মো.কামাল উদ্দিন: ইসকনের মূল ভাবনায় আছে এক ধরনের শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবনযাপন: নিরামিষভোজী হওয়া, মদ্যপান ও নেশা থেকে দূরে থাকা, জুয়া পরিহার করা এবং সংযমী জীবনযাপন করা। এই আদর্শ মেনে চলতে প্রচুর ধৈর্য ও নিয়মানুবর্তিতা প্রয়োজন। কিন্তু সাম্প্রতিককালে হাজারি গলিতে ঘটে যাওয়া ঘটনা দেখে প্রশ্ন জাগে—এই আদর্শ কোথায় হারিয়ে গেল?একটি সামান্য ফেসবুক পোস্ট, যা মূলত ইসকনের সংগঠন বিরোধী ছিল, কিন্তু কোনো ধর্মের বিরুদ্ধে নয়—তারই প্রতিক্রিয়ায় কিছু মানুষ ক্ষিপ্ত হয়ে হামলার পথ বেছে নেয়। এতে বোঝা যায়, যারা এই ঘটনা ঘটিয়েছে, তারা যেন মাতালের মতো আচরণ করেছে—যা ইসকনের নীতির সম্পূর্ণ বিরোধী।

যে সংগঠন নিজেকে ধৈর্য, সংযম, এবং শান্তির প্রতীক বলে দাবি করে, তাদের একাংশের এমন আচরণ যেন সেই আদর্শকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। প্রশাসন তো ছিল, আইনের সহায়তা নিয়ে পরিস্থিতি সামলানো যেত। তবু কেন এমন অনিয়ন্ত্রিত প্রতিক্রিয়া হলো? সব মিলিয়ে ঘটনাটি এলোমেলো মনে হচ্ছে, তাই ইসকন নিয়ে আজ এই লেখা লিখতে বসলাম। ইসকন (ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি ফর কৃষ্ণ কনশাসনেস) প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৬৬ সালে। এটি প্রতিষ্ঠা করেন শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ। ইসকনের প্রধান লক্ষ্য ছিল ভগবান শ্রীকৃষ্ণের প্রতি প্রেম ও ভক্তির প্রসার ঘটানো এবং তার আধ্যাত্মিক শিক্ষার মাধ্যমে মানুষের চেতনার উন্নয়ন করা। মূলত শ্রীমদ্ভাগবতম ও ভগবদ্গীতার উপদেশকে ভিত্তি করে গঠিত এ সংগঠনটি বিশ্বব্যাপী ভগবানের প্রতি আত্মসমর্পণ, মানবিক উন্নয়ন, এবং সহমর্মিতার শিক্ষা ছড়িয়ে দিতে কাজ করে।

ইসকন ইস্যুনিয়ে কেন হিন্দু মুসলমান বিতর্ক- তার আগে আমরা হিন্দু মুসলমানের সম্প্রতির ইতিহাস নিয়ে কথা বলে দেখি-

বাংলাদেশে হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায়ের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ইতিহাস বহু পুরনো। ভারতীয় উপমহাদেশে, বিশেষ করে বাংলায়, শত শত বছর ধরে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ একসাথে বসবাস করে আসছে। ইতিহাসে দেখা যায়, বেশিরভাগ সময়েই এই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ছিল, যা এ অঞ্চলের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে কিছু বিশেষ রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে সাময়িক উত্তেজনা ও সহিংসতা দেখা দিলেও সাধারণ জনগণের মাঝে সম্প্রীতি বজায় ছিল উল্লেখযোগ্য।

হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির ইতিহাস বাংলা অঞ্চলে হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের সহাবস্থান প্রথম থেকেই মূলত সাংস্কৃতিক ও সামাজিক মেলবন্ধনের মধ্য দিয়ে বিকাশ লাভ করে। মুঘল শাসনামলে বিশেষভাবে বাংলায় বিভিন্ন ধর্মের মানুষ তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি এবং ধর্মীয় উৎসব পালনের সুযোগ পেতো। এরপরে, ব্রিটিশ শাসনামলে ধর্মীয় উত্তেজনার কিছু ঘটনা দেখা গেলেও অধিকাংশ সময় ধর্মীয় পরিচয়কে ছাড়িয়ে বাঙালিত্বের ভাবধারাই প্রধান হিসেবে উদযাপিত হয়। বাংলার সুফি-সাধক ও বৈষ্ণব কবিরা শান্তির বার্তা ছড়িয়েছেন, যা সমাজে একতা ও সম্প্রীতির মজবুত ভিত্তি স্থাপন করে।

১৯৪৭ সালে ভারত বিভাজনের পর সৃষ্ট নতুন রাজনৈতিক সীমানা, অর্থাৎ পাকিস্তান ও পরে বাংলাদেশ হিসেবে পরিচিত এই অঞ্চলে, ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা মাঝে মাঝে নির্যাতনের শিকার হলেও সাধারণ ভাবে হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায় একসঙ্গে বসবাস করেছে। বিশেষ করে, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময়ে হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায় একত্রিত হয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্ভাসিত জাতির এই সংহতি হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ককে একটি নতুন মাত্রায় উন্নীত করে।বাংলাদেশে সম্প্রীতির বিকাশ স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে সংবিধান রচনা করা হয়, যেখানে সকল ধর্মের মানুষের অধিকার, সমান সুযোগ এবং ধর্ম পালনের স্বাধীনতার গ্যারান্টি দেওয়া হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার এই সংবিধানের মাধ্যমে ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে, যা সমাজে ধর্মীয় সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখে।

পরবর্তী কয়েক দশক ধরে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের প্রতি সমর্থন জানাতে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। বিশেষ করে বিভিন্ন উৎসব উপলক্ষে সরকারীভাবে ছুটি ঘোষণা এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে সহযোগিতার মতো পদক্ষেপগুলো সম্প্রীতির বন্ধন আরও মজবুত করেছে। বর্তমান সমস্যার কারণ সাম্প্রতিক বছর গুলোতে হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির ঐতিহ্যে কিছু চ্যালেঞ্জ দেখা দিয়েছে। এই চ্যালেঞ্জগুলোর কারণ হতে পারে: রাজনৈতিক ও সামাজিক উত্তেজনা: রাজনীতিতে ধর্মকে ব্যবহার করা এবং তা দিয়ে উস্কানিমূলক বক্তব্য প্রচার, বিভিন্ন সময়ে সামাজিক উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে। কিছু রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠী তাদের স্বার্থে ধর্মীয় বিভাজন সৃষ্টি করতে পারে, যা সাধারণ জনগণের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি করে। সামাজিক মাধ্যমের অপব্যবহার: বর্তমান ডিজিটাল যুগে গুজব ছড়ানো অত্যন্ত সহজ হয়ে গেছে। বিশেষ করে সামাজিক মাধ্যমে ধর্মীয় বিষয় নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং এতে উস্কানি দিয়ে সহিংসতা ঘটানোর প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়।

