মুহাম্মদ নিযামুদ্দীন : পুরো দেশ থেকে প্রাজ্ঞ ও প্রাগ্রসর মানুষদের প্রবল প্রতিবাদের মুখে অবশেষে স্থগিত করা হয়েছে ২০২৪-এর জন্য ঘোষিত বাংলা একাডেমির বিতর্কিত সাহিত্য পুরস্কার। প্রতিবছরই বাংলা একাডেমির পুরস্কার নিয়ে এরকম বিতর্ক সৃষ্টি হয় এবং একাডেমি ও পুরস্কার প্রদানের প্রক্রিয়া নিয়ে মানুষের মনে একধরণের নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টি হয়। এ ধরণের বিতর্ক বহু বছর আগে থেকেই হয়ে আসছে। যখন বারবার এধরণের বিতর্ক হয়ে আসছে, তখন বুঝতে হবে পুরো প্রক্রিয়াতেই কোনো প্রহসন লুকিয়ে আছে। বাছাই প্রক্রিয়া ও বিচার প্রক্রিয়ায় যদি না থাকে সততা, স্বচ্ছতা, দলনিরপেক্ষতা ও দৃঢ়তা এবং সাহিত্যের প্রতি অকৃত্রিম মমত্ববোধ, তাহলে কখনোই হবেনা এহেন অনাকাঙ্ক্ষিত অবস্থা রোধ।

পুরস্কার কোনো খারাপ জিনিস নয়। সৃষ্টিশীল লেখকরা যখন তাদের অবদানের জন্য পুরস্কার পান, তখন একদিকে তারা প্রতিভার স্বীকৃতি ও সম্মান যেমন পান, অন্যদিকে আনন্দও পান। এই স্বীকৃতি ও আনন্দ তাঁদেরকে আরো উন্নত কিছু লিখতে উৎসাহ ও উদ্দীপনা প্রদান করে। কিন্তু যিনি প্রকৃত লেখক তিনি কখনো পুরস্কারের জন্য লিখেননা। আর যিনি পুরস্কার পাওয়ার জন্য লিখেন, তিনি তখন প্রকৃত লেখক থাকেননা। পরাজিত লেখকের কাতারে সামিল হয়ে যান।

আজকাল পুরস্কার নিয়ে যতোটা বিতর্ক দেখা যায়, একসময় পুরস্কারের প্রক্রিয়াটি কিছুটা হলেও পরিষ্কার ছিলো। কিছুটা বিতর্ক থাকলেও গাধাকে ঘোড়া বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা ছিলোনা। এ প্রসঙ্গে লিখতে গিয়ে সৈয়দ আবুল মকসুদ তাঁর ‘বাঙালি মুসলমানের বুদ্ধিবৃত্তিক বিভ্রম ও বিশ্বাসহীনতা’ শীর্ষক লেখার একস্থানে লিখেছেন, “ষাটের দশকে পদক-পুরস্কার-খেতাব যাঁরা পেয়েছেন তাঁরা কেউই অযোগ্য ব্যক্তি নন। তাঁদের প্রত্যেকেরই কম-বেশি নিজ নিজ ক্ষেত্রে কাজ রয়েছে।”(সুত্র- দৈনিক যুগান্তর, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৬)।

কথায় আছে- গেছে যে দিন, ভালো ; আসছে দিন খারাপ। এক সময় খারাপ এসে সাহিত্য জগতকেও কলুষিত করতে থাকে। ব্যবসায়ীদের মতো লাভ আর লোভের চিন্তা লেখকদেরকেও পেয়ে বসে। লজ্জা- শরমের মাথা খেয়ে লেখকরাও পদ, পদক, পয়সা ও পুরস্কারের পেছনে দৌঁড়াতে থাকেন। এ প্রসঙ্গে লিখতে গিয়ে কবি আবু হাসান শাহরিয়ার তাঁর ‘সমাত্মজীবনী’ (প্রকাশ- আগস্ট ২০০৪, সাহিত্যবিকাশ, বাংলাবাজার, ঢাকা)-এর একস্থানে লিখেছেন, “লেখালেখি একটা ম্যারাথন দৌঁড়। কিন্তু বাংলাদেশের কবি-লেখকদের অধিকাংশই ১০০ মিটার দৌঁড়বিদ; – এক দৌঁড়েই নাম-যশ-পদক পুরস্কার নিয়ে বাড়ি ফিরতে চান। যত না লেখায়, তার চেয়ে ঢের বেশি সময় দেন তারা প্রচারপটুতায়।”(পৃ-২২)।

নির্মলেন্দু গুণের অনেক গুণ। একটি গুণ হলো- তিনি একজন পাওয়ারফুল কবি। অন্য একটি গুণ হলো- তিনি পাওয়ারফুল কবির পাশাপাশি পাওয়ার জন্যও পাগল। প্রতিভার স্বীকৃতি হিসেবে পদক পুরস্কার তিনি কম পাননি, তারপরও পাওয়ার প্রত্যাশা তিনি কখনো ছাড়েননি। রীতিমত চেয়েও বসেছেন! এ প্রসঙ্গে লিখতে গিয়ে প্রখ্যাত সাংবাদিক মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর (নোবেলজয়ী ড. ইউনুসের ছোট ভাই এবং এখন প্রয়াত) তাঁর ‘চট্টগ্রাম. কম’ শীর্ষক সম্পাদকীয় কলামের একস্থানে লিখেছেন,”খ্যাতনামা কবি নির্মলেন্দু গুণ তাঁর জন্যে ‘স্বাধীনতা পদক’ চেয়ে নানা মহলে সমালোচিত হয়েছেন। খুব ভালো লেগেছে, মানুষ এখনো ভুল কাজটির সমালোচনা করছেন দেখে। যদিও সমালোচনার যোগ্য অনেক কাজ হারিয়ে যায়। নির্মলেন্দু গুণ ঠিক ধরা পড়েছেন।”(দৈনিক আজাদী, ৫ এপ্রিল ২০১৬ চট্টগ্রাম )। এরপর তিনি আরো লিখেছেন, “পদক বা পুরস্কার যাঁরা চেয়ে নেন তাঁদের আত্মসম্মান বোধ বলতে কিছু নেই। আমরা জানি, অনেকে সরকারি পদক বা পুরস্কারের জন্য তদবীর করেন। এটাও নিন্দনীয়। আমার ধারণা, বাংলাদেশে সরকারি পদক বা পুরস্কার কারো বিশেষ সম্মান বৃদ্ধি করেনা। যাঁরা প্রকৃত গুণী তাঁরা এমনিতেই শ্রদ্ধেয় ও সম্মানিত।”

২০২০ সালের ০১ মে শুক্রবার কবি নির্মলেন্দু গুণ নিজেকে সরাসরি আওয়ামী লীগের কবি হিসেবে দাবি করে একটি দীর্ঘ স্ট্যাটাস দেন নিজের ফেসবুকে। দাবির সপক্ষে বলতে গিয়ে তিনি লিখেন, “একটা জিনিশ স্পষ্ট হওয়া দরকার। যদিও আমি সরাসরি আওয়ামী লীগ বা অন্য কোনো রাজনৈতিক দল করিনা – কিন্তু আমি মূলত আওয়ামী লীগেরই কবি।” দীর্ঘ ঐ স্ট্যাটাসের একস্থানে তিনি আরো লিখেন, “আমার কাছ থেকে নিরপেক্ষ অবস্থান যারা আশা করে, তারা মতলববাজ।” ফেসবুকে প্রকাশ করা তাঁর ঐ দীর্ঘ বয়ান অনলাইন মিডিয়া be.bangla.report সহ বিভিন্ন মিডিয়ায় তখন প্রকাশিত হয়েছিলো এবং ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি করেছিলো। তখন তারই প্রতিক্রিয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে আমি একটি পদ্য লিখেছিলাম এবং প্রকাশ করেছিলাম উক্ত সালের ৩ মে তারিখে – নিজের ফেসবুকে। অতি অল্পসময়ের মধ্যে লেখা আমার পদ্য-প্রতিক্রিয়াটি ছিলো নিম্নরূপ-
কবি কখনো দলের হয়না
কবি হয় দিলের,
কবি কখনো কিলের হয়না
কবি হয় মিলের।
কবি কখনো মূলার হয়না
কবি হয় মূলের,
কবি কখনো ভুলের হয়না
কবি হয় ফুলের।
দলকানা কবি দৃষ্টি দোষে
দেখেনা পেছন আগ,
নিজের পায়ে কুঠার মারে
গুণ হয়ে যায় ভাগ!

