খন রঞ্জন রায়: ৬০০ একর খাস জমিকে লাস্যময়ী অবয়ব ভেবে পুরোদস্তর ৬০ জন শিক্ষক আর ঢাকা কলেজ ও জগন্নাথ কলেজের স্নাতক শ্রেণির ৮৭৭ জন ছাত্র হাওলাত করে ১লা জুলাই ১৯২১ সালে যাত্রা শুরু করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ছাত্রী ভর্তির ব্যাপারে কোন নির্দেশনা না থাকায় ছাত্রীদের ভর্তি না করে ভালবাসার নিভৃত অন্ধকারে বাঁধা হয়। এই সিদ্ধান্তে বিরক্ত ও বিব্রত হয়ে হতাশায়-দুঃখে-আকাশের দিকে না তাকিয়ে মামলা ঠুকে দেন লীলা নাগ।

অনভিপ্রেত এই ঘটনায় চাপা গুঞ্জন শুরু হয়। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অনুতপ্ত, ক্ষমাপ্রার্থী হয়ে লীলা নাগকে ১৯২৩ সালে ইংরেজি বিভাগে এম.এ শ্রেণির ছাত্রী হিসাবে গ্রহণ করে। ভালোর সঙ্গে মন্দের যে দ্বন্ধ তার অবসান হয়। প্রফুল্ল মনে আনন্দ শিহরণের পবিত্র-আকাক্সক্ষা নিয়ে পূর্ণাঙ্গভাবে শুরু হয় বিশ্ববিদ্যালয় কার্যক্রম। তৎকালীন সময়ে পূর্ববঙ্গের অবহেলিত শিক্ষা বঞ্চিত এলাকায় নতুনভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আবির্ভাব ঘটনায় রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস। তখনকার সময়ে সর্বক্ষেত্রেই বিশেষ করে শিক্ষা ব্যবস্থায় বিশেষ পক্ষপাতিত্ব ছিল অনেক বেশি। এর অন্তর্গত প্রতিবিম্বের অনুতাপ বেশ দীর্ঘ।

ব্রিটিশ শাসনামলের ঐ সময়টা ভাঙ্গা গড়ার ইতিহাসে কলঙ্কিত। অত্র এলাকার সুধী সমাজের মানসিক সংগ্রাম-আবেগের গভীর স্পর্শে রঙিন হচ্ছিল। সৃজনশীল মানুষেরা নিয়ত নিজেদেরকে খোঁজে। অন্যের সঙ্গে মেলায় নিজের অবস্থানগত ভেতরকার আবেগ।

মনের ভেতরের দ্বান্দিকতা পরিহার করে আন্তরিকভাবে নেমে পড়ে মাটি মানুষ ও সমাজের কল্যাণে। অবচেতনের কদর্য রূপটি ধামাচাপা পড়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায়ও এর ব্যত্যয় ঘটেনি। প্রতিটি পদক্ষেপের বাঁকেবাঁকে কর্কশ কান্নাভেজা গলায় জোরালো খাকরাশি দিতে হয়েছিল। অত্র এলাকার স্বাধীন জাতিসত্তার বিকাশ ঘটানোর লক্ষ্যে স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবী জানিয়ে ৩১ জানুয়ারি ১৯১২ সালে ব্রিটিশ ভারতের ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জের সাথে দেখা করেছিলেন আমাদের নমস্য বেশ কয়েকজন দেশপ্রেমী।

নবাব স্যার সলিমুল্লাহ, সৈয়দ নওয়াব আলী, শেরে বাংলা এ. কে ফজলুল হক, নওয়াব আলী চৌধুরী, নবাব সিরাজুল্লাহ, ললিত মোহন চট্টোপাধ্যায়, মোহাম্মদ ওয়াহিদ, ডবিøউ এ.টি. আর্চিবন্ড, শামসুল উলামা আবু নাসের আনন্দ চন্দ্র রায়, ড. এস.সি বিদ্যাভূষণ, ডি. এস ফ্রেজারসহ আরো অনেকে। এর ঠিক তিনদিন পর ২ ফেব্রুয়ারি ১৯১২ সালে লর্ড হার্ডিঞ্জ ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। শুরু হয় প্রতিষ্ঠার তোরজোর, আইন-কানুন, নিয়মনীতি প্রণয়নের ক্যরিকেচার।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের যথাযথ পথচলা শুরু করতে গঠন করা হয় তুলনামূলক উজ্জ্বল একটি কমিটি। স্যার রবার্ট নাথানিয়েল প্রকাশ নাথান কমিটি গঠিত হয় ১৯১২ সালের ২৭ মে। অশান্ত দ্রোহের আগুনে নিজেকে ব্যবচ্ছেদ করে ১৯১৩ সালে এই কমিটি ইতিবাচক আভিমত প্রকাশ করে। মেজাজ হারানো আক্রমনাত্মক আভিব্যক্তি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধীতায় নেমে পড়ে কিছু বুদ্ধিজীবী। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালের উপাচার্য স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, রাজনীতিক সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী, ড. রাসবিহারী ঘোষ প্রমুখ ব্যক্তিরা ১৯১২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি লর্ড হার্ডিঞ্জর সাথে দেখা করে ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতামূলক একটি স্মারকলিপি পেশ করেন। তাঁদের যুক্তি ছিল নতুন আরেকটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হলে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট বরাদ্দ কমে যাবে, এখানে অধ্যয়নরত পূর্ববঙ্গ ও ত্রিপুরার ৭ হাজার সহ ২৭ হাজার শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন ব্যহত হবে। তাঁদের এই কুলিন দাবী ধূপে টিকেনি। বঙ্গভঙ্গ রদ করতে গিয়ে পূর্ববঙ্গের পিছিয়ে পড়া মানুষদের যে ক্ষতি হয়েছিল তা পুষিয়ে দিতেই ব্রিটিশ সরকার শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়ে ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেয়। সামাজিক দায়বদ্ধতা নিয়ে প্রশাসনিক প্রক্রিয়াগত জটিল সব কাজকর্ম দ্রুত শেষ করার তাগাদা আসে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অন্যতম অনুঘটক হিসাবে আরো কিছু লোকদেখানো কমিটি অনুমোদন দেয় সেই সময়ের প্রশাসক। গঠিত শিক্ষাবিদ স্যাডলার কমিশনও নান্দনিক মাধুয্যে প্রকাশ করে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ-কর্মপরিকল্পনার অভিব্যক্তিতে বড় ধরনের ধাক্কা লাগে ১৯১৪ সালে শুরু হওয়া প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। নানা প্রতিকূলতার মুখে পড়েই নিজেকে অতিক্রম করতে হয়েছে বাধাবিপত্তি। অপার যন্ত্রণা নিয়ে প্রায় গোড়া থেকেই অনিশ্চয়তা মুখোমুখি হতে হয়। প্রতিষ্ঠা আকাঙক্ষার অপার স্রোতের আড়ালে নানা কূটকৌশল যথেষ্ট বুদ্ধিমত্তার সাথে মোকাবিলা করতে পেরেছে। বলা হয়ে থাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কোন স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় প্রতিষ্ঠিত হয়নি। রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে একটি সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে এর লাবণ্য যোজনা শুরু হয়।