ইসকন এবং বিদেশী প্রভাব: ইসকন একটি আন্তর্জাতিক সংগঠন, এবং তাদের কিছু কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের মাঝে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। ইসকনের কিছু সমর্থক স্থানীয় জনগণের বিশ্বাসের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে, যা সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সংকট: ইদানীং কিছু কিছু রাজনৈতিক এবং সামাজিক সংঘর্ষ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ভিত্তিকে নাড়া দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মন্দির ভাঙচুর, সংঘর্ষ, এবং বিভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অপপ্রচার।

সমাধানের পথ বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন:প্রশাসনের কঠোর নজরদারি: যে কোনো ধরনের সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বা উস্কানির বিরুদ্ধে কঠোরভাবে পদক্ষেপ নিতে হবে। সামাজিক মাধ্যমের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখা এবং ধর্মীয় অপপ্রচার বন্ধ করতে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রয়োগ করতে হবে। ধর্মীয় নেতাদের একত্রিত করা: সকল ধর্মের নেতাদের একত্রিত করে তারা যাতে শান্তির বার্তা প্রদান করেন, সেই উদ্যোগ নিতে হবে। সাধারণ মানুষের মধ্যে সহনশীলতা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের বার্তা ছড়াতে হবে।

জনসচেতনতা ও শিক্ষার প্রসার: বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠান এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে ধর্মীয় সহনশীলতার গুরুত্ব তুলে ধরে শিক্ষামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উপর বিশেষ কর্মশালা এবং সেমিনারের আয়োজন করা যেতে পারে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও বাংলাদেশের ভাবমূর্তি রক্ষা: আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি রক্ষায় সরকারকে কূটনৈতিকভাবে সক্রিয় থাকতে হবে। ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষায় উদ্যোগী হয়ে দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলো সমাধানে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে হবে। স্থানীয় প্রশাসনের শক্ত ভূমিকা: স্থানীয় প্রশাসন এবং স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও জনপ্রতিনিধিদের এগিয়ে এসে উস্কানিমূলক কর্মকাণ্ডে বাধা প্রদান করতে হবে এবং সম্প্রীতির বার্তা ছড়াতে হবে।

বাংলাদেশের হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির ইতিহাস বহু পুরনো এবং এটি আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সাম্প্রতিক ঘটনাবলিতে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হলেও এটি অস্থায়ী সমস্যা। জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি, সরকারের সক্রিয় পদক্ষেপ এবং ধর্মীয় সম্প্রীতি রক্ষায় সবার প্রচেষ্টায় আমরা পুনরায় এই ঐতিহ্যকে রক্ষা করতে সক্ষম হবো। অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ। ইসকনের প্রধান লক্ষ্য ছিল ভগবান শ্রীকৃষ্ণের প্রতি প্রেম ও ভক্তির প্রসার ঘটানো এবং তার আধ্যাত্মিক শিক্ষার মাধ্যমে মানুষের চেতনার উন্নয়ন করা। মূলত শ্রীমদ্ভাগবতম ও ভগবদ্গীতার উপদেশকে ভিত্তি করে গঠিত এ সংগঠনটি বিশ্বব্যাপী ভগবানের প্রতি আত্মসমর্পণ, মানবিক উন্নয়ন, এবং সহমর্মিতার শিক্ষা ছড়িয়ে দিতে কাজ করে। প্রতিষ্ঠার ইতিহাস শ্রীল ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ নিউ ইয়র্কে এসে প্রথমে কয়েকজন অনুসারীর সাথে মিলে ইসকন প্রতিষ্ঠা করেন। তার উদ্দেশ্য ছিল প্রাচীন ভারতীয় বৈষ্ণব দর্শন ও ভক্তি-সংস্কৃতি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দেওয়া।

নিউ ইয়র্কে ছোট্ট এক অ্যাপার্টমেন্টে শুরু হলেও ইসকন দ্রুত বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে এটি প্রায় ১০০টিরও বেশি দেশে কাজ করছে, এবং বেশ কয়েকটি স্থানে ইসকনের মন্দির ও আশ্রম রয়েছে। ইসকনের আদর্শ ও কার্যক্রম ইসকনের মূল আদর্শ ভগবান কৃষ্ণের প্রতি ভক্তি ও প্রেমকে জীবনের কেন্দ্রবিন্দুতে স্থাপন করা। এর প্রধান শিক্ষা “হরে কৃষ্ণ, হরে কৃষ্ণ, কৃষ্ণ কৃষ্ণ, হরে হরে হরে রাম, হরে রাম, রাম রাম, হরে হরে” মহামন্ত্রের মাধ্যমে চেতনাকে শুদ্ধ করা। ইসকন সদস্যরা বৈষ্ণব ধর্মের চতুর্দশ নিয়ম অনুসরণ করেন, যা সনাতন ধর্মের অনেক দিককে অন্তর্ভুক্ত করে। এর মধ্যে প্রধান নিয়মগুলো হলো নিরামিষ ভোজ পালন, মাদকদ্রব্য থেকে দূরে থাকা, এবং যৌন সংযম।

ইসকন সদস্যরা ভগবদ্গীতার শিক্ষা অনুসরণ করে এবং এই শিক্ষা অনুযায়ী মানবকল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করে থাকে। সংগঠন পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ ইসকনের প্রধান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা হলো “গভর্নিং বডি কমিশন” (GBC), যা প্রভুপাদ নিজেই প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সংগঠনকে সুসংগঠিত রাখার জন্য। বর্তমানে GBC ইসকনের বিভিন্ন দেশের কার্যক্রম ও নির্দেশনা নিয়ন্ত্রণ করে এবং এদের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী ইসকনের মূল নীতিমালা ও কার্যক্রম পরিচালিত হয়। তবে ভক্তিবেদান্ত স্বামীর আদর্শ ও শিক্ষাই ইসকনের মূল প্রেরণা এবং এটির কার্যক্রমের মূল দিক নির্দেশনা। ইসকনের সমাজে ভূমিকা ও অবদান ইসকন সারা বিশ্বে ভক্তি আন্দোলনের একটি শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। এরা বিভিন্ন মন্দির, কৃষ্ণ উৎসব, রথযাত্রা, এবং স্কুল পরিচালনার মাধ্যমে হিন্দু ধর্ম ও সংস্কৃতিকে প্রচার করে। এছাড়া ইসকন নানা সেবামূলক কার্যক্রম, যেমন বিনামূল্যে খাবার বিতরণ, শিক্ষামূলক কার্যক্রম, এবং হাসপাতাল পরিচালনা করে মানবকল্যাণে অবদান রেখে চলেছে।

