নিজস্ব প্রতিবেদক: অর্থ সংকটে বন্ধ হতে চলেছে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজের ভেনম রিসার্চ সেন্টার। সাপের বিষ থেকে প্রতিষেধক তৈরির দেশের একমাত্র গবেষণা কেন্দ্রটির এখন অনিশ্চিত ভবিষ্যতের প্রতিচ্ছবি। প্রকল্পটি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হলেও গত আড়াই বছরে কেউ একবারের জন্যও খোঁজ নেয়নি। প্রকল্পে যারা কাজ করছেন, তারা দীর্ঘদিন ধরে বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না। বিভিন্ন জায়গা থেকে অর্থ সংগ্রহ করে এবং ধারদেনা করে প্রকল্পটি চালু রাখা হয়েছে।
এমন অবস্থায় ৩৭০ বিষধর সাপের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কায় পড়েছেন গবেষকরা। সাপের বিষ থেকে প্রতিষেধক তৈরির এই গবেষণা কেন্দ্রটি অর্থের অভাবে বন্ধ হওয়ার পথে। এ অবস্থায় গবেষকদের কাছে একটি পথই খোলা রয়েছে, মারাত্মক বিষধর সাপগুলোকে প্রকৃতিতে ছেড়ে দেওয়া। কিন্তু সেটিও মানুষের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। গবেষণা চালিয়ে যাবেন নাকি সাপ ছেড়ে দেবেন, সে বিষয়ে তাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে দুই মাসের মধ্যেই। একসঙ্গে এত সাপ মেরে ফেলাও বেআইনি।
২০১৮ সালে ভেনম রিসার্চ সেন্টারে (ভিআরসি) গবেষণা শুরু হয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের অপারেশনাল প্ল্যানের আওতায়। এর মধ্যে দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে সাপ ধরে আনা, সেগুলো প্রতিপালন, প্রজনন- সর্বোপরি বিষ সংগ্রহ চলছিল। রাসেলস ভাইপার সাপের বিষ থেকে প্রতিষেধক তৈরির একটি ট্রায়ালও সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু ২০২৪ সালের জুন থেকে প্রকল্পে অর্থ বরাদ্দ বন্ধ রয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকার অপারেশনাল প্ল্যানের বরাদ্দ বন্ধ করে দিলে এই অচলাবস্থা দেখা দেয়। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ভবনের পাশে দুই হাজার বর্গফুটের এই সেন্টারে আট বছর ধরে গবেষণার জন্য লালন পালন করা হচ্ছে রাসেলস ভাইপার, পদ্মগোখরা, পিট ভাইপার, সবুজ বোড়ার মতো বিষধর সাপ। সাধারণত লোকালয়ে এসব সাপ খুবই বিরল। এ ধরনের সাপের কামড়ের পর তাৎক্ষণিক চিকিৎসা না পেলে ছয় ঘণ্টার মধ্যেই মৃত্যু অনিবার্য।
ভেনম রিসার্চ সেন্টারের সহকারী গবেষক আব্দুল আউয়াল বলেন, সরকারি অর্থায়ন বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সাপের প্রধান খাবার ইঁদুর উৎপাদন কমাতে হয়েছে। আগে সপ্তাহে ছয় দিন ইঁদুরকে খাবার দেওয়া হলেও এখন চার দিন দেওয়া হচ্ছে। সাপগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে ১৫ দিনে মাত্র একবার খাবার দেওয়া হচ্ছে। শুধু খাবার নয়, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতনও প্রায় বন্ধ বলে জানান তিনি।