পূর্ববঙ্গের পশ্চাদ্বর্তী জনগণ শিক্ষাক্ষেত্রে পশ্চাৎপদ হওয়াটাই সমাজের অন্যান্য সকল ক্ষেত্রে তাঁদের পিছিয়ে পড়ার অন্যতম প্রধান কারণ ছিল। ব্রিটিশ কর্তৃক প্রবর্তিত শিক্ষা দর্শন অত্র এলাকার জনগণ সাদরে গ্রহণ করতে পারেনি। পশ্চাদর্শী ঘোরলাগা চোখের বাঁকবদল করতে ব্রিটিশ সরকার অন্তত চারটি শিক্ষা কমিশন গঠন করেছিল। ১৮৮২ সালের হান্টার কমিশন, ১৯১২ সালের স্যার নাথান কমিশন, ১৯১৩ সালের হর্নেল কমিশন এবং সর্বশেষ ১৯১৭ সালের কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কমিটি। প্রতি কমিটির অন্ত:সলিলা সুপারিশ ছিল অত্র এলাকার শিক্ষা বিস্তার।

১৯০৬ সালের হিসাবে তাঁরা দেখিয়েছেন আত্ম-অন্তরালে থাকার পরও পূর্ব বাংলা ও আসাম মিলে উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের ছাত্র-ছাত্রী ছিল ১৬৯৮ জন। তাতেই তাঁরা খুশি হয়ে অপার বিস্ময়ে শিক্ষা খাতের বরাদ্দ বৃদ্ধি করেছিল। তাঁদের মন্তব্য ছিল অনগ্রসর এই এলাকার জন্য রাজকীয় সব নিয়ম-কানুন খাটে না। শিক্ষা অগ্রগতির সম্মান ও মর্যাদার পুরষ্কার হিসাবে যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টার, লিডস, লিভারপুল বিশ্ববিদ্যালয়ের আদলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রকল্প উপস্থাপন করে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অশুভ চেহারায় নিসর্গের সৌন্দর্য এনে দেয় লন্ডনে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক তা অনুমোদনের পর।

১৯২১ সালে ৪ এপ্রিল ভারত সরকার আত্মবিশ্লেষণ করে বাংলা সরকারকে এক সরকারি পত্র প্রেরণ করে। পত্রে আর্থিক সংশ্লেষণ সংক্রান্ত প্রতিবেদন এবং প্রতিষ্ঠার বিশদ পরিকল্পনা উপস্থাপনের নির্দেশ প্রদান করে। দীর্ঘ এই পদযাত্রায় কমিটির সদস্যদের অভিজ্ঞতার স্বর্ণভাণ্ডার সুন্দরের ধ্যান হিসাবে পর্যবসিত হয়। আবাসিক শিক্ষাদানকারী রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত পরিচালনায় শিক্ষা ও গবেষণার বিষয় অন্তর্ভূক্ত করে একটি সুপারিশ চূড়ান্ত করা হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের জায়গা হিসাবে আভিজাত ও সৌন্দর্যমণ্ডিত রমনাকে বেছে নেওয়া হয়। এখানে ২৪৩ একর জায়গা ইতিপূর্বে সরকারের অধিগ্রহণ করা ছিল। বঙ্গভঙ্গ পরিকল্পনার আওতায় পূর্ববাংলা ও আসাম সরকারের প্রশাসনিক দপ্তর প্রতিষ্ঠার জন্য এই জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছিল। এর সাথে কার্জন হল, ঢাকা কলেজ, নতুন সরকারি ভবন, সচিবালয়, সরকারি ছাপাখানা, সরকারি কর্মকর্তাদের আবাসস্থল ও অত্র এলাকার ছোটখাট সকল স্থাপনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পত্তি হিসাবে অন্তর্ভূক্ত করা হয়।

১৯২০ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ভারতীয় আইন সভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিল সিলেক্ট কমিটিতে পাঠানো হয়। ১৮ মার্চ এই বিল আইনে পরিণত হয়। ১৯২০ সালের ২৩ মার্চ গভর্নর জেনারেল কর্তৃক অনুমোদন লাভ করে। এই আইন অনুমোদনের ফলেই আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ১৯২০ সালের ১ ডিসেম্বর স্যার ফিলিপ জোসেফ হার্টগ প্রথম উপাচার্য হিসাবে ভারতের গভর্নর জেনারেল কর্তৃক ৫ বছরের জন্য নিয়োগপ্রাপ্ত হন। তিনি ১০ ডিসেম্বর তারিখ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য হিসাবে আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব পালন শুরু করেন। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম কোষাদক্ষ হিসাবে অবৈতনিক দায়িত্ব পালন করেন জে.এইচ. লিন্ডসে, প্রথম রেজিষ্ট্রার ছিলেন খানবাহাদুর নাজির উদ্দিন আহম্মদ। প্রথম প্রক্টর ফিদা আলী খান। শুরুতে প্রথিতযশা বৃত্তিধারী বিজ্ঞানী ও কিছু শিক্ষাবিদের কঠোর মাননিয়ন্ত্রিত শিক্ষাদানের করস্পর্শ অবদানে এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রাচ্যের অক্সফোর্ড হিসাবে খ্যাতি অর্জন করেছিল।