ইসকন শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় সংগঠন নয়, এটি একটি বৈশ্বিক ভক্তি আন্দোলন, যা মূলত আধ্যাত্মিক ও সামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে কাজ করছে। বিশ্বব্যাপী হিন্দু ধর্মের প্রচার, ভক্তি ও চেতনার উন্নয়ন এবং মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করার ক্ষেত্রে ইসকন একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে। ইসকন সম্প্রতি বাংলাদেশে বিশেষত চট্টগ্রামে একটি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে, যার কারণ হিসেবে তাদের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড ও দাবিগুলোর মধ্যে নতুন কিছু রাজনৈতিক ও সামাজিক বিষয় উঠে এসেছে। বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে বহু ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষ একত্রে বাস করে, সেখানে যে কোনো ধর্মীয় সংগঠনের কর্মকাণ্ডকে সাধারণ মানুষের উপর প্রভাব ফেলতে পারে। হঠাৎ ইসকন নিয়ে আগ্রহ ও সমালোচনার কারণ বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে ইসকনের বেশ কিছু কার্যকলাপ ও বক্তব্য বিশেষভাবে নজর কেড়েছে।

ইসকন তাদের ভক্তি আন্দোলন প্রচারের পাশাপাশি কিছু রাজনৈতিক এবং সামাজিক দাবি ও কর্মকাণ্ডে মনোযোগ দিয়েছে, যা একদিকে যেমন তাদের ধর্মীয় ভক্তদের উদ্দীপ্ত করছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের মধ্যে কৌতূহল এবং সমালোচনা বাড়িয়ে দিয়েছে। চট্টগ্রামে তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহী মামলা এবং সমালোচনা চট্টগ্রামে ইসকনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা দায়েরের বিষয়টি দেশজুড়ে আলোচনার সূত্রপাত করেছে।

সাধারণত, ধর্মীয় সংগঠনগুলোর কর্মকাণ্ড ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। চট্টগ্রামের মামলাটি মূলত আমাদের জাতীয় পতাকা উপর তাদের মনগড়া ইতিহাস পরিবর্তনের মনোভাব নিয়ে তাদের পতাকা উত্তোলন করে তাতে রাষ্ট্র বিরোধী ষড়যন্ত্র বলে মনে করার পাশাপাশি তাদের কার্যকলাপের মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বৃদ্ধির অভিযোগে দায়ের করা হয়েছে। অনেকে মনে করেন, তাদের কার্যকলাপ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে এবং দেশপ্রেমের বিরোধী অবস্থান তৈরি করতে পারে।

ইসকনের পূর্বে ঘোষিত ৮ দফা দাবি ইসকন সম্প্রতি কিছু দাবি উত্থাপন করেছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি দফা হলো: 1. সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর আক্রমণ ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রণয়ন। মন্দির ও পূজা মন্ডপে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা। শিক্ষাব্যবস্থায় ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষা প্রদান নিশ্চিত করা। ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জন্য সরকারি চাকরিতে বিশেষ কোটা চালু করা।সনাতনী সমাজের উন্নয়নে সরকারি বরাদ্দ বৃদ্ধি করা। এই দাবিগুলোতে ইসকন মূলত নিজেদের সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা, উন্নয়ন ও সমানাধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে। তবে, অনেকেই মনে করেন যে এই দাবি গুলোতে কিছু রাজনৈতিক ভাষা যুক্ত রয়েছে, যা তাদের ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের বাইরে চলে গেছে। তাদের এই দাবিগুলো নিয়ে সমাজে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখতে ইসকনের করণীয় বাংলাদেশে ইসকনের মতো ধর্মীয় সংগঠনগুলোর কাছে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার জন্য দায়িত্ববোধ থাকা জরুরি। কিছু পদক্ষেপ ইসকন গ্রহণ করতে পারে যাতে তারা নিজেদের ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে সীমাবদ্ধ থাকে এবং সাম্প্রদায়িক ঐক্য বজায় রাখতে সহযোগিতা করে। এগুলো হলো: ধর্মীয় সংযম ও সহনশীলতা: ধর্মীয় উস্কানি এড়ানো এবং ভক্তদের উদ্দীপ্ত করার সময় সংযম ও সহনশীলতা প্রদর্শন করা। সামাজিক সংলাপ: স্থানীয় মুসলিম নেতৃবৃন্দের সাথে সংলাপ ও আলোচনা শুরু করা, যাতে পারস্পরিক বোঝাপড়া বৃদ্ধি পায়। সামাজিক দায়িত্ব পালন: ধর্মীয় কার্যকলাপের পাশাপাশি সমাজের সার্বিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখা, যেমন দরিদ্রদের জন্য খাদ্য বিতরণ, চিকিৎসা প্রদান, ইত্যাদি। মাধ্যমিক সহিংসতা এড়ানো: যেকোনো ধরনের ধর্মীয় প্রতিক্রিয়া বা কার্যক্রমে ভক্তদের শান্তিপূর্ণ অবস্থান বজায় রাখতে উৎসাহিত করা। সহযোগিতা ও বন্ধুত্ব: স্থানীয় মুসলিম এবং অন্যান্য সম্প্রদায়ের নেতাদের সাথে সহযোগিতা করে একত্রে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বার্তা প্রচার করা।

ইসকনের দাবির অন্তর্নিহিত বার্তা ইসকনের দাবিগুলোর মাধ্যমে তারা বাংলাদেশের সনাতন সম্প্রদায়ের সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং উন্নয়নের গুরুত্ব তুলে ধরেছে। তাদের ভাষায় এটি সম্পূর্ণরূপে সামাজিক সমতা ও ন্যায়বিচার দাবি, তবে সমালোচকরা মনে করেন, এটি একটি জাতীয় সংগঠনের পক্ষে দেশের সরকারের বিরুদ্ধে কিছুটা অবস্থান নেওয়া হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। বাংলাদেশে ইসকন সহ সব ধর্মীয় সংগঠনের একতা এবং সামাজিক দায়িত্ববোধ প্রয়োজন, বিশেষ করে একটি বহুধর্মীয় রাষ্ট্রের সাম্প্রদায়িক ঐক্য বজায় রাখতে। ইসকন যদি তাদের কার্যক্রম এবং দাবিগুলোকে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখে এবং সমাজের শান্তি ও ঐক্যের প্রতি সম্মান দেখায়, তবে তা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জন্য সহায়ক হবে।

সাম্প্রতিক চট্টগ্রামের হাজারী গলিতে ইসকন বিরোধী একটি ফেসবুক পোস্ট নিয়ে যে তীব্র উত্তেজনা ও সহিংসতা সৃষ্টি হয়েছে, তা একটি গভীর সামাজিক উদ্বেগের বিষয়। ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে সেখানে জনমনে বিভ্রান্তি ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। চট্টগ্রামের সাম্প্রতিক এই উত্তেজনার পেছনে বেশ কিছু কারণ থাকতে পারে। তা হলো:সামাজিক বিভ্রান্তি ও গুজবের প্রসার: ফেসবুক ও সামাজিক মাধ্যমের মাধ্যমে গুজব ও বিদ্বেষমূলক পোস্ট দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, যা জনমনে ক্ষোভ ও উত্তেজনা বৃদ্ধি করে। ইসকনকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যেই সাধারণ মানুষের মধ্যে কিছু প্রশ্ন ও বিতর্ক ছিল, যা একটি ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে আরও বেড়ে যায়।

ধর্মীয় অনুভূতির প্রভাব: ধর্মীয় বিষয়ে মানুষের অনুভূতি অত্যন্ত সংবেদনশীল হওয়ায়, ছোটখাটো বিরোধেও উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়। ইসকনের কর্মকাণ্ড নিয়ে সাধারণ জনগণের মধ্যে বিভিন্ন মতামত এবং বিতর্ক ছিল, যা সুযোগসন্ধানী মহল সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টির জন্য ব্যবহার করে থাকতে পারে। উস্কানিমূলক গোষ্ঠী ও বাহিরের প্রভাব: কিছু অসাধু গোষ্ঠী এ ধরনের সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি করে দেশের ভেতরে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করতে চায়। এ ধরনের পরিস্থিতিতে সুবিধাবাদী ও উস্কানিমূলক মহল ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা কাজে লাগিয়ে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধার করতে চায়।

আইনশৃঙ্খলার শিথিলতা ও জনসচেতনতার অভাব: অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসন আগাম পরিস্থিতির উপর নজরদারি করতে ব্যর্থ হয়, যার ফলে পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যায়। জনসচেতনতার অভাব এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির নীতি মেনে চলার অনুপস্থিতি থেকেও এই ধরনের উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়।

সরকারের করণীয় সরকারের পক্ষ থেকে এই ধরনের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এবং পুনরায় এ ধরনের উত্তেজনা এড়াতে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। এই পদক্ষেপগুলো সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় সহায়ক হতে পারে:গুজব নিয়ন্ত্রণ ও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রয়োগ: ফেসবুক এবং অন্যান্য সামাজিক মাধ্যমের মাধ্যমে যেকোনো উস্কানিমূলক পোস্ট ও গুজব ছড়ানোর উপর কঠোর নজরদারি রাখা প্রয়োজন। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন অনুযায়ী গুজব সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত এবং সামাজিক মাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করতে বিশেষ টিম গঠন করা প্রয়োজন।

ধর্মীয় নেতৃত্বের ভূমিকা: ইমাম, পুরোহিত, এবং অন্যান্য ধর্মীয় নেতাদের কাছে আবেদন জানানো উচিত, যাতে তারা জনগণকে শান্তিপূর্ণভাবে এবং সৌহার্দ্য বজায় রাখতে পরামর্শ দেন। ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের সক্রিয় ভূমিকা সামাজিক শান্তি রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। জনসচেতনতা বৃদ্ধি: ধর্মীয় সম্প্রীতির গুরুত্ব এবং গুজবের প্রভাব সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করা দরকার। বিভিন্ন কর্মশালা, সেমিনার, এবং প্রচার প্রচারণা মাধ্যমে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় জনমনে একতা এবং সৌহার্দ্যের বার্তা পৌঁছানো যেতে পারে।

দ্রুত ও কার্যকর আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা: যেকোনো সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা দ্রুত এবং কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণে আনতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও সক্রিয় ও সতর্ক থাকতে হবে। সেনাবাহিনী ও পুলিশ বাহিনীর প্রশিক্ষণ এবং আধুনিক সরঞ্জামের মাধ্যমে এ ধরনের পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। দ্রুত বিচারের ব্যবস্থা:সহিংসতায় জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচারের ব্যবস্থা গ্রহণ করলে মানুষ সরকারের উপর আস্থা ফিরে পাবে এবং সাম্প্রদায়িক সংঘাতের বিরুদ্ধে সতর্ক থাকবে।

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি মজবুত করা: দেশব্যাপী সকল সম্প্রদায়ের মানুষদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহমর্মিতা বৃদ্ধির জন্য স্কুল-কলেজে বিশেষ শিক্ষামূলক প্রোগ্রাম এবং সম্প্রীতির বার্তা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। বাংলাদেশে বিভিন্ন ধর্মের মানুষের সহাবস্থান আমাদের ঐতিহ্যের অংশ। ইসকনকে কেন্দ্র করে যে ধরনের উত্তেজনা এবং সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা চট্টগ্রামে দেখা যাচ্ছে, তা সম্প্রীতির পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি স্বরূপ। সরকার ও সমাজের সকল শ্রেণীর মানুষের উচিত একত্রে এই ধরনের পরিস্থিতির মোকাবিলা করা। গুজব, ভুল বোঝাবুঝি, এবং সাম্প্রদায়িক উস্কানির উপর কঠোর নজরদারি রেখে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সৌহার্দ্য বজায় রাখা এবং অস্থিরতামুক্ত বাংলাদেশ গঠনের পথে এগিয়ে যাওয়া আমাদের সকলের দায়িত্ব।

লেখকঃ চট্টগ্রাম বিভাগীয় ব্যুরো প্রধান ও যুগ্ন সম্পাদক, দৈনিক ভোরের আওয়াজ ও The Daily banner এবং গবেষক টেলিভিশন উপস্থাপক।

