ড. আতিউর রহমান: আজ ১৭ মার্চ। বাংলাদেশের আরেক নাম জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১০৪তম জন্মবার্ষিকী। তিনি নিজে কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর জন্মদিন পালনের পক্ষে ছিলেন না। জেলে থাকার সময় পরিবারের পক্ষ থেকে বেশি করে উন্নততর খাবার নিয়ে যেতেন তাঁর স্ত্রী ও সন্তানরা।

সেই খাবার তিনি অন্যান্য রাজনৈতিক সহযোগী জেলবাসী ও তাঁকে সহায়তা করতেন যেসব কয়েদি তাঁদের সঙ্গে ভাগ করে খেতেন। জেলে থাকা তাঁর কর্মী ও রাজনৈতিক সহযোগীরা সেদিন সকালে তাঁকে ফুল পাঠাতেন জন্মদিনের শুভেচ্ছা হিসেবে। জেলের বাইরে থাকার সময় খুবই সাদামাটাভাবে পারিবারিক পরিবেশে তাঁর জন্মদিন পালন করা হতো। তাই ১৯৭১ সালে অসহযোগ আন্দোলন চলাকালে ১৭ মার্চ বিদেশি সাংবাদিকরা যখন তাঁকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানান, তখন তিনি খানিকটা অবাকই হয়েছিলেন।

কেননা তখন তাঁর হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছিল বাংলাদেশের দুঃখী মানুষের অকালে প্রাণ ঝরে যাওয়ার দুঃখে। আর তিনি তো জানতেন ইয়াহিয়া-মুজিব সংলাপ তখন কোন পথে এগোচ্ছিল। সামনে এ দেশের মুক্তিকামী সাধারণ মানুষের কপালে কী আছে, তা-ও তিনি অনুমান করতে পেরেছিলেন। তাইতো বিদেশি সাংবাদিকদের শুভেচ্ছার জবাবে বলেছিলেন, ‘১৯২০ সালের ১৭ মার্চ আমার জন্মদিন।

আমি জীবনে কখনো আমার জন্মদিন পালন করিনি। আপনারা আমার দেশের মানুষের অবস্থা জানেন, তাদের জীবনের কোনো নিরাপত্তা নেই। যখন কেউ ভাবতেও পারে না মরার কথা, তখনো তারা মরে।…আমার আবার জন্মদিন কি, মৃত্যু দিবসই বা কি? আমার জীবনই বা কি?… আমার জনগণই আমার জীবন।’

জনগণের সঙ্গে ছিল তাঁর আত্মার সম্পর্ক। তাদের দুঃখে তিনি দুঃখী হতেন। তাদের সুখে সুখী হতেন। আর শুধু স্বপ্ন দেখতেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার এবং দেশের সব মানুষের সার্বিক মুক্তির। জীবন-ঘষে জ্বলে ওঠা এই নান্দনিক নেতৃত্ব একদিনেই গড়ে ওঠেনি। ছাত্রজীবন থেকেই পণ করেছিলেন এ দেশের কৃষক-শ্রমিকসহ সাধারণ মানুষের দুঃখ নিবারণ করবেন। সেই আশায় পাকিস্তান আন্দোলনে যোগ দিলেও ১৯৪৭ সালেই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন সে ছিল ‘ভ্রান্ত প্রত্যুষ’। তাই শুরু করলেন গণতান্ত্রিক যুব লীগ, পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ ও আওয়ামী মুসলিম লীগ গড়ে তোলার নব রাজনৈতিক যাত্রা।

১৯৪৮ সালে বাংলা ভাষার মর্যাদার ওপর আঘাত এলে ছাত্র ও শিক্ষকদের নিয়ে শুরু করলেন ভাষা আন্দোলন। এই পর্বের ভাষা আন্দোলনের শুরুতেই তিনি এর নেতৃত্বে চলে এসেছিলেন। অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে রাজনীতির যে ভূমিকা, সেটিই তাঁকে রাজনৈতিক আন্দোলনে যুক্ত করতে উৎসাহ জুগিয়েছিল। তাই তরুণ রাজনীতিক হিসেবেও তিনি অর্থনৈতিক মুক্তির প্রশ্নে ছিলেন আপসহীন। ফলে জমিদারি থেকে কৃষক-প্রজাদের রক্ষা করতে যেমন পাকিস্তান আন্দোলন করেছেন, তেমনি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ায় হতাশ হয়ে বসে না পড়ে নতুন উদ্যমে সংগ্রাম করেছেন পূর্ব বাংলার মানুষের অর্থনৈতিক দাবিদাওয়াকে সামনে রেখে। শ্রমজীবী কৃষকদের ‘দাওয়াল’ আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। বিনা ক্ষতিপূরণে জামিদারি প্রথা উচ্ছেদ করে প্রজাদের জমির প্রকৃত মালিক বানানোর দাবিতে ছিলেন অটল। তাই তরুণ বয়সেই জাতীয় পর্যায়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতার মর্যাদা অর্জন করেছিলেন। হতে পেরেছিলেন বাঙালির প্রধানতম মুখপাত্র। মুক্তির অগ্রদূত।

