আজ নিরাপদ মাতৃত্ব দিবস——-
খন রঞ্জন রায়: নিরাপদ মাতৃত্বের অধিকার একটি মানবাধিকার। নিরাপদ প্রসবের সব ধরনের সুযোগ পাওয়াও একজন মায়ের অধিকার। একজন নাগরিক হিসেবে মাতৃত্বকালীন সে অধিকার ভোগ করার ক্ষমতা রাখেন। নিরাপদ মাতৃত্ব দিবস উদযাপনের মূল উদ্দেশ্য হলো গর্ভকালীন, প্রসবকালীন ও প্রসবপরবর্তী সময়ে সকল প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য সেবাদান এর মাধ্যমে মায়ের সুস্থ্যতা ও নবজাতকের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা।
এক জরিপে দেখা গেছে, ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী মহিলাদের ২০ শতাংশই মাতৃত্বজনিত কারণে মারা যান। এছাড়াও কিশোরী মায়ের মৃত্যুহার প্রতি হাজারে ৬ জন। বাংলাদেশে নগর ও গ্রামাঞ্চলে এই মাতৃত্বজনিত মৃত্যুর অনুপাত ৮৬.১০০। দেশের পার্বত্যাঞ্চলের অবস্থা আরও ভয়াবহ। এসব জায়গায় স্বাস্থ্যকেন্দ্র অনেক দূরে, সেখানেও স্বাস্থ্যকর্মীরা নিয়মিত থাকেন না। এসব এলাকার ৯০ ভাগ শিশু ধাত্রীদর হাতে গৃহেই জন্ম নেয়। ফলে এসব এলাকায় মাতৃ ও শিশুর মৃত্যুর হার অন্যান্য জেলার তুলনায় অনেক বেশি।
অনিরাপদ গর্ভপাতে নারীর স্বাস্থ্য ও জীবনের ওপর বড় ধরনের হুমকি থাকে। বেশিরভাগ মৃত্যুই ঘটে প্রসব-পরবর্তী সময়ে। স্বাভাবিক অবস্থাতেই মেয়েরা বেশি রক্তাল্পতায় ভোগেন। গর্ভাবস্থায় অবশ্যই বিশেষ সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। গর্ভাবস্থায় অন্য কোন জটিলতা ছাড়াই মায়ের রক্তে স্বাভাবিক কারণে হিমোগ্লুবিনের মাত্রা কমে যায়। এই সময় রক্তের তরল অংশ অর্থাৎ প্লাজমার মাত্রা বেড়ে গেলেও তার তুলনায় লোহিত কণিকার পরিমাণ একবারে বাড়ে না।
স্বাভাবিক ইউটেরাসের ওজন থাকে ৬০ গ্রাম। গর্ভস্থ অবস্থায় বেড়ে গিয়ে হয়ে যায় এক কেজি। শরীরের অভ্যন্তরীণ এই পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্যতা বজায় রাখতে একজন গর্ভবতী মায়ের লোহিত কণিকার পরিমাণ ৩৩ শতাংশের মত বৃদ্ধির প্রয়োজন, এই পরিমাণ লোহিত কণিকা তৈরি করতে শরীরের প্রচুর বাড়তি পরিমাণ ফলিক অ্যাসিড ও আয়রনের প্রয়োজন হয়। দৈনিক আহার বা অন্য মাধ্যমে এই উপাদান শরীর সরবরাহ না পেলে ‘জমা’ আয়রন ও ফলিক অ্যাসিড খরচ করে লোহিত কণিকা তৈরি হয়। শরীরে যদি যথেষ্ট পরিমাণে উপাদানগুলো জমা না থাকে তাহলে অ্যানিমিয়া দেখা দেয়। তাকে সাধারণ ভাষায় রক্তশূন্যতা বলে। গর্ভধারণ একটি মারাত্মক জটিল প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করে।
গর্ভাবস্থা পরীক্ষণের ইতিহাস একটি গুরুত্প‚র্ণ ইতিহাস । যার শেকড় প্রোথিত রয়েছে জাদু, কল্পকাহিনী ও বিজ্ঞানের মধ্যে। প্রাচীন মিসরীয় সময় থেকে আধুনিক ঊনবিংশ শতাব্দীর চিকিৎসকরা প্রস্রাব বিজ্ঞানের উপর জোর দিলেও গর্ভাবস্থা শনাক্তকরণে তারা বিজ্ঞানভিত্তিক কিছু পদ্ধতি অবলম্বন করেন।
