মাহবুবুর রহমান: রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ত প্রবেশপথ টঙ্গী। শিল্পকারখানা, রেললাইন, বস্তি ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই জনপদে প্রতিদিনই মানুষের ব্যস্ততা। কিন্তু এর পাশাপাশি অপরাধের নানা অভিযোগও দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায়। বিশেষ করে মাদক কেনাবেচা, ছিনতাই, অস্ত্র, চাঁদাবাজি, সহিংসতা, হত্যা এবং নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। পুলিশের মামলা-সংক্রান্ত পরিসংখ্যানেও টঙ্গীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির একটি চিত্র পাওয়া যায়। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত টঙ্গী পূর্ব থানায় ৮৪২টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ৩৯৭টি মামলাই মাদকসংক্রান্ত। অর্থাৎ মোট মামলার প্রায় ৪৭ শতাংশ মাদককে ঘিরে। ছয় মাসে এত মামলা হওয়ার হিসাবে প্রতিদিন গড়ে প্রায় পাঁচটি মামলা হয়েছে। আর মাদকসংক্রান্ত মামলা হয়েছে প্রতিদিন গড়ে দুইটিরও বেশি। তবে মামলা হওয়া আর অপরাধের প্রকৃত চিত্র এক বিষয় নয়। অনেক ঘটনা থানায় মামলা পর্যন্ত গড়ায় না। ফলে পুলিশের পরিসংখ্যানের বাইরেও অপরাধের ঘটনা থেকে যেতে পারে বলে মনে করেন স্থানীয় বাসিন্দাদের কেউ কেউ।

মামলার বড় অংশ মাদকসংক্রান্ত
পুলিশের তথ্যমতে, বছরের প্রথম ছয় মাসে টঙ্গী পূর্ব থানায় মাদকসংক্রান্ত ৩৯৭টি মামলা হয়েছে। একই সময়ে নারী ও শিশু নির্যাতনের ৬৬টি, অস্ত্র আইনে ২৮টি, ছিনতাইয়ের ২০টি, হত্যার ১০টি, সিঁধেল চুরির ৯টি এবং ডাকাতির দুটি মামলা হয়েছে। অন্যান্য অপরাধে মামলা হয়েছে আরও ৩১০টি। পরিসংখ্যান বলছে, টঙ্গী পূর্ব থানার মামলার তালিকায় মাদকসংক্রান্ত অপরাধের অবস্থান সবচেয়ে ওপরে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন অভিযানে মাদক উদ্ধারের পাশাপাশি দেশীয় অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনাও ঘটছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, টঙ্গীর কয়েকটি বস্তি, রেললাইনসংলগ্ন এলাকা, শিল্পকারখানার আশপাশ এবং ঘনবসতিপূর্ণ কিছু এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে মাদক কেনাবেচার অভিযোগ রয়েছে। সন্ধ্যার পর এসব এলাকার কোনো কোনো অংশে অপরিচিত ও সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের আনাগোনা বাড়ে বলেও অভিযোগ স্থানীয়দের। তবে কোনো নির্দিষ্ট হত্যাকাণ্ড, ছিনতাই বা সহিংসতার সঙ্গে মাদকের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে—এমন সিদ্ধান্ত তদন্ত ছাড়া দেওয়া যায় না বলে আইনশৃঙ্খলা সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।

হত্যাকাণ্ডে মাদক বিরোধের অভিযোগ
সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনাও টঙ্গীর অপরাধ পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। গত ১ সেপ্টেম্বর গোপালপুর এলাকায় নূরুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তিকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত এবং দুই পায়ের রগ কেটে হত্যার অভিযোগ ওঠে। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে ওই হত্যাকাণ্ডের পেছনে মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের বিষয়টি সামনে এসেছে। তবে হত্যার প্রকৃত কারণ এবং কারা এতে জড়িত, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা। এ ধরনের ঘটনা স্থানীয়দের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। বিশেষ করে মাদক ব্যবসাকে কেন্দ্র করে বিরোধ তৈরি হলে তা মারামারি, হামলা কিংবা আরও গুরুতর অপরাধে গড়াতে পারে—এমন আশঙ্কা রয়েছে।

নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনাও উদ্বেগের
টঙ্গীতে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনাও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরেকটি উদ্বেগের জায়গা। পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বছরের প্রথম ছয় মাসে টঙ্গী পূর্ব থানায় নারী ও শিশু নির্যাতনের ৬৬টি মামলা হয়েছে। এর বাইরে টঙ্গী পশ্চিম থানার এলাকাতেও নারী নির্যাতনের অভিযোগে একাধিক মামলা হয়েছে। মার্চে বড়দেওড়া শিংবাড়ী এলাকায় ১৮ বছর বয়সী এক তরুণীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগে মামলা হয়। ওই মামলায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করার কথা জানায় পুলিশ। জুলাইয়ে কলাবাগান এলাকায় এক মাদ্রাসাছাত্রীকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা হয়। আসামি গ্রেপ্তারের দাবিতে স্থানীয় বাসিন্দারা ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করেন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে স্থানীয়দের উদ্বেগের ক্ষেত্রে এসব ঘটনাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ অপরাধের শিকার ব্যক্তিদের নিরাপত্তা, বিচারপ্রাপ্তি এবং দ্রুত আইনি সহায়তা নিশ্চিত করা নিয়ে প্রশ্নও সামনে আসে।

ছিনতাইয়ে দেশীয় অস্ত্রের ব্যবহার
টঙ্গীর ব্যস্ত সড়ক, অলিগলি ও পরিবহনকেন্দ্রিক এলাকাগুলোতে ছিনতাইয়ের অভিযোগও রয়েছে। গত জুনে টঙ্গী পশ্চিম থানার দক্ষিণ আরিচপুর ও বড় দেওড়া এলাকায় পৃথক অভিযান চালিয়ে ছিনতাই ও ডাকাতির প্রস্তুতির অভিযোগে ১৩ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পুলিশের দাবি, তাদের কাছ থেকে চাপাতি ও ছুরিসহ দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় পৃথক দুটি মামলা হয়েছে। এরপর জুলাইয়ে টঙ্গী পূর্ব থানার গাজীপুরা এলাকায় চলন্ত অটোরিকশা থামিয়ে এক নারী যাত্রীর ওপর হামলা ও ছিনতাইয়ের অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় দুইজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাদের কাছ থেকে ছুরি ও চাপাতি উদ্ধারের কথাও জানানো হয়। পরে অস্ত্র আইনে মামলা করা হয়। পুলিশের তথ্যমতে, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে টঙ্গী পূর্ব এলাকায় ছিনতাইয়ের অভিযোগে ৪২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

অভিযানে বাধা, আসামি ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনাও
টঙ্গীর কিছু এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনার সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বাধার মুখে পড়ার ঘটনাও সামনে এসেছে। হাজী মাজার বস্তি, এরশাদনগরসহ কয়েকটি এলাকায় বিভিন্ন সময়ে অভিযান চালিয়ে মাদক ও দেশীয় অস্ত্র উদ্ধারের পাশাপাশি একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এসব অভিযানে মাদক, অস্ত্র ও ছিনতাইয়ের অভিযোগ একসঙ্গে সামনে এসেছে। এতে বোঝা যায়, অপরাধের ধরনগুলো অনেক ক্ষেত্রে একে অপরের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে উঠতে পারে। তবে প্রতিটি ঘটনার সম্পর্ক ও ভূমিকা তদন্তের মাধ্যমে আলাদাভাবে নির্ধারণ করতে হয়। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি টঙ্গী রেলস্টেশন এলাকায় পুলিশের ওপর হামলা করে হাতকড়াসহ এক আসামিকে ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগও ওঠে। ওই ঘটনায় একজন পুলিশ সদস্য আহত হন। পরে ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

খুচরা বিক্রেতা গ্রেপ্তার, মূল কারবারিরা কতটা নিয়ন্ত্রণে?
মাদকবিরোধী অভিযানে নিয়মিত গ্রেপ্তার ও মামলা হলেও স্থানীয় পর্যায়ে প্রশ্ন উঠছে—এসব অভিযানে মাদক সরবরাহের মূল উৎস কতটা নিয়ন্ত্রণে আসছে? স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, অভিযানে অনেক সময় মাদক বহনকারী, খুচরা বিক্রেতা কিংবা সেবনকারীরা গ্রেপ্তার হলেও বড় কারবারের সঙ্গে জড়িতদের একটি অংশ ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। ফলে একজন গ্রেপ্তার হওয়ার পর অন্য কেউ একই এলাকায় নতুন করে ব্যবসা শুরু করে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং কারা মাদক ব্যবসার মূল নিয়ন্ত্রক—তা নির্ধারণের জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্ত ও গোয়েন্দা নজরদারি প্রয়োজন।

