এম,সফিউল আজম চৌধুরী: স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত দেশে প্রতি পাঁচ থেকে ছয় বছরের একটি নির্দিষ্ট অর্থনৈতিক চক্র বা নিয়মিত বিরতি মেনে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন জাতীয় পে-স্কেল নিয়ে আসে। ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির সাথে সংগতি রাখা, বাজারদরের জ্যামিতিক বৃদ্ধির বিপরীতে টাকার ক্রয় ক্ষমতা সচল রাখা এবং দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যেই রাষ্ট্র নিয়ম তান্ত্রিকভাবে এই পদক্ষেপ নেয়।

মহার্ঘ ভাতা, বাড়ি ভাড়া, চিকিৎসা ভাতা, যাতায়াত সুবিধা, উৎসব বোনাস থেকে শুরু করে সর্বশেষ বৈশাখী ভাতাও যুক্ত হয়েছে সরকারি খাতের সুযোগ-সুবিধায়। প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এবং বাজার মূল্যের সাথে সংগতি রাখার জন্য রাষ্ট্রের এসব উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। কিন্তু প্রশ্ন জাগে—রাষ্ট্রের এই বিপুল সুযোগ-সুবিধার বিপরীতে দেশের মূল অর্থনীতি যাদের কাঁধে ভর করে দাঁড়িয়ে আছে, সেই বিশাল বেসরকারি খাতের কোটি কোটি কর্মজীবী মানুষের ভাগ্যের চাকা ঘুরছে কোন গতিতে?

সম্প্রতি জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে এই মৌলিক ও ঐতিহাসিক বৈষম্যটির দিকে অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে আঙুল তুলেছেন সংসদ সদস্য মারদীয়া মমতাজ। চাটুকারিতা ও চর্বিতচর্বণ প্রশংসার চেনা বৃত্ত থেকে বেরিয়ে তিনি সংসদে বেসরকারি চাকরিজীবীদের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, বৈষম্য, অনিশ্চয়তা ও হাড়ভাঙা খাটুনির বাস্তব চিত্রটি সামনে এনেছেন। তাঁর উত্থাপিত প্রশ্নটি শুধু যৌক্তিকই নয়, এটি বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক ও সামাজিক জিজ্ঞাসা। যদি দেশের মাত্র ৫ শতাংশ সরকারি চাকরিজীবীর জন্য সুনির্দিষ্ট ও সুরক্ষিত জাতীয় পে-স্কেল থাকতে পারে, তবে বাকি ৯৫ শতাংশ বেসরকারি খাতের কর্মীদের জন্য কেন একটি কার্যকর ন্যূনতম বেতন কাঠামো বা আইনি সুরক্ষা রাষ্ট্র তৈরি করবে না?

​বিভিন্ন পরিসংখ্যান ও শ্রম শক্তি জরিপের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশের মোট কর্মসংস্থান ও শ্রম শক্তির মাত্র ৫ শতাংশের কাছাকাছি নিয়োজিত আছেন সরকারি খাতে। বাকি প্রায় ৯৫ শতাংশ কর্মজীবী মানুষই বেসরকারি খাতের প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রতিষ্ঠানিক চাকার মূল জ্বালানি। দেশের তৈরি পোশাক খাত, প্রবাসী আয়ের পর অভ্যন্তরীণ ব্যবসা-বাণিজ্য, ব্যাংক-বীমা, করপোরেট হাউস, গণমাধ্যম, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা, আবাসন খাত থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প—সবই বেসরকারি খাতের শ্রমের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সিংহভাগ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর আসে এই বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তা ও কর্মীদের পকেট থেকে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ ডেটা এবং বিভিন্ন বেসরকারি গবেষণা সংস্থার সমীক্ষা অনুযায়ী, দেশের জিডিপিতে বেসরকারি খাতের অবদান প্রায় ৮০ শতাংশের ওপরে। অথচ এই বিশাল জনগোষ্ঠীর সিংহভাগের জন্যই কোনো সুনির্দিষ্ট বেতন কাঠামো নেই, নেই কোনো উৎসব বোনাসের আইনি নিশ্চয়তা, আর ভবিষ্যৎ তহবিলের সুবিধা তো অধিকাংশ মধ্যম ও ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের কাছে এক অলীক কল্পনা।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) কর্তৃক ১৯৭০ সালে গৃহীত ‘ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ কনভেনশন, ১৯৭০ (কনভেনশন ১৩১)’অনুযায়ী, প্রতিটি দেশের সরকার তার দেশের সব ধরনের শ্রমজীবী ও চাকুরীরত মানুষের জন্য একটি উপযুক্ত ন্যূনতম মজুরি কাঠামো নির্ধারণ করতে বাধ্য, যা কর্মীর জীবনযাত্রার ব্যয়, সামাজিক নিরাপত্তা এবং মূল্যস্ফীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। বাংলাদেশ আইএলও-র অনেক কনভেনশনে স্বাক্ষর করলেও বেসরকারি খাতের প্রাতিষ্ঠানিক ও মধ্যম আয়ের চাকরিজীবীদের সুরক্ষায় এর কোনো কেন্দ্রীয় প্রতিফলন দেখা যায় না। উন্নত বিশ্বে তো বটেই, এমনকি দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী দেশ ভারতেও বেসরকারি খাতের জন্য ন্যূনতম মজুরি আইন অত্যন্ত কঠোরভাবে কার্যকর। সেখানে রাজ্য ও খাত ভিত্তিক দক্ষ, আধা-দক্ষ এবং অদক্ষ কর্মীদের জন্য ন্যূনতম বেতন সুনির্দিষ্ট করা আছে। এমনকি শ্রীলঙ্কা বা ভিয়েতনামের মতো দেশেও বেসরকারি খাতের কর্মীদের জন্য বাৎসরিক ইনক্রিমেন্ট ও মহার্ঘ ভাতার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। অথচ বাংলাদেশে তৈরি পোশাক খাতের বাইরে, যেখানে আন্তর্জাতিক চাপের কারণে মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়, বিশাল বেসরকারি করপোরেট, আইটি, লজিস্টিকস, সিএন্ডএফ,পরিবহন, বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিংবা বিপণন খাতের কর্মীদের জন্য কোনো কেন্দ্রীয় ও বৈজ্ঞানিক মজুরি কাঠামো আজ পর্যন্ত গড়ে ওঠেনি।