আব্দুল আউয়ালের ভাষায়, দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে সংগৃহীত প্রায় ৩৫০টি সাপ রয়েছে এখানে। এগুলোকে বাঁচিয়ে রাখাও এখন বড় চ্যালেঞ্জ। দীর্ঘদিন গবেষণাগারে বন্দি থাকার কারণে এসব সাপকে হঠাৎ প্রকৃতিতে ছেড়ে দেওয়া সহজ নয়। অনেক সাপ হয়তো স্বাভাবিক পরিবেশে নিজেদের খাবার সংগ্রহ করতে পারবে না। আবার অপরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন এলাকায় ছেড়ে দিলে মানুষের জন্যও ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে এসব সাপ মেরে ফেলাও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর হবে।
জানা গেছে, এই দীর্ঘ গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতির একটি রাসেলস ভাইপারের জন্য মনোভালেন্ট অ্যান্টিভেনম তৈরির কাজ। রাসেলস ভাইপারের জন্য মনোভালেন্ট অ্যান্টিভেনমের ল্যাবরেটরি ট্রায়াল ইঁদুরের ওপর সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এর বিস্তারিত প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে এবং মূল্যায়নের অপেক্ষায় রয়েছে।
প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভারতে তৈরি প্রচলিত অ্যান্টিভেনম দিয়ে একজন রোগীর চিকিৎসায় ২০ থেকে ৪০ ভায়াল পর্যন্ত প্রয়োজন হতে পারে। বিপরীতে দেশীয়ভাবে তৈরি মনোভালেন্ট অ্যান্টিভেনমে ২ থেকে ৫ ভায়াল প্রয়োজন হতে পারে। এতে চিকিৎসা ব্যয় ৫ হাজার টাকার নিচে নামিয়ে আনার সম্ভাবনা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ভেনম রিসার্চ সেন্টারে বর্তমানে দেড় কেজির বেশি সংগৃহীত সাপের বিষ সংরক্ষিত রয়েছে। আন্তর্জাতিক বিষ নিষ্কাশন ও স্বীকৃত গবেষণা প্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্রের কেনটাকি রেপটাইল জু এবং অস্ট্রেলিয়ার ভেনম সাপ্লাইস এর প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যতালিকা ও ক্যাটালগ অনুযায়ী, বৈজ্ঞানিক ও চিকিৎসার উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত প্রতি গ্রাম সাপের বিষের দাম প্রজাতিভেদে ১০০ থেকে ৪০০ মার্কিন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১২,০০০ থেকে ৪৮,০০০ টাকা)। এই হিসাব অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বৈধ বাজারে চিকিৎসা ও গবেষণার জন্য ১৫০০ গ্রাম (দেড় কেজি) সাপের বিষের আনুমানিক প্রকৃত মূল্য ২ লাখ ২৫ হাজার থেকে ৬ লাখ মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি টাকায় দাঁড়ায় প্রায় ২ কোটি ৭০ লাখ থেকে ৭ কোটি ২০ লাখ টাকা।
ভেনম রিসার্চ সেন্টারের সমন্বয়ক অধ্যাপক ডা. আব্দুল্লাহ আবু সাঈদের প্রশ্ন, এখানে সাড়ে ৩৭০টির মতো সাপ আছে। এসব সাপকে বাঁচাতে হলেও একটা বাজেট দরকার। এই টাকাও পর্যন্ত নেই আমাদের কাছে। ৫-৬ বছর ধরে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে সাপগুলো সংগ্রহ করা হয়েছে। একটা জনগুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প এভাবে শেষ হয়ে যাবে? তার এই প্রশ্ন শুধু সাপগুলোকে ঘিরে নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আট বছরের গবেষণা, কোটি টাকা ব্যয়ে গড়ে ওঠা অবকাঠামো, সংরক্ষিত সাপের বিষ এবং দেশীয় অ্যান্টিভেনম তৈরির সম্ভাবনা।
