বিনোদন ডেস্ক: গত মঙ্গলবার (১৫ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় কলকাতার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন উপমহাদেশের বিশিষ্ট সংগীতশিল্পী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়। মৃত্যুর আগ মূহুর্তেও প্রকাশ করে গেছেন গানের প্রতি তার অকৃত্রিম ভালোবাসা। সেই গান শুনতে শুনতেই হৃদ্স্পন্দন বন্ধ হয় ‘গীতশ্রী’র।

কলকাতার অ্যাপোলো হাসপাতালের আইসিইউয়ে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা নার্সরা জানান, মৃত্যুর আগে ‘গীতশ্রী’র ইচ্ছা হয়, টিভিতে গান শুনবেন। কিন্তু আইসিইউয়ে তা কী ভাবে সম্ভব, সেই ভাবনার মাঝেই আমাদের কাছে গান শোনানোর আবদার করেন তিনি। আইসিইউয়ের নার্সিং ইন-চার্জ ঝুমা বিশ্বাসকে বলেন ‘‘তুমি গান জানো? শোনাতে পারবে আমায়?’’ তার আগে আমরা তাকে বার বার অনুরোধ করি, ‘ম্যাডাম, চোখ বুজে একটু বিশ্রাম নিন’। কিন্তু নারাজ ‘গীতশ্রী’।

‘গানে মোর কোন ইন্দ্রধনু’র সুরে বাঙালিকে আজও আবিষ্ট করে রেখেছে যার গলা, তার আবদারে না করতে পারেননি রবীন্দ্রসঙ্গীতে তালিম নেওয়া তনুশ্রী সামন্ত। গেয়ে ওঠেন, ‘তোমার অসীমে প্রাণ মন লয়ে’, ‘দাঁড়িয়ে আছ তুমি আমার গানের ওপারে’। তার পরেও বিশ্রাম নিতে নারাজ সন্ধ্যা। গান না শুনলে যে তিনি বিশ্রাম নিতে পারছেন না! অগত্যা আইসিইউয়ের নার্সিং ইন-চার্জ ঝুমা বিশ্বাস নিজের মোবাইলে চালালেন শিল্পীর পছন্দের গান। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় অ্যাপোলো হাসপাতালের আইসিইউয়ে ‘গীতশ্রী’র ১০৪ নম্বর শয্যা তখন ভেসে যাচ্ছে সুরের মূর্ছনায়।

এক সময়ে শুরু হল ‘এই শহর থেকে আরও অনেক দূরে চলো কোথাও চলে যাই…’। চোখ বন্ধ করেই শুনছেন সন্ধ্যা। আচমকা মনিটরে চোখ গেল চিকিৎসক-নার্সদের। হৃদ্স্পন্দন নামতে শুরু করেছে— ৭২ থেকে মুহূর্তের মধ্যে ২১। ‘ম্যাডাম ম্যাডাম’ ডাকেও আর সাড়া দিচ্ছেন না। সিপিআর, ভেন্টিলেশন দেওয়া হলেও চোখ আর খুললেন না সন্ধ্যা।

২৭ জানুয়ারি কোভিড নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন সন্ধ্যা। করোনামুক্ত হয়ে ২ ফেব্রুয়ারি থেকে হাসপাতালের ৩৫৫ নম্বর মহারাজা সুইট ছিল তার ঠিকানা। বুধবার সেখানে বসে ঝুমা বললেন, ‘‘মাত্র এক মিনিট ৫৮ সেকেন্ড গানটা শুনতে শুনতেই শহর ছেড়ে পাড়ি দিলেন। জীবনে ভুলব না এই স্মৃতি।’’ গত কয়েক দিনের কথা বলতে গিয়ে চোখের কোণ ভিজে আসছে নার্সিং ডিরেক্টর লক্ষ্মী ভট্টাচার্য, নার্সিং সুপার প্রেমলতা বিশওয়াল, ফ্লোর ইন-চার্জ দীপ্তি বন্দ্যোপাধ্যায়ের। প্রত্যেকেই বলছেন, ‘‘গলার মতো তার ব্যবহারও ছিল মিষ্টি। কখনও বিরক্তি ছিল না।’’