বেসরকারি খাতের সিংহভাগ প্রতিষ্ঠানের কর্মপরিবেশ পর্যালোচনায় কয়েকটি অভিন্ন ও উদ্বেগজনক চিত্র ফুটে ওঠে।

প্রথমত, এখানে রয়েছে চাকরির চরম নিরাপত্তাহীনতা। আজ চাকরি আছে কাল নেই—এই আতঙ্কের মধ্যে কাটে বেসরকারি খাতের অধিকাংশ কর্মীর জীবন। বাংলাদেশ শ্রম আইন কাগজে-কলমে থাকলেও এর চার মাসের নোটিশ বা ক্ষতিপূরণের বিধান বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানই মানে না। কোনো কারণ দর্শানো ছাড়াই যেকোনো মুহূর্তে মৌখিক আদেশে চাকরিচ্যুতির ঘটনা এখানে নিত্যনৈমিত্তিক।

দ্বিতীয়ত, কাজের অতিরিক্ত চাপ ও ওভারটাইমের অনুপস্থিতি কর্মীদের জীবনকে ওষ্ঠাগত করে তোলে। আন্তর্জাতিক শ্রম আইন ও দেশীয় আইন অনুযায়ী দৈনিক ৮ ঘণ্টা এবং সপ্তাহে সর্বোচ্চ ৪৮ ঘণ্টা কর্মদিবসের কথা বলা হলেও, বেসরকারি খাতে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা কাজ করাটা অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই অতিরিক্ত খাটুনির জন্য কোনো ওভারটাইম বা আর্থিক প্রণোদনা দেওয়া হয় না, যা স্পষ্টত আধুনিক শোষণের শামিল। এর সাথে যুক্ত হয়েছে বাজার দরের সাথে বেতনের অসঙ্গতি তথা মূল্যস্ফীতির থাবা। গত কয়েক বছরে দেশে মূল্যস্ফীতির হার প্রায় ১০ শতাংশের কাছাকাছি ঘোরাফেরা করছে। চাল, ডাল, তেল থেকে শুরু করে বাড়ি ভাড়া, সন্তানদের শিক্ষা খরচ ও চিকিৎসা ব্যয় দ্বিগুণ হয়েছে। কিন্তু বেসরকারি খাতে সেই অনুপাতে বেতন বাড়েনি। মালিক পক্ষের মর্জির ওপর ঝুলে থাকে বাৎসরিক ইনক্রিমেন্ট। ফলে প্রতিবছর এই খাতের কর্মীদের প্রকৃত ক্রয় ক্ষমতা জ্যামিতিক হারে কমছে এবং তারা এক ধরনের নীরব দারিদ্র্যের দিকে ধাবিত হচ্ছেন।

​বেসরকারি খাতের এই সীমাহীন বৈষম্য, অনিশ্চয়তা ও অসম্মানজনক কর্মপরিবেশের কারণেই আজ দেশের শিক্ষিত যুব সমাজ সরকারি চাকরির পেছনে অন্ধের মতো ছুটছে। একটি বিসিএস বা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকের পদের জন্য লাখ লাখ গ্র্যাজুয়েট বছরের পর বছর কোচিং সেন্টারে টেবিল চাপড়াচ্ছেন, উৎপাদনশীল বয়স নষ্ট করছেন। বেসরকারি খাতকে নিরাপদ, ন্যায্য ও সম্মানজনক না করার কারণে পুরো সামাজিক মানসিকতায় এক ধরনের মারাত্মক বিকৃতি তৈরি হয়েছে। মেধার বিকাশ ঘটার কথা ছিল যেখানে উদ্ভাবন, উদ্যোক্তা হওয়া ও বেসরকারি করপোরেট খাতে, সেখানে সবাই খুঁজছে একটি নিরাপদ খাঁচা। এই তীব্র প্রতিযোগিতাই সমাজ ও রাষ্ট্রে ঘুষ, তদবির এবং দুর্নীতির সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখছে। কারণ তরুণরা দেখছে, বেসরকারি খাতে যোগ্যতা দিয়েও যেখানে জীবন নিশ্চিত নয়, সেখানে সরকারি খাতে একবার ঢুকতে পারলে আজীবন সুরক্ষিত এবং সামাজিকভাবে ক্ষমতাশালী হওয়া যায়।

এই গভীর সংকট নিয়ে দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদ, সমাজবিজ্ঞানী ও শ্রম আইন বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশের একজন খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদ ও নীতি-বিশ্লেষক এই প্রসঙ্গে জানান যে, আমরা একটি মুক্তবাজার অর্থনীতির কথা বলি, কিন্তু শ্রমবাজারের ক্ষেত্রে একে চরম নৈরাজ্য বাজারে পরিণত করেছি। পুঁজির সুরক্ষা দেওয়ার জন্য রাষ্ট্রে যত আইন আছে, শ্রমের সুরক্ষা দেওয়ার জন্য তার সিকিভাগও কার্যকর নেই। বেসরকারি কর্মীরা যদি প্রতি পদে বঞ্চিত বোধ করেন, তবে দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি টেকসই হতে পারে না। সংসদে মারদীয়া মমতাজের এই বক্তব্যটি একটি চোখ খোলার মতো সতর্কবার্তা এবং এটি জন আকাঙ্ক্ষারই প্রতিফলন। একইভাবে বেসরকারি খাতের করপোরেট কালচার নিয়ে কাজ করা একজন শীর্ষস্থানীয় মানবসম্পদ বিশেষজ্ঞের মতে, আমাদের দেশের বেসরকারি খাতের বড় অংশ এখনো সামন্ততান্ত্রিক মানসিকতায় চলে। তারা কর্মীদের সম্পদ না ভেবে খরচের খাত বা কস্ট সেন্টার মনে করে। করপোরেট সুশাসন বা গভর্ন্যান্সের অভাব এবং সরকারি তদারকি না থাকায় মালিকপক্ষ নিজেদের সুবিধামতো নিয়ম তৈরি করে পার পেয়ে যাচ্ছে, যেখানে আসলে রাষ্ট্রকে শক্তিশালী রেগুলেটরের ভূমিকা পালন করতে হবে।

​এই নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি ও দীর্ঘদিনের বঞ্চনা নিয়ে মূলধারার গণমাধ্যমের সংকট ও সার্বিক বেসরকারি খাতের চিত্র তুলে ধরেছেন দেশের একজন প্রথিতযশা ও সিনিয়র সাংবাদিক। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, গণমাধ্যম এবং রাজনীতিতে দীর্ঘকাল ধরে আমরা জবাবদিহিতার সংস্কৃতির কথা বলে আসছি, অথচ এই জবাবদিহিতা সবচেয়ে বেশি অনুপস্থিত আমাদের শ্রম ও কর্মসংস্থান নীতিতে। বেসরকারি খাতের সাংবাদিকদের কথাই যদি ধরি, বিশেষ করে মফস্বল বা আঞ্চলিক পর্যায়ে কর্মরত সাংবাদিকদের আর্থিক সংকট আজ এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিয়েছে। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বেতন কাঠামো না থাকা, মাসের পর মাস বেতন বকেয়া থাকা এবং ন্যূনতম পেশাগত সুরক্ষার অভাবের কারণে বেসরকারি খাতের বিশাল অংশ আজ চরম অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে। মেধার মূল্যায়ন এবং কর্মীদের জীবনযাত্রার নিশ্চয়তা না দিয়ে আমরা কোনো দিন একটি দায়িত্বশীল ও টেকসই বেসরকারি খাত গড়ে তুলতে পারব না। সংসদে একজন জনপ্রতিনিধি যখন এই বঞ্চনা নিয়ে সোচ্চার হন, তখন বুঝতে হবে দেয়ালের পিঠ ঠেকে গেছে। রাষ্ট্র যদি এখনই আইন করে এই পুঁজিবাদী মানসিকতা নিয়ন্ত্রণ না করে, তবে দক্ষ শ্রমশক্তি হারিয়ে দেশ অর্থনৈতিক ও মেধা সংকটের এক অন্ধকার চোরাবালিতে নিমজ্জিত হবে।

