খন রঞ্জন রায়: পৃথিবীতে মানুষের পরেই প্রাণিজগতের স্থান। বিভিন্ন ধর্মে প্রাণিজগৎকে পৃথক জাতি সত্তার স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। পশু-পাখি মানবতার কল্যাণে নিয়োজিত। আমিষ জাতীয় খাবার গ্রহণের ক্ষেত্রে পৃথিবীর সব ধর্ম, দর্শন, বিজ্ঞান, সভ্যতার মানুষ নির্দিষ্ট কিছু প্রাণির মাংস খাওয়ার বিধান দেওয়া হয়েছে। হাজার লক্ষ প্রাণির মধ্যে সীমিত কিছু পশু-পাখি খাদ্য হিসাবে ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া আছে। তাও সহনশীলতা প্রদর্শন করে নানা আইনকানুন ও বিধিবিধান প্রতিপালন করে।

মানুষের মতো জীবজন্তুও রক্ত মাংসে গঠিত। তাদেরও কষ্ট আছে, আছে সুখ, দুঃখ, আনন্দ, বেদনা, নাচ-গান, হাসি-কান্না, প্রেম, বিরহ, বিচ্ছেদ। তাদের মধ্যেও নানারকম চিন্তা, চেতনা ও বোধের জন্ম হয়। তারাও অনুভব শক্তির অধিকারী। কিন্তু জীবজন্তুর প্রতি মানুষের ব্যবহার আদিমকাল হতে নিষ্ঠুরতায় পূর্ণ। মানুষের মতো পৃথিবীতে জীবজন্তুর স্বাভাবিক ও শান্তিময় জীবনধারনের অধিকার রয়েছে। মানুষ জীবন্তুর কোনো অধিকার আছে এমনটা ভাবনার ফুরসত নেই। মানুষে মানুষেই অশ্রদ্ধা, টিটকারি, উপহাস, অসম্মান, অবহেলা, অত্যাচার ইত্যাদি নিত্যসঙ্গী। মানুষের জীবন এক রহস্যময় জটিল উপাখ্যান। প্রতি মুহূর্তে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া চলতে থাকে। এর বিচ্যুত হলেই সৃষ্টি হয় অধিকার রক্ষার বিষয়। যার পোশাকি নাম ‘মানবাধিকার’।

পশু-প্রাণিদের সমস্যার গভীরে অনুসন্ধান খুব বেশি হয়েছে, তা নয়। তবে ১৮২৪ সালে ব্রিটেনের একটি প্রাণিপ্রেমী সংগঠন জীবজন্তুর অধিকার বিষয়ে সোচ্চার হয়। পশুদের প্রতি তীব্র বাসনা জাগে। মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে পশু অধিকারে জনজাগরণ সৃষ্টি করে। তারা পশুদের প্রতি বিভেদ, ক্ষোভ, ঘৃণা-হীনস্বার্থ, খাদ্যলিপ্সা দূর করে অন্তবক্ষ ব্যবহার ভাবনা জাগাতে সক্ষম হয়। মানবসমাজ যেমন ভালোভাবে বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে তেমনি পশুপাখিদের। তাদের অধিকার তছরুপ করার কোন সুযোগ নাই। ধীরে ধীরে তাদের চিন্তা-চেতনা ছড়িয়ে পড়তে থাকে বিভিন্ন দেশে। কিছু কিছু মানুষের আপত্তির ফিসফিসানি থাকলেও তা ধোপে টিকেনি। ব্যক্তিগত স্বার্থ ত্যাগ করে সেই সময় থেকেই সভ্য দুনিয়া পশু পাখির অধিকারের প্রতি সহনশীলতা প্রদর্শনে মনোযোগী হয়েছে।

যুক্তি ও বিজ্ঞানের যুগের সাথে তাল মিলিয়ে আরো কিছু সংগঠন প্রাণিজগতের অধিকার আন্দোলনে যোগ দেয়। অবলা-অসহায় এই পশুদের প্রতি সহনশীলতা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম তুলনামূলক আজো অনুজ্জ্বল ও অকিঞ্চিতকর। এই পৃথিবীতে মানুষের পরেই প্রাণিজগতের স্থান। বিশ্বের প্রতিটি প্রাণিই একটি জীবনচক্রে বসবাস করে। প্রত্যেক প্রাণিরই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য আলাদা আলাদা। জীবন্ত প্রতিটি প্রাণই জীবনধারনের জন্য অন্য আরেকটি প্রাণের উপর নির্ভরশীল। এইটি পৃথিবীর অনিবার্য উদ্ভিদ ও প্রাণির জীবনচক্র। অনাদিকাল ধরে নানা ত্যাগ ও তিতিক্ষার মুখোমুখি হয়ে আত্মক্ষয়ে আরেক জীব উর্বর হয়।

মানুষ মনে করে জীবজন্তুর কোনো অধিকার নেই; মানুষের জন্যই জীবজন্তুর সৃষ্টি। তথাকথিত এই ধারণাকে ভেঙ্গে দিয়েছেন প্রাণি অধিকার কর্মীরা। মানবমন সংযতকরণে কিছু সঞ্চীবনী মন্ত্রের দরকার হয়। তারা তা করে দেখাতে পেরেছে। তারা দেখিয়েছে যে পশুর প্রতি মানুষ যে ব্যবহার করে তা যদি মানুষের উপর পতিত হয় তা হলে কী অবস্থা হবে তা একবার ভেবে দেখার অনুরোধ করেন। আত্ম বিশ্লেষণে নিরন্তর জাগিয়ে তোলার অহর্নিশ চেষ্টা চালান। মানবজীবনের কর্তব্য ও মানবমন নিয়ে কিছুটা বিশ্লেষণের প্রয়োজন সৃষ্টি করতে পার হয় দীর্ঘ সময়। যৌক্তিক দাবী ও আন্দোলনের ফলে জীবজন্তুর অধিকারের সর্বজনীন ঘোষণা গৃহীত হয়। এই অধিকারকে উপযুক্ত করে তোলার জন্য ১৯৯৮ সালের ১০ ডিসেম্বর প্রথমবারের মতো ‘আন্তজার্তিক পশু অধিকার দিবস’ পালন করা হয়।

১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে মানুষের অধিকার আদায়ে সর্বজনীন ঘোষণা করা হয়েছিল। এই ঘোষণার দিনটি স্মরণীয় করে রাখার লক্ষ্যে ১৯৫০ সালের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ৪২৩/৫ নম্বর সিদ্ধান্তের অনুবলে প্রতি বছর ১০ ডিসেম্বর জাতিসংঘভুক্ত দেশসমূহে ‘বিশ্ব মানবাধিকার দিবস’ পালন হয়ে আসছে। পশুপ্রেমীদের মনেও এই নিয়ে সমান দাগ কাটে। জীবজন্তুর প্রতি মানুষের নিুষ্ঠুরতা বন্ধে এবং শান্তিপূর্ণ ও স্বাভাবিক বিকাশ নিশ্চিত করার নিশ্চয়তা দাবী করে। তাদের যুক্তি মানুষ আর পশুতে তফাৎ বুদ্ধিগত, পশুরা সহজ অনর্গল স্বতঃর্স্ফূত ভাষায় প্রকাশ করতে পারে না কেবল। বাকী সকল ক্ষেত্রে, বিশেষ করে জৈবিক বিবেচনায় উভয়ের মধ্যে কোনো তফাৎ নেই। মানুষের মাঝে মানসিক অস্থিরতা আচার আচরণ, দ্বন্ধ সংঘাত মূর্ত হয়ে দেখা দিলেও পশুরা তা অর্থপূর্ণ শব্দ উচ্চারণের মাধ্যমে প্রকাশ করতে পারে। তাই পশুর অধিকার ও মানুষের অধিকার অভিন্ন। এই জন্য মানুষের জন্য মানবাধিকার দিবসের দিনটিই একসাথে একত্রে মিলেমিশে পশু অধিকার দিবস পালন করার ঘোষণা করা হয়। জীবন স্বাভাবিক চলমান রাখার খাতিরে অনেক কিছুকে বিসর্জন দিতে হয়। দৃষ্টি প্রসারিত করতে হয়। শ্রবণশক্তির ক্ষমতা বৃদ্ধি করা লাগে। এই কঠিন বাস্তবতাকে প্রয়োজনমাফিক পরিবর্তনের প্রয়োজনেই এই দিবস। একবিংশ শতকের এই স্বর্ণযুগে, আধুনিকতা ও প্রগতির এই যুগে মানুষে পশুতে মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে, তা ভাবনার অতীত। মানুষের দানবীয় চেতনার সমুচ্চারে নানা কেচ্চাকাহিনীর দাপটে চরিত্র যেন বর্বর-পাশবিক, কদর্য, সভ্যতা, ভব্যতার পরিপন্থী না হয় সেই জন্যই মানবসভ্যতা।

মানব মনের যুদ্ধ, দাঙ্গা, সংঘর্ষ, রক্তপাত, মৃত্যু, জ্বালাও-পোড়াও নীতি এই সব দুষ্টপন্থা পাপ, পরন্তাপকে ধুয়ে-মুছে এগিয়ে চলাই মানবাধিকার। ধনে-মানে, শিক্ষা-সংস্কৃতিতে বিত্তবেসাতের ¯ু’লকায়াতে সর্বত্র-সবজায়গায় এমনকি পাহাড়-সমতল, শীত-গ্রীষ্ম, কিংবা পদ্মা-তিস্তারধারা অব্যাহত থাকলেও মানুষের মনের উগ্রতা, ক্ষমতালিপ্সা অব্যাহত থাকে। ফলে জীবনের সবকিছুতে পস্তাতে হয়। মূঢ়, ম্লান ,মূক ও মুখে নিপতিত হয়। বর্তমান সময়ে বহুল উচ্চারিত একটি শব্দ দুর্ঘটনা। শহর থেকে গ্রাম-জেলা-উপজেলা ইউনিয়নে সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষ হতাহতের খবর পাওয়া যায়। পরিসংখ্যান নির্ভুলভাবে তুলে আনা হয়। মানুষ বিষাদে পরে, কষ্টের-বেদনার বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। সমালোচনার বন্যা বয়ে যায়। গালমন্দ, খিস্তিখেউড়ের পারঙ্গমতা দেখায়।