মো.কামাল উদ্দিন: ইসকনের মূল ভাবনায় আছে এক ধরনের শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবনযাপন: নিরামিষভোজী হওয়া, মদ্যপান ও নেশা থেকে দূরে থাকা, জুয়া পরিহার করা এবং সংযমী জীবনযাপন করা। এই আদর্শ মেনে চলতে প্রচুর ধৈর্য ও নিয়মানুবর্তিতা প্রয়োজন। কিন্তু সাম্প্রতিককালে হাজারি গলিতে ঘটে যাওয়া ঘটনা দেখে প্রশ্ন জাগে—এই আদর্শ কোথায় হারিয়ে গেল?একটি সামান্য ফেসবুক পোস্ট, যা মূলত ইসকনের সংগঠন বিরোধী ছিল, কিন্তু কোনো ধর্মের বিরুদ্ধে নয়—তারই প্রতিক্রিয়ায় কিছু মানুষ ক্ষিপ্ত হয়ে হামলার পথ বেছে নেয়। এতে বোঝা যায়, যারা এই ঘটনা ঘটিয়েছে, তারা যেন মাতালের মতো আচরণ করেছে—যা ইসকনের নীতির সম্পূর্ণ বিরোধী।

যে সংগঠন নিজেকে ধৈর্য, সংযম, এবং শান্তির প্রতীক বলে দাবি করে, তাদের একাংশের এমন আচরণ যেন সেই আদর্শকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। প্রশাসন তো ছিল, আইনের সহায়তা নিয়ে পরিস্থিতি সামলানো যেত। তবু কেন এমন অনিয়ন্ত্রিত প্রতিক্রিয়া হলো? সব মিলিয়ে ঘটনাটি এলোমেলো মনে হচ্ছে, তাই ইসকন নিয়ে আজ এই লেখা লিখতে বসলাম। ইসকন (ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি ফর কৃষ্ণ কনশাসনেস) প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৬৬ সালে। এটি প্রতিষ্ঠা করেন শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ। ইসকনের প্রধান লক্ষ্য ছিল ভগবান শ্রীকৃষ্ণের প্রতি প্রেম ও ভক্তির প্রসার ঘটানো এবং তার আধ্যাত্মিক শিক্ষার মাধ্যমে মানুষের চেতনার উন্নয়ন করা। মূলত শ্রীমদ্ভাগবতম ও ভগবদ্গীতার উপদেশকে ভিত্তি করে গঠিত এ সংগঠনটি বিশ্বব্যাপী ভগবানের প্রতি আত্মসমর্পণ, মানবিক উন্নয়ন, এবং সহমর্মিতার শিক্ষা ছড়িয়ে দিতে কাজ করে।

ইসকন ইস্যুনিয়ে কেন হিন্দু মুসলমান বিতর্ক- তার আগে আমরা হিন্দু মুসলমানের সম্প্রতির ইতিহাস নিয়ে কথা বলে দেখি-

বাংলাদেশে হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায়ের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ইতিহাস বহু পুরনো। ভারতীয় উপমহাদেশে, বিশেষ করে বাংলায়, শত শত বছর ধরে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ একসাথে বসবাস করে আসছে। ইতিহাসে দেখা যায়, বেশিরভাগ সময়েই এই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ছিল, যা এ অঞ্চলের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে কিছু বিশেষ রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে সাময়িক উত্তেজনা ও সহিংসতা দেখা দিলেও সাধারণ জনগণের মাঝে সম্প্রীতি বজায় ছিল উল্লেখযোগ্য।

হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির ইতিহাস বাংলা অঞ্চলে হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের সহাবস্থান প্রথম থেকেই মূলত সাংস্কৃতিক ও সামাজিক মেলবন্ধনের মধ্য দিয়ে বিকাশ লাভ করে। মুঘল শাসনামলে বিশেষভাবে বাংলায় বিভিন্ন ধর্মের মানুষ তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি এবং ধর্মীয় উৎসব পালনের সুযোগ পেতো। এরপরে, ব্রিটিশ শাসনামলে ধর্মীয় উত্তেজনার কিছু ঘটনা দেখা গেলেও অধিকাংশ সময় ধর্মীয় পরিচয়কে ছাড়িয়ে বাঙালিত্বের ভাবধারাই প্রধান হিসেবে উদযাপিত হয়। বাংলার সুফি-সাধক ও বৈষ্ণব কবিরা শান্তির বার্তা ছড়িয়েছেন, যা সমাজে একতা ও সম্প্রীতির মজবুত ভিত্তি স্থাপন করে।

১৯৪৭ সালে ভারত বিভাজনের পর সৃষ্ট নতুন রাজনৈতিক সীমানা, অর্থাৎ পাকিস্তান ও পরে বাংলাদেশ হিসেবে পরিচিত এই অঞ্চলে, ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা মাঝে মাঝে নির্যাতনের শিকার হলেও সাধারণ ভাবে হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায় একসঙ্গে বসবাস করেছে। বিশেষ করে, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময়ে হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায় একত্রিত হয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্ভাসিত জাতির এই সংহতি হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ককে একটি নতুন মাত্রায় উন্নীত করে।বাংলাদেশে সম্প্রীতির বিকাশ স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে সংবিধান রচনা করা হয়, যেখানে সকল ধর্মের মানুষের অধিকার, সমান সুযোগ এবং ধর্ম পালনের স্বাধীনতার গ্যারান্টি দেওয়া হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার এই সংবিধানের মাধ্যমে ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে, যা সমাজে ধর্মীয় সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখে।

পরবর্তী কয়েক দশক ধরে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের প্রতি সমর্থন জানাতে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। বিশেষ করে বিভিন্ন উৎসব উপলক্ষে সরকারীভাবে ছুটি ঘোষণা এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে সহযোগিতার মতো পদক্ষেপগুলো সম্প্রীতির বন্ধন আরও মজবুত করেছে। বর্তমান সমস্যার কারণ সাম্প্রতিক বছর গুলোতে হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির ঐতিহ্যে কিছু চ্যালেঞ্জ দেখা দিয়েছে। এই চ্যালেঞ্জগুলোর কারণ হতে পারে: রাজনৈতিক ও সামাজিক উত্তেজনা: রাজনীতিতে ধর্মকে ব্যবহার করা এবং তা দিয়ে উস্কানিমূলক বক্তব্য প্রচার, বিভিন্ন সময়ে সামাজিক উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে। কিছু রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠী তাদের স্বার্থে ধর্মীয় বিভাজন সৃষ্টি করতে পারে, যা সাধারণ জনগণের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি করে। সামাজিক মাধ্যমের অপব্যবহার: বর্তমান ডিজিটাল যুগে গুজব ছড়ানো অত্যন্ত সহজ হয়ে গেছে। বিশেষ করে সামাজিক মাধ্যমে ধর্মীয় বিষয় নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং এতে উস্কানি দিয়ে সহিংসতা ঘটানোর প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়।