আব্দুল্লাহ আবু সাঈদের ভাষ্য, প্রকল্পটি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হলেও গত আড়াই বছরে কেউ একবারের জন্যও খোঁজ নেয়নি। প্রকল্পে যারা কাজ করছেন, তারা দীর্ঘদিন ধরে বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না। বিভিন্ন জায়গা থেকে অর্থ সংগ্রহ করে এবং ধারদেনা করে প্রকল্পটি চালু রাখা হয়েছে।সরকারের কাছে আত্তীকরণের জন্য ডিপিপি পাঠানো হয়েছে বলেও জানান তিনি। আব্দুল্লাহ আবু সাঈদ বলেন, ডিপিপিটি কয়েকবার সংশোধনের জন্য পাঠানো হয়েছিল। সংশোধন করে পুণরায় মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু এখনও কোনো সমাধান হয়নি।
চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. অনিরুদ্ধ ঘোষ জানান, কেন্দ্রটি একটি সরকারি উদ্যোগ হিসেবে অপারেশনাল প্ল্যানের (ওপি) আওতায় পরিচালিত হতো। কিন্তু ২০২৪ সালের জুনের পর সরকারি অর্থায়ন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বর্তমানে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজের মেডিসিন বিভাগের কিছু অর্থায়ন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগীদের বরাদ্দের একটি অংশ দিয়ে সীমিত পরিসরে কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়া হচ্ছে।তার মতে, দ্রুত সরকারি অর্থায়ন না এলে কেন্দ্রটিকে টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।
এদিকে, কেন্দ্রটি বন্ধ হয়ে গেলে গত আট বছরের গবেষণা, অবকাঠামো এবং অর্জন বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বে। ভবিষ্যতে আবার এই গবেষণা শুরু করতে গেলে অনেক কিছুই শূন্য থেকে তৈরি করতে হবে। আট বছরে ভেনম রিসার্চ সেন্টারের গবেষকরা দেশি সাপ ও সাপের বিষ নিয়ে আন্তর্জাতিক জার্নালে ১১টি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন।
এসব গবেষণায় বাংলাদেশে নতুন সাপের প্রজাতির উপস্থিতি শনাক্ত, বিষধর সাপের ভৌগোলিক বিস্তৃতি ও জিনগত বৈচিত্র্য, কোবরা ও গ্রিন পিট ভাইপারের বিষের গঠন, জলবায়ু পরিবর্তনে সাপের আবাসস্থলের পরিবর্তন, সামুদ্রিক সাপের কামড়, সাপের বিষে আক্রান্ত হওয়ার চিকিৎসা এবং বন্দি সাপের পরজীবী সংক্রমণ নিয়ে তথ্য উঠে এসেছে।
গবেষণাগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের কোরাল রেড কুকরি সাপ, কনডানারাস স্যান্ড স্নেক ও পারস্য উপসাগরীয় সি স্নেকের উপস্থিতি শনাক্তকরণ, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কোবরার বিষের জিনগত ও প্রোটিনগত পার্থক্য এবং অ্যান্টিভেনমের কার্যকারিতা নিয়ে গবেষণা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এসব গবেষণা দেশীয় সাপের বিষের বৈশিষ্ট্য বোঝা এবং অঞ্চলভিত্তিক অ্যান্টিভেনম তৈরির ভিত্তি তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
ভেনম রিসার্চ সেন্টারের সহযোগী গবেষক মোহাম্মদ নোমান জানান, সাপের কামড় বাংলাদেশের একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা। সাম্প্রতিক জরিপের হিসাবে, দেশে প্রতিবছর প্রায় সাড়ে চার লাখ মানুষ সাপের কামড়ের শিকার হন এবং প্রায় আড়াই হাজার গবাদিপশু মারা যায়। ভুক্তভোগীদের বড় অংশ গ্রামীণ ও কৃষিভিত্তিক জনগোষ্ঠীর। এ গবেষণা সফলভাবে পরিচালিত হলে প্রতি বছর সাপে কাটায় মৃত্যু হ্রাস করা যাবে। পাশাপাশি দেশীয় তৈরি অ্যান্টিভেনম কম মূল্যে সরবরাহ করা যাবে।




