*ঠিকাদারি সমিতির দ্বন্দ্ব,মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে এলাকায় লাগানো হয়েছে পোস্টার, উত্তেজনার সৃষ্টি
সুকান্ত বিকাশ ধর, সাতকানিয়া: সাতকানিয়ায় চট্টগ্রাম দক্ষিণ সড়ক বিভাগের ঠিকাদারি সমিতির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের জের ধরে বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের তিন নেতাসহ ৪ জনের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস বিরোধী আইনে মামলা দায়েরের করেছেন বিএনপি সমর্থিত এক ঠিকাদার। শুধু তাই নয়, এ মামলায় এক নম্বর সাক্ষী রাখা হয়েছে চন্দনাইশ উপজেলা বিএনপি’র সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও চট্টগ্রাম-১৪ আসনের সংসদ সদস্য জসিম উদ্দিন আহমেদ এর ঘনিষ্ঠ এম এ হাশেম রাজু সহ আরও কয়েকজনকে।
এ ঘটনায় সাতকানিয়ায় ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টির পাশাপাশি বিএনপি নেতাকর্মীদের মাঝে দেখা দিয়েছে চরম উত্তেজনা। এছাড়া মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে সাতকানিয়ার বিভিন্ন এলাকায় দেওয়ালে দেওয়ালে সাঁটানো হয়েছে পোষ্টার। মামলায় রাষ্ট্র ও সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র, নাশকতা সৃষ্টি এবং রাজনৈতিক নেতাদের ব্যানার ছিঁড়ে পদদলিত করার মতো গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে মামলার আসামিরা এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন। তাদের দাবি, ঠিকাদারি সমিতির নেতৃত্ব ও আধিপত্য নিয়ে বিরোধের জেরে তাদের বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মামলাটি করা হয়েছে।
একই সঙ্গে ঘটনাস্থলে কোনো ধরনের রাজনৈতিক কর্মসূচি বা নাশকতার ঘটনা ঘটেছিল কি না এবং মামলা দায়েরের আগে পুলিশ কী ধরনের প্রাথমিক যাচাই করেছে—তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন আসামিরা।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) দিবাগত মধ্যরাতে ঠিকাদার মো. আব্দুল কাদের সিকদার বাদী হয়ে সাতকানিয়া থানায় মামলাটি দায়ের করেন। মামলায় এম এ হাশেম রাজু ছাড়াও আরও দুই জনকে সাক্ষী করা হয়েছে।
এজাহারভুক্ত চার আসামিরা হলেন-গাছবাড়িয়া সরকারি কলেজ ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ও বিএনপি নেতা আফিল উদ্দিন আহমদ (৫২), চন্দনাইশ উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি মো. সাইফুল ইসলাম (৪৫), সাতকানিয়া উপজেলা যুবদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বিএনপি নেতা ইলিয়াছ বাবুল (৫৫) এবং ঠিকাদার কামাল উদ্দিন চৌধুরী বাঁচা (৪৮)। এ ছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও অনেকে রয়েছে বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, আসামিদের এলডিপি এবং বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এজাহারে অভিযোগ করা হয়, নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ যুবলীগের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে নিয়ে আসামিরা চট্টগ্রাম দক্ষিণ সড়ক বিভাগের কার্যালয়ের সামনে দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র ও লাঠিসোটা নিয়ে মিছিলের আয়োজন করেন। এতে আরও অভিযোগ করা হয়, সন্ত্রাসী কার্যের মাধ্যমে সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক বিভিন্ন ধরনের ভ্রান্তিমূলক তথ্যপ্রচার, রাষ্ট্রের ক্ষতি সাধনের চেষ্টা, রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্র ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অর্থায়নের সহায়তা, আসামিদের আশ্রয়দান ও প্ররোচিত করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর উদ্দেশ্যে তারা ওই কর্মসূচি পালন করেন।
এজাহারে আরও বলা হয়, সড়ক বিভাগের কার্যালয়ের মূল ভবনে থাকা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এবং চট্টগ্রাম-১৪ আসনের সংসদ সদস্য জসীম উদ্দীন আহমেদের ব্যানার ছিঁড়ে পায়ের নিচে ফেলে উল্লাস করা হয়। পরে চন্দনাইশ ও সাতকানিয়া উপজেলা বিএনপি এবং অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীরা ঘটনাস্থলে গেলে আসামিরা সেখান থেকে পালিয়ে যান। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে আসামিদের বক্তব্য ভিন্ন।
স্থানীয়ভাবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চট্টগ্রাম দক্ষিণ সড়ক বিভাগকে কেন্দ্র করে ‘চট্টগ্রাম দক্ষিণ সড়ক বিভাগ ঠিকাদার সমিতি’ ও ‘চট্টগ্রাম দক্ষিণ সড়ক বিভাগ ঠিকাদার কল্যাণ সমিতি’ নামে দুটি অনিবন্ধিত সংগঠন রয়েছে। এই দুই সংগঠনের নেতৃত্ব ও কার্যক্রমকে ঘিরে ঠিকাদারদের মধ্যে বিরোধ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
একটি সমিতির সভাপতি চন্দনাইশ উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক এম এ হাশেম রাজু এবং সাধারণ সম্পাদক মো. মোরশেদুল আলম চৌধুরী। অপর সমিতির সভাপতি মামলার ১ নম্বর আসামি আফিল উদ্দিন আহমদ। ওই সমিতির সাধারণ সম্পাদক মামলার ২ নম্বর আসামি মো. সাইফুল ইসলাম এবং সিনিয়র সহ-সভাপতি মামলার ৩ নম্বর আসামি ইলিয়াছ বাবুল।
এই নেতৃত্ব কাঠামোই মামলার নেপথ্যে থাকা বিরোধের বিষয়টি সামনে এনেছে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।
একই দিনে অনুষ্ঠান, রাতে পাল্টা জমায়েত সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সোমবার দুপুরে এম এ হাশেম রাজুর নেতৃত্বাধীন সমিতি চট্টগ্রাম দক্ষিণ সড়ক বিভাগের কার্যালয়ের মাঠে ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে দোয়া মাহফিল ও আলোচনা সভার আয়োজন করে।
আসামিদের দাবি, ওই সময় তাদের সমিতির কিছু ব্যানার সেখান থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে—এমন খবর তারা পান। পরে কর্মসূচি শেষ হওয়ার পর রাতে আফিল উদ্দিন আহমদসহ তার নেতৃত্বাধীন সমিতির লোকজন সড়ক বিভাগের কার্যালয়ে যান। সেখানে একটি নির্ধারিত কক্ষে তারা আলোচনা সভা করেন বলে দাবি করেন আসামিরা।
এরপরই সোমবার মধ্যরাতে আব্দুল কাদের সিকদার বাদী হয়ে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলাটি করেন।
ঘটনার সময়, কার্যালয়ে কারা উপস্থিত ছিলেন, সেখানে কী ধরনের কর্মসূচি হয়েছিল এবং ব্যানার ছেঁড়া বা পোড়ানোর ঘটনা আদৌ ঘটেছে কি না—এসব প্রশ্ন এখন তদন্তের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মামলার ১ নম্বর আসামি আফিল উদ্দিন আহমদ বলেন, আমি গাছবাড়িয়া সরকারি কলেজ ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা ছাত্রদলের সাবেক সহসভাপতি এবং উত্তর সাতকানিয়া সাংগঠনিক উপজেলা বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা। বিএনপির দুঃসময়ে দলের হাল ধরেছি। অথচ আজ সন্ত্রাসবিরোধী মামলার আসামি হয়েছি।
তিনি বলেন, “মূলত সেখানে আমাদের কিছু ব্যানার ছিল। সেগুলো সরিয়ে ফেলা হয়েছে—এমন খবর পেয়ে আমরা সেখানে যাই। পরে নির্ধারিত কক্ষে আলোচনা সভা করেছি। পুলিশ কোনো ধরনের তদন্ত না করে মধ্যরাতে কীভাবে মামলা রুজু করল, সেটিও জনগণের কাছে আমার প্রশ্ন।
মামলার ২ নম্বর আসামি মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, আমি চন্দনাইশ উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি, জেলা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক ও উপজেলা যুবদলের সাবেক সদস্য। আর এখন আমি রাষ্ট্র ও বর্তমান বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছি। আর আমাকে দেওয়া হচ্ছে আওয়ামী লীগের টেগ—এমন অভিযোগ কোনো সুস্থ মানুষ বিশ্বাস করবে না, এটা হাস্যকর ছাড়া আর কিছু নয়।’
তার দাবি, ঠিকাদারি সমিতির দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করেই উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মামলাটি করা হয়েছে। জনগণ বিভ্রান্ত, দল ও সরকারের বদনাম হবে, তাই আমরা এখনও চুপ আছি। আর রাজু ভাই কেন এখানে মাথা ঘামাবে ; তিনি তো চন্দনাইশ বিএনপির কর্ণধার নয়।
মামলার ৩ নম্বর আসামি ইলিয়াছ বাবুল বলেন, আমি সাতকানিয়া উপজেলা যুবদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক, উপজেলা বিএনপির সাবেক সহসাংগঠনিক সম্পাদক এবং বর্তমানে উত্তর সাতকানিয়া সাংগঠনিক উপজেলা বিএনপির সংগঠক। দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামে নির্যাতনের শিকার হয়েও রাজনীতি থেকে সরে যাইনি।
তিনি বলেন, রোববার এর আলোচনা সভায় আমি উপস্থিতই ছিলাম না। অথচ আমাকে সন্ত্রাসবিরোধী মামলায় আসামি করা হয়েছে। দলের সুসময়ে এমন উপহার পাওয়া সত্যিই দুঃখজনক।
এজাহারের ১ নম্বর সাক্ষী ও বিএনপি নেতা এম এ হাশেম রাজু বলেন, মামলার আসামিরাতো আমাদের দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত ভাই-ব্রাদার। এ নিয়ে আমি কোন কমেন্ট করছি না। আমাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব নাই, সেটা আমি বলবো না। দ্বন্দ্ব থাকতেই পারে। কিন্তু দ্বন্দ্বের বহিঃপ্রকাশ ও দ্বন্দ্বের প্রতিদান প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ সদস্যের ছবি সম্বলিত ব্যানার ছিড়ে ফেলবেন, এটা কোন আইনে পেয়েছেন এবং এগুলো কোন সংস্কৃতি ?
রাজু বলেন, সড়ক বিভাগের বিল্ডিং ও বিল্ডিং এর আশপাশ এলাকা থেকে ১২ থেকে ১৩টি ব্যানার নামিয়ে পুড়ে ও ছিড়ে পদদলিত করা হয়েছে। তারা এত রাতে সেখানে কীসের মিটিং করেছে, সেটাও দেখা দরকার। ওই কার্যালয়ের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করলে পুরো ঘটনা পরিষ্কার হবে।
এদিকে মামলার বাদী মো. আব্দুল কাদের সিকদারের বলেন, আমরা ঠিকাদার সমিতি মিলাদ অনুষ্ঠান করেছিলাম। তবে এর আগে আপিল উদ্দিনদের ব্যানার ছিল। মামলার আসামিরা কি ব্যানার ছেড়ায় জড়িত ছিল এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, আপনি রাজু ভাই ও মোরশেদের সাথে কথা বলেন, তারা ক্লিয়ার বলতে পারবেন।
ঠিকাদার সমিতির দ্বন্দ্বের বিষয়ে তিনি বলেন, এখানে দ্বন্দ্বের কিছু নাই। এমপি (চট্টগ্রাম-১৪ আসন)র নির্দেশে সমিতি করা হয়েছে। তবে, এ বিষয়ে উভয়ের মধ্যে কথা চলছে, আশা করি এটা সমঝোতা হয়ে যাবে।
চট্টগ্রাম দক্ষিণ সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী পিন্টু চাকমা বলেন, ঠিকাদার সমিতির একটি অনুষ্ঠান ছিল। তারা আমাকে দাওয়াত করেছিল। তবে আমি সেখানে উপস্থিত থাকতে পারিনি। মামলার বিষয়ে আমি কিছুই জানি না।
তিনি আরও বলেন, ঠিকাদার সমিতিগুলো সরকার কর্তৃক নিবন্ধিত নয়। তারা নিজেদের উদ্যোগে এসব সমিতি গঠন করেছে।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও সাতকানিয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) জহির আমিন বলেন, “আমি ঘটনাস্থলে গিয়ে কিছু ব্যানার ছেঁড়া অবস্থায় পেয়েছি। তবে বিষয়টি অধিকতর তদন্তের পর বিস্তারিত বলতে পারব।
সাতকানিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, খবর পাওয়ার পর ঘটনাস্থলে পুলিশের একটি টিম পাঠানো হয়। প্রাথমিক তদন্তে প্রধানমন্ত্রীর ব্যানার ছিঁড়ে পদদলিত করার সত্যতা পাওয়া গেছে। পরে বাদীর এজাহারের ভিত্তিতে মামলা রুজু করা হয়েছে। এ ঘটনায় প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
চট্টগ্রামের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সাতকানিয়া সার্কেল) মো.আরিফুল ইসলাম সিদ্দিকী বলেন , যেহেতু ওসি সাহেব মামলা নিয়েছেন, তিনিই এটি ভালো বলতে পারবেন।