ব্রিটিশ ভারতে অক্সব্রিজ শিক্ষা ব্যবস্থা অনুসরণে গবেষণাধর্মী এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠালগ্নে শিক্ষকতায় জড়িত ছিলেন, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, স্যার এ.এফ রহমান, সত্যেন্দ্রনাথ বসু, হরিদাশ ভট্টাচার্য, এফ সি টার্নার, জি. এইচ ল্যাংলি, ডব্লিউ এ জেনকিন্স, রমেশ চন্দ্র মজুমদার, নরেশ চন্দ্র সেনগুপ্ত, জ্ঞান চন্দ্র ঘোষ প্রমুখের মতো বিদ্বগ্ধজনেরা।

তিনটি অনুষদ, ১২ টি বিভাগ, ৩টি আবাসিক হল ঢাকা কলেজ ও জগন্নাথ কলেজের ডিগ্রি ক্লাসের অধ্যয়নরত ছাত্র, এই দুই কলেজের লাইব্রেরির দুষ্পাপ্য বই, শিক্ষক, শিক্ষা উপকরণ নিয়ে যাত্রা শুরু করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার গভীর আবেগি প্রেমের জোয়ারে ভাসা প্রকৃতি ও রূপের আকরিক এই শিক্ষায়তনে প্রথম দিকে ছাত্র পাওয়া যায়নি। বিশেষ করে পূর্ব বাংলার মুসলিম অধ্যুষিত জনগণের উচ্চাশা পূরণে হতাশা পরিলক্ষিত হয়। সবরকম বাড়তি সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার পরও তখন মোট ছাত্রর মাত্র ৯ শতাংশ মুসলিম সম্প্রদায়ের পাওয়া যায়। শিক্ষকের ক্ষেত্রে আরো। ছাইয়ের দমবন্ধ করা বিষাদ। দেশ বিভাগের আগ ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত অবধারিতভাবে ৮০ শতাংশ ছাত্র-শিক্ষক ছিল হিন্দু সম্প্রদায়ের। সকল প্রকার যুক্তি শৃঙ্খল মেনে নারী শিক্ষার বেলায় তা আরো আলোহীন অন্ধকার।

প্রথম মুসলিম ছাত্রী ছিলেন বেগম ফজিলাতুন্নেছা জোহা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯২৭ সালে গণিতে মাস্টার্স করা এই বিদুষী মহীয়সী পরবর্তীতে প্রথম মুসলিম নারী হিসাবে বেশ কয়েকটি রেকর্ড অর্জন করেছিলেন। বাঙালি জাতির রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামজিক অগ্রযাত্রায় বহুলাংশে সাফল্যের দাবীদার এই বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম নারী শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেছিলেন করুণাকণা গুপ্ত। ১৯৩৫ সালের সামাজিক প্রেক্ষাপটে সাংগীতিক সুষমা নিয়ে সাহসী পদক্ষেপ এই নারী শিক্ষক নিয়োগ। নানা প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করে ছাত্র-শিক্ষকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিগত ১০০ বছরে এর গৌরবময় ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রেখেছে। দেশের শিক্ষা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রশাসন, কূটনীতি, জনসংযোগ, রাজনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-কারখানা স্থাপনে, সংগীত, নাট্যকলা, শিল্প-সাহিত্য সর্বক্ষেত্রে প্রায় ৭০ শতাংশের অবদান এই বিশ্ববিদ্যালয়ে থেকে শিক্ষালাভকারীর। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বকীয়তা বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের অবস্থান ধারাবাহিকভাবে উজ্জ্বল করছে।

প্রাক্তন কৃতিশিক্ষার্থীদের মধ্যে এ পর্যন্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হয়েছেন ১৩ জন, প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন ০৭ জন, নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন এক জন। প্রতিষ্ঠাকাল থেকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক খ্যতিসম্পন্ন ৫২ ব্যক্তিত্বকে সম্মানসূচক ডক্টর অব ফিলোসফি ডিগ্রি প্রদান করা হয়েছে। প্রধানত বিজ্ঞান, সাহিত্য, রাজনীতি, রাষ্ট্রপরিচালনাসহ সমাজ ও মানবকল্যাণে বিশেষ ও গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ এই ডিগ্রি প্রদান করা হয়। প্রাক্তন কৃতি শিক্ষার্থী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসাবে আমাদের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৫৩ তম ব্যক্তি হিসাবে সম্মানজনক এই ফেলোশিপ অর্জন করেন। এখানে উল্লেখ করার মতো, গুরুত্বপূর্ণ জানার বিষয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ৫ বছরের মাথায় কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রিত বিশেষ বক্তা হিসাবে উপস্থিত থেকে বিশ্ববিদ্যালয়কে আলোকিত করেছিল।

১৯৩৬ সালে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কবিগুরুকে সম্মানসূচক ডিলিট ডিগ্রি প্রদান করে। প্রতিষ্ঠার শতবর্ষে ১ হাজার ৮১২ জন কৃতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানের সাথে পিএইচডি ডিগ্রি সম্পন্ন করেছেন। ১৯৭৪ সাল থেকে চালু করা এমফিল ডিগ্রি প্রাপ্ত হয়েছেন এখন পর্যন্ত ১ হাজার ৬৭০ জন শিক্ষার্থী। এছাড়াও আরো কিছু ডিগ্রি; ছাত্রদের জীবনে জড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে। এর মধ্যে আছে ডিএসসি ২৭ জন, ডিএড ০৮ এবং ডিবিএ ১২ জন।

ফসল প্রাপ্তির কাল যেমন বসন্ত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বেলায়ও বসন্তকাল অতিক্রম করছে। অতীত কাজের সঙ্গে বর্তমানের বিশেষ ভিন্নতা থাকলেও উচ্চতর ডিগ্রি প্রদান ও শিক্ষার্থী আকর্ষণে এই বিশ্ববিদ্যালয় অনুকরণীয় রঙ ও রেখার নাচন শুরু করতে পেরেছে।

প্রায় ১৪ হাজার ছাত্রীসহ বর্তমানে মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যায় প্রায় ৪৭ হাজার। ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ নির্বিশেষে সবার জন্য সবসময় উন্মুক্ত এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তির সুযোগ অবারিত। উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত, নিন্মমধ্যবিত্ত, বিত্তহীন, ধর্মীয়ভাবে রক্ষণশীল সবাই এখানে সর্বকালের প্রতীকবাদী আচরণের সাথে মিলেমিশে বিদ্যার্জন চালিয়ে যেতে পারে।

সমসাময়িক বিষয়নির্ভর শিক্ষার সাথে পৌরাণিক, ইতিহাস নির্ভর, ধর্মীয়, সব বিষয়ে সবার ভর্তি হওয়ার সুযোগ বেশ সমঝদার অনুকরণীয়। ৬৬৮ জন প্রগতিবাদী নারী শিক্ষককে সাথে নিয়ে ১৯৯২ জন মনীষী শিক্ষকের নিবিড় তত্ত্বাবধানে চলে বর্তমান শিক্ষাক্রম। বিশাল এই কর্মযজ্ঞকে যথার্থভাবে নিষ্ঠার সাথে পরিচালনা করে সহযোগী হিসাবে প্রায় ৫ হাজার চাকুরিজীবী।

দীর্ঘ শিক্ষা অভিযাত্রায় বর্তমানে ১৩টি অনুষদে, ৮৩টি বিভাগে, ১৩টি ইনস্টিটিউটে, ৫৬টি বিশেষায়িত গবেষণা কেন্দ্র মিলে বিশ্ববিদ্যালয়টি নিজস্ব চিত্রপট তুলে ধরছে। আবাসিকরীতির এই প্রতিষ্ঠানটিতে এখন ২০টি আবাসিক হল এবং বিদেশী শিক্ষার্থীর জন্য ৩টি আলাদা ছাত্রাবাসে অধ্যায়নরত শিক্ষার্থীদের মানসিক সংগ্রাম চিত্রায়িত করছে। সুখী জীবনের প্রত্যাশা নিয়ে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থী কারো মুখে হাসিখুশি অবয়ব ফুটে ওঠে। কারো বা অবর্ণনীয় নিমজ্জনের গল্প।।

বিশ্ববিদ্যালয়টির নিজস্ব ছাত্র-ছাত্রী ছাড়াও সোনা খোঁজা আরো কিছু শিক্ষার্থী নিয়ে স্নাতক পর্যায়ের ঢাকা শহরের ০৭টি কলেজের ৩ লক্ষাধিক শিক্ষার্থীসহ আরো শতাধিক অধিভুক্ত ও উপাদানকল্প কলেজ এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ত্রিসীমানায় অধিভুক্ত করা হয়েছে।
এই বিশ্ববিদ্যালয়ে লোগোর অভিব্যক্তি নিয়েও রয়েছে তীব্র গোলকধাঁধা মানুষ যেমন নিজেকে সবচেয়ে ভালবাসে।

প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে তার লোগো। নিজের সঙ্গে বোঝাপড়া করেই লোগোর অবয়ব তৈর্ িকরা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ইতিহাসের সঙ্গে যেমন ধর্ম, সংস্কৃতি, ভাষা, প্রকৃতির প্রতিকৃতি ফুটে ওঠে। লোগোর বেলায়ও তাই। শুরুতে চাঁদতারা ও স্বস্তিকার সমন্বয়ে সৃষ্টির যথেষ্ট পূজা করা হতো। ১৯৫২সালে স্বস্তিকা বাদ দিয়ে সেখানে আরবি হরফে বই জুড়ে দেওয়া হয়। কোমলভাবে আড়াল করা হচ্ছিল আরো অনেক কিছু।

মানসিকভাবে ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে ১৯৭২ সালে লোগো পরিবর্তনের প্রয়োজন পড়ে। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীনের প্রাক ধারণায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাসিন্দা চারুকলার শিক্ষক-শিল্পী-সমরজিৎ রায় চৌধুরী ১৯৭৩ সালে অপার সৌন্দর্যের প্রতীক বর্তমানের লোগোটি চূড়ান্ত করেন।

এই ভূখণ্ডের সুদীর্ঘ রাজনৈতিক আন্দোলন ইতিহাসে প্রত্যক্ষভাবে সুগভীর প্রভাব বিস্তার করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক- পেশাজীবিরা। ভাষা আন্দোলন, স্বাধীকার আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রতিটি অবিসংবাদিত ঘটনায় স্বমহিমায় দীপ্যমান। বর্তমানের সফল-সার্থক-স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সশস্ত্র সংগ্রামেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান সন্দেহাতীতভাবে সর্বাগ্রে।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাতে একদিনেই ১৯ জন শিক্ষক ১০১ জন ছাত্র, ২৮ জন চাকুরীজীবিকে নির্মমভাবে হত্যা করে। ১৪ ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবি হত্যা এবং পুরো ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে সহস্রাধীক ছাত্র-শিক্ষক-কর্মচারি-আত্মদান করেছে।

শিক্ষা, গবেষণা, সংস্কৃতি, রাজনীতি, স্বাধীনতা ও একুশে পদক প্রাপ্তিতে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দাপুটে পদচারণা থাকলেও অবয়বের দিকে দৈর্ঘ্যে ও প্রস্থে এর জায়গা কমছে। ২৭৫.৮ একর জায়গা দখলে রাখতে পারলেও সরকারি খাজনা দিতে হয় ৩৭৭ একরের। এক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ নিরুপায় বশ্যতা স্বীকার করেছে।

জায়গা দখলের অসহ্য যন্ত্রণা ঠেকাতে গিয়ে দেখেছে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের জায়গার উপর দেশের সকল আদি শিল্প-সংস্কৃতির শিক্ষায়তন গড়ে ওঠেছে। এখানে – সেখানে গড়ে ওঠা সেইসব প্রতিষ্ঠানও দেশ সেবায় বিশেষ অবদান রাখছে। তাঁদের আদি উৎস ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দিনে চেতনায় বিস্ফোরণ ঘটানো সেইসব নমস্য ব্যক্তিদের প্রতি নতমস্তকে শ্রদ্ধা।