ইসকন এবং বিদেশী প্রভাব: ইসকন একটি আন্তর্জাতিক সংগঠন, এবং তাদের কিছু কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের মাঝে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। ইসকনের কিছু সমর্থক স্থানীয় জনগণের বিশ্বাসের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে, যা সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সংকট: ইদানীং কিছু কিছু রাজনৈতিক এবং সামাজিক সংঘর্ষ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ভিত্তিকে নাড়া দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মন্দির ভাঙচুর, সংঘর্ষ, এবং বিভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অপপ্রচার।

সমাধানের পথ বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন:প্রশাসনের কঠোর নজরদারি: যে কোনো ধরনের সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বা উস্কানির বিরুদ্ধে কঠোরভাবে পদক্ষেপ নিতে হবে। সামাজিক মাধ্যমের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখা এবং ধর্মীয় অপপ্রচার বন্ধ করতে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রয়োগ করতে হবে। ধর্মীয় নেতাদের একত্রিত করা: সকল ধর্মের নেতাদের একত্রিত করে তারা যাতে শান্তির বার্তা প্রদান করেন, সেই উদ্যোগ নিতে হবে। সাধারণ মানুষের মধ্যে সহনশীলতা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের বার্তা ছড়াতে হবে।

জনসচেতনতা ও শিক্ষার প্রসার: বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠান এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে ধর্মীয় সহনশীলতার গুরুত্ব তুলে ধরে শিক্ষামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উপর বিশেষ কর্মশালা এবং সেমিনারের আয়োজন করা যেতে পারে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও বাংলাদেশের ভাবমূর্তি রক্ষা: আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি রক্ষায় সরকারকে কূটনৈতিকভাবে সক্রিয় থাকতে হবে। ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষায় উদ্যোগী হয়ে দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলো সমাধানে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে হবে। স্থানীয় প্রশাসনের শক্ত ভূমিকা: স্থানীয় প্রশাসন এবং স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও জনপ্রতিনিধিদের এগিয়ে এসে উস্কানিমূলক কর্মকাণ্ডে বাধা প্রদান করতে হবে এবং সম্প্রীতির বার্তা ছড়াতে হবে।

বাংলাদেশের হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির ইতিহাস বহু পুরনো এবং এটি আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সাম্প্রতিক ঘটনাবলিতে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হলেও এটি অস্থায়ী সমস্যা। জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি, সরকারের সক্রিয় পদক্ষেপ এবং ধর্মীয় সম্প্রীতি রক্ষায় সবার প্রচেষ্টায় আমরা পুনরায় এই ঐতিহ্যকে রক্ষা করতে সক্ষম হবো। অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ। ইসকনের প্রধান লক্ষ্য ছিল ভগবান শ্রীকৃষ্ণের প্রতি প্রেম ও ভক্তির প্রসার ঘটানো এবং তার আধ্যাত্মিক শিক্ষার মাধ্যমে মানুষের চেতনার উন্নয়ন করা। মূলত শ্রীমদ্ভাগবতম ও ভগবদ্গীতার উপদেশকে ভিত্তি করে গঠিত এ সংগঠনটি বিশ্বব্যাপী ভগবানের প্রতি আত্মসমর্পণ, মানবিক উন্নয়ন, এবং সহমর্মিতার শিক্ষা ছড়িয়ে দিতে কাজ করে। প্রতিষ্ঠার ইতিহাস শ্রীল ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ নিউ ইয়র্কে এসে প্রথমে কয়েকজন অনুসারীর সাথে মিলে ইসকন প্রতিষ্ঠা করেন। তার উদ্দেশ্য ছিল প্রাচীন ভারতীয় বৈষ্ণব দর্শন ও ভক্তি-সংস্কৃতি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দেওয়া।

নিউ ইয়র্কে ছোট্ট এক অ্যাপার্টমেন্টে শুরু হলেও ইসকন দ্রুত বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে এটি প্রায় ১০০টিরও বেশি দেশে কাজ করছে, এবং বেশ কয়েকটি স্থানে ইসকনের মন্দির ও আশ্রম রয়েছে। ইসকনের আদর্শ ও কার্যক্রম ইসকনের মূল আদর্শ ভগবান কৃষ্ণের প্রতি ভক্তি ও প্রেমকে জীবনের কেন্দ্রবিন্দুতে স্থাপন করা। এর প্রধান শিক্ষা “হরে কৃষ্ণ, হরে কৃষ্ণ, কৃষ্ণ কৃষ্ণ, হরে হরে হরে রাম, হরে রাম, রাম রাম, হরে হরে” মহামন্ত্রের মাধ্যমে চেতনাকে শুদ্ধ করা। ইসকন সদস্যরা বৈষ্ণব ধর্মের চতুর্দশ নিয়ম অনুসরণ করেন, যা সনাতন ধর্মের অনেক দিককে অন্তর্ভুক্ত করে। এর মধ্যে প্রধান নিয়মগুলো হলো নিরামিষ ভোজ পালন, মাদকদ্রব্য থেকে দূরে থাকা, এবং যৌন সংযম।

ইসকন সদস্যরা ভগবদ্গীতার শিক্ষা অনুসরণ করে এবং এই শিক্ষা অনুযায়ী মানবকল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করে থাকে। সংগঠন পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ ইসকনের প্রধান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা হলো “গভর্নিং বডি কমিশন” (GBC), যা প্রভুপাদ নিজেই প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সংগঠনকে সুসংগঠিত রাখার জন্য। বর্তমানে GBC ইসকনের বিভিন্ন দেশের কার্যক্রম ও নির্দেশনা নিয়ন্ত্রণ করে এবং এদের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী ইসকনের মূল নীতিমালা ও কার্যক্রম পরিচালিত হয়। তবে ভক্তিবেদান্ত স্বামীর আদর্শ ও শিক্ষাই ইসকনের মূল প্রেরণা এবং এটির কার্যক্রমের মূল দিক নির্দেশনা। ইসকনের সমাজে ভূমিকা ও অবদান ইসকন সারা বিশ্বে ভক্তি আন্দোলনের একটি শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। এরা বিভিন্ন মন্দির, কৃষ্ণ উৎসব, রথযাত্রা, এবং স্কুল পরিচালনার মাধ্যমে হিন্দু ধর্ম ও সংস্কৃতিকে প্রচার করে। এছাড়া ইসকন নানা সেবামূলক কার্যক্রম, যেমন বিনামূল্যে খাবার বিতরণ, শিক্ষামূলক কার্যক্রম, এবং হাসপাতাল পরিচালনা করে মানবকল্যাণে অবদান রেখে চলেছে।