অপরাধ নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ
টঙ্গীর অপরাধ পরিস্থিতি শুধু পুলিশের অভিযান দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব কি না, সেটিও আলোচনায় এসেছে। স্থানীয়দের মতে, মাদক নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বস্তি ও রেললাইনসংলগ্ন এলাকার নিরাপত্তা, পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা, সিসিটিভি, কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়া ঠেকানো এবং দ্রুত বিচারপ্রক্রিয়া নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে শিল্পাঞ্চল ও পরিবহনকেন্দ্রিক এলাকাগুলোতে নিয়মিত টহল এবং সন্দেহজনক কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারি বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন স্থানীয়রা। পুলিশের মামলার পরিসংখ্যান টঙ্গীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলেও এটি পুরো বাস্তবতার একমাত্র মাপকাঠি নয়। কোন এলাকায় অপরাধ বেশি, কোন ধরনের অপরাধ বারবার ঘটছে এবং অপরাধের পেছনে কী কারণ কাজ করছে—এসব বিষয় বিশ্লেষণ করে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা নেওয়াই বড় চ্যালেঞ্জ। টঙ্গী রাজধানীর প্রবেশদ্বার হওয়ায় প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ এখানে যাতায়াত করেন। তাই এখানকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রভাব শুধু স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; আশপাশের বৃহত্তর এলাকার জননিরাপত্তার সঙ্গেও তা জড়িত। মাদক, ছিনতাই, অস্ত্র ও সহিংসতার অভিযোগগুলোর পাশাপাশি নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনাগুলোও তাই আলাদাভাবে গুরুত্ব দিয়ে দেখার প্রয়োজন রয়েছে। অপরাধের মূল কারণ শনাক্ত, অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা এবং ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে টঙ্গীর দীর্ঘদিনের অপরাধ-সংক্রান্ত উদ্বেগ কমানো সম্ভব হতে পারে।

মাহবুবুর রহমান: রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ত প্রবেশপথ টঙ্গী। শিল্পকারখানা, রেললাইন, বস্তি ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই জনপদে প্রতিদিনই মানুষের ব্যস্ততা। কিন্তু এর পাশাপাশি অপরাধের নানা অভিযোগও দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায়। বিশেষ করে মাদক কেনাবেচা, ছিনতাই, অস্ত্র, চাঁদাবাজি, সহিংসতা, হত্যা এবং নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। পুলিশের মামলা-সংক্রান্ত পরিসংখ্যানেও টঙ্গীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির একটি চিত্র পাওয়া যায়। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত টঙ্গী পূর্ব থানায় ৮৪২টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ৩৯৭টি মামলাই মাদকসংক্রান্ত। অর্থাৎ মোট মামলার প্রায় ৪৭ শতাংশ মাদককে ঘিরে। ছয় মাসে এত মামলা হওয়ার হিসাবে প্রতিদিন গড়ে প্রায় পাঁচটি মামলা হয়েছে। আর মাদকসংক্রান্ত মামলা হয়েছে প্রতিদিন গড়ে দুইটিরও বেশি। তবে মামলা হওয়া আর অপরাধের প্রকৃত চিত্র এক বিষয় নয়। অনেক ঘটনা থানায় মামলা পর্যন্ত গড়ায় না। ফলে পুলিশের পরিসংখ্যানের বাইরেও অপরাধের ঘটনা থেকে যেতে পারে বলে মনে করেন স্থানীয় বাসিন্দাদের কেউ কেউ।

মামলার বড় অংশ মাদকসংক্রান্ত
পুলিশের তথ্যমতে, বছরের প্রথম ছয় মাসে টঙ্গী পূর্ব থানায় মাদকসংক্রান্ত ৩৯৭টি মামলা হয়েছে। একই সময়ে নারী ও শিশু নির্যাতনের ৬৬টি, অস্ত্র আইনে ২৮টি, ছিনতাইয়ের ২০টি, হত্যার ১০টি, সিঁধেল চুরির ৯টি এবং ডাকাতির দুটি মামলা হয়েছে। অন্যান্য অপরাধে মামলা হয়েছে আরও ৩১০টি। পরিসংখ্যান বলছে, টঙ্গী পূর্ব থানার মামলার তালিকায় মাদকসংক্রান্ত অপরাধের অবস্থান সবচেয়ে ওপরে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন অভিযানে মাদক উদ্ধারের পাশাপাশি দেশীয় অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনাও ঘটছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, টঙ্গীর কয়েকটি বস্তি, রেললাইনসংলগ্ন এলাকা, শিল্পকারখানার আশপাশ এবং ঘনবসতিপূর্ণ কিছু এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে মাদক কেনাবেচার অভিযোগ রয়েছে। সন্ধ্যার পর এসব এলাকার কোনো কোনো অংশে অপরিচিত ও সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের আনাগোনা বাড়ে বলেও অভিযোগ স্থানীয়দের। তবে কোনো নির্দিষ্ট হত্যাকাণ্ড, ছিনতাই বা সহিংসতার সঙ্গে মাদকের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে—এমন সিদ্ধান্ত তদন্ত ছাড়া দেওয়া যায় না বলে আইনশৃঙ্খলা সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।

হত্যাকাণ্ডে মাদক বিরোধের অভিযোগ
সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনাও টঙ্গীর অপরাধ পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। গত ১ সেপ্টেম্বর গোপালপুর এলাকায় নূরুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তিকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত এবং দুই পায়ের রগ কেটে হত্যার অভিযোগ ওঠে। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে ওই হত্যাকাণ্ডের পেছনে মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের বিষয়টি সামনে এসেছে। তবে হত্যার প্রকৃত কারণ এবং কারা এতে জড়িত, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা। এ ধরনের ঘটনা স্থানীয়দের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। বিশেষ করে মাদক ব্যবসাকে কেন্দ্র করে বিরোধ তৈরি হলে তা মারামারি, হামলা কিংবা আরও গুরুতর অপরাধে গড়াতে পারে—এমন আশঙ্কা রয়েছে।

নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনাও উদ্বেগের
টঙ্গীতে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনাও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরেকটি উদ্বেগের জায়গা। পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বছরের প্রথম ছয় মাসে টঙ্গী পূর্ব থানায় নারী ও শিশু নির্যাতনের ৬৬টি মামলা হয়েছে। এর বাইরে টঙ্গী পশ্চিম থানার এলাকাতেও নারী নির্যাতনের অভিযোগে একাধিক মামলা হয়েছে। মার্চে বড়দেওড়া শিংবাড়ী এলাকায় ১৮ বছর বয়সী এক তরুণীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগে মামলা হয়। ওই মামলায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করার কথা জানায় পুলিশ। জুলাইয়ে কলাবাগান এলাকায় এক মাদ্রাসাছাত্রীকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা হয়। আসামি গ্রেপ্তারের দাবিতে স্থানীয় বাসিন্দারা ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করেন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে স্থানীয়দের উদ্বেগের ক্ষেত্রে এসব ঘটনাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ অপরাধের শিকার ব্যক্তিদের নিরাপত্তা, বিচারপ্রাপ্তি এবং দ্রুত আইনি সহায়তা নিশ্চিত করা নিয়ে প্রশ্নও সামনে আসে।

ছিনতাইয়ে দেশীয় অস্ত্রের ব্যবহার
টঙ্গীর ব্যস্ত সড়ক, অলিগলি ও পরিবহনকেন্দ্রিক এলাকাগুলোতে ছিনতাইয়ের অভিযোগও রয়েছে। গত জুনে টঙ্গী পশ্চিম থানার দক্ষিণ আরিচপুর ও বড় দেওড়া এলাকায় পৃথক অভিযান চালিয়ে ছিনতাই ও ডাকাতির প্রস্তুতির অভিযোগে ১৩ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পুলিশের দাবি, তাদের কাছ থেকে চাপাতি ও ছুরিসহ দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় পৃথক দুটি মামলা হয়েছে। এরপর জুলাইয়ে টঙ্গী পূর্ব থানার গাজীপুরা এলাকায় চলন্ত অটোরিকশা থামিয়ে এক নারী যাত্রীর ওপর হামলা ও ছিনতাইয়ের অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় দুইজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাদের কাছ থেকে ছুরি ও চাপাতি উদ্ধারের কথাও জানানো হয়। পরে অস্ত্র আইনে মামলা করা হয়। পুলিশের তথ্যমতে, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে টঙ্গী পূর্ব এলাকায় ছিনতাইয়ের অভিযোগে ৪২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

অভিযানে বাধা, আসামি ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনাও
টঙ্গীর কিছু এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনার সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বাধার মুখে পড়ার ঘটনাও সামনে এসেছে। হাজী মাজার বস্তি, এরশাদনগরসহ কয়েকটি এলাকায় বিভিন্ন সময়ে অভিযান চালিয়ে মাদক ও দেশীয় অস্ত্র উদ্ধারের পাশাপাশি একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এসব অভিযানে মাদক, অস্ত্র ও ছিনতাইয়ের অভিযোগ একসঙ্গে সামনে এসেছে। এতে বোঝা যায়, অপরাধের ধরনগুলো অনেক ক্ষেত্রে একে অপরের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে উঠতে পারে। তবে প্রতিটি ঘটনার সম্পর্ক ও ভূমিকা তদন্তের মাধ্যমে আলাদাভাবে নির্ধারণ করতে হয়। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি টঙ্গী রেলস্টেশন এলাকায় পুলিশের ওপর হামলা করে হাতকড়াসহ এক আসামিকে ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগও ওঠে। ওই ঘটনায় একজন পুলিশ সদস্য আহত হন। পরে ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

খুচরা বিক্রেতা গ্রেপ্তার, মূল কারবারিরা কতটা নিয়ন্ত্রণে?
মাদকবিরোধী অভিযানে নিয়মিত গ্রেপ্তার ও মামলা হলেও স্থানীয় পর্যায়ে প্রশ্ন উঠছে—এসব অভিযানে মাদক সরবরাহের মূল উৎস কতটা নিয়ন্ত্রণে আসছে? স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, অভিযানে অনেক সময় মাদক বহনকারী, খুচরা বিক্রেতা কিংবা সেবনকারীরা গ্রেপ্তার হলেও বড় কারবারের সঙ্গে জড়িতদের একটি অংশ ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। ফলে একজন গ্রেপ্তার হওয়ার পর অন্য কেউ একই এলাকায় নতুন করে ব্যবসা শুরু করে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং কারা মাদক ব্যবসার মূল নিয়ন্ত্রক—তা নির্ধারণের জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্ত ও গোয়েন্দা নজরদারি প্রয়োজন।

অপরাধ নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ
টঙ্গীর অপরাধ পরিস্থিতি শুধু পুলিশের অভিযান দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব কি না, সেটিও আলোচনায় এসেছে। স্থানীয়দের মতে, মাদক নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বস্তি ও রেললাইনসংলগ্ন এলাকার নিরাপত্তা, পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা, সিসিটিভি, কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়া ঠেকানো এবং দ্রুত বিচারপ্রক্রিয়া নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে শিল্পাঞ্চল ও পরিবহনকেন্দ্রিক এলাকাগুলোতে নিয়মিত টহল এবং সন্দেহজনক কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারি বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন স্থানীয়রা। পুলিশের মামলার পরিসংখ্যান টঙ্গীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলেও এটি পুরো বাস্তবতার একমাত্র মাপকাঠি নয়। কোন এলাকায় অপরাধ বেশি, কোন ধরনের অপরাধ বারবার ঘটছে এবং অপরাধের পেছনে কী কারণ কাজ করছে—এসব বিষয় বিশ্লেষণ করে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা নেওয়াই বড় চ্যালেঞ্জ। টঙ্গী রাজধানীর প্রবেশদ্বার হওয়ায় প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ এখানে যাতায়াত করেন। তাই এখানকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রভাব শুধু স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; আশপাশের বৃহত্তর এলাকার জননিরাপত্তার সঙ্গেও তা জড়িত। মাদক, ছিনতাই, অস্ত্র ও সহিংসতার অভিযোগগুলোর পাশাপাশি নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনাগুলোও তাই আলাদাভাবে গুরুত্ব দিয়ে দেখার প্রয়োজন রয়েছে। অপরাধের মূল কারণ শনাক্ত, অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা এবং ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে টঙ্গীর দীর্ঘদিনের অপরাধ-সংক্রান্ত উদ্বেগ কমানো সম্ভব হতে পারে।