নির্মলেন্দু গুণ তাঁর উক্ত পোস্টে তাঁকে যে সময়ে স্বাধীনতা পুরস্কার প্রদান করা হয়েছে, সেটাকে ‘অহেতুক বিলম্ব’ বলেও উল্লেখ করেছেন! যেন সেটা তাঁর পৈত্রিক সম্পত্তি, কিংবা ব্যাংকে গচ্ছিত টাকা! একজন লোক পাওয়ার জন্য কতটা পাগল, কতটা ব্যাকুল হলে ‘অহেতুক বিলম্ব’ কথাগুলো ব্যাবহার করতে পারে! উক্ত পোস্টে তিনি লিখেছেন, “আবার আমাকে স্বাধীনতা পুরস্কার প্রদানে অহেতুক বিলম্ব করার জন্য বিরক্তি ও ক্ষোভ প্রকাশ করে ফেইসবুকে লিখেছিও। একটু বিলম্ব হলেও বঙ্গবন্ধুকন্যা, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমার দাবির যৌক্তিকতা অনুধাবন করে আমাকে পুরস্কৃত করেছেন। তাতে আমি খুশি হয়েছি, সম্মানিত বোধ করেছি।” ২৪ মে ২০২৩ আরেকটি পোস্টে নির্মলেন্দু গুণ লিখেছেন, “বিশ্ববিদ্যালয় তো হলো শেখ হাসিনার নামে। নেত্রকোনা সরকারী কলেজটা আমার নামে হইলে কেমন হয়? আমি তো ঐ কলেজের ভালো ছাত্র ছিলাম। শিক্ষামন্ত্রী ডাক্তার দীপু মনি, আপনি এইমর্মে সাহস করে একটা প্রস্তাব উত্থাপন করুন, আশা করি মাননীয়া প্রধানমন্ত্রী মেনে নিবেন। আপনারা দু’জনই তো জনসমাবেশে আমার কবিতা পড়েন। তাই না? সমস্যা কী?”

একজন কবি হবেন দেশের ও দশের, তাঁর চিন্তা ও কর্মে থাকবে সবার প্রতি সাম্য। তবেই তো রক্ষা পাবে ভারসাম্য, যা সবারই কাম্য। কিন্তু আফসোস, নির্মলেন্দু গুন পারেননি দলীয় দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে যেতে। তিনি সবসময় ছিলেন একটি দলের অন্ধ অনুগত হিসেবে মেতে। তার প্রমাণও পাওয়া যায় তাঁর লেখনীতে। একজন কবি বা লেখকের কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি সমর্থন, কিংবা আত্মার বন্ধন থাকতেই পারে। কিন্তু তাই বলে নিজের সমর্থক দল ক্ষমতায় গেলে ঐ দলের বিপুল কর্মীবাহিনীর ওপর দেশকে শাসন করার দায়িত্ব তুলে দেওয়ার মতো দায়িত্বহীন কথা কি কেউ বলতে পারে? ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা যখন ক্ষমতায় আসেন, নির্মলেন্দু গুণ তাঁর ‘নির্গুণের জার্নাল’ শীর্ষক একটি কলামে শেখ হাসিনাকে প্রশংসার প্লাবনে ভাসিয়ে লিখেন,”আমরা দলীয়করণের অতীত তিক্ত অভিজ্ঞতার আলোকে – দলীয়করণের যে একটি ভালো দিক রয়েছে, থাকে, থাকতে পারে, থাকা সম্ভব, সেই ভালো দিকটাকে আমরা একেবারেই বিবেচনায় আনছি না। ক্ষমতায় বসার পর বিরোধীদলকে তুষ্ট করার জন্য আমরা যদি আমাদের দলের কর্মীদের সংগে দূরত্ব সৃষ্টি করি, যদি তাদের পরিহার করে পথ চলার চেষ্টা করে কোনো অনন্য নজির স্থাপন করতে চাই – তাতে কার লাভ? জনগণ তো শুধু ঐ দলের কতিপয় নেতা বা নেত্রীর ওপরই আস্থা স্থাপন করেনি – ভোটের মাধ্যমে জনগণ দেশকে শাসন করার দায়িত্ব ঐ দলের বিপুল কর্মীবাহিনীর ওপরই ন্যাস্ত করে। আমরা জনগণের রায়ের এই দিকটাকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করছি বলেই আমার আশংকা।…ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলগুলো তাদের বিপুল কর্মীবাহিনীকে যদি অল্পমূল্যে ক্ষমতার স্বাদ দিতে পারে তবে আমার মনে হয়, তাতে দেশ ও জাতির লাভ হবে।…রাজনীতি করাটাকে যখন একটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় কর্ম বলেই সমাজ বিবেচনা করে সেহেতু – এইখাতে রাষ্ট্রের বাৎসরিক বাজেটেও একটা থোক অর্থ বরাদ্দ রাখা যায়।”(দৈনিক বাংলাবাজার পত্রিকা, ২৭ সেপ্টেম্বর ১৯৯৬)। নির্মলেন্দু গুণ যেহেতু ঐ দলের নুন খেয়েছেন, গুণও গাইবেন স্বাভাবিক কথা। কিন্তু গুণ গাইতে গিয়ে এভাবে বিবেককে খুন করে ফেলবেন, সেটা কেউ কল্পনাও করেনি। কেননা দলীয় লোকদেরকে ক্ষমতার স্বাদ দেওয়া, নানানরকম সুবিধা দেওয়া তো কোটারই নামান্তর। আর কে না জানে, কোটা যে যোগ্যতা ও মেধার মাপকাঠি নয়! সেজন্যই তো ২০২৪ সালে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনটা হয়ে গেলো বাংলাদেশে। স্বৈরাচার দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হলো চোরের বেশে!