বঙ্গবন্ধুর অর্থনৈতিক মুক্তিসংগ্রামের পরের পর্ব হিসেবে দেখা যায় ভাষা আন্দোলন-পরবর্তী কালকে। এ সময় ইস্যুভিত্তিক আন্দোলনের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থ নিয়ে ভাবতে শুরু করেছেন বঙ্গবন্ধু। মনে মনে ছক কেটেছেন দেশ চালানোর দায়িত্ব পেলে কী করবেন। তাঁর লেখা ‘আমার দেখা নয়া চীন’ বইটির পাতায় পাতায় স্থান পেয়েছে তাঁর সেসব অগ্রসর চিন্তা। গণমুখী রাষ্ট্রনীতি কেমন হওয়া উচিত, রাজনৈতিক নেতাদের জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা কেমন হওয়া উচিত-এসব বিষয়ও তাঁর ভাবনাজগতে এ সময় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মাঠে-ময়দানে তাঁর তৎপরতা, সংসদে তাঁর বক্তৃতা এবং তাঁর নিজের লেখালেখিতেও এটি স্পষ্ট হয়ে ধরা পড়ে। আর পাকিস্তানি গোয়েন্দাদের প্রতিবেদনগুলো থেকে বোঝা যায় পাকিস্তানি অপশাসকরাও অন্যদের তুলনায় বঙ্গবন্ধুর এমন অর্থনৈতিক সংবেদনশীলতাকে ক্রমেই তাঁদের জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখতে শুরু করেছিলেন।

১৯৫৪ সালে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে বাঙালির যুক্তফ্রন্টের বিজয়ে বঙ্গবন্ধুকে তাই দেখা যায় অন্যতম প্রধান নিয়ামকের ভূমিকায়। বাঙালির ওই বিজয় দীর্ঘস্থায়ী না হলেও পুরো দশকেই বঙ্গবন্ধু পূর্ব বাংলার মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির প্রশ্নটিতে আপসহীন থেকে নিজের ও তাঁর দলের রাজনৈতিক কর্মসূচিকে এগিয়ে নিয়েছেন।

দুই দফা মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে এবং সংসদে সোচ্চার ভূমিকা রেখে তিনি ঠিকই বুঝে নিয়েছিলেন যে সে সময় বিদ্যমান ব্যবস্থায় তিনি যেমন অর্থনৈতিক মুক্তি পূর্ব বাংলার মানুষের জন্য চাইছেন, তা সম্ভব হবে না। তাই এ সময়টায় ধীরে ধীরে এই ভূখণ্ডের স্বায়ত্তশাসনের বিষয়টিকে রাজনীতির কেন্দ্রেই আনতে শুরু করেন বঙ্গবন্ধু। ফলে তাঁকেই প্রধান শত্রু গণ্য করে জেলে পাঠানো হয় পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই। নানাভাবে হেনস্তা করেও বঙ্গবন্ধুকে আপস করানো যায়নি, বরং জেলে বসেই ছক কেটেছেন কেমন করে বাঙালির অর্থনৈতিক মুক্তির সনদ তৈরি করা যায়।

