খন রঞ্জন রায় : প্রকৃতির গাছ-গাছালির নির্যাসের সাথে ল্যাবরেটরিতে তৈরি করা কিছু রাসায়নিক যৌগই ‘মাদক’। এর আভিধানিক অর্থ ওষুধ। এই ওষুধ মাত্রাতিরিক্ত গ্রহণের ফলে মানুষের মনের অনুভূতি, চিন্তা-চেতনা মন-মানসিকতা স্বাভাবিক অবস্থা থেকে অস্বাভাবিক অবস্থায় রূপান্তর ঘটে বলেই তাকে মাদক হিসাবে অভিহিত করা হয়।

১৮৮৭ সালে মানুষের স্থূলতার বিরুদ্ধে যে ওষুধ প্রয়োগ করা হয়েছিল পরবর্তীতে সেই ওষুধে নানা জরকরস সংযুক্ত করে বর্তমানের অধিক জনপ্রিয় মাদক ‘ইয়াবা’ তৈরি করা হয়। মানুষের কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে বিশেষ উন্মাদনা সৃষ্টি করা গাঁজা, মারিজুয়ানা, হাশিস, চরস, ভাং ইত্যাদির আদি উৎস বিরুৎজাতীয় উদ্ভিদের বিভিন্ন উপজাতি।

হেরোইন, মরফিন, কোডেইন নামের মাদক উৎপন্ন হয় পপি নামক একটি ফল থেকে। ভয়ঙ্কর এই মাদক তৈরিতে উদ্ভিদের অতি চেনা ফলের রূপে বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থের প্রক্রিয়াজাত করা হয়। কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের উপর বিশৃংঙ্খলভাবে ব্যাপক বিস্তর প্রভাব সৃষ্টি করা ওয়াইন, বিয়ার, চোলাই মদ, মদ উৎপন্ন করা হয়। জীবনতৃষ্ণার তীব্রতা নিয়ে বৈতালিক কাণ্ড; কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাবারের হতচ্ছড়া সৃষ্টি এইসব মাদক।

মানুষের স্বাস্থ্যগত কল্যাণের চিন্তা করে রোগ নিরাময়ের জন্য ল্যাবরেটরিতে তৈরি করা ওষুধ, মাত্রাতিরিক্ত সেবনে শরীরে মাদকতার তীব্র আবহ তৈরি হয়। বিশেষ করে ঘুমের ওষুধ ডায়াজিপাম, ক্লোনাজেপাম, মিডাজোলাম, ডেক্সোমেথরফেন, কিটামিন ইত্যাদির কর্মসাধনায় মাদকের কাতারে তালিকাভূক্ত।

বৈধভাবে তৈরি করে বাজারজাত করা কিছু ওষুধ একসঙ্গে মিশিয়ে নতুন করে মাদকের ভাবব্যাঞ্জনা সৃষ্টি করা হচ্ছে। ব্যবহার ও প্রয়োগের বাড়াবাড়ি হিসাবে নিত্যনতুন নাম-কামের কিছু মাদকের গঠন-ইঙ্গিত হরহামেশাই শোনা যায়। মাদকতা একটি অতি প্রাচীন রূপ হলেও রকমভেদের ভিন্নতা বর্তমানকে নতুনভাবে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড় করাচ্ছে।

লোভাক্রান্ত মানুষের কাজের কৌশলে পরাস্ত হচ্ছে সহজ-সরল সাধারণ মানুষজন। পৃথিবীর দেশে দেশে মানুষের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে মানুষই। নিসর্গে মিলেমিশে থাকা তাবৎ মানুষের মুখে তুলে দিয়েছে মাদকের মরণনেশা। সভ্যতার শুরু থেকেই মানুষ-মানুষের সরল পথচলার দীর্ঘ দেয়াল তুলে দিয়েছে মানুষই।

চারদিকে মাদকের ঘনঘটার মধ্যে নানা নাম ও প্রকরণে উদ্ধার হওয়া মাদক বাংলাদেশে পাওয়া যাচ্ছে ২৭ ধরণের। ফেনসিডিল, আইস, ইয়াবা, রেফিটফায়েড স্পিরিট, তাড়ি, ভায়াগ্রা, মরফিন, একনাগাড়ে পাওয়া গেলেও ইয়াবা আর গাঁজার ধারণার জগতে পা রাখা মাদকসেবীর সংখ্যাই বেশি।

চাপা বিষাদ ও বেদনা-বিধুর-রহস্যময় আবহ নিয়ে জানাতে হয় দেশে ১৮ থেকে ৬০ বছর বয়সীদের মধ্যে মাদকাসক্তের সংখ্যা প্রায় ৯০ লাখ। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের সম্পূর্ণ আনাড়ি সমীক্ষায়ও দেখা গেছে মাদকের বিষয়বৈচিত্র্য রপ্তকরণে নারী-পুরুষের সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। এই হিসাব মাদককে যাঁরা আজন্ম সাথী করেছে তাঁদের।

যাঁরা বিভিন্ন টেনশন মাথায় নিয়ে ঘুমের ট্যাবলেট খেয়ে পুনরুজ্জীবন প্রাপ্তির আকাক্সক্ষা করে তারাও এক ধরনের মাদকাসক্ত। গবেষণায় দেখা গেছে তরুণ প্রজন্মের এক চতুর্থাংশই কোন না কোন ধরণের নেশায় আসক্ত। সামর্থ্য, সামাজিক অবস্থান, পারিবারিক ঐতিহ্য বস্তি কিংবা রাজপথ বিবেচনায় নিজ নিজ অবস্থানের মদ,সিসা, গাম-ডাণ্ডি-নামের নেশা দ্রব্যের খপ্পরে পরে।

জাতিসংঘের মাদক নিয়ন্ত্রণ সংস্থা ইউএনওডিসির তথ্যমতে বাংলাদেশে প্রতিবছর ৩.৮ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে মাদকাসক্তর সংখ্যা। সারা বিশ্বের ব্যবধান বোঝা যেখানে ২ শতাংশ। অর্থনৈতিক দুরবস্তার জন্য অনেকাংশে দায়ী এই মাদকাসক্তদের প্রতি দশ জনে একজন হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসে। একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তি শারীরিক মানসিক, আর্থিক, পারিবারিকসহ নানাভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়।