লেখকঃ খন রঞ্জন রায়,সমাজচিন্তক, গবেষক ও সংগঠক।

খন রঞ্জন রায়: ৬০০ একর খাস জমিকে লাস্যময়ী অবয়ব ভেবে পুরোদস্তর ৬০ জন শিক্ষক আর ঢাকা কলেজ ও জগন্নাথ কলেজের স্নাতক শ্রেণির ৮৭৭ জন ছাত্র হাওলাত করে ১লা জুলাই ১৯২১ সালে যাত্রা শুরু করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ছাত্রী ভর্তির ব্যাপারে কোন নির্দেশনা না থাকায় ছাত্রীদের ভর্তি না করে ভালবাসার নিভৃত অন্ধকারে বাঁধা হয়। এই সিদ্ধান্তে বিরক্ত ও বিব্রত হয়ে হতাশায়-দুঃখে-আকাশের দিকে না তাকিয়ে মামলা ঠুকে দেন লীলা নাগ।

অনভিপ্রেত এই ঘটনায় চাপা গুঞ্জন শুরু হয়। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অনুতপ্ত, ক্ষমাপ্রার্থী হয়ে লীলা নাগকে ১৯২৩ সালে ইংরেজি বিভাগে এম.এ শ্রেণির ছাত্রী হিসাবে গ্রহণ করে। ভালোর সঙ্গে মন্দের যে দ্বন্ধ তার অবসান হয়। প্রফুল্ল মনে আনন্দ শিহরণের পবিত্র-আকাক্সক্ষা নিয়ে পূর্ণাঙ্গভাবে শুরু হয় বিশ্ববিদ্যালয় কার্যক্রম। তৎকালীন সময়ে পূর্ববঙ্গের অবহেলিত শিক্ষা বঞ্চিত এলাকায় নতুনভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আবির্ভাব ঘটনায় রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস। তখনকার সময়ে সর্বক্ষেত্রেই বিশেষ করে শিক্ষা ব্যবস্থায় বিশেষ পক্ষপাতিত্ব ছিল অনেক বেশি। এর অন্তর্গত প্রতিবিম্বের অনুতাপ বেশ দীর্ঘ।

ব্রিটিশ শাসনামলের ঐ সময়টা ভাঙ্গা গড়ার ইতিহাসে কলঙ্কিত। অত্র এলাকার সুধী সমাজের মানসিক সংগ্রাম-আবেগের গভীর স্পর্শে রঙিন হচ্ছিল। সৃজনশীল মানুষেরা নিয়ত নিজেদেরকে খোঁজে। অন্যের সঙ্গে মেলায় নিজের অবস্থানগত ভেতরকার আবেগ।

মনের ভেতরের দ্বান্দিকতা পরিহার করে আন্তরিকভাবে নেমে পড়ে মাটি মানুষ ও সমাজের কল্যাণে। অবচেতনের কদর্য রূপটি ধামাচাপা পড়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায়ও এর ব্যত্যয় ঘটেনি। প্রতিটি পদক্ষেপের বাঁকেবাঁকে কর্কশ কান্নাভেজা গলায় জোরালো খাকরাশি দিতে হয়েছিল। অত্র এলাকার স্বাধীন জাতিসত্তার বিকাশ ঘটানোর লক্ষ্যে স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবী জানিয়ে ৩১ জানুয়ারি ১৯১২ সালে ব্রিটিশ ভারতের ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জের সাথে দেখা করেছিলেন আমাদের নমস্য বেশ কয়েকজন দেশপ্রেমী।

নবাব স্যার সলিমুল্লাহ, সৈয়দ নওয়াব আলী, শেরে বাংলা এ. কে ফজলুল হক, নওয়াব আলী চৌধুরী, নবাব সিরাজুল্লাহ, ললিত মোহন চট্টোপাধ্যায়, মোহাম্মদ ওয়াহিদ, ডবিøউ এ.টি. আর্চিবন্ড, শামসুল উলামা আবু নাসের আনন্দ চন্দ্র রায়, ড. এস.সি বিদ্যাভূষণ, ডি. এস ফ্রেজারসহ আরো অনেকে। এর ঠিক তিনদিন পর ২ ফেব্রুয়ারি ১৯১২ সালে লর্ড হার্ডিঞ্জ ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। শুরু হয় প্রতিষ্ঠার তোরজোর, আইন-কানুন, নিয়মনীতি প্রণয়নের ক্যরিকেচার।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের যথাযথ পথচলা শুরু করতে গঠন করা হয় তুলনামূলক উজ্জ্বল একটি কমিটি। স্যার রবার্ট নাথানিয়েল প্রকাশ নাথান কমিটি গঠিত হয় ১৯১২ সালের ২৭ মে। অশান্ত দ্রোহের আগুনে নিজেকে ব্যবচ্ছেদ করে ১৯১৩ সালে এই কমিটি ইতিবাচক আভিমত প্রকাশ করে। মেজাজ হারানো আক্রমনাত্মক আভিব্যক্তি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধীতায় নেমে পড়ে কিছু বুদ্ধিজীবী। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালের উপাচার্য স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, রাজনীতিক সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী, ড. রাসবিহারী ঘোষ প্রমুখ ব্যক্তিরা ১৯১২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি লর্ড হার্ডিঞ্জর সাথে দেখা করে ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতামূলক একটি স্মারকলিপি পেশ করেন। তাঁদের যুক্তি ছিল নতুন আরেকটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হলে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট বরাদ্দ কমে যাবে, এখানে অধ্যয়নরত পূর্ববঙ্গ ও ত্রিপুরার ৭ হাজার সহ ২৭ হাজার শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন ব্যহত হবে। তাঁদের এই কুলিন দাবী ধূপে টিকেনি। বঙ্গভঙ্গ রদ করতে গিয়ে পূর্ববঙ্গের পিছিয়ে পড়া মানুষদের যে ক্ষতি হয়েছিল তা পুষিয়ে দিতেই ব্রিটিশ সরকার শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়ে ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেয়। সামাজিক দায়বদ্ধতা নিয়ে প্রশাসনিক প্রক্রিয়াগত জটিল সব কাজকর্ম দ্রুত শেষ করার তাগাদা আসে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অন্যতম অনুঘটক হিসাবে আরো কিছু লোকদেখানো কমিটি অনুমোদন দেয় সেই সময়ের প্রশাসক। গঠিত শিক্ষাবিদ স্যাডলার কমিশনও নান্দনিক মাধুয্যে প্রকাশ করে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ-কর্মপরিকল্পনার অভিব্যক্তিতে বড় ধরনের ধাক্কা লাগে ১৯১৪ সালে শুরু হওয়া প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। নানা প্রতিকূলতার মুখে পড়েই নিজেকে অতিক্রম করতে হয়েছে বাধাবিপত্তি। অপার যন্ত্রণা নিয়ে প্রায় গোড়া থেকেই অনিশ্চয়তা মুখোমুখি হতে হয়। প্রতিষ্ঠা আকাঙক্ষার অপার স্রোতের আড়ালে নানা কূটকৌশল যথেষ্ট বুদ্ধিমত্তার সাথে মোকাবিলা করতে পেরেছে। বলা হয়ে থাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কোন স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় প্রতিষ্ঠিত হয়নি। রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে একটি সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে এর লাবণ্য যোজনা শুরু হয়।