বঙ্গবন্ধুর গুরু সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুর পর তিনি যখন পূর্ব বাংলার প্রধানতম নেতা হয়ে উঠলেন, তখন স্বায়ত্তশাসনের রূপরেখা হিসেবে হাজির করলেন ঐতিহাসিক ছয় দফা কর্মসূচি। সারা পূর্ব বাংলা ঘুরে বেড়িয়েছেন জনগণকে ছয় দফার মর্মবাণী বোঝাতে। তখন তিনি প্রায়ই গ্রেপ্তার হতেন। জামিন পেয়েই আবার ছয় দফার কথা জোর গলায় বলতে থাকতেন। আবার জেলে। আবার জামিন। ফের জেল। সে যেন ‘সাপলুডুর’ লড়াই। তাই তাঁকে সরিয়ে দিতে চূড়ান্ত তৎপরতা হিসেবে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার চেষ্টাও হয়েছিল। কিন্তু সব ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে জনগণ তাঁকে মুক্ত করেছিল আর বাঙালির বহুকালের অর্থনৈতিক বঞ্চনার প্রেক্ষাপটে একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক মুক্তির সংগ্রামের সূচনাকারীর স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে দিয়েছিল ‘বঙ্গবন্ধু’ গণ-উপাধি।

প্রতিদানে বঙ্গবন্ধুও প্রথমে নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে স্বায়ত্তশাসনের দাবি বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছেন। যখন পাকিস্তানিরা তাতে বাধা দিয়ে উল্টো যুদ্ধ চাপিয়ে দিল, তখন স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন এবং মুক্তিযুদ্ধের আনুষ্ঠানিক ডাক দিয়েছেন। শেষ পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেশকে স্বাধীন করেছেন মূলত জাতিকে লড়াই করার নৈতিক শক্তি জুগিয়ে। গত শতাব্দীর পঞ্চাশ ও ষাটের দশকজুড়ে অর্থনৈতিক মুক্তির প্রশ্নকে প্রধান উপজীব্য করে তরুণ রাজনীতিক শেখ মুজিবের সংগ্রামের মাধ্যমে ‘বঙ্গবন্ধু’ হয়ে ওঠা এবং শেষ পর্যন্ত স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করাকেই তাই বলা যায় তাঁর অর্থনৈতিক মুক্তির সংগ্রামের দ্বিতীয় পর্ব।

বঙ্গবন্ধুর এই সংগ্রামের তৃতীয় এবং চূড়ান্ত পর্বের ব্যাপ্তি তুলনামূলক ছোট। চার বছরেরও কম। কিন্তু স্বাধীন দেশের দায়িত্ব কাঁধে নিয়েই পুনর্গঠন ও উন্নয়নের যে বিশাল কর্মযজ্ঞ তিনি শুরু করেছিলেন, ‘সোনার বাংলা’ প্রতিষ্ঠার যে রূপরেখা তিনি সে সময় দাঁড় করিয়ে গেছেন, সেগুলোর বিচারে এ সময়ে তাঁর অর্থনৈতিক চিন্তা ও কর্মসূচিগুলো খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। প্রাকৃতিক চ্যালেঞ্জ, ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার চ্যালেঞ্জ, দেশের অভ্যন্তরে বেপথু রাজনীতি, বিশ্বাসঘাতকদের নানামুখী চক্রান্ত, প্রবল জন-আকাঙ্ক্ষার চাপ।

এ সব কিছু মোকাবেলা করেও বঙ্গবন্ধু তাঁর অর্থনৈতিক মুক্তির প্রতিশ্রুতি পূরণে যেভাবে সৎ থেকেছেন তার তুলনা বিশ্বে সত্যি বিরল। কেবল দ্রুত প্রবৃদ্ধিতে সীমাবদ্ধ না থেকে প্রকৃত অর্থেই সুপরিকল্পিতভাবে তিনি এগোতে শুরু করেছিলেন। আর তাঁর এই উন্নয়ন অভিযাত্রার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল মানুষ। দুঃখী মানুষ। মাত্র সাড়ে তিন বছরের শাসনামলে তিনি বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার আড়াই গুণ বাড়িয়েছিলেন। মাত্র দুই বছরের মধ্যে চালু করেছিলেন প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা। মূলত সামাজিক পুঁজিই ছিল ওই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে মূল সম্পদ। মাটি ও মানুষের সম্মিলনে গড়ে উঠেছিল সেই অসামান্য সামাজিক পুঁজি। পাশাপাশি ‘সোনার বাংলা’ গড়তে সক্ষম ‘সোনার মানুষ’ তৈরির উদ্যোগ নিয়েছিলেন ‘কুদরাত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশন’-এর মাধ্যমে।