বর্তমান আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর জ্ঞান বিজ্ঞানের যুগে গর্ভ পরীক্ষণের বিবিধ সুযোগ সুবিধা রয়েছে হাতের নাগালে। দোরগোড়ায়। আজকের ডিজিটাল প্রেগন্যান্সি টেস্ট এবং ক্লিনিক্যাল ধাঁচের পরীক্ষণ ব্যবস্থা অত্যন্ত নির্ভুল ও স্বল্পব্যয়ী। গর্ভ পরীক্ষণে সর্বদাই স্থানীয় সংস্কৃতির জোরালো উপস্থিতি লক্ষ্যণীয়। এজন্য মহিলাদেরকে তাদের প্রজনন ক্ষমতা, নারীত্ব এবং ভবিষ্যতের মুখোমুখি হতে হয়েছে বারবার। হিউম্যান কোরিওনিক গোনাডাট্রোপিন নামক মানব হরমোন শনাক্তকরণের মাধ্যমে আজকাল স্বল্পতম সময়ে নির্ভুল গর্ভ পরীক্ষা করা সম্ভব হয়েছে।
জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ৩২ লাখ শিশু জন্মগ্রহণ করে । এ ছাড়া হিসাব করে বের করা হয়েছে যে কিশোরী অবস্থা থেকে নারীদের প্রজনন বয়ঃসীমার শেষ প্রান্ত পর্যন্ত সব নারীকে সেবা দেওয়ার জন্য বাংলাদেশে এখনো পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যকর্মী বা মিডওয়াইফ ব্যবস্থার উপর নির্ভর করা যায়নি।
গবেষণা জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশে গর্ভধারণ জটিলতায় প্রতি বছর ২০ হাজারেরও বেশি নারী মারা যায়। গর্ভধারণকালে যথাযথ পরিচর্যায় রাখা হয় না বলেই এমনটি ঘটে থাকে । গবেষণায় দেখা গেছে, তিনবার গর্ভকালীন সেবার মধ্যে মাত্র একবার প্রসবপূর্ব সেবা গ্রহণ করে গর্ভবতীদের ৫০ ভাগ। ২০ ভাগ মাত্র তিনবারের কোর্স পূর্ণ করেন। সন্তান জন্ম হলেই ধরে নেওয়া হয় ভয়ের সময়টা চলে গেছে। প্রসূতির চিকিৎসাও শেষ। প্রসব পরবর্তী চিকিৎসা নেন না অনেকেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জরিপে বলা হয়েছে, মোট মারা যাওয়ার শতকরা ৮০ জন প্রসূতি প্রসবকালে মারা যান গ্রাম্য ধাত্রীদের হাতেই।
সন্তান হওয়ার পর মায়ের দৈনন্দিন রুটিন বদলে যায়। দিন-রাত পুরোটা সময়ই দিতে হয় তাকে। মনে হয়, তাঁর জীবন বুঝি শোবার ঘরে বন্দী হয়ে গেল। বিশেষ করে প্রথম সন্তান হওয়ার পর একধরনের বিষণ্নতায় পেয়ে বসে বেশিরভাগ মাকে। এই বিষাদগ্রস্ততাকে বলে ‘পোস্ট পাটাম যদিও যে কোন নারীর চিরন্তন পরিচয় ‘মা’ এবং মা পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরতম শব্দ। মাতৃত্বের মধ্য দিয়ে বংশানুক্রম ধারা টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব বর্তায় মায়ের ওপরই। আর নারীর পূর্ণতাও আসে মাতৃত্বে। একথা অনস্বীকার্য যে, একজন মায়ের গর্ভকালীন সুস্থতাই পারে একটি সুন্দর ও সুস্থ শিশু জন্ম দিতে। কিন্তু বাস্তবতা বড়ই নিষ্ঠুর। নির্মম।
পরিসংখ্যানে জানা যায়, প্রতিবছর সারা বিশ্বে প্রায় ২১ কোটি নারী গর্ভবতী হয়। এর দুই কোটিরও বেশি গর্ভজনিত স্বাস্থ্য সমস্যায় ভোগেন এবং আশি লাখের জীবনাশঙ্কা দেখা দেয়। এখনও আমাদের দেশে প্রতি ১ লাখ জীবিত জন্মে ১৭২ জন নবজাতকের মৃত্যু ঘটছে। প্রসবকেন্দ্রিক মোট ‘মাতৃমৃত্যুর ৭৩ শতাংশ ঘটছে প্রসব পরবর্তী সময়ে। আর প্রথম ২৪ ঘণ্টাতেই মারা যায় মোট মাতৃমৃত্যুর ৫৬ শতাংশ । দেশে গর্ভপাতও বাড়ছে উল্লেখযোগ্য হারে। এখনও বাড়িতে প্রসব হচ্ছে ৫৩ শতাংশ প্রসূতির। প্রতিদিন মারা যাচ্ছে ১৫ জন প্রসূতি । গরিব, অসচ্ছল জনগণের মধ্যে জটিলতায় ভোগার আশঙ্কা বেশি। মূলত গর্ভকালীন জটিলতা, দক্ষ স্বাস্থ্যসেবার অভাব, প্রয়োজনীয় যত্ন ও পুষ্টির অভাব, পরিবারের অসচেতনতা, প্রসব পরবর্তী অসচেতনতা, প্রসব পরবর্তী সেবাযত্নের অপ্রতুলতা ইত্যাদি একজন মাকে ঠেলে দিচ্ছে সীমাহীন অনিশ্চয়তা, দুর্ভোগ আর কষ্টের মুখে। সঙ্গে সঙ্গে গর্ভজাত সন্তানটিও পড়ছে ঝুঁকির মধ্যে।