কবি নির্মলেন্দু গুণ প্রথম শ্রেণির মুজিব প্রেমিক সন্দেহ নেই। মুজিব বন্দনায় তিনি বহু বিখ্যাত কবিতাও রচনাও করেছেন। তার পুরস্কারও পেয়েছেন তিনি হাতে নাতে। শুধু কি তাই? রাষ্ট্রিয় খরচে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে নিউইয়র্কে অবস্থিত জাতিসংঘের অধিবেশনে অংশগ্রহণের দুর্লভ সূযোগও পেয়েছিলেন। তাই বলে কি ভাসানীকে মুজিবের বিরোধী ধারার বলে চিত্রিত ও চিহ্নিত করতে হবে? কিন্তু নির্মলেন্দু গুণ তাঁর ‘নির্গুণের জার্নাল’-এ ভাসানীকে ঐ ভিন্নধারার বলে চিত্রিত ও চিহ্নিত করতে চুল পরিমাণ ভুল করেননি। তিনি লিখেছেন, “তারা ভাবতো ভারত সবসময়ই বাংলাদেশকে শোষণ করার তালে থাকবে এবং আমাদের সঙ্গে বড় ভাই সুলভ আচরণ করবে। তাকে কোনো অবস্থাতেই বিশ্বাস করা যায় না। ভারতকে শক্তির মাধ্যমে মোকাবিলা করার প্রস্তুতি আমাদের থাকা দরকার। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতা করলেও, ভবিষ্যতের কথা ভেবেই আমাদের উচিৎ মুসলিম উম্মার সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক সুদৃঢ় করা। ভারতকে চাপের মধ্যে রাখার জন্য একদলশাসিত, নাস্তিকের দেশ কমিউনিস্ট চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নতি করা দরকার।…মৌলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ছিলেন ঐ ধারার সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা। তিনি খুব চমৎকার ভাষায় সাম্প্রদায়িক চুলকানিযুক্ত ভারতবিরোধী বক্তব্য প্রদান করতে পারতেন।… মিত্রবাহিনী হিসেবে আমাদের সঙ্গে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে মুক্তিযুদ্ধে প্রাণ দেবার জন্য ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের পরিবর্তে তিনি বলতেন, ভারতীয় সেনাবাহিনী বাংলাদেশে ঢুকে আমাদের হাজার-হাজার কোটি টাকার সম্পদ লুট করে নিয়ে গেছে। সে কারণেই বাংলাদশের এই দুর্দশা। ৭৪-এর এই দুর্ভিক্ষ।”(দৈনিক বাংলাবাজার পত্রিকা, ৬ ডিসেম্বর ১৯৯৬)। মওলানা ভাসানীর ভারতবিরোধীতার পেছনে কারণ ছিলো। তিনি মনে করতেন, আমরা পিন্ডির প্রভুত্বকে প্রত্যাখ্যান করেছি দিল্লির দাসত্ব করার জন্য নয়। একজন দেশপ্রেমিক স্বাধীনচেতা মানুষের মনোভাব এমনটাই হওয়া উচিত। সেদিক থেকে মওলানা ভাসানীর ভাবনা কি ভুল ছিলো? অবশ্যই না। ভারতও প্রমাণ করতে পারেনি সে আমাদের বন্ধু। সে সর্বক্ষেত্রে বাংলাদেশেকে শোষণ করেছে এবং একটি গোলাম রাষ্ট্রে পরিণত করার চেষ্টা করেছে। ভারতীয় সেনাবাহিনী যে লুট করেছে, সেকথা কি কেউ অস্বীকার করতে পারবে? ভারতীয় লুটপাটে বাঁধা দিয়েছিলেন বলেই তো মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার মেজর জলিলকে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম জেলে যেতে হয়েছিলো। তাঁর বইতেও আছে সেই বয়ান। তাঁর একটি বইয়ের নামই তো ‘অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা’! নয় কি? মেজর জলিল, মওলানা ভাসানীর মতো দেশপ্রেমিকরা ভারতের চাণক্য নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন বলেই তো বাংলাদেশকে সিকিম বানাবার ভারতীয় চেষ্টা বারবার ব্যর্থ হয়েছে। তার উজ্জ্বল উদাহরণ – ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক জুলাই জাগরণ। মওলানার ভারতবিরোধীতা যে ছিলোনা অকারণ, তা ফের প্রমাণ করেছে বাংলাদেশের বিপ্লবী জনগণ। ভাসানী একসময় পাকিস্তানি শোষকদের সাথে করেননি আপোষ, বলিষ্ঠ কন্ঠে বলেছিলেন ‘খামোশ’ ; তেমনি ভারতকেও দিয়েছিলেন শাসানী। তাতে নির্মলেন্দু গুণের কেন এত চুলকানি? অন্নদাশঙ্কর রায় তাঁর এক ছড়ায় লিখেছেন-
দিল্লীকে দেন শাসানি
মহান নেতা ভাসানী
অন্তরে নেই দুঃখ লেশ
অপাঙক্তেয় বাংলাদেশ।

গুণ আরো লিখেছেন, “আমি মনে করি, ৭১-পরবর্তী বাংলাদেশে মৌলানা ভাসানী সাহেবই ‘প্রগতিশীল সাম্প্রদায়িকতা’র জন্ম দিয়েছিলেন। আমি এও মনে করি যে, ঐ প্রগতিশীল সাম্প্রদায়িকতাকে সেদিন শুরুতেই শক্ত হাতে মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুর সরকার।” (দৈনিক বাংলাবাজার পত্রিকা, ৬ ডিসেম্বর ১৯৯৬)। কোনো একজন লোক স্বধর্মের লোকদেরকে ভালোবাসতেই পারেন, তাই বলে কি তিনি সাম্প্রদায়িক হয়ে যাবেন? গান্ধিও তো হিন্দুদেরকে ভালোবাসতেন, হিন্দু ধর্ম নিয়ে লিখেছেন বই। সে সম্পর্কে গুণের মন্তব্য কই? ভাসানীকে যারা ভালোবাসতেননা, তারাও এই অপবাদ দেননি যে, ভাসানী সাম্প্রদায়িক ছিলেন। অথচ তাঁকেই কিনা গুন বানিয়ে ফেললেন ভিলেন! কবি অসীম সাহারও নেই ভুল। তিনিও ‘স্বাধীনতা পদক’ পাওয়ার জন্য ছিলেন অত্যন্ত ব্যাকুল! ফেসবুকে প্রদত্ত এক পোস্টে তিনিও লিখেছিলেন, “জীবিত থাকতে আমাকে ‘স্বাধীনতা পদক’ না দিলে কোনো অবস্থাতেই যেন দেয়া না হয়। আমার পরিবারের কেউ যেন তা গ্রহণও না করে!”

এবার বাংলা একাডেমি পুরস্কার প্রসঙ্গে করা যাক প্রত্যাবর্তন। কেননা বিষয়টি গোটা বঙ্গদেশে বিতর্কের তুঙ্গে এখন। বিতর্কের পেছনে আছেও বহু কারণ। সেই কারণ নিয়ে কথা বলতে নেই বারণ। কারণ আর কিছু নয় – এই পুরস্কার নিয়ে প্রতিবছর হয় নয়ছয়। অর্থাৎ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, যারা যোগ্য নয় তারা এই পুরস্কার পায়, আর যারা যোগ্য তারা থাকেন উপেক্ষার উপত্যকায়। পুরস্কার প্রদানের পুরো প্রক্রিয়াতেই রয়েছে গলদ। তাইতো হায় পুরস্কার প্রদানের বেলায় প্রতি বছর প্রাধান্য পায় বলদ! এ প্রসঙ্গে লিখতে গিয়ে ফরিদ কবির তাঁর ‘বাংলা একাডেমীকে নিয়ে দুটো কথা বলতেই হচ্ছে’ শীর্ষক লেখার একস্থানে লিখেছেন, “শিল্প-সাহিত্যের জন্য যে ভয়ংকর ক্ষতিকর কাজটি এটি বছরের পর বছর করে চলেছে, সেটির নাম ‘বাংলা একাডেমী পুরস্কার’।…গত তিন দশক ধরে হাতে গোনা কয়েকটি উদাহরণ বাদে প্রায় সব পুরস্কার গেছে ভুল লোকদের ঝুলিতে।…একাডেমীর মহাপরিচালক, একাডেমীর ফেলোরা জানেন কিনা আমার জানা নেই, কিন্তু দেশের একজন সাধারণ পাঠকও এখন জেনে গেছেন, একাডেমী পুরস্কার পাওয়া যায় না, তা নিতে হয়। প্রতি বছরই কিছু লেখক-কবি তৎপর হয়ে ওঠেন পুরস্কারটি হাতিয়ে নেয়ার জন্য। এবং কয়েকজন তাতে সফল হন। যারা পুরস্কার পান, সাধারণ পাঠকরা, বিশেষত, রাজধানীর বাইরের তরুণ লেখক-কবিরা এতে প্রতারিত হন। কারণ তাদের কাছে এরাই বাংলাদেশের সাহিত্যের ‘আইকন’ হয়ে ওঠেন। কিন্তু ধীরে ধীরে তারা উপলব্ধি করতে পারেন এইসব একাডেমী পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক-কবিদের লেখায় কোনো ‘বিশেষ’ কিছু নেই, তারা একেবারেই সাধারণ মানের।” ( দ্র- নতুনধারা, ১৫ মার্চ ২০১১, ঢাকা ; অতিথি সম্পাদকঃ ফরিদ কবির, সম্পাদকঃ নাঈমুল ইসলাম খান)। একই কাগজের একই সংখ্যায় “পুরস্কারটা যদি ‘পরিষ্কার’ হতো!” শিরোনামের লেখার একস্থানে সৈকত হাবিব লিখেছেন, “এজন্যই দেখা যায় এমন সব ব্যক্তি বাংলা একাডেমী পুরস্কার পেয়েছেন যাদের রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তির ‘যোগ্যতা’ সাহিত্যের যোগ্যতার চেয়ে অনেক বেশি।…ইদানীং এও শোনা যাচ্ছে, বাংলা একাডেমী পুরস্কারের পেছনে একটি সিন্ডিকেট কাজ করছে, যারা কোনো-না-কোনোভাবে প্রতি বছরই নিজেদের লোকদের পুরস্কার পাইয়ে দিতে তৎপর থাকে এবং যথেষ্ট সফলতাও পেয়ে থাকে। সম্ভবত এসবের পেছনে আছে পুরস্কার প্রদানের অপরিষ্কার নীতি ও অস্বচ্ছতা।” একই সংখ্যায় ‘বাংলা একাডেমী কী বস্তু?’ শিরোনামের লেখায় জাহেদ সরওয়ার লিখেছেন, “তবে সবচাইতে বিভ্রান্তিকর যে কাজটা এই একাডেমী করিয়া আসিতেছে তাহা হইল ইহার নামে প্রচলিত পুরস্কার। ক্ষমতাদলীয় ক্যাডাররা দীর্ঘদিন ধরিয়া এই পুরস্কার আলোকিত করিয়া আসিতেছে নিজেদের। তবে এটার পাশাপাশি ওরা চালাকি করিয়া কিছু বাতিল বুড়োদেরও সাথে জুড়ে দেয়। যাহাতে তাহারা বলিতে পারে একাডেমী শুদ্ধ। সরকারদলীয় ক্যাডারদেরকেই পুরস্কৃত করে না অভাবী বুড়োদেরও পুরস্কৃত করিয়া থাকে। মোট কথা কোনো ক্ষেত্রে বাংলা একাডেমী কোনো মৌলিক মানুষকেই পুরস্কৃত করে নাই।”

