ঢাকা অফিস: জাতিসংঘের ৮১ তম অধিবেশনে তারেক রহমানের প্রদত্ত বক্তব্যের প্রতিবাদ করে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে আজ শনিবার(২৬ সেপ্টেম্বর)গণমাধ্যমে প্রেরিত এক লিখিত প্রতিবাদে তারেক রহমান বিশ্বসভায় আওয়ামী লীগ সরকার সম্পর্কে বিষোদগার করেছেন এবং মিথ্যাচারের আশ্রয় নিয়েছেন।
তিনি তার বক্তব্যে বলেছেন, ফ্যাসিবাদী শাসনামলে স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হওয়া গুম, খুন, অপহরণ, দুর্নীতি, লুটপাট আর টাকা পাচারের অভিশাপ থেকে মুক্ত হয়ে বাংলাদেশ বর্তমানে পুনরায় গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করেছে। তার এই বক্তব্য সত্যের অপলাপ ছাড়া আর কিছু নয়। জাতিসংঘে প্রদত্ত বক্তৃতায় তারেক রহমান বাংলাদেশের প্রকৃত চিত্রটি আড়াল করেছেন। স্বাধীনতার ঘোষণার মতো জাতীয়ভাবে মীমাংসিত বিষয় নিয়েও মিথ্যাচার করেছেন। তাছাড়া আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ক্রমাগত মিথ্যাচার, আওয়ামী লীগের অর্জন চুরির প্রবণতা, সারাদেশে চাঁদাবাজি-টেন্ডারবাজি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও ঘরবাড়ি দখল, প্রশাসনকে দলীয়করণ, মিথ্যা মামলা দিয়ে লক্ষ লক্ষ নেতা-কর্মীকে ঘরছাড়া করা, বিনাবিচারে আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী-সমর্থকদের কারাগারে আটক রাখার কারণে কারাগারের ধারণক্ষমতার চেয়ে আড়াইগুণ বেশি কারাবন্দি, কারাগারে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের পরিকল্পিতভাবে হত্যা, জনগণকে অগোচরে রেখে একের পর এক দেশবিরোধী চুক্তি সম্পাদন, মিথ্যা অজুহাতে দক্ষ ও যোগ্য সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাদের চাকুরিচ্যুত করা, হাজার শিল্প-কারখানা বন্ধ হয়ে লক্ষ লক্ষ মানুষের মানবেতর জীবনযাপন, একের পর এক নারী ও শিশু ধর্ষণ ও অপহরণ– এই হচ্ছে তারেক রহমানের আজকের বাংলাদেশের চিত্র।
প্রতিবাদে উল্লেখ করেন, মেটিকুলাস ডিজাইনের মাধ্যমে ফ্যাসিস্ট ইউনূসের তল্পিবাহক হিসেবে তারেক রহমান বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে এবং একটি সাজানো নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠন করেছে। আশা করা হয়েছিল, অতীতের ভুল ও অপকর্ম থেকে নিজেকে শুধরে নিয়ে তারেক রহমান নতুন ভাবে রাজনীতি শুরু করেছেন। কিন্তু যতই দিন যাচ্ছে, তার বক্তব্য ও কর্মকান্ড থেকে আবারও প্রমাণিত হচ্ছে যে কুকুরের লেজ কখনো সোজা হয় না। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত সময়কালে তারেক রহমানের পরিচালিত দুর্নীতি সিন্ডিকেটের কারণে বাংলাদেশ ৫ বার দুর্নীতিতে বিশ্বে শীর্ষস্থান লাভ করেছিল। মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারকে হরণ ও বিরুদ্ধ মতকে দমনের লক্ষ্যে তারেক রহমানের নিদের্শনায় বাংলাদেশে উগ্র জঙ্গিগোষ্ঠীর উত্থান ঘটানো হয়েছিল। বিচার ব্যবস্থাকে কুক্ষিগত করে রাখার জন্য তারেক রহমানের লালিত জঙ্গিগোষ্ঠী একযোগে সারাদেশে আদালতসহ ৫০০ স্থানে বোমা হামলা করেছিল। তারেক রহমানের পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলাদেশ পরিণত হয়েছিল সন্ত্রাসের এক ভয়াল জনপদে।
তারেকের দৌরাত্ম্য এখানেই থেমে থাকেনি। তারই নীলনকশায় বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বর্বরোচিত গ্রেনেড হামলা চালানো হয়, সেই হামলায় বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রাণে রক্ষা পেলেও আইভী রহমান সহ আওয়ামী লীগের ২৪জন নেতাকর্মী প্রাণ হারিয়েছিলেন। সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়া, সাবেক সংসদ সদস্য আহসানউল্লাহ মাস্টার, মঞ্জুরুল ইমাম, মামতাজ উদ্দিন সহ আওয়ামী লীগে হাজার হাজার নেতাকর্মীকে হত্যা করা হয়।