দেশি-বিদেশি অপশক্তির নানা চক্রান্তে তাঁকে আমরা হারিয়েছিলাম শারীরিকভাবে। এরপর অর্থনৈতিক এবং সামাজিক সুবিচার এ দেশ থেকে হারিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সাম্যভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে অন্তর্ভুক্তিমূলক রাখার যে কল্যাণমুখী মানসিকতা তিনি এ দেশের মানুষের মনে প্রতিষ্ঠিত করে দিয়ে গিয়েছিলেন, তার জোরেই দেশ আবার সঠিক পথে ফিরেছে। সেই নবযাত্রার নেতৃত্ব দিচ্ছেন বঙ্গবন্ধুরই সুযোগ্য কন্যা আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

দুর্নীতি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, সাম্প্রদায়িক শক্তির প্রতিরোধ, অপরাজনীতি, সামাজিক বিভাজনের মতো চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করে করেই আমাদের এগোতে হচ্ছে। তবে অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষার ব্যাপক প্রসার, শতভাগ বিদ্যুৎ সরবরাহ, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, নারীর ক্ষমতায়ন, ডিজিটাল সেবা, কৃষির আধুনিকায়ন ও খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নতি এখন দৃশ্যমান। ম্যাক্রো অর্থনীতিতে বেশ কিছু টানাপড়েন এখনো রয়ে গেছে। বিশেষ করে আর্থিক হিসেবে ঘাটতির কারণে বৈদেশিক মজুদের ওপর চাপ, উঁচু হারের মূল্যস্ফীতি এবং নানা ধরনের বিনিময় হারের কারণেই যে সামষ্টিক অর্থনীতিতে এই অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তা আমরা জানি। বুঝি। তবু এ কথা বলা অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে বঙ্গবন্ধুর মাটিঘেঁষা নেতৃত্বের ধরন থেকে শিক্ষা নিয়ে নিশ্চয় এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে তাঁর আরাধ্য ‘সোনার বাংলা’ নির্মাণের কাজটি আমাদের পক্ষে সম্পন্ন করা সম্ভব। বঙ্গবন্ধুর এই জন্মদিনে সেই আশাবাদ জেগে থাকুক, সেই প্রত্যাশাই করছি।

লেখক : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর

ড. আতিউর রহমান: আজ ১৭ মার্চ। বাংলাদেশের আরেক নাম জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১০৪তম জন্মবার্ষিকী। তিনি নিজে কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর জন্মদিন পালনের পক্ষে ছিলেন না। জেলে থাকার সময় পরিবারের পক্ষ থেকে বেশি করে উন্নততর খাবার নিয়ে যেতেন তাঁর স্ত্রী ও সন্তানরা।

সেই খাবার তিনি অন্যান্য রাজনৈতিক সহযোগী জেলবাসী ও তাঁকে সহায়তা করতেন যেসব কয়েদি তাঁদের সঙ্গে ভাগ করে খেতেন। জেলে থাকা তাঁর কর্মী ও রাজনৈতিক সহযোগীরা সেদিন সকালে তাঁকে ফুল পাঠাতেন জন্মদিনের শুভেচ্ছা হিসেবে। জেলের বাইরে থাকার সময় খুবই সাদামাটাভাবে পারিবারিক পরিবেশে তাঁর জন্মদিন পালন করা হতো। তাই ১৯৭১ সালে অসহযোগ আন্দোলন চলাকালে ১৭ মার্চ বিদেশি সাংবাদিকরা যখন তাঁকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানান, তখন তিনি খানিকটা অবাকই হয়েছিলেন।

কেননা তখন তাঁর হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছিল বাংলাদেশের দুঃখী মানুষের অকালে প্রাণ ঝরে যাওয়ার দুঃখে। আর তিনি তো জানতেন ইয়াহিয়া-মুজিব সংলাপ তখন কোন পথে এগোচ্ছিল। সামনে এ দেশের মুক্তিকামী সাধারণ মানুষের কপালে কী আছে, তা-ও তিনি অনুমান করতে পেরেছিলেন। তাইতো বিদেশি সাংবাদিকদের শুভেচ্ছার জবাবে বলেছিলেন, ‘১৯২০ সালের ১৭ মার্চ আমার জন্মদিন।

