বিশেষ প্রতিবেদক: ১০ বছর আগে স্বামী ফরহাদ শেখের সঙ্গে বিচ্ছেদ হয় হনুফা বেগমের। তিন সন্তানকে নিয়ে কখনো নদীর চরে, কখনো ব্রিজের ঢালে, রাস্তার পাশে, কখনো বা অন্যের আশ্রয়ে থেকেছেন তিনি। রাস্তায় রাস্তায় থাকায় নিজের বাবা-মাও পরিচয় দিতেন না। সব কষ্ট বুকে জমিয়ে নারী হয়েও পুরুষদের মতোই ক্ষেত-খামারে কাজ করেছেন সন্তানদের মানুষ করার জন্য। স্বল্প আয়ে টানাটানির সংসারের চাকা ঘুরিয়ে কখনো নিজে বাড়ির মালিক হবেন, সেটি স্বপ্নেও ভাবেননি। সেখানে স্বাবলম্বী হয়ে ওঠা তো বিলাসিতার মতোই। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেয়া উপহারের ঘর ঘুরিয়ে দিয়েছে হনুফার জীবনের চাকা। নিজেই লালনপালন করছেন গরু-ছাগল ও হাঁস-মুরগি।

ঘরের সামনে চাষ করছেন বেগুন, পেঁপে, পুঁইশাকসহ বিভিন্ন শাকসবজি। লাগিয়েছেন মাল্টা, কলা আমলকিসহ বিভিন্ন ফলের গাছও। ঘর পাওয়ার পর স্বাবলম্বী হয়ে ওঠা হনুফার স্বপ্নের রাজমহলে এখন শুধুই সুখের বন্যা। হনুফা বেগমের ৩ ঘর পরের বাসিন্দা আরজিনা বেগমও জানালেন তাদের ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প। শুধু হনুফা ও আরজিনা বেগমই নয়, বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার গৌরম্ভা আশ্রয়ণ প্রকল্পে গিয়ে ঘর পাওয়া গৃহহীন ভূমিহীন মানুষের পাল্টে যাওয়া জীবনের গল্প শোনার সময় উচ্ছাস চোখে পড়ে। এক সময় যাদের ছিল না মাথা গোঁজার ঠাঁই, উন্নত জীবনযাপন ছিল যাদের কাছে আকাশকুসুম কল্পনা মাত্র। প্রধানমন্ত্রীর দেয়া জমিসহ পাকা ঘর পেয়ে এখন বদলে গেছে তাদের সবার জীবনজীবিকার গল্প। স্বপ্নের ঘর বুঝে পাওয়ার পর নিজেদের পছন্দমতো তা সাজিয়ে তুলেছেন সবাই। সেইসঙ্গে গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছেন প্রধানমন্ত্রীর প্রতি।

সরেজমিন গৌরম্ভা আশ্রয়ণ প্রকল্প ঘুরে দেখা যায়, সারিবদ্ধভাবে লাল রঙিন টিনের চকচকে ঘর। ঘরগুলোর সামনে ছোট্ট বাগান। বাগানে চাষ করা হচ্ছে বেগুন, পেয়ারা, আমলকী, পেঁপে, কলা ও শাকসবজি, যা নিজেরা খেয়ে বিক্রিও করছেন এসব ঘরের বাসিন্দারা। আবার কেউ কেউ গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগি লালনপালন করছেন। এসব বিক্রি করেও অনেকটাই স্বাবলম্বী তারা। এছাড়াও আশ্রয়ণ প্রকল্পটিতে রয়েছে বিশালাকৃতির দুটি পুকুর। যেখানে মাছ চাষ করে সমানভাবে লাভবান হচ্ছেন সবাই।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত বাগেরহাট জেলার ৯ উপজেলার ভূমিহীন ও গৃহহীন ১ হাজার ৬৩৭ পরিবার ঘর বুঝে পেয়েছেন। বর্তমানে তারা সবাই স্বাবলম্বী। গৌরম্ভা আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা হনুফা বেগম ভোরের কাগজকে বলেন, ১ বছর ৫ মাস আগে ঘর বুঝে পান তিনি। প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতায় এখন ঘরের সামনে সবজি চাষ করছেন, গরুছাগল হাঁসমুরগি লালনপালন করছেন। এখন আর তার অভাব বলতে কিছু নেই। আগের মতো আর কষ্টের কাজ করে টাকা উপার্জন করা লাগে না। দুই ছেলে নাজমুল শেখ ও আলী আকব্বরকে ভ্যান কিনে দেয়ার পরিকল্পনা করছেন। ছেলেরা উপার্জন শুরু করলে দিন আরো বদলে যাবে বলে আশা করেন তিনি।

