খন রঞ্জন রায় : নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, আমদানি, প্রক্রিয়াকরণ, মজুত, সরবরাহ, বিপণন ও বিক্রয়সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম বিষয়ে সর্বস্তরে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করার লক্ষ্য নিয়ে সরকার শুরু করে ‘জাতীয় নিরাপদ খাদ্য দিবস’। কেবল নাম কুড়ানোর জন্য নয়, সকল শ্রেণি-পেশার মানুষকে নিরাপদ খাদ্যের বিষয়ে অধিক সচেতন করে তোলার উষ্ণ নিবিড় উচ্চারণ এই দিবস।

ইতিহাসের প্রান্তসীমায় দাঁড়িয়ে দেখা যায়, ২০১৮ সালে দেশে প্রথমবারেরমতো পালিত হয়েছিল প্রশ্নহীন এই দিবস। বিশেষ ইতিবাচক সাড়া পড়েছিল প্রথম বছরেই। মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় এই দিবস নিঃশব্দে প্রতিবছর পালনের চিন্তা জেঁকে বসে। নিরাপদ পুষ্টিকর খাবার ভাবনায় প্রতিবছর ২রা ফেব্রুয়ারি লালিত্যের সঙ্গে গাম্ভীর্যের মিশেলে পালিত হচ্ছে এই দিবস। হারাম হালালের তোয়াক্কা না করে সরকার ১৯৫৯ সালের বিশুদ্ধ খাদ্য আইন রহিত করে যুগান্তকারী নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩ প্রণয়ন করেছে। ক্ষুরধার এই আইনের আলোকে ২০১৫ সালের ২রা ফেব্রুয়ারি প্রতিষ্ঠা করে ‘নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ’।

খাদ্যে ভেজাল ও দূষণবিরোধী কার্যক্রম সফলভাবে পরিচালনার স্বার্থে এই কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠা করার দিনটিই ‘জাতীয় নিরাপদ খাদ্য দিবস’। খাদ্যের উৎপাদন থেকে ভোক্তা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে খাদ্যের নিরাপত্তা ও পুষ্টিমান বজায় রাখার বিষয়টি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য মতে প্রতিবছর ৬০ কোটি মানুষ দূষিত খাবার খেয়ে অসুস্থ্য হয়। মনে দাগ কেটে যাওয়ার মতো ঘটনা যে কেবলমাত্র খাদ্য ভেজালের জন্য প্রতি বছর মারা যায প্রায় ৫ লাখ মানুষ। আরো ভয়ানক তথ্য যে ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের ৪৩ শতাংশ খাবারজনিত রোগে আক্রান্ত হয়। আর এই অজানা নিয়তির কারণে প্রতিবছর প্রাণ হারায় ১ লাখ ২৫ হাজার শিশু। খাদ্যের সাথে অসম্ভব এক অন্তর্দ্বন্ধের ধূসর এই মুর্হূর্ত।

শরীরতত্ত্ব বিজ্ঞানের খুব ধারালো তথ্য মতে, মানবদেহে খাদ্যের প্রধানত তিনটি কাজ। দেহে তাপ উৎপাদন করে, কর্মশক্তি প্রদান করে, রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলে দেহকে সুস্থ, সবল এবং কর্মক্ষম রাখে। দেহের গঠন, বৃদ্ধিসাধন, ক্ষয়পূরণ ও রক্ষণাবেক্ষণ সাধনে অটল প্রহরীর মতো কাজ করে। শরীরের জন্য মহামূল্যবান এই খাদ্যে ছয় রকমের উপাদান একান্তে সংগোপনে ভূমিকা পালন করে। শর্করা, আমিষ, স্নেহ, পানি, ভিটামিন এর খনিজ লবণ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রলুব্ধ করা খাবার পরিহার করে নির্বাচিত খাদ্যে পর্যাপ্ত পরিমাণে খাদ্যপ্রাণ ও খনিজসহ প্রয়োজনীয় উপাদান আছে কিনা তা নিশ্চিত হয়ে আহার করতে বলেছে। খাদ্যাভাসে লোভের আড়ালে থেকে মানবদেহে রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণু দ্বারা সংক্রমিত হয় এমন খাদ্য পরিহার করতে বলেছে।

খাদ্য নিয়ন্ত্রণকারী বিভিন্ন দেশের সংস্থার সুপারিশ গ্রহণ করে সুস্থ্য সবল নিরোগ জীবনযাপনে অভ্যস্থ হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। তারা বাস্তবতার ভেতরে বুঁদ হয়ে থাকার জন্য কিছু সুনির্দিষ্ট সুপারিশও করেছে। যেমন- মানবেদেহ যতটুকু ক্যালরির শক্তি খরচ করে ঠিক ততটকু বা তার কাছাকাছি সংখ্যক ক্যলরির খাদ্যশক্তি বিশিষ্ট খাদ্য গ্রহণ করে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন ও দুর্ভোগ যোগ না হয় এমন ওজন বজায় রাখা। বলেছে দৈনন্দিন খাদ্যশক্তি বা ক্যালরির শতকরা ৩০ ভাগের বেশি স্নেহ পদার্থ থেকে আসা উচিত নয়।

