মোহীত উল আলম: পবিত্র বাইবেলে (রচনাপর্ব: ১২০০ খ্রীষ্টপূর্ব থেকে খ্রীষ্টাব্দ ১) সৃষ্টিতত্ত্ব নিয়ে এই কথাটি আছে যে সৃষ্টিকর্তা প্রথমে আদম (আ:)-কে সৃষ্টি করেন। তারপর তাঁর পাঁজরের হাড় থেকে ইভকে সৃষ্টি করেন (“জেনেসিস”, ২:২১-২৩)। তাঁদের দুই পুত্রের কথা জানা যায়, এবেল এবং কেইন বা হাবিল ও কাবিল, এবং এরপর থেকে মানবজাতির ধারাবাহিক বংশবিস্তার।

“জেনেসিস” গ্রন্থের ১:২৬-২৭-এ আছে যে গড বলছেন, আমরা আমাদের মতো করে মনুষ্যজাতির সৃষ্টি করি যাতে তারা সমুদ্রের মাছ, আকাশের পাখি, গবাদি পশু, বন্যজন্তু এবং যা কিছু মাটির ওপর নড়াচাড়া করে তার ওপর প্রভুত্ব বিস্তার করতে পারে। (আমার অনুবাদ, এ্ আই থেকে)। “জেনেসিস” ২:৭-এ গড মাটির ধুলো থেকে একটি মানুষ বানালেন, এবং তার মধ্যে গড নিজেই নি:শ্বাস পূরে দিলেন, তখন মানুষ একটি জীবন্ত মানুষ হয়ে গেল। (আমার অনুবাদ এ আই থেকে)।

পবিত্র কোরান শরীফের (নাজেলকাল: ৬১০ থেকে ৬৩২ খ্রীষ্টাব্দ) ১৫ নম্বর সুরা “আল হিজর”-এর ২৬ আয়াতে আল্লাহ্ বলছেন, আমরা মানুষ সৃষ্টি করেছি রূপান্তরিত শুকনো মাটি (’সালসাল’) থেকে, ২৭ আয়াতে বলছেন, আর পূর্বে আমরা জ্বিন সৃষ্টি করেছি গরম বাতাসের আগুন থেকে, আর ২৮ আয়াতে বলছেন, দেখ, তোমরা ফেরেস্তারা, আমি এই মাটির খন্ড থেকে আকৃতি দান করে মানুষ সৃষ্টি করছি, এবং ২৯ আয়াতে বলছেন, আমি যখন পরিপূর্ণ আকারে তাকে সৃষ্টি করব, তখন আমার সত্তা আমি নি:শ্বাসের সঙ্গে তার ভিতরে পূরে দেব, তখন তোমরা আভূমি নত হয়ে তার প্রতি আনুগত্য দেখাবে। ৩০ আয়াতে জানানো হচ্ছে আল্লাহ্ র আজ্ঞা মেনে ফেরেস্তারা আভূমি নত হয়ে মানুষটাকে আনুগত্য জানালো। ৩১ আয়াতে জানতে পারছি, ফেরেস্তাদের মধ্যে ইবলিশ তার আনুগত্য জানাতে অস্বীকার করলো। ২৩ নম্বর সুরা “মুমিনুন”-এ মানুষ সৃষ্টির খানিকটা বিশদ বর্ণনায়, আয়াত ১২-১৪তে বলছেন, মানুষকে আমরা সৃষ্টি করেছি একবিন্দু ধুলিকণা থেকে, তারপর তাকে আমরা এক বিন্দু বীর্য হিসেবে গর্ভের বিশ্রামের জায়গায় নিশ্চিত রেখেছি, তারপর সে বীর্যবিন্দুকে এক বিন্দু জমাট রক্তে পরিণত করে একটি ভ্রূণ হিসেবে রূপ দিই, তারপর সে ভ্রূণ থেকে হাড়ের সৃষ্টি করি, সে হাড়গুলিকে আচ্ছাদিত রাখার জন্য মাংসের সৃষ্টি করি, তখন আমরা সম্পূর্ণরূপে একটি নতুন সৃষ্টি পাই। সুতরাং মহান আল্লাহ্ র গুণগান গাই। ১৫ আয়াতে মানুষকে লক্ষ্য করে বলছেন, অবশেষে তোমরা সবাই মারা যাবে, আর ১৬ আয়াতে বলছেন শেষ বিচারের দিন তোমরা সবাই আবার জাগ্রত হবে। ৩৮ নম্বর সুরা “সাদ”এর ৭১ ও ৭২ আয়াতে পুনরায় আল্লাহ্ ফেরেস্তাদেরকে বলছেন, দেখ, আমি মাটি থেকে মানুষ সৃষ্টি করতে যাচ্ছি, আর সেটা টেনে নিয়ে ৭২ আয়াতে সুরা আল হিজরের ২৯ আয়াতের পুনরুক্তি করে বলছেন, আমি যখন পরিপূর্ণ আকারে তাকে সৃষ্টি করব, তখন আমার সত্তা আমি নি:শ্বাসের সঙ্গে তার ভিতরে পূরে দেব, তখন তোমরা আভূমি নত হয়ে তার প্রতি আনুগত্য দেখাবে। (কোরানের আয়াতগুলি আবদুল্লাহ ইউসুফ আলীর বিখ্যাত ইংরেজি অনুবাদ থেকে আমি বাংলায় অনুবাদ করলাম।)

আধুনিক বিশ্বে প্রচলিত প্রধান দু’টি ধর্ম খ্রিস্টিয়ানিটি ও ইসলামের মধ্যে মানবসৃষ্টির এই সৃষ্টি রহস্য একটি অমোচনীয় বিশ্বাসের বস্তু হলেও বিজ্ঞানীদের মধ্যে এ নিয়ে বিস্তর পর্যবেক্ষণ চলে।

