চকরিয়া (কক্সবাজার) প্রতিনিধি : চকরিয়া সরকারি কলেজের সদ্য বিদায়ী (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যক্ষ ইন্দ্রজিত বড়ুয়া কর্তৃক কলেজ তহবিলের বিপুল টাকা আত্মসাতের তদন্ত শুরু করেছে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর। কলেজ কর্তৃপক্ষের লিখিত অভিযোগের পর মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) মহাপরিচালকের নির্দেশে গঠিত হয় দুই সদস্যের তদন্ত কমিটি।
সোমবার (২১ অক্টোবর) তার ১৩ মাস দায়িত্বপালনকালে নিয়মবহির্ভূত তহবিলের ১ কোটি ১০ দশ লাখ টাকা আত্মসাত ও অনিয়মের সত্যতা পেয়েছে তদন্ত দল।
এদিকে মাউশি মহাপরিচালকের নির্দেশে গঠিত তদন্ত দল সোমবার সকাল ৯টায় চকরিয়া সরকারি কলেজে এসে পৌছান। তারা কলেজের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ও শিক্ষকদের উপস্থিতিতে ইন্দ্রজিত বড়ুয়ার নানা অনিয়মের তদন্ত শুরু করেন। এসময় তদন্ত কমিটির সদস্যরা তার দায়িত্ব পালনকালীন সময়ে খাত ওয়ারী কলেজের আয়-ব্যয়, উন্নয়ন খাত, অভ্যন্তরিণ পরীক্ষা খাত, সরকারি কোষাগারের হিসাব, কেন্দ্র ফ্রি, নৈশপ্রহরী ও অত্যবশ্যাকীয় কর্মচারী খাতের খরচের নামে তহবিলের টাকা আত্মসাতের বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছেন।
চকরিয়া সরকারি কলেজের শিক্ষকরা জানান, সম্প্রতি কলেজের সাবেক ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ইন্দ্রজিত বড়ুয়ার টাকা আত্মসাত ও অনিয়মের বিষয়ে নজরে এনে শিক্ষক প্রনব কুমার বড়ুয়াকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে দেন বর্তমান ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নুসরাত জাহান। ইতোমধ্যে তদন্ত কমিটি একটি প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন। গত ২০২৩ সালের ১৮ জুলাই সাবেক (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যক্ষ একেএম শাহাবুদ্দিন অবসরে যাওয়ার দিন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ইন্দ্রজিত বড়ুয়াকে তহবিলের ১ কোটি ১২ লাখ ৩০ হাজার ৯৪৩ টাকা বুঝিয়ে দিয়ে দেন। এরমধ্যে কলেজের সাধারণ তহবিলের ৮০ লাখ ৬৭ হাজার ৩১৫ টাকা, স্থায়ী আমানত ৩১ লাখ ৪৩ হাজার ২৪ টাকা ও নগদ ২০ হাজার ৬০৩ টাকা। অথচ ইন্দ্রজিত বড়ুয়া একক ক্ষমতাবলে কলেজের নানা উন্নয়নের নাম দিয়ে ব্যাংক থেকে উত্তোলন করে লুটপাট করেছেন। এছাড়াও বছরে প্রায় পাঁচ হাজার শিক্ষার্থীর কাছ থেকে জনপ্রতি ২০০ টাকা করে ১০ লাখ টাকা নেওয়া হয়। ওইসব টাকা জমা না দিয়ে কলেজের উন্নয়নে ব্যয় করতে পারতেন। কিন্তু ইন্দ্রজিত বড়ুয়া ১৩ মাসে ৭৬ লাখ টাকা নিয়মবহির্ভূতভাবে খরচ দেখিয়েছেন। অথচ নীতিমালায় বলা হয়েছে, কলেজের উন্নয়নখাতে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ বছরে ৯ লাখ ৮০ হাজার টাকা খরচ করতে পারবেন।
কলেজে গঠিত পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি ইন্দ্রজিত বড়ুয়ার সময়ে অভ্যন্তরিন পরীক্ষা খাতে ৩ লাখ ১৪ হাজার ৯৪৮ টাকা, সরকারি কোষাগারে ৯৭ হাজার ৭০৬ টাকা, কেন্দ্র ফ্রি খাতে ৪৭ হাজার ৭৫০ টাকা, নৈশপ্রহরী ও অত্যবশ্যাকীয় কর্মচারী খাতে ২৯ লাখ ৮৩ হাজার ২৫৮ টাকা নিয়মবহির্ভূতভাবে খরচ করার কারণে ঘাটতি রয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন।
গত ১০ অক্টোবর কলেজ তহবিলের টাকা ঘাটতির বিষয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। গত ২১ অক্টোবর অভিযোগের প্রেক্ষিতে দুই সদস্যের একটি তদন্ত দল চকরিয়া সরকারি কলেজে আসেন।
এদিন সকাল ১০টা থেকে শুরু হয়ে সন্ধা ছয়টা পর্যন্ত তদন্ত কার্যক্রম চলে। ওইসময় ইন্দ্রজিত বড়ুয়াও উপস্থিত ছিলেন। এসময় তার ১৩ মাসের আয়-ব্যয় ও ব্যাংক হিসাব দেখেন। উন্নয়নের নামে কলেজ তহবিলের টাকা আত্মসাত করার বিষয়ে নিশ্চিত হন তদন্ত দল।
অভিযোগ উঠেছে, ১৩ মাস দায়িত্ব পালনকালীন সময়ে সাবেক ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ইন্দ্রজিত বড়ুয়া কলেজের উন্নয়ন খাতে ব্যাংক হিসাব থেকে টাকা উত্তোলন পূর্বক বেশিরভাগ লেনদেন করা হয়েছে। কলেজের খরচের বিপরীতে ইন্দ্রজিত বড়ুয়ার অনুগত শিক্ষক ও কর্মচারীর নামে চেকসমুহ ইস্যূ করলেও পরে দেখা গেছে, ব্যাংক থেকে তিনিই টাকা উত্তোলন করেছেন। আবার কলেজে রক্ষিত চেকবইয়ের মুন্ডায় চেক গ্রহীতা হিসেবে কারো স্বাক্ষরও নেই। এমনকি নতুন অধ্যক্ষকে দায়িত্ব ছেড়ে দেয়ার পরদিন কৌশলে তিনি চেকবই থেকে ৯টি চেক নিজের হেফাজতে নিয়ে রেখে দেন। পরে অবশ্য চেকের এসব অসঙ্গতির বিষয়ে বর্তমান ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের কাছে লিখিতভাবে স্বীকারও করে স্বাক্ষর দিয়েছেন।
এব্যাপারে চকরিয়া কলেজের বিদায়ী ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ইন্দ্রজিত বড়ুয়া বলেন, মাউশির তদন্ত দলের সাথে কথা বলেছেন। দায়িত্ব পালনকালীন সময়ে কোন অনিয়ম পাননি। তদন্ত রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত বেশি কিছু বলবো না। মুলত আমাকে হয়রানি করতে চক্রান্ত করা হচ্ছে।
ইতোমধ্যে কলেজের উন্নয়নের নামে কোটি টাকা আত্মসাতের বিষয়টি সত্যতা পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন একাধিক শিক্ষক। নিরুপনের পর দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এর হস্তক্ষেপ কামনা করছেন চকরিয়াবাসী, অভিভাবকমন্ডলী এবং শিক্ষক পরিষদ।