মৃত্যুর খবরটাই ব্যথিত হওয়ার, শোক-দুঃখ প্রকাশের। কিন্তু মানুষ ব্যতিত নিরীহ নিরপরাধ অহিংস অবলা প্রাণীর দুর্ঘটনায় মৃত্যুর কোন পরিসংখ্যান নেই। খুব বেশি আবেগ আক্ষেপত্ত সৃষ্টি হয় না। বিষয়টি অনেকের নিকট খুব স্বাভাবিক এবং অতিকায় সহজ মনে হয়। স্বীকার করা ভালো প্রতিনিয়ত গাড়িচাপায় অসংখ্য প্রাণির মৃত্যু হচ্ছে। এ ক্ষতি আমাদেরই, সমাজের, সামাজিক পরিণতির।
জর্জ এলিয়েট বলেছিলেন- ‘প্রাণি এমন একমত বন্ধু তারা কোন প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করে না, তারা কোন সমালোচনা করে না।’ অথচ প্রাণিদের ভালোবাসার বিশালতা আমাদের কল্পনাকেও হার মানায়। জীবনের বিভিন্ন পর্বে কোন না কোনভাবে মানুষ প্রাণিতে বন্ধুত্ব হয়। তখন উপলদ্ধি করতে পারে এই প্রাণির ভালোবাসার গভীরতা। এখানে আলোচনা নিষ্প্রয়োজন যে পশু পাখি প্রকৃতির অন্যতম উপাদান। এদের প্রতিদ ভালোবাসা রাখা এবং অধিকার রক্ষা করা নৈতিক দায়িত্ব।

পশুর প্রতি মানষের আচরণ হওয়া উচিত একজন মানুষের প্রতি মানুষের যেমন, ঠিক তেমন। পশুবিজ্ঞানীরা আক্ষেপ করে বলেছেন, পশু-পাখির প্রতি যদি সহানুভুতি না দেখাতে পারে, তাহলে সেই মানুষ মানুষের প্রতি সহানুভূতি দেখাতে পারবে না। পশুপাখি নিষ্পাপ প্রাণি, পাপ করার কোন প্রয়োজন পরে না। এই নিষ্পাপ প্রাণির প্রতি আমরা মমতা-মায়া-সহানুভূতি, মানবোচিত, মানবীয়, মানুষি, মানুষিক, মানবিক হতে না পারি; তবে মানুষ হিসাবে আমরা মূল্যহীন। মানুষের প্রতিও মমত্ব দেখানো সম্ভব হয় না।

যুক্তরাষ্ট্রের এফবিআই ‘সিরিয়াল কিলারদের’ উপর এক বিশুদ্ধ সমীক্ষা চালিয়েছে। একেবারে গভীর মস্তিস্কে ঘন্টা নেড়ে দেওয়া রিপোর্টে দেখা গেছে এইসব কিলাররা হাত পাকিয়েছে পশুদের প্রতি নির্দয়তা দেখাতে দেখাতেই্। তারা ‘অ্যামিন্যাল অ্যাবিউজ’ করেছে কোন ঘৃনা বা বিদ্বেষ থেকে নয়, করেছে শ্রেণি-গোত্র-বর্ণ, জাতপাত নির্বিশেষে। পশুর প্রতি পশুত্ব নতুন নয়, বেশ পুরনো। সামাজিক মনোবৈকল্য বা প্রতিবন্ধীতার জন্যই পশুর ওপর নিষ্ঠুর ব্যবহার করা হয়। সময়ের সাথে সাথে পরিবশে প্রকৃতির পরিবর্তনে সবকিছু উল্টোপাল্টা হয়ে যায়। চিন্তাভাবনা ও জীবনের অনেক পরিবর্তন হয়। হয় না কেবল পশুদের প্রতি নিষ্ঠুরতার আচরণ।

মনোবিজ্ঞানীরা এই অবস্থাকে এক ধরনের মানসিক সমস্যা বলে আখায়িত করেছেন। বিস্মিত ও চমকিত করে এই আচরণকে বলেছেন ‘ডিসলেক্সিয়া’। নীতিশ্রাস্ত্র মতে মানবসমাজের জন্য সামাজিক অধিকার, রাষ্ট্রীয় অধিকার, রাজনৈতিক অধিকার, অর্থনৈতিক অধিকার, আইনগত অধিকার, নৈতিক অধিকার, সাম্যের অধিকার, শোষণের বিরুদ্ধে অধিকার, সংস্কৃতি ও শিক্ষাক্ষেত্রের অধিকার, সাংবিধানিক অধিকার, মৌলিক অধিকার, অন্ন-বস্ত্র, বাসস্থান চিকিৎসা শিক্ষা পাওয়ার অধিকার, চিন্তা বিবেক বাক স্বীধানতার অধিকার, সম্পত্তির অধিকার, চলাফেলার অধিকার আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার, সরকারি চাকরি লাভের অধিকার এমন হাজারো অধিকারের কথা অধিকার হিসাবে বলা হলেও পশুদের জন্য কার্যকর কেবল ‘নৈতিক অধিকার’। এই অধিকার নিয়েই বিবেক নিসৃত। সামাজিক নৈতিকতা বা ন্যায়বোধ থেকে উৎসারিত হয়।

নৈতিক অধিকারের কোন আইনগত ভিত্তি নেই। রুচিও মননের সংযোগ, অনুভূতি ও কল্পনা করার শক্তি আচরণ হাসিমাখা মুখ, স্নিগ্ধ চোখের ইশারা, কথা বলার ভঙ্গি পরিহিত পোশাকের সাধারণ মাধুর্য, বাহ্যবস্তুর জ্ঞান ইত্যাদি। নানা উপাচার মানবিক, নৈতিক পরিস্থিতিতে সমৃদ্ধ করে। আলোকিত করে। সৌজন্য থাকলে, সত্য ও বিনয় থাকলে কপটতা বর্জিত হলে এর ফল হাতেনাতে পাওয়া যায়। মানুষে এইসব গুণাগুণ বাহ্যিক সংস্কৃতির প্রকাশ। চোখে দেখা যায় না, কানে শোনা যায় না এবং তা সঙ্গে সঙ্গে উপলদ্ধিও করা যায় না।