স্নেহ পদার্থ গ্রহণ সীমিত করা, স্নেহ পদার্থ প্রধানত সম্পৃক্ত, অসম্পৃক্ত ও আন্তঃস্নেহরূপে ভুতুড়ে অস্তিত্ব নিয়ে আমাদের চারপাশ ঘুরে বেড়ায়। সম্পৃক্ত স্নেহ পদার্থের মধ্যে আছে চর্বিযুক্ত মাংস, মাখন, ঘি, ননী, পনির, নারকেল তেল, পাম তেল, পশুর চর্বি ইত্যাদি। বিনয়ের সাথে এইগুলো পরিহার চালচলনে ত্রুটি-বিচ্যুতি শোধরানোর কথা বলেছে। এইসব রসালো খাবারের কিনার ঘেঁষে আন্তঃস্নেহ পদার্থও ঘুর ঘুর করে। বিস্কুট, কুকি, ওয়েফার, হিমায়িত পিৎসা, পাই, রান্নার তেল, উনুনে সেঁকা ও তেলে ভাজা খাদ্য, মোড়ককৃত যে কোন খাবার রুটি- পাউরুটি-বনে মাখানো মাখন শরীরের জন্য খানিকটা দোটানায় ফেলে। সম্পূর্ণ নিষেধের তালিকায় থাকা গরু, ছাগল, ভেড়া, উটের মাংস ও এদের দুগ্ধজাত দ্রব্য চাক্ষুষ ক্ষতির কারণ তা-তো সবারই কম বেশি জানা।

এইসব খাবার নিয়ে চিরকালের সংশয় থাকলেও স্নেহ পদার্থের জন্য উপকারী খাদ্য বাদাম, সূর্যমুখী তেল, সয়াবিন তেল, জলপাই তেলকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আদেশ আছে। জীবনে সংগতি অসংগতির কথা বিবেচনা করে প্রতিদিন কমপক্ষে ৪০০ গ্রাম ফল ও শাকসবজি খাওয়া উচিত বলেও নির্দেশনা দিয়েছে। স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভাসের মধ্যে আকৃষ্ট করার মতো শিম, শিমজাতীয় খাদ্য, ডাল, আঁছাটা শস্যদানা, ভুট্টা, যব, লালচাল অন্তর্ভুক্ত।

এখানে পছন্দের সীমা সংকোচিত করতে বলা হচ্ছে। অভ্যাসের গতানুগতিকতায় তাল মেলাতে নিষেধ করেছে। সবকিছু মেলানো না গেলেও সুস্বাদু আলু, মিষ্টি আলু, কাসাভা ইত্যাদিকে পরিহারের তালিকায় রাখতে বলা হয়েছে। গৃহীত খাবারে চিনির পরিমাণ নিশ্চিন্তে নির্বাসনে দেওয়ার আহ্বান আছে। একজন সুস্থ ওজনের প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ সাধারণত দিনে ২০০০ ক্যালরি খাদ্য শক্তি গ্রহণ করে, সেখানে মুক্ত চিনি থেকে যায়। ঐ পরিমাণ চিনি থেকেই শরীরশক্তির কাজ চালানোর মতো ক্যালরি খুঁজে পাওয়া যায়। মুক্ত চিনি বলতে রাঁধুনি, শিল্পোৎপাদক দ্বারা খাদ্যে বা পানীয়তে যোগকৃত অতিরিক্ত চিনির পাশাপাশি, মধু, ফলের রস, রসের ঘনীভূতরূপে প্রাকৃতিকভাবে উপস্থিত চিনি তেজ আর অহমিকা নিয়ে উপস্থিত থাকে।

বিচক্ষণ মানুষ এইসবের হিসাব-নিকাশ করেই খাদগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন। অনেকে মনে করতে পারেন এই তালিকা নিতান্তই সাদামাটা। আন্দাজ করা। আসলেও তাই। এখানেই যথেষ্ট উপাদান নিহিত। খাবারের সমস্ত উৎস থেকে লবণ কিংবা সোডিয়াম গ্রহণ একান্তই সীমিত করার নির্দেশনা আছে।

বলা আছে, তিন সাদা মানবদেহে অনাচার উদ্ভাবনে সহায়ক। সাদা চালের ভাত, রুটি, ময়দা তৎসংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়াকরণ খাবার, সাদা চিনি আর খুন্তি-কড়াইয়ের লড়াইয়ে থাকা লবণ। স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভাস অপুষ্টি থেকে রক্ষা করে, স্বাস্থ্যকে আত্মদীপ হবার ব্রতে উৎসাহিত করে। অসংক্রামক রোগব্যাধি যেমন ডায়াবেটিস হৃদরোগ, স্ট্রোক, উচ্চরক্তচাপ, ক্যান্সারসহ মরণঘাতি রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে। স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভাসের প্রয়োজনগুলি বিভিন্ন ধরনের উদ্ভিজ ও প্রাণিজ উৎস থেকে মেটানো যায়। অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভাস এবং শারীরিক কর্মকাণ্ডের অভাব বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্য ঝুঁকির প্রধানতম দুই কারণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গবেষণামূলক বিবৃতি অনুযায়ী পর্যাপ্ত পরিমাণে শাকসবজি ও ফলমূল না খাওয়ার ফলে বিশ্বব্যাপী মোট মৃত্যুর ২.৮৫ শতাংশ ঘটে এই বেলেল্লাপনায়। স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভাস জীবনের প্রথম ভাগ থেকেই শুরু করতে তারা পরামর্শ প্রদান করে।

