মীর হোসেন মোল্লা (আরমান): সামাজিক মূল্যবোধ হলো এমন একটি ধারণা, যা সমাজের রীতিনীতি ও ভালোমন্দ নির্ধারণের মাধ্যমে মানুষের আচার-আচরণ ও কর্মকাণ্ডকে নিয়ন্ত্রণ করে। আর এই মূল্যবোধের যখন অবক্ষয় ঘটে তখন সৃষ্টি হয় নানা সামাজিক অসংগতি ও নৈরাজ্যের। আর এর ভয়াবহতা কতটা করুণ ও মারাত্মক হতে পারে তা বর্তমান সমাজ ব্যবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে সহজেই অনুমেয়।
আমরা মানুষ সামাজিক জীব। আদিকাল থেকেই মানুষ সংঘবদ্ধভাবে সমাজে বসবাস করতে পছন্দ করে। কিন্তু আমরা কি আদৌ সামাজিক? একুশ শতকে দাঁড়িয়ে বর্তমান সমাজের পটভূমিতে সমগ্র জাতির সম্মুখে এটি অনেক বড় প্রশ্ন। প্রতিনিয়ত সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় এ প্রশ্নকে করেছে আরো জোরালো। বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থায় বর্তমানে যতগুলো সমস্যা রয়েছে, তার মধ্যে সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় সবার শীর্ষে।
সততা, ধৈর্য, কর্তব্যনিষ্ঠা, শিষ্টাচার, দেশপ্রেম এবং পারস্পরিক মমত্ববোধ ও কল্যাণবোধের বিপরীতে হিংসা-বিদ্বেষ, ক্রোধ, লোভ, দুর্নীতি ও পারস্পরিক দ্বন্দ্ব সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে জেঁকে বসেছে। সামাজিক মূল্যবোধ ও নৈতিক অবক্ষয় যে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে জেঁকে বসেছে, একটি সভ্য ও শান্তিপূর্ণ সমাজব্যবস্থা সেখানে শুধু বইয়ের পাতায় লেখা রূপকথার গল্পের মতো। আর এসব নেতিবাচকতার প্রধান শিকার আমাদের যুবসমাজ।
আঠারো ও উনিশ শতকের হতদরিদ্র সনাতন সমাজব্যবস্থার নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষা ও সামাজিক মূল্যবোধ আজকের আধুনিক সমাজব্যবস্থায় প্রায় বিরল। কলি যুগের হিংসা, অহংকার, বর্বরতা এবং বিকৃত চিন্তাভাবনা ও বিকৃত রুচির মহামারিতে ভুগছে সমাজের প্রতিটি স্তর। প্রতিনিয়ত কোথাও না কোথাও ঘটছে বিভিন্ন ধরনের সন্ত্রাসী কার্যকলাপ।
বর্তমান এমন এক সমাজে আমরা বসবাস করছি, যেখানে একটি শিশুও নিরাপদে নেই। স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে, স্ত্রী কর্তৃক স্বামীকে, ভাই কর্তৃক ভাইকে, বাবা-মা কর্তৃক সন্তানকে, সন্তান কর্তৃক বাবা মাকে, বন্ধু কর্তৃক বন্ধুকে খুন এখন একটি নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। খবরের কাগজ খুললেই চোখে ভাসে গুম, খুন, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, রাহাজানি এবং নারী ও শিশু নির্যাতনের মতো ভয়াবহ ঘটনাগুলো। এক কথায় বলতে গেলে এর সবকিছুর মূলে রয়েছে পারিবারিক ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার অভাব, আকাশ সংস্কৃতির প্রসার এবং পশ্চিমা সংস্কৃতির ভয়াল থাবা। সেই সঙ্গে মাদকাসক্তি, পর্নো আসক্তি, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর নেতিবাচক ব্যবহার ও রাজনীতিতে তরুণদের অক্লান্ত লেজুড়বৃত্তি হলো তরুণ সমাজের নেতিবাচক পরিবর্তন ও ছন্দপতনের আরো কিছু কারণ।
শুধু তা-ই নয়,বেকারত্ব ও হতাশা বর্তমান তরুণ ও যুবসমাজের অবক্ষয়ের আরো দু’টি মূল কারণ। সঠিক কর্মসংস্থানের অভাব, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, শিক্ষক ও অভিভাবকদের আদর্শহীনতা এবং বিত্তবানদের অনৈতিকতা সমাজের প্রতিটি স্তরে যেমন বৈষম্য সৃষ্টি করেছে, তেমনি কল্পনাতীত হারে বৃদ্ধি পেয়েছে বেকারত্বের হার। এর ফলে তরুণ ও যুবসমাজের একটি বৃহৎ অংশ মাদকাসক্তি, চাঁদাবাজি, চুরি-ছিনতাই-ডাকাতি, অপহরণ ইত্যাদি অপরাধমূলক কাজে জড়িয়ে পড়ছে।
উল্লিখিত সমস্যাসমূহের ইতিবাচক পরিবর্তন এখন সময়ের দাবি। কেননা এই ভয়ানক বর্বরতা ও নৈতিক অবক্ষয়ের ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি অন্ধকার ও কলঙ্কিত সমাজ অপেক্ষা করছে। আর দিন শেষে আমরা দাঁড়াব কাঠগড়ায়, প্রশ্নবিদ্ধ হবে সমাজ।
কিন্তু কীভাবে আসবে পরিবর্তন? এই পরিবর্তন শুরু করতে হবে পরিবার থেকে, দায়িত্ব নিতে হবে পরিবারের প্রতিটি সদস্যকে। ছোটবেলা থেকেই সন্তানকে ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষায় দীক্ষিত করতে হবে। বড়দের সম্মান ও ছোটদের স্নেহ করার পাশাপাশি সব নৈতিক গুণাবলি অর্জনের পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে।
মনে রাখতে হবে, বিশ্বের কোনো ধর্মই মানুষকে অসভ্য ও বর্বর হতে শেখায় না। তাই ধর্মীয় শিক্ষার বিকল্প কিছু হতে পারে না। পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা হতে হবে আরো যুগোপযোগী এবং প্রায়োগিক। শিক্ষা ও নৈতিক শিক্ষার সমন্বয়ে তৈরি করতে হবে জাতীয় শিক্ষাক্রম। এর পাশাপাশি সামাজিক নিয়মকানুন, মূল্যবোধ ও পারস্পরিক দায়বদ্ধতা সম্পর্কে সবাইকে সচেতন হতে হবে। লেখকঃ মীর হোসেন মোল্লা (আরমান) / সাংবাদিক।




