রানা চক্রবর্তী: শাহ মোহাম্মদ সগীর মধ্যযুগের একজন শক্তিশালী কবি ছিলেন। সেকালে প্রচলিত ফার্সি ভাষার বিখ্যাত প্রণয়কাব্য ইউসুক-জোলেখার বিষয়বস্তু অবলম্বন করে তিনি বাংলা ভাষায় ‘ইউসুফ-জোলেখা’ কাব্যটি লিখেছিলেন। সগীরের আবির্ভাবকাল নিয়ে এখনও পর্যন্ত গবেষকদের মধ্যে যথেষ্ট বিতর্ক রয়েছে।
ডঃ মুহম্মদ এনামুল হক অভিমত প্রকাশ করেছিলেন যে, মোহাম্মদ সগীর সুলতান গিয়াসুদ্দীন আজম শাহের (১৩৯০-১৪১০ খৃষ্টাব্দ) পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেছিলেন। তিনি-“চট্টগ্রামের পুঁথির সহিত মিলাইয়া ত্রিপুরার খণ্ডিত পুঁথির পত্র হইতে কবির যে আত্মৰিবরণী” – তৈরি করেছিলেন, সেটাকে ১৯৫১ সালের ‘মাহে-নও’ নামক পত্রিকায় প্রথমে প্রকাশিত করেছিলেন। এরপরে তিনি তাঁর ‘মুসলিম বাঙ্গালা সাহিত্য’ গ্রন্থে সেই আত্মবিবরণীর অসংশোধিত অবিকল পাঠ ও আলোকচিত্র প্রকাশ করেছিলেন। সগীরের ওই আত্মবিবরণীর নিম্নোদ্ধৃত ছত্রগুলি থেকে ডঃ হক তাঁর পূর্বোক্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিলেন—
“রাজা রাজ্যেশ্বর মধ্যে ধার্মিক পণ্ডিত।
দেব অবতার নৃপ জগৎ বিদিত॥
মনুষ্যের মধ্যে যেহ্ন ধর্ম অবতার।
(পুঁথির মূল বানানে পাঠ- মনুষ্যের মৈদ্ধে যেহ্ন ধৰ্ম্ম অবতার।)
মহা নরপতি গ্যেছ পৃথিবীর সার॥
(পুঁথির মূল বানানে পাঠ-মহা নরপতি গ্যেছ পিরথিস্বীর সার॥)
ঠাঁই ঠাঁই ইচ্ছে রাজা আপনা বিজয়।
পুত্র শিষ্য হন্তে তিই মাগে পরাজয়॥
মহাজন বাক্য ইহ পূরণ করিআ।
লইলেন্ত রাজ্যপাট বঙ্গাল গৌড়িআ॥
করুণা হৃদয় রাজা পুণ্যবন্ত ওর।
সবগুণে অসীম অতুল মনোহর॥
পূর্ণিমার চান্দ জনি বদন সুন্দর।
মধুর মধুর বাণী কহন্ত সুন্দর॥
রমণীবল্লভ নৃপ রসে অনুপমা।
কনে বা কহিতে পারে সে গুণ মহিমা॥
…
মোহাম্মদ সগীর তান আজ্ঞাক অধীন।
তাহান আছুক যশ ভুবন এ তিন॥”
উপরোক্ত অংশটি পাঠ করলে বুঝতে পারা যায় যে, এই ছত্রগুলির মাধ্যমে কোন একজন শাসকের বন্দনা করা হয়েছিল; এবং শেষ দুই ছত্রের ভাষা থেকে মনে হয় যে, সেই শাসক সগীরের সমসাময়িক এবং তাঁর পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। অতীতে ডঃ এনামূল হক জানিয়েছিলেন যে, উদ্ধত অংশের চতুর্থ ছত্রের – “নরপতি গ্যেছ” – শব্দদ্বয়ের অর্থ হল-‘গ্যেছ’ নামক কোন শাসক এবং সেই ‘গ্যেছ’ = গিয়াস = সুলতান গিয়াসুদ্দীন আজম শাহ।
ইতিহাস বলে যে, সুলতান গিয়াসুদ্দীন আজম শাহ তাঁর পিতাকে যুদ্ধে পরাজিত ও নিহত করে গৌড়বঙ্গের সুলতানি মসনদ অধিকার করে নিয়েছিলেন। উদ্ধৃত অংশের পঞ্চম থেকে অষ্টম ছত্রে সেকথারই ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে বলে ডঃ হক তাঁর নিজের অভিমত প্রকাশ করেছিলেন।কিন্তু বর্তমান সময়ের গবেষকরা তাঁর এই মতের সাথে সহমত পোষণ করতে পারেননি, এই প্রসঙ্গে তাঁদের বক্তব্য নিম্নরূপ-(ক) বর্তমান সময়ের গবেষকদের মতে-“মহা নরপতি গ্যেছ পৃথিবীর সার” – এই চরণটিতে থাকা ‘গ্যেছ’ শব্দটি কোন একজন শাসকের নাম হিসেবে, বিশেষ করে একজন কবির পৃষ্ঠপোষক শাসকের নাম হিসাবে আদৌ গ্রহণ করা চলে কিনা, সেটা রীতিমত বিতর্কের বিষয়। কারণ-পৃষ্ঠপোষক শাসকের নামকে এরকম সংক্ষেপে ও বিকৃতভাবে কোনক্রমে মাত্র এক জায়গায় উল্লেখ করাটা সেযুগের নিরিখে রীতিমত অস্বাভাবিক ব্যাপার বলেই মনে হয়।