ঝুঁকি মোকাবিলায় জন্য এখন বিশ্বব্যাপী সমাদৃত পেশা মিডওয়াইফারি। নার্সিং পেশার আদলে কেবল গর্ভ ও মাতৃত্বকালীন স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিতকরণেই এই পেশার উদ্ভব। এই পেশার কর্মপরিধি রয়েছে। তৃণমূল পর্যায়ে বসবাসরত দম্পতিদের সন্তান গ্রহণের প্রস্তুতি সম্পর্কে শিক্ষাদান করা। গর্ভকালীন জটিলতা নির্ণয় করাসহ গর্ভকালীন সময়ে প্রয়োজনীয় শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা। যেমন, রক্তের গ্রুপ, রক্তচাপ, রক্ত স্বল্পতা, রক্তে সুগার ও এলবুমিন পরীক্ষা, গর্ভস্থ শিশুর অবস্থান নির্ণয় ইত্যাদি। রোগ প্রতিষেধক টিকা যেমন, টিটেনাস টক্সয়েড (টি টি), হেপাটাইটিস বি ভাইরাস দেওয়া।
ঝুঁকিপূর্ণ গর্ভ সনাক্ত ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা। নবজাতককে মাতৃদুগ্ধ পানের কৌশল সম্পর্কে মাকে অবহিত করা। অস্বাভাবিক রক্তক্ষরণের কারণ নির্ণয় ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা। প্রি-একলাম্পসিয়া নির্ণয় করা ও দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা। সুষম খাবার সম্পর্কে জ্ঞান দান। প্রসবকালীন সময়ে পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা। বিলম্বিত প্রসব ও বাধাগ্রস্ত প্রসব সনাক্ত করাসহ তাৎক্ষণিক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা। পার্টোগ্রাফ ব্যবহারের মাধ্যমে প্রসবের অগ্রগতি ও গর্ভস্থ শিশুর শারীরিক অবস্থা দ্রুত পরীক্ষা করা যেমন, অক্সিজেনের স্বল্পতা নিরূপণ, জন্মগত ত্রিটি নির্ধারণ করা ও ওজন নেওয়া।
কম ওজনের শিশুকে ক্যাঙ্গারু কেয়ার দেওয়া। প্রসবোত্তর মায়ের শারীরিক অবস্থা পর্যকেবক্ষণ যেমন: রক্তপাত, রক্তচাপ, তাপমাত্রা, নাড়ী ও শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি পরীক্ষা ও রেকর্ড করা। নবজাতককে মাতৃদুগ্ধ পান নিশ্চিত করা। প্রসবজনিত প্রজননতন্ত্রের ইনজুরি সেলাই ও ড্রেসিং করা। পোষ্ট-একলাম্পসিয়া নির্ণয় ও যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা। প্রসবোত্তর সময়ে মায়েদের প্রজননতন্ত্রের সংক্রমণসহ অন্যান্য জটিলতা নিরূপণ ও ব্যবস্থা গ্রহণ করা। জটিল কেসসমূহ নির্ধারিত স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সঠিকভাবে রেফার করা। দম্পতিদের পরিবার পরিকল্পনা সম্পর্কে পরামর্শ প্রদান করা। মা ও শিশুস্বাস্থ্য বিষয়ে স্বাস্থ্যশিক্ষা প্রদান করা। দুর্যোগকালীন সময়ে গর্ভবতী মাকে নিরাপদ স্থানে স্থানান্তর ও মেন্টাল সাপোর্ট প্রদান করা। দুর্যোগজনিত কারণে সৃষ্ট জটিলতা নিরূপণ ও তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা ইত্যাদি।