এ প্রসঙ্গে আহমদ ছফার কিছু বক্তব্য পেশ করা প্রাসঙ্গিক মনে করছি। বাংলা একাডেমী পুরস্কারের চেয়ে বড় কোনো পুরস্কার যদি বাংলাদেশে থাকতো, তা পাওয়ার পক্ষে আহমদ ছফার যোগ্যতা বা প্রতিভা ছিলো তার চেয়েও বহু বহুগুণ বেশি। তাঁর যারা শত্রু, তারাও একবাক্যে স্বীকার করবেন, তিনি কখনো পুরস্কারের প্রত্যাশায় লিখতেন না, লালায়িতও ছিলেন না। তারপরও দুঃখজনক ও দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, স্পষ্ঠবাদী স্বভাবের কারণে তিনি বাংলা একাডেমী পুরস্কার থেকে বঞ্চিত ছিলেন। দিলেও আপোষহীন স্বভাবের কারণে তিনি নিতেন কিনা সন্দেহ! অবশ্য, পুরস্কার প্রদানের চেষ্টা যে ছিলোনা তাও কিন্তু নয়। তবে সেটা মূল বাংলা একাডেমী পুরস্কার ছিলোনা, সেটা ছিলো

একটি পার্শ্ব পুরস্কার – সা’দত আলি আখন্দ সাহিত্য পুরস্কার। ১৯৯২ সালের ২০ মে একাডেমীর মহাপরিচালক সেকথা জানিয়ে তাঁকে একটি চিঠিও দেন। কিন্তু এরি মধ্যে একটি ঘটনা ঘটে যায়। উক্ত সালের ২৮ মে দৈনিক ভোরের কাগজ পত্রিকার ‘সংস্কৃতি সংবাদ’ বিভাগে ‘আমাকে কেন পুরস্কার দিল’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনটি লিখেন সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল। প্রতিবেদনটিতে আহমদ ছফার বয়ান থেকে উদ্বৃতি দিয়ে লেখা হয়, “এম. আর. আখতার মুকুলের পিতার নামানুসারে বাংলা একাডেমী যে পুরস্কার প্রদান করেন সে পুরস্কার এ বছর পেয়েছেন আহমদ ছফা। এ ব্যাপারে তাঁকে অভিনন্দন জানাতেই বললেন, ‘অভিনন্দন ফিরিয়ে নাও, কারণ আমি ওই পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করব। ওরা যদি আমাকে একটা বক্তৃতা দিতে দেয় এবং তা ওদের কাগজে ছাপে তাহলে পুরস্কার নেব, নইলে নয়। বাংলা একাডেমি মায়ের মতো, আমি বাংলা একাডেমিকে শ্রদ্ধা করি। কিন্তু বাংলা একাডেমির লোকজন অদ্ভুত জীব। মদ সিগারেট না খাওয়ালে ওরা পুরস্কার দেয় না। আমি তো তা করিনি, তবু তারা আমাকে কেন পুরস্কার দিল’?” (দ্র- প্রাপক আহমদ ছফা, আহমদ ছফাকে লেখা চিঠিপত্রের সংকলন, সংগ্রহ ও সম্পাদনা- নূরুল আনোয়ার, প্রকাশক- খান ব্রাদার্স অ্যান্ড কোম্পানি, ঢাকা)। প্রতিবেদনটি পত্রিকায় প্রকাশের পর বাংলা একাডেমীর তৎকালীন মহাপরিচালক এক পত্রে আহমদ ছফাকে লিখেন, “বাংলা একাডেমি সম্পর্কে এটি গুরুতর অভিযোগ, যা তাৎক্ষণিকভাবে যথাযথ তদন্তের দাবি রাখে। অতএব আপনি সত্যি সত্যি এ ধরনের কোনো উক্তি করেছেন কি না, তা প্রত্যায়ন না করা পর্যন্ত আমাদের পক্ষে তদন্তকার্য হাতে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।”(ঐ)। উক্ত পত্রের উত্তরে বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালকের বরাবরে লেখা এক পত্রে আত্মপক্ষ সমর্থন করে আহমদ ছফা লিখেন, “আমি উদ্যোগী হয়ে ওই পত্রিকায় কিছু বলিনি। একটি গ্রন্থ প্রকাশ অনুষ্ঠান উপলক্ষে আমাকে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে যেতে হয়েছিল। সেখানে জনাব সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল আমার সঙ্গে পুরস্কারের ব্যাপারে আলাপ করছিলেন। তিনি যে সংবাদপত্রের লোক সেই ব্যাপারে আমি কিছু জানতাম না। তথাপি সংবাদপত্রে আমার বরাত দিয়ে প্রতিবেদনটি যখন প্রকাশিত হয়েছে, আমার বক্তব্য উদ্ধৃত করার ক্ষেত্রে কিছুটা হেরফের ঘটে গেলেও বক্তব্যের মর্মার্থের দায়দায়িত্ব আমি অস্বীকার করব না।”(ঐ)।

উপরের উক্তি ও উদ্ধৃতি থেকে কি এটা উপলব্ধি করা যায়না যে, বাংলা একাডেমী প্রতিবছর করে যে সাহিত্য পুরস্কার প্রদান – বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তা করেনা বহন যোগ্যতা ও প্রতিভার প্রমাণ। অতএব কথা পরিষ্কার – অবিলম্বে পুরস্কার প্রদানের পুরো প্রক্রিয়ায় সংস্কার তথা সচ্চতা ও সততা আনা দরকার, যাতে বাংলা একাডেমীর প্রতি মানুষের আস্থা ফিরে আসে আবার।