একদিকে দুর্নীতি, লুটপাট, সন্ত্রাস অন্যদিকে তরুণ প্রজন্মকে ধ্বংস করার জন্য দেশজুড়ে মাদকের বিস্তার – এই ছিল তারেক রহমানের মূলনীতি। তার পাপের ভাণ্ডার এতটাই ভারী হয়ে ওঠে যে, এক পর্যায়ে “জীবনে রাজনীতি করবে না” এমন দাসখত দিয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিল। কিন্তু বিদেশে নিরাপদ দূরত্বে থেকেও বাংলাদেশ বিরোধী চক্রান্ত চালিয়ে গেছে। আগুন সন্ত্রাসের মাধ্যমে দেশকে অস্থিতিশীল করার অপচেষ্টা করেছে। দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে বাধাগ্রস্ত করার অপপ্রয়াস চালিয়েছে। এহেন তারেক রহমানের কাছ থেকে বেশি কিছু আশা করাও ভুল। বিগত ৭ মাসে সরকার পরিচালনায় প্রতিনিয়ত তিনি এর প্রমাণ রেখে চলেছে। জাতিসংঘের বক্তৃতায় মিথ্যাচার তারই ধারাবাহিকতা।
বক্তৃতায় তিনি একদিকে বলছেন, ১৭ বছরে দেশ নাকি আগায়নি, আবার অন্যদিকে দাবী করছেন বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ-এর তালিকা থেকে উত্তরণের অপেক্ষায় রয়েছে। ১৭ বছরে যদি দেশে উন্নয়ন না হয়ে থাকে, তাহলে এই উত্তরণের সম্ভাবনা কী হাওয়া থেকে হয়েছে? তারেক রহমানের জানা থাকা উচিত যে, আওয়ামী লীগ সরকারের এমডিজি (MDG) গোলের মাধ্যমে পরিকল্পিত উন্নয়ন কৌশলের কারণেই বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশের দিকে ধাবিত হয়েছে।
তারেক রহমান তার বক্তৃতায় কোভিড মহামারির কথা উল্লেখ করেছেন। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার দূরদর্শী সিদ্ধান্তের কারণে যে, বাংলাদেশের মানুষ বিনামূল্যে ৩৭ কোটি ডোজ ভ্যাকসিন পেয়েছে এবং প্রাণহানির সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছে; সেই কথাটি উল্লেখ করেন নাই। কারণ তাহলে কৃতিত্ব আওয়ামী লীগকে দিতে হবে।
নারীর ক্ষমতায়নের জন্য আওয়ামী লীগ সরকার নারী নীতিমালা প্রণয়ন করেছিল। সমাজের সর্বক্ষেত্র নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে নারীবান্ধব সমাজ গড়ে তুলেছিল। চাকুরি ক্ষেত্রে মেয়েরা যেন বঞ্চিত না হয়, সেজন্য তাদের জন্য বিশেষ কোটা ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে ছাত্রদের দাবির প্রেক্ষিতে নারীদের এই কোটা সহ সকল কোটা বাতিল করা হয়। তখন বিএনপিও এই নারী কোটা বাতিলের পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করেছিল। আর এখন তারেক রহমান বলছে “দেশের আর্থ-সামাজিক রূপান্তরের ক্ষেত্রে নারীরা সরকারের সব পরিকল্পনার অগ্রভাগে রয়েছেন”।
আওয়ামী লীগ সরকার-ই প্রথম ২০১০ সাল থেকে মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিনামূল্যে বই বিতরণ করা হয়েছে এবং দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত নারীদের অবৈতনিক শিক্ষা নিশ্চিত করেছিল। জাতিসংঘের বক্তৃতায় তারেক রহমান সে কথাটিও বেমালুম আড়াল করে গেলেন।
তারেক রহমান তার বৃক্তৃতায় বিভিন্ন রকমের কার্ডের কথা বলেছেন। অথচ আওয়ামী লীগ আমলেই ফেয়ার প্রাইস কার্ড চালু করা হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সামাজিক সুরক্ষা ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মাধ্যমে দারিদ্র বিমোচনে বাংলাদেশের সাফল্য আন্তর্জাতিক বিশ্বে ভূয়সী প্রশংসা লাভ করে। ২০০৫ সালে দেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ৪০ শতাংশ যা ২০২২ সালে নেমে আসে ১৮.৭ শতাংশে আর অতি দারিদ্র্যের হার ২১.১ শতাংশ থেকে নেমে আসে ৫.