পরামর্শের গভীরতা মায়ের দুধ বিষয়ে। মায়ের শাল দুধ থেকে শুরু করে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বুকের দুধ খাওয়ালে শিশুর সুস্থ্য বিকাশ ঘটে, ধীশক্তির বিকাশ হয়, মেদবহুল হবার সম্ভাবনা থাকে না। মায়ের প্রতি আজন্ম ঋণের ফলশ্রুতিতে আজীবন অ-সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হবার ঝুঁকি হ্রাস পায়। খাদ্য পুষ্টিবিজ্ঞানীরা শিশু বয়স থেকেই যখন- পুষ্টিকর ও সুষম খাবার গ্রহণের কথা বলে থাকেন তখন জগৎসংসারে এই সব খাবারের সন্ধান করতে হয়। দেখা গেছে খাাদ্যের সহজলভ্যতা আর পুষ্টিমূল্য বিবেচনা করলে আমাদের নির্ভর করতে হয় উদ্ভিদের উপর। আমাদের অস্তিতে মিশে থাকা মাংস বা প্রাণিজ আমিষের উৎসও কিন্তু উদ্ভিদের উপর নির্ভরশীল। ঘটনাচক্রে উদ্ভিদই খাদ্যশৃঙ্খলা বজায় রাখতে মহামূল্যবান ভূমিকা রাখে।

জীবনযাত্রার মানের দৃশ্যমান উন্নয়নে খাদ্য হিসাবে ব্যবহারের জন্য প্রায় ২ হাজার প্রজাতির উদ্ভিদ চাষ করা হয়। এর বাইরে যত্রতত্র গজিয়ে ওঠা নানা ধরনের তৃণ-গুল্ম অহরহ সংগ্রহ করে খাদ্য ও পুষ্টি চাহিদা পূরণ করা হয়। উদ্ভিদের উপর খাদ্য চাহিদা নির্ভর করলেও অনেক ক্ষেত্রে উদ্ভিজ তেল মানবদেহের জন্য নীরব চপেটাঘাত। উদ্ভিজ তেলকে আংশিক জারিত করে যান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় পারশিয়ালি হাইড্রোজেনেশন করলে তা তরল অবস্থা থেকে কঠিন কিংবা অর্ধকঠিন অবস্থায় রূপান্তর ঘটে। ডালডা বা বনস্পতি নামের সুস্বাদু এই ক্ষতিকর তেল খাওয়ার জন্য মানুষজন খুবই উদগ্রীব হয়ে থাকে।

পারশিয়ালি হাইড্রোজেনেটেড অয়েল বা পিএইচও নামের ট্রান্সফ্যাট মানবদেহকে ছিঁড়েখুঁড়ে ফেলে। অতিরিক্ত মাত্রার ট্রান্সফ্যাট হৃদরোগ ও স্ট্রোকের কারণ হয়। বাংলাদেশে প্রতিবছর যে ২ লাখ ৮০ হাজার মানুষ হৃদরোগে মারা যায় এর মধ্যে ৪.৪১ শতাংশ মৃত্যুর জন্য দায়ী করা হয় ট্রান্সফ্যাটকে। ক্ষতিকর চর্বিজাতীয় এই খাবারের আসল মতলব মানুষের মৃত্যু ঘটানো। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদেনে ট্রান্সফ্যাটজনিত দৌরাত্ম্যের কারণে হৃদরোগে মৃত্যুর প্রায় দুই তৃতীয়াংশই ঘটে ১৫টি দেশে। যন্ত্রণার আর্তি এখানে যে, এই ১৫টির মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম।

জীবনের জন্য অন্ধকার ও অশনিসংকেতের খাদ্যে ট্রান্সফ্যাটের প্রধান উৎস সাধারণত বেকারিপণ্য, প্রক্রিয়াজাত ও ভাজাপোড়া খাবার আর হোটেল রেঁস্তোরায় বিভিন্ন খাবার তৈরিতে দূষিত কলুষিত ডালডা ব্যবহার। অকালমৃত্যু ও মানবদেহের জন্য নীরব ঘাতক ট্রান্সফ্যাট নিয়ন্ত্রণে নীতিমালা প্রণয়ন করছে সরকার। আমাদের ভ্রষ্ট খাদ্য ব্যবস্থার টুটি টিপে ধরতে এই নীতিতে কঠোর কিছু বিধান যুক্ত করা হয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা উর্ধ্বশ্বাস রুদ্ধশ্বাসে সাহসী উচ্চারণে ২০২৩ সালের মধ্যে ট্রান্সফ্যান্ট নির্মূলের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। বিরামহীন শান্তি, দুর্বার গতিতে ভোক্তাঅধিকার সংগঠনগুলোকে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছে। খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলার বাতিঘর ভোক্তাঅধিকার সংগঠনগুলো। খাদ্যে ভেজালের লুকোচুরি ও প্রতারণার খেলা বন্ধে কিছু দাবী ও সুপারিশ করেছে।
সকল খাদ্যপণ্যে ট্রান্সফ্যাটের মাত্রা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গবেষণালব্ধ নীতিমালা অনুসরণ করে সর্বোচ্চ ২ শতাংশ নির্ধারণ করা। কথায় কথায় ট্রান্সফ্যাটের উৎস ডালডা, বনস্পতির আমদানি, উৎপাদন, বাজারজাতকরণ ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করা। খাদ্যপণ্যের মোড়কে ট্রান্সফ্যাটের পরিমাণ বাধ্যতামূলকভাবে উল্লেখ করা। এইসব অপরাধীর বীরত্ব প্রকাশ বন্ধ করতে ট্রান্সফ্যাটের বেলায় আলাদা লোগো প্রণয়ন ও বাধ্যতামূলক ব্যবহার নিশ্চিত করা। ট্রান্সফ্যাট সম্পর্কিয় বিভ্রান্তিকর মিথ্যা তথ্যের বিজ্ঞান ও প্রচারণা কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করা।

খাদ্যপণ্য থেকে ট্রান্সফ্যাট নিশ্চিত নির্বাসনে যেতে পরিমাপের জন্য আধুনিক যন্ত্রপাতি-ল্যাবরেটরি ও লোকবল নিয়োগ করা। খাদ্যপণ্যের ট্রান্সফ্যান্ট পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে নিয়মিতভাবে যাচাই-পরীক্ষা করে জনগণকে অবহিত করা এবং প্রাপ্ত ফলাফল ভোক্তা সাধারণকে অবগতির জন্য ওয়েব সাইটে উন্মুক্ত করে রাখা।

ট্রান্সফেটের ঝুঁকি এবং এর বাস্তবতা যে ভয়ঙ্কর মৃত্যুপুরী তা জনসাধারণকে নিয়মিতভাবে ব্যাপক আকারে প্রচার করা। খাদ্যপণ্য থেকে ট্রান্সফ্যাট বেকসুর নিরুদ্দেশ হয়ে যাবার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে প্রয়োজনীয় সংখ্যক পর্যাপ্ত লোকবল নিয়োগ, তাঁদের সক্ষমতার জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা করাই স্বাস্থ্য ঝুঁকি কমানোর একমাত্র পন্থা। ট্রান্সফ্যাটের বাইরে খাদ্যপণ্য ও পানীয় লোভনীয় করতে মাছ ও ফল দ্রুত না পঁচতে কাপড়ের রঙ ও বিভিন্ন রাসায়নিক ব্যবহারের হরহামেশা খবরে আকাশ বাতাস কেঁপে উঠতো। এইসব অনাচারের বিরুদ্ধে মনোজাগতিক লড়াই তৈরি করতেই নিরাপদ খাদ্য আইন ও তদারকির জন্য কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠাতা করা হয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মাধ্যমে গড়ে তোলা এই আইনে দূষণ মিশ্রিত কোনো খাবার বিক্রি করলে বা চেষ্টা করলে, হোটেল, রেস্তোঁরা বা প্রতিষ্ঠান এই ব্যাপারে অবহেলা করলে, শর্ত ভঙ্গ করে কোনো খাদ্যদ্রব্য মজুত বা প্রস্তুত করলে, অনুমোদিত ট্রেড মার্ক নকল করে বিক্রয়ের চেষ্টা করলে ইত্যাদি এহেন ২০ ধরনের অপরাধের জন্য ২ বছর থেকে অনুর্ধ্ব ৭ বছরের কারাদণ্ড সাথে তিন লাখ টাকা থেকে অনধিক ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। একই অপরাধ পুনরায় করলে শাস্তি ও জরিমানার পরিমাণ বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।

নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের প্রবিধিমালা বাস্তবায়নে একটি রোডম্যাপ নিয়ে কাজ করছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদিত মাত্রা ২ শতাংশের বেশি ট্রান্সফ্যাট ব্যবহার করলে দণ্ডনীয় অপরাধ বলে গণ্য হবে। সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড বা ১২ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড ক্ষেত্র বিশেষ উভয় দণ্ড প্রদানের বিধান রাখা হয়েছে। জীবননাশক বা মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর কোনো রাসায়নিক বা ভারী ধাতু বা বিষাক্ত দ্রব্য মিশ্রিত কোনো খাদ্যদ্রব্য উৎপাদন, আমদানি, প্রস্তুত, মজুত, বিতরণ, বিক্রয় কিংবা বিক্রয়ের অপচেষ্টা করলেও অনুর্ধ্ব ৭ বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের মুখোমুখি হতে হবে। পুনরায় একই অপরাধে লিপ্ত হলে দ্বিগুণিতক হারে শাস্তি কার্যকরের উচ্চাকাংক্ষা জানানো হয়েছে।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার আন্তর্জাতিকভাবে অনুমোদিত নির্দেশনা, আমেরিকান খাদ্য এবং ড্রাগ প্রশাসনের নীতিমালা অনুসরণ করে ‘নিরাপদ খাদ্য আইনে’ ১৩ টি অধ্যায়, ৯০ টি ধারা, ৩৩ রকমের খাদ্য ভেজাল ও খাদ্য বিষয়ে সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হয়েছে। মানুষের প্রত্যাশিত ব্যবহার উপযোগীতা অনুযায়ী বিশুদ্ধ ও স্বাস্থ্যসম্মত আহার্য নিয়েই গভীর মমতাবোধক আজকের এই দিবস।

জাগতিক জীবনকে সুখময় করতে নিরাপদ খাদ্য শৃঙ্খলার বিধিবিধান ও সব নিয়মকানুন বেমালুম টপকে যাক এই অসমাপ্ত আকাঙ্ক্ষাতেই আজ শেষ করি।লেখকঃ খন রঞ্জন রায়,প্রবন্ধিক

খন রঞ্জন রায় : নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, আমদানি, প্রক্রিয়াকরণ, মজুত, সরবরাহ, বিপণন ও বিক্রয়সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম বিষয়ে সর্বস্তরে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করার লক্ষ্য নিয়ে সরকার শুরু করে ‘জাতীয় নিরাপদ খাদ্য দিবস’। কেবল নাম কুড়ানোর জন্য নয়, সকল শ্রেণি-পেশার মানুষকে নিরাপদ খাদ্যের বিষয়ে অধিক সচেতন করে তোলার উষ্ণ নিবিড় উচ্চারণ এই দিবস।

ইতিহাসের প্রান্তসীমায় দাঁড়িয়ে দেখা যায়, ২০১৮ সালে দেশে প্রথমবারেরমতো পালিত হয়েছিল প্রশ্নহীন এই দিবস। বিশেষ ইতিবাচক সাড়া পড়েছিল প্রথম বছরেই। মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় এই দিবস নিঃশব্দে প্রতিবছর পালনের চিন্তা জেঁকে বসে। নিরাপদ পুষ্টিকর খাবার ভাবনায় প্রতিবছর ২রা ফেব্রুয়ারি লালিত্যের সঙ্গে গাম্ভীর্যের মিশেলে পালিত হচ্ছে এই দিবস। হারাম হালালের তোয়াক্কা না করে সরকার ১৯৫৯ সালের বিশুদ্ধ খাদ্য আইন রহিত করে যুগান্তকারী নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩ প্রণয়ন করেছে। ক্ষুরধার এই আইনের আলোকে ২০১৫ সালের ২রা ফেব্রুয়ারি প্রতিষ্ঠা করে ‘নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ’।

খাদ্যে ভেজাল ও দূষণবিরোধী কার্যক্রম সফলভাবে পরিচালনার স্বার্থে এই কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠা করার দিনটিই ‘জাতীয় নিরাপদ খাদ্য দিবস’। খাদ্যের উৎপাদন থেকে ভোক্তা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে খাদ্যের নিরাপত্তা ও পুষ্টিমান বজায় রাখার বিষয়টি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য মতে প্রতিবছর ৬০ কোটি মানুষ দূষিত খাবার খেয়ে অসুস্থ্য হয়। মনে দাগ কেটে যাওয়ার মতো ঘটনা যে কেবলমাত্র খাদ্য ভেজালের জন্য প্রতি বছর মারা যায প্রায় ৫ লাখ মানুষ। আরো ভয়ানক তথ্য যে ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের ৪৩ শতাংশ খাবারজনিত রোগে আক্রান্ত হয়। আর এই অজানা নিয়তির কারণে প্রতিবছর প্রাণ হারায় ১ লাখ ২৫ হাজার শিশু। খাদ্যের সাথে অসম্ভব এক অন্তর্দ্বন্ধের ধূসর এই মুর্হূর্ত।

শরীরতত্ত্ব বিজ্ঞানের খুব ধারালো তথ্য মতে, মানবদেহে খাদ্যের প্রধানত তিনটি কাজ। দেহে তাপ উৎপাদন করে, কর্মশক্তি প্রদান করে, রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলে দেহকে সুস্থ, সবল এবং কর্মক্ষম রাখে। দেহের গঠন, বৃদ্ধিসাধন, ক্ষয়পূরণ ও রক্ষণাবেক্ষণ সাধনে অটল প্রহরীর মতো কাজ করে। শরীরের জন্য মহামূল্যবান এই খাদ্যে ছয় রকমের উপাদান একান্তে সংগোপনে ভূমিকা পালন করে। শর্করা, আমিষ, স্নেহ, পানি, ভিটামিন এর খনিজ লবণ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রলুব্ধ করা খাবার পরিহার করে নির্বাচিত খাদ্যে পর্যাপ্ত পরিমাণে খাদ্যপ্রাণ ও খনিজসহ প্রয়োজনীয় উপাদান আছে কিনা তা নিশ্চিত হয়ে আহার করতে বলেছে। খাদ্যাভাসে লোভের আড়ালে থেকে মানবদেহে রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণু দ্বারা সংক্রমিত হয় এমন খাদ্য পরিহার করতে বলেছে।

খাদ্য নিয়ন্ত্রণকারী বিভিন্ন দেশের সংস্থার সুপারিশ গ্রহণ করে সুস্থ্য সবল নিরোগ জীবনযাপনে অভ্যস্থ হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। তারা বাস্তবতার ভেতরে বুঁদ হয়ে থাকার জন্য কিছু সুনির্দিষ্ট সুপারিশও করেছে। যেমন- মানবেদেহ যতটুকু ক্যালরির শক্তি খরচ করে ঠিক ততটকু বা তার কাছাকাছি সংখ্যক ক্যলরির খাদ্যশক্তি বিশিষ্ট খাদ্য গ্রহণ করে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন ও দুর্ভোগ যোগ না হয় এমন ওজন বজায় রাখা। বলেছে দৈনন্দিন খাদ্যশক্তি বা ক্যালরির শতকরা ৩০ ভাগের বেশি স্নেহ পদার্থ থেকে আসা উচিত নয়।

স্নেহ পদার্থ গ্রহণ সীমিত করা, স্নেহ পদার্থ প্রধানত সম্পৃক্ত, অসম্পৃক্ত ও আন্তঃস্নেহরূপে ভুতুড়ে অস্তিত্ব নিয়ে আমাদের চারপাশ ঘুরে বেড়ায়। সম্পৃক্ত স্নেহ পদার্থের মধ্যে আছে চর্বিযুক্ত মাংস, মাখন, ঘি, ননী, পনির, নারকেল তেল, পাম তেল, পশুর চর্বি ইত্যাদি। বিনয়ের সাথে এইগুলো পরিহার চালচলনে ত্রুটি-বিচ্যুতি শোধরানোর কথা বলেছে। এইসব রসালো খাবারের কিনার ঘেঁষে আন্তঃস্নেহ পদার্থও ঘুর ঘুর করে। বিস্কুট, কুকি, ওয়েফার, হিমায়িত পিৎসা, পাই, রান্নার তেল, উনুনে সেঁকা ও তেলে ভাজা খাদ্য, মোড়ককৃত যে কোন খাবার রুটি- পাউরুটি-বনে মাখানো মাখন শরীরের জন্য খানিকটা দোটানায় ফেলে। সম্পূর্ণ নিষেধের তালিকায় থাকা গরু, ছাগল, ভেড়া, উটের মাংস ও এদের দুগ্ধজাত দ্রব্য চাক্ষুষ ক্ষতির কারণ তা-তো সবারই কম বেশি জানা।

এইসব খাবার নিয়ে চিরকালের সংশয় থাকলেও স্নেহ পদার্থের জন্য উপকারী খাদ্য বাদাম, সূর্যমুখী তেল, সয়াবিন তেল, জলপাই তেলকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আদেশ আছে। জীবনে সংগতি অসংগতির কথা বিবেচনা করে প্রতিদিন কমপক্ষে ৪০০ গ্রাম ফল ও শাকসবজি খাওয়া উচিত বলেও নির্দেশনা দিয়েছে। স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভাসের মধ্যে আকৃষ্ট করার মতো শিম, শিমজাতীয় খাদ্য, ডাল, আঁছাটা শস্যদানা, ভুট্টা, যব, লালচাল অন্তর্ভুক্ত।

এখানে পছন্দের সীমা সংকোচিত করতে বলা হচ্ছে। অভ্যাসের গতানুগতিকতায় তাল মেলাতে নিষেধ করেছে। সবকিছু মেলানো না গেলেও সুস্বাদু আলু, মিষ্টি আলু, কাসাভা ইত্যাদিকে পরিহারের তালিকায় রাখতে বলা হয়েছে। গৃহীত খাবারে চিনির পরিমাণ নিশ্চিন্তে নির্বাসনে দেওয়ার আহ্বান আছে। একজন সুস্থ ওজনের প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ সাধারণত দিনে ২০০০ ক্যালরি খাদ্য শক্তি গ্রহণ করে, সেখানে মুক্ত চিনি থেকে যায়। ঐ পরিমাণ চিনি থেকেই শরীরশক্তির কাজ চালানোর মতো ক্যালরি খুঁজে পাওয়া যায়। মুক্ত চিনি বলতে রাঁধুনি, শিল্পোৎপাদক দ্বারা খাদ্যে বা পানীয়তে যোগকৃত অতিরিক্ত চিনির পাশাপাশি, মধু, ফলের রস, রসের ঘনীভূতরূপে প্রাকৃতিকভাবে উপস্থিত চিনি তেজ আর অহমিকা নিয়ে উপস্থিত থাকে।

বিচক্ষণ মানুষ এইসবের হিসাব-নিকাশ করেই খাদগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন। অনেকে মনে করতে পারেন এই তালিকা নিতান্তই সাদামাটা। আন্দাজ করা। আসলেও তাই। এখানেই যথেষ্ট উপাদান নিহিত। খাবারের সমস্ত উৎস থেকে লবণ কিংবা সোডিয়াম গ্রহণ একান্তই সীমিত করার নির্দেশনা আছে।

বলা আছে, তিন সাদা মানবদেহে অনাচার উদ্ভাবনে সহায়ক। সাদা চালের ভাত, রুটি, ময়দা তৎসংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়াকরণ খাবার, সাদা চিনি আর খুন্তি-কড়াইয়ের লড়াইয়ে থাকা লবণ। স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভাস অপুষ্টি থেকে রক্ষা করে, স্বাস্থ্যকে আত্মদীপ হবার ব্রতে উৎসাহিত করে। অসংক্রামক রোগব্যাধি যেমন ডায়াবেটিস হৃদরোগ, স্ট্রোক, উচ্চরক্তচাপ, ক্যান্সারসহ মরণঘাতি রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে। স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভাসের প্রয়োজনগুলি বিভিন্ন ধরনের উদ্ভিজ ও প্রাণিজ উৎস থেকে মেটানো যায়। অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভাস এবং শারীরিক কর্মকাণ্ডের অভাব বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্য ঝুঁকির প্রধানতম দুই কারণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গবেষণামূলক বিবৃতি অনুযায়ী পর্যাপ্ত পরিমাণে শাকসবজি ও ফলমূল না খাওয়ার ফলে বিশ্বব্যাপী মোট মৃত্যুর ২.৮৫ শতাংশ ঘটে এই বেলেল্লাপনায়। স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভাস জীবনের প্রথম ভাগ থেকেই শুরু করতে তারা পরামর্শ প্রদান করে।

পরামর্শের গভীরতা মায়ের দুধ বিষয়ে। মায়ের শাল দুধ থেকে শুরু করে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বুকের দুধ খাওয়ালে শিশুর সুস্থ্য বিকাশ ঘটে, ধীশক্তির বিকাশ হয়, মেদবহুল হবার সম্ভাবনা থাকে না। মায়ের প্রতি আজন্ম ঋণের ফলশ্রুতিতে আজীবন অ-সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হবার ঝুঁকি হ্রাস পায়। খাদ্য পুষ্টিবিজ্ঞানীরা শিশু বয়স থেকেই যখন- পুষ্টিকর ও সুষম খাবার গ্রহণের কথা বলে থাকেন তখন জগৎসংসারে এই সব খাবারের সন্ধান করতে হয়। দেখা গেছে খাাদ্যের সহজলভ্যতা আর পুষ্টিমূল্য বিবেচনা করলে আমাদের নির্ভর করতে হয় উদ্ভিদের উপর। আমাদের অস্তিতে মিশে থাকা মাংস বা প্রাণিজ আমিষের উৎসও কিন্তু উদ্ভিদের উপর নির্ভরশীল। ঘটনাচক্রে উদ্ভিদই খাদ্যশৃঙ্খলা বজায় রাখতে মহামূল্যবান ভূমিকা রাখে।

জীবনযাত্রার মানের দৃশ্যমান উন্নয়নে খাদ্য হিসাবে ব্যবহারের জন্য প্রায় ২ হাজার প্রজাতির উদ্ভিদ চাষ করা হয়। এর বাইরে যত্রতত্র গজিয়ে ওঠা নানা ধরনের তৃণ-গুল্ম অহরহ সংগ্রহ করে খাদ্য ও পুষ্টি চাহিদা পূরণ করা হয়। উদ্ভিদের উপর খাদ্য চাহিদা নির্ভর করলেও অনেক ক্ষেত্রে উদ্ভিজ তেল মানবদেহের জন্য নীরব চপেটাঘাত। উদ্ভিজ তেলকে আংশিক জারিত করে যান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় পারশিয়ালি হাইড্রোজেনেশন করলে তা তরল অবস্থা থেকে কঠিন কিংবা অর্ধকঠিন অবস্থায় রূপান্তর ঘটে। ডালডা বা বনস্পতি নামের সুস্বাদু এই ক্ষতিকর তেল খাওয়ার জন্য মানুষজন খুবই উদগ্রীব হয়ে থাকে।

পারশিয়ালি হাইড্রোজেনেটেড অয়েল বা পিএইচও নামের ট্রান্সফ্যাট মানবদেহকে ছিঁড়েখুঁড়ে ফেলে। অতিরিক্ত মাত্রার ট্রান্সফ্যাট হৃদরোগ ও স্ট্রোকের কারণ হয়। বাংলাদেশে প্রতিবছর যে ২ লাখ ৮০ হাজার মানুষ হৃদরোগে মারা যায় এর মধ্যে ৪.৪১ শতাংশ মৃত্যুর জন্য দায়ী করা হয় ট্রান্সফ্যাটকে। ক্ষতিকর চর্বিজাতীয় এই খাবারের আসল মতলব মানুষের মৃত্যু ঘটানো। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদেনে ট্রান্সফ্যাটজনিত দৌরাত্ম্যের কারণে হৃদরোগে মৃত্যুর প্রায় দুই তৃতীয়াংশই ঘটে ১৫টি দেশে। যন্ত্রণার আর্তি এখানে যে, এই ১৫টির মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম।

জীবনের জন্য অন্ধকার ও অশনিসংকেতের খাদ্যে ট্রান্সফ্যাটের প্রধান উৎস সাধারণত বেকারিপণ্য, প্রক্রিয়াজাত ও ভাজাপোড়া খাবার আর হোটেল রেঁস্তোরায় বিভিন্ন খাবার তৈরিতে দূষিত কলুষিত ডালডা ব্যবহার। অকালমৃত্যু ও মানবদেহের জন্য নীরব ঘাতক ট্রান্সফ্যাট নিয়ন্ত্রণে নীতিমালা প্রণয়ন করছে সরকার। আমাদের ভ্রষ্ট খাদ্য ব্যবস্থার টুটি টিপে ধরতে এই নীতিতে কঠোর কিছু বিধান যুক্ত করা হয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা উর্ধ্বশ্বাস রুদ্ধশ্বাসে সাহসী উচ্চারণে ২০২৩ সালের মধ্যে ট্রান্সফ্যান্ট নির্মূলের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। বিরামহীন শান্তি, দুর্বার গতিতে ভোক্তাঅধিকার সংগঠনগুলোকে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছে। খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলার বাতিঘর ভোক্তাঅধিকার সংগঠনগুলো। খাদ্যে ভেজালের লুকোচুরি ও প্রতারণার খেলা বন্ধে কিছু দাবী ও সুপারিশ করেছে।
সকল খাদ্যপণ্যে ট্রান্সফ্যাটের মাত্রা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গবেষণালব্ধ নীতিমালা অনুসরণ করে সর্বোচ্চ ২ শতাংশ নির্ধারণ করা। কথায় কথায় ট্রান্সফ্যাটের উৎস ডালডা, বনস্পতির আমদানি, উৎপাদন, বাজারজাতকরণ ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করা। খাদ্যপণ্যের মোড়কে ট্রান্সফ্যাটের পরিমাণ বাধ্যতামূলকভাবে উল্লেখ করা। এইসব অপরাধীর বীরত্ব প্রকাশ বন্ধ করতে ট্রান্সফ্যাটের বেলায় আলাদা লোগো প্রণয়ন ও বাধ্যতামূলক ব্যবহার নিশ্চিত করা। ট্রান্সফ্যাট সম্পর্কিয় বিভ্রান্তিকর মিথ্যা তথ্যের বিজ্ঞান ও প্রচারণা কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করা।

খাদ্যপণ্য থেকে ট্রান্সফ্যাট নিশ্চিত নির্বাসনে যেতে পরিমাপের জন্য আধুনিক যন্ত্রপাতি-ল্যাবরেটরি ও লোকবল নিয়োগ করা। খাদ্যপণ্যের ট্রান্সফ্যান্ট পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে নিয়মিতভাবে যাচাই-পরীক্ষা করে জনগণকে অবহিত করা এবং প্রাপ্ত ফলাফল ভোক্তা সাধারণকে অবগতির জন্য ওয়েব সাইটে উন্মুক্ত করে রাখা।

ট্রান্সফেটের ঝুঁকি এবং এর বাস্তবতা যে ভয়ঙ্কর মৃত্যুপুরী তা জনসাধারণকে নিয়মিতভাবে ব্যাপক আকারে প্রচার করা। খাদ্যপণ্য থেকে ট্রান্সফ্যাট বেকসুর নিরুদ্দেশ হয়ে যাবার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে প্রয়োজনীয় সংখ্যক পর্যাপ্ত লোকবল নিয়োগ, তাঁদের সক্ষমতার জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা করাই স্বাস্থ্য ঝুঁকি কমানোর একমাত্র পন্থা। ট্রান্সফ্যাটের বাইরে খাদ্যপণ্য ও পানীয় লোভনীয় করতে মাছ ও ফল দ্রুত না পঁচতে কাপড়ের রঙ ও বিভিন্ন রাসায়নিক ব্যবহারের হরহামেশা খবরে আকাশ বাতাস কেঁপে উঠতো। এইসব অনাচারের বিরুদ্ধে মনোজাগতিক লড়াই তৈরি করতেই নিরাপদ খাদ্য আইন ও তদারকির জন্য কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠাতা করা হয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মাধ্যমে গড়ে তোলা এই আইনে দূষণ মিশ্রিত কোনো খাবার বিক্রি করলে বা চেষ্টা করলে, হোটেল, রেস্তোঁরা বা প্রতিষ্ঠান এই ব্যাপারে অবহেলা করলে, শর্ত ভঙ্গ করে কোনো খাদ্যদ্রব্য মজুত বা প্রস্তুত করলে, অনুমোদিত ট্রেড মার্ক নকল করে বিক্রয়ের চেষ্টা করলে ইত্যাদি এহেন ২০ ধরনের অপরাধের জন্য ২ বছর থেকে অনুর্ধ্ব ৭ বছরের কারাদণ্ড সাথে তিন লাখ টাকা থেকে অনধিক ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। একই অপরাধ পুনরায় করলে শাস্তি ও জরিমানার পরিমাণ বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।

নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের প্রবিধিমালা বাস্তবায়নে একটি রোডম্যাপ নিয়ে কাজ করছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদিত মাত্রা ২ শতাংশের বেশি ট্রান্সফ্যাট ব্যবহার করলে দণ্ডনীয় অপরাধ বলে গণ্য হবে। সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড বা ১২ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড ক্ষেত্র বিশেষ উভয় দণ্ড প্রদানের বিধান রাখা হয়েছে। জীবননাশক বা মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর কোনো রাসায়নিক বা ভারী ধাতু বা বিষাক্ত দ্রব্য মিশ্রিত কোনো খাদ্যদ্রব্য উৎপাদন, আমদানি, প্রস্তুত, মজুত, বিতরণ, বিক্রয় কিংবা বিক্রয়ের অপচেষ্টা করলেও অনুর্ধ্ব ৭ বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের মুখোমুখি হতে হবে। পুনরায় একই অপরাধে লিপ্ত হলে দ্বিগুণিতক হারে শাস্তি কার্যকরের উচ্চাকাংক্ষা জানানো হয়েছে।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার আন্তর্জাতিকভাবে অনুমোদিত নির্দেশনা, আমেরিকান খাদ্য এবং ড্রাগ প্রশাসনের নীতিমালা অনুসরণ করে ‘নিরাপদ খাদ্য আইনে’ ১৩ টি অধ্যায়, ৯০ টি ধারা, ৩৩ রকমের খাদ্য ভেজাল ও খাদ্য বিষয়ে সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হয়েছে। মানুষের প্রত্যাশিত ব্যবহার উপযোগীতা অনুযায়ী বিশুদ্ধ ও স্বাস্থ্যসম্মত আহার্য নিয়েই গভীর মমতাবোধক আজকের এই দিবস।

জাগতিক জীবনকে সুখময় করতে নিরাপদ খাদ্য শৃঙ্খলার বিধিবিধান ও সব নিয়মকানুন বেমালুম টপকে যাক এই অসমাপ্ত আকাঙ্ক্ষাতেই আজ শেষ করি।লেখকঃ খন রঞ্জন রায়,প্রবন্ধিক