গৃহবধূ আরজিনা বেগম বলেন, একসময় আলোকদিয়া চরে থাকতেন। সেখান থেকে উচ্ছেদ করার পর মানুষের বাড়িতে ভাড়া থাকতেন। স্বামী হুমায়ুন শেখ দিনমজুরের কাজ করে অনেক কষ্টে সংসার চালাত। এখানে ঘর পাওয়ার পর পাল্টে গেছে চিত্র। ঘরভাড়া দেয়া লাগে না। নিজেই সবজি চাষ করে বাড়তি উপার্জন করে সংসারে সহযোগিতা করতে পারছেন। দুই ছেলে লিমন শেখ ও মুছাব্বির শেখকে পড়াশুনা করাচ্ছেন। ছেলেদের মানুষের মতো মানুষ করাই আরজিনা বেগমের একমাত্র স্বপ্ন।

আরেক বাসিন্দা আলামিন শেখ বলেন, কাঠমিস্ত্রির কাজ করে অনেক কষ্টে সংসার চালাতাম। জীবনে মানুষের ১৫০-২০০ ঘর নিজ হাতে গড়েছি। সবসময় ভাবতাম কবে নিজের জমি হবে, আর কবে নিজের ঘর নিজ হাতে তৈরি করব। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাদের জমিসহ ঘর উপহার দিয়েছেন। ঘরে নিজের কাজ করা লাগেনি। তবে স্বপ্ন পূরণে নিজ হাতে একটি রান্নাঘর তৈরি করেছি। রান্না ঘরটিতে এ প্রতিবেদককে নিয়ে গিয়ে অশ্রæসিক্ত চোখে আলামিন শেখ বলেন, এটি শুধু ঘর নয়, আমাদের স্বপ্ন। এজন্য নিজ হাতে সাজিয়ে তুলছি। তার বাড়ির সামনের পুকুর দেখিয়ে বলেন, এখানে বিভিন্ন মাছ চাষ করি আমরাই। যা লাভ হয় সবাই মিলে ভাগ করে নেই। পুকুরে মাছ চাষ করে সব খরচ বাদেও প্রত্যেক পরিবার মাসে ১৫০০-২০০০টাকা আয় করে বলে জানালেন তিনি।

শহিদুল ইসলাম নামে এক বাসিন্দা বলেন, আদাঘাট চরে থাকতাম। সেখানে খনন করার সময় তাড়িয়ে দিছে। নছিমন চালিয়ে যা আয় করি, সংসারই চলত না। প্রায় মাসে বাসাভাড়া বাকি পড়ত। এখানে ঘর পাওয়ার পর আর সমস্যা নাই। মনমতো সবজি লাগাইছি। যা আয় করি, ভালোভাবে বাজারের টাকা হয়ে যায়।

ঘর পাচ্ছেন আলোর পথে ফেরা জলদস্যুরাও: ভূমিহীন গৃহহীন মানুষের মতোই আলোর পথে ফেরা ঠিকানাহীন জলদস্যুদেরও নতুন ঘর দিচ্ছে সরকার। তেমনি একজন আবদুল মান্নান। তিনি বলেন, বাবার চিকিৎসা খরচ জোগাতে মাছ ধরে উপার্জন করতে গিয়ে জলদস্যুতায় জড়িয়ে পড়ি। দীর্ঘ ১৪ বছর অন্ধকার পথে চলার পর আত্মসমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছি। নিজের ঘরবাড়ি জমি কিছুই ছিল না। সরকার শ্রীফলতলা আশ্রয়ণ প্রকল্পে একটি ঘর দিতে যাচ্ছে। দোয়া করবেন, পরিবার নিয়ে যেন ভালো থাকতে পারি। ঘর উপহার দেয়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন হান্নান।