ইসকন শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় সংগঠন নয়, এটি একটি বৈশ্বিক ভক্তি আন্দোলন, যা মূলত আধ্যাত্মিক ও সামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে কাজ করছে। বিশ্বব্যাপী হিন্দু ধর্মের প্রচার, ভক্তি ও চেতনার উন্নয়ন এবং মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করার ক্ষেত্রে ইসকন একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে। ইসকন সম্প্রতি বাংলাদেশে বিশেষত চট্টগ্রামে একটি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে, যার কারণ হিসেবে তাদের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড ও দাবিগুলোর মধ্যে নতুন কিছু রাজনৈতিক ও সামাজিক বিষয় উঠে এসেছে। বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে বহু ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষ একত্রে বাস করে, সেখানে যে কোনো ধর্মীয় সংগঠনের কর্মকাণ্ডকে সাধারণ মানুষের উপর প্রভাব ফেলতে পারে। হঠাৎ ইসকন নিয়ে আগ্রহ ও সমালোচনার কারণ বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে ইসকনের বেশ কিছু কার্যকলাপ ও বক্তব্য বিশেষভাবে নজর কেড়েছে।

ইসকন তাদের ভক্তি আন্দোলন প্রচারের পাশাপাশি কিছু রাজনৈতিক এবং সামাজিক দাবি ও কর্মকাণ্ডে মনোযোগ দিয়েছে, যা একদিকে যেমন তাদের ধর্মীয় ভক্তদের উদ্দীপ্ত করছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের মধ্যে কৌতূহল এবং সমালোচনা বাড়িয়ে দিয়েছে। চট্টগ্রামে তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহী মামলা এবং সমালোচনা চট্টগ্রামে ইসকনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা দায়েরের বিষয়টি দেশজুড়ে আলোচনার সূত্রপাত করেছে।

সাধারণত, ধর্মীয় সংগঠনগুলোর কর্মকাণ্ড ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। চট্টগ্রামের মামলাটি মূলত আমাদের জাতীয় পতাকা উপর তাদের মনগড়া ইতিহাস পরিবর্তনের মনোভাব নিয়ে তাদের পতাকা উত্তোলন করে তাতে রাষ্ট্র বিরোধী ষড়যন্ত্র বলে মনে করার পাশাপাশি তাদের কার্যকলাপের মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বৃদ্ধির অভিযোগে দায়ের করা হয়েছে। অনেকে মনে করেন, তাদের কার্যকলাপ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে এবং দেশপ্রেমের বিরোধী অবস্থান তৈরি করতে পারে।

ইসকনের পূর্বে ঘোষিত ৮ দফা দাবি ইসকন সম্প্রতি কিছু দাবি উত্থাপন করেছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি দফা হলো: 1. সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর আক্রমণ ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রণয়ন। মন্দির ও পূজা মন্ডপে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা। শিক্ষাব্যবস্থায় ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষা প্রদান নিশ্চিত করা। ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জন্য সরকারি চাকরিতে বিশেষ কোটা চালু করা।সনাতনী সমাজের উন্নয়নে সরকারি বরাদ্দ বৃদ্ধি করা। এই দাবিগুলোতে ইসকন মূলত নিজেদের সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা, উন্নয়ন ও সমানাধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে। তবে, অনেকেই মনে করেন যে এই দাবি গুলোতে কিছু রাজনৈতিক ভাষা যুক্ত রয়েছে, যা তাদের ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের বাইরে চলে গেছে। তাদের এই দাবিগুলো নিয়ে সমাজে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখতে ইসকনের করণীয় বাংলাদেশে ইসকনের মতো ধর্মীয় সংগঠনগুলোর কাছে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার জন্য দায়িত্ববোধ থাকা জরুরি। কিছু পদক্ষেপ ইসকন গ্রহণ করতে পারে যাতে তারা নিজেদের ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে সীমাবদ্ধ থাকে এবং সাম্প্রদায়িক ঐক্য বজায় রাখতে সহযোগিতা করে। এগুলো হলো: ধর্মীয় সংযম ও সহনশীলতা: ধর্মীয় উস্কানি এড়ানো এবং ভক্তদের উদ্দীপ্ত করার সময় সংযম ও সহনশীলতা প্রদর্শন করা। সামাজিক সংলাপ: স্থানীয় মুসলিম নেতৃবৃন্দের সাথে সংলাপ ও আলোচনা শুরু করা, যাতে পারস্পরিক বোঝাপড়া বৃদ্ধি পায়। সামাজিক দায়িত্ব পালন: ধর্মীয় কার্যকলাপের পাশাপাশি সমাজের সার্বিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখা, যেমন দরিদ্রদের জন্য খাদ্য বিতরণ, চিকিৎসা প্রদান, ইত্যাদি। মাধ্যমিক সহিংসতা এড়ানো: যেকোনো ধরনের ধর্মীয় প্রতিক্রিয়া বা কার্যক্রমে ভক্তদের শান্তিপূর্ণ অবস্থান বজায় রাখতে উৎসাহিত করা। সহযোগিতা ও বন্ধুত্ব: স্থানীয় মুসলিম এবং অন্যান্য সম্প্রদায়ের নেতাদের সাথে সহযোগিতা করে একত্রে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বার্তা প্রচার করা।

ইসকনের দাবির অন্তর্নিহিত বার্তা ইসকনের দাবিগুলোর মাধ্যমে তারা বাংলাদেশের সনাতন সম্প্রদায়ের সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং উন্নয়নের গুরুত্ব তুলে ধরেছে। তাদের ভাষায় এটি সম্পূর্ণরূপে সামাজিক সমতা ও ন্যায়বিচার দাবি, তবে সমালোচকরা মনে করেন, এটি একটি জাতীয় সংগঠনের পক্ষে দেশের সরকারের বিরুদ্ধে কিছুটা অবস্থান নেওয়া হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। বাংলাদেশে ইসকন সহ সব ধর্মীয় সংগঠনের একতা এবং সামাজিক দায়িত্ববোধ প্রয়োজন, বিশেষ করে একটি বহুধর্মীয় রাষ্ট্রের সাম্প্রদায়িক ঐক্য বজায় রাখতে। ইসকন যদি তাদের কার্যক্রম এবং দাবিগুলোকে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখে এবং সমাজের শান্তি ও ঐক্যের প্রতি সম্মান দেখায়, তবে তা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জন্য সহায়ক হবে।