আমি জীবনে কখনো আমার জন্মদিন পালন করিনি। আপনারা আমার দেশের মানুষের অবস্থা জানেন, তাদের জীবনের কোনো নিরাপত্তা নেই। যখন কেউ ভাবতেও পারে না মরার কথা, তখনো তারা মরে।…আমার আবার জন্মদিন কি, মৃত্যু দিবসই বা কি? আমার জীবনই বা কি?… আমার জনগণই আমার জীবন।’

জনগণের সঙ্গে ছিল তাঁর আত্মার সম্পর্ক। তাদের দুঃখে তিনি দুঃখী হতেন। তাদের সুখে সুখী হতেন। আর শুধু স্বপ্ন দেখতেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার এবং দেশের সব মানুষের সার্বিক মুক্তির। জীবন-ঘষে জ্বলে ওঠা এই নান্দনিক নেতৃত্ব একদিনেই গড়ে ওঠেনি। ছাত্রজীবন থেকেই পণ করেছিলেন এ দেশের কৃষক-শ্রমিকসহ সাধারণ মানুষের দুঃখ নিবারণ করবেন। সেই আশায় পাকিস্তান আন্দোলনে যোগ দিলেও ১৯৪৭ সালেই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন সে ছিল ‘ভ্রান্ত প্রত্যুষ’। তাই শুরু করলেন গণতান্ত্রিক যুব লীগ, পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ ও আওয়ামী মুসলিম লীগ গড়ে তোলার নব রাজনৈতিক যাত্রা।

১৯৪৮ সালে বাংলা ভাষার মর্যাদার ওপর আঘাত এলে ছাত্র ও শিক্ষকদের নিয়ে শুরু করলেন ভাষা আন্দোলন। এই পর্বের ভাষা আন্দোলনের শুরুতেই তিনি এর নেতৃত্বে চলে এসেছিলেন। অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে রাজনীতির যে ভূমিকা, সেটিই তাঁকে রাজনৈতিক আন্দোলনে যুক্ত করতে উৎসাহ জুগিয়েছিল। তাই তরুণ রাজনীতিক হিসেবেও তিনি অর্থনৈতিক মুক্তির প্রশ্নে ছিলেন আপসহীন। ফলে জমিদারি থেকে কৃষক-প্রজাদের রক্ষা করতে যেমন পাকিস্তান আন্দোলন করেছেন, তেমনি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ায় হতাশ হয়ে বসে না পড়ে নতুন উদ্যমে সংগ্রাম করেছেন পূর্ব বাংলার মানুষের অর্থনৈতিক দাবিদাওয়াকে সামনে রেখে। শ্রমজীবী কৃষকদের ‘দাওয়াল’ আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। বিনা ক্ষতিপূরণে জামিদারি প্রথা উচ্ছেদ করে প্রজাদের জমির প্রকৃত মালিক বানানোর দাবিতে ছিলেন অটল। তাই তরুণ বয়সেই জাতীয় পর্যায়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতার মর্যাদা অর্জন করেছিলেন। হতে পেরেছিলেন বাঙালির প্রধানতম মুখপাত্র। মুক্তির অগ্রদূত।

বঙ্গবন্ধুর অর্থনৈতিক মুক্তিসংগ্রামের পরের পর্ব হিসেবে দেখা যায় ভাষা আন্দোলন-পরবর্তী কালকে। এ সময় ইস্যুভিত্তিক আন্দোলনের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থ নিয়ে ভাবতে শুরু করেছেন বঙ্গবন্ধু। মনে মনে ছক কেটেছেন দেশ চালানোর দায়িত্ব পেলে কী করবেন। তাঁর লেখা ‘আমার দেখা নয়া চীন’ বইটির পাতায় পাতায় স্থান পেয়েছে তাঁর সেসব অগ্রসর চিন্তা। গণমুখী রাষ্ট্রনীতি কেমন হওয়া উচিত, রাজনৈতিক নেতাদের জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা কেমন হওয়া উচিত-এসব বিষয়ও তাঁর ভাবনাজগতে এ সময় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মাঠে-ময়দানে তাঁর তৎপরতা, সংসদে তাঁর বক্তৃতা এবং তাঁর নিজের লেখালেখিতেও এটি স্পষ্ট হয়ে ধরা পড়ে। আর পাকিস্তানি গোয়েন্দাদের প্রতিবেদনগুলো থেকে বোঝা যায় পাকিস্তানি অপশাসকরাও অন্যদের তুলনায় বঙ্গবন্ধুর এমন অর্থনৈতিক সংবেদনশীলতাকে ক্রমেই তাঁদের জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখতে শুরু করেছিলেন।