৬ শতাংশ। সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ২০০৬ সালে বরাদ্দ ছিল ২ হাজার ৫ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রায় ১ লক্ষ ২৬ হাজার ২৬ কোটি টাকা যা ২০০৬ সালের বরাদ্দের তুলনায় ৫০ গুণ বেশ। আর সামাজিক নিরাপত্তা খাতে উপকারভোগীর সংখ্যা ১ কোটি ৮১ লাখ ২৩ হাজার ৫৫৪ জন। বাংলাদেশে একজন মানুষ্ও গৃহহীন থাকবে না- মুজিববর্ষে প্রদত্ত মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষণার আলোকে ৮ লাখ ৪১ হাজার ৬২৩টি পরিবারকে ঘর ও জমি প্রদান করা হয়, যার সুবিধাভোগীর সংখ্যা ৪২ লাখ ৮০ হাজারের বেশি। খাদ্য নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থানমূলক কার্যক্রম ভিজিএফ (VGF), ভিজিডি (VGD), ভিডব্লিউবি, টিআর, জিআর, কাবিখা, কাবিটা, ইজিপিপি এবং ওএমএসের আওতায় পরিচালিত ১১৪টি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় সুবিধাভোগীর সংখ্যা ৪ কোটি ৬১ লাখ ১৫ হাজার ৭৫৬ জন। ২০০৬ সালে এই উপকারভোগীর সংখ্যা ছিল মাত্র ৪ লাখ ৩০ হাজার জন।
বক্তৃতায় তারেক রহমান বলেছেন, “বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক তরুণ জনগোষ্ঠী এবং ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল সক্ষমতা আমাদের সামনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে উন্নত প্রযুক্তি, জ্ঞান ও গবেষণার সুযোগ সবার নাগালের মধ্যে আনতে হবে।” ভালো কথা বলেছেন। কিন্তু তারেক রহমানের কাছে প্রশ্ন, এই ডিজিটাল সক্ষমতা তৈরি হলো কীভাবে? ১৭ বছরে আওয়ামী লীগ সরকার যে, দেশে একটি ডিজিটাল বিপ্লব ঘটিয়েছেন; সেই কথাটি বলতে কী লজ্জা পাচ্ছেন?
প্রসঙ্গক্রমে অতীতে বিএনপি সরকার তথ্যপ্রযুক্তির জন্য কী করেছিল, সেটি একটু জেনে নেওয়া দরকার। তথ্যপাচার হয়ে যাবে এই অজুহাতে বিএনপি সরকার বাংলাদেশকে বিনামূল্যে সাবমেরিন ক্যাবলে যুক্ত হওয়া থেকে বিরত রেখেছিল। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে সাবমেরিন ক্যাবলের সঙ্গে বাংলাদেশকে যুক্ত করার ফলে বাংলাদেশ ইন্টারনেটের মাধ্যমে সহজেই বিশ্বপরিসরে যুক্ত হয়।
নেদারল্যান্ড সরকার বাংলাদেশকে বিনামূল্য টিউলিপ ব্র্যান্ডের কম্পিউটার দিতে চেয়েছিল, কিন্তু যেহেতু ব্র্যান্ডটির নামের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ রেহানার মেয়ে টিউলিপের নামের মিল, সেহেতু ২০০১ সালের বিএনপি সরকার নেদারল্যান্ডের সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিল।
বিএনপি নেতা সাবেক পররাষ্ট্র মন্ত্রী এম মোরশেদ খানের কোম্পানির মাধ্যমে মোবাইল ব্যবসাকে কুক্ষিগত করে রাখা হয়েছিল। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ রাষ্ট্র পরিচালনায় এসে একাধিক অপারেটরকে ব্যবসা করার সুযোগ প্রদান করে, ফলে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশের কারণে মোবাইল ফোন মানুষের জন্য সহজলভ্য হয়ে ওঠে।
অপার সম্ভাবনার কথা বিবেচনা করে আওয়ামী লীগ সরকার কম্পিউটার সামগ্রীর উপর শূন্য শুল্ক আরোপ, ইন্টারনেটকে সহজলভ্য করে, মোবাইল ফোনকে সহজলভ্য করে, সারাদেশে ডিজিটাল ব্যাকবোন গড়ে তোলে, দক্ষ আইটি জনবল তৈরির জন্য পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করে ডিজিটাল বাংলাদেশকে বাস্তব রূপ দিয়েছিল। আজকে বাংলাদেশের ডিজিটাল সক্ষমতার কথা তারেক রহমান বলে, কিন্তু এই অর্জন কীভাবে সাধিত হলো সেই সত্য উচ্চারণ করে না।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিনামূল্যে দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। তারেক রহমান এটিও তার সরকারের অর্জন বলে দাবি করেছেন।
প্রতিবাদলিপিতে আরেও বলা হয়, তারেক রহমান যদি এভাবে তার অতীতের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে মিথ্যাচার ও এই ধরনের অপশাসন চালিয়ে যেতে থাকেন, তাহলে তার কথার সূত্র ধরেই বলতে হয় যে, সবার জন্য বাংলাদেশ তো দুরের কথা “সবার আগে বাংলা শেষ”।