পূর্ববঙ্গের পশ্চাদ্বর্তী জনগণ শিক্ষাক্ষেত্রে পশ্চাৎপদ হওয়াটাই সমাজের অন্যান্য সকল ক্ষেত্রে তাঁদের পিছিয়ে পড়ার অন্যতম প্রধান কারণ ছিল। ব্রিটিশ কর্তৃক প্রবর্তিত শিক্ষা দর্শন অত্র এলাকার জনগণ সাদরে গ্রহণ করতে পারেনি। পশ্চাদর্শী ঘোরলাগা চোখের বাঁকবদল করতে ব্রিটিশ সরকার অন্তত চারটি শিক্ষা কমিশন গঠন করেছিল। ১৮৮২ সালের হান্টার কমিশন, ১৯১২ সালের স্যার নাথান কমিশন, ১৯১৩ সালের হর্নেল কমিশন এবং সর্বশেষ ১৯১৭ সালের কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কমিটি। প্রতি কমিটির অন্ত:সলিলা সুপারিশ ছিল অত্র এলাকার শিক্ষা বিস্তার।

১৯০৬ সালের হিসাবে তাঁরা দেখিয়েছেন আত্ম-অন্তরালে থাকার পরও পূর্ব বাংলা ও আসাম মিলে উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের ছাত্র-ছাত্রী ছিল ১৬৯৮ জন। তাতেই তাঁরা খুশি হয়ে অপার বিস্ময়ে শিক্ষা খাতের বরাদ্দ বৃদ্ধি করেছিল। তাঁদের মন্তব্য ছিল অনগ্রসর এই এলাকার জন্য রাজকীয় সব নিয়ম-কানুন খাটে না। শিক্ষা অগ্রগতির সম্মান ও মর্যাদার পুরষ্কার হিসাবে যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টার, লিডস, লিভারপুল বিশ্ববিদ্যালয়ের আদলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রকল্প উপস্থাপন করে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অশুভ চেহারায় নিসর্গের সৌন্দর্য এনে দেয় লন্ডনে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক তা অনুমোদনের পর।

১৯২১ সালে ৪ এপ্রিল ভারত সরকার আত্মবিশ্লেষণ করে বাংলা সরকারকে এক সরকারি পত্র প্রেরণ করে। পত্রে আর্থিক সংশ্লেষণ সংক্রান্ত প্রতিবেদন এবং প্রতিষ্ঠার বিশদ পরিকল্পনা উপস্থাপনের নির্দেশ প্রদান করে। দীর্ঘ এই পদযাত্রায় কমিটির সদস্যদের অভিজ্ঞতার স্বর্ণভাণ্ডার সুন্দরের ধ্যান হিসাবে পর্যবসিত হয়। আবাসিক শিক্ষাদানকারী রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত পরিচালনায় শিক্ষা ও গবেষণার বিষয় অন্তর্ভূক্ত করে একটি সুপারিশ চূড়ান্ত করা হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের জায়গা হিসাবে আভিজাত ও সৌন্দর্যমণ্ডিত রমনাকে বেছে নেওয়া হয়। এখানে ২৪৩ একর জায়গা ইতিপূর্বে সরকারের অধিগ্রহণ করা ছিল। বঙ্গভঙ্গ পরিকল্পনার আওতায় পূর্ববাংলা ও আসাম সরকারের প্রশাসনিক দপ্তর প্রতিষ্ঠার জন্য এই জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছিল। এর সাথে কার্জন হল, ঢাকা কলেজ, নতুন সরকারি ভবন, সচিবালয়, সরকারি ছাপাখানা, সরকারি কর্মকর্তাদের আবাসস্থল ও অত্র এলাকার ছোটখাট সকল স্থাপনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পত্তি হিসাবে অন্তর্ভূক্ত করা হয়।

১৯২০ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ভারতীয় আইন সভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিল সিলেক্ট কমিটিতে পাঠানো হয়। ১৮ মার্চ এই বিল আইনে পরিণত হয়। ১৯২০ সালের ২৩ মার্চ গভর্নর জেনারেল কর্তৃক অনুমোদন লাভ করে। এই আইন অনুমোদনের ফলেই আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ১৯২০ সালের ১ ডিসেম্বর স্যার ফিলিপ জোসেফ হার্টগ প্রথম উপাচার্য হিসাবে ভারতের গভর্নর জেনারেল কর্তৃক ৫ বছরের জন্য নিয়োগপ্রাপ্ত হন। তিনি ১০ ডিসেম্বর তারিখ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য হিসাবে আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব পালন শুরু করেন। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম কোষাদক্ষ হিসাবে অবৈতনিক দায়িত্ব পালন করেন জে.এইচ. লিন্ডসে, প্রথম রেজিষ্ট্রার ছিলেন খানবাহাদুর নাজির উদ্দিন আহম্মদ। প্রথম প্রক্টর ফিদা আলী খান। শুরুতে প্রথিতযশা বৃত্তিধারী বিজ্ঞানী ও কিছু শিক্ষাবিদের কঠোর মাননিয়ন্ত্রিত শিক্ষাদানের করস্পর্শ অবদানে এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রাচ্যের অক্সফোর্ড হিসাবে খ্যাতি অর্জন করেছিল।

ব্রিটিশ ভারতে অক্সব্রিজ শিক্ষা ব্যবস্থা অনুসরণে গবেষণাধর্মী এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠালগ্নে শিক্ষকতায় জড়িত ছিলেন, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, স্যার এ.এফ রহমান, সত্যেন্দ্রনাথ বসু, হরিদাশ ভট্টাচার্য, এফ সি টার্নার, জি. এইচ ল্যাংলি, ডব্লিউ এ জেনকিন্স, রমেশ চন্দ্র মজুমদার, নরেশ চন্দ্র সেনগুপ্ত, জ্ঞান চন্দ্র ঘোষ প্রমুখের মতো বিদ্বগ্ধজনেরা।

তিনটি অনুষদ, ১২ টি বিভাগ, ৩টি আবাসিক হল ঢাকা কলেজ ও জগন্নাথ কলেজের ডিগ্রি ক্লাসের অধ্যয়নরত ছাত্র, এই দুই কলেজের লাইব্রেরির দুষ্পাপ্য বই, শিক্ষক, শিক্ষা উপকরণ নিয়ে যাত্রা শুরু করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার গভীর আবেগি প্রেমের জোয়ারে ভাসা প্রকৃতি ও রূপের আকরিক এই শিক্ষায়তনে প্রথম দিকে ছাত্র পাওয়া যায়নি। বিশেষ করে পূর্ব বাংলার মুসলিম অধ্যুষিত জনগণের উচ্চাশা পূরণে হতাশা পরিলক্ষিত হয়। সবরকম বাড়তি সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার পরও তখন মোট ছাত্রর মাত্র ৯ শতাংশ মুসলিম সম্প্রদায়ের পাওয়া যায়। শিক্ষকের ক্ষেত্রে আরো। ছাইয়ের দমবন্ধ করা বিষাদ। দেশ বিভাগের আগ ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত অবধারিতভাবে ৮০ শতাংশ ছাত্র-শিক্ষক ছিল হিন্দু সম্প্রদায়ের। সকল প্রকার যুক্তি শৃঙ্খল মেনে নারী শিক্ষার বেলায় তা আরো আলোহীন অন্ধকার।

প্রথম মুসলিম ছাত্রী ছিলেন বেগম ফজিলাতুন্নেছা জোহা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯২৭ সালে গণিতে মাস্টার্স করা এই বিদুষী মহীয়সী পরবর্তীতে প্রথম মুসলিম নারী হিসাবে বেশ কয়েকটি রেকর্ড অর্জন করেছিলেন। বাঙালি জাতির রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামজিক অগ্রযাত্রায় বহুলাংশে সাফল্যের দাবীদার এই বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম নারী শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেছিলেন করুণাকণা গুপ্ত। ১৯৩৫ সালের সামাজিক প্রেক্ষাপটে সাংগীতিক সুষমা নিয়ে সাহসী পদক্ষেপ এই নারী শিক্ষক নিয়োগ। নানা প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করে ছাত্র-শিক্ষকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিগত ১০০ বছরে এর গৌরবময় ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রেখেছে। দেশের শিক্ষা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রশাসন, কূটনীতি, জনসংযোগ, রাজনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-কারখানা স্থাপনে, সংগীত, নাট্যকলা, শিল্প-সাহিত্য সর্বক্ষেত্রে প্রায় ৭০ শতাংশের অবদান এই বিশ্ববিদ্যালয়ে থেকে শিক্ষালাভকারীর। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বকীয়তা বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের অবস্থান ধারাবাহিকভাবে উজ্জ্বল করছে।

প্রাক্তন কৃতিশিক্ষার্থীদের মধ্যে এ পর্যন্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হয়েছেন ১৩ জন, প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন ০৭ জন, নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন এক জন। প্রতিষ্ঠাকাল থেকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক খ্যতিসম্পন্ন ৫২ ব্যক্তিত্বকে সম্মানসূচক ডক্টর অব ফিলোসফি ডিগ্রি প্রদান করা হয়েছে। প্রধানত বিজ্ঞান, সাহিত্য, রাজনীতি, রাষ্ট্রপরিচালনাসহ সমাজ ও মানবকল্যাণে বিশেষ ও গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ এই ডিগ্রি প্রদান করা হয়। প্রাক্তন কৃতি শিক্ষার্থী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসাবে আমাদের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৫৩ তম ব্যক্তি হিসাবে সম্মানজনক এই ফেলোশিপ অর্জন করেন। এখানে উল্লেখ করার মতো, গুরুত্বপূর্ণ জানার বিষয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ৫ বছরের মাথায় কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রিত বিশেষ বক্তা হিসাবে উপস্থিত থেকে বিশ্ববিদ্যালয়কে আলোকিত করেছিল।

১৯৩৬ সালে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কবিগুরুকে সম্মানসূচক ডিলিট ডিগ্রি প্রদান করে। প্রতিষ্ঠার শতবর্ষে ১ হাজার ৮১২ জন কৃতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানের সাথে পিএইচডি ডিগ্রি সম্পন্ন করেছেন। ১৯৭৪ সাল থেকে চালু করা এমফিল ডিগ্রি প্রাপ্ত হয়েছেন এখন পর্যন্ত ১ হাজার ৬৭০ জন শিক্ষার্থী। এছাড়াও আরো কিছু ডিগ্রি; ছাত্রদের জীবনে জড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে। এর মধ্যে আছে ডিএসসি ২৭ জন, ডিএড ০৮ এবং ডিবিএ ১২ জন।

ফসল প্রাপ্তির কাল যেমন বসন্ত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বেলায়ও বসন্তকাল অতিক্রম করছে। অতীত কাজের সঙ্গে বর্তমানের বিশেষ ভিন্নতা থাকলেও উচ্চতর ডিগ্রি প্রদান ও শিক্ষার্থী আকর্ষণে এই বিশ্ববিদ্যালয় অনুকরণীয় রঙ ও রেখার নাচন শুরু করতে পেরেছে।

প্রায় ১৪ হাজার ছাত্রীসহ বর্তমানে মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যায় প্রায় ৪৭ হাজার। ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ নির্বিশেষে সবার জন্য সবসময় উন্মুক্ত এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তির সুযোগ অবারিত। উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত, নিন্মমধ্যবিত্ত, বিত্তহীন, ধর্মীয়ভাবে রক্ষণশীল সবাই এখানে সর্বকালের প্রতীকবাদী আচরণের সাথে মিলেমিশে বিদ্যার্জন চালিয়ে যেতে পারে।

সমসাময়িক বিষয়নির্ভর শিক্ষার সাথে পৌরাণিক, ইতিহাস নির্ভর, ধর্মীয়, সব বিষয়ে সবার ভর্তি হওয়ার সুযোগ বেশ সমঝদার অনুকরণীয়। ৬৬৮ জন প্রগতিবাদী নারী শিক্ষককে সাথে নিয়ে ১৯৯২ জন মনীষী শিক্ষকের নিবিড় তত্ত্বাবধানে চলে বর্তমান শিক্ষাক্রম। বিশাল এই কর্মযজ্ঞকে যথার্থভাবে নিষ্ঠার সাথে পরিচালনা করে সহযোগী হিসাবে প্রায় ৫ হাজার চাকুরিজীবী।

দীর্ঘ শিক্ষা অভিযাত্রায় বর্তমানে ১৩টি অনুষদে, ৮৩টি বিভাগে, ১৩টি ইনস্টিটিউটে, ৫৬টি বিশেষায়িত গবেষণা কেন্দ্র মিলে বিশ্ববিদ্যালয়টি নিজস্ব চিত্রপট তুলে ধরছে। আবাসিকরীতির এই প্রতিষ্ঠানটিতে এখন ২০টি আবাসিক হল এবং বিদেশী শিক্ষার্থীর জন্য ৩টি আলাদা ছাত্রাবাসে অধ্যায়নরত শিক্ষার্থীদের মানসিক সংগ্রাম চিত্রায়িত করছে। সুখী জীবনের প্রত্যাশা নিয়ে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থী কারো মুখে হাসিখুশি অবয়ব ফুটে ওঠে। কারো বা অবর্ণনীয় নিমজ্জনের গল্প।।

বিশ্ববিদ্যালয়টির নিজস্ব ছাত্র-ছাত্রী ছাড়াও সোনা খোঁজা আরো কিছু শিক্ষার্থী নিয়ে স্নাতক পর্যায়ের ঢাকা শহরের ০৭টি কলেজের ৩ লক্ষাধিক শিক্ষার্থীসহ আরো শতাধিক অধিভুক্ত ও উপাদানকল্প কলেজ এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ত্রিসীমানায় অধিভুক্ত করা হয়েছে।
এই বিশ্ববিদ্যালয়ে লোগোর অভিব্যক্তি নিয়েও রয়েছে তীব্র গোলকধাঁধা মানুষ যেমন নিজেকে সবচেয়ে ভালবাসে।

প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে তার লোগো। নিজের সঙ্গে বোঝাপড়া করেই লোগোর অবয়ব তৈর্ িকরা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ইতিহাসের সঙ্গে যেমন ধর্ম, সংস্কৃতি, ভাষা, প্রকৃতির প্রতিকৃতি ফুটে ওঠে। লোগোর বেলায়ও তাই। শুরুতে চাঁদতারা ও স্বস্তিকার সমন্বয়ে সৃষ্টির যথেষ্ট পূজা করা হতো। ১৯৫২সালে স্বস্তিকা বাদ দিয়ে সেখানে আরবি হরফে বই জুড়ে দেওয়া হয়। কোমলভাবে আড়াল করা হচ্ছিল আরো অনেক কিছু।

মানসিকভাবে ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে ১৯৭২ সালে লোগো পরিবর্তনের প্রয়োজন পড়ে। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীনের প্রাক ধারণায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাসিন্দা চারুকলার শিক্ষক-শিল্পী-সমরজিৎ রায় চৌধুরী ১৯৭৩ সালে অপার সৌন্দর্যের প্রতীক বর্তমানের লোগোটি চূড়ান্ত করেন।

এই ভূখণ্ডের সুদীর্ঘ রাজনৈতিক আন্দোলন ইতিহাসে প্রত্যক্ষভাবে সুগভীর প্রভাব বিস্তার করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক- পেশাজীবিরা। ভাষা আন্দোলন, স্বাধীকার আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রতিটি অবিসংবাদিত ঘটনায় স্বমহিমায় দীপ্যমান। বর্তমানের সফল-সার্থক-স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সশস্ত্র সংগ্রামেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান সন্দেহাতীতভাবে সর্বাগ্রে।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাতে একদিনেই ১৯ জন শিক্ষক ১০১ জন ছাত্র, ২৮ জন চাকুরীজীবিকে নির্মমভাবে হত্যা করে। ১৪ ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবি হত্যা এবং পুরো ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে সহস্রাধীক ছাত্র-শিক্ষক-কর্মচারি-আত্মদান করেছে।

শিক্ষা, গবেষণা, সংস্কৃতি, রাজনীতি, স্বাধীনতা ও একুশে পদক প্রাপ্তিতে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দাপুটে পদচারণা থাকলেও অবয়বের দিকে দৈর্ঘ্যে ও প্রস্থে এর জায়গা কমছে। ২৭৫.৮ একর জায়গা দখলে রাখতে পারলেও সরকারি খাজনা দিতে হয় ৩৭৭ একরের। এক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ নিরুপায় বশ্যতা স্বীকার করেছে।

জায়গা দখলের অসহ্য যন্ত্রণা ঠেকাতে গিয়ে দেখেছে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের জায়গার উপর দেশের সকল আদি শিল্প-সংস্কৃতির শিক্ষায়তন গড়ে ওঠেছে। এখানে – সেখানে গড়ে ওঠা সেইসব প্রতিষ্ঠানও দেশ সেবায় বিশেষ অবদান রাখছে। তাঁদের আদি উৎস ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দিনে চেতনায় বিস্ফোরণ ঘটানো সেইসব নমস্য ব্যক্তিদের প্রতি নতমস্তকে শ্রদ্ধা।

লেখকঃ খন রঞ্জন রায়,সমাজচিন্তক, গবেষক ও সংগঠক।