আকাশে জ্যোৎস্নাপ্লাবিত গোলচাঁদ থাকলেও মাদকাসক্তর বোধের জগতে থাকে হাহাকার ও পরিবার বিচ্ছিন্নতা। চেহারা অবয়বের অভিব্যক্তি থাকে নিঃসাড়। মুখমণ্ডল ফুলে যায়, মুখ ও নাক লাল হয়, চোখের শক্তি কমে গিয়ে ঝাপসা দেখা শুরু করে, মুখমণ্ডলসহ সারা শরীরে কালো শিরা পড়ে, হৃদযন্ত্র, ফুসফুস কর্মক্ষমতা হারাতে বসে। চর্ম ও যৌন রোগ বৃদ্ধি পেতে পারে, সংক্রামক রোগের প্রকোপ ধরা দেয়, স্মৃতিশক্তি লোপ পায়, যৌনশক্তি কমে যায়। প্রকৃতির রং বৈভবকে ভাবলে দেখা যায় মাদক গ্রহণে শারীরিকভাবে নারীরা বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়। অনিয়মিত মাসিক, প্রজননক্ষমতা হ্রাস, জরায়ুর বিভিন্ন রোগসহ নানা উপসর্গ দেখা দেয়।

এইডস ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে মাদকাসক্তরা বহুকালের সম্পর্ক ধরে রেখেছে। সাকুল্যে হিসাব করলে মাদক গ্রহণকারী নারী পুরুষের সকলেরই হজমশক্তি লোপ পায়, খাদ্য স্পৃহা কমে যায়, ফলাফল শরীর স্বাস্থ্য দুর্বল হওয়া, আর আদি চেহারার নতুন রূপ লাভ করে। বিকৃত হওয়া চেহারায় ধূসর রঙের ঝাপসা মুখের অবয়ব সৃষ্টি হয়। আত্মপ্রতিকৃতির চারপাশ ঘিরে ধরে জটিল সব রোগ-বালাই। লিভার, কিডনি, মস্তিষ্কে এলোমেলো কার্যকারীতার ফলশ্রুতি নির্ঘাত মৃত্যুর মুখে পতিত হওয়া।

শারীরিক স্বাস্থ্যের কারণ-কৌশলের সাথে মানসিক স্বাস্থ্যের বাস্তানুবাগ রীতির ব্যাপক পরিবর্তন হয়। শেখার ক্ষমতা এবং কাজের দক্ষতা কমিয়ে দেয়, বিচার-বিবেচনার, বিন্যাস ও গঠনের দৃঢ়তায় ছেদ পড়ে, ভাবনা প্রকাশ আর উপলদ্ধির মাধ্যমগত ভিন্নতা দেখা দেয়। কোনটা ভুল, কোনটা সঠিক তা বোঝার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। ফলে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা লোপ পায়। নিজের আবেগ প্রকাশের গ্রহণ রূপটি নিয়ন্ত্রণহীন নয়। উগ্র আচরণের জন্ম দেয়। মানসিক পীড়ন বাড়িয়ে দেয়। একটি ঘটনার আচরণের সাথে অন্য আরেকটি ঘটনার প্রেক্ষিত আলাদাভাবে প্রকাশভঙ্গির রূপ বিলোপ পায়। স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যহত হয়ে আত্মহননের প্রবণতা অতিনিকটবর্তী হয়ে দেখা দেয়। অর্থনৈতিক দিক থেকে পরিবারে শতছিন্ন পরিণতি ঘটে। অন্য সদস্যদের মাঝেও বিশৃঙ্খলায় উদ্বুদ্ধ হওয়ার পরিবেশ সৃষ্টি হয়। কর্মক্ষম জনশক্তির আয় রোজগারে-পরিবারে বিশেষ অবদান রাখা থেকে বিচ্যুত হয়। শরীর স্বাস্থ্যে রোগ বালাইয়ে মাখামাখি হয় বলে চিকিৎসা খরচ অনেক বেড়ে যায়।

পারিবারিক ও সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টির পেছনের কারিগর ‘মাদক’। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে বাংলাদেশে প্রতি বছর মাদকের পেছনে সরাসরি খরচ হয় ৬০ হাজার কোটি টাকা। এই টাকা যোগারে বিস্ময়কর সব ঘটনার জন্ম দেয়। খুনাখুনি পর্যন্ত গড়ায়।

মাদকাসক্ত ছেলে-মেয়ে দ্বারা গত দশ বছরে দেশে দুইশ মা-বাবা খুন হয়েছেন। সমকালীন বাস্তবতার প্রতিফলন হলো দেশে আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে মাদকাসক্তর সংখ্যা। গত ৫ বছরে আসক্তির এই সংখ্যা তীব্র গতির খুঁজ পাওয়া যায়। গুণিতক হার। এখানে নারীরাও পিছিয়ে নেই। সামাজিক ও আর্থিক প্রতিবন্ধকতার কারণে অধিকাংশ ক্ষেত্রে নারীরা মাদকের রূপমাধুরীকে বুকে টেনে নিচ্ছেন।

মাদকের অনৈতিক সৌন্দর্য বৈভবকে তারা প্রতিনিধিত্ব করছেন। শিক্ষার্থী ও তরুণীদের মাঝে এই প্রবণতা অত্যাদিক থাকলেও গৃহবধু, চাকুরিজীবীসহ সব বয়সী নারীই আছেন মাদকের প্রবহমান জলধারায়। জাতিসংঘের এক জরিপে বলা হয়েছে বাংলাদেশে মোট মাদকাসক্ত নারী পুরুষের মধ্যে ১৩ শতাংশ নারী। মাদক প্রকৃতির রূপবৈচিত্র্যকে সর্বান্তকরণে গ্রহণ করেছে ১৫ থেকে ৩৫ বছরের গড় বয়সের নারীরা।

