বশির আহাম্মদ,বান্দরবান প্রতিনিধি: বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার দক্ষিণে এবং নাইক্ষ্যংছড়ির পূর্ব-দক্ষিণে মিয়ানমারের আরাকান রাজ্য। দুই উপজেলার অন্তত ২০০ কিলোমিটার সীমানা মিয়ানমারের সাথে লাগোয়া। পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথ পাড়ি দিয়ে হেঁটেই পার হওয়া যায় মিয়ানমারে। আর এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে গরু চোরাকারবারীরা মিয়ানমার থেকে গরু এনে রমরমা বাণিজ্য চালিয়ে আসছে। সম্প্রতি শুরু হয়েছে নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তেও।
জানা গেছে, সীমান্তের প্রতিটি ঘরের মানুষ জড়িয়ে পড়েছে এই গরু বাণিজ্যের সাথে। আলীকদম ও নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার কুরুকপাতা, বাইশারী, তুমব্রু, বাইশফাঁড়ি, আশারতলী, জামছড়ি, বম্বনিয়া এবং রামু উপজেলার হাজিরপাড়া, মৌলভীরকাটার বেশ কিছু অসাধু চোরাকারবারী, বাজার ইজারাদার ও স্থানীয় প্রভাবশালী জনপ্রতিনিধিকে সঙ্গে নিয়ে চলছে অবৈধ এই বাণিজ্য। ফলে সরকার কোটি কোটি টাকার রাজস্ব যেমন হারাচ্ছে, ঠিক তেমনি মাদক বিস্তারের সুযোগও তৈরি করছে চক্রটি। কিন্তু গত আগস্ট থেকে সেপ্টেম্বর জুড়ে মিয়ানমার সীমান্তে সেদেশের সেনাবাহিনী ও বিদ্রোহী গ্রুপের সংঘর্ষের মধ্যেও এদেশে কিভাবে গরু ঢুকছে সেই প্রশ্ন তুলেছেন সচেতন নাগরিক সমাজ।
আগস্ট-সেপ্টেম্বর জুড়ে দুই উপজেলার সীমান্ত এলাকায় অনুসন্ধান করে জানা যায়, চোরাকারবারীরা বিজিবি, আরাকান আর্মি এবং আরসার সদস্যদের সঙ্গে আঁতাত করেই বিনা বাধায় মিয়ানমারের গরু বাংলাদেশে নিয়ে আসছে।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, এক সপ্তাহ আগে বাইশফাঁড়ি-তুমব্রু সীমান্তে বেশ কিছু গরু জড়ো করা হয় বাংলাদেশে আনার জন্য। পরে মিয়ানমারের আরসার নাম ভাঙিয়ে চক্রটি অর্থের লেনদেন করে গরুগুলো বাংলাদেশে নিয়ে আসে। চক্রটি গরু ছাড়াও মিয়ানমার থেকে ইয়াবা, বিদেশী মদ, সিগারেট, কফি ও ক্যালসিয়াম নিয়ে আসে।
অন্যদিকে আলীকদম উপজেলার মিয়ানমার সীমান্তবর্তী পোয়ামুহুরী-করুকপাতা এলাকা দিয়েও অবাধে গরু ঢুকতো। এখানকার প্রশাসন চোরাই গরু আটকে তৎপর হওয়ায় চোরাকারবারীরা রুট পাল্টে নাইক্ষ্যংছড়ির বাইশারী, ঈদগড়, কাগজিখোলা রুট ব্যবহার করছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে দায়িত্ব পালন করে গরুর চালান এলাকার বাইরে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন এসব চোরাকারবারীরা।
এক্ষেত্রে কেউ পুঁজি, আবার কেউ ক্ষমতা বিনোয়াগ করে থাকে। আর ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট প্রধানদের প্রত্যেক গরুর জন্য এক হাজার ৫০০ টাকা করে চাঁদা দিতে হয়। সে টাকা নেওয়া হয় বিভিন্ন খাতে ‘ম্যানেজ’ করার নামে।
স্থানীয়রা জানান, সম্প্রতি গরু ব্যবসার নামে যেসব ব্যক্তি সক্রিয় হয়েছেন তাদের অনেকেই ইয়াবা ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত। আবার কেউ চোরাই কাঠ ব্যবসায়ী। তাদের অনেকের নামেই রয়েছে মামলা।
এ বিষয়ে ১১ বিজিবির জোনের অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. রেজাউল করিম সাংবাদিকদের জানান, সম্প্রতি বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে চোরাই পথে আনা মিয়ানমারের অসংখ্য গরু জব্দ করে কাস্টমসে জমা দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সীমান্ত সুরক্ষার পাশাপাশি অস্ত্র, ইয়াবা, সন্ত্রাস বিরোধী কার্যক্রম ও চোরাই পথে আনা মিয়ানমারের গরুসহ সব ধরনের পণ্য আটকে বিজিবি আগের চেয়ে এখন বেশি তৎপর।
অন্যদিকে, নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা নির্বাহী অফিসার সালমা ফেরদৌস বলেন, সীমান্ত দিয়ে অবৈধ গরু প্রবেশের বিষয়ে আমরা কয়েকবার অভিযান চালিয়েছি। গরু চোরাচালান রোধে বিজিবি আগের চেয়ে অনেক সতর্কে আছে।
দুই উপজেলার সচেতন নাগরিকদের মতে, মিয়ানমারের চোরাই গরুর কারণে দেশীয় গরু খামারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। পাশাপাশি গরু ব্যবসার আড়ালে ইয়াবার বিস্তারও বেড়ে যাচ্ছে। চোরাকারবারীদের সাথে মিয়ানমারের ব্যবসায়ী ও বিজিপির সঙ্গে সম্পর্ক না থাকলে এমন পরিস্থিতিতে গরু আনা সম্ভব নয়। তাই এসব চোরাকারবারী দ্বারা রাষ্ট্রের কোন ক্ষতি হচ্ছে কিনা তাও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।