বেসরকারি খাতের এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে বঞ্চনা ও অনিশ্চয়তা থেকে রক্ষা করতে বর্তমান সরকারকে এখনই সুনির্দিষ্ট নীতিগত ও আইনি সংস্কারে হাত দেওয়া উচিত। এর জন্য সরকারকে একটি উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন জাতীয় বেসরকারি পে-কমিশন বা টাস্কফোর্স গঠন করতে হবে। এই কমিশন বেসরকারি খাতের বিভিন্ন স্তরের, যেমন আইটি, ব্যাংক, ম্যানুফ্যাকচারিং, রিটেল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ইত্যাদির জন্য শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ন্যূনতম এবং গ্রেডভিত্তিক বেতন কাঠামো নির্ধারণ করবে, যা প্রতি তিন বছর পর মূল্যস্ফীতির সাথে সমন্বয় করা হবে। এর পাশাপাশি বাংলাদেশ শ্রম আইনের যথাযথ সংস্কার ও কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। কথায় কথায় বেআইনি ছাঁটাই, গ্র্যাচুইটি ও প্রভিডেন্ট ফান্ড না দেওয়ার প্রবণতা বন্ধে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরকে শক্তিশালী ও দুর্নীতিমুক্ত করতে হবে। প্রতিটি জেলায় শ্রম আদালতের সংখ্যা বাড়িয়ে মামলা তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে নিষ্পত্তির আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি করতে হবে।

​সরকার যে সর্বজনীন পেনশন স্কিম চালু করেছে, সেটিকে বেসরকারি খাতের সব প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানের জন্য বাধ্যতামূক করা উচিত, যেখানে কর্মীর বেতনের একটি অংশ, প্রতিষ্ঠানের একটি অংশ এবং সরকারের পক্ষ থেকে একটি নির্দিষ্ট লভ্যাংশ যুক্ত হয়ে একটি শক্তিশালী ভবিষ্যৎ তহবিল গঠিত হবে। অতিরিক্ত কর্মঘণ্টার অবসান ঘটিয়ে কোনো প্রতিষ্ঠান যদি অতিরিক্ত কাজ করায়, তবে আইন অনুযায়ী দ্বিগুণ হারে ওভারটাইম দেওয়া নিশ্চিত করতে হবে এবং প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের জন্য কর্মীদের বাধ্যতামূলক গ্রুপ বা স্বাস্থ্য বীমার আওতায় আনা আইনি বাধ্যবাধকতার মধ্যে ফেলতে হবে। একই সাথে যেসব বেসরকারি প্রতিষ্ঠান তাদের কর্মীদের জন্য চমৎকার সুযোগ-সুবিধা, স্বাস্থ্য বীমা এবং সুনির্দিষ্ট বেতন কাঠামো নিশ্চিত করবে, সরকারকে সেসব প্রতিষ্ঠানকে কর রেয়াত বা বিশেষ বাণিজ্যিক সুবিধা দেওয়া উচিত। এছাড়া প্রতিবছর প্রতিষ্ঠানের কর্মপরিবেশের ওপর ভিত্তি করে সেরা নিয়োগকর্তা রেটিং বা সনদ দেওয়া যেতে পারে, যা বাজারে তাদের ব্র্যান্ড ভ্যালু বাড়াবে।

​একটি রাষ্ট্র বা সমাজ কখনোই তার ৯৫ শতাংশ কর্মক্ষম মানুষকে পেছনে ফেলে, তাদের মনে তীব্র বঞ্চনাবোধ জিয়ে রেখে সমৃদ্ধির শিখরে পৌঁছাতে পারে না। সরকারি কর্মচারীরা রাষ্ট্রের চালিকাশক্তি হলে, বেসরকারি কর্মীরা এই রাষ্ট্রের অর্থনীতির মূল ফুসফুস। ফুসফুসকে প্রতিনিয়ত চেপে ধরে শরীরকে সুস্থ রাখা অসম্ভব। সংসদ সদস্য মারদীয়া মমতাজ যে প্রশ্নটি তুলেছেন, তা কেবল কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য নয়; এটি দেশের কোটি কোটি নীরব, নিরুপায় বেসরকারি চাকরিজীবীর ভেতরের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও দীর্ঘশ্বাসের প্রতিধ্বনি। প্রশংসা ও স্তুতির রাজনীতি একপাশে সরিয়ে রেখে সরকারের উচিত এই বাস্তবতাকে সাহসের সাথে স্বীকার করা এবং বেসরকারি খাতের কর্মীদের জন্য একটি মানবিক, মর্যাদাপূর্ণ ও বৈষম্যহীন কর্মপরিবেশ গড়ে তুলতে অবিলম্বে কার্যকর আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন করা। তবেই কমবে সরকারি চাকরির পেছনে অন্ধ উন্মাদনা, বন্ধ হবে মেধার অপচয়, আর টেকসই হবে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি।

লেখক-সাংবাদিক,রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও মানবাধিকার কর্মী, চট্টগ্রাম।