নিরাপদ মাতৃত্বের অধিকার আজ বিশ্বব্যাপী নারীর একটি মৌলিক অধিকার হিসেবেই স্বীকৃত। উন্নত সকল দেশেই বাধ্যতাম‚লকভাবেই প্রদান করা হয় নারীর এই অধিকার। এজন্যে রয়েছে যথাযথ নজরদারীর ব্যবস্থাও। বাংলাদেশেও এই নতুন পেশার উদ্ভব ঘটানো হয়েছে। তদারকি হচ্ছে যথাযথ। কর্মপরিধিও সুনির্দিষ্টকরণ করা হয়েছে। সুফলও মিলেছে। এই কারণে, ২০১১ সালে জাতিসংঘের ৬৬তম সাধারণ অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে মা ও শিশু স্বাস্থ্যে অসামান্য অবদানের জন্য ডিজিটাল হেলথ ফর ডিজিটাল ডেভেলপমেন্ট শীর্ষক ‘সাউথ-সাউথ’ পুরস্কার প্রদান করা হয়।এর আগেও মা ও শিশু মৃত্যু হ্রাসের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করায় জাতিসংঘ কর্তৃক এমডিজি অ্যাওয়ার্ড-২০১০ অর্জন করে বাংলাদেশ।
চতুর্থ স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি সেক্টর কর্মসূচি এর লক্ষ্যমাত্রার অন্যতম উদ্দেশ্য মাতৃমৃত্যু হার প্রতি এক লক্ষ জীবিত জন্মে ১৭২ হতে কমিয়ে ১২১ এর নিচে নামিয়ে আনা। ২০২২ সালের মধ্যে এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রশিক্ষিত সেবাদানকারী দ্বারা আন্তরিকতা ও সম্মানের সাথে মায়েদের গর্ভকালীন চেকআপ বাড়ানো এবং দক্ষ জন্ম সহায়তাকারী দ্বারা প্রসবের হার বাড়ানোর লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই উদ্দেশ্যে সরকার জেলা, উপজেলা এবং ইউনিয়ন পর্যায়ের সেবাকেন্দ্র হতে প্রশিক্ষিত সহায়তাকারী দ্বারা প্রসবের জন্য সেবাকেন্দ্র শক্তিশালীকরণ সহ ২০,০০০ মিডওয়াইফ প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছে। ইউনিয়ন পর্যায়ের সেবা কেন্দ্রগুলো ২৪ ঘণ্টা ডেলিভারী সেবা প্রদানের ও যথাযথ তথ্য প্রদানের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে।
এই চ্যালেঞ্জকে সামনে রেখে জাতীয় ৭ম পঞ্চ বার্ষিক পরিকল্পনা ও রূপকল্প ২০২১ এর আলোকে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় ৪র্থ স্বাস্থ্য সেক্টর কর্মসূচি (২০১৭-২২) বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। এতে মাতৃস্বাস্থ্য ও নবজাতকের স্বাস্থ্যের উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে। সর্বোচ্চ গুণগত মান বজায় রেখে সেবার পরিধি বৃদ্ধির লক্ষ্যে নতুন হাসপাতাল নির্মাণ, শয্যা সংখ্যা বৃদ্ধি, চিকিৎসক, নার্স, মিডওয়াইফ ও অন্যান্য জনবল নিয়োগ দেয়া হয়েছে। হচ্ছে। মা ও শিশু স্বাস্থ্যের উন্নয়ন দেশ ও জাতীয় উন্নয়নের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
সরকার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে প্রসবপূর্ব, প্রসবকালীন, প্রসব পরবর্তী ও নবজাতকের পরিচর্যার উন্নয়নে জরুরি প্রসূতি সেবা কর্মসূচি ও নিরাপদ প্রসব নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ৩ বৎসর মেয়াদী ‘মিডওয়াইফারি কোর্স’ চালু করেছে। নবজাতকের জন্য ‘জাতীয় নবজাতক স্বাস্থ্য কর্মসূচি’ বাস্তবায়িত হচ্ছে। সেবা প্রদানে মায়ের অনুভূতি, পছন্দ, গোপনীয়তা, ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া, বৈষম্যহীন আন্তরিক সেবা, জরুরি প্রয়োজনীয় সেবা প্রাপ্তি এবং অবাধ তথ্য প্রদান খুবই গুরুত্বপূর্ণ যা প্রতিটি মায়ের মৌলিক অধিকার। এই অধিকারকে সমুন্নত রাখতে পারাটাই বড় চ্যালেঞ্জ।