সাম্প্রতিক চট্টগ্রামের হাজারী গলিতে ইসকন বিরোধী একটি ফেসবুক পোস্ট নিয়ে যে তীব্র উত্তেজনা ও সহিংসতা সৃষ্টি হয়েছে, তা একটি গভীর সামাজিক উদ্বেগের বিষয়। ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে সেখানে জনমনে বিভ্রান্তি ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। চট্টগ্রামের সাম্প্রতিক এই উত্তেজনার পেছনে বেশ কিছু কারণ থাকতে পারে। তা হলো:সামাজিক বিভ্রান্তি ও গুজবের প্রসার: ফেসবুক ও সামাজিক মাধ্যমের মাধ্যমে গুজব ও বিদ্বেষমূলক পোস্ট দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, যা জনমনে ক্ষোভ ও উত্তেজনা বৃদ্ধি করে। ইসকনকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যেই সাধারণ মানুষের মধ্যে কিছু প্রশ্ন ও বিতর্ক ছিল, যা একটি ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে আরও বেড়ে যায়।

ধর্মীয় অনুভূতির প্রভাব: ধর্মীয় বিষয়ে মানুষের অনুভূতি অত্যন্ত সংবেদনশীল হওয়ায়, ছোটখাটো বিরোধেও উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়। ইসকনের কর্মকাণ্ড নিয়ে সাধারণ জনগণের মধ্যে বিভিন্ন মতামত এবং বিতর্ক ছিল, যা সুযোগসন্ধানী মহল সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টির জন্য ব্যবহার করে থাকতে পারে। উস্কানিমূলক গোষ্ঠী ও বাহিরের প্রভাব: কিছু অসাধু গোষ্ঠী এ ধরনের সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি করে দেশের ভেতরে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করতে চায়। এ ধরনের পরিস্থিতিতে সুবিধাবাদী ও উস্কানিমূলক মহল ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা কাজে লাগিয়ে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধার করতে চায়।

আইনশৃঙ্খলার শিথিলতা ও জনসচেতনতার অভাব: অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসন আগাম পরিস্থিতির উপর নজরদারি করতে ব্যর্থ হয়, যার ফলে পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যায়। জনসচেতনতার অভাব এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির নীতি মেনে চলার অনুপস্থিতি থেকেও এই ধরনের উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়।

সরকারের করণীয় সরকারের পক্ষ থেকে এই ধরনের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এবং পুনরায় এ ধরনের উত্তেজনা এড়াতে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। এই পদক্ষেপগুলো সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় সহায়ক হতে পারে:গুজব নিয়ন্ত্রণ ও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রয়োগ: ফেসবুক এবং অন্যান্য সামাজিক মাধ্যমের মাধ্যমে যেকোনো উস্কানিমূলক পোস্ট ও গুজব ছড়ানোর উপর কঠোর নজরদারি রাখা প্রয়োজন। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন অনুযায়ী গুজব সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত এবং সামাজিক মাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করতে বিশেষ টিম গঠন করা প্রয়োজন।

ধর্মীয় নেতৃত্বের ভূমিকা: ইমাম, পুরোহিত, এবং অন্যান্য ধর্মীয় নেতাদের কাছে আবেদন জানানো উচিত, যাতে তারা জনগণকে শান্তিপূর্ণভাবে এবং সৌহার্দ্য বজায় রাখতে পরামর্শ দেন। ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের সক্রিয় ভূমিকা সামাজিক শান্তি রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। জনসচেতনতা বৃদ্ধি: ধর্মীয় সম্প্রীতির গুরুত্ব এবং গুজবের প্রভাব সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করা দরকার। বিভিন্ন কর্মশালা, সেমিনার, এবং প্রচার প্রচারণা মাধ্যমে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় জনমনে একতা এবং সৌহার্দ্যের বার্তা পৌঁছানো যেতে পারে।

দ্রুত ও কার্যকর আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা: যেকোনো সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা দ্রুত এবং কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণে আনতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও সক্রিয় ও সতর্ক থাকতে হবে। সেনাবাহিনী ও পুলিশ বাহিনীর প্রশিক্ষণ এবং আধুনিক সরঞ্জামের মাধ্যমে এ ধরনের পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। দ্রুত বিচারের ব্যবস্থা:সহিংসতায় জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচারের ব্যবস্থা গ্রহণ করলে মানুষ সরকারের উপর আস্থা ফিরে পাবে এবং সাম্প্রদায়িক সংঘাতের বিরুদ্ধে সতর্ক থাকবে।

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি মজবুত করা: দেশব্যাপী সকল সম্প্রদায়ের মানুষদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহমর্মিতা বৃদ্ধির জন্য স্কুল-কলেজে বিশেষ শিক্ষামূলক প্রোগ্রাম এবং সম্প্রীতির বার্তা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। বাংলাদেশে বিভিন্ন ধর্মের মানুষের সহাবস্থান আমাদের ঐতিহ্যের অংশ। ইসকনকে কেন্দ্র করে যে ধরনের উত্তেজনা এবং সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা চট্টগ্রামে দেখা যাচ্ছে, তা সম্প্রীতির পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি স্বরূপ। সরকার ও সমাজের সকল শ্রেণীর মানুষের উচিত একত্রে এই ধরনের পরিস্থিতির মোকাবিলা করা। গুজব, ভুল বোঝাবুঝি, এবং সাম্প্রদায়িক উস্কানির উপর কঠোর নজরদারি রেখে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সৌহার্দ্য বজায় রাখা এবং অস্থিরতামুক্ত বাংলাদেশ গঠনের পথে এগিয়ে যাওয়া আমাদের সকলের দায়িত্ব।

লেখকঃ চট্টগ্রাম বিভাগীয় ব্যুরো প্রধান ও যুগ্ন সম্পাদক, দৈনিক ভোরের আওয়াজ ও The Daily banner এবং গবেষক টেলিভিশন উপস্থাপক।