এম,সফিউল আজম চৌধুরী: স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত দেশে প্রতি পাঁচ থেকে ছয় বছরের একটি নির্দিষ্ট অর্থনৈতিক চক্র বা নিয়মিত বিরতি মেনে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন জাতীয় পে-স্কেল নিয়ে আসে। ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির সাথে সংগতি রাখা, বাজারদরের জ্যামিতিক বৃদ্ধির বিপরীতে টাকার ক্রয় ক্ষমতা সচল রাখা এবং দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যেই রাষ্ট্র নিয়ম তান্ত্রিকভাবে এই পদক্ষেপ নেয়।

মহার্ঘ ভাতা, বাড়ি ভাড়া, চিকিৎসা ভাতা, যাতায়াত সুবিধা, উৎসব বোনাস থেকে শুরু করে সর্বশেষ বৈশাখী ভাতাও যুক্ত হয়েছে সরকারি খাতের সুযোগ-সুবিধায়। প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এবং বাজার মূল্যের সাথে সংগতি রাখার জন্য রাষ্ট্রের এসব উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। কিন্তু প্রশ্ন জাগে—রাষ্ট্রের এই বিপুল সুযোগ-সুবিধার বিপরীতে দেশের মূল অর্থনীতি যাদের কাঁধে ভর করে দাঁড়িয়ে আছে, সেই বিশাল বেসরকারি খাতের কোটি কোটি কর্মজীবী মানুষের ভাগ্যের চাকা ঘুরছে কোন গতিতে?

সম্প্রতি জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে এই মৌলিক ও ঐতিহাসিক বৈষম্যটির দিকে অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে আঙুল তুলেছেন সংসদ সদস্য মারদীয়া মমতাজ। চাটুকারিতা ও চর্বিতচর্বণ প্রশংসার চেনা বৃত্ত থেকে বেরিয়ে তিনি সংসদে বেসরকারি চাকরিজীবীদের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, বৈষম্য, অনিশ্চয়তা ও হাড়ভাঙা খাটুনির বাস্তব চিত্রটি সামনে এনেছেন। তাঁর উত্থাপিত প্রশ্নটি শুধু যৌক্তিকই নয়, এটি বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক ও সামাজিক জিজ্ঞাসা। যদি দেশের মাত্র ৫ শতাংশ সরকারি চাকরিজীবীর জন্য সুনির্দিষ্ট ও সুরক্ষিত জাতীয় পে-স্কেল থাকতে পারে, তবে বাকি ৯৫ শতাংশ বেসরকারি খাতের কর্মীদের জন্য কেন একটি কার্যকর ন্যূনতম বেতন কাঠামো বা আইনি সুরক্ষা রাষ্ট্র তৈরি করবে না?

​বিভিন্ন পরিসংখ্যান ও শ্রম শক্তি জরিপের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশের মোট কর্মসংস্থান ও শ্রম শক্তির মাত্র ৫ শতাংশের কাছাকাছি নিয়োজিত আছেন সরকারি খাতে। বাকি প্রায় ৯৫ শতাংশ কর্মজীবী মানুষই বেসরকারি খাতের প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রতিষ্ঠানিক চাকার মূল জ্বালানি। দেশের তৈরি পোশাক খাত, প্রবাসী আয়ের পর অভ্যন্তরীণ ব্যবসা-বাণিজ্য, ব্যাংক-বীমা, করপোরেট হাউস, গণমাধ্যম, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা, আবাসন খাত থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প—সবই বেসরকারি খাতের শ্রমের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সিংহভাগ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর আসে এই বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তা ও কর্মীদের পকেট থেকে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ ডেটা এবং বিভিন্ন বেসরকারি গবেষণা সংস্থার সমীক্ষা অনুযায়ী, দেশের জিডিপিতে বেসরকারি খাতের অবদান প্রায় ৮০ শতাংশের ওপরে। অথচ এই বিশাল জনগোষ্ঠীর সিংহভাগের জন্যই কোনো সুনির্দিষ্ট বেতন কাঠামো নেই, নেই কোনো উৎসব বোনাসের আইনি নিশ্চয়তা, আর ভবিষ্যৎ তহবিলের সুবিধা তো অধিকাংশ মধ্যম ও ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের কাছে এক অলীক কল্পনা।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) কর্তৃক ১৯৭০ সালে গৃহীত ‘ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ কনভেনশন, ১৯৭০ (কনভেনশন ১৩১)’অনুযায়ী, প্রতিটি দেশের সরকার তার দেশের সব ধরনের শ্রমজীবী ও চাকুরীরত মানুষের জন্য একটি উপযুক্ত ন্যূনতম মজুরি কাঠামো নির্ধারণ করতে বাধ্য, যা কর্মীর জীবনযাত্রার ব্যয়, সামাজিক নিরাপত্তা এবং মূল্যস্ফীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। বাংলাদেশ আইএলও-র অনেক কনভেনশনে স্বাক্ষর করলেও বেসরকারি খাতের প্রাতিষ্ঠানিক ও মধ্যম আয়ের চাকরিজীবীদের সুরক্ষায় এর কোনো কেন্দ্রীয় প্রতিফলন দেখা যায় না। উন্নত বিশ্বে তো বটেই, এমনকি দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী দেশ ভারতেও বেসরকারি খাতের জন্য ন্যূনতম মজুরি আইন অত্যন্ত কঠোরভাবে কার্যকর। সেখানে রাজ্য ও খাত ভিত্তিক দক্ষ, আধা-দক্ষ এবং অদক্ষ কর্মীদের জন্য ন্যূনতম বেতন সুনির্দিষ্ট করা আছে। এমনকি শ্রীলঙ্কা বা ভিয়েতনামের মতো দেশেও বেসরকারি খাতের কর্মীদের জন্য বাৎসরিক ইনক্রিমেন্ট ও মহার্ঘ ভাতার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। অথচ বাংলাদেশে তৈরি পোশাক খাতের বাইরে, যেখানে আন্তর্জাতিক চাপের কারণে মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়, বিশাল বেসরকারি করপোরেট, আইটি, লজিস্টিকস, সিএন্ডএফ,পরিবহন, বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিংবা বিপণন খাতের কর্মীদের জন্য কোনো কেন্দ্রীয় ও বৈজ্ঞানিক মজুরি কাঠামো আজ পর্যন্ত গড়ে ওঠেনি।

