ঢাকা ব্যুরো: মশক নিধনে আয়োজনের শেষ নেই দুই সিটি কর্পোরেশনের। কীটনাশক প্রয়োগ, পরিচ্ছন্নতা অভিযান ও সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইনে কোমর বেঁধে মাঠে নেমেছেন মেয়ররা। তবুও প্রতিদিন কেন বাড়ছে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা- এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন নগরবাসী। সিটি কর্পোরেশন বলছে, মশা মারার প্রধান হাতিয়ার কীটনাশকের কোনো ঘাটতি নেই। নিয়মিত তা প্রয়োগও করা হচ্ছে। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, পর্যাপ্ত কীটনাশক থাকলেও তা এডিস মশার বিরুদ্ধে কার্যকর নয়। দীর্ঘদিন একই ধরনের ওষুধ প্রয়োগ করায় মশারা কীটনাশক প্রতিরোধী হয়ে উঠেছে। তাই ওষুধে সুফল মিলছে না। এছাড়া কীটনাশকের মাত্রা ও মান নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন তারা।
সিটি কর্পোরেশনের দাবি ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে কীটনাশক প্রয়োগে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। পর্যাপ্ত কার্যকরী কীটনাশক মজুত রয়েছে ভাণ্ডারে। নতুন শিপমেন্ট না এলেও যা আছে তা দিয়ে আগামী ৪ মাস চলে যাবে। তাছাড়া এসব কীটনাশকের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই। কারণ, এগুলো সিটি করপোরেশনের নিজস্ব ল্যাব, আইডিসিআর ও প্ল্যান্ট প্রটেকশন ইউনিট থেকে পরীক্ষা করে শতভাগ কার্যকারিতা নিশ্চিত হয়েই তা মাঠ পর্যায়ে প্রয়োগ করা হয়।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইনের পাশাপাশি কার্যকরী মশার ওষুধ প্রয়োগের ওপর কতটা গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে- জানতে চাইলে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র আতিকুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, ওষুধ নিয়ে কিছু জটিলতা আগে ছিল; তবে এখন তা কেটে গেছে। এছাড়া কীটতত্ত্ব বিভাগের আইনকানুন মেনে ওষুধ আমদানি করা দীর্ঘসূত্রতার ব্যাপার। তবুও আমাদের কোনো ঘাটতি নেই। আগে ডেঙ্গুর লার্ভা মারার ওষুধ ছিল না, আমরা সেটাও এনেছি।
মেয়র বলেন, এক ধরনের সিন্ডিকেট বিষয়টিকে এমন জটিল করে রেখেছে, যাতে কয়েলের ব্যবসা বন্ধ না হয়। বাসাবাড়ির ছাদে, বারান্দার জমা পানিতে যে ওষুধ ছিটিয়ে দিলেই লার্ভা ধ্বংস হবে, সেই ওষুধ আমরা দিচ্ছি বাড়ি বাড়ি। তবে ‘ওভার দ্য কাউন্টারে’ এ ধরনের লার্ভা মারার ওষুধ যত দ্রুত মানুষ ফার্মেসি থেকে কিনে নিজেরা প্রয়োগ করতে পারবে, তত দ্রুত ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে। এর জন্য যত ধরনের জটিলতা রয়েছে, তা দূর করার চেষ্টা করছি।
তিনি আরো বলেন, আগে একটা কোম্পানির কীটনাশক আমদানির অনুমতি ছিল। এখন তা উন্মুক্ত করে দেয়া হয়েছে। বেসরকারি কোম্পানি যদি সেই কীটনাশক এনে আমাদের সঙ্গে ব্যবসা করতে চায়, আমরা স্বাগত জানাই। তাদের মাধ্যমে এসব ওষুধ এনে দোকানে দোকানে বিক্রির ব্যবস্থা করব।
বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য : ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে পরিচ্ছন্নতা অভিযান ও ক্যাম্পেইনের পাশাপাশি কীটনাশক বাছাইয়ের ক্ষেত্রে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, মশা দমনের জন্য আমাদের দেশে দীর্ঘদিন ধরে একই ধরনের কীটনাশক ব্যবহারের ফলে মশা কীটনাশক প্রতিরোধী হয়ে উঠেছে। তাই পুরনো ও একই ধরনের কীটনাশক বাদ দিয়ে নতুন ও কার্যকরী কীটনাশক (লার্ভিসাইড ও এডাল্টিসাইড) যোগ করতে হবে। কীটনাশক বাছাই করার আগে তা প্রথমে ল্যাবরেটরিতে যথাযথ টেস্ট (টক্সিসিটি বায়োঅ্যাসে) করতে হবে। বিভিন্ন দেশে সফলতার সঙ্গে ব্যবহৃত লার্ভিসাইড বিটিআই তথা বেসিলাস থুরেনজেনিসিস (পাউডার), স্পাইনোসাদ, গ্রোথ রেগুলেটরস আমাদের দেশেও পরীক্ষামূলকভাবে প্রয়োগ করা যেতে পারে।
কীটতত্ত্ববিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার বলেন, জানা মতে বর্তমানে সিটি করপোরেশনে যথেষ্ট কীটনাশক মজুত রয়েছে। তবে প্রতিটি প্রজাতির মশা কীটনাশক ও প্রকৃতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে তাদের জিনগত পরিবর্তন করে থাকে। যে কীটনাশক এখন দেয়া হচ্ছে বা বিগত দুই থেকে তিন বছর ধরে দেয়া হচ্ছে, এখন এটার বিরুদ্ধে মশা সহনশীলতা তৈরি করে ফেলেছে। এটাকে ইনসেক্টিসাইড রেজিস্ট্যান্স বা কীটনাশক সহনশীলতা বলা হয়। একটা সময়ে এটা এদের জিনগত সহনশীলতায় পরিবর্তন নিয়ে আসে, যা পরবর্তী প্রজন্মেও চলে যায়। এ কারণে মশার ওষুধ আর কাজ করছে না।
কর্পোরেশন সূত্র জানায়, করোনা পরিস্থিতির কারণে ২০২০ সালের মার্চের পর মশক নিয়ন্ত্রণের উল্লেখযোগ্য নতুন কার্যকর কোনো ওষুধ আমদানি করতে পারেনি দুই সিটি কর্পোরেশন। একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের চক্রান্তের কারণে কীটনাশক দ্রুত আনা সম্ভব হয়নি। এছাড়া ভেজাল ওষুধ সরবরাহ, ট্রায়াল শেষ না হতেই ওষুধ ক্রয়, ওষুধে পানি মিশিয়ে ব্যবহারের ফলে কার্যকারিতা হারাচ্ছে মশা নিধনের এসব ওষুধ। নিয়মিত ওষুধ ছিটানোসহ মশা নিয়ন্ত্রণে যাবতীয় কাজে গাফিলতি ছিল। পর্যাপ্ত ওষুধ মজুত আছে কিনা বা যতটুকু আছে তার কার্যকারিতার বিষয়েও নজরদারি নেই।
বিশেষ করে দক্ষিণ সিটি (ডিএসসিসিতে) ব্যবহৃত ওষুধের বেশির ভাগই মেয়াদোত্তীর্ণ ও মিক্সিং। অতিরিক্ত পানি মিশিয়ে ওষুধ ছিটানোয় কোনো কাজে আসছে না। বর্তমানে ব্যবহৃত ওষুধগুলো আগে এরোসল ও কয়েল কোম্পানিতে বিক্রি হতো। এরাই ওষুধ কিনে নিয়ে নগর ভবনের ওষুধের সঙ্গে পানি মিশিয়ে দিচ্ছে। এছাড়া মাঠপর্যায়ের জনপ্রতিনিধিদের দাবি- উত্তর সিটিতে ডেঙ্গুর লার্ভা মারতে নোভালিউরন নামের যে ট্যাবলেট দেয়া হচ্ছে, তাতে মশা মরছে না। এই ট্যাবলেট যে প্রাণীর দেহে ‘কাইটিন’ নামে একটি উপাদান রয়েছে, শুধু সেসব প্রাণীর লার্ভা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
জানতে চাইলে ডিএনসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা জোবাইদুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, অন্যান্য আধুনিক দেশের দিকে তাকালে বোঝা যাবে তাদের তুলনায় আমাদের দেশে ডেঙ্গু অনেকটাই কন্ট্রোলে রয়েছে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আমরা কীটনাশক প্রয়োগের ব্যাপারে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি। তিনি বলেন, পর্যান্ত কার্যকরী কীটনাশক মজুত রয়েছে ভাণ্ডারে। নতুন শিপমেন্ট না এলেও যা আছে তা দিয়ে আগামী ৪ মাস চলে যাবে।
বর্তমানে কি কি ধরনের কীটনাশক ব্যবহার করা হচ্ছে এবং তার কার্যকারিতা কতটুকু- জানতে চাইলে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা জোবাইদুর রহমান বলেন, মেলাথিয়ন এলাকাভিত্তিক প্রয়োগ করা হচ্ছে। মেলাথিয়ন-ফিফটি সেভেন ই-সি ফগিংয়ের জন্য দেয়া হচ্ছে। এছাড়া (টেমিফস-৫০ ইসি) লার্ভিসাইট করা হচ্ছে। ম্যালেরিয়া ওয়েল-বি, নোভালুরন ট্যাবলেট দিয়েছি বাড়ি বাড়ি লার্ভা নষ্ট করতে। তিন মাস পর্যন্ত এই ট্যাবলেটের কার্যকারিতা থাকে। তবে ৩ মাস অপেক্ষা না করে ১ মাস পর আবারো ট্যাবলেট দিচ্ছি। তিনি বলেন, এসব কীটনাশকের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই কারণ, এগুলো সিটি করপোরেশনের নিজস্ব ল্যাব, আইডিসিআর ও প্ল্যান্ট প্রটেকশন ইউনিট থেকে পরীক্ষা করে শতভাগ কার্যকারিতা নিশ্চিত হয়েই আমরা প্রয়োগ করি।
কীটনাশক ক্রয়ে সিন্ডিকেট বৈরী : সূত্র জানায়, কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন ‘প্ল্যান্ট প্রটেকশন উইং’ কীটনাশকের নিয়ন্ত্রণ সংস্থা হিসেবে কাজ করে। কোনো প্রতিষ্ঠান দেশের বাইরে থেকে কীটনাশক এনে দেশে ব্যবসা করতে চাইলে প্রথমে ছাড়পত্রের জন্য এখানে লিখিত আবেদন করে। আবেদনের পর প্রথমে এই উইং থেকে আবেদন ও ওষুধের নমুনা জমা দিয়ে রাখতে বলা হয়। নির্দিষ্ট কোম্পানিকে তারা সময়মতো ডাকবে। এরপর গুরুত্বের ওপর ভিত্তি করে পর্যায়ক্রমে আবেদনগুলো ‘সাবপিট্যাক’ মিটিংয়ে উঠানো হয়।
ওই মিটিংয়ে আলোচনা করে স্যাম্পল ঘেঁটে পরের মিটিংয়ে ওষুধটি ব্যবহার উপযোগী হবে কিনা, তা পরীক্ষা করতে ল্যাবে পাঠানোর প্রস্তাব দেয়া হয়। পরবর্তী সময়ে ‘কেমিক্যাল কম্পোজিশনের’ মাধ্যমে একটি ভাগ প্ল্যান প্রটেকশন উইংয়ের নিজেদের ল্যাব এবং অন্য ভাগটি রোগতত্ত্ব গবেষণা প্রতিষ্ঠানে (আইইডিসিআর) পাঠানো হয়। এ দুটি রিপোর্ট আসার পর তা পরবর্তী ‘সাবপিট্যাক’ মিটিংয়ে দেয়া হয় এবং যাচাই-বাছাই করে রেজিস্ট্রেশনের ছাড়পত্র দেয়া হয়।
এসব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে ৮ থেকে ১১ মাস সময় লেগে যায়। উইংয়ের কয়েকজন কীটতত্ত্ববিদ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এ প্রক্রিয়াগুলো দীর্ঘদিন ধরে ঝুলিয়ে রাখেন। সূত্র জানায়, এসব কাজ দ্রুত করতে গেলে কোম্পানির মালিকদের গুনতে হয় মোটা অঙ্কের টাকা। সিটি করপোরেশন থেকে ডেঙ্গু নিধনের ওষুধ আনতেও এই প্ল্যান প্রটেকশন উইংয়ে ঘুরতে হচ্ছে প্রায় সাত মাস ধরে।



