মাহবুবুর রহমান: বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে এমন কিছু নাম রয়েছে, যাদের জীবনগাঁথা দেশের ইতিহাসের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। সেই তালিকায় অন্যতম হলেন তোফায়েল আহমেদ। ছাত্ররাজনীতি থেকে জাতীয় রাজনীতি, গণঅভ্যুত্থান থেকে মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে সংসদীয় গণতন্ত্রের নানা উত্থান-পতন—প্রায় ছয় দশকের রাজনৈতিক জীবনে তিনি ছিলেন বাংলাদেশের ইতিহাসের বহু গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের প্রত্যক্ষ সাক্ষী ও অংশীদার। ২০২৬ সালের ১ জুন তাঁর মৃত্যু বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক যুগের অবসানের প্রতীক হয়ে উঠেছে। ৮২ বছর বয়সে পৃথিবী ছেড়ে যাওয়া এই বর্ষীয়ান নেতা শুধু একজন রাজনীতিক ছিলেন না; তিনি ছিলেন একটি সময়ের প্রতিনিধি, একটি রাজনৈতিক ধারার প্রতীক এবং বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠনের দীর্ঘ পথচলার জীবন্ত ইতিহাস।

ছাত্রনেতা থেকে জাতীয় নেতৃত্বে উত্থান
১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর ভোলার কোরালিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তোফায়েল আহমেদ। উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য তিনি ঢাকায় আসেন এবং ছাত্রজীবনেই রাজনীতির প্রতি গভীর আকৃষ্ট হন। ষাটের দশকে পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালির অধিকার আদায়ের আন্দোলন যখন তীব্রতর হচ্ছিল, তখন তরুণ তোফায়েল আহমেদ ছাত্রসমাজের অন্যতম মুখ হয়ে ওঠেন। ১৯৬৭ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সহ-সভাপতি (ভিপি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সেই সময় ছাত্রসমাজের আন্দোলন শুধু শিক্ষার্থীদের দাবি-দাওয়া নয়, বরং পুরো জাতির রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হয়ে উঠেছিল। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বৈষম্য ও দমননীতির বিরুদ্ধে ছাত্রদের আন্দোলনকে সংগঠিত করতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম মুখ
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে বিবেচিত ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান ছিল ইতিহাসের এক যুগান্তকারী ঘটনা। সেই আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক ছিলেন তোফায়েল আহমেদ। আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানে যখন গণবিস্ফোরণ ঘটে, তখন ছাত্রনেতা তোফায়েল আহমেদ আন্দোলনের সম্মুখসারিতে অবস্থান করেন। গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাঙালি জাতীয়তাবাদ নতুন গতি পায় এবং শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা আরও সুসংহত হয়। ইতিহাসবিদদের মতে, ১৯৬৯-এর সেই গণজাগরণই ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার পথকে অনেকাংশে প্রস্তুত করেছিল। আর সেই আন্দোলনের অন্যতম প্রধান ছাত্রনেতা ছিলেন তোফায়েল আহমেদ।

বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর
রাজনৈতিক দূরদর্শিতা, সাংগঠনিক দক্ষতা ও নেতৃত্বের গুণাবলির কারণে খুব অল্প বয়সেই তিনি জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমান-এর আস্থা অর্জন করেন। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনের সময় মাত্র ২৭ বছর বয়সে তিনি পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। একই সময়ে তিনি শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক সচিব হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। সেই সুবাদে পাকিস্তানের রাজনৈতিক সংকট, ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে টালবাহানা এবং স্বাধীনতার পূর্বমুহূর্তের বহু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার প্রত্যক্ষ সাক্ষী ছিলেন তিনি।

মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক
১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা শুরুর পর স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হলে তোফায়েল আহমেদ মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক হিসেবে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। বিভিন্ন সূত্রে তাঁকে বাংলাদেশ লিবারেশন ফ্রন্ট বা মুজিব বাহিনীর অন্যতম শীর্ষ সংগঠক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশের অভ্যন্তরে ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জনমত গঠনে তিনি ভূমিকা রাখেন। স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়নে তরুণ প্রজন্মকে সংগঠিত করার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান উল্লেখযোগ্য বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করেন।

স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রগঠনের রাজনীতি
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠন। সেই সময় বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সচিব হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে যুক্ত ছিলেন তোফায়েল আহমেদ। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক কাঠামো গঠনের প্রাথমিক পর্যায়ের বহু ঘটনার সঙ্গে তিনি সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন। স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধি, রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন এবং দলকে তৃণমূল পর্যায়ে সম্প্রসারণে তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

১৯৭৫-এর পর কঠিন সময়
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক ভয়াবহ মোড় এনে দেয়। সেই ঘটনার পর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের জন্য নেমে আসে কঠিন সময়। তোফায়েল আহমেদও দীর্ঘ সময় রাজনৈতিক নির্যাতনের শিকার হন। বিভিন্ন সময়ে তাঁকে কারাবরণ করতে হয়। বিভিন্ন জেলায় প্রায় পাঁচ বছর কারাগারে কাটিয়েছেন তিনি। এই সময় আওয়ামী লীগের অস্তিত্ব রক্ষা এবং দলীয় কর্মীদের সংগঠিত রাখার ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

সংসদীয় রাজনীতির উজ্জ্বল বক্তা
বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতিতে তোফায়েল আহমেদ ছিলেন একজন শক্তিশালী বক্তা হিসেবে পরিচিত। জাতীয় সংসদে তাঁর বক্তব্য রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরাও মনোযোগ দিয়ে শুনতেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। ভোলা অঞ্চলের মানুষের কাছে তিনি ছিলেন অত্যন্ত জনপ্রিয় নেতা। বিভিন্ন সময়ে ভোলা-১, ভোলা-২ এবং অন্যান্য আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। রাজনৈতিক মতভেদ থাকলেও সংসদীয় বিতর্কে তাঁর যুক্তিনির্ভর উপস্থাপন ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার কারণে তিনি ব্যাপক সম্মান অর্জন করেছিলেন।

মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন
রাজনৈতিক জীবনে তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন। শিল্পমন্ত্রী, বাণিজ্যমন্ত্রী এবং গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে দেশের শিল্পায়ন, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং অবকাঠামো উন্নয়নের নানা উদ্যোগে তিনি যুক্ত ছিলেন। বিশেষ করে বাণিজ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে দেশের রপ্তানি সম্প্রসারণ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্পর্ক জোরদার এবং শিল্পখাতের উন্নয়নে তিনি বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। যদিও এসব উদ্যোগের সাফল্য ও সীমাবদ্ধতা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে ভিন্নমত রয়েছে, তবুও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার জন্য তিনি স্বীকৃত ছিলেন।

আওয়ামী লীগের প্রবীণ অভিভাবক
দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার কারণে আওয়ামী লীগের মধ্যে তিনি এক ধরনের অভিভাবকসুলভ মর্যাদা লাভ করেছিলেন। দলীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ, রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলা এবং নতুন জন্মের নেতাদের পরামর্শ দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর মতামত গুরুত্ব পেত। পরবর্তী সময়ে তিনি আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। জাতীয় রাজনীতিতে নানা পরিবর্তন এলেও দলীয় রাজনীতিতে তাঁর প্রভাব ও গ্রহণযোগ্যতা দীর্ঘদিন বজায় ছিল।

ইতিহাসের জীবন্ত সাক্ষী
বাংলাদেশের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ প্রায় সব অধ্যায়ের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন তোফায়েল আহমেদ। তিনি দেখেছেন ভাষা আন্দোলনের উত্তরাধিকার কীভাবে ছয় দফা আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। তিনি অংশ নিয়েছেন ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে। প্রত্যক্ষ করেছেন ১৯৭০-এর নির্বাচন, ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রগঠন, ১৯৭৫-এর রাজনৈতিক বিপর্যয়, সামরিক শাসন, গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলন এবং একবিংশ শতাব্দীর পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতা। এই দীর্ঘ পথচলায় তিনি ছিলেন কখনও ছাত্রনেতা, কখনও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, কখনও মন্ত্রী, কখনও বিরোধী রাজনীতিক, আবার কখনও প্রবীণ উপদেষ্টা।

মূল্যায়ন ও উত্তরাধিকার
তোফায়েল আহমেদের রাজনৈতিক জীবন নিয়ে মতভেদ থাকতেই পারে। তাঁর দলীয় অবস্থান, বিভিন্ন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বা সরকারের কর্মকাণ্ড নিয়ে সমালোচনাও হয়েছে। তবে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের অনেকেই স্বীকার করেন যে তিনি বাংলাদেশের রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের প্রতিনিধি ছিলেন। তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় সম্ভবত এটাই—তিনি ছিলেন এমন একজন মানুষ, যিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রজন্মের সংগ্রাম থেকে শুরু করে আধুনিক রাজনৈতিক বিকাশের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপের সাক্ষী ছিলেন। রাজনীতির ময়দানে ছয় দশকেরও বেশি সময় কাটিয়ে যাওয়া এই বর্ষীয়ান নেতা চলে গেলেও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তাঁর নাম আলোচিত হবে দীর্ঘদিন। নতুন প্রজন্ম যখন স্বাধীনতার ইতিহাস, গণঅভ্যুত্থান কিংবা বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিবর্তন নিয়ে আলোচনা করবে, তখন তোফায়েল আহমেদের নাম অনিবার্যভাবেই উঠে আসবে। একজন ছাত্রনেতা থেকে জাতীয় নেতা হয়ে ওঠার এই যাত্রা শুধু একজন ব্যক্তির রাজনৈতিক জীবন নয়; এটি বাংলাদেশের ইতিহাসেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিচ্ছবি। তাঁর মৃত্যুতে একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটেছে, কিন্তু ইতিহাসে তাঁর উপস্থিতি থেকে যাবে দীর্ঘকাল।

মাহবুবুর রহমান: বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে এমন কিছু নাম রয়েছে, যাদের জীবনগাঁথা দেশের ইতিহাসের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। সেই তালিকায় অন্যতম হলেন তোফায়েল আহমেদ। ছাত্ররাজনীতি থেকে জাতীয় রাজনীতি, গণঅভ্যুত্থান থেকে মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে সংসদীয় গণতন্ত্রের নানা উত্থান-পতন—প্রায় ছয় দশকের রাজনৈতিক জীবনে তিনি ছিলেন বাংলাদেশের ইতিহাসের বহু গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের প্রত্যক্ষ সাক্ষী ও অংশীদার। ২০২৬ সালের ১ জুন তাঁর মৃত্যু বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক যুগের অবসানের প্রতীক হয়ে উঠেছে। ৮২ বছর বয়সে পৃথিবী ছেড়ে যাওয়া এই বর্ষীয়ান নেতা শুধু একজন রাজনীতিক ছিলেন না; তিনি ছিলেন একটি সময়ের প্রতিনিধি, একটি রাজনৈতিক ধারার প্রতীক এবং বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠনের দীর্ঘ পথচলার জীবন্ত ইতিহাস।

ছাত্রনেতা থেকে জাতীয় নেতৃত্বে উত্থান
১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর ভোলার কোরালিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তোফায়েল আহমেদ। উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য তিনি ঢাকায় আসেন এবং ছাত্রজীবনেই রাজনীতির প্রতি গভীর আকৃষ্ট হন। ষাটের দশকে পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালির অধিকার আদায়ের আন্দোলন যখন তীব্রতর হচ্ছিল, তখন তরুণ তোফায়েল আহমেদ ছাত্রসমাজের অন্যতম মুখ হয়ে ওঠেন। ১৯৬৭ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সহ-সভাপতি (ভিপি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সেই সময় ছাত্রসমাজের আন্দোলন শুধু শিক্ষার্থীদের দাবি-দাওয়া নয়, বরং পুরো জাতির রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হয়ে উঠেছিল। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বৈষম্য ও দমননীতির বিরুদ্ধে ছাত্রদের আন্দোলনকে সংগঠিত করতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম মুখ
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে বিবেচিত ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান ছিল ইতিহাসের এক যুগান্তকারী ঘটনা। সেই আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক ছিলেন তোফায়েল আহমেদ। আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানে যখন গণবিস্ফোরণ ঘটে, তখন ছাত্রনেতা তোফায়েল আহমেদ আন্দোলনের সম্মুখসারিতে অবস্থান করেন। গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাঙালি জাতীয়তাবাদ নতুন গতি পায় এবং শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা আরও সুসংহত হয়। ইতিহাসবিদদের মতে, ১৯৬৯-এর সেই গণজাগরণই ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার পথকে অনেকাংশে প্রস্তুত করেছিল। আর সেই আন্দোলনের অন্যতম প্রধান ছাত্রনেতা ছিলেন তোফায়েল আহমেদ।

বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর
রাজনৈতিক দূরদর্শিতা, সাংগঠনিক দক্ষতা ও নেতৃত্বের গুণাবলির কারণে খুব অল্প বয়সেই তিনি জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমান-এর আস্থা অর্জন করেন। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনের সময় মাত্র ২৭ বছর বয়সে তিনি পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। একই সময়ে তিনি শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক সচিব হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। সেই সুবাদে পাকিস্তানের রাজনৈতিক সংকট, ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে টালবাহানা এবং স্বাধীনতার পূর্বমুহূর্তের বহু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার প্রত্যক্ষ সাক্ষী ছিলেন তিনি।

মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক
১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা শুরুর পর স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হলে তোফায়েল আহমেদ মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক হিসেবে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। বিভিন্ন সূত্রে তাঁকে বাংলাদেশ লিবারেশন ফ্রন্ট বা মুজিব বাহিনীর অন্যতম শীর্ষ সংগঠক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশের অভ্যন্তরে ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জনমত গঠনে তিনি ভূমিকা রাখেন। স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়নে তরুণ প্রজন্মকে সংগঠিত করার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান উল্লেখযোগ্য বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করেন।

স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রগঠনের রাজনীতি
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠন। সেই সময় বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সচিব হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে যুক্ত ছিলেন তোফায়েল আহমেদ। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক কাঠামো গঠনের প্রাথমিক পর্যায়ের বহু ঘটনার সঙ্গে তিনি সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন। স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধি, রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন এবং দলকে তৃণমূল পর্যায়ে সম্প্রসারণে তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

১৯৭৫-এর পর কঠিন সময়
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক ভয়াবহ মোড় এনে দেয়। সেই ঘটনার পর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের জন্য নেমে আসে কঠিন সময়। তোফায়েল আহমেদও দীর্ঘ সময় রাজনৈতিক নির্যাতনের শিকার হন। বিভিন্ন সময়ে তাঁকে কারাবরণ করতে হয়। বিভিন্ন জেলায় প্রায় পাঁচ বছর কারাগারে কাটিয়েছেন তিনি। এই সময় আওয়ামী লীগের অস্তিত্ব রক্ষা এবং দলীয় কর্মীদের সংগঠিত রাখার ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

সংসদীয় রাজনীতির উজ্জ্বল বক্তা
বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতিতে তোফায়েল আহমেদ ছিলেন একজন শক্তিশালী বক্তা হিসেবে পরিচিত। জাতীয় সংসদে তাঁর বক্তব্য রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরাও মনোযোগ দিয়ে শুনতেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। ভোলা অঞ্চলের মানুষের কাছে তিনি ছিলেন অত্যন্ত জনপ্রিয় নেতা। বিভিন্ন সময়ে ভোলা-১, ভোলা-২ এবং অন্যান্য আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। রাজনৈতিক মতভেদ থাকলেও সংসদীয় বিতর্কে তাঁর যুক্তিনির্ভর উপস্থাপন ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার কারণে তিনি ব্যাপক সম্মান অর্জন করেছিলেন।

মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন
রাজনৈতিক জীবনে তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন। শিল্পমন্ত্রী, বাণিজ্যমন্ত্রী এবং গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে দেশের শিল্পায়ন, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং অবকাঠামো উন্নয়নের নানা উদ্যোগে তিনি যুক্ত ছিলেন। বিশেষ করে বাণিজ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে দেশের রপ্তানি সম্প্রসারণ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্পর্ক জোরদার এবং শিল্পখাতের উন্নয়নে তিনি বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। যদিও এসব উদ্যোগের সাফল্য ও সীমাবদ্ধতা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে ভিন্নমত রয়েছে, তবুও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার জন্য তিনি স্বীকৃত ছিলেন।

আওয়ামী লীগের প্রবীণ অভিভাবক
দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার কারণে আওয়ামী লীগের মধ্যে তিনি এক ধরনের অভিভাবকসুলভ মর্যাদা লাভ করেছিলেন। দলীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ, রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলা এবং নতুন জন্মের নেতাদের পরামর্শ দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর মতামত গুরুত্ব পেত। পরবর্তী সময়ে তিনি আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। জাতীয় রাজনীতিতে নানা পরিবর্তন এলেও দলীয় রাজনীতিতে তাঁর প্রভাব ও গ্রহণযোগ্যতা দীর্ঘদিন বজায় ছিল।

ইতিহাসের জীবন্ত সাক্ষী
বাংলাদেশের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ প্রায় সব অধ্যায়ের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন তোফায়েল আহমেদ। তিনি দেখেছেন ভাষা আন্দোলনের উত্তরাধিকার কীভাবে ছয় দফা আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। তিনি অংশ নিয়েছেন ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে। প্রত্যক্ষ করেছেন ১৯৭০-এর নির্বাচন, ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রগঠন, ১৯৭৫-এর রাজনৈতিক বিপর্যয়, সামরিক শাসন, গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলন এবং একবিংশ শতাব্দীর পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতা। এই দীর্ঘ পথচলায় তিনি ছিলেন কখনও ছাত্রনেতা, কখনও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, কখনও মন্ত্রী, কখনও বিরোধী রাজনীতিক, আবার কখনও প্রবীণ উপদেষ্টা।

মূল্যায়ন ও উত্তরাধিকার
তোফায়েল আহমেদের রাজনৈতিক জীবন নিয়ে মতভেদ থাকতেই পারে। তাঁর দলীয় অবস্থান, বিভিন্ন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বা সরকারের কর্মকাণ্ড নিয়ে সমালোচনাও হয়েছে। তবে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের অনেকেই স্বীকার করেন যে তিনি বাংলাদেশের রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের প্রতিনিধি ছিলেন। তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় সম্ভবত এটাই—তিনি ছিলেন এমন একজন মানুষ, যিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রজন্মের সংগ্রাম থেকে শুরু করে আধুনিক রাজনৈতিক বিকাশের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপের সাক্ষী ছিলেন। রাজনীতির ময়দানে ছয় দশকেরও বেশি সময় কাটিয়ে যাওয়া এই বর্ষীয়ান নেতা চলে গেলেও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তাঁর নাম আলোচিত হবে দীর্ঘদিন। নতুন প্রজন্ম যখন স্বাধীনতার ইতিহাস, গণঅভ্যুত্থান কিংবা বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিবর্তন নিয়ে আলোচনা করবে, তখন তোফায়েল আহমেদের নাম অনিবার্যভাবেই উঠে আসবে। একজন ছাত্রনেতা থেকে জাতীয় নেতা হয়ে ওঠার এই যাত্রা শুধু একজন ব্যক্তির রাজনৈতিক জীবন নয়; এটি বাংলাদেশের ইতিহাসেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিচ্ছবি। তাঁর মৃত্যুতে একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটেছে, কিন্তু ইতিহাসে তাঁর উপস্থিতি থেকে যাবে দীর্ঘকাল।