চালর্স ডারউইন , বিবতর্নবাদী ইংরেজ জীব বিজ্ঞানী ১৮৩৫ সালে দক্ষিণ আমেরিকার ইকুয়েডর নামক দেশটি থেকে ৬৩০ মাইল পশ্চিমে গ্যালাপ্যাগোজ দ্বীপপুঞ্জে পাঁচ সপ্তাহব্যাপী থেকে সেখানকার জীববৈচিত্র দেখে উদ্বুদ্ধ হয়ে প্রাণিকুলের উৎস খুঁজতে গিয়ে ন্যাচারাল সিলেকশন বা প্রাকৃতিক বাছাইয়ের ওপর জোর দেন। যেটির সরল অর্থ হচ্ছে, প্রকৃতি নিজেই তার অস্তিত্ব বজায় রাখার জন্য বাছাই এবং বর্জনের মধ্য দিয়ে যায়। প্রকৃতি বলতে সকল প্রাণিকুল আর বৃক্ষলতাদি আর সমুদ্র আর স্থল বোঝাচ্ছে। এই ধারণাটি তিনি তাঁর যুগান্তকারী গ্রন্থ দ্য অরিজিন অব স্পিসিজ (১৮৫৯)এ বিধৃত করেন, যার পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা দেন জীববিজ্ঞানী হার্বার্ট স্পেনসার ১৮৬৪ সালে “দ্য সার্ভাভাইবল অব দ্য ফিটেস্ট” সংজ্ঞায়, যেটির অর্থ হলো প্রাণিকুল বেঁচে থাকে শক্তি দিয়ে নয়, বরঞ্চ পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নিজের বংশবিস্তার করার প্রজনন ক্ষমতা বজায় রাখার জন্য।

মজার ব্যাপার হলো, লেখক শরৎচন্দ্র তাঁর শ্রীকান্ত উপন্যাসের এক জায়গায় লিখছেন, “অতিশয় বড় আকারের ডাইনোসর লোপ পাইয়াছে, কিন্তু সামান্য তেলাপোকা টিকিয়া আছে” (হাতের কাছে বইটি নেই, আছে শেলফে, কিন্তু চিন্তার গতি ব্যাহত হবে বিধায় চেয়ার ছেড়ে উঠছি না। তাই উদ্ধৃতি বা সোর্স ভুল হতে পারে), যেটি স্পেনসারের দেওয়া তত্ত্বের সাহিত্য রূপ। অর্থাৎ, পরিবর্তিত প্রাকৃতিক পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খেতে না পেরে অনেক প্রাণির বিলয় হয় কেননা তার প্রজনন ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে ফলে বংশবিস্তার করতে পারে না। আবার অনেক প্রাণি খাপ খাওয়াতে পেরে টিকে থাকে, যেমন তেলাপোকা ৩২ কোটি বছর আগে থেকে এখনও প্রজননশীল । “দ্য সার্ভাভাইবল অব দ্য ফিটেস্ট” সংজ্ঞাটি ডারউইনের পছন্দ হলে তিনি ১৮৬৯ সালে দ্য অরিজিনের ৫ম সংস্করণে সেটি গ্রহণ করেন এবং এটিকে ন্যাচার‌্যাল সিলেকশনের সমরূপ আখ্যা দেন।

ডারউইন কোথাও, যেমন দ্য ডিসেন্ট অব ম্যান (১৮৭১) বা অন্য কোথাও সরাসরি বলেননি যে বানর থেকে মানুষের সৃষ্টি হয়েছে, কিন্তু তিনি ধারণা করেছিলেন যে প্রাণিকুলের মধ্যে একটি গাছের বিভিন্ন শাখার মতো কোন না কোন পূর্বাপর সম্পর্ক আছে। কিন্তু তাঁর এই ধারণা বিশ্বকুলে প্রবল প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে, কারণ এটি সরাসরি ধর্মগ্রন্থে বর্ণিত মানুষের সৃষ্টিরহস্য এবং সৃষ্টিতত্ত্ব নিয়ে সাধারণ মানুষের বিশ্বাসে আঘাত হানে। কারণ একজন সৃষ্টিকর্তা নেই, এটি মানবমনে কোথাও ঠাঁই পায় না। (আমার মনেও ঠাঁই পায় না)।

যা হোক সৃষ্টিতত্ত্ব আর বিবর্তনবাদের তত্ত্বের মধ্যে সংঘাত পশ্চিমের সমাজে বিতর্কের পর্যায়ে পৌঁছালে বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় বড় পন্ডিতেরা এটিকে একাডেমিক পর্যায়ে নিয়ে আসেন (যে চর্চাটা আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রায় অনুপস্থিত। ওখানে খুব বিতর্কিত বিষয়কেও একাডেমিক ডিসিপ্লিনের মধ্যে ফেলে অনেকটা ডিসেনসিটাইজ করে পুরো ব্যাপারটি আলোচনা করা হয়। যেমন, পুঁজিবাদের সরাসরি প্রতিপক্ষ মার্ক্সবাদ পশ্চিমা পুঁজিবাদী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সাসটেইনডভাবে আলোচনা করা হয়।)

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক বিশ্বব্যাপী পরিচিত শেক্সপিয়ার পন্ডিত ও নব্য ইতিহাসবাদ সাহিত্যপাঠরীতির প্রবর্তক স্টিফেন গ্রিনব্ল্যাট একটি গ্রন্থ লিখলেন, দ্য রাইজ এ্যান্ড ফল অব এ্যাডাম এ্যান্ড ঈভ (২০১৭) এবং এই বিতর্কের অবসানকল্পে তিনি উপসংহার টানলেন যে যদিও এটা প্রমাণ করা যাবে না যে যুগে যুগে রচিত ও সংযোজিত পবিত্র বাইবেল মানুষ ছাড়া কেউ লিখেছে, কিন্তু সৃষ্টিতত্ত্বের গল্পটা নৈয়ায়িকভাবে এতটাই আকর্ষণীয় যে মানুষ এটাতে আকর্ষিত হবেই। কী সে আকর্ষণ? সেটি হলো, মানুষের সব কাজ পর্যবেক্ষণ করার জন্য একজন আল্লাহ, গড, ভগবান বা বুদ্ধ আছেন যিনি বিচারকের ভূমিকায় পাপের জন্য শাস্তি আর সাধু কাজের জন্য প্রশস্তির ব্যবস্থা রেখেছেন। পবিত্র কোরাণে ৯৯ সংখ্যক সুরা “জিলজ্যাল” বা “আজ-জালাহ,” ৭ আয়াতে আল্লাহ্ বলছেন, কেউ এক এ্যাটম ওজনের ভালো কাজ করলে আমার নজর এড়ায় না, আর ৮ আয়াতে বলছেন, কেউ এক এ্যাটম ওজনের খারাপ কাজ করলে তাও আমার নজর এড়ায় না।