মাদকের চেনা রূপকে দেখিয়ে দেয়া মোট আসক্তের ৯১ শতাংশই কিশোর-তরুণ, এর মধ্যে ৪৫ শতাংশ লালচে রাজপথের বাসিন্ধা- বেকার। বাকীদের শিক্ষা অনুজ্জ্বল হলেও সমাজ সভ্যতা-কর্মক্ষমতার দিকে তারা গুরুত্বপূর্ণ। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর তাঁদের প্রতিবেদনের কালি ও তুলির আঁচরে উল্লেখ করেছে উচ্চ শিক্ষিত মাদকাসক্তর সংখ্যাও নেহায়েত কম নয়। ১৫ শতাংশ।

বাংলাদেশ মাদক বিরোধী সংস্থা আর আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ আইসিডিডিআরবিও তাদের বিমূর্ত কায়দায় করা গবেষণায় কাছাকাছি পরিসংখ্যানই তুলে ধরেছে। আকাশ-নদী একাকার হয়ে ওঠা এইসব গবেষণার ভয়ঙ্কর তথ্য হলো শুধু মাদকের আসক্তি নয়, তামাক সেবনের হারও নারী-পুরুষ নির্বিশেষে বাড়ছে। সিগারেট, বিড়ি, সাদাপাতা, জর্দার ছন্দময় রেখায় পা ফেলা ২৯ শতাংশই নারী। সরলীকরণ চোখেও ভয়াবহতা অনুমান করা যায়।

বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা ঢাকা আহছানিয়া মিশন কেবলমাত্র নারী মাদকাসক্তদের নিয়ে কাজ করছে। মাদক থেকে মুক্তির আলো ছড়িয়ে দিতে কাজ করতে গিয়ে তাঁরা দেখছে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের মাদকে জড়িয়ে পড়ার অন্যতম বিশেষ কারণ পারিবারিক অবহেলা কর্মব্যস্ত মা-বাবার সন্তানদের বেলায় এর আকৃতি উজ্জ্বল রঙের। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত মেয়েদের ক্ষেত্রে এই সমস্যা সিঁদুর লালচে রঙে-উজ্জ্বল হয়। বাস্তব আর আধাবাস্তব যাই বলা হোক মাদকের অপব্যাবহার থেকে অভ্যাস, আর অভ্যাস থেকে আসক্তি জন্মে।

আসক্তি জন্মানোর জন্য এক শ্রেণির সিপাহসালার সদা জাগ্রত। তাঁরা শিশু-কিশোর-তরুণ-নারীর সুবিধাগত অবস্থান দুর্বলতাকে লুফে নেয়। ভালবাসার বিচিত্র্য প্রকৃতি নিয়ে লোভনীয় আকর্ষণ জাগাতে সচেষ্ট হয়। জলকাদমাটিমাখা স্নেহশীলা আপ্যায়নের ফলে মাদকের সৌন্দর্যে মজে যায়। ব্যবসায়িরা সার্থক হয়।

জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে জানা যায় আমাদের দেশে নিয়মিতভাবে মাদক ব্যবসার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত আছে সাড়ে তিন লাখ মানুষ। এর বাইরে আরো অনেক অনিয়মিত ব্যবসায়ি নানাভাবে মাদক ব্যবসার সাথে ঢলাঢলি করে। প্রথমে উড়ন্তডানার সিগেরেটের রংধনু দিয়ে শুরু করে। অনুকরণজাত এই আসক্তি ধীরে ধীরে মাদকের রূপ লাভ করে।

স্বল্পমাত্রায় বিষ প্রয়োগও যেমন ওষুধি হিসাবে কাজ করে। এই মাত্রার নন্দিত দৃশ্যের সাথে বাড়তি রং লেপনের সঙ্গে সঙ্গেই ব্যাপক গতির সঞ্চার করে। মুগ্ধকর দৃষ্টি প্রসারিত হয় প্রকৃতি আর মানুষের সান্নিধ্য যেমন আলাদা ছন্দ তৈরি হয়, তেমনি মাদকের বিষাক্ত-আকর্ষণ-অপব্যবহারের সূচনা হয়। বন্ধুবান্ধবের সহচার্যে শুরু হলেও পরবর্তীতে মানবাকৃতির সঙ্গে মিলিয়ে নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। নেশার জালে জড়িয়ে মাদক কোনার অর্থ জোগাড় করতে গিয়েই কিশোর-তরুণরা ব্যাপকভাবে অপরাধী হয়। বেপরোয়াভাবে অপহরণ, চাঁদাবাজি, ছুরিকাঘাত খুন পর্যন্ত ঘটাতে দ্বিধা করে না। কিশোর সন্ত্রাসীর ক্রমবর্ধমান দাপটের যে তথ্য সম্প্রতি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে তার গোড়ার বিষয়টি এই মাদক। মাদকের মুক্তরেখা এখন আলো ঝলমলে নগরীর অলিগলি থেকে শুরু করে প্রত্যান্ত গ্রামেও অবাধে বিচরণ করছে। ব্যাপকভাবে শুরু হয়েছিল আশির দশকে।

মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচার আশংকাজনকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় তখন সকলকে ভাবিয়ে তুলে। এই সমস্যা মোকাবিলায় অপব্যবহার; পাচার রোধ ও ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সাধারণ জনগণকে সচেতন করার ভাবনা চিন্তা শুরু করা হয়। মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনকল্পে ১৯৮৯ সালে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ জারি করে। অত:পর ১৯৯০ সালে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন প্রণয়ন করা হয়। প্রতিষ্ঠা করা হয় পরিদপ্তর। ১৯৯১ সালে এই অধিদপ্তরকে অধিক কার্যকরী সংস্থা হিসাবে পরিণত করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে ন্যাস্ত করা হয়।

দেশে মাদক নিয়ন্ত্রণের জন্য সুনির্দিষ্ট ৩টি কর্মকৌশল বা পদ্ধতি অনুসরণ করতে থাকে। চাহিদা হৃাস, সরবরাহ হৃাস এবং ক্ষতিহৃাস নিয়ে বিভিন্ন কার্যকর পদক্ষেপ নিতে থাকে। এরপর থেকে সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে যুগের চাহিদা পূরণে ‘মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন পরিবর্তন, পরিমার্জন, সংযোজন হতে থাকে। ২০০১ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয জাতীয় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ বোর্ড, ২০১৪ সালে প্রণীত হয় বিধিমালা।

২০১৬ সালে বেসরকারী পর্যায়ে মাদকাসক্ত পরামর্শ কেন্দ্র, মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্র,মাদকাসক্ত পুনর্বাসন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার বিধিমালা চ‚ড়ান্ত করা হয়। সরকারের সাথে বেসরকারী সংস্থাকে মাখামাখি করিয়ে দেওয়া হয়। ২০১৮ সালে আইনে আনা হয় ব্যতিক্রমী ভিন্নতা। মাদক অপরাধে তাৎক্ষণিক শাস্তি নিশ্চিত করতে মোবাইলকোর্ট পরিচালনা করে কঠোরহাতে দমনের চেষ্টা করা হয়। অতীত সব আইনের আমুল পরিবর্তন ঘটিয়ে ২০২০ সালে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন নতুনভাবে সাজানো হয়েছে।

মাদকের ভয়াবহতা সম্পর্কে ভাবনার খোরাক জুগাতে যুগপৎভাবে মসজিদের ইমাম, মন্দিরের পুরোহিত, গীর্জার ফাদারদেরও বেশি বেশি প্রচার প্রচারণা করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মাদকের সাথে বাঁদরামি করে চাষাবাদ, উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, বহন, পরিবহন, স্থানান্তর, আমদানি, রপ্তানি, সরবরাহ, বিপণন, ক্রয়-বিক্রয়, হস্তান্তর, অর্পণ, গ্রহণ, প্রেরণ, লেনদেন, নিলামকরণ, ধারণ, গুদামজাতকরণ, প্রদর্শন, সেবন, প্রয়োগ, ব্যবহারকে একই অপরাধ হিসাবে গণ্য করা হয়েছে। ওজনদার হিসাবে মাত্র ৫ গ্রাম ওজনের যে কোন মাদক উপরোক্ত সব ধারায় পাওয়া গেলে বিভিন্ন মেয়াদি কারাদণ্ড অর্থদণ্ড, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং সর্বশেষ সবোর্চ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত বিধান রেখে আইন সংশোধন করা হয়েছে।

আর্থসামাজিক, সাংস্কৃতিক, ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে দেখা যায় মাদকের ব্যবহার অতি প্রাচীন। বাণিজ্যিক স্বার্থ বিবেচনা করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতবর্ষে প্রথম আফিম চাষ শুরু করে। আফিমকে আনুষ্ঠানিকতা দেওয়ার জন্য ফরমান জারি করে। আফিমের আওতা ও সহায়তায় বিপুল অর্থ উপার্জনের ফলে একে সরকারি নিয়ন্ত্রণে এনে ১৮৫৭ সালে আফিম আইন প্রবর্তন করা হয়। ১৮৭৮ সালে সম্পূর্ণ আলাদা বিভাগ হিসাবে স্বীকৃতি দেয় আফিমকে।
১৯০৯ সালে সামাজিক নিরাপত্তা ভাবনায় এই আইনকে সংশোধন করা হয়। আফিম, মদ, গাঁজা, কোকেন দিয়ে তৈরি বিভিন্ন ধরনের মাদক আলাদাভাবে প্রসার ঘটলে ১৯৩০ সালে একে বিপদজনক হিসাবে গণ্য করে একটি সহনীয় মাত্রায় সেবন বিধি নিয়ে আইন করে। জনসম্মুখে আফিম সেবন ও ধূমপান নিয়ন্ত্রণে ১৯৩২ সালে সাধারণভাবে এবং ১৯৩৯ সালে কঠোর হওয়ার নির্দেশনা সম্বলিত আইন বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হয়।

সেই থেকে শুরু করে বর্তমান সময়ে এসে মাদকের বিরুদ্ধে লড়াই করতে স্বস্তির জায়গা খোঁজা হচ্ছে। লোকচক্ষুর অন্তরালে ঘটে যাওয়া মাদকাসক্তির প্রতিরোধ ও প্রতিকার নিয়ে অভিন্ন কর্মসূচির ভাবনা শুরু হয়। মায়ের বুকের মতো আশ্রয় খুঁজে পাওয়া যায় ‘জাতিসংঘ’।

প্রকৃতি আর মানুষ দুয়ে মিলে যেমন গড়ে উঠেছে পৃথিবী তেমনি একে রক্ষা করার দায়িত্বও মানুষের। সাংগঠনিকভাবে জাতিসংঘের। তাঁরা ১৯৮৭ সালে সাধারণ পরিষদের ৪২তম অধিবেশনের ১১২ নম্বর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মাদকের বিরুদ্ধে আশানুরূপ দ্রুত সুফল পাওয়ার গঠনমূলক সিদ্ধান্ত নেয়। মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিকভাবে সমাধাদানের পথ খুঁজে।

সচেতনতা ও প্রতিরোধমূলক ভূমিকা সক্রিয় করার লক্ষ্যে ২৬ জুন মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচার বিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস হিসাবে ঘোষণা করে। মাদকের ছোবলে পড়ে পৃথিবীতে ধ্বংস হয়েছে সৃজনশীল বহু মেধা ও মেধাবী ব্যক্তি। মাদকের বিরুদ্ধে দীর্ঘ স্থায়ী ক্ষতির প্রভাবকে আমলে নিয়ে বাংলাদেশ ১৯৯০ সাল থেকেই যথাযথ মর্যাদায় এই দিবস পালন শুরু করে। দিবস পালনের আনন্দের জোয়ারে গা না ভাসিয়ে আন্তর্জাতিক কঠোরতার সাথে সামঞ্জস্য রেখে দিবস পালন যথার্থ হোক, হুড়াহুড়ি নয়, সমন্বিতভাবে ত্বরান্বিত হোক মাদক ভাবনা। মাদক পাচারকারীদের অবৈধ এই মনোবৃত্তিতে দ্রুত পরিবর্তন আসবে উন্মুখ হয়ে তাই ভাবছি।লেখকঃ খন রঞ্জন রায়,সমাজচিন্তক, গবেষক ও সংগঠক।

