নিজস্ব প্রতিবেদক: চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) ১১তম গ্রেডে কর্মরত এক অফিসারকে ১৪তম গ্রেডে পদায়ন করে সেটিকে পদোন্নতি বলে অফিস আদেশ জারী করেছে সংস্থাটির সচিবালয় বিভাগ। এই আদেশ নিয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। এটি কি নিছক অনভিজ্ঞতা নাকি ঘুষ বাণিজ্যের বলি তা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করছেন অনেকে। চাহিদা অনুযায়ী ঘুষ আদায় করতে না পেরে সিনিয়র একজন কর্মচারীকে ইচ্ছকৃতভাবে ডিমোশন দিয়েছে বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। গত ১৫ ফেব্রুয়ারী সিডিএ সচিব রবীন্দ্র চাকমা স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে এমন গড়মিল দেখা গেছে। এই ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে উচ্চ আদালতে রিট পিটিশন দায়ের করেছেন ভুক্তভোগী কর্মচারী নাছির আহাম্মদ খান।
সিডিএ’র জারী করা অফিস আদেশের ৫ নম্বরে রয়েছে নাছির আহাম্মদ খানের নাম। তার বর্তমান পদবী দেখানো হয়েছে উচ্চমান সহকারী (১৪ তম গ্রেড) আর পদায়নকৃত মার্কেট সুপারিনটেন্ডেন্ট পদটিও ১৪তম গ্রেডের। প্রকৃতপক্ষে নাছির আহাম্মদ খান ২০২৪ সালের ২৮ ডিসেম্বর থেকেই ১১তম গ্রেড সুবিধা ভোগ করছেন। গতবছরের ৩০ ডিসেম্বর তৎকালীন সচিব রবীন্দ্র চাকমা স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে বিষয়টি নিশ্চিত করেছিলেন। উচ্চতর গ্রেডে স্বাক্ষরের মাত্র আড়াই মাসের মাথায় অর্থাৎ ১৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ তারিখে সেই একই ব্যক্তির পদোন্নতির চিঠিতে ১৪তম গ্রেডে কর্মরত দেখানো হয়েছে।
সূত্রটি জানায়, সিডিএ’র জ্যেষ্ঠতার তালিকা প্রনয়ন কমিটির আহবায়কের দায়িত্বে ছিলেন এই রবীন্দ্র চাকমা। কমিটির ৮ সদস্যের মধ্যে ৫ জন স্বাক্ষর করেছেন ১৭ ফেব্রুয়ারী আর আহবায়ক স্বাক্ষর করেছেন ১৮ ফেব্রুয়ারী। জ্যেষ্ঠতার তালিকায় আহবায়কের স্বাক্ষর করার ৩দিন আগে পদোন্নতির চিঠিতে স্বাক্ষর করা হয়েছে। যা সম্পূর্ণ অনিয়ম ও দুর্নীতির বহিঃপ্রকাশ।বিষয়টি নিছক ভুল কি না তা নিশ্চিত করতে এই আদেশ সংশোধন করে বিভাগীয় পদোন্নতি কালীন মার্কেট সুপারের পরিবর্তে সেকশান অফিসার হিসেবে বিবেচনা করার জন্য একই তারিখে চেয়ারম্যান বরাবরে একটি চিঠি দিয়েছেন সিডিএ’র সেকশন অফিসার ও আইন কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) নাছির আহাম্মদ খান। আবেদন সূত্রে জানা যায় ২০০০ সালের ২৮ জুন নাছির আহাম্মদ সরাসরি নিম্নমান সহকারী কাম মুদ্রাক্ষরিক পদে যোদান করেন। ২০০৮ সালে পদোন্নতির মাধ্যমে উচ্চমান সহকারী (ইউ.ডিএ) পদোন্নতি লাভ করলেও ২০১৯ সালে পদোন্নতি কালীন উচ্চমান সহকারী (ইউ.ডিএ) হিসাবে জ্যেষ্ঠ থাকা সত্ত্বেও সেকশান অফিসারের পদে পদোন্নতি না দিয়ে নিরাপত্তা কর্মকর্তা পদে পদায়ন করা হয়। ৭ বছর দায়িত্ব পালনের পর বিগত ২০২২ সালের ২৯ ডিসেম্বর মূলপদ কর্তন করে সেকশান অফিসার অথরাইজেশন শাখা-২ এর ভারপ্রাপ্ত হিসাবে পদায়ন করেন। ২০২৩ সালে আইন কর্মকর্তার আকস্মিক মৃত্যুতে তাকে আইন কর্মকর্তার (ভারপ্রাপ্ত) দায়িত্ব দেয়া হয়। উচ্চমান সহকারী (ইউ.ডিএ) পদে জ্যেষ্ঠ হওয়ায় বিগত ১০ বছর যাবৎ সেকশান অফিসারের দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।
সম্প্রতি পুনরায় বিভাগীয় পদোন্নতির কার্যক্রম চলমান অবস্থায় যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় সৃজিত জ্যেষ্ঠতার তালিকায় উচ্চমান সহকারী হিসাবে প্রথম অবস্থানে থাকলেও সেকশান অফিসারে পদোন্নতি না দিয়ে জুনিয়রদের ওই পদে পদোন্নতির জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে এবং সিনিয়রকে মার্কেট সুপারের পদে পদোন্নতির কথা বলা হয়েছে। বাস্তবে ওই পদটি উচ্চমান সহকারী পদের সমতুল্য। এই পদে পদায়িত করার অর্থ হলো চউক প্রবিধানমালা-১৯৯০ অনুযায়ী স্ববিরোধী কার্যক্রম যা’ আইনের পরিপন্থী।
সূত্র জানায়, নাছির খানের চিঠির কোন সুরাহা না করেই গত ১২ মার্চ এই চিঠির পরও চউকের সচিব (অতিরিক্ত দায়িত্ব) আহমেদ আনোয়ারুল নজরুল স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে তাকে মার্কেট সুপার দেখিয়ে পাহাড়তলী বদলী করা হয়েছে।
এই আদেশকে চ্যালেঞ্জ করে গত ২৫ মার্চ উচ্চ আদালতে রিট পিটিশন দায়ের করেছেন নাছির আহাম্মদ। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত এটি শুনানীর জন্য কার্যতালিকায় রাখা হয়েছে।
এবিষয়ে চউকের উচ্চমান সহকারী বর্তমানে সেকশান অফিসার ও আইন কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) নাছির আহাম্মদ খান চেয়ারম্যান বরাবরে লিখিত আবেদন ও রিট পিটিশনের বিষয়টি স্বীকার করলেও কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি।
এবিষয়ে জানতে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী নুরুল করিম ও সার্বক্ষনিক সদস্য ( অর্থ ও প্রশাসন) নুরুল্লা নুরীর অফিসে গেলেও ঢাকায় অবস্থান করার কারণে তাদের পাওয়া যায়নি। মোবাইলে কল দিলেও রিসিব করেননি।
উল্লেখ্য, একই পদোন্নতির চিঠিতে মোহাম্মদ আলমগীর খানকে ১১ তম গ্রেড থেকে সরাসরি ৯ম ও একজন নক্সাবিদকে ১৫তম গ্রেড থেকে ৯ম গ্রেডে উন্নীত করা হয়েছে। একজন মার্কেট সুপারকে ১৪তম গ্রেড থেকে ১১তম গ্রেড দিয়ে এস্টেট অফিসারে পদোন্নতি দিয়েছে আবার একজন সিনিয়র অডিট অফিসারকে ক্যাশিয়ার করা হলেও তার গ্রেডেশনের কোন পরিবর্তণ হয়নি। ২০ গ্রেডের একজন নিরাপত্তাপ্রহরীকে অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক পদে ১৬তম গ্রেড দেয়া হয়েছে অথচ ২০ গ্রেডের আরো ১৩ জন নিরাপত্তা প্রহরীকে ১৯তম গ্রেড দিয়ে প্রধান নিরাপত্তা প্রহরী করা হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী নিরাপত্তাপ্রহরী থেকে সরাসরি অফিস সহকারী পদে যাওয়ার সুযোগ নেই কিন্তু এই ক্ষেত্রে নিয়মের তোয়াক্কা না করেই তা করা হয়েছে। আবার ২০/২৫ বছর যাবৎ চাকরী করছেন এমন ব্যাক্তিকেও পদোন্নতি দেয়া হয়নি।
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নিয়োগ ও পদোন্নতি কমিটির গত ২৬ জানুয়ারী সহকারী সচিব পদে ১ জন এবং অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক পদে ১১ জন ও গত ২৮ জানুয়ারী এস্টেট অফিসার বিল্ডিং পদে ১ জন, মূল্যায়ন কর্মকর্তা পদে ১ জন, মার্কেট সুপারিনটেনডেন্ট পদে ১ জন, উচ্চমান সহকারী পদে ১ জন, ক্যাশিয়ার পদে ১ জন, অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক পদে ২ জন, পাম্প ড্রাইভার পদে ৩ জন, হেড দারোয়ান/প্রধান নিরাপত্তা প্রহরী পদে ১৩ জন এবং সহকারী স্থপতি পদে ১ জনসহ মোট ৩৬ জনকে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নিয়োগ ও পদোন্নতি কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে গত ৮ ফেব্রুয়ারী অনুষ্ঠিত সিডিএ’র ৪৬৮তম বোর্ডসভায় পদোন্নতি প্রদান করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের আলোকে ১৫ ফেব্রুয়ারী চিঠি ইস্যু করেছেন তৎকালীন সচিব রবীন্দ্র চাকমা।