এ্যারিস্টোটল যেটিকে মানুষের টেলিওলোজিক্যাল (বা ক্রমশ নৈতিক উন্নতির পথে অগ্রসরমান মানবজাতি) অগ্রগমন ভেবে আশাবাদী ছিলেন, গ্রিনব্ল্যাটও সেইরূপ সৃষ্টিতত্ত্বের কাহিনীর মধ্যে এইরূপ মানবাত্মক নৈতিক আচরণের এই ঊর্ধ্বগমনকে প্রাধান্য দিয়ে তাঁর বইটি শেষ করেন। বলেন, জেনেসিসের গল্পে আছে যে একটি মানবজীবন অতিবাহিত হয় সেই জ্ঞান নিয়ে যে জ্ঞান বলে কোনটা ভালো আর কোনটা খারাপ। অর্থাৎ পবিত্র কোরাণের ভাষায় সে “আশরাফুল মুকলাকাত”। কিন্তু প্রাকৃতিক বাছাই দ্বারা সৃষ্ট জীবন ধারণায় এই পাপ-পুণ্যের কোন বোধ বা জ্ঞান কাজ করে না বা এর কোন অবস্থান নেই বিধায় সর্বজনীনভাবে মানুষ এই তত্ত্বকে পরিত্যাগ করেছে বলা যায়। মানুষ চায় সৃষ্টিকর্তার কাছে দু‘হাত তুলে তার পাপকার্যের জন্য মার্জনা, আর ভালো কাজের জন্য সন্তুষ্টির বিধান।

ওপরে ধর্মীয় সৃষ্টিতত্ত্বের আলোকে ধর্মীয় সংজ্ঞাগুলি যখন দিচ্ছিলাম তখন লক্ষ করে থাকবেন, সৃষ্টিততত্ত্বের আলোকে নি:শ্বাস বা ‘ফুঁ’ বা মুখ থেকে নির্গত বায়ুর উল্লেখ আছে। এর ধর্মীয় গুরুত্ব হচ্ছে গড বা আল্লাহ যখন মানব শরীরে ফুঁ প্রবিষ্ট করালেন, তখনই মানবদেহ পবিত্র (ডিভাইন বা ঐশ্বরিক) হয়ে উঠল, যেটি তার আত্মা, যেটি অমর।

এই ফুঁ-টা কী? একটি নি:শ্বাস। বায়ুপ্রধান প্রক্রিয়া। মানুষ মর্ত্যলোকে একটি নি:শ্বাসের মালিক। ধর্মে বলা হয়, এটা দেবার মালিকও আল্লাহ, নেবার মালিকও আল্লাহ। ইংরেজি সাহিত্যের ক্লাসিক নাটক খ্রিস্টোফার মার্লোর ডক্টর ফাউস্টাস-এর শেষ দৃশ্যে ডক্টর ফাউস্টাসকে মরবার আগে একটি নি:শ্বাস ধার নেবার জন্য কত যে কাকুতি-মিনতে করতে দেখি। আর, দুই বছর আগে রোজার সময় বিভাগে সহকর্মীদের সঙ্গে ইফতার করার সময় হঠাৎ আমার চোকিং হয়, অর্থাৎ শ্বাসনালীতে খাবার আটকে যায়। তখন ক্ষিয়ৎক্ষণের জন্য আমি অনুভব করি নি:শ্বাসের মূল্য। আমার খুবই জুনিয়র সহকর্মী জাগরণ দে মিল্টন আমার বুকে দুটো মোটামুটি পাওয়ারের ঘুষি মারলে আমার ব্লকটা ছোটে। আল্লাহ মেহেরবান। এই নি:শ্বাস হচ্ছে বায়ু। প্রকৃতিতে ছোট্ট একটা প্রজাপতি বাতাসে সাঁতার কেটে কেটে ওড়ে। এই বায়ুমন্ডল আছে বলে আমরা বেঁচে আছি। বিজ্ঞানে বায়ুর প্রভাব অত্যধিক। চামড়ার টায়ারের ভিতর বাতাস ভরে দিলে সে ট্রাক কয়েক টন ওজন সহজে বহন করতে পারে।

বায়ু বা বাতাসের ধর্মীয়, প্রাকৃতিক ও বিজ্ঞানী ব্যবহার ছাড়াও এর একটি সামাজিক বা রাজনৈতিক ব্যবহার আছে, তুচ্ছার্থে। তখন এটাকে আমরা বলি বাতাস, যেটা ক্ষণস্থায়ী, যেটা ফুটা, যেটা সাবস্ট্যান্সবিহীন। । গত পনের বছরের স্বৈরাচারী শাসনের আমলের ভিত্তি ছিল এই বাতাসই। কিছু অবাস্তব জিগিরকে, তুলনাযোগ্য সত্যকে অতুলনীয় মিথ্যায় পরিণত করার (যেমন অমূক শ্রেষ্ঠ, সবই অমুক দল, ইতিহাসে আর হয় নাই ইত্যাদি বাচাল শ্লোগান) একটি কৌশল অবলম্বন করেছিল তারা। একটি অবৈজ্ঞানিক, অনৈতিহাসিক এবং অরাজনৈতিক গালভরা প্রচ্ছদের আড়ালে “গণতন্ত্রের” নামে স্পষ্টভাবে গণতন্ত্র বিনষ্ট করার একটি নষ্ট রাজনৈতিক রিটারিক ছিল তাদের বাতাস। এটি দিয়ে গোটা একটি রাজনৈতিক সমাজে মতদ্বৈধতাবিহীনভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে চেয়েছিল তারা। যেটির ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে সচেতন মানুষ ও সাধারণ জনগণ টনটনে হয়ে থাকলেও কেন যেন পূর্বতন শাসকগোষ্ঠীর সে সম্পর্কে জাগরণ হয়নি। বাতাসের ধারণায় তারা দেশ চালিয়েছিলো, বাতাসের মতোই তাদের পরাভব হয়।
বাতাস থেকে আবার মুখনির্গত নি:শ্বাসের কথায় ফেরত আসি। বিজ্ঞানে আছে এক কণা বাতাসের মধ্যে নাইট্রোজেন হলো ৭৮.০৯ %, অক্সিজেন হলো ২০.৯৫%, আর্গন হলো ০.৯৩% আর কার্বনডাই অক্সাইড হলো .০৪%, অর্থাৎ এক কণা বাতাস হলো বহু গ্যাসের সমষ্টি।

তেমনি নি:শ্বাস ছাড়া আমরা বাঁচতে পারি না বিধায় নি:শ্বাস হলো আমাদের প্রাণ। ঠিক সেরকম বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে ঐতিহাসিক ৭ মার্চ দিবসের গুরুত্ব হলো সেরকম। এটিকে যদি প্রাণশক্তি হিসেবে দেখি, তা হলে তার পেছনে আছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাংলাদেশের সংগ্রামের জন্য তের বছরের জেল খাটা, ৪৮-এর ভাষা আন্দোলন, বায়ান্নের একুশে ফেব্রুয়ারি বা শহীদ দিবস, ’৫৪-এর যুক্তফ্রন্টে তৎকালীন মুসলিম লীগের ভরাডুবি, ৬৯-এর গণবিক্ষোভ এবং ’৭১-এর ৭ মার্চের ভাষণ, যার পরিণতিতে এগিয়ে আসে মুক্তিযুদ্ধ, এগুলি সবই স্নোবল ইফেক্টের মতো লাইন ধরে চলে আসবে, আসবে বাংলাদেশ।

মানলাম যে ইতিহাস কী ঘটলো সেটা নয়, কিন্তু কারা কীভাবে ঘটনার বিশ্লেষণ করছে সেটিই ইতিহাস। এটিও মানলাম যে ইতিহাসকে বা ঐতিহাসিক ঘটনাকে ডিকনটেক্সচুয়ালাইজ করে যেমন আলোচনা করা যায়, তাকে আবার কনটেক্সচুয়ালাইজ করেও আলোচনা করা যায়। আধুনিক ইতিহাসবিদদের প্রবণতা হচ্ছে, ইরফান হাবীব সহ ফুকো, এমনকি মার্কস পযর্ন্ত যে ইতিহাসকে কনটেক্সট থেকে উপড়ে না ফেলে তাকে কনটেক্সটে রেখে বিশ্লেষণ করা ভালো।

পাকিস্তানী সাংবাদিক লেখক সিদ্দিক সালিক তাঁর উইটনেস টু সারেন্ডার গ্রন্থে এই ভাষণ শেষ হবার পূর্বমুহূর্ত পযর্ন্ত যে সামরিক শাসকমহল টিক্কা খান সহ কীরকম অস্থিরতার মধ্যে ছিল, তার বিবরণ আছে। ৭ মার্চকে ডিকন্টেকচুয়ালাইজ করলে বা পরিপ্রেক্ষিতবিহীন করলে এটি অবশ্যই ৩৬৫ দিনের একদিন, কিন্তু পরিপ্রেক্ষিত সহকারে বিবেচনায় আনলে দেখা যাবে যে এটি বাংলাদেশের জাতীয় জীবনে অতীব গুরুত্ব বহন করে। নতুন পথ তৈরি হবে, নতুন যুগ আসবে, কিন্তু অতীতকে পাঠ করে এগোতে হবে। অতীতকে পাঠ না করলে ভবিষ্যত হবে ছায়াচ্ছন্ন। তা হলে ৭ মার্চের সামাজিক-রাজনৈতিক গুরুত্ব যদি বাংলাদেশের একজন সচেতন নাগরিক হয়ে কেউ অস্বীকার করে সেটি অবশ্যই তার গণতান্ত্রিক অধিকার, কিন্তু তা হলে ৭ই মার্চের মধ্যে যে ওপরে ব্যাখ্যাত সৃষ্টিতত্ত্বের মতো একটি ধারাবাহিকতা আছে সেটি আমরা স্বীকার করলাম না। আর যদি ৭ মার্চের গুরুত্ব আমরা বিবর্তনধারা অনুযায়ী সার্ভাভাইবল অব দ্য ফিটেস্ট তত্ত্বে ফেলি, সেটি হবে আরেকরকম পর্যবেক্ষণ। যেন এটির কোন শুরু নেই, এটির কোন সংলগ্নতা নেই।

একটি শক্তিশালী স্বৈরাচারী সরকারের গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে পরাজিত হবার পর আমরা দেখতে চাই বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী সকল গর্বিত বিজয়ী ছাত্র-জনতা ও আমরা সমর্থকেরা সহ বিজ্ঞানভিত্তিক সঠিক তথ্যের বিশ্লেষণী ক্ষমতা প্রদর্শন করব। আমরা আশাবাদী যে যুক্তির আলো সকল জায়গায় স্থান পাবে: রাজনীতি, ইতিহাস, ক্রীড়া, ধর্ম, সামাজিক কাজকর্মে ও ব্যবসাতে। তথ্যভিত্তিক, নিরেট নিরপেক্ষতার মধ্য দিয়ে যোগ্যতা ও যুক্তির সু-অধিষ্ঠান হবে।

বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সংগ্রামী ও মেধাবী চরিত্র খুবই উৎসাহব্যঞ্জক একটি ব্যাপার।“ওরে সবুজ, ওরে অবুঝ, আধমরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা।”

আধুনিক বাংলাদেশ আমরা দেখতে চাই। ইতিহাসকে নতুনভাবে পর্যালোচনা করা উচিত, রাজনৈতিক রিটারিকভিত্তিক না হয়ে তথ্যের ওপর দাঁড় করানো উচিত, কেননা মিথ্যার ওপর দেশ চলতে পারে না। কিন্তু সেই বিচারেও, অর্থাৎ অত্যন্ত বস্তুনিষ্ঠ পর্যবেক্ষণেও বাংলাদেশের ইতিহাসে ৭ মার্চের গুরুত্ব আমাদের জাতীয় জীবন থেকে অবলুপ্ত করা যায় না।

বহু আগে ইংরেজ মনীষী ফ্রান্সিস বেকন বলেছেন, “অব গ্রেট প্লেস” শীর্ষক প্রবন্ধে যে ক্ষমতার পথটি অতি পিচ্ছিল। সে জন্য সাধু সাবধান। কোন ভুল করা যাবে না।

“ঐ নূতনের কেতন ওড়ে কালবোশেখীর ঝড় / তোরা সব জয়ধ্বনি কর!”