(খ) অতীতে এই শব্দটি আদৌ – ‘গ্যেছ’-গোছের কিছু ছিল কিনা, সেটাও রীতিমত সংশয়ের বিষয়। কারণ-‘যেহ্ন’ ‘যেহ’ প্রভৃতি শব্দও লিপিকর-প্রমাদে ‘গ্যেছ’ শব্দে রূপান্তরিত হতে পারে, অথবা পুঁথির অস্পষ্ট অক্ষরের জন্য ঐসব শব্দকে কেউ ভুল করে ‘গ্যেছ’-রূপেও পড়তে পারেন। বরং ‘গ্যেছ’-এর জায়গায় ঐ শব্দগুলি চরণটির মধ্যে সার্থকতরভাবে নিজেদের জায়গা করে নিতে পারে। মোটের উপরে ‘গ্যেছ’ -এই ছোট্ট শব্দটির মধ্যেসুলতান গিয়াসুদ্দীন আজম শাহের নাম আবিষ্কার করতে হলে আরও জোরালো কোন ঐতিহাসিক প্রমাণের দরকার রয়েছে।
(গ) এই প্রসঙ্গে একথাও উল্লেখ্য যে, অতীতে ডঃ এনামুল হক ইউসুফ-জোলেখার পুঁথির যে আলোকচিত্রগুলি প্রকাশিত করেছিলেন, তাতে ‘গ্যেছ’ শব্দটিকে ম্যাগনিফাইং লেন্স ব্যবহার করেও পরবর্তী সময়ের গবেষকরা স্পষ্টভাবে পড়তে পারেননি।
(ঘ) “ঠাঁই ঠাঁই ইচ্ছে রাজা আপনা বিজয়” থেকে শুরু করে “লইলেন্ত রাজ্যপাট বঙ্গাল গৌড়িআ” পর্যন্ত চরণগুলিতে সুলতান গিয়াসুদ্দীন আজম শাহের তাঁর পিতাকে যুদ্ধে পরাজিত করে রাজ্য অধিকার করবার প্রসঙ্গটি পরোক্ষভাবে উল্লেখিত হয়েছিল বলে ডঃ হক তাঁর অভিমত প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু বর্তমান সময়ের গবেষকদের মতে এই চরণগুলির স্বাভাবিক ব্যাখ্যা হচ্ছে যে-এগুলির মাধ্যমে সেকালের এমন একজন শাসকের কথা বলা হয়েছিল, যিনি মহাজন-বচন সার্থক করে প্রথমে নিজের পুত্র বা শিষ্যের কাছে যুদ্ধে পরাজিত হয়েছিলেন এবং পরে অন্যদের পরাজিত করে গৌড় ও বঙ্গের রাজ্য অধিকার করতে পেরেছিলেন।
(ঙ) এখনও পর্যন্ত সগীরের কাব্যের যতটুকু অংশ মুদ্রিত আকারে প্রকাশিত হয়েছে, সেটির ভাষা থেকেও সগীরকে অতটা প্রাচীন বলে মনে হয় না।
(চ) অতীতে অধ্যাপক সুলতান আহমদ ভূঁইয়া দেখিয়ে দিয়েছিলেন যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুঁথিশালায় রক্ষিত ইউসুফ-জোলেখার একটি প্রাচীন পুঁথিতে কাব্যের কাহিনীর মধ্যে সেটির অন্যতম চরিত্র রাজা তৈমুসের গুণ-বর্ণনা প্রসঙ্গে লেখা হয়েছিল-
“মনুস্যের মৈদ্ধে জেন ধৰ্ম্ম অবতার
মোহা মোহা নরপতি পৃথিহ্মির সার॥
…
রাজা রাজেশ্বর মোহা ধার্ম্মিক পণ্ডিত।
দেব অবতার নৃপ জগত বিদিত॥
…
করুণা হৃদএ রাজা পুণ্য ততপর।
সর্বগুণে অসীম অতুল মেনোহর॥
পুন্নিমার চন্দ্র জিনি বদন সোন্দর।
মধুর মধুর বানি কহে মৃদুশ্বর॥
রমনি বল্লব নৃপ রসে নিউপমা।
কনে বা কহিতে পারে সে গুন মহিম॥”
এই ছত্রগুলিই আবার ডঃ এনামুল হক কর্তৃক প্রকাশিত সগীরের পূর্বোক্ত রাজবন্দনার মধ্যে প্রায় অবিকলভাবে পাওয়া যায়, তাতে শুধু দু’-একটি শব্দমাত্র পরিবর্তিত হয়েছে বলে দেখা যায়। অতীতে এভাবেই অধ্যাপক ভূঁইয়া সগীরের রাজবন্দনার ঐতিহাসিক প্রামাণিকতা সম্বন্ধে-তাঁরই ভাষায়-“ঘোরতর সন্দেহের অবকাশ”- সৃষ্টি করেছিলেন। এরপরে অধ্যাপক সুলতান আহমদ ভূঁইয়া ‘নও বাহার’ পত্রিকার চতুর্থ বর্ষের পঞ্চম সংখ্যার ২২৫-২২৮ নং পৃষ্ঠায় প্রকাশিত একটি প্রবন্ধে লিখেছিলেন—