আবদুল হান্নানের সঙ্গে বাগেরহাটের শ্রীফলতলা আশ্রয়ণ প্রকল্প এলাকায় ঘর পেতে যাওয়া জিয়াউর রহমান জানান, সুন্দরবনে মাছ ধরতে গেলে জলদস্যুরা তাকে অপহরণ করে ৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। মুক্তিপণের টাকা দিতে না পেরে নিজেই যুক্ত হয়ে যান দস্যুদের দলে। তিনি বলেন, অন্ধকার জীবন থেকে ফিরে নসিমন চালিয়ে স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন করছি। ঘর পাওয়ার পর আরো ভালোভাবে জীবনযাপন করতে পারব।

আশ্রয়ণ প্রকল্প বিষয়ে জানতে চাইলে বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. আজিজুর রহমান বলেন, বাগেরহাটে ৪ হাজার ৯৬৩ জন ভূমিহীন ও গৃহহীন রয়েছেন। এর মধ্যে ১ হাজার ৬৩৭টি পরিবারকে এরই মধ্যে জমিসহ ঘর উপহার দেয়া হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার আরো ৫০০টি পরিবারকে নতুন ঘর দেয়া হবে। এ উপলক্ষে ঘরগুলোর কাজ এরই মধ্যে সম্পন্ন করা হয়েছে এবং সব ধরনের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। ডিসি বলেন, ইতোমধ্যে যারা ঘর পেয়েছেন তারা দিনমজুর, গৃহকর্মী, ভ্যান চালক, ভিক্ষুকসহ নি¤œ আয়ের মানুষ। এমন জায়গায় ঘরগুলো করা হয়েছে, যাতে তারা সহজে জীবিকা নির্বাহের ব্যবস্থা করতে পারেন। তাদের অনেকে এখন চিংড়ি ঘেরে কাজ করেন। জীবিকা নির্বাহে তাদের চাষাবাদের ব্যবস্থা করা, ক্ষুদ্রঋণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। চাষাবাদ করতে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। ফলে তারা এখন চাষাবাদ করেও স্বাবলম্বী হচ্ছেন। মাদক, কিশোর গ্যাং রোধে মোটিভেট করা হয়েছে। আমরা প্রায়শই ওই সব গুচ্ছগ্রাম পরিদর্শনে যাই এবং মনিটর করে থাকি। ঘর পাওয়া মানুষগুলো এখন এতটাই খুশি যে, তারা প্রধানমন্ত্রীর জন্য দোয়া করেন।

আজ ঘর হস্তান্তর করবেন প্রধানমন্ত্রী: আজ বৃহস্পতিবার ৫২ উপজেলায় ২৬ হাজার ২২৯টি ঘর হস্তান্তর করবেন প্রধানমন্ত্রী। গণভবন থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে তৃতীয় পর্যায়ের ২য় ধাপে এসব ঘর হস্তান্তর করা হবে। এ উপলক্ষে ৫ জেলার কয়েকটি স্থান থেকে ভিডিও কনফারেন্সে যুক্ত থাকবেন জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্টরা।

আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের তথ্যানুযায়ী, এর আগে তিন দফায় ১ লাখ ৮৫ হাজার ১২৯টি ঘর পেয়েছেন গৃহহীনরা। এ প্রকল্পে এ পর্যন্ত বরাদ্দ করা অর্থের পরিমাণ ৪ হাজার ২৮ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ে নির্মিত মোট একক ঘরের সংখ্যা ১ লাখ ১৭ হাজার ৩২৯টি। বর্তমানে তৃতীয় পর্যায়ে বরাদ্দ হচ্ছে ৬৭ হাজার ৮০০টি। এর মধ্যে গত ২৬ এপ্রিল হস্তান্তর হয় ৩২ হাজার ৯০৪টি। তৃতীয় পর্যায়ে চরাঞ্চলে বরাদ্দকৃত বিশেষ নকশার ঘরের সংখ্যা ১ হাজার ২৪২টি। বর্তমানে আরো ৮ হাজার ৬৬৭টি ঘর নির্মাণাধীন রয়েছে।