কিছু পছন্দ না হলে হাসিমুখেই তা জানাতেন সন্ধ্যা। যেমন, তার চিকিৎসার দায়িত্বে থাকা ক্রিটিক্যাল কেয়ারের চিকিৎসক সুরেশ রামাসুব্বনকে বলেছিলেন— ‘‘কর্নাটকের গান নয়, আমার পছন্দ তো রবীন্দ্রসঙ্গীত’। ওই চিকিৎসকের বলেন, ‘‘আমার মা গানের শিক্ষিকা, সঙ্গীত ঘরানায় বড় হয়েছি। তাকে সেটা বলেছিলাম। কর্নাটকের শিল্পী ও গান নিয়ে আলোচনা করতেন।’’

কখনও কষ্টের কথা বলেননি ‘গীতশ্রী’। ব্যতিক্রম এক বারই। মঙ্গলবার সকালে রক্তচাপ বাড়াতে ওষুধ দেওয়ার জন্য গলার পাশে চ্যানেল (সেন্ট্রাল লাইন) করার সময়ে বলেন, ‘‘আর পারছি না। এ বার ছেড়ে দিন।’’ সুরেশের কথায়, ‘‘শোনার পরেই মনটা কেমন হয়ে গিয়েছিল!’’

শেষের দিনগুলো কেমন কেটেছিল ‘গীতশ্রী’র? নার্সেরা জানাচ্ছেন, তার দুপুরের মেনুতে থাকত গলা ভাত ও মাছের পাতলা ঝোল। প্রতিদিন দুপুরে টিভিতে তার সিরিয়াল দেখা চাই-ই। তার পরে কিছু ক্ষণ বিশ্রাম। সন্ধ্যা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত ফের সিরিয়াল। দীপ্তি জানান, গত ১১ ফেব্রুয়ারি ঊরুর অস্ত্রোপচারের আগের দিন মেয়ে-জামাইয়ের কাছে বাড়ি ফিরতে চেয়েছিলেন। অস্ত্রোপচারের পরে মাঝেমধ্যে পা ঝুলিয়েও বসতেন। শীতাতপ যন্ত্র নয়, বরং হাল্কা করে পাখা চালাতেই বলতেন নার্সদের। মঙ্গলবার সকালে প্রায় দু’ঘণ্টা তাঁর কাছে ছিলেন লক্ষ্মী। বললেন, ‘‘খিদে পেয়েছে বলছিলেন। বলেছিলাম, পেটের সিটি স্ক্যান হয়ে গেলেই খেতে দেওয়া হবে। স্ক্যানের পরে আইসিইউয়ে গিয়ে পছন্দের সুজি, ছানাও খেয়েছিলেন।’’

তার পরেই গান শোনানোর আবদার করেন তনুশ্রীর কাছে। কেন গান গাওয়া ছেড়েছেন ওই তরুণী, তা-ও জানতে চান। তনুশ্রীর কথায়, ‘‘রাতে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলে ঘুমিয়ে পড়তেন। কিন্তু এ দিন গান না শুনে চোখ বন্ধই করছিলেন না।’’

আর শেষ সময়ে? ঝুমা বলেন, ‘‘মোবাইলে গান চালানোর আগে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, নিজের গান শুনবেন কি না। আপত্তি করেছিলেন। মান্না দে-র নাম বলতেই উদগ্রীব হয়ে শুনতে চাইলেন। ওর গাওয়া একাধিক গান চালিয়ে দিয়ে মাথায় হাত বোলাচ্ছিলাম। চোখেমুখে তখন এক অদ্ভুত শান্তি। তার পরেই সব শেষ।’’

পছন্দের ক্রিম-পারফিউমে সাজিয়ে ‘গীতশ্রী’কে শেষ বারের মতো বিদায় জানিয়েছেন অ্যাপোলোর সবাই। তবে মন মানছে না। চিকিৎসক, নার্স থেকে খাবার বণ্টনের ইন-চার্জ রানা চৌধুরী, সকলেই যেন বলতে চাইছেন— ‘কিছু ক্ষণ আরও না হয় রহিতে কাছে…’।

বিনোদন ডেস্ক: গত মঙ্গলবার (১৫ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় কলকাতার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন উপমহাদেশের বিশিষ্ট সংগীতশিল্পী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়। মৃত্যুর আগ মূহুর্তেও প্রকাশ করে গেছেন গানের প্রতি তার অকৃত্রিম ভালোবাসা। সেই গান শুনতে শুনতেই হৃদ্স্পন্দন বন্ধ হয় ‘গীতশ্রী’র।

কলকাতার অ্যাপোলো হাসপাতালের আইসিইউয়ে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা নার্সরা জানান, মৃত্যুর আগে ‘গীতশ্রী’র ইচ্ছা হয়, টিভিতে গান শুনবেন। কিন্তু আইসিইউয়ে তা কী ভাবে সম্ভব, সেই ভাবনার মাঝেই আমাদের কাছে গান শোনানোর আবদার করেন তিনি। আইসিইউয়ের নার্সিং ইন-চার্জ ঝুমা বিশ্বাসকে বলেন ‘‘তুমি গান জানো? শোনাতে পারবে আমায়?’’ তার আগে আমরা তাকে বার বার অনুরোধ করি, ‘ম্যাডাম, চোখ বুজে একটু বিশ্রাম নিন’। কিন্তু নারাজ ‘গীতশ্রী’।

‘গানে মোর কোন ইন্দ্রধনু’র সুরে বাঙালিকে আজও আবিষ্ট করে রেখেছে যার গলা, তার আবদারে না করতে পারেননি রবীন্দ্রসঙ্গীতে তালিম নেওয়া তনুশ্রী সামন্ত। গেয়ে ওঠেন, ‘তোমার অসীমে প্রাণ মন লয়ে’, ‘দাঁড়িয়ে আছ তুমি আমার গানের ওপারে’। তার পরেও বিশ্রাম নিতে নারাজ সন্ধ্যা। গান না শুনলে যে তিনি বিশ্রাম নিতে পারছেন না! অগত্যা আইসিইউয়ের নার্সিং ইন-চার্জ ঝুমা বিশ্বাস নিজের মোবাইলে চালালেন শিল্পীর পছন্দের গান। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় অ্যাপোলো হাসপাতালের আইসিইউয়ে ‘গীতশ্রী’র ১০৪ নম্বর শয্যা তখন ভেসে যাচ্ছে সুরের মূর্ছনায়।

এক সময়ে শুরু হল ‘এই শহর থেকে আরও অনেক দূরে চলো কোথাও চলে যাই…’। চোখ বন্ধ করেই শুনছেন সন্ধ্যা। আচমকা মনিটরে চোখ গেল চিকিৎসক-নার্সদের। হৃদ্স্পন্দন নামতে শুরু করেছে— ৭২ থেকে মুহূর্তের মধ্যে ২১। ‘ম্যাডাম ম্যাডাম’ ডাকেও আর সাড়া দিচ্ছেন না। সিপিআর, ভেন্টিলেশন দেওয়া হলেও চোখ আর খুললেন না সন্ধ্যা।

২৭ জানুয়ারি কোভিড নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন সন্ধ্যা। করোনামুক্ত হয়ে ২ ফেব্রুয়ারি থেকে হাসপাতালের ৩৫৫ নম্বর মহারাজা সুইট ছিল তার ঠিকানা। বুধবার সেখানে বসে ঝুমা বললেন, ‘‘মাত্র এক মিনিট ৫৮ সেকেন্ড গানটা শুনতে শুনতেই শহর ছেড়ে পাড়ি দিলেন। জীবনে ভুলব না এই স্মৃতি।’’ গত কয়েক দিনের কথা বলতে গিয়ে চোখের কোণ ভিজে আসছে নার্সিং ডিরেক্টর লক্ষ্মী ভট্টাচার্য, নার্সিং সুপার প্রেমলতা বিশওয়াল, ফ্লোর ইন-চার্জ দীপ্তি বন্দ্যোপাধ্যায়ের। প্রত্যেকেই বলছেন, ‘‘গলার মতো তার ব্যবহারও ছিল মিষ্টি। কখনও বিরক্তি ছিল না।’’

কিছু পছন্দ না হলে হাসিমুখেই তা জানাতেন সন্ধ্যা। যেমন, তার চিকিৎসার দায়িত্বে থাকা ক্রিটিক্যাল কেয়ারের চিকিৎসক সুরেশ রামাসুব্বনকে বলেছিলেন— ‘‘কর্নাটকের গান নয়, আমার পছন্দ তো রবীন্দ্রসঙ্গীত’। ওই চিকিৎসকের বলেন, ‘‘আমার মা গানের শিক্ষিকা, সঙ্গীত ঘরানায় বড় হয়েছি। তাকে সেটা বলেছিলাম। কর্নাটকের শিল্পী ও গান নিয়ে আলোচনা করতেন।’’

কখনও কষ্টের কথা বলেননি ‘গীতশ্রী’। ব্যতিক্রম এক বারই। মঙ্গলবার সকালে রক্তচাপ বাড়াতে ওষুধ দেওয়ার জন্য গলার পাশে চ্যানেল (সেন্ট্রাল লাইন) করার সময়ে বলেন, ‘‘আর পারছি না। এ বার ছেড়ে দিন।’’ সুরেশের কথায়, ‘‘শোনার পরেই মনটা কেমন হয়ে গিয়েছিল!’’

শেষের দিনগুলো কেমন কেটেছিল ‘গীতশ্রী’র? নার্সেরা জানাচ্ছেন, তার দুপুরের মেনুতে থাকত গলা ভাত ও মাছের পাতলা ঝোল। প্রতিদিন দুপুরে টিভিতে তার সিরিয়াল দেখা চাই-ই। তার পরে কিছু ক্ষণ বিশ্রাম। সন্ধ্যা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত ফের সিরিয়াল। দীপ্তি জানান, গত ১১ ফেব্রুয়ারি ঊরুর অস্ত্রোপচারের আগের দিন মেয়ে-জামাইয়ের কাছে বাড়ি ফিরতে চেয়েছিলেন। অস্ত্রোপচারের পরে মাঝেমধ্যে পা ঝুলিয়েও বসতেন। শীতাতপ যন্ত্র নয়, বরং হাল্কা করে পাখা চালাতেই বলতেন নার্সদের। মঙ্গলবার সকালে প্রায় দু’ঘণ্টা তাঁর কাছে ছিলেন লক্ষ্মী। বললেন, ‘‘খিদে পেয়েছে বলছিলেন। বলেছিলাম, পেটের সিটি স্ক্যান হয়ে গেলেই খেতে দেওয়া হবে। স্ক্যানের পরে আইসিইউয়ে গিয়ে পছন্দের সুজি, ছানাও খেয়েছিলেন।’’

তার পরেই গান শোনানোর আবদার করেন তনুশ্রীর কাছে। কেন গান গাওয়া ছেড়েছেন ওই তরুণী, তা-ও জানতে চান। তনুশ্রীর কথায়, ‘‘রাতে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলে ঘুমিয়ে পড়তেন। কিন্তু এ দিন গান না শুনে চোখ বন্ধই করছিলেন না।’’

আর শেষ সময়ে? ঝুমা বলেন, ‘‘মোবাইলে গান চালানোর আগে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, নিজের গান শুনবেন কি না। আপত্তি করেছিলেন। মান্না দে-র নাম বলতেই উদগ্রীব হয়ে শুনতে চাইলেন। ওর গাওয়া একাধিক গান চালিয়ে দিয়ে মাথায় হাত বোলাচ্ছিলাম। চোখেমুখে তখন এক অদ্ভুত শান্তি। তার পরেই সব শেষ।’’

পছন্দের ক্রিম-পারফিউমে সাজিয়ে ‘গীতশ্রী’কে শেষ বারের মতো বিদায় জানিয়েছেন অ্যাপোলোর সবাই। তবে মন মানছে না। চিকিৎসক, নার্স থেকে খাবার বণ্টনের ইন-চার্জ রানা চৌধুরী, সকলেই যেন বলতে চাইছেন— ‘কিছু ক্ষণ আরও না হয় রহিতে কাছে…’।