১৯৫৪ সালে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে বাঙালির যুক্তফ্রন্টের বিজয়ে বঙ্গবন্ধুকে তাই দেখা যায় অন্যতম প্রধান নিয়ামকের ভূমিকায়। বাঙালির ওই বিজয় দীর্ঘস্থায়ী না হলেও পুরো দশকেই বঙ্গবন্ধু পূর্ব বাংলার মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির প্রশ্নটিতে আপসহীন থেকে নিজের ও তাঁর দলের রাজনৈতিক কর্মসূচিকে এগিয়ে নিয়েছেন।

দুই দফা মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে এবং সংসদে সোচ্চার ভূমিকা রেখে তিনি ঠিকই বুঝে নিয়েছিলেন যে সে সময় বিদ্যমান ব্যবস্থায় তিনি যেমন অর্থনৈতিক মুক্তি পূর্ব বাংলার মানুষের জন্য চাইছেন, তা সম্ভব হবে না। তাই এ সময়টায় ধীরে ধীরে এই ভূখণ্ডের স্বায়ত্তশাসনের বিষয়টিকে রাজনীতির কেন্দ্রেই আনতে শুরু করেন বঙ্গবন্ধু। ফলে তাঁকেই প্রধান শত্রু গণ্য করে জেলে পাঠানো হয় পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই। নানাভাবে হেনস্তা করেও বঙ্গবন্ধুকে আপস করানো যায়নি, বরং জেলে বসেই ছক কেটেছেন কেমন করে বাঙালির অর্থনৈতিক মুক্তির সনদ তৈরি করা যায়।

বঙ্গবন্ধুর গুরু সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুর পর তিনি যখন পূর্ব বাংলার প্রধানতম নেতা হয়ে উঠলেন, তখন স্বায়ত্তশাসনের রূপরেখা হিসেবে হাজির করলেন ঐতিহাসিক ছয় দফা কর্মসূচি। সারা পূর্ব বাংলা ঘুরে বেড়িয়েছেন জনগণকে ছয় দফার মর্মবাণী বোঝাতে। তখন তিনি প্রায়ই গ্রেপ্তার হতেন। জামিন পেয়েই আবার ছয় দফার কথা জোর গলায় বলতে থাকতেন। আবার জেলে। আবার জামিন। ফের জেল। সে যেন ‘সাপলুডুর’ লড়াই। তাই তাঁকে সরিয়ে দিতে চূড়ান্ত তৎপরতা হিসেবে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার চেষ্টাও হয়েছিল। কিন্তু সব ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে জনগণ তাঁকে মুক্ত করেছিল আর বাঙালির বহুকালের অর্থনৈতিক বঞ্চনার প্রেক্ষাপটে একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক মুক্তির সংগ্রামের সূচনাকারীর স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে দিয়েছিল ‘বঙ্গবন্ধু’ গণ-উপাধি।

প্রতিদানে বঙ্গবন্ধুও প্রথমে নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে স্বায়ত্তশাসনের দাবি বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছেন। যখন পাকিস্তানিরা তাতে বাধা দিয়ে উল্টো যুদ্ধ চাপিয়ে দিল, তখন স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন এবং মুক্তিযুদ্ধের আনুষ্ঠানিক ডাক দিয়েছেন। শেষ পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেশকে স্বাধীন করেছেন মূলত জাতিকে লড়াই করার নৈতিক শক্তি জুগিয়ে। গত শতাব্দীর পঞ্চাশ ও ষাটের দশকজুড়ে অর্থনৈতিক মুক্তির প্রশ্নকে প্রধান উপজীব্য করে তরুণ রাজনীতিক শেখ মুজিবের সংগ্রামের মাধ্যমে ‘বঙ্গবন্ধু’ হয়ে ওঠা এবং শেষ পর্যন্ত স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করাকেই তাই বলা যায় তাঁর অর্থনৈতিক মুক্তির সংগ্রামের দ্বিতীয় পর্ব।