খন রঞ্জন রায় : প্রকৃতির গাছ-গাছালির নির্যাসের সাথে ল্যাবরেটরিতে তৈরি করা কিছু রাসায়নিক যৌগই ‘মাদক’। এর আভিধানিক অর্থ ওষুধ। এই ওষুধ মাত্রাতিরিক্ত গ্রহণের ফলে মানুষের মনের অনুভূতি, চিন্তা-চেতনা মন-মানসিকতা স্বাভাবিক অবস্থা থেকে অস্বাভাবিক অবস্থায় রূপান্তর ঘটে বলেই তাকে মাদক হিসাবে অভিহিত করা হয়।

১৮৮৭ সালে মানুষের স্থূলতার বিরুদ্ধে যে ওষুধ প্রয়োগ করা হয়েছিল পরবর্তীতে সেই ওষুধে নানা জরকরস সংযুক্ত করে বর্তমানের অধিক জনপ্রিয় মাদক ‘ইয়াবা’ তৈরি করা হয়। মানুষের কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে বিশেষ উন্মাদনা সৃষ্টি করা গাঁজা, মারিজুয়ানা, হাশিস, চরস, ভাং ইত্যাদির আদি উৎস বিরুৎজাতীয় উদ্ভিদের বিভিন্ন উপজাতি।

হেরোইন, মরফিন, কোডেইন নামের মাদক উৎপন্ন হয় পপি নামক একটি ফল থেকে। ভয়ঙ্কর এই মাদক তৈরিতে উদ্ভিদের অতি চেনা ফলের রূপে বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থের প্রক্রিয়াজাত করা হয়। কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের উপর বিশৃংঙ্খলভাবে ব্যাপক বিস্তর প্রভাব সৃষ্টি করা ওয়াইন, বিয়ার, চোলাই মদ, মদ উৎপন্ন করা হয়। জীবনতৃষ্ণার তীব্রতা নিয়ে বৈতালিক কাণ্ড; কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাবারের হতচ্ছড়া সৃষ্টি এইসব মাদক।

মানুষের স্বাস্থ্যগত কল্যাণের চিন্তা করে রোগ নিরাময়ের জন্য ল্যাবরেটরিতে তৈরি করা ওষুধ, মাত্রাতিরিক্ত সেবনে শরীরে মাদকতার তীব্র আবহ তৈরি হয়। বিশেষ করে ঘুমের ওষুধ ডায়াজিপাম, ক্লোনাজেপাম, মিডাজোলাম, ডেক্সোমেথরফেন, কিটামিন ইত্যাদির কর্মসাধনায় মাদকের কাতারে তালিকাভূক্ত।

বৈধভাবে তৈরি করে বাজারজাত করা কিছু ওষুধ একসঙ্গে মিশিয়ে নতুন করে মাদকের ভাবব্যাঞ্জনা সৃষ্টি করা হচ্ছে। ব্যবহার ও প্রয়োগের বাড়াবাড়ি হিসাবে নিত্যনতুন নাম-কামের কিছু মাদকের গঠন-ইঙ্গিত হরহামেশাই শোনা যায়। মাদকতা একটি অতি প্রাচীন রূপ হলেও রকমভেদের ভিন্নতা বর্তমানকে নতুনভাবে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড় করাচ্ছে।

লোভাক্রান্ত মানুষের কাজের কৌশলে পরাস্ত হচ্ছে সহজ-সরল সাধারণ মানুষজন। পৃথিবীর দেশে দেশে মানুষের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে মানুষই। নিসর্গে মিলেমিশে থাকা তাবৎ মানুষের মুখে তুলে দিয়েছে মাদকের মরণনেশা। সভ্যতার শুরু থেকেই মানুষ-মানুষের সরল পথচলার দীর্ঘ দেয়াল তুলে দিয়েছে মানুষই।

চারদিকে মাদকের ঘনঘটার মধ্যে নানা নাম ও প্রকরণে উদ্ধার হওয়া মাদক বাংলাদেশে পাওয়া যাচ্ছে ২৭ ধরণের। ফেনসিডিল, আইস, ইয়াবা, রেফিটফায়েড স্পিরিট, তাড়ি, ভায়াগ্রা, মরফিন, একনাগাড়ে পাওয়া গেলেও ইয়াবা আর গাঁজার ধারণার জগতে পা রাখা মাদকসেবীর সংখ্যাই বেশি।

চাপা বিষাদ ও বেদনা-বিধুর-রহস্যময় আবহ নিয়ে জানাতে হয় দেশে ১৮ থেকে ৬০ বছর বয়সীদের মধ্যে মাদকাসক্তের সংখ্যা প্রায় ৯০ লাখ। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের সম্পূর্ণ আনাড়ি সমীক্ষায়ও দেখা গেছে মাদকের বিষয়বৈচিত্র্য রপ্তকরণে নারী-পুরুষের সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। এই হিসাব মাদককে যাঁরা আজন্ম সাথী করেছে তাঁদের।

যাঁরা বিভিন্ন টেনশন মাথায় নিয়ে ঘুমের ট্যাবলেট খেয়ে পুনরুজ্জীবন প্রাপ্তির আকাক্সক্ষা করে তারাও এক ধরনের মাদকাসক্ত। গবেষণায় দেখা গেছে তরুণ প্রজন্মের এক চতুর্থাংশই কোন না কোন ধরণের নেশায় আসক্ত। সামর্থ্য, সামাজিক অবস্থান, পারিবারিক ঐতিহ্য বস্তি কিংবা রাজপথ বিবেচনায় নিজ নিজ অবস্থানের মদ,সিসা, গাম-ডাণ্ডি-নামের নেশা দ্রব্যের খপ্পরে পরে।

জাতিসংঘের মাদক নিয়ন্ত্রণ সংস্থা ইউএনওডিসির তথ্যমতে বাংলাদেশে প্রতিবছর ৩.৮ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে মাদকাসক্তর সংখ্যা। সারা বিশ্বের ব্যবধান বোঝা যেখানে ২ শতাংশ। অর্থনৈতিক দুরবস্তার জন্য অনেকাংশে দায়ী এই মাদকাসক্তদের প্রতি দশ জনে একজন হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসে। একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তি শারীরিক মানসিক, আর্থিক, পারিবারিকসহ নানাভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়।

আকাশে জ্যোৎস্নাপ্লাবিত গোলচাঁদ থাকলেও মাদকাসক্তর বোধের জগতে থাকে হাহাকার ও পরিবার বিচ্ছিন্নতা। চেহারা অবয়বের অভিব্যক্তি থাকে নিঃসাড়। মুখমণ্ডল ফুলে যায়, মুখ ও নাক লাল হয়, চোখের শক্তি কমে গিয়ে ঝাপসা দেখা শুরু করে, মুখমণ্ডলসহ সারা শরীরে কালো শিরা পড়ে, হৃদযন্ত্র, ফুসফুস কর্মক্ষমতা হারাতে বসে। চর্ম ও যৌন রোগ বৃদ্ধি পেতে পারে, সংক্রামক রোগের প্রকোপ ধরা দেয়, স্মৃতিশক্তি লোপ পায়, যৌনশক্তি কমে যায়। প্রকৃতির রং বৈভবকে ভাবলে দেখা যায় মাদক গ্রহণে শারীরিকভাবে নারীরা বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়। অনিয়মিত মাসিক, প্রজননক্ষমতা হ্রাস, জরায়ুর বিভিন্ন রোগসহ নানা উপসর্গ দেখা দেয়।

এইডস ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে মাদকাসক্তরা বহুকালের সম্পর্ক ধরে রেখেছে। সাকুল্যে হিসাব করলে মাদক গ্রহণকারী নারী পুরুষের সকলেরই হজমশক্তি লোপ পায়, খাদ্য স্পৃহা কমে যায়, ফলাফল শরীর স্বাস্থ্য দুর্বল হওয়া, আর আদি চেহারার নতুন রূপ লাভ করে। বিকৃত হওয়া চেহারায় ধূসর রঙের ঝাপসা মুখের অবয়ব সৃষ্টি হয়। আত্মপ্রতিকৃতির চারপাশ ঘিরে ধরে জটিল সব রোগ-বালাই। লিভার, কিডনি, মস্তিষ্কে এলোমেলো কার্যকারীতার ফলশ্রুতি নির্ঘাত মৃত্যুর মুখে পতিত হওয়া।

শারীরিক স্বাস্থ্যের কারণ-কৌশলের সাথে মানসিক স্বাস্থ্যের বাস্তানুবাগ রীতির ব্যাপক পরিবর্তন হয়। শেখার ক্ষমতা এবং কাজের দক্ষতা কমিয়ে দেয়, বিচার-বিবেচনার, বিন্যাস ও গঠনের দৃঢ়তায় ছেদ পড়ে, ভাবনা প্রকাশ আর উপলদ্ধির মাধ্যমগত ভিন্নতা দেখা দেয়। কোনটা ভুল, কোনটা সঠিক তা বোঝার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। ফলে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা লোপ পায়। নিজের আবেগ প্রকাশের গ্রহণ রূপটি নিয়ন্ত্রণহীন নয়। উগ্র আচরণের জন্ম দেয়। মানসিক পীড়ন বাড়িয়ে দেয়। একটি ঘটনার আচরণের সাথে অন্য আরেকটি ঘটনার প্রেক্ষিত আলাদাভাবে প্রকাশভঙ্গির রূপ বিলোপ পায়। স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যহত হয়ে আত্মহননের প্রবণতা অতিনিকটবর্তী হয়ে দেখা দেয়। অর্থনৈতিক দিক থেকে পরিবারে শতছিন্ন পরিণতি ঘটে। অন্য সদস্যদের মাঝেও বিশৃঙ্খলায় উদ্বুদ্ধ হওয়ার পরিবেশ সৃষ্টি হয়। কর্মক্ষম জনশক্তির আয় রোজগারে-পরিবারে বিশেষ অবদান রাখা থেকে বিচ্যুত হয়। শরীর স্বাস্থ্যে রোগ বালাইয়ে মাখামাখি হয় বলে চিকিৎসা খরচ অনেক বেড়ে যায়।

পারিবারিক ও সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টির পেছনের কারিগর ‘মাদক’। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে বাংলাদেশে প্রতি বছর মাদকের পেছনে সরাসরি খরচ হয় ৬০ হাজার কোটি টাকা। এই টাকা যোগারে বিস্ময়কর সব ঘটনার জন্ম দেয়। খুনাখুনি পর্যন্ত গড়ায়।

মাদকাসক্ত ছেলে-মেয়ে দ্বারা গত দশ বছরে দেশে দুইশ মা-বাবা খুন হয়েছেন। সমকালীন বাস্তবতার প্রতিফলন হলো দেশে আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে মাদকাসক্তর সংখ্যা। গত ৫ বছরে আসক্তির এই সংখ্যা তীব্র গতির খুঁজ পাওয়া যায়। গুণিতক হার। এখানে নারীরাও পিছিয়ে নেই। সামাজিক ও আর্থিক প্রতিবন্ধকতার কারণে অধিকাংশ ক্ষেত্রে নারীরা মাদকের রূপমাধুরীকে বুকে টেনে নিচ্ছেন।

মাদকের অনৈতিক সৌন্দর্য বৈভবকে তারা প্রতিনিধিত্ব করছেন। শিক্ষার্থী ও তরুণীদের মাঝে এই প্রবণতা অত্যাদিক থাকলেও গৃহবধু, চাকুরিজীবীসহ সব বয়সী নারীই আছেন মাদকের প্রবহমান জলধারায়। জাতিসংঘের এক জরিপে বলা হয়েছে বাংলাদেশে মোট মাদকাসক্ত নারী পুরুষের মধ্যে ১৩ শতাংশ নারী। মাদক প্রকৃতির রূপবৈচিত্র্যকে সর্বান্তকরণে গ্রহণ করেছে ১৫ থেকে ৩৫ বছরের গড় বয়সের নারীরা।

মাদকের চেনা রূপকে দেখিয়ে দেয়া মোট আসক্তের ৯১ শতাংশই কিশোর-তরুণ, এর মধ্যে ৪৫ শতাংশ লালচে রাজপথের বাসিন্ধা- বেকার। বাকীদের শিক্ষা অনুজ্জ্বল হলেও সমাজ সভ্যতা-কর্মক্ষমতার দিকে তারা গুরুত্বপূর্ণ। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর তাঁদের প্রতিবেদনের কালি ও তুলির আঁচরে উল্লেখ করেছে উচ্চ শিক্ষিত মাদকাসক্তর সংখ্যাও নেহায়েত কম নয়। ১৫ শতাংশ।

বাংলাদেশ মাদক বিরোধী সংস্থা আর আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ আইসিডিডিআরবিও তাদের বিমূর্ত কায়দায় করা গবেষণায় কাছাকাছি পরিসংখ্যানই তুলে ধরেছে। আকাশ-নদী একাকার হয়ে ওঠা এইসব গবেষণার ভয়ঙ্কর তথ্য হলো শুধু মাদকের আসক্তি নয়, তামাক সেবনের হারও নারী-পুরুষ নির্বিশেষে বাড়ছে। সিগারেট, বিড়ি, সাদাপাতা, জর্দার ছন্দময় রেখায় পা ফেলা ২৯ শতাংশই নারী। সরলীকরণ চোখেও ভয়াবহতা অনুমান করা যায়।

বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা ঢাকা আহছানিয়া মিশন কেবলমাত্র নারী মাদকাসক্তদের নিয়ে কাজ করছে। মাদক থেকে মুক্তির আলো ছড়িয়ে দিতে কাজ করতে গিয়ে তাঁরা দেখছে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের মাদকে জড়িয়ে পড়ার অন্যতম বিশেষ কারণ পারিবারিক অবহেলা কর্মব্যস্ত মা-বাবার সন্তানদের বেলায় এর আকৃতি উজ্জ্বল রঙের। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত মেয়েদের ক্ষেত্রে এই সমস্যা সিঁদুর লালচে রঙে-উজ্জ্বল হয়। বাস্তব আর আধাবাস্তব যাই বলা হোক মাদকের অপব্যাবহার থেকে অভ্যাস, আর অভ্যাস থেকে আসক্তি জন্মে।

আসক্তি জন্মানোর জন্য এক শ্রেণির সিপাহসালার সদা জাগ্রত। তাঁরা শিশু-কিশোর-তরুণ-নারীর সুবিধাগত অবস্থান দুর্বলতাকে লুফে নেয়। ভালবাসার বিচিত্র্য প্রকৃতি নিয়ে লোভনীয় আকর্ষণ জাগাতে সচেষ্ট হয়। জলকাদমাটিমাখা স্নেহশীলা আপ্যায়নের ফলে মাদকের সৌন্দর্যে মজে যায়। ব্যবসায়িরা সার্থক হয়।

জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে জানা যায় আমাদের দেশে নিয়মিতভাবে মাদক ব্যবসার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত আছে সাড়ে তিন লাখ মানুষ। এর বাইরে আরো অনেক অনিয়মিত ব্যবসায়ি নানাভাবে মাদক ব্যবসার সাথে ঢলাঢলি করে। প্রথমে উড়ন্তডানার সিগেরেটের রংধনু দিয়ে শুরু করে। অনুকরণজাত এই আসক্তি ধীরে ধীরে মাদকের রূপ লাভ করে।

স্বল্পমাত্রায় বিষ প্রয়োগও যেমন ওষুধি হিসাবে কাজ করে। এই মাত্রার নন্দিত দৃশ্যের সাথে বাড়তি রং লেপনের সঙ্গে সঙ্গেই ব্যাপক গতির সঞ্চার করে। মুগ্ধকর দৃষ্টি প্রসারিত হয় প্রকৃতি আর মানুষের সান্নিধ্য যেমন আলাদা ছন্দ তৈরি হয়, তেমনি মাদকের বিষাক্ত-আকর্ষণ-অপব্যবহারের সূচনা হয়। বন্ধুবান্ধবের সহচার্যে শুরু হলেও পরবর্তীতে মানবাকৃতির সঙ্গে মিলিয়ে নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। নেশার জালে জড়িয়ে মাদক কোনার অর্থ জোগাড় করতে গিয়েই কিশোর-তরুণরা ব্যাপকভাবে অপরাধী হয়। বেপরোয়াভাবে অপহরণ, চাঁদাবাজি, ছুরিকাঘাত খুন পর্যন্ত ঘটাতে দ্বিধা করে না। কিশোর সন্ত্রাসীর ক্রমবর্ধমান দাপটের যে তথ্য সম্প্রতি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে তার গোড়ার বিষয়টি এই মাদক। মাদকের মুক্তরেখা এখন আলো ঝলমলে নগরীর অলিগলি থেকে শুরু করে প্রত্যান্ত গ্রামেও অবাধে বিচরণ করছে। ব্যাপকভাবে শুরু হয়েছিল আশির দশকে।

মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচার আশংকাজনকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় তখন সকলকে ভাবিয়ে তুলে। এই সমস্যা মোকাবিলায় অপব্যবহার; পাচার রোধ ও ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সাধারণ জনগণকে সচেতন করার ভাবনা চিন্তা শুরু করা হয়। মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনকল্পে ১৯৮৯ সালে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ জারি করে। অত:পর ১৯৯০ সালে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন প্রণয়ন করা হয়। প্রতিষ্ঠা করা হয় পরিদপ্তর। ১৯৯১ সালে এই অধিদপ্তরকে অধিক কার্যকরী সংস্থা হিসাবে পরিণত করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে ন্যাস্ত করা হয়।

দেশে মাদক নিয়ন্ত্রণের জন্য সুনির্দিষ্ট ৩টি কর্মকৌশল বা পদ্ধতি অনুসরণ করতে থাকে। চাহিদা হৃাস, সরবরাহ হৃাস এবং ক্ষতিহৃাস নিয়ে বিভিন্ন কার্যকর পদক্ষেপ নিতে থাকে। এরপর থেকে সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে যুগের চাহিদা পূরণে ‘মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন পরিবর্তন, পরিমার্জন, সংযোজন হতে থাকে। ২০০১ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয জাতীয় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ বোর্ড, ২০১৪ সালে প্রণীত হয় বিধিমালা।

২০১৬ সালে বেসরকারী পর্যায়ে মাদকাসক্ত পরামর্শ কেন্দ্র, মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্র,মাদকাসক্ত পুনর্বাসন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার বিধিমালা চ‚ড়ান্ত করা হয়। সরকারের সাথে বেসরকারী সংস্থাকে মাখামাখি করিয়ে দেওয়া হয়। ২০১৮ সালে আইনে আনা হয় ব্যতিক্রমী ভিন্নতা। মাদক অপরাধে তাৎক্ষণিক শাস্তি নিশ্চিত করতে মোবাইলকোর্ট পরিচালনা করে কঠোরহাতে দমনের চেষ্টা করা হয়। অতীত সব আইনের আমুল পরিবর্তন ঘটিয়ে ২০২০ সালে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন নতুনভাবে সাজানো হয়েছে।

মাদকের ভয়াবহতা সম্পর্কে ভাবনার খোরাক জুগাতে যুগপৎভাবে মসজিদের ইমাম, মন্দিরের পুরোহিত, গীর্জার ফাদারদেরও বেশি বেশি প্রচার প্রচারণা করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মাদকের সাথে বাঁদরামি করে চাষাবাদ, উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, বহন, পরিবহন, স্থানান্তর, আমদানি, রপ্তানি, সরবরাহ, বিপণন, ক্রয়-বিক্রয়, হস্তান্তর, অর্পণ, গ্রহণ, প্রেরণ, লেনদেন, নিলামকরণ, ধারণ, গুদামজাতকরণ, প্রদর্শন, সেবন, প্রয়োগ, ব্যবহারকে একই অপরাধ হিসাবে গণ্য করা হয়েছে। ওজনদার হিসাবে মাত্র ৫ গ্রাম ওজনের যে কোন মাদক উপরোক্ত সব ধারায় পাওয়া গেলে বিভিন্ন মেয়াদি কারাদণ্ড অর্থদণ্ড, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং সর্বশেষ সবোর্চ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত বিধান রেখে আইন সংশোধন করা হয়েছে।

আর্থসামাজিক, সাংস্কৃতিক, ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে দেখা যায় মাদকের ব্যবহার অতি প্রাচীন। বাণিজ্যিক স্বার্থ বিবেচনা করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতবর্ষে প্রথম আফিম চাষ শুরু করে। আফিমকে আনুষ্ঠানিকতা দেওয়ার জন্য ফরমান জারি করে। আফিমের আওতা ও সহায়তায় বিপুল অর্থ উপার্জনের ফলে একে সরকারি নিয়ন্ত্রণে এনে ১৮৫৭ সালে আফিম আইন প্রবর্তন করা হয়। ১৮৭৮ সালে সম্পূর্ণ আলাদা বিভাগ হিসাবে স্বীকৃতি দেয় আফিমকে।
১৯০৯ সালে সামাজিক নিরাপত্তা ভাবনায় এই আইনকে সংশোধন করা হয়। আফিম, মদ, গাঁজা, কোকেন দিয়ে তৈরি বিভিন্ন ধরনের মাদক আলাদাভাবে প্রসার ঘটলে ১৯৩০ সালে একে বিপদজনক হিসাবে গণ্য করে একটি সহনীয় মাত্রায় সেবন বিধি নিয়ে আইন করে। জনসম্মুখে আফিম সেবন ও ধূমপান নিয়ন্ত্রণে ১৯৩২ সালে সাধারণভাবে এবং ১৯৩৯ সালে কঠোর হওয়ার নির্দেশনা সম্বলিত আইন বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হয়।

সেই থেকে শুরু করে বর্তমান সময়ে এসে মাদকের বিরুদ্ধে লড়াই করতে স্বস্তির জায়গা খোঁজা হচ্ছে। লোকচক্ষুর অন্তরালে ঘটে যাওয়া মাদকাসক্তির প্রতিরোধ ও প্রতিকার নিয়ে অভিন্ন কর্মসূচির ভাবনা শুরু হয়। মায়ের বুকের মতো আশ্রয় খুঁজে পাওয়া যায় ‘জাতিসংঘ’।

প্রকৃতি আর মানুষ দুয়ে মিলে যেমন গড়ে উঠেছে পৃথিবী তেমনি একে রক্ষা করার দায়িত্বও মানুষের। সাংগঠনিকভাবে জাতিসংঘের। তাঁরা ১৯৮৭ সালে সাধারণ পরিষদের ৪২তম অধিবেশনের ১১২ নম্বর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মাদকের বিরুদ্ধে আশানুরূপ দ্রুত সুফল পাওয়ার গঠনমূলক সিদ্ধান্ত নেয়। মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিকভাবে সমাধাদানের পথ খুঁজে।

সচেতনতা ও প্রতিরোধমূলক ভূমিকা সক্রিয় করার লক্ষ্যে ২৬ জুন মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচার বিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস হিসাবে ঘোষণা করে। মাদকের ছোবলে পড়ে পৃথিবীতে ধ্বংস হয়েছে সৃজনশীল বহু মেধা ও মেধাবী ব্যক্তি। মাদকের বিরুদ্ধে দীর্ঘ স্থায়ী ক্ষতির প্রভাবকে আমলে নিয়ে বাংলাদেশ ১৯৯০ সাল থেকেই যথাযথ মর্যাদায় এই দিবস পালন শুরু করে। দিবস পালনের আনন্দের জোয়ারে গা না ভাসিয়ে আন্তর্জাতিক কঠোরতার সাথে সামঞ্জস্য রেখে দিবস পালন যথার্থ হোক, হুড়াহুড়ি নয়, সমন্বিতভাবে ত্বরান্বিত হোক মাদক ভাবনা। মাদক পাচারকারীদের অবৈধ এই মনোবৃত্তিতে দ্রুত পরিবর্তন আসবে উন্মুখ হয়ে তাই ভাবছি।লেখকঃ খন রঞ্জন রায়,সমাজচিন্তক, গবেষক ও সংগঠক।