নৈতিক ব্যক্তিত্বের মানুষটি তৈরি হয় শিক্ষা নিয়ে। শিক্ষা মানুষের মনকে যদি পরিবর্তন না করে। প্রসারিত না করে, সহনীয়-সহিষ্ণু না করে বিদ্যাশিক্ষার আগের মানুষ আর বিদ্যার্জনের পরের মানুষটি যদি এক হয়, তবে মানুষ হিসাবে জন্মগ্রহণ অর্থহীন। মানুষের বিবেক ও সামাজিক নৈতিকতা বা ন্যায়বোধ থেকে আসে নৈতিক অধিকার। এটি রাষ্ট্র কর্তৃক প্রণয়ন করা হয় না। নির্লোভ নির্মোহভাবে জীবন পথে দুর্বলকে সাহায্য লাভের সুযোগ এগিয়ে নেওয়াই নৈতিক দায়িত্ব এবং প্রাপকের অধিকার। বিবেকবোধ দ্বারা এই বিশিষ্টতা ও বিশালতা অর্জন করতে হয়। এই অধিকার কেবল হদয়কে আর্দ্র করার। এর কোনো শ্রেনিবিভাগ করা যায় না। এই অধিকার ভঙ্গকারীকে কোন রকম শাস্তির আওতায় আনা যায় না। এর উৎস গোপনে নিভৃতে। নিজ বিবেকের তাড়নায় সৃষ্টি বোধ ও কর্মে সক্রিয় ব্যক্তিসত্তা। এর ব্যত্যয় হলে নিজে নিজে দ্বগ্ধ হয়ে সমাজে উপহাসের পাত্র হয় মাত্র।

প্রতি প্রাণির আলাদা আলাদা অধিকার সম্পর্কে অতিসাম্প্রতিক তীব্র আলোচনা চললেও এর ভিত্তি অনেক পুরনো। কিঞ্চিত দীর্ঘ নয়। প্রাচীন গ্রীস, রোম বা অন্যান্য জায়গায় এই বিষয়ে আলোচনার সুত্রপাত হয়েছিল। তবে অধিকারকে পাকাপোক্ত করার চূড়ান্ত লড়াই শুরু হতে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। অষ্টাদশ শতাব্দীর রাজনৈতিক বিপ্লবের পর প্রাণির স্পন্দন বোঝার অবলম্বন পাওয়া যায়। মানুষের অধিকারকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার ব্যাপক আলোচনা পর্যালোচনার অধিকার পায়।

ধূলি-ধূসর দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হতে থাকে। আশা নিরশার দ্বন্ধে ভুগতে ভুগতে অন্ধকার মোচন করার প্রয়োজনে বোঝা পড়ার তাগিদ শুরু হয়। সৃষ্টি হয় নানামুখী আবহ। দার্শনিক সামাজিক মতবাদের বন্দনা আর প্রেরণা। এই সমস্ত পণ্ডিতরা বেশ বদ্ধিমান এবং অতি সতর্ক। মানুষের অদ্ভুত মানসিকতাকে গতি আর প্রাণময় করে এগিয়ে চলে। ইতিহাসের পৃষ্টায় যুক্ত হয় মানবাধিকার। দারুণভাবে উদ্দীপ্ত হয় মানুষ। দেশে দেশে অগণিত মানুষ বিভিন্ন ধরনের সমস্যায় পীড়িত হলেও মানুষের অধিকারের বিষয়টি শক্তিশালী হতে থাকে।

মানুষের অধিকার এগিয়ে চলার পথ ধরে জীবজন্তুর অধিকার ও একই পথে হাঁটছে। প্রকাশ্যে অকুন্ঠ সমর্থন পাচ্ছে ‘পশু অধিকার’। ঘটনাবহুল জটিল হিসাবের জালে বন্দি হয়েও ক্ষেত্র বিশেষে প্রতিরোধের বেড়া পার হতে সমর্থ্য হয়েছে। পশু অধিকার আদায়ে দারুণভাবে লড়ে গতিশীলতার স্বাক্ষর রাখছে। আন্তর্জাতিক চত্তরে এই নিয়ে ভীষণ হৈচৈ এবং উৎসাহ দেখা দিয়েছে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে জীবজন্তুর অধিকার প্রতিষ্ঠার মতিগতি এখনো রহস্যঘেরা। নিভৃতে, পর্দার আড়ালে, অন্তরালে। সেই দিক বিবেচনা করলে পশু অধিকার দিবসের এই দিনে তাদের মহিমা তুলে ধরা, উদারতার বিস্তার দাবী করা নৈতিক দায়িত্ব।। এই দাবী-দায়িত্বের বিষয়টি একদমই অন্যরকম। মানবেতিহাসে অনন্য। জীবজন্তুর প্রতি রঙ্গতামাসার বোধ পরিত্যাগ করে সদয় ও স্নেহশীল হই। তাদের জন্য ভালোবাসা ও মমতা লালন করি এবং প্রকৃতির সৌন্দর্য রক্ষায় মনোযোগী হই। আমাদের জীবনসাধনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হোক ‘পশু’ আজকের দিনে এমনটাই প্রত্যাশা।

লেখকঃ খন রঞ্জন রায়,সমাজচিন্তক, গবেষক ও সংগঠক।

খন রঞ্জন রায়: পৃথিবীতে মানুষের পরেই প্রাণিজগতের স্থান। বিভিন্ন ধর্মে প্রাণিজগৎকে পৃথক জাতি সত্তার স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। পশু-পাখি মানবতার কল্যাণে নিয়োজিত। আমিষ জাতীয় খাবার গ্রহণের ক্ষেত্রে পৃথিবীর সব ধর্ম, দর্শন, বিজ্ঞান, সভ্যতার মানুষ নির্দিষ্ট কিছু প্রাণির মাংস খাওয়ার বিধান দেওয়া হয়েছে। হাজার লক্ষ প্রাণির মধ্যে সীমিত কিছু পশু-পাখি খাদ্য হিসাবে ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া আছে। তাও সহনশীলতা প্রদর্শন করে নানা আইনকানুন ও বিধিবিধান প্রতিপালন করে।

মানুষের মতো জীবজন্তুও রক্ত মাংসে গঠিত। তাদেরও কষ্ট আছে, আছে সুখ, দুঃখ, আনন্দ, বেদনা, নাচ-গান, হাসি-কান্না, প্রেম, বিরহ, বিচ্ছেদ। তাদের মধ্যেও নানারকম চিন্তা, চেতনা ও বোধের জন্ম হয়। তারাও অনুভব শক্তির অধিকারী। কিন্তু জীবজন্তুর প্রতি মানুষের ব্যবহার আদিমকাল হতে নিষ্ঠুরতায় পূর্ণ। মানুষের মতো পৃথিবীতে জীবজন্তুর স্বাভাবিক ও শান্তিময় জীবনধারনের অধিকার রয়েছে। মানুষ জীবন্তুর কোনো অধিকার আছে এমনটা ভাবনার ফুরসত নেই। মানুষে মানুষেই অশ্রদ্ধা, টিটকারি, উপহাস, অসম্মান, অবহেলা, অত্যাচার ইত্যাদি নিত্যসঙ্গী। মানুষের জীবন এক রহস্যময় জটিল উপাখ্যান। প্রতি মুহূর্তে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া চলতে থাকে। এর বিচ্যুত হলেই সৃষ্টি হয় অধিকার রক্ষার বিষয়। যার পোশাকি নাম ‘মানবাধিকার’।

পশু-প্রাণিদের সমস্যার গভীরে অনুসন্ধান খুব বেশি হয়েছে, তা নয়। তবে ১৮২৪ সালে ব্রিটেনের একটি প্রাণিপ্রেমী সংগঠন জীবজন্তুর অধিকার বিষয়ে সোচ্চার হয়। পশুদের প্রতি তীব্র বাসনা জাগে। মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে পশু অধিকারে জনজাগরণ সৃষ্টি করে। তারা পশুদের প্রতি বিভেদ, ক্ষোভ, ঘৃণা-হীনস্বার্থ, খাদ্যলিপ্সা দূর করে অন্তবক্ষ ব্যবহার ভাবনা জাগাতে সক্ষম হয়। মানবসমাজ যেমন ভালোভাবে বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে তেমনি পশুপাখিদের। তাদের অধিকার তছরুপ করার কোন সুযোগ নাই। ধীরে ধীরে তাদের চিন্তা-চেতনা ছড়িয়ে পড়তে থাকে বিভিন্ন দেশে। কিছু কিছু মানুষের আপত্তির ফিসফিসানি থাকলেও তা ধোপে টিকেনি। ব্যক্তিগত স্বার্থ ত্যাগ করে সেই সময় থেকেই সভ্য দুনিয়া পশু পাখির অধিকারের প্রতি সহনশীলতা প্রদর্শনে মনোযোগী হয়েছে।

যুক্তি ও বিজ্ঞানের যুগের সাথে তাল মিলিয়ে আরো কিছু সংগঠন প্রাণিজগতের অধিকার আন্দোলনে যোগ দেয়। অবলা-অসহায় এই পশুদের প্রতি সহনশীলতা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম তুলনামূলক আজো অনুজ্জ্বল ও অকিঞ্চিতকর। এই পৃথিবীতে মানুষের পরেই প্রাণিজগতের স্থান। বিশ্বের প্রতিটি প্রাণিই একটি জীবনচক্রে বসবাস করে। প্রত্যেক প্রাণিরই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য আলাদা আলাদা। জীবন্ত প্রতিটি প্রাণই জীবনধারনের জন্য অন্য আরেকটি প্রাণের উপর নির্ভরশীল। এইটি পৃথিবীর অনিবার্য উদ্ভিদ ও প্রাণির জীবনচক্র। অনাদিকাল ধরে নানা ত্যাগ ও তিতিক্ষার মুখোমুখি হয়ে আত্মক্ষয়ে আরেক জীব উর্বর হয়।

মানুষ মনে করে জীবজন্তুর কোনো অধিকার নেই; মানুষের জন্যই জীবজন্তুর সৃষ্টি। তথাকথিত এই ধারণাকে ভেঙ্গে দিয়েছেন প্রাণি অধিকার কর্মীরা। মানবমন সংযতকরণে কিছু সঞ্চীবনী মন্ত্রের দরকার হয়। তারা তা করে দেখাতে পেরেছে। তারা দেখিয়েছে যে পশুর প্রতি মানুষ যে ব্যবহার করে তা যদি মানুষের উপর পতিত হয় তা হলে কী অবস্থা হবে তা একবার ভেবে দেখার অনুরোধ করেন। আত্ম বিশ্লেষণে নিরন্তর জাগিয়ে তোলার অহর্নিশ চেষ্টা চালান। মানবজীবনের কর্তব্য ও মানবমন নিয়ে কিছুটা বিশ্লেষণের প্রয়োজন সৃষ্টি করতে পার হয় দীর্ঘ সময়। যৌক্তিক দাবী ও আন্দোলনের ফলে জীবজন্তুর অধিকারের সর্বজনীন ঘোষণা গৃহীত হয়। এই অধিকারকে উপযুক্ত করে তোলার জন্য ১৯৯৮ সালের ১০ ডিসেম্বর প্রথমবারের মতো ‘আন্তজার্তিক পশু অধিকার দিবস’ পালন করা হয়।

১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে মানুষের অধিকার আদায়ে সর্বজনীন ঘোষণা করা হয়েছিল। এই ঘোষণার দিনটি স্মরণীয় করে রাখার লক্ষ্যে ১৯৫০ সালের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ৪২৩/৫ নম্বর সিদ্ধান্তের অনুবলে প্রতি বছর ১০ ডিসেম্বর জাতিসংঘভুক্ত দেশসমূহে ‘বিশ্ব মানবাধিকার দিবস’ পালন হয়ে আসছে। পশুপ্রেমীদের মনেও এই নিয়ে সমান দাগ কাটে। জীবজন্তুর প্রতি মানুষের নিুষ্ঠুরতা বন্ধে এবং শান্তিপূর্ণ ও স্বাভাবিক বিকাশ নিশ্চিত করার নিশ্চয়তা দাবী করে। তাদের যুক্তি মানুষ আর পশুতে তফাৎ বুদ্ধিগত, পশুরা সহজ অনর্গল স্বতঃর্স্ফূত ভাষায় প্রকাশ করতে পারে না কেবল। বাকী সকল ক্ষেত্রে, বিশেষ করে জৈবিক বিবেচনায় উভয়ের মধ্যে কোনো তফাৎ নেই। মানুষের মাঝে মানসিক অস্থিরতা আচার আচরণ, দ্বন্ধ সংঘাত মূর্ত হয়ে দেখা দিলেও পশুরা তা অর্থপূর্ণ শব্দ উচ্চারণের মাধ্যমে প্রকাশ করতে পারে। তাই পশুর অধিকার ও মানুষের অধিকার অভিন্ন। এই জন্য মানুষের জন্য মানবাধিকার দিবসের দিনটিই একসাথে একত্রে মিলেমিশে পশু অধিকার দিবস পালন করার ঘোষণা করা হয়। জীবন স্বাভাবিক চলমান রাখার খাতিরে অনেক কিছুকে বিসর্জন দিতে হয়। দৃষ্টি প্রসারিত করতে হয়। শ্রবণশক্তির ক্ষমতা বৃদ্ধি করা লাগে। এই কঠিন বাস্তবতাকে প্রয়োজনমাফিক পরিবর্তনের প্রয়োজনেই এই দিবস। একবিংশ শতকের এই স্বর্ণযুগে, আধুনিকতা ও প্রগতির এই যুগে মানুষে পশুতে মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে, তা ভাবনার অতীত। মানুষের দানবীয় চেতনার সমুচ্চারে নানা কেচ্চাকাহিনীর দাপটে চরিত্র যেন বর্বর-পাশবিক, কদর্য, সভ্যতা, ভব্যতার পরিপন্থী না হয় সেই জন্যই মানবসভ্যতা।

মানব মনের যুদ্ধ, দাঙ্গা, সংঘর্ষ, রক্তপাত, মৃত্যু, জ্বালাও-পোড়াও নীতি এই সব দুষ্টপন্থা পাপ, পরন্তাপকে ধুয়ে-মুছে এগিয়ে চলাই মানবাধিকার। ধনে-মানে, শিক্ষা-সংস্কৃতিতে বিত্তবেসাতের ¯ু’লকায়াতে সর্বত্র-সবজায়গায় এমনকি পাহাড়-সমতল, শীত-গ্রীষ্ম, কিংবা পদ্মা-তিস্তারধারা অব্যাহত থাকলেও মানুষের মনের উগ্রতা, ক্ষমতালিপ্সা অব্যাহত থাকে। ফলে জীবনের সবকিছুতে পস্তাতে হয়। মূঢ়, ম্লান ,মূক ও মুখে নিপতিত হয়। বর্তমান সময়ে বহুল উচ্চারিত একটি শব্দ দুর্ঘটনা। শহর থেকে গ্রাম-জেলা-উপজেলা ইউনিয়নে সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষ হতাহতের খবর পাওয়া যায়। পরিসংখ্যান নির্ভুলভাবে তুলে আনা হয়। মানুষ বিষাদে পরে, কষ্টের-বেদনার বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। সমালোচনার বন্যা বয়ে যায়। গালমন্দ, খিস্তিখেউড়ের পারঙ্গমতা দেখায়।

মৃত্যুর খবরটাই ব্যথিত হওয়ার, শোক-দুঃখ প্রকাশের। কিন্তু মানুষ ব্যতিত নিরীহ নিরপরাধ অহিংস অবলা প্রাণীর দুর্ঘটনায় মৃত্যুর কোন পরিসংখ্যান নেই। খুব বেশি আবেগ আক্ষেপত্ত সৃষ্টি হয় না। বিষয়টি অনেকের নিকট খুব স্বাভাবিক এবং অতিকায় সহজ মনে হয়। স্বীকার করা ভালো প্রতিনিয়ত গাড়িচাপায় অসংখ্য প্রাণির মৃত্যু হচ্ছে। এ ক্ষতি আমাদেরই, সমাজের, সামাজিক পরিণতির।
জর্জ এলিয়েট বলেছিলেন- ‘প্রাণি এমন একমত বন্ধু তারা কোন প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করে না, তারা কোন সমালোচনা করে না।’ অথচ প্রাণিদের ভালোবাসার বিশালতা আমাদের কল্পনাকেও হার মানায়। জীবনের বিভিন্ন পর্বে কোন না কোনভাবে মানুষ প্রাণিতে বন্ধুত্ব হয়। তখন উপলদ্ধি করতে পারে এই প্রাণির ভালোবাসার গভীরতা। এখানে আলোচনা নিষ্প্রয়োজন যে পশু পাখি প্রকৃতির অন্যতম উপাদান। এদের প্রতিদ ভালোবাসা রাখা এবং অধিকার রক্ষা করা নৈতিক দায়িত্ব।

পশুর প্রতি মানষের আচরণ হওয়া উচিত একজন মানুষের প্রতি মানুষের যেমন, ঠিক তেমন। পশুবিজ্ঞানীরা আক্ষেপ করে বলেছেন, পশু-পাখির প্রতি যদি সহানুভুতি না দেখাতে পারে, তাহলে সেই মানুষ মানুষের প্রতি সহানুভূতি দেখাতে পারবে না। পশুপাখি নিষ্পাপ প্রাণি, পাপ করার কোন প্রয়োজন পরে না। এই নিষ্পাপ প্রাণির প্রতি আমরা মমতা-মায়া-সহানুভূতি, মানবোচিত, মানবীয়, মানুষি, মানুষিক, মানবিক হতে না পারি; তবে মানুষ হিসাবে আমরা মূল্যহীন। মানুষের প্রতিও মমত্ব দেখানো সম্ভব হয় না।

যুক্তরাষ্ট্রের এফবিআই ‘সিরিয়াল কিলারদের’ উপর এক বিশুদ্ধ সমীক্ষা চালিয়েছে। একেবারে গভীর মস্তিস্কে ঘন্টা নেড়ে দেওয়া রিপোর্টে দেখা গেছে এইসব কিলাররা হাত পাকিয়েছে পশুদের প্রতি নির্দয়তা দেখাতে দেখাতেই্। তারা ‘অ্যামিন্যাল অ্যাবিউজ’ করেছে কোন ঘৃনা বা বিদ্বেষ থেকে নয়, করেছে শ্রেণি-গোত্র-বর্ণ, জাতপাত নির্বিশেষে। পশুর প্রতি পশুত্ব নতুন নয়, বেশ পুরনো। সামাজিক মনোবৈকল্য বা প্রতিবন্ধীতার জন্যই পশুর ওপর নিষ্ঠুর ব্যবহার করা হয়। সময়ের সাথে সাথে পরিবশে প্রকৃতির পরিবর্তনে সবকিছু উল্টোপাল্টা হয়ে যায়। চিন্তাভাবনা ও জীবনের অনেক পরিবর্তন হয়। হয় না কেবল পশুদের প্রতি নিষ্ঠুরতার আচরণ।

মনোবিজ্ঞানীরা এই অবস্থাকে এক ধরনের মানসিক সমস্যা বলে আখায়িত করেছেন। বিস্মিত ও চমকিত করে এই আচরণকে বলেছেন ‘ডিসলেক্সিয়া’। নীতিশ্রাস্ত্র মতে মানবসমাজের জন্য সামাজিক অধিকার, রাষ্ট্রীয় অধিকার, রাজনৈতিক অধিকার, অর্থনৈতিক অধিকার, আইনগত অধিকার, নৈতিক অধিকার, সাম্যের অধিকার, শোষণের বিরুদ্ধে অধিকার, সংস্কৃতি ও শিক্ষাক্ষেত্রের অধিকার, সাংবিধানিক অধিকার, মৌলিক অধিকার, অন্ন-বস্ত্র, বাসস্থান চিকিৎসা শিক্ষা পাওয়ার অধিকার, চিন্তা বিবেক বাক স্বীধানতার অধিকার, সম্পত্তির অধিকার, চলাফেলার অধিকার আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার, সরকারি চাকরি লাভের অধিকার এমন হাজারো অধিকারের কথা অধিকার হিসাবে বলা হলেও পশুদের জন্য কার্যকর কেবল ‘নৈতিক অধিকার’। এই অধিকার নিয়েই বিবেক নিসৃত। সামাজিক নৈতিকতা বা ন্যায়বোধ থেকে উৎসারিত হয়।

নৈতিক অধিকারের কোন আইনগত ভিত্তি নেই। রুচিও মননের সংযোগ, অনুভূতি ও কল্পনা করার শক্তি আচরণ হাসিমাখা মুখ, স্নিগ্ধ চোখের ইশারা, কথা বলার ভঙ্গি পরিহিত পোশাকের সাধারণ মাধুর্য, বাহ্যবস্তুর জ্ঞান ইত্যাদি। নানা উপাচার মানবিক, নৈতিক পরিস্থিতিতে সমৃদ্ধ করে। আলোকিত করে। সৌজন্য থাকলে, সত্য ও বিনয় থাকলে কপটতা বর্জিত হলে এর ফল হাতেনাতে পাওয়া যায়। মানুষে এইসব গুণাগুণ বাহ্যিক সংস্কৃতির প্রকাশ। চোখে দেখা যায় না, কানে শোনা যায় না এবং তা সঙ্গে সঙ্গে উপলদ্ধিও করা যায় না।

নৈতিক ব্যক্তিত্বের মানুষটি তৈরি হয় শিক্ষা নিয়ে। শিক্ষা মানুষের মনকে যদি পরিবর্তন না করে। প্রসারিত না করে, সহনীয়-সহিষ্ণু না করে বিদ্যাশিক্ষার আগের মানুষ আর বিদ্যার্জনের পরের মানুষটি যদি এক হয়, তবে মানুষ হিসাবে জন্মগ্রহণ অর্থহীন। মানুষের বিবেক ও সামাজিক নৈতিকতা বা ন্যায়বোধ থেকে আসে নৈতিক অধিকার। এটি রাষ্ট্র কর্তৃক প্রণয়ন করা হয় না। নির্লোভ নির্মোহভাবে জীবন পথে দুর্বলকে সাহায্য লাভের সুযোগ এগিয়ে নেওয়াই নৈতিক দায়িত্ব এবং প্রাপকের অধিকার। বিবেকবোধ দ্বারা এই বিশিষ্টতা ও বিশালতা অর্জন করতে হয়। এই অধিকার কেবল হদয়কে আর্দ্র করার। এর কোনো শ্রেনিবিভাগ করা যায় না। এই অধিকার ভঙ্গকারীকে কোন রকম শাস্তির আওতায় আনা যায় না। এর উৎস গোপনে নিভৃতে। নিজ বিবেকের তাড়নায় সৃষ্টি বোধ ও কর্মে সক্রিয় ব্যক্তিসত্তা। এর ব্যত্যয় হলে নিজে নিজে দ্বগ্ধ হয়ে সমাজে উপহাসের পাত্র হয় মাত্র।

প্রতি প্রাণির আলাদা আলাদা অধিকার সম্পর্কে অতিসাম্প্রতিক তীব্র আলোচনা চললেও এর ভিত্তি অনেক পুরনো। কিঞ্চিত দীর্ঘ নয়। প্রাচীন গ্রীস, রোম বা অন্যান্য জায়গায় এই বিষয়ে আলোচনার সুত্রপাত হয়েছিল। তবে অধিকারকে পাকাপোক্ত করার চূড়ান্ত লড়াই শুরু হতে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। অষ্টাদশ শতাব্দীর রাজনৈতিক বিপ্লবের পর প্রাণির স্পন্দন বোঝার অবলম্বন পাওয়া যায়। মানুষের অধিকারকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার ব্যাপক আলোচনা পর্যালোচনার অধিকার পায়।

ধূলি-ধূসর দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হতে থাকে। আশা নিরশার দ্বন্ধে ভুগতে ভুগতে অন্ধকার মোচন করার প্রয়োজনে বোঝা পড়ার তাগিদ শুরু হয়। সৃষ্টি হয় নানামুখী আবহ। দার্শনিক সামাজিক মতবাদের বন্দনা আর প্রেরণা। এই সমস্ত পণ্ডিতরা বেশ বদ্ধিমান এবং অতি সতর্ক। মানুষের অদ্ভুত মানসিকতাকে গতি আর প্রাণময় করে এগিয়ে চলে। ইতিহাসের পৃষ্টায় যুক্ত হয় মানবাধিকার। দারুণভাবে উদ্দীপ্ত হয় মানুষ। দেশে দেশে অগণিত মানুষ বিভিন্ন ধরনের সমস্যায় পীড়িত হলেও মানুষের অধিকারের বিষয়টি শক্তিশালী হতে থাকে।

মানুষের অধিকার এগিয়ে চলার পথ ধরে জীবজন্তুর অধিকার ও একই পথে হাঁটছে। প্রকাশ্যে অকুন্ঠ সমর্থন পাচ্ছে ‘পশু অধিকার’। ঘটনাবহুল জটিল হিসাবের জালে বন্দি হয়েও ক্ষেত্র বিশেষে প্রতিরোধের বেড়া পার হতে সমর্থ্য হয়েছে। পশু অধিকার আদায়ে দারুণভাবে লড়ে গতিশীলতার স্বাক্ষর রাখছে। আন্তর্জাতিক চত্তরে এই নিয়ে ভীষণ হৈচৈ এবং উৎসাহ দেখা দিয়েছে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে জীবজন্তুর অধিকার প্রতিষ্ঠার মতিগতি এখনো রহস্যঘেরা। নিভৃতে, পর্দার আড়ালে, অন্তরালে। সেই দিক বিবেচনা করলে পশু অধিকার দিবসের এই দিনে তাদের মহিমা তুলে ধরা, উদারতার বিস্তার দাবী করা নৈতিক দায়িত্ব।। এই দাবী-দায়িত্বের বিষয়টি একদমই অন্যরকম। মানবেতিহাসে অনন্য। জীবজন্তুর প্রতি রঙ্গতামাসার বোধ পরিত্যাগ করে সদয় ও স্নেহশীল হই। তাদের জন্য ভালোবাসা ও মমতা লালন করি এবং প্রকৃতির সৌন্দর্য রক্ষায় মনোযোগী হই। আমাদের জীবনসাধনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হোক ‘পশু’ আজকের দিনে এমনটাই প্রত্যাশা।

লেখকঃ খন রঞ্জন রায়,সমাজচিন্তক, গবেষক ও সংগঠক।