বিশেষ প্রতিবেদক: ১০ বছর আগে স্বামী ফরহাদ শেখের সঙ্গে বিচ্ছেদ হয় হনুফা বেগমের। তিন সন্তানকে নিয়ে কখনো নদীর চরে, কখনো ব্রিজের ঢালে, রাস্তার পাশে, কখনো বা অন্যের আশ্রয়ে থেকেছেন তিনি। রাস্তায় রাস্তায় থাকায় নিজের বাবা-মাও পরিচয় দিতেন না। সব কষ্ট বুকে জমিয়ে নারী হয়েও পুরুষদের মতোই ক্ষেত-খামারে কাজ করেছেন সন্তানদের মানুষ করার জন্য। স্বল্প আয়ে টানাটানির সংসারের চাকা ঘুরিয়ে কখনো নিজে বাড়ির মালিক হবেন, সেটি স্বপ্নেও ভাবেননি। সেখানে স্বাবলম্বী হয়ে ওঠা তো বিলাসিতার মতোই। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেয়া উপহারের ঘর ঘুরিয়ে দিয়েছে হনুফার জীবনের চাকা। নিজেই লালনপালন করছেন গরু-ছাগল ও হাঁস-মুরগি।

ঘরের সামনে চাষ করছেন বেগুন, পেঁপে, পুঁইশাকসহ বিভিন্ন শাকসবজি। লাগিয়েছেন মাল্টা, কলা আমলকিসহ বিভিন্ন ফলের গাছও। ঘর পাওয়ার পর স্বাবলম্বী হয়ে ওঠা হনুফার স্বপ্নের রাজমহলে এখন শুধুই সুখের বন্যা। হনুফা বেগমের ৩ ঘর পরের বাসিন্দা আরজিনা বেগমও জানালেন তাদের ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প। শুধু হনুফা ও আরজিনা বেগমই নয়, বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার গৌরম্ভা আশ্রয়ণ প্রকল্পে গিয়ে ঘর পাওয়া গৃহহীন ভূমিহীন মানুষের পাল্টে যাওয়া জীবনের গল্প শোনার সময় উচ্ছাস চোখে পড়ে। এক সময় যাদের ছিল না মাথা গোঁজার ঠাঁই, উন্নত জীবনযাপন ছিল যাদের কাছে আকাশকুসুম কল্পনা মাত্র। প্রধানমন্ত্রীর দেয়া জমিসহ পাকা ঘর পেয়ে এখন বদলে গেছে তাদের সবার জীবনজীবিকার গল্প। স্বপ্নের ঘর বুঝে পাওয়ার পর নিজেদের পছন্দমতো তা সাজিয়ে তুলেছেন সবাই। সেইসঙ্গে গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছেন প্রধানমন্ত্রীর প্রতি।

সরেজমিন গৌরম্ভা আশ্রয়ণ প্রকল্প ঘুরে দেখা যায়, সারিবদ্ধভাবে লাল রঙিন টিনের চকচকে ঘর। ঘরগুলোর সামনে ছোট্ট বাগান। বাগানে চাষ করা হচ্ছে বেগুন, পেয়ারা, আমলকী, পেঁপে, কলা ও শাকসবজি, যা নিজেরা খেয়ে বিক্রিও করছেন এসব ঘরের বাসিন্দারা। আবার কেউ কেউ গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগি লালনপালন করছেন। এসব বিক্রি করেও অনেকটাই স্বাবলম্বী তারা। এছাড়াও আশ্রয়ণ প্রকল্পটিতে রয়েছে বিশালাকৃতির দুটি পুকুর। যেখানে মাছ চাষ করে সমানভাবে লাভবান হচ্ছেন সবাই।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত বাগেরহাট জেলার ৯ উপজেলার ভূমিহীন ও গৃহহীন ১ হাজার ৬৩৭ পরিবার ঘর বুঝে পেয়েছেন। বর্তমানে তারা সবাই স্বাবলম্বী। গৌরম্ভা আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা হনুফা বেগম ভোরের কাগজকে বলেন, ১ বছর ৫ মাস আগে ঘর বুঝে পান তিনি। প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতায় এখন ঘরের সামনে সবজি চাষ করছেন, গরুছাগল হাঁসমুরগি লালনপালন করছেন। এখন আর তার অভাব বলতে কিছু নেই। আগের মতো আর কষ্টের কাজ করে টাকা উপার্জন করা লাগে না। দুই ছেলে নাজমুল শেখ ও আলী আকব্বরকে ভ্যান কিনে দেয়ার পরিকল্পনা করছেন। ছেলেরা উপার্জন শুরু করলে দিন আরো বদলে যাবে বলে আশা করেন তিনি।

গৃহবধূ আরজিনা বেগম বলেন, একসময় আলোকদিয়া চরে থাকতেন। সেখান থেকে উচ্ছেদ করার পর মানুষের বাড়িতে ভাড়া থাকতেন। স্বামী হুমায়ুন শেখ দিনমজুরের কাজ করে অনেক কষ্টে সংসার চালাত। এখানে ঘর পাওয়ার পর পাল্টে গেছে চিত্র। ঘরভাড়া দেয়া লাগে না। নিজেই সবজি চাষ করে বাড়তি উপার্জন করে সংসারে সহযোগিতা করতে পারছেন। দুই ছেলে লিমন শেখ ও মুছাব্বির শেখকে পড়াশুনা করাচ্ছেন। ছেলেদের মানুষের মতো মানুষ করাই আরজিনা বেগমের একমাত্র স্বপ্ন।

আরেক বাসিন্দা আলামিন শেখ বলেন, কাঠমিস্ত্রির কাজ করে অনেক কষ্টে সংসার চালাতাম। জীবনে মানুষের ১৫০-২০০ ঘর নিজ হাতে গড়েছি। সবসময় ভাবতাম কবে নিজের জমি হবে, আর কবে নিজের ঘর নিজ হাতে তৈরি করব। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাদের জমিসহ ঘর উপহার দিয়েছেন। ঘরে নিজের কাজ করা লাগেনি। তবে স্বপ্ন পূরণে নিজ হাতে একটি রান্নাঘর তৈরি করেছি। রান্না ঘরটিতে এ প্রতিবেদককে নিয়ে গিয়ে অশ্রæসিক্ত চোখে আলামিন শেখ বলেন, এটি শুধু ঘর নয়, আমাদের স্বপ্ন। এজন্য নিজ হাতে সাজিয়ে তুলছি। তার বাড়ির সামনের পুকুর দেখিয়ে বলেন, এখানে বিভিন্ন মাছ চাষ করি আমরাই। যা লাভ হয় সবাই মিলে ভাগ করে নেই। পুকুরে মাছ চাষ করে সব খরচ বাদেও প্রত্যেক পরিবার মাসে ১৫০০-২০০০টাকা আয় করে বলে জানালেন তিনি।

শহিদুল ইসলাম নামে এক বাসিন্দা বলেন, আদাঘাট চরে থাকতাম। সেখানে খনন করার সময় তাড়িয়ে দিছে। নছিমন চালিয়ে যা আয় করি, সংসারই চলত না। প্রায় মাসে বাসাভাড়া বাকি পড়ত। এখানে ঘর পাওয়ার পর আর সমস্যা নাই। মনমতো সবজি লাগাইছি। যা আয় করি, ভালোভাবে বাজারের টাকা হয়ে যায়।

ঘর পাচ্ছেন আলোর পথে ফেরা জলদস্যুরাও: ভূমিহীন গৃহহীন মানুষের মতোই আলোর পথে ফেরা ঠিকানাহীন জলদস্যুদেরও নতুন ঘর দিচ্ছে সরকার। তেমনি একজন আবদুল মান্নান। তিনি বলেন, বাবার চিকিৎসা খরচ জোগাতে মাছ ধরে উপার্জন করতে গিয়ে জলদস্যুতায় জড়িয়ে পড়ি। দীর্ঘ ১৪ বছর অন্ধকার পথে চলার পর আত্মসমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছি। নিজের ঘরবাড়ি জমি কিছুই ছিল না। সরকার শ্রীফলতলা আশ্রয়ণ প্রকল্পে একটি ঘর দিতে যাচ্ছে। দোয়া করবেন, পরিবার নিয়ে যেন ভালো থাকতে পারি। ঘর উপহার দেয়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন হান্নান।

আবদুল হান্নানের সঙ্গে বাগেরহাটের শ্রীফলতলা আশ্রয়ণ প্রকল্প এলাকায় ঘর পেতে যাওয়া জিয়াউর রহমান জানান, সুন্দরবনে মাছ ধরতে গেলে জলদস্যুরা তাকে অপহরণ করে ৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। মুক্তিপণের টাকা দিতে না পেরে নিজেই যুক্ত হয়ে যান দস্যুদের দলে। তিনি বলেন, অন্ধকার জীবন থেকে ফিরে নসিমন চালিয়ে স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন করছি। ঘর পাওয়ার পর আরো ভালোভাবে জীবনযাপন করতে পারব।

আশ্রয়ণ প্রকল্প বিষয়ে জানতে চাইলে বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. আজিজুর রহমান বলেন, বাগেরহাটে ৪ হাজার ৯৬৩ জন ভূমিহীন ও গৃহহীন রয়েছেন। এর মধ্যে ১ হাজার ৬৩৭টি পরিবারকে এরই মধ্যে জমিসহ ঘর উপহার দেয়া হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার আরো ৫০০টি পরিবারকে নতুন ঘর দেয়া হবে। এ উপলক্ষে ঘরগুলোর কাজ এরই মধ্যে সম্পন্ন করা হয়েছে এবং সব ধরনের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। ডিসি বলেন, ইতোমধ্যে যারা ঘর পেয়েছেন তারা দিনমজুর, গৃহকর্মী, ভ্যান চালক, ভিক্ষুকসহ নি¤œ আয়ের মানুষ। এমন জায়গায় ঘরগুলো করা হয়েছে, যাতে তারা সহজে জীবিকা নির্বাহের ব্যবস্থা করতে পারেন। তাদের অনেকে এখন চিংড়ি ঘেরে কাজ করেন। জীবিকা নির্বাহে তাদের চাষাবাদের ব্যবস্থা করা, ক্ষুদ্রঋণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। চাষাবাদ করতে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। ফলে তারা এখন চাষাবাদ করেও স্বাবলম্বী হচ্ছেন। মাদক, কিশোর গ্যাং রোধে মোটিভেট করা হয়েছে। আমরা প্রায়শই ওই সব গুচ্ছগ্রাম পরিদর্শনে যাই এবং মনিটর করে থাকি। ঘর পাওয়া মানুষগুলো এখন এতটাই খুশি যে, তারা প্রধানমন্ত্রীর জন্য দোয়া করেন।

আজ ঘর হস্তান্তর করবেন প্রধানমন্ত্রী: আজ বৃহস্পতিবার ৫২ উপজেলায় ২৬ হাজার ২২৯টি ঘর হস্তান্তর করবেন প্রধানমন্ত্রী। গণভবন থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে তৃতীয় পর্যায়ের ২য় ধাপে এসব ঘর হস্তান্তর করা হবে। এ উপলক্ষে ৫ জেলার কয়েকটি স্থান থেকে ভিডিও কনফারেন্সে যুক্ত থাকবেন জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্টরা।

আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের তথ্যানুযায়ী, এর আগে তিন দফায় ১ লাখ ৮৫ হাজার ১২৯টি ঘর পেয়েছেন গৃহহীনরা। এ প্রকল্পে এ পর্যন্ত বরাদ্দ করা অর্থের পরিমাণ ৪ হাজার ২৮ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ে নির্মিত মোট একক ঘরের সংখ্যা ১ লাখ ১৭ হাজার ৩২৯টি। বর্তমানে তৃতীয় পর্যায়ে বরাদ্দ হচ্ছে ৬৭ হাজার ৮০০টি। এর মধ্যে গত ২৬ এপ্রিল হস্তান্তর হয় ৩২ হাজার ৯০৪টি। তৃতীয় পর্যায়ে চরাঞ্চলে বরাদ্দকৃত বিশেষ নকশার ঘরের সংখ্যা ১ হাজার ২৪২টি। বর্তমানে আরো ৮ হাজার ৬৬৭টি ঘর নির্মাণাধীন রয়েছে।