মুহাম্মদ নিযামুদ্দীন : পুরো দেশ থেকে প্রাজ্ঞ ও প্রাগ্রসর মানুষদের প্রবল প্রতিবাদের মুখে অবশেষে স্থগিত করা হয়েছে ২০২৪-এর জন্য ঘোষিত বাংলা একাডেমির বিতর্কিত সাহিত্য পুরস্কার। প্রতিবছরই বাংলা একাডেমির পুরস্কার নিয়ে এরকম বিতর্ক সৃষ্টি হয় এবং একাডেমি ও পুরস্কার প্রদানের প্রক্রিয়া নিয়ে মানুষের মনে একধরণের নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টি হয়। এ ধরণের বিতর্ক বহু বছর আগে থেকেই হয়ে আসছে। যখন বারবার এধরণের বিতর্ক হয়ে আসছে, তখন বুঝতে হবে পুরো প্রক্রিয়াতেই কোনো প্রহসন লুকিয়ে আছে। বাছাই প্রক্রিয়া ও বিচার প্রক্রিয়ায় যদি না থাকে সততা, স্বচ্ছতা, দলনিরপেক্ষতা ও দৃঢ়তা এবং সাহিত্যের প্রতি অকৃত্রিম মমত্ববোধ, তাহলে কখনোই হবেনা এহেন অনাকাঙ্ক্ষিত অবস্থা রোধ।

পুরস্কার কোনো খারাপ জিনিস নয়। সৃষ্টিশীল লেখকরা যখন তাদের অবদানের জন্য পুরস্কার পান, তখন একদিকে তারা প্রতিভার স্বীকৃতি ও সম্মান যেমন পান, অন্যদিকে আনন্দও পান। এই স্বীকৃতি ও আনন্দ তাঁদেরকে আরো উন্নত কিছু লিখতে উৎসাহ ও উদ্দীপনা প্রদান করে। কিন্তু যিনি প্রকৃত লেখক তিনি কখনো পুরস্কারের জন্য লিখেননা। আর যিনি পুরস্কার পাওয়ার জন্য লিখেন, তিনি তখন প্রকৃত লেখক থাকেননা। পরাজিত লেখকের কাতারে সামিল হয়ে যান।

আজকাল পুরস্কার নিয়ে যতোটা বিতর্ক দেখা যায়, একসময় পুরস্কারের প্রক্রিয়াটি কিছুটা হলেও পরিষ্কার ছিলো। কিছুটা বিতর্ক থাকলেও গাধাকে ঘোড়া বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা ছিলোনা। এ প্রসঙ্গে লিখতে গিয়ে সৈয়দ আবুল মকসুদ তাঁর ‘বাঙালি মুসলমানের বুদ্ধিবৃত্তিক বিভ্রম ও বিশ্বাসহীনতা’ শীর্ষক লেখার একস্থানে লিখেছেন, “ষাটের দশকে পদক-পুরস্কার-খেতাব যাঁরা পেয়েছেন তাঁরা কেউই অযোগ্য ব্যক্তি নন। তাঁদের প্রত্যেকেরই কম-বেশি নিজ নিজ ক্ষেত্রে কাজ রয়েছে।”(সুত্র- দৈনিক যুগান্তর, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৬)।

কথায় আছে- গেছে যে দিন, ভালো ; আসছে দিন খারাপ। এক সময় খারাপ এসে সাহিত্য জগতকেও কলুষিত করতে থাকে। ব্যবসায়ীদের মতো লাভ আর লোভের চিন্তা লেখকদেরকেও পেয়ে বসে। লজ্জা- শরমের মাথা খেয়ে লেখকরাও পদ, পদক, পয়সা ও পুরস্কারের পেছনে দৌঁড়াতে থাকেন। এ প্রসঙ্গে লিখতে গিয়ে কবি আবু হাসান শাহরিয়ার তাঁর ‘সমাত্মজীবনী’ (প্রকাশ- আগস্ট ২০০৪, সাহিত্যবিকাশ, বাংলাবাজার, ঢাকা)-এর একস্থানে লিখেছেন, “লেখালেখি একটা ম্যারাথন দৌঁড়। কিন্তু বাংলাদেশের কবি-লেখকদের অধিকাংশই ১০০ মিটার দৌঁড়বিদ; – এক দৌঁড়েই নাম-যশ-পদক পুরস্কার নিয়ে বাড়ি ফিরতে চান। যত না লেখায়, তার চেয়ে ঢের বেশি সময় দেন তারা প্রচারপটুতায়।”(পৃ-২২)।

নির্মলেন্দু গুণের অনেক গুণ। একটি গুণ হলো- তিনি একজন পাওয়ারফুল কবি। অন্য একটি গুণ হলো- তিনি পাওয়ারফুল কবির পাশাপাশি পাওয়ার জন্যও পাগল। প্রতিভার স্বীকৃতি হিসেবে পদক পুরস্কার তিনি কম পাননি, তারপরও পাওয়ার প্রত্যাশা তিনি কখনো ছাড়েননি। রীতিমত চেয়েও বসেছেন! এ প্রসঙ্গে লিখতে গিয়ে প্রখ্যাত সাংবাদিক মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর (নোবেলজয়ী ড. ইউনুসের ছোট ভাই এবং এখন প্রয়াত) তাঁর ‘চট্টগ্রাম. কম’ শীর্ষক সম্পাদকীয় কলামের একস্থানে লিখেছেন,”খ্যাতনামা কবি নির্মলেন্দু গুণ তাঁর জন্যে ‘স্বাধীনতা পদক’ চেয়ে নানা মহলে সমালোচিত হয়েছেন। খুব ভালো লেগেছে, মানুষ এখনো ভুল কাজটির সমালোচনা করছেন দেখে। যদিও সমালোচনার যোগ্য অনেক কাজ হারিয়ে যায়। নির্মলেন্দু গুণ ঠিক ধরা পড়েছেন।”(দৈনিক আজাদী, ৫ এপ্রিল ২০১৬ চট্টগ্রাম )। এরপর তিনি আরো লিখেছেন, “পদক বা পুরস্কার যাঁরা চেয়ে নেন তাঁদের আত্মসম্মান বোধ বলতে কিছু নেই। আমরা জানি, অনেকে সরকারি পদক বা পুরস্কারের জন্য তদবীর করেন। এটাও নিন্দনীয়। আমার ধারণা, বাংলাদেশে সরকারি পদক বা পুরস্কার কারো বিশেষ সম্মান বৃদ্ধি করেনা। যাঁরা প্রকৃত গুণী তাঁরা এমনিতেই শ্রদ্ধেয় ও সম্মানিত।”

২০২০ সালের ০১ মে শুক্রবার কবি নির্মলেন্দু গুণ নিজেকে সরাসরি আওয়ামী লীগের কবি হিসেবে দাবি করে একটি দীর্ঘ স্ট্যাটাস দেন নিজের ফেসবুকে। দাবির সপক্ষে বলতে গিয়ে তিনি লিখেন, “একটা জিনিশ স্পষ্ট হওয়া দরকার। যদিও আমি সরাসরি আওয়ামী লীগ বা অন্য কোনো রাজনৈতিক দল করিনা – কিন্তু আমি মূলত আওয়ামী লীগেরই কবি।” দীর্ঘ ঐ স্ট্যাটাসের একস্থানে তিনি আরো লিখেন, “আমার কাছ থেকে নিরপেক্ষ অবস্থান যারা আশা করে, তারা মতলববাজ।” ফেসবুকে প্রকাশ করা তাঁর ঐ দীর্ঘ বয়ান অনলাইন মিডিয়া be.bangla.report সহ বিভিন্ন মিডিয়ায় তখন প্রকাশিত হয়েছিলো এবং ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি করেছিলো। তখন তারই প্রতিক্রিয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে আমি একটি পদ্য লিখেছিলাম এবং প্রকাশ করেছিলাম উক্ত সালের ৩ মে তারিখে – নিজের ফেসবুকে। অতি অল্পসময়ের মধ্যে লেখা আমার পদ্য-প্রতিক্রিয়াটি ছিলো নিম্নরূপ-
কবি কখনো দলের হয়না
কবি হয় দিলের,
কবি কখনো কিলের হয়না
কবি হয় মিলের।
কবি কখনো মূলার হয়না
কবি হয় মূলের,
কবি কখনো ভুলের হয়না
কবি হয় ফুলের।
দলকানা কবি দৃষ্টি দোষে
দেখেনা পেছন আগ,
নিজের পায়ে কুঠার মারে
গুণ হয়ে যায় ভাগ!

নির্মলেন্দু গুণ তাঁর উক্ত পোস্টে তাঁকে যে সময়ে স্বাধীনতা পুরস্কার প্রদান করা হয়েছে, সেটাকে ‘অহেতুক বিলম্ব’ বলেও উল্লেখ করেছেন! যেন সেটা তাঁর পৈত্রিক সম্পত্তি, কিংবা ব্যাংকে গচ্ছিত টাকা! একজন লোক পাওয়ার জন্য কতটা পাগল, কতটা ব্যাকুল হলে ‘অহেতুক বিলম্ব’ কথাগুলো ব্যাবহার করতে পারে! উক্ত পোস্টে তিনি লিখেছেন, “আবার আমাকে স্বাধীনতা পুরস্কার প্রদানে অহেতুক বিলম্ব করার জন্য বিরক্তি ও ক্ষোভ প্রকাশ করে ফেইসবুকে লিখেছিও। একটু বিলম্ব হলেও বঙ্গবন্ধুকন্যা, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমার দাবির যৌক্তিকতা অনুধাবন করে আমাকে পুরস্কৃত করেছেন। তাতে আমি খুশি হয়েছি, সম্মানিত বোধ করেছি।” ২৪ মে ২০২৩ আরেকটি পোস্টে নির্মলেন্দু গুণ লিখেছেন, “বিশ্ববিদ্যালয় তো হলো শেখ হাসিনার নামে। নেত্রকোনা সরকারী কলেজটা আমার নামে হইলে কেমন হয়? আমি তো ঐ কলেজের ভালো ছাত্র ছিলাম। শিক্ষামন্ত্রী ডাক্তার দীপু মনি, আপনি এইমর্মে সাহস করে একটা প্রস্তাব উত্থাপন করুন, আশা করি মাননীয়া প্রধানমন্ত্রী মেনে নিবেন। আপনারা দু’জনই তো জনসমাবেশে আমার কবিতা পড়েন। তাই না? সমস্যা কী?”

একজন কবি হবেন দেশের ও দশের, তাঁর চিন্তা ও কর্মে থাকবে সবার প্রতি সাম্য। তবেই তো রক্ষা পাবে ভারসাম্য, যা সবারই কাম্য। কিন্তু আফসোস, নির্মলেন্দু গুন পারেননি দলীয় দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে যেতে। তিনি সবসময় ছিলেন একটি দলের অন্ধ অনুগত হিসেবে মেতে। তার প্রমাণও পাওয়া যায় তাঁর লেখনীতে। একজন কবি বা লেখকের কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি সমর্থন, কিংবা আত্মার বন্ধন থাকতেই পারে। কিন্তু তাই বলে নিজের সমর্থক দল ক্ষমতায় গেলে ঐ দলের বিপুল কর্মীবাহিনীর ওপর দেশকে শাসন করার দায়িত্ব তুলে দেওয়ার মতো দায়িত্বহীন কথা কি কেউ বলতে পারে? ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা যখন ক্ষমতায় আসেন, নির্মলেন্দু গুণ তাঁর ‘নির্গুণের জার্নাল’ শীর্ষক একটি কলামে শেখ হাসিনাকে প্রশংসার প্লাবনে ভাসিয়ে লিখেন,”আমরা দলীয়করণের অতীত তিক্ত অভিজ্ঞতার আলোকে – দলীয়করণের যে একটি ভালো দিক রয়েছে, থাকে, থাকতে পারে, থাকা সম্ভব, সেই ভালো দিকটাকে আমরা একেবারেই বিবেচনায় আনছি না। ক্ষমতায় বসার পর বিরোধীদলকে তুষ্ট করার জন্য আমরা যদি আমাদের দলের কর্মীদের সংগে দূরত্ব সৃষ্টি করি, যদি তাদের পরিহার করে পথ চলার চেষ্টা করে কোনো অনন্য নজির স্থাপন করতে চাই – তাতে কার লাভ? জনগণ তো শুধু ঐ দলের কতিপয় নেতা বা নেত্রীর ওপরই আস্থা স্থাপন করেনি – ভোটের মাধ্যমে জনগণ দেশকে শাসন করার দায়িত্ব ঐ দলের বিপুল কর্মীবাহিনীর ওপরই ন্যাস্ত করে। আমরা জনগণের রায়ের এই দিকটাকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করছি বলেই আমার আশংকা।…ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলগুলো তাদের বিপুল কর্মীবাহিনীকে যদি অল্পমূল্যে ক্ষমতার স্বাদ দিতে পারে তবে আমার মনে হয়, তাতে দেশ ও জাতির লাভ হবে।…রাজনীতি করাটাকে যখন একটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় কর্ম বলেই সমাজ বিবেচনা করে সেহেতু – এইখাতে রাষ্ট্রের বাৎসরিক বাজেটেও একটা থোক অর্থ বরাদ্দ রাখা যায়।”(দৈনিক বাংলাবাজার পত্রিকা, ২৭ সেপ্টেম্বর ১৯৯৬)। নির্মলেন্দু গুণ যেহেতু ঐ দলের নুন খেয়েছেন, গুণও গাইবেন স্বাভাবিক কথা। কিন্তু গুণ গাইতে গিয়ে এভাবে বিবেককে খুন করে ফেলবেন, সেটা কেউ কল্পনাও করেনি। কেননা দলীয় লোকদেরকে ক্ষমতার স্বাদ দেওয়া, নানানরকম সুবিধা দেওয়া তো কোটারই নামান্তর। আর কে না জানে, কোটা যে যোগ্যতা ও মেধার মাপকাঠি নয়! সেজন্যই তো ২০২৪ সালে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনটা হয়ে গেলো বাংলাদেশে। স্বৈরাচার দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হলো চোরের বেশে!

কবি নির্মলেন্দু গুণ প্রথম শ্রেণির মুজিব প্রেমিক সন্দেহ নেই। মুজিব বন্দনায় তিনি বহু বিখ্যাত কবিতাও রচনাও করেছেন। তার পুরস্কারও পেয়েছেন তিনি হাতে নাতে। শুধু কি তাই? রাষ্ট্রিয় খরচে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে নিউইয়র্কে অবস্থিত জাতিসংঘের অধিবেশনে অংশগ্রহণের দুর্লভ সূযোগও পেয়েছিলেন। তাই বলে কি ভাসানীকে মুজিবের বিরোধী ধারার বলে চিত্রিত ও চিহ্নিত করতে হবে? কিন্তু নির্মলেন্দু গুণ তাঁর ‘নির্গুণের জার্নাল’-এ ভাসানীকে ঐ ভিন্নধারার বলে চিত্রিত ও চিহ্নিত করতে চুল পরিমাণ ভুল করেননি। তিনি লিখেছেন, “তারা ভাবতো ভারত সবসময়ই বাংলাদেশকে শোষণ করার তালে থাকবে এবং আমাদের সঙ্গে বড় ভাই সুলভ আচরণ করবে। তাকে কোনো অবস্থাতেই বিশ্বাস করা যায় না। ভারতকে শক্তির মাধ্যমে মোকাবিলা করার প্রস্তুতি আমাদের থাকা দরকার। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতা করলেও, ভবিষ্যতের কথা ভেবেই আমাদের উচিৎ মুসলিম উম্মার সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক সুদৃঢ় করা। ভারতকে চাপের মধ্যে রাখার জন্য একদলশাসিত, নাস্তিকের দেশ কমিউনিস্ট চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নতি করা দরকার।…মৌলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ছিলেন ঐ ধারার সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা। তিনি খুব চমৎকার ভাষায় সাম্প্রদায়িক চুলকানিযুক্ত ভারতবিরোধী বক্তব্য প্রদান করতে পারতেন।… মিত্রবাহিনী হিসেবে আমাদের সঙ্গে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে মুক্তিযুদ্ধে প্রাণ দেবার জন্য ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের পরিবর্তে তিনি বলতেন, ভারতীয় সেনাবাহিনী বাংলাদেশে ঢুকে আমাদের হাজার-হাজার কোটি টাকার সম্পদ লুট করে নিয়ে গেছে। সে কারণেই বাংলাদশের এই দুর্দশা। ৭৪-এর এই দুর্ভিক্ষ।”(দৈনিক বাংলাবাজার পত্রিকা, ৬ ডিসেম্বর ১৯৯৬)। মওলানা ভাসানীর ভারতবিরোধীতার পেছনে কারণ ছিলো। তিনি মনে করতেন, আমরা পিন্ডির প্রভুত্বকে প্রত্যাখ্যান করেছি দিল্লির দাসত্ব করার জন্য নয়। একজন দেশপ্রেমিক স্বাধীনচেতা মানুষের মনোভাব এমনটাই হওয়া উচিত। সেদিক থেকে মওলানা ভাসানীর ভাবনা কি ভুল ছিলো? অবশ্যই না। ভারতও প্রমাণ করতে পারেনি সে আমাদের বন্ধু। সে সর্বক্ষেত্রে বাংলাদেশেকে শোষণ করেছে এবং একটি গোলাম রাষ্ট্রে পরিণত করার চেষ্টা করেছে। ভারতীয় সেনাবাহিনী যে লুট করেছে, সেকথা কি কেউ অস্বীকার করতে পারবে? ভারতীয় লুটপাটে বাঁধা দিয়েছিলেন বলেই তো মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার মেজর জলিলকে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম জেলে যেতে হয়েছিলো। তাঁর বইতেও আছে সেই বয়ান। তাঁর একটি বইয়ের নামই তো ‘অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা’! নয় কি? মেজর জলিল, মওলানা ভাসানীর মতো দেশপ্রেমিকরা ভারতের চাণক্য নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন বলেই তো বাংলাদেশকে সিকিম বানাবার ভারতীয় চেষ্টা বারবার ব্যর্থ হয়েছে। তার উজ্জ্বল উদাহরণ – ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক জুলাই জাগরণ। মওলানার ভারতবিরোধীতা যে ছিলোনা অকারণ, তা ফের প্রমাণ করেছে বাংলাদেশের বিপ্লবী জনগণ। ভাসানী একসময় পাকিস্তানি শোষকদের সাথে করেননি আপোষ, বলিষ্ঠ কন্ঠে বলেছিলেন ‘খামোশ’ ; তেমনি ভারতকেও দিয়েছিলেন শাসানী। তাতে নির্মলেন্দু গুণের কেন এত চুলকানি? অন্নদাশঙ্কর রায় তাঁর এক ছড়ায় লিখেছেন-
দিল্লীকে দেন শাসানি
মহান নেতা ভাসানী
অন্তরে নেই দুঃখ লেশ
অপাঙক্তেয় বাংলাদেশ।

গুণ আরো লিখেছেন, “আমি মনে করি, ৭১-পরবর্তী বাংলাদেশে মৌলানা ভাসানী সাহেবই ‘প্রগতিশীল সাম্প্রদায়িকতা’র জন্ম দিয়েছিলেন। আমি এও মনে করি যে, ঐ প্রগতিশীল সাম্প্রদায়িকতাকে সেদিন শুরুতেই শক্ত হাতে মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুর সরকার।” (দৈনিক বাংলাবাজার পত্রিকা, ৬ ডিসেম্বর ১৯৯৬)। কোনো একজন লোক স্বধর্মের লোকদেরকে ভালোবাসতেই পারেন, তাই বলে কি তিনি সাম্প্রদায়িক হয়ে যাবেন? গান্ধিও তো হিন্দুদেরকে ভালোবাসতেন, হিন্দু ধর্ম নিয়ে লিখেছেন বই। সে সম্পর্কে গুণের মন্তব্য কই? ভাসানীকে যারা ভালোবাসতেননা, তারাও এই অপবাদ দেননি যে, ভাসানী সাম্প্রদায়িক ছিলেন। অথচ তাঁকেই কিনা গুন বানিয়ে ফেললেন ভিলেন! কবি অসীম সাহারও নেই ভুল। তিনিও ‘স্বাধীনতা পদক’ পাওয়ার জন্য ছিলেন অত্যন্ত ব্যাকুল! ফেসবুকে প্রদত্ত এক পোস্টে তিনিও লিখেছিলেন, “জীবিত থাকতে আমাকে ‘স্বাধীনতা পদক’ না দিলে কোনো অবস্থাতেই যেন দেয়া না হয়। আমার পরিবারের কেউ যেন তা গ্রহণও না করে!”

এবার বাংলা একাডেমি পুরস্কার প্রসঙ্গে করা যাক প্রত্যাবর্তন। কেননা বিষয়টি গোটা বঙ্গদেশে বিতর্কের তুঙ্গে এখন। বিতর্কের পেছনে আছেও বহু কারণ। সেই কারণ নিয়ে কথা বলতে নেই বারণ। কারণ আর কিছু নয় – এই পুরস্কার নিয়ে প্রতিবছর হয় নয়ছয়। অর্থাৎ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, যারা যোগ্য নয় তারা এই পুরস্কার পায়, আর যারা যোগ্য তারা থাকেন উপেক্ষার উপত্যকায়। পুরস্কার প্রদানের পুরো প্রক্রিয়াতেই রয়েছে গলদ। তাইতো হায় পুরস্কার প্রদানের বেলায় প্রতি বছর প্রাধান্য পায় বলদ! এ প্রসঙ্গে লিখতে গিয়ে ফরিদ কবির তাঁর ‘বাংলা একাডেমীকে নিয়ে দুটো কথা বলতেই হচ্ছে’ শীর্ষক লেখার একস্থানে লিখেছেন, “শিল্প-সাহিত্যের জন্য যে ভয়ংকর ক্ষতিকর কাজটি এটি বছরের পর বছর করে চলেছে, সেটির নাম ‘বাংলা একাডেমী পুরস্কার’।…গত তিন দশক ধরে হাতে গোনা কয়েকটি উদাহরণ বাদে প্রায় সব পুরস্কার গেছে ভুল লোকদের ঝুলিতে।…একাডেমীর মহাপরিচালক, একাডেমীর ফেলোরা জানেন কিনা আমার জানা নেই, কিন্তু দেশের একজন সাধারণ পাঠকও এখন জেনে গেছেন, একাডেমী পুরস্কার পাওয়া যায় না, তা নিতে হয়। প্রতি বছরই কিছু লেখক-কবি তৎপর হয়ে ওঠেন পুরস্কারটি হাতিয়ে নেয়ার জন্য। এবং কয়েকজন তাতে সফল হন। যারা পুরস্কার পান, সাধারণ পাঠকরা, বিশেষত, রাজধানীর বাইরের তরুণ লেখক-কবিরা এতে প্রতারিত হন। কারণ তাদের কাছে এরাই বাংলাদেশের সাহিত্যের ‘আইকন’ হয়ে ওঠেন। কিন্তু ধীরে ধীরে তারা উপলব্ধি করতে পারেন এইসব একাডেমী পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক-কবিদের লেখায় কোনো ‘বিশেষ’ কিছু নেই, তারা একেবারেই সাধারণ মানের।” ( দ্র- নতুনধারা, ১৫ মার্চ ২০১১, ঢাকা ; অতিথি সম্পাদকঃ ফরিদ কবির, সম্পাদকঃ নাঈমুল ইসলাম খান)। একই কাগজের একই সংখ্যায় “পুরস্কারটা যদি ‘পরিষ্কার’ হতো!” শিরোনামের লেখার একস্থানে সৈকত হাবিব লিখেছেন, “এজন্যই দেখা যায় এমন সব ব্যক্তি বাংলা একাডেমী পুরস্কার পেয়েছেন যাদের রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তির ‘যোগ্যতা’ সাহিত্যের যোগ্যতার চেয়ে অনেক বেশি।…ইদানীং এও শোনা যাচ্ছে, বাংলা একাডেমী পুরস্কারের পেছনে একটি সিন্ডিকেট কাজ করছে, যারা কোনো-না-কোনোভাবে প্রতি বছরই নিজেদের লোকদের পুরস্কার পাইয়ে দিতে তৎপর থাকে এবং যথেষ্ট সফলতাও পেয়ে থাকে। সম্ভবত এসবের পেছনে আছে পুরস্কার প্রদানের অপরিষ্কার নীতি ও অস্বচ্ছতা।” একই সংখ্যায় ‘বাংলা একাডেমী কী বস্তু?’ শিরোনামের লেখায় জাহেদ সরওয়ার লিখেছেন, “তবে সবচাইতে বিভ্রান্তিকর যে কাজটা এই একাডেমী করিয়া আসিতেছে তাহা হইল ইহার নামে প্রচলিত পুরস্কার। ক্ষমতাদলীয় ক্যাডাররা দীর্ঘদিন ধরিয়া এই পুরস্কার আলোকিত করিয়া আসিতেছে নিজেদের। তবে এটার পাশাপাশি ওরা চালাকি করিয়া কিছু বাতিল বুড়োদেরও সাথে জুড়ে দেয়। যাহাতে তাহারা বলিতে পারে একাডেমী শুদ্ধ। সরকারদলীয় ক্যাডারদেরকেই পুরস্কৃত করে না অভাবী বুড়োদেরও পুরস্কৃত করিয়া থাকে। মোট কথা কোনো ক্ষেত্রে বাংলা একাডেমী কোনো মৌলিক মানুষকেই পুরস্কৃত করে নাই।”

এ প্রসঙ্গে আহমদ ছফার কিছু বক্তব্য পেশ করা প্রাসঙ্গিক মনে করছি। বাংলা একাডেমী পুরস্কারের চেয়ে বড় কোনো পুরস্কার যদি বাংলাদেশে থাকতো, তা পাওয়ার পক্ষে আহমদ ছফার যোগ্যতা বা প্রতিভা ছিলো তার চেয়েও বহু বহুগুণ বেশি। তাঁর যারা শত্রু, তারাও একবাক্যে স্বীকার করবেন, তিনি কখনো পুরস্কারের প্রত্যাশায় লিখতেন না, লালায়িতও ছিলেন না। তারপরও দুঃখজনক ও দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, স্পষ্ঠবাদী স্বভাবের কারণে তিনি বাংলা একাডেমী পুরস্কার থেকে বঞ্চিত ছিলেন। দিলেও আপোষহীন স্বভাবের কারণে তিনি নিতেন কিনা সন্দেহ! অবশ্য, পুরস্কার প্রদানের চেষ্টা যে ছিলোনা তাও কিন্তু নয়। তবে সেটা মূল বাংলা একাডেমী পুরস্কার ছিলোনা, সেটা ছিলো

একটি পার্শ্ব পুরস্কার – সা’দত আলি আখন্দ সাহিত্য পুরস্কার। ১৯৯২ সালের ২০ মে একাডেমীর মহাপরিচালক সেকথা জানিয়ে তাঁকে একটি চিঠিও দেন। কিন্তু এরি মধ্যে একটি ঘটনা ঘটে যায়। উক্ত সালের ২৮ মে দৈনিক ভোরের কাগজ পত্রিকার ‘সংস্কৃতি সংবাদ’ বিভাগে ‘আমাকে কেন পুরস্কার দিল’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনটি লিখেন সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল। প্রতিবেদনটিতে আহমদ ছফার বয়ান থেকে উদ্বৃতি দিয়ে লেখা হয়, “এম. আর. আখতার মুকুলের পিতার নামানুসারে বাংলা একাডেমী যে পুরস্কার প্রদান করেন সে পুরস্কার এ বছর পেয়েছেন আহমদ ছফা। এ ব্যাপারে তাঁকে অভিনন্দন জানাতেই বললেন, ‘অভিনন্দন ফিরিয়ে নাও, কারণ আমি ওই পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করব। ওরা যদি আমাকে একটা বক্তৃতা দিতে দেয় এবং তা ওদের কাগজে ছাপে তাহলে পুরস্কার নেব, নইলে নয়। বাংলা একাডেমি মায়ের মতো, আমি বাংলা একাডেমিকে শ্রদ্ধা করি। কিন্তু বাংলা একাডেমির লোকজন অদ্ভুত জীব। মদ সিগারেট না খাওয়ালে ওরা পুরস্কার দেয় না। আমি তো তা করিনি, তবু তারা আমাকে কেন পুরস্কার দিল’?” (দ্র- প্রাপক আহমদ ছফা, আহমদ ছফাকে লেখা চিঠিপত্রের সংকলন, সংগ্রহ ও সম্পাদনা- নূরুল আনোয়ার, প্রকাশক- খান ব্রাদার্স অ্যান্ড কোম্পানি, ঢাকা)। প্রতিবেদনটি পত্রিকায় প্রকাশের পর বাংলা একাডেমীর তৎকালীন মহাপরিচালক এক পত্রে আহমদ ছফাকে লিখেন, “বাংলা একাডেমি সম্পর্কে এটি গুরুতর অভিযোগ, যা তাৎক্ষণিকভাবে যথাযথ তদন্তের দাবি রাখে। অতএব আপনি সত্যি সত্যি এ ধরনের কোনো উক্তি করেছেন কি না, তা প্রত্যায়ন না করা পর্যন্ত আমাদের পক্ষে তদন্তকার্য হাতে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।”(ঐ)। উক্ত পত্রের উত্তরে বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালকের বরাবরে লেখা এক পত্রে আত্মপক্ষ সমর্থন করে আহমদ ছফা লিখেন, “আমি উদ্যোগী হয়ে ওই পত্রিকায় কিছু বলিনি। একটি গ্রন্থ প্রকাশ অনুষ্ঠান উপলক্ষে আমাকে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে যেতে হয়েছিল। সেখানে জনাব সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল আমার সঙ্গে পুরস্কারের ব্যাপারে আলাপ করছিলেন। তিনি যে সংবাদপত্রের লোক সেই ব্যাপারে আমি কিছু জানতাম না। তথাপি সংবাদপত্রে আমার বরাত দিয়ে প্রতিবেদনটি যখন প্রকাশিত হয়েছে, আমার বক্তব্য উদ্ধৃত করার ক্ষেত্রে কিছুটা হেরফের ঘটে গেলেও বক্তব্যের মর্মার্থের দায়দায়িত্ব আমি অস্বীকার করব না।”(ঐ)।

উপরের উক্তি ও উদ্ধৃতি থেকে কি এটা উপলব্ধি করা যায়না যে, বাংলা একাডেমী প্রতিবছর করে যে সাহিত্য পুরস্কার প্রদান – বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তা করেনা বহন যোগ্যতা ও প্রতিভার প্রমাণ। অতএব কথা পরিষ্কার – অবিলম্বে পুরস্কার প্রদানের পুরো প্রক্রিয়ায় সংস্কার তথা সচ্চতা ও সততা আনা দরকার, যাতে বাংলা একাডেমীর প্রতি মানুষের আস্থা ফিরে আসে আবার।