লেখকঃ মোহীত উল আলম,চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাসক, প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট।

মোহীত উল আলম: পবিত্র বাইবেলে (রচনাপর্ব: ১২০০ খ্রীষ্টপূর্ব থেকে খ্রীষ্টাব্দ ১) সৃষ্টিতত্ত্ব নিয়ে এই কথাটি আছে যে সৃষ্টিকর্তা প্রথমে আদম (আ:)-কে সৃষ্টি করেন। তারপর তাঁর পাঁজরের হাড় থেকে ইভকে সৃষ্টি করেন (“জেনেসিস”, ২:২১-২৩)। তাঁদের দুই পুত্রের কথা জানা যায়, এবেল এবং কেইন বা হাবিল ও কাবিল, এবং এরপর থেকে মানবজাতির ধারাবাহিক বংশবিস্তার।

“জেনেসিস” গ্রন্থের ১:২৬-২৭-এ আছে যে গড বলছেন, আমরা আমাদের মতো করে মনুষ্যজাতির সৃষ্টি করি যাতে তারা সমুদ্রের মাছ, আকাশের পাখি, গবাদি পশু, বন্যজন্তু এবং যা কিছু মাটির ওপর নড়াচাড়া করে তার ওপর প্রভুত্ব বিস্তার করতে পারে। (আমার অনুবাদ, এ্ আই থেকে)। “জেনেসিস” ২:৭-এ গড মাটির ধুলো থেকে একটি মানুষ বানালেন, এবং তার মধ্যে গড নিজেই নি:শ্বাস পূরে দিলেন, তখন মানুষ একটি জীবন্ত মানুষ হয়ে গেল। (আমার অনুবাদ এ আই থেকে)।

পবিত্র কোরান শরীফের (নাজেলকাল: ৬১০ থেকে ৬৩২ খ্রীষ্টাব্দ) ১৫ নম্বর সুরা “আল হিজর”-এর ২৬ আয়াতে আল্লাহ্ বলছেন, আমরা মানুষ সৃষ্টি করেছি রূপান্তরিত শুকনো মাটি (’সালসাল’) থেকে, ২৭ আয়াতে বলছেন, আর পূর্বে আমরা জ্বিন সৃষ্টি করেছি গরম বাতাসের আগুন থেকে, আর ২৮ আয়াতে বলছেন, দেখ, তোমরা ফেরেস্তারা, আমি এই মাটির খন্ড থেকে আকৃতি দান করে মানুষ সৃষ্টি করছি, এবং ২৯ আয়াতে বলছেন, আমি যখন পরিপূর্ণ আকারে তাকে সৃষ্টি করব, তখন আমার সত্তা আমি নি:শ্বাসের সঙ্গে তার ভিতরে পূরে দেব, তখন তোমরা আভূমি নত হয়ে তার প্রতি আনুগত্য দেখাবে। ৩০ আয়াতে জানানো হচ্ছে আল্লাহ্ র আজ্ঞা মেনে ফেরেস্তারা আভূমি নত হয়ে মানুষটাকে আনুগত্য জানালো। ৩১ আয়াতে জানতে পারছি, ফেরেস্তাদের মধ্যে ইবলিশ তার আনুগত্য জানাতে অস্বীকার করলো। ২৩ নম্বর সুরা “মুমিনুন”-এ মানুষ সৃষ্টির খানিকটা বিশদ বর্ণনায়, আয়াত ১২-১৪তে বলছেন, মানুষকে আমরা সৃষ্টি করেছি একবিন্দু ধুলিকণা থেকে, তারপর তাকে আমরা এক বিন্দু বীর্য হিসেবে গর্ভের বিশ্রামের জায়গায় নিশ্চিত রেখেছি, তারপর সে বীর্যবিন্দুকে এক বিন্দু জমাট রক্তে পরিণত করে একটি ভ্রূণ হিসেবে রূপ দিই, তারপর সে ভ্রূণ থেকে হাড়ের সৃষ্টি করি, সে হাড়গুলিকে আচ্ছাদিত রাখার জন্য মাংসের সৃষ্টি করি, তখন আমরা সম্পূর্ণরূপে একটি নতুন সৃষ্টি পাই। সুতরাং মহান আল্লাহ্ র গুণগান গাই। ১৫ আয়াতে মানুষকে লক্ষ্য করে বলছেন, অবশেষে তোমরা সবাই মারা যাবে, আর ১৬ আয়াতে বলছেন শেষ বিচারের দিন তোমরা সবাই আবার জাগ্রত হবে। ৩৮ নম্বর সুরা “সাদ”এর ৭১ ও ৭২ আয়াতে পুনরায় আল্লাহ্ ফেরেস্তাদেরকে বলছেন, দেখ, আমি মাটি থেকে মানুষ সৃষ্টি করতে যাচ্ছি, আর সেটা টেনে নিয়ে ৭২ আয়াতে সুরা আল হিজরের ২৯ আয়াতের পুনরুক্তি করে বলছেন, আমি যখন পরিপূর্ণ আকারে তাকে সৃষ্টি করব, তখন আমার সত্তা আমি নি:শ্বাসের সঙ্গে তার ভিতরে পূরে দেব, তখন তোমরা আভূমি নত হয়ে তার প্রতি আনুগত্য দেখাবে। (কোরানের আয়াতগুলি আবদুল্লাহ ইউসুফ আলীর বিখ্যাত ইংরেজি অনুবাদ থেকে আমি বাংলায় অনুবাদ করলাম।)

আধুনিক বিশ্বে প্রচলিত প্রধান দু’টি ধর্ম খ্রিস্টিয়ানিটি ও ইসলামের মধ্যে মানবসৃষ্টির এই সৃষ্টি রহস্য একটি অমোচনীয় বিশ্বাসের বস্তু হলেও বিজ্ঞানীদের মধ্যে এ নিয়ে বিস্তর পর্যবেক্ষণ চলে।