মিডওয়াইফের দায়িত্ব শুধু স্বাস্থ্য কেন্দ্রে নিরাপদ প্রসবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। মা ও শিশুর পুষ্টি ও রোগ প্রতিরোধ টিকা সম্পর্কে এমনকি পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি এবং প্রজনন স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধিতে প্রশিক্ষিত মিডওয়াইফগণ আন্তরিকভাবে কাজ করলে নির্ধারিত চ্যালেঞ্জ, সফলভাবে উৎরে যাওয়া সম্ভব। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, স্বাভাবিক প্রসব পরিচালনা করতে হলে সারাদেশে ২২ হাজার মিডওয়াইফ প্রয়োজন। এখন পর্যন্ত ৫ হাজার প্রশিক্ষিত হয়ে পদায়িত হয়েছেন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ও সাব- সেন্টারে। প্রশিক্ষণোত্তর পূর্ণাঙ্গ সহায়তা ও পুনঃপ্রশিক্ষণের ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মিডওয়াইফদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে দেশব্যাপী প্রাথমিক সেবা পর্যায়ে, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণকেন্দ্রে। প্রয়োজনের নিরিখে বণ্টন এবং কর্মস্থলে অবস্থান নিশ্চিত করা। দেখা গেছে স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানসমূহে মিডওয়াইফরা সিনিয়র স্টাফ নার্স বা যেকোনো সাধারণ নার্সের মতো দায়িত্ব পালন করছেন। অর্থাৎ, তাঁদের পেছনে বিনিয়োগ ও অর্জিত দক্ষতা কাজে লাগানো হচ্ছে না। মিডওয়াইফদের জন্মসংশ্লিষ্ট কাজে আত্মনিয়োগের নিশ্চয়তা নিশ্চিত করতে হবে।
আমাদের মিডওয়াইফারি ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির দুর্বলতা কাটাতে হবে। যেহেতু চিকিৎসা একটি জরুরি বিষয় তাই এ ক্ষেত্রের মিডওয়াইফকে প্রশিক্ষণ, পদায়ন, কার্যক্রম প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ এবং দ্রুত বাস্তবায়নের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। নিবিড় পর্যবেক্ষণ, মনিটরিং এবং ফলোআপ পদ্ধতিতে আরও আধুনিক এবং বাস্তবসম্মত করতে হবে। সৎ, দেশপ্রেমিক, আন্তরিক, দায়বদ্ধ, দক্ষ মিডওয়াইফারি ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে।
সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা এর সফলতার ধারাবাহিকতা রক্ষার স্বার্থে বাংলাদেশকে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে ইতোমধ্যে পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। নিরাপদ মাতৃত্ব ও প্রসবকালীন স্বাস্থ্য সচেতনতা নিয়ে প্রতিবছর ২৮ মে বিশ্বব্যাপী ‘আন্তর্জাতিক নারী স্বাস্থ্য দিবস’ হিসেবে ১৯৮৭ সাল থেকে ‘নিরাপদ মাতৃত্ব দিবস’ পালিত হয়ে আসছে। মাতৃস্বাস্থ্যের প্রতি গুরুত্ব ও এর কার্যকরিতা অনুধাবন করে ১৯৯৭ সাল থেকে বাংলাদেশেও যথাযথভাবে নিরাপদ মাতৃত্ব দিবস হিসেবে পালন করা শুরু হয়।
প্রতিবারই একটি করে গুরুত্বপূর্ণ, জনগুরুত্বের প্রতিপাদ্য বিষয় থাকে। কেবল বিষয় নয়, সহানুভূতি ও সহযোগিতার মাধ্যমে নিরাপদ মাতৃত্ব দিবসে সবার মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো গেলেই সফল হবে এই দিবস পালনের মূল উদ্দেশ্য। মায়েদের অধিকার নিশ্চিত হয়ে নিরাপদ মাতৃত্ব দিবস পালন সার্থক হবে।লেখকঃ খন রঞ্জন রায়,সমাজচিন্তক, গবেষক ও সংগঠক।