“শাহ মোহাম্মদ সগীরের কাব্যে আমরা যে সমস্ত ভনিতা পাই তাহাতে দেখা যায় যে, কবি ইহা ফারসী কোনও কিতাব দেখিয়া রচনা করিয়াছেন। পারস্য সাহিত্যের ইতিহাসে আমরা দেখিতে পাই যে, মহাকবি ফেরদৌসী এবং মোল্লা আবদুর রহমান জামী (১৪১৪-৯২ খ্রীঃ) ‘য়ুসুফ জোলেখা’ নামীয় কাব্য যথাক্রমে একাদশ ও পঞ্চদশ শতাব্দীতে রচনা করিয়াছেন। … ফেরদৌসী, জামী ও সগীরের কাব্য আলোচনা করিয়া আমার এই ধারণা বদ্ধমূল হইয়াছে যে, সগীরের কাব্যখানি জামীর কাব্যের অনুকরণে রচিত; ফেরদৌসীর কাব্যের কোন প্রভাব তাহার কাব্যে নাই। সুতরাং জামীর ‘য়ুসুফ জোলেখা’ কাব্য রচনার (রচনাকাল-৮৮৮ হিঃ = ১৪৮৩ খৃঃ, দ্রষ্টব্যঃ-Literary History of Persia – E. G. Brown, Vol. III, page– 516) অন্ততঃপক্ষে একশত বৎসর পরে আমাদের বঙ্গাল দেশের কবি শাহ মোহাম্মদ সগীর তাঁহার ‘য়ুসুফ জোলেখা’ কাব্য প্রণয়ন করিয়াছিলেন, ইহা সহজেই অনুমেয়। কাজেই খুব নেক নজরে দেখিলেও শাহ মোহাম্মদ সগীরকে কিছুতেই ষোড়শ শতাব্দীর শেষ পাদের পূর্বে ফেলা যায় না।”
তারপরে অধ্যাপক সুলতান আহমদ ভূঁইয়া রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত ‘সাহিত্যিকী’ পত্রিকার ১৩৭৬ বঙ্গাব্দের শরৎ সংখ্যায় এবিষয়ে বিস্তৃতভাবে আলোচনা করেছিলেন এবং সগীর ও জামীর কাব্যের তুলনামূলক আলোচনা করে তাঁর নিজের সিদ্ধান্তকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।
বর্তমান সময়ের গবেষকদের মতে, সগীর যে খুব একটা আধুনিকযুগের কবিও ছিলেন না, সেকথা তাঁর কাব্যের ভাষা থেকেই পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারা যায়। মোটামুটিভাবে বিচার করলে তিনি ১৬০০ খৃষ্টাব্দের কাছাকাছি সময়ে ইউসুফ-জোলেখা কাব্যটি রচনা করেছিলেন বলে মনে করা যেতে পারে।
এছাড়া অতীতে শেখ এ. টি. এম রুহুল আমীন ১৩৭১ বঙ্গাব্দের শ্রাবণ সংখ্যার ‘মাসিক মোহাম্মদী’ পত্রিকায় প্রকাশিত একটি প্রবন্ধে সগীর সম্বন্ধে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করেছিলেন বলে দেখতে পাওয়া যায়। তাঁর মতে-‘সগীর’ নামটি ভুল, কবির আসল নাম ছিল-‘সগিরি’ (যা কাব্যটির অনেক পুঁথিতে পাওয়া যায়)। আমীন তাঁর সেই প্রবন্ধে ‘সগিরি’ নামের ব্যুৎপত্তি সম্বন্ধে এবং আলোচ্য কবির বংশপরিচয় ও পৃষ্ঠপোষক সম্বন্ধে অনেক নতুন কথা লিখেছিলেন। কিন্তু যেহেতু তাঁর আলোচনার ভিত্তি প্রধানতঃ কিংবদন্তীর উপরে প্রতিষ্ঠিত ছিল, সেহেতু সেইসব কিংবদন্তীর সমর্থনে যথেষ্ট পরিমাণে ঐতিহাসিক তথ্য-প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত তাঁর সিদ্ধান্তগুলিকে বর্তমান সময়ের গবেষকরা গ্রহণ করতে রাজি হননি।লেখক: রানা চক্রবর্তী, বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট



