নিজস্ব প্রতিবেদক: সমৃদ্ধির স্বপ্নজাগানিয়া ‘নানিয়ারচর সেতু’ উন্মুক্ত হচ্ছে বুধবার (১২ জানুয়ারি)। এতে পিছিয়ে পড়া পাহাড়ে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থায় যেমনি গতিশীলতা আসবে তেমনি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার সাথে অর্থনৈতিকভাবে উন্নয়ন হবে কৃষকসহ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের। আর সাজেকের সাথে রাঙামাটি শহরের সরাসরি সড়ক যোগাযোগ তৈরি হওয়ায় সমৃদ্ধ হবে পর্যটন সংশ্লিষ্ট খাতও। রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িসহ ছয়টি পাহাড়ি উপজেলার অন্তত পাঁচ লাখ মানুষের ভাগ্য বদলাবে সেতুটি; এমন প্রত্যাশা স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের। বুধবার সকাল দশটায় গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সেতুটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
সড়ক নেটওয়ার্কে যুক্ত হওয়া এই সেতু এখন পাহাড়ের সবচেয়ে দীর্ঘ ও দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা। ৫০০ মিটার দৈর্ঘ্য ও ১০ দশমিক ২ মিটার প্রস্থের এই সেতু নির্মাণ প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণসহ ব্যয় হয়েছে ২২০ কোটি টাকা। সেতুর নির্মাণ কাজ ২০১৬ সালের ১ নভেম্বর শুরু হয়ে শেষ হয় ৩০ জুন ২০২১। সড়ক ও জনপথ বিভাগের এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করেছে সেনাবাহিনীর ২০ ও ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কন্সট্রাকশন ব্যাটালিয়ন (ইসিবি)। রাঙামাটি-নানিয়ারচর-লংগদু, খাগড়াছড়ি-দিঘিনালা-বাঘাইছড়ি-সাজেকের বাসিন্দারা সেতুটির সরাসরি সুফল ভোগ করবে। পাহাড়ের এই আলোচিত সেতুর নাম ‘বীরশ্রেষ্ঠ ল্যান্সনায়েক মুন্সি আব্দুর রউফ সেতু’ রাখার দাবি তুলেছেন স্থানীয়রা।
বিশেষ ভৌগলিক অবস্থার কারণে পাহাড়ের সব উপজেলা এখনও সড়ক নেটওয়ার্কের আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। এর সাথে গেলো শতাব্দির মাঝামাঝি ১৯৬০ সালে ‘কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প’ নির্মাণে বাঁধ তৈরি হয়। এতে সৃষ্ট কৃত্রিম হ্রদের কারণে দূরবর্তী বেশ ক’টি উপজেলা ‘জলবন্দি’ হয়ে জেলা শহর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। সেখানে যোগাযোগ ব্যবস্থায় একমাত্র ভরসা হয়ে ওঠে নৌযান। ফলে নৌযান নির্ভর পাহাড়ে উৎপাদিত কৃষিপণ্যের সময়মতো ‘পরিবহন ও বাজারজাত’ করা যেমন কষ্টসাধ্য ও ব্যয়বহুল তেমনি যাতায়াতেও ছিল নানান সীমাবদ্ধতা।
রাঙামাটি-নানিয়ারচর-লংগদু-বাঘাইছড়ি সরাসরি সড়ক যোগাযোগ স্থাপনের জন্য ১৯৯৩ সালে পরিকল্পনা নেয়া হয়েছিল। কিন্তু নানিয়ারচরে চেঙ্গি নদীর ওপর সেতু নির্মাণে প্রকল্পটি ব্যয়বহুল হওয়ায় সে উদ্যোগ পিছিয়ে পড়ে। এরসাথে সেতু নির্মাণে পাহাড়ের আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলোর রিরোধিতাও উল্লেখযোগ্যভাবে দায়ি। তবে সেতু নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাই করে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করে বর্তমান সরকার।
২০১৫ সালের ৩১ অক্টোবর সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের মুুখ থেকে চেঙ্গি নদীর ওপর সেতু নির্মাণের ঘোষণা আসে। তবে মন্ত্রীর ঘোষণার পরেও সেতু নির্মাণ কাজে হাত দিতেই লেগে গেছে দুই বছর। গত ২০১৬ সালের ১ নভেম্বর সেনাবাহিনীর ২০ ইঞ্জিনিয়ার কন্সট্রাকশন ব্যাটেলিয়ান (ইসিবি) সেতু নির্মাণের কাজ বাস্তবায়ন শুরু হয়। অবশেষে সাড়ে চার বছরে দৃশ্যমান হওয়া সেই স্বপ্নের সেতু বুধবার উন্মুক্ত হল।
রাঙামাটি শহর থেকে সড়ক পথে নানিয়ারচরের দূরত্ব প্রায় ৪০, বাঘাইছড়ি ১৫০ ও লংগদু উপজেলা প্রায় ১৪০ কিলোমিটার। রাঙামাটির সঙ্গে নানিয়ারচর ছাড়া বাঘাইছড়ি ও লংগদু উপজেলার কোনও বাস সার্ভিস নেই। খাগড়াছড়ি হয়ে জেলা সদরে আসতে বাঘাইছড়ি থেকে সময় লাগে প্রায় ছয় ঘণ্টা। আর লংগদু থেকে পাঁচ ঘণ্টা। সরাসরি যোগাযোগের জন্য ছয়-সাত ঘণ্টা দূরত্বের নৌ-পথেই ভরসা।

নানিয়ারচর থেকে বাঘাইছড়ি ৩০ আর লংগদুর দূরত্ব প্রায় ১৮ কিলোমিটার। নানিয়ারচর সেতু হয়ে এখন এক থেকে দেড় ঘণ্টায় জেলা সদর থেকে সরাসরি বাঘাইছড়ি ও লংগদু যাওয়া যাবে। তবে নানিয়ারচর থেকে লংগদু ১৮ কিলোমিটারের সড়কটি এখনও নির্মাণ শেষ হয়নি। বাঘাইছড়ি-লংগদু সড়কের চলমান কাজ শেষ না হওয়ায় সেতু উদ্বোধনের দিন থেকে লংগদু ও বাঘাইছড়িবাসী এর সুবিধা পাচ্ছেন না।
পাহাড়ের এই আলোচিত সেতুর নাম ‘বীরশ্রেষ্ঠ ল্যান্সনায়েক মুন্সি আব্দুর রউফ সেতু’ রাখার দাবি তুলেছেন স্থানীয়রা। নানিয়ারচর উপজেলা ক্রিড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক রিপন দাশ বলেন, ‘আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের সাতজন বীরশ্রেষ্ঠ’র মধ্যে ‘বীরশ্রেষ্ঠ ল্যান্সনায়েক মুন্সি আব্দুর রউফ’ নানিয়ারচরের মাটিতে শুয়ে আছেন। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে তাঁর নামেই এই সেতুর নামকরণের দাবি জানাচ্ছি’।
মঙ্গলবার নানিয়ারচর সেতু এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, উদ্বোধন উপলক্ষে সেনাবাহিনী সেতুর উত্তর প্রান্তে মঞ্চ তৈরি করেছে। এখান থেকেই গণভবনের সাথে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভিডিও কনফারেন্সে যুক্ত হবেন সংশ্লিষ্টরা। এজন্য আনুষাঙ্গিক ব্যাপক প্রস্তুতির সাথে বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থাও জোড়দার করা হয়েছে।
নানিয়ারচর বাজার ব্যবসায়ী কমিটির সভাপতি আব্দুর রহমান (৬৩) বলেন, ‘আগে নদী পার হতেই ইঞ্জিন নৌকায় আধঘন্টা থেকে একঘন্টা লেগে যেতো। এখন মিনিটেই সেতু পার হওয়া যায়। গতি এসেছে জীবনযাত্রায়’। কৃষক নির্মল হাওলাদার (৪৭) বলেন, ‘সেতুর অভাবে মৌসুমি ফল, ফসল, সবজি পরিবহনের অভাবে বিক্রি করা যেতো না; পঁচে নষ্ট হতো। কৃষক ন্যায্য দাম পেতো না। এখন সেই কষ্ট নাই’। পল্লী চিকিৎসক ফোরকান হোসেন (৩৫) বলেন, ‘যাতায়াত ও রোগি পারাপারেও ভোগান্তি হতো। এখন সহজ হয়েছে’।
সেতু নির্মাণের ফলে যোগাযোগ ব্যবসা-বাণিজ্য, রাজনীতি ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে ব্যাপক অগ্রগতি হওয়ার প্রত্যাশা করছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও। নানিয়ারচর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান প্রগতি চাকমা বলেন, ‘সেতুর কারণে নানিয়ারচরসহ পাশের দুই উপজেলা লংগদু-বাঘাইছড়ি-সাজেক ও খাগড়াছড়ির সাথে যোগাযোগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের পথ উন্মুক্ত হবে। এতে এ অঞ্চলের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে ব্যাপক অগ্রগতি আসবে’।
রাঙামাটি সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী শাহে আরেফীন বলেন,‘নানিয়ারচর সেতু নির্মাণ প্রকল্পে ভূমি অধিগ্রহণসহ ব্যয় হয়েছে ২২০ কোটি টাকা। বুধবার সকাল দশটায় ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সেতুটির উদ্বোধন করবেন’।