বেসরকারি খাতের সিংহভাগ প্রতিষ্ঠানের কর্মপরিবেশ পর্যালোচনায় কয়েকটি অভিন্ন ও উদ্বেগজনক চিত্র ফুটে ওঠে।

প্রথমত, এখানে রয়েছে চাকরির চরম নিরাপত্তাহীনতা। আজ চাকরি আছে কাল নেই—এই আতঙ্কের মধ্যে কাটে বেসরকারি খাতের অধিকাংশ কর্মীর জীবন। বাংলাদেশ শ্রম আইন কাগজে-কলমে থাকলেও এর চার মাসের নোটিশ বা ক্ষতিপূরণের বিধান বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানই মানে না। কোনো কারণ দর্শানো ছাড়াই যেকোনো মুহূর্তে মৌখিক আদেশে চাকরিচ্যুতির ঘটনা এখানে নিত্যনৈমিত্তিক।

দ্বিতীয়ত, কাজের অতিরিক্ত চাপ ও ওভারটাইমের অনুপস্থিতি কর্মীদের জীবনকে ওষ্ঠাগত করে তোলে। আন্তর্জাতিক শ্রম আইন ও দেশীয় আইন অনুযায়ী দৈনিক ৮ ঘণ্টা এবং সপ্তাহে সর্বোচ্চ ৪৮ ঘণ্টা কর্মদিবসের কথা বলা হলেও, বেসরকারি খাতে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা কাজ করাটা অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই অতিরিক্ত খাটুনির জন্য কোনো ওভারটাইম বা আর্থিক প্রণোদনা দেওয়া হয় না, যা স্পষ্টত আধুনিক শোষণের শামিল। এর সাথে যুক্ত হয়েছে বাজার দরের সাথে বেতনের অসঙ্গতি তথা মূল্যস্ফীতির থাবা। গত কয়েক বছরে দেশে মূল্যস্ফীতির হার প্রায় ১০ শতাংশের কাছাকাছি ঘোরাফেরা করছে। চাল, ডাল, তেল থেকে শুরু করে বাড়ি ভাড়া, সন্তানদের শিক্ষা খরচ ও চিকিৎসা ব্যয় দ্বিগুণ হয়েছে। কিন্তু বেসরকারি খাতে সেই অনুপাতে বেতন বাড়েনি। মালিক পক্ষের মর্জির ওপর ঝুলে থাকে বাৎসরিক ইনক্রিমেন্ট। ফলে প্রতিবছর এই খাতের কর্মীদের প্রকৃত ক্রয় ক্ষমতা জ্যামিতিক হারে কমছে এবং তারা এক ধরনের নীরব দারিদ্র্যের দিকে ধাবিত হচ্ছেন।

​বেসরকারি খাতের এই সীমাহীন বৈষম্য, অনিশ্চয়তা ও অসম্মানজনক কর্মপরিবেশের কারণেই আজ দেশের শিক্ষিত যুব সমাজ সরকারি চাকরির পেছনে অন্ধের মতো ছুটছে। একটি বিসিএস বা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকের পদের জন্য লাখ লাখ গ্র্যাজুয়েট বছরের পর বছর কোচিং সেন্টারে টেবিল চাপড়াচ্ছেন, উৎপাদনশীল বয়স নষ্ট করছেন। বেসরকারি খাতকে নিরাপদ, ন্যায্য ও সম্মানজনক না করার কারণে পুরো সামাজিক মানসিকতায় এক ধরনের মারাত্মক বিকৃতি তৈরি হয়েছে। মেধার বিকাশ ঘটার কথা ছিল যেখানে উদ্ভাবন, উদ্যোক্তা হওয়া ও বেসরকারি করপোরেট খাতে, সেখানে সবাই খুঁজছে একটি নিরাপদ খাঁচা। এই তীব্র প্রতিযোগিতাই সমাজ ও রাষ্ট্রে ঘুষ, তদবির এবং দুর্নীতির সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখছে। কারণ তরুণরা দেখছে, বেসরকারি খাতে যোগ্যতা দিয়েও যেখানে জীবন নিশ্চিত নয়, সেখানে সরকারি খাতে একবার ঢুকতে পারলে আজীবন সুরক্ষিত এবং সামাজিকভাবে ক্ষমতাশালী হওয়া যায়।

এই গভীর সংকট নিয়ে দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদ, সমাজবিজ্ঞানী ও শ্রম আইন বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশের একজন খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদ ও নীতি-বিশ্লেষক এই প্রসঙ্গে জানান যে, আমরা একটি মুক্তবাজার অর্থনীতির কথা বলি, কিন্তু শ্রমবাজারের ক্ষেত্রে একে চরম নৈরাজ্য বাজারে পরিণত করেছি। পুঁজির সুরক্ষা দেওয়ার জন্য রাষ্ট্রে যত আইন আছে, শ্রমের সুরক্ষা দেওয়ার জন্য তার সিকিভাগও কার্যকর নেই। বেসরকারি কর্মীরা যদি প্রতি পদে বঞ্চিত বোধ করেন, তবে দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি টেকসই হতে পারে না। সংসদে মারদীয়া মমতাজের এই বক্তব্যটি একটি চোখ খোলার মতো সতর্কবার্তা এবং এটি জন আকাঙ্ক্ষারই প্রতিফলন। একইভাবে বেসরকারি খাতের করপোরেট কালচার নিয়ে কাজ করা একজন শীর্ষস্থানীয় মানবসম্পদ বিশেষজ্ঞের মতে, আমাদের দেশের বেসরকারি খাতের বড় অংশ এখনো সামন্ততান্ত্রিক মানসিকতায় চলে। তারা কর্মীদের সম্পদ না ভেবে খরচের খাত বা কস্ট সেন্টার মনে করে। করপোরেট সুশাসন বা গভর্ন্যান্সের অভাব এবং সরকারি তদারকি না থাকায় মালিকপক্ষ নিজেদের সুবিধামতো নিয়ম তৈরি করে পার পেয়ে যাচ্ছে, যেখানে আসলে রাষ্ট্রকে শক্তিশালী রেগুলেটরের ভূমিকা পালন করতে হবে।

​এই নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি ও দীর্ঘদিনের বঞ্চনা নিয়ে মূলধারার গণমাধ্যমের সংকট ও সার্বিক বেসরকারি খাতের চিত্র তুলে ধরেছেন দেশের একজন প্রথিতযশা ও সিনিয়র সাংবাদিক। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, গণমাধ্যম এবং রাজনীতিতে দীর্ঘকাল ধরে আমরা জবাবদিহিতার সংস্কৃতির কথা বলে আসছি, অথচ এই জবাবদিহিতা সবচেয়ে বেশি অনুপস্থিত আমাদের শ্রম ও কর্মসংস্থান নীতিতে। বেসরকারি খাতের সাংবাদিকদের কথাই যদি ধরি, বিশেষ করে মফস্বল বা আঞ্চলিক পর্যায়ে কর্মরত সাংবাদিকদের আর্থিক সংকট আজ এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিয়েছে। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বেতন কাঠামো না থাকা, মাসের পর মাস বেতন বকেয়া থাকা এবং ন্যূনতম পেশাগত সুরক্ষার অভাবের কারণে বেসরকারি খাতের বিশাল অংশ আজ চরম অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে। মেধার মূল্যায়ন এবং কর্মীদের জীবনযাত্রার নিশ্চয়তা না দিয়ে আমরা কোনো দিন একটি দায়িত্বশীল ও টেকসই বেসরকারি খাত গড়ে তুলতে পারব না। সংসদে একজন জনপ্রতিনিধি যখন এই বঞ্চনা নিয়ে সোচ্চার হন, তখন বুঝতে হবে দেয়ালের পিঠ ঠেকে গেছে। রাষ্ট্র যদি এখনই আইন করে এই পুঁজিবাদী মানসিকতা নিয়ন্ত্রণ না করে, তবে দক্ষ শ্রমশক্তি হারিয়ে দেশ অর্থনৈতিক ও মেধা সংকটের এক অন্ধকার চোরাবালিতে নিমজ্জিত হবে।