চালর্স ডারউইন , বিবতর্নবাদী ইংরেজ জীব বিজ্ঞানী ১৮৩৫ সালে দক্ষিণ আমেরিকার ইকুয়েডর নামক দেশটি থেকে ৬৩০ মাইল পশ্চিমে গ্যালাপ্যাগোজ দ্বীপপুঞ্জে পাঁচ সপ্তাহব্যাপী থেকে সেখানকার জীববৈচিত্র দেখে উদ্বুদ্ধ হয়ে প্রাণিকুলের উৎস খুঁজতে গিয়ে ন্যাচারাল সিলেকশন বা প্রাকৃতিক বাছাইয়ের ওপর জোর দেন। যেটির সরল অর্থ হচ্ছে, প্রকৃতি নিজেই তার অস্তিত্ব বজায় রাখার জন্য বাছাই এবং বর্জনের মধ্য দিয়ে যায়। প্রকৃতি বলতে সকল প্রাণিকুল আর বৃক্ষলতাদি আর সমুদ্র আর স্থল বোঝাচ্ছে। এই ধারণাটি তিনি তাঁর যুগান্তকারী গ্রন্থ দ্য অরিজিন অব স্পিসিজ (১৮৫৯)এ বিধৃত করেন, যার পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা দেন জীববিজ্ঞানী হার্বার্ট স্পেনসার ১৮৬৪ সালে “দ্য সার্ভাভাইবল অব দ্য ফিটেস্ট” সংজ্ঞায়, যেটির অর্থ হলো প্রাণিকুল বেঁচে থাকে শক্তি দিয়ে নয়, বরঞ্চ পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নিজের বংশবিস্তার করার প্রজনন ক্ষমতা বজায় রাখার জন্য।

মজার ব্যাপার হলো, লেখক শরৎচন্দ্র তাঁর শ্রীকান্ত উপন্যাসের এক জায়গায় লিখছেন, “অতিশয় বড় আকারের ডাইনোসর লোপ পাইয়াছে, কিন্তু সামান্য তেলাপোকা টিকিয়া আছে” (হাতের কাছে বইটি নেই, আছে শেলফে, কিন্তু চিন্তার গতি ব্যাহত হবে বিধায় চেয়ার ছেড়ে উঠছি না। তাই উদ্ধৃতি বা সোর্স ভুল হতে পারে), যেটি স্পেনসারের দেওয়া তত্ত্বের সাহিত্য রূপ। অর্থাৎ, পরিবর্তিত প্রাকৃতিক পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খেতে না পেরে অনেক প্রাণির বিলয় হয় কেননা তার প্রজনন ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে ফলে বংশবিস্তার করতে পারে না। আবার অনেক প্রাণি খাপ খাওয়াতে পেরে টিকে থাকে, যেমন তেলাপোকা ৩২ কোটি বছর আগে থেকে এখনও প্রজননশীল । “দ্য সার্ভাভাইবল অব দ্য ফিটেস্ট” সংজ্ঞাটি ডারউইনের পছন্দ হলে তিনি ১৮৬৯ সালে দ্য অরিজিনের ৫ম সংস্করণে সেটি গ্রহণ করেন এবং এটিকে ন্যাচার‌্যাল সিলেকশনের সমরূপ আখ্যা দেন।

ডারউইন কোথাও, যেমন দ্য ডিসেন্ট অব ম্যান (১৮৭১) বা অন্য কোথাও সরাসরি বলেননি যে বানর থেকে মানুষের সৃষ্টি হয়েছে, কিন্তু তিনি ধারণা করেছিলেন যে প্রাণিকুলের মধ্যে একটি গাছের বিভিন্ন শাখার মতো কোন না কোন পূর্বাপর সম্পর্ক আছে। কিন্তু তাঁর এই ধারণা বিশ্বকুলে প্রবল প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে, কারণ এটি সরাসরি ধর্মগ্রন্থে বর্ণিত মানুষের সৃষ্টিরহস্য এবং সৃষ্টিতত্ত্ব নিয়ে সাধারণ মানুষের বিশ্বাসে আঘাত হানে। কারণ একজন সৃষ্টিকর্তা নেই, এটি মানবমনে কোথাও ঠাঁই পায় না। (আমার মনেও ঠাঁই পায় না)।

যা হোক সৃষ্টিতত্ত্ব আর বিবর্তনবাদের তত্ত্বের মধ্যে সংঘাত পশ্চিমের সমাজে বিতর্কের পর্যায়ে পৌঁছালে বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় বড় পন্ডিতেরা এটিকে একাডেমিক পর্যায়ে নিয়ে আসেন (যে চর্চাটা আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রায় অনুপস্থিত। ওখানে খুব বিতর্কিত বিষয়কেও একাডেমিক ডিসিপ্লিনের মধ্যে ফেলে অনেকটা ডিসেনসিটাইজ করে পুরো ব্যাপারটি আলোচনা করা হয়। যেমন, পুঁজিবাদের সরাসরি প্রতিপক্ষ মার্ক্সবাদ পশ্চিমা পুঁজিবাদী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সাসটেইনডভাবে আলোচনা করা হয়।)

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক বিশ্বব্যাপী পরিচিত শেক্সপিয়ার পন্ডিত ও নব্য ইতিহাসবাদ সাহিত্যপাঠরীতির প্রবর্তক স্টিফেন গ্রিনব্ল্যাট একটি গ্রন্থ লিখলেন, দ্য রাইজ এ্যান্ড ফল অব এ্যাডাম এ্যান্ড ঈভ (২০১৭) এবং এই বিতর্কের অবসানকল্পে তিনি উপসংহার টানলেন যে যদিও এটা প্রমাণ করা যাবে না যে যুগে যুগে রচিত ও সংযোজিত পবিত্র বাইবেল মানুষ ছাড়া কেউ লিখেছে, কিন্তু সৃষ্টিতত্ত্বের গল্পটা নৈয়ায়িকভাবে এতটাই আকর্ষণীয় যে মানুষ এটাতে আকর্ষিত হবেই। কী সে আকর্ষণ? সেটি হলো, মানুষের সব কাজ পর্যবেক্ষণ করার জন্য একজন আল্লাহ, গড, ভগবান বা বুদ্ধ আছেন যিনি বিচারকের ভূমিকায় পাপের জন্য শাস্তি আর সাধু কাজের জন্য প্রশস্তির ব্যবস্থা রেখেছেন। পবিত্র কোরাণে ৯৯ সংখ্যক সুরা “জিলজ্যাল” বা “আজ-জালাহ,” ৭ আয়াতে আল্লাহ্ বলছেন, কেউ এক এ্যাটম ওজনের ভালো কাজ করলে আমার নজর এড়ায় না, আর ৮ আয়াতে বলছেন, কেউ এক এ্যাটম ওজনের খারাপ কাজ করলে তাও আমার নজর এড়ায় না।

এ্যারিস্টোটল যেটিকে মানুষের টেলিওলোজিক্যাল (বা ক্রমশ নৈতিক উন্নতির পথে অগ্রসরমান মানবজাতি) অগ্রগমন ভেবে আশাবাদী ছিলেন, গ্রিনব্ল্যাটও সেইরূপ সৃষ্টিতত্ত্বের কাহিনীর মধ্যে এইরূপ মানবাত্মক নৈতিক আচরণের এই ঊর্ধ্বগমনকে প্রাধান্য দিয়ে তাঁর বইটি শেষ করেন। বলেন, জেনেসিসের গল্পে আছে যে একটি মানবজীবন অতিবাহিত হয় সেই জ্ঞান নিয়ে যে জ্ঞান বলে কোনটা ভালো আর কোনটা খারাপ। অর্থাৎ পবিত্র কোরাণের ভাষায় সে “আশরাফুল মুকলাকাত”। কিন্তু প্রাকৃতিক বাছাই দ্বারা সৃষ্ট জীবন ধারণায় এই পাপ-পুণ্যের কোন বোধ বা জ্ঞান কাজ করে না বা এর কোন অবস্থান নেই বিধায় সর্বজনীনভাবে মানুষ এই তত্ত্বকে পরিত্যাগ করেছে বলা যায়। মানুষ চায় সৃষ্টিকর্তার কাছে দু‘হাত তুলে তার পাপকার্যের জন্য মার্জনা, আর ভালো কাজের জন্য সন্তুষ্টির বিধান।

ওপরে ধর্মীয় সৃষ্টিতত্ত্বের আলোকে ধর্মীয় সংজ্ঞাগুলি যখন দিচ্ছিলাম তখন লক্ষ করে থাকবেন, সৃষ্টিততত্ত্বের আলোকে নি:শ্বাস বা ‘ফুঁ’ বা মুখ থেকে নির্গত বায়ুর উল্লেখ আছে। এর ধর্মীয় গুরুত্ব হচ্ছে গড বা আল্লাহ যখন মানব শরীরে ফুঁ প্রবিষ্ট করালেন, তখনই মানবদেহ পবিত্র (ডিভাইন বা ঐশ্বরিক) হয়ে উঠল, যেটি তার আত্মা, যেটি অমর।

এই ফুঁ-টা কী? একটি নি:শ্বাস। বায়ুপ্রধান প্রক্রিয়া। মানুষ মর্ত্যলোকে একটি নি:শ্বাসের মালিক। ধর্মে বলা হয়, এটা দেবার মালিকও আল্লাহ, নেবার মালিকও আল্লাহ। ইংরেজি সাহিত্যের ক্লাসিক নাটক খ্রিস্টোফার মার্লোর ডক্টর ফাউস্টাস-এর শেষ দৃশ্যে ডক্টর ফাউস্টাসকে মরবার আগে একটি নি:শ্বাস ধার নেবার জন্য কত যে কাকুতি-মিনতে করতে দেখি। আর, দুই বছর আগে রোজার সময় বিভাগে সহকর্মীদের সঙ্গে ইফতার করার সময় হঠাৎ আমার চোকিং হয়, অর্থাৎ শ্বাসনালীতে খাবার আটকে যায়। তখন ক্ষিয়ৎক্ষণের জন্য আমি অনুভব করি নি:শ্বাসের মূল্য। আমার খুবই জুনিয়র সহকর্মী জাগরণ দে মিল্টন আমার বুকে দুটো মোটামুটি পাওয়ারের ঘুষি মারলে আমার ব্লকটা ছোটে। আল্লাহ মেহেরবান। এই নি:শ্বাস হচ্ছে বায়ু। প্রকৃতিতে ছোট্ট একটা প্রজাপতি বাতাসে সাঁতার কেটে কেটে ওড়ে। এই বায়ুমন্ডল আছে বলে আমরা বেঁচে আছি। বিজ্ঞানে বায়ুর প্রভাব অত্যধিক। চামড়ার টায়ারের ভিতর বাতাস ভরে দিলে সে ট্রাক কয়েক টন ওজন সহজে বহন করতে পারে।

বায়ু বা বাতাসের ধর্মীয়, প্রাকৃতিক ও বিজ্ঞানী ব্যবহার ছাড়াও এর একটি সামাজিক বা রাজনৈতিক ব্যবহার আছে, তুচ্ছার্থে। তখন এটাকে আমরা বলি বাতাস, যেটা ক্ষণস্থায়ী, যেটা ফুটা, যেটা সাবস্ট্যান্সবিহীন। । গত পনের বছরের স্বৈরাচারী শাসনের আমলের ভিত্তি ছিল এই বাতাসই। কিছু অবাস্তব জিগিরকে, তুলনাযোগ্য সত্যকে অতুলনীয় মিথ্যায় পরিণত করার (যেমন অমূক শ্রেষ্ঠ, সবই অমুক দল, ইতিহাসে আর হয় নাই ইত্যাদি বাচাল শ্লোগান) একটি কৌশল অবলম্বন করেছিল তারা। একটি অবৈজ্ঞানিক, অনৈতিহাসিক এবং অরাজনৈতিক গালভরা প্রচ্ছদের আড়ালে “গণতন্ত্রের” নামে স্পষ্টভাবে গণতন্ত্র বিনষ্ট করার একটি নষ্ট রাজনৈতিক রিটারিক ছিল তাদের বাতাস। এটি দিয়ে গোটা একটি রাজনৈতিক সমাজে মতদ্বৈধতাবিহীনভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে চেয়েছিল তারা। যেটির ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে সচেতন মানুষ ও সাধারণ জনগণ টনটনে হয়ে থাকলেও কেন যেন পূর্বতন শাসকগোষ্ঠীর সে সম্পর্কে জাগরণ হয়নি। বাতাসের ধারণায় তারা দেশ চালিয়েছিলো, বাতাসের মতোই তাদের পরাভব হয়।
বাতাস থেকে আবার মুখনির্গত নি:শ্বাসের কথায় ফেরত আসি। বিজ্ঞানে আছে এক কণা বাতাসের মধ্যে নাইট্রোজেন হলো ৭৮.০৯ %, অক্সিজেন হলো ২০.৯৫%, আর্গন হলো ০.৯৩% আর কার্বনডাই অক্সাইড হলো .০৪%, অর্থাৎ এক কণা বাতাস হলো বহু গ্যাসের সমষ্টি।

তেমনি নি:শ্বাস ছাড়া আমরা বাঁচতে পারি না বিধায় নি:শ্বাস হলো আমাদের প্রাণ। ঠিক সেরকম বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে ঐতিহাসিক ৭ মার্চ দিবসের গুরুত্ব হলো সেরকম। এটিকে যদি প্রাণশক্তি হিসেবে দেখি, তা হলে তার পেছনে আছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাংলাদেশের সংগ্রামের জন্য তের বছরের জেল খাটা, ৪৮-এর ভাষা আন্দোলন, বায়ান্নের একুশে ফেব্রুয়ারি বা শহীদ দিবস, ’৫৪-এর যুক্তফ্রন্টে তৎকালীন মুসলিম লীগের ভরাডুবি, ৬৯-এর গণবিক্ষোভ এবং ’৭১-এর ৭ মার্চের ভাষণ, যার পরিণতিতে এগিয়ে আসে মুক্তিযুদ্ধ, এগুলি সবই স্নোবল ইফেক্টের মতো লাইন ধরে চলে আসবে, আসবে বাংলাদেশ।

মানলাম যে ইতিহাস কী ঘটলো সেটা নয়, কিন্তু কারা কীভাবে ঘটনার বিশ্লেষণ করছে সেটিই ইতিহাস। এটিও মানলাম যে ইতিহাসকে বা ঐতিহাসিক ঘটনাকে ডিকনটেক্সচুয়ালাইজ করে যেমন আলোচনা করা যায়, তাকে আবার কনটেক্সচুয়ালাইজ করেও আলোচনা করা যায়। আধুনিক ইতিহাসবিদদের প্রবণতা হচ্ছে, ইরফান হাবীব সহ ফুকো, এমনকি মার্কস পযর্ন্ত যে ইতিহাসকে কনটেক্সট থেকে উপড়ে না ফেলে তাকে কনটেক্সটে রেখে বিশ্লেষণ করা ভালো।

পাকিস্তানী সাংবাদিক লেখক সিদ্দিক সালিক তাঁর উইটনেস টু সারেন্ডার গ্রন্থে এই ভাষণ শেষ হবার পূর্বমুহূর্ত পযর্ন্ত যে সামরিক শাসকমহল টিক্কা খান সহ কীরকম অস্থিরতার মধ্যে ছিল, তার বিবরণ আছে। ৭ মার্চকে ডিকন্টেকচুয়ালাইজ করলে বা পরিপ্রেক্ষিতবিহীন করলে এটি অবশ্যই ৩৬৫ দিনের একদিন, কিন্তু পরিপ্রেক্ষিত সহকারে বিবেচনায় আনলে দেখা যাবে যে এটি বাংলাদেশের জাতীয় জীবনে অতীব গুরুত্ব বহন করে। নতুন পথ তৈরি হবে, নতুন যুগ আসবে, কিন্তু অতীতকে পাঠ করে এগোতে হবে। অতীতকে পাঠ না করলে ভবিষ্যত হবে ছায়াচ্ছন্ন। তা হলে ৭ মার্চের সামাজিক-রাজনৈতিক গুরুত্ব যদি বাংলাদেশের একজন সচেতন নাগরিক হয়ে কেউ অস্বীকার করে সেটি অবশ্যই তার গণতান্ত্রিক অধিকার, কিন্তু তা হলে ৭ই মার্চের মধ্যে যে ওপরে ব্যাখ্যাত সৃষ্টিতত্ত্বের মতো একটি ধারাবাহিকতা আছে সেটি আমরা স্বীকার করলাম না। আর যদি ৭ মার্চের গুরুত্ব আমরা বিবর্তনধারা অনুযায়ী সার্ভাভাইবল অব দ্য ফিটেস্ট তত্ত্বে ফেলি, সেটি হবে আরেকরকম পর্যবেক্ষণ। যেন এটির কোন শুরু নেই, এটির কোন সংলগ্নতা নেই।

একটি শক্তিশালী স্বৈরাচারী সরকারের গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে পরাজিত হবার পর আমরা দেখতে চাই বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী সকল গর্বিত বিজয়ী ছাত্র-জনতা ও আমরা সমর্থকেরা সহ বিজ্ঞানভিত্তিক সঠিক তথ্যের বিশ্লেষণী ক্ষমতা প্রদর্শন করব। আমরা আশাবাদী যে যুক্তির আলো সকল জায়গায় স্থান পাবে: রাজনীতি, ইতিহাস, ক্রীড়া, ধর্ম, সামাজিক কাজকর্মে ও ব্যবসাতে। তথ্যভিত্তিক, নিরেট নিরপেক্ষতার মধ্য দিয়ে যোগ্যতা ও যুক্তির সু-অধিষ্ঠান হবে।

বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সংগ্রামী ও মেধাবী চরিত্র খুবই উৎসাহব্যঞ্জক একটি ব্যাপার।“ওরে সবুজ, ওরে অবুঝ, আধমরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা।”

আধুনিক বাংলাদেশ আমরা দেখতে চাই। ইতিহাসকে নতুনভাবে পর্যালোচনা করা উচিত, রাজনৈতিক রিটারিকভিত্তিক না হয়ে তথ্যের ওপর দাঁড় করানো উচিত, কেননা মিথ্যার ওপর দেশ চলতে পারে না। কিন্তু সেই বিচারেও, অর্থাৎ অত্যন্ত বস্তুনিষ্ঠ পর্যবেক্ষণেও বাংলাদেশের ইতিহাসে ৭ মার্চের গুরুত্ব আমাদের জাতীয় জীবন থেকে অবলুপ্ত করা যায় না।

বহু আগে ইংরেজ মনীষী ফ্রান্সিস বেকন বলেছেন, “অব গ্রেট প্লেস” শীর্ষক প্রবন্ধে যে ক্ষমতার পথটি অতি পিচ্ছিল। সে জন্য সাধু সাবধান। কোন ভুল করা যাবে না।

“ঐ নূতনের কেতন ওড়ে কালবোশেখীর ঝড় / তোরা সব জয়ধ্বনি কর!”

লেখকঃ মোহীত উল আলম,চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাসক, প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট।