অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
ভুয়া বিল ভাউচারে অর্থ আত্মসাৎ, কাল্পনিক নাম ব্যবহার করে শিল্পীদের টাকা উত্তোলন
নিজস্ব প্রতিবেদক: কাল্পনিক নাম ব্যবহার করে শিল্পীদের টাকা আত্মসাৎ, গ্রাফিক্স কার্ড দিয়ে পুনঃপ্রচার ও ভুয়া বিল ভাউচারের মাধ্যমে বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করার অভিযোগ ওঠেছে বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) চট্টগ্রাম কেন্দ্রের কতিপয় অসৎ কর্মকতার বিরুদ্ধে। শুধু তাই নয়, অর্থের লোভে সরকার বিরোধীদের অতিরিক্ত সুবিধা দেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে। আর নেপথ্যে থেকে এসব দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিয়ে ভাগ নিচ্ছেন খোদ প্রতিষ্ঠানের জেনারেল ম্যানেজার (জিএম, চলতি দায়িত্ব) মো. ঈমাম হোসাইন। সংশ্লিষ্ট একাধিক বিশ্বস্ত সূত্র এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।
জানা গেছে, “ইতিহাসের এই দিনে” শিরোনামে ২ মিনিটের একটি গ্রাফিক্স কার্ড ২৯ বার পুনঃপ্রচার দেখিয়ে ৩৩ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। গ্রাফিক্স কার্ড বারবার প্রচার করা হলেও ভ্রমণের নামে চার মাসে উত্তোলন করেছেন ৭ লাখ ২৩ হাজার টাকা। সম্প্রতি তদন্তে এর সত্যতা পাওয়া গেলেও রহস্যজনক কারণে কোন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অন্যদিকে, নিয়ন্ত্রণকারী কর্মকর্তা রোমানা শারমিনকে দিনের পর দিন ছুটি দেখিয়ে চার মাসে শিল্পী সম্মানীর নামে ৬০ লাখ ৫৮ হাজার ৩৪৬ অনৈতিকভাবে উত্তোলনের ঘটনাও তদন্তে উঠে এসেছে।
একাধিক শিল্পী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সিন্ডিকেট শিল্পী সম্মানীর লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। অনুষ্ঠান পুনঃপ্রচার দেখিয়ে পুননির্মাণের নামে ভুয়া বাজেট তুলছে দুর্নীতিবাজ চক্র। ভালো উপস্থাপকদের ফ্লোর দেওয়া হয় না অথচ অনৈতিক সুবিধা নিয়ে অনভিজ্ঞদের বিশেষ সুবিধা দিচ্ছেন জিএম ঈমাম হোসাইন।
সূত্রটি জানায়, লেদার টেকনোলজি ইনস্টিটিউট, ঢাকা শাখার ছাত্রলীগের সাবেক গবেষণা সম্পাদক মো. সফির হোসাইন ২০১৫ সালে ‘প্রযোজক (গ্রেড-২)’ হিসেবে বিটিভিতে যোগদান করেন।যোগদানের পর থেকেই তিনি শিল্পী, কলাকুশলী ও সহকর্মীদের সঙ্গে ছলচাতুরি, অসদাচরণ এবং দুর্নীতিতে জড়াতে থাকেন। সুযোগ বুঝে তৎকালীন প্রযোজক ও এইচডিটিভির পিডি মাহফুজা আক্তারের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে নামে বেনামে কোটি টাকা উত্তোলনে অংশ নেন। এসব অর্থ দিয়ে সফির হোসাইন চাকরির তিন বছরের মাথায় গাজীপুরে ৬ একর জমি, দামি গাড়ি এবং রাজধানীর হাতিরঝিলে ২৬০০ বর্গফুটের বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ক্রয় করেন।
২০২২ সালে তাকে নির্বাহী প্রযোজক পদে পদোন্নতি দিয়ে ঢাকায় পদায়ন করলেও যোগদান না করে গোপনে চট্টগ্রামে থেকে যান। মাহফুজা আক্তারের সহযোগিতায় ভুয়া ভাউচারের মাধ্যমে ৫৫ লাখ টাকা উত্তোলন করেন। এ কারণে ২০২৩ সালের ২ মে তাঁকে শাস্তি দেওয়া হয় এবং আত্মসাৎকৃত অর্থ উদ্ধারে ব্যবস্থা নেয়। মাহফুজা আক্তারের ২১ কোটি টাকা আত্মসাৎ মামলার তদন্তের অংশ হিসেবে সফির হোসাইনকে ২০২৪ সালের ২০ সেপ্টেম্বর দুদক তলব করে।
জালিয়াতির মাধ্যমে শিল্পীদের ৪ কোটি টাকা আত্মসাতসহ একাধিক গুরুতর অভিযোগ প্রমাণিত হলেও বহাল তবিয়তে আছেন মো. সফির হোসাইন ওরফে ইলন সফির। ফলে বিটিভি চট্টগ্রাম কেন্দ্র বর্তমানে লুটপাটের উন্মুক্ত অঙ্গনে পরিণত হয়েছে। কেন্দ্রের জেনারেল ম্যানেজার (চ. দা.) মো. ঈমাম হোসাইন এবং নির্বাহী প্রযোজক মো. সফির হোসাইনের নেতৃত্বে ‘হোসাইন সিন্ডিকেট’-এর সদস্যরা জুলাই অভ্যুত্থান অনুষ্ঠানের নামে ভুয়া বাজেট ও বিল-ভাউচারের মাধ্যমে ব্যাপক লুটপাট চালিয়ে যাচ্ছে। এমনকি ঈমাম হোসাইনের যোগসাজশে নির্বাহী প্রযোজক হয়েও সরকারের আইন ভঙ্গ করে ভুয়া প্রোগ্রাম ম্যানেজার সেজে বিপুল অঙ্কের টাকা উত্তোলন ও আত্মসাৎ করছেন সফির হোসাইন।
বিটিভির প্রধান কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, জালিয়াতি, ছলচাতুরি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং শিল্পীদের কোটি টাকা আত্মসাতসহ বিভিন্ন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৪ সালের ২ জানুয়ারি তদন্তপূর্বক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বিটিভির মহাপরিচালককে নির্দেশ দেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়। এবিষয়ে ২০২৫ সালের ২৬ আগস্ট তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে তদস্ত কমিটির আহবায় অনুষ্ঠান ও পরিকল্পনা বিভাগের পরিচালক মো. আজগর আলী।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মো. সফির হোসাইন তৎকালীন জেনারেল ম্যানেজার (চ. দা.) মাহফুজা আক্তারের সঙ্গে আঁতাত করে শুধু চট্টগ্রাম কেন্দ্রেই ভুয়া বাজেট ও ভাউচারের মাধ্যমে ১ কোটি ২৩ লাখ ১২ হাজার সাতশত ২২ টাকা উত্তোলন করে আত্মসাৎ করেছেন। শুধু তাই নয়, তাঁর পূর্বের কর্মকাণ্ডেও নানা ধরনের দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া যায়। তদন্তের পরও প্রতিবেদনটি মন্ত্রণালয়ে না পাঠাতে গাজীপুর এলাকার এক প্রভাবশালী কর্মকর্তার নির্দেশে ফাইল গায়েব রাখা হয়। পরে প্রধান কার্যালয়ে তোলপাড় শুরু হলে মহাপরিচালক প্রতিবেদনটি মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করেন। তবে বিটিভির ৩৪ জন শীর্ষ কর্মকর্তা দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতিবাজ ও রাজনৈতিক সুবিধাভোগীদের রক্ষায় সক্রিয় রয়েছেন।
ঢাকা ও চট্টগ্রাম কেন্দ্রের একাধিক সূত্রের দাবি, দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা গড়ে তুলতে ব্যর্থ হলেও সাবেক জিএম মাহফুজা আক্তারের মতোই মো. ঈমাম হোসাইন অনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলে সফির হোসাইনকে বিশেষভাবে কাছে টেনে নেন। তাঁর বিরুদ্ধেও ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি ও অসদাচরণের বহু অভিযোগ রয়েছে। ঢাকা কেন্দ্রে দায়িত্বে থাকাকালে ভুয়া শিল্পীদের মাধ্যমে কোটি টাকা বাজেট উত্তোলন, ৪১টি মঞ্চনাটক পুনঃপ্রচার দেখিয়ে ১ লাখ ১৭ হাজার টাকা করে মোট ৪৭,৯৭,০০০ টাকা হাতিয়ে নেওয়াসহ বহু দুর্নীতির সাথে ইমাম হোসাইন জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। নিজেকে বিএনপি প্রমাণ করতে মরিয়া অন্যদিকে নিজের অপকর্ম ঢাকতে জামায়াত পন্থীদের দিয়ে যা তা অনুষ্ঠান প্রচার করে যাচ্ছে। কিছুদিন আগে তোতলা সাংবাদিকের অনুষ্ঠানও শততম পর্ব শেষ করেছে। আর বলে বেড়ায় বিএনপিতে সব মূর্খ, সাংবাদিক নাই অথচ বিএনপি লোকদের অনুষ্ঠানে কোন সহযোগিতা করে না ইমাম গং। লোক দেখানো কিছু নাম সর্বস্ব অনুষ্ঠান বিএনপির নেতাদের ডাকে ধূর্ত ইমাম হোসাইন। নিজের অপকর্ম ঢাকতে সব সময় কূটকৌশলে ব্যস্ত পলাতক ওবায়দুল কাদেরের ভাগিনা ঈমাম হোসাইন।
সম্প্রতি ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন একটি নির্ধারিত টকশোতে অংশ নিতে গিয়ে সেখানে চরম অব্যবস্থাপনার মুখে পড়েন। পরে তিনি বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে ফোনে অবহিত করেন তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরীকে। প্রতিমন্ত্রীর অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বিটিভি চট্টগ্রাম কেন্দ্রের এই জিএম ইমাম হোসাইন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পূর্বনির্ধারিত টকশোতে অংশ নিতে বিটিভি চট্টগ্রাম কেন্দ্রে যান ভূমি প্রতিমন্ত্রী। কিন্তু সেখানে পৌঁছে তিনি যে পরিস্থিতির মুখোমুখি হন, তা একটি রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার প্রতিষ্ঠানের জন্য অত্যন্ত অস্বস্তি ও বিব্রতকর।
সূত্রটি জানায়, আওয়ামী লীগের আশীর্বাাদে চাকরি নিয়েছেন মো. ঈমাম হোসাইন। সেই সুবাদে সাবেক মন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের পিএস আব্দুল মতিনসহ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির ক্ষমতা প্রয়োগ করে তিনি আওয়ামী লীগকে তোষামোদ করেছেন। জুলাই অভ্যুত্থানের পর হঠাৎ অবস্থান পরিবর্তন করে নতুন প্রভাবশালীদের ছত্রচ্ছায়ায় সিনিয়র কর্মকর্তাদের উপেক্ষা করে চট্টগ্রাম কেন্দ্রের জেনারেল ম্যানেজারের দায়িত্ব দখল করেন। সরকারি চাকরির বিধি অনুযায়ী কোনো সিনিয়র কর্মকর্তাকে এড়িয়ে “চলতি দায়িত্ব” দেওয়া যায় না, তবুও তিনি দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে এ পদে বহাল রয়েছেন।
আওয়ামী লীগের পরিচয় পরিবর্তন করে জামায়াতের শেল্টারে বিএনপির নেতা-কর্মীদের বোকা বানাচ্ছে। ঢাকা কেন্দ্রের জিএম পদ ভাগিয়ে নিতে নিজেকে বড় জিয়া প্রেমি সাজাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ছেন তিনি। বেগম খালেদা জিয়াকে নিয়ে লিখছেন কবিতা, পত্রিকায় লিখছেন কলামও। চাকরি বিধি অনুযায়ী ছয় মাসের বেশি চলতি দায়িত্বে থাকার নিয়ম না থাকলেও ঈমাম হোসাইন দির্ঘদিন ধরে মাসে মাসে অবৈধভাবে দায়িত্বভাতা ও বেতন ভোগ করছেন।
বিটিভিতে ২০০৯ সালে চাকুরী নেওয়ার পর তিনি তাঁর ফেসবুক প্রোফাইল ছবি ও স্ট্যাটাস পরিবর্তন করে নিজেকে ‘জাসদ’ নেতা হিসেবে পরিচিত করতে শুরু করেন এবং রাজনৈতিকভাবে কেন্দ্র পরিচালনার অভিযোগ ওঠে। একজন সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে এ আচরণ দণ্ডনীয় অপরাধ হলেও কর্তৃপক্ষ তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি, ফলে শিল্পী, কলাকুশলী, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। বর্তমানে সরকার বিরোধী শক্তি কে নিয়ে বিটিভি পরিচালনা করতেছে। এসব বিষয়ে বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) চট্টগ্রাম কেন্দ্রের জিএম (চ.দা.) ঈমাম হোসাইনের কাছে জানতে চাইলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।