বেসরকারি খাতের এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে বঞ্চনা ও অনিশ্চয়তা থেকে রক্ষা করতে বর্তমান সরকারকে এখনই সুনির্দিষ্ট নীতিগত ও আইনি সংস্কারে হাত দেওয়া উচিত। এর জন্য সরকারকে একটি উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন জাতীয় বেসরকারি পে-কমিশন বা টাস্কফোর্স গঠন করতে হবে। এই কমিশন বেসরকারি খাতের বিভিন্ন স্তরের, যেমন আইটি, ব্যাংক, ম্যানুফ্যাকচারিং, রিটেল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ইত্যাদির জন্য শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ন্যূনতম এবং গ্রেডভিত্তিক বেতন কাঠামো নির্ধারণ করবে, যা প্রতি তিন বছর পর মূল্যস্ফীতির সাথে সমন্বয় করা হবে। এর পাশাপাশি বাংলাদেশ শ্রম আইনের যথাযথ সংস্কার ও কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। কথায় কথায় বেআইনি ছাঁটাই, গ্র্যাচুইটি ও প্রভিডেন্ট ফান্ড না দেওয়ার প্রবণতা বন্ধে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরকে শক্তিশালী ও দুর্নীতিমুক্ত করতে হবে। প্রতিটি জেলায় শ্রম আদালতের সংখ্যা বাড়িয়ে মামলা তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে নিষ্পত্তির আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি করতে হবে।

​সরকার যে সর্বজনীন পেনশন স্কিম চালু করেছে, সেটিকে বেসরকারি খাতের সব প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানের জন্য বাধ্যতামূক করা উচিত, যেখানে কর্মীর বেতনের একটি অংশ, প্রতিষ্ঠানের একটি অংশ এবং সরকারের পক্ষ থেকে একটি নির্দিষ্ট লভ্যাংশ যুক্ত হয়ে একটি শক্তিশালী ভবিষ্যৎ তহবিল গঠিত হবে। অতিরিক্ত কর্মঘণ্টার অবসান ঘটিয়ে কোনো প্রতিষ্ঠান যদি অতিরিক্ত কাজ করায়, তবে আইন অনুযায়ী দ্বিগুণ হারে ওভারটাইম দেওয়া নিশ্চিত করতে হবে এবং প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের জন্য কর্মীদের বাধ্যতামূলক গ্রুপ বা স্বাস্থ্য বীমার আওতায় আনা আইনি বাধ্যবাধকতার মধ্যে ফেলতে হবে। একই সাথে যেসব বেসরকারি প্রতিষ্ঠান তাদের কর্মীদের জন্য চমৎকার সুযোগ-সুবিধা, স্বাস্থ্য বীমা এবং সুনির্দিষ্ট বেতন কাঠামো নিশ্চিত করবে, সরকারকে সেসব প্রতিষ্ঠানকে কর রেয়াত বা বিশেষ বাণিজ্যিক সুবিধা দেওয়া উচিত। এছাড়া প্রতিবছর প্রতিষ্ঠানের কর্মপরিবেশের ওপর ভিত্তি করে সেরা নিয়োগকর্তা রেটিং বা সনদ দেওয়া যেতে পারে, যা বাজারে তাদের ব্র্যান্ড ভ্যালু বাড়াবে।

​একটি রাষ্ট্র বা সমাজ কখনোই তার ৯৫ শতাংশ কর্মক্ষম মানুষকে পেছনে ফেলে, তাদের মনে তীব্র বঞ্চনাবোধ জিয়ে রেখে সমৃদ্ধির শিখরে পৌঁছাতে পারে না। সরকারি কর্মচারীরা রাষ্ট্রের চালিকাশক্তি হলে, বেসরকারি কর্মীরা এই রাষ্ট্রের অর্থনীতির মূল ফুসফুস। ফুসফুসকে প্রতিনিয়ত চেপে ধরে শরীরকে সুস্থ রাখা অসম্ভব। সংসদ সদস্য মারদীয়া মমতাজ যে প্রশ্নটি তুলেছেন, তা কেবল কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য নয়; এটি দেশের কোটি কোটি নীরব, নিরুপায় বেসরকারি চাকরিজীবীর ভেতরের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও দীর্ঘশ্বাসের প্রতিধ্বনি। প্রশংসা ও স্তুতির রাজনীতি একপাশে সরিয়ে রেখে সরকারের উচিত এই বাস্তবতাকে সাহসের সাথে স্বীকার করা এবং বেসরকারি খাতের কর্মীদের জন্য একটি মানবিক, মর্যাদাপূর্ণ ও বৈষম্যহীন কর্মপরিবেশ গড়ে তুলতে অবিলম্বে কার্যকর আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন করা। তবেই কমবে সরকারি চাকরির পেছনে অন্ধ উন্মাদনা, বন্ধ হবে মেধার অপচয়, আর টেকসই হবে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি।

লেখক-সাংবাদিক,রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও মানবাধিকার কর্মী, চট্টগ্রাম।