বঙ্গবন্ধুর এই সংগ্রামের তৃতীয় এবং চূড়ান্ত পর্বের ব্যাপ্তি তুলনামূলক ছোট। চার বছরেরও কম। কিন্তু স্বাধীন দেশের দায়িত্ব কাঁধে নিয়েই পুনর্গঠন ও উন্নয়নের যে বিশাল কর্মযজ্ঞ তিনি শুরু করেছিলেন, ‘সোনার বাংলা’ প্রতিষ্ঠার যে রূপরেখা তিনি সে সময় দাঁড় করিয়ে গেছেন, সেগুলোর বিচারে এ সময়ে তাঁর অর্থনৈতিক চিন্তা ও কর্মসূচিগুলো খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। প্রাকৃতিক চ্যালেঞ্জ, ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার চ্যালেঞ্জ, দেশের অভ্যন্তরে বেপথু রাজনীতি, বিশ্বাসঘাতকদের নানামুখী চক্রান্ত, প্রবল জন-আকাঙ্ক্ষার চাপ।

এ সব কিছু মোকাবেলা করেও বঙ্গবন্ধু তাঁর অর্থনৈতিক মুক্তির প্রতিশ্রুতি পূরণে যেভাবে সৎ থেকেছেন তার তুলনা বিশ্বে সত্যি বিরল। কেবল দ্রুত প্রবৃদ্ধিতে সীমাবদ্ধ না থেকে প্রকৃত অর্থেই সুপরিকল্পিতভাবে তিনি এগোতে শুরু করেছিলেন। আর তাঁর এই উন্নয়ন অভিযাত্রার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল মানুষ। দুঃখী মানুষ। মাত্র সাড়ে তিন বছরের শাসনামলে তিনি বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার আড়াই গুণ বাড়িয়েছিলেন। মাত্র দুই বছরের মধ্যে চালু করেছিলেন প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা। মূলত সামাজিক পুঁজিই ছিল ওই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে মূল সম্পদ। মাটি ও মানুষের সম্মিলনে গড়ে উঠেছিল সেই অসামান্য সামাজিক পুঁজি। পাশাপাশি ‘সোনার বাংলা’ গড়তে সক্ষম ‘সোনার মানুষ’ তৈরির উদ্যোগ নিয়েছিলেন ‘কুদরাত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশন’-এর মাধ্যমে।

দেশি-বিদেশি অপশক্তির নানা চক্রান্তে তাঁকে আমরা হারিয়েছিলাম শারীরিকভাবে। এরপর অর্থনৈতিক এবং সামাজিক সুবিচার এ দেশ থেকে হারিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সাম্যভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে অন্তর্ভুক্তিমূলক রাখার যে কল্যাণমুখী মানসিকতা তিনি এ দেশের মানুষের মনে প্রতিষ্ঠিত করে দিয়ে গিয়েছিলেন, তার জোরেই দেশ আবার সঠিক পথে ফিরেছে। সেই নবযাত্রার নেতৃত্ব দিচ্ছেন বঙ্গবন্ধুরই সুযোগ্য কন্যা আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

দুর্নীতি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, সাম্প্রদায়িক শক্তির প্রতিরোধ, অপরাজনীতি, সামাজিক বিভাজনের মতো চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করে করেই আমাদের এগোতে হচ্ছে। তবে অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষার ব্যাপক প্রসার, শতভাগ বিদ্যুৎ সরবরাহ, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, নারীর ক্ষমতায়ন, ডিজিটাল সেবা, কৃষির আধুনিকায়ন ও খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নতি এখন দৃশ্যমান। ম্যাক্রো অর্থনীতিতে বেশ কিছু টানাপড়েন এখনো রয়ে গেছে। বিশেষ করে আর্থিক হিসেবে ঘাটতির কারণে বৈদেশিক মজুদের ওপর চাপ, উঁচু হারের মূল্যস্ফীতি এবং নানা ধরনের বিনিময় হারের কারণেই যে সামষ্টিক অর্থনীতিতে এই অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তা আমরা জানি। বুঝি। তবু এ কথা বলা অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে বঙ্গবন্ধুর মাটিঘেঁষা নেতৃত্বের ধরন থেকে শিক্ষা নিয়ে নিশ্চয় এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে তাঁর আরাধ্য ‘সোনার বাংলা’ নির্মাণের কাজটি আমাদের পক্ষে সম্পন্ন করা সম্ভব। বঙ্গবন্ধুর এই জন্মদিনে সেই আশাবাদ জেগে থাকুক, সেই প্রত্যাশাই করছি।

লেখক : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর