মাহবুবুর রহমান: দুর্নীতিমুক্ত, দক্ষ, স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও জনবান্ধব জনপ্রশাসন প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা দীর্ঘদিনের। রাষ্ট্র পরিচালনায় যোগ্যতা, সততা ও পেশাদারত্বকে প্রাধান্য দেওয়ার লক্ষ্যে বিভিন্ন সময়ে নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামোয় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন এখনো দৃশ্যমান নয়। নিয়োগ, পদায়ন, বদলি ও পদোন্নতিতে মেধা ও দক্ষতার পরিবর্তে রাজনৈতিক বিবেচনা, দলীয় আনুগত্য এবং প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও দীর্ঘদিনের। এমন বাস্তবতায় ‘মেরিটোক্রেসির বাংলাদেশ’ গড়ার অঙ্গীকার করেছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার। তবে সেই অঙ্গীকার বাস্তবায়নে জনপ্রশাসন সংস্কারের কার্যকর উদ্যোগ কতদূর এগিয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাষ্ট্রের বিভিন্ন খাতের পাশাপাশি জনপ্রশাসন সংস্কারের বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার প্রশাসনকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, দক্ষ ও জনমুখী করার লক্ষ্যে ২০২৪ সালের ৩ অক্টোবর সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা আব্দুল মুয়ীদ চৌধুরীর নেতৃত্বে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন গঠন করে। কমিশন চার মাসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেয়। এতে প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্বিন্যাস থেকে শুরু করে নিয়োগ, পদোন্নতি, জবাবদিহিতা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার বিষয়ে দুই শতাধিক সুপারিশ করা হয়।

তবে কমিশনের প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পরও সুপারিশগুলোর উল্লেখযোগ্য অংশ বাস্তবায়নের উদ্যোগ দৃশ্যমান হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও সংস্কারের অগ্রগতি প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। পরবর্তী সময়ে বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরও নতুন করে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন গঠন কিংবা আগের সুপারিশ বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যায়নি বলে সংশ্লিষ্টদের অনেকে মনে করছেন।

মেধার মূল্যায়নই কি হবে প্রশাসনের প্রধান ভিত্তি?
বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে ‘মেরিটোক্রেসির বাংলাদেশ’ বিনির্মাণের যে অঙ্গীকার করা হয়েছে, তার মূল লক্ষ্য হলো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে যোগ্যতা, সততা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও পেশাদারত্বের ভিত্তিতে জনবল ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা। এ ব্যবস্থায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়োগ, পদায়ন, বদলি ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে দলীয় পরিচয় কিংবা রাজনৈতিক আনুগত্যের পরিবর্তে যোগ্যতাকে প্রাধান্য দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

ইশতেহারে আরও বলা হয়েছে, ব্যক্তির বিশ্বাস, অবিশ্বাস কিংবা দলীয় আনুগত্য বিবেচনায় না নিয়ে সততা, মেধা, দক্ষতা, যোগ্যতা, দেশপ্রেম ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে প্রশাসন, পুলিশসহ রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে। নিয়োগপ্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় সংস্কার, সংবিধানের আলোকে যথোপযুক্ত সিভিল সার্ভিস আইন প্রণয়ন এবং প্রশাসনের সব পর্যায়ে ই-গভর্নেন্স চালুর প্রতিশ্রুতিও রয়েছে।

কিন্তু প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধান দূর করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। জনপ্রশাসনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘদিনের দলীয়করণ, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং প্রশাসনিক অনিয়মের সংস্কৃতি পরিবর্তন না হলে কেবল নীতিগত ঘোষণা দিয়ে মেধাভিত্তিক প্রশাসন প্রতিষ্ঠা করা কঠিন হবে।

সংস্কার কমিশনের দুই শতাধিক সুপারিশ
আব্দুল মুয়ীদ চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে প্রশাসনিক কাঠামো ও কার্যপদ্ধতিতে ব্যাপক পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছিল। এর মধ্যে ছিল মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সংখ্যা কমানো, সমপ্রকৃতির মন্ত্রণালয়গুলোকে পাঁচটি গুচ্ছে বিন্যস্ত করা, নতুন দুটি বিভাগ গঠন, দেশকে চারটি প্রদেশে বিভক্ত করা এবং রাজধানীর জন্য পৃথক সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব।

এ ছাড়া জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)-এর পদবি পরিবর্তন, সিভিল সার্ভিস পুনর্গঠন, বাধ্যতামূলক অবসর ও ওএসডি প্রথা বাতিল, মন্ত্রিসভা কমিটির মাধ্যমে সচিব নিয়োগ, উপসচিব পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে কোটা পুনর্বিন্যাস এবং ন্যায়পাল নিয়োগের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও প্রতিবেদনে স্থান পায়।

প্রতিবেদনটি ১৭টি অধ্যায়ে বিন্যস্ত ছিল। বাস্তবায়নের সুবিধার্থে সুপারিশগুলোকে স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি—এই তিন ভাগে ভাগ করা হয়। স্বল্পমেয়াদি সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য ছয় মাস এবং মধ্যমেয়াদি সুপারিশের জন্য এক বছর সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল।

কমিশনের নিজস্ব জরিপেও জনপ্রশাসন সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি উঠে আসে। জরিপে ৮৪ দশমিক ৪ শতাংশ উত্তরদাতা জনপ্রশাসনে সংস্কারের পক্ষে মত দেন। অন্যদিকে, ৮০ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, বিদ্যমান জনপ্রশাসনব্যবস্থা জনবান্ধব নয়। এই ফলাফল প্রশাসনিক সংস্কারের ব্যাপক জনসমর্থনের ইঙ্গিত দিলেও সুপারিশ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন কতটা ঘটেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।

দলীয়করণ, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও দুর্নীতি বড় বাধা
জনপ্রশাসনের কর্মকর্তাদের মতে, প্রশাসনের সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো নিয়োগ, পদায়ন ও পদোন্নতিতে মেধা ও দক্ষতার যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে না পারা। বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক আনুগত্য, প্রভাবশালী মহলের সুপারিশ এবং ব্যক্তিগত সম্পর্ক প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করেছে—এমন অভিযোগও রয়েছে।

এর ফলে যোগ্য ও দক্ষ কর্মকর্তাদের অনেকে প্রত্যাশিত মূল্যায়ন থেকে বঞ্চিত হন। অন্যদিকে, রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে সুবিধা পাওয়ার অভিযোগ প্রশাসনের পেশাদারত্ব ও নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। কেন্দ্রীভূত প্রশাসনিক কাঠামো এবং জবাবদিহিতার ঘাটতিও এ সমস্যাকে দীর্ঘস্থায়ী করেছে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিমত।

সংস্কার বিশেষজ্ঞদের মতে, জনপ্রশাসনকে কার্যকর করতে হলে শুধু সাংগঠনিক কাঠামো পরিবর্তন করলেই হবে না; বরং নিয়োগ ও পদোন্নতির স্বচ্ছ মানদণ্ড, নিরপেক্ষ মূল্যায়নব্যবস্থা, পেশাগত স্বাধীনতা, দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও আমলাতন্ত্রের দায়িত্ব ও ক্ষমতার সীমারেখাও স্পষ্ট করা প্রয়োজন।

৫০ বছরে ২৬টি উদ্যোগ, তবু কেন গতানুগতিক প্রশাসন?
গত পাঁচ দশকে বাংলাদেশে জনপ্রশাসন সংস্কারের লক্ষ্যে ২৬টি কমিশন বা কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। এতগুলো উদ্যোগের পরও প্রশাসনিক কাঠামো ও কার্যপদ্ধতিতে প্রত্যাশিত পরিবর্তন না আসা সংস্কারপ্রক্রিয়ার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, কমিশন গঠন এবং প্রতিবেদন প্রণয়ন সংস্কারের প্রথম ধাপ মাত্র। সুপারিশের বাস্তবসম্মত মূল্যায়ন, রাজনৈতিক ঐকমত্য, প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন, প্রশাসনিক প্রস্তুতি, নির্দিষ্ট সময়সীমা এবং বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের কার্যকর ব্যবস্থা না থাকলে সংস্কারের সুফল পাওয়া কঠিন।

এ ক্ষেত্রে আগের কমিশনের সুপারিশগুলোকে অগ্রাধিকারভিত্তিতে পর্যালোচনা করে কোন প্রস্তাব দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য, কোনটির জন্য আইন সংশোধন প্রয়োজন এবং কোনটির ক্ষেত্রে বৃহত্তর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ঐকমত্য দরকার—তা নির্ধারণ করা জরুরি। একই সঙ্গে বাস্তবায়নযোগ্য সুপারিশগুলোকে অনির্দিষ্টকালের জন্য ফেলে না রেখে নির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনার আওতায় আনার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।

নতুন কমিশন গঠনের আশ্বাস সরকারের
জনপ্রশাসন সংস্কারের বিষয়ে বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে নতুন কমিশন গঠনের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টা মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ জানিয়েছেন, জনপ্রশাসন সংস্কারের জন্য খুব শিগগির একটি নতুন কমিশন গঠন করা হবে। প্রশাসনকে দলীয়করণের প্রভাব থেকে বের করে আনার বিষয়েও সরকার কাজ করছে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।

গত ১৭ আগস্ট সরকারের ১৮০ দিন উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। উপদেষ্টা জানান, বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন গঠনের যে প্রতিশ্রুতি রয়েছে, সরকার সেই অবস্থান থেকে সরে আসেনি। এ লক্ষ্যে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে বিভিন্ন কার্যক্রম শুরু হয়েছে এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জমা দেওয়া প্রতিবেদনও পর্যালোচনা করা হয়েছে।

কমিশন গঠনে বিলম্বের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি প্রশাসনের ভেতরে বিদ্যমান সমস্যাগুলো দূর করার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সংস্কার কমিশনকে কার্যকরভাবে কাজ করতে হলে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক পর্যায়ে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও অনিয়ম দূর করার বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি।

তবে কমিশন গঠনের ঘোষণা বাস্তব রূপ পাবে কবে, কমিশনের কার্যপরিধি কী হবে এবং আগের প্রতিবেদনের কোন কোন সুপারিশ নতুন করে বিবেচনা করা হবে—এসব বিষয়ে স্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

আগের প্রতিবেদন নিয়ে প্রশ্ন, নতুন কমিশনের পক্ষে বিশেষজ্ঞ
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক সচিব এ কে এম আব্দুল আউয়াল মজুমদার অন্তর্বর্তী সরকারের জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন নিয়ে সমালোচনা করেছেন। তাঁর মতে, প্রতিবেদনটি নিম্নমানের এবং বাস্তবায়নযোগ্য সুপারিশের ঘাটতি রয়েছে। বর্তমান সরকার নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী নতুন একটি জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন গঠন করলে তা ইতিবাচক উদ্যোগ হবে বলে তিনি মনে করেন।

তিনি বলেন, নতুন কমিশনের উচিত হবে বিস্তৃত পর্যালোচনার মাধ্যমে বাস্তবসম্মত সুপারিশ তৈরি করা। সেখান থেকে এমন প্রস্তাব চিহ্নিত করতে হবে, যেগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশ, জনগণ এবং জনপ্রশাসনের কর্মকর্তারা উপকৃত হবেন। একই সঙ্গে মেধাভিত্তিক, যোগ্য, দক্ষ, জনবান্ধব ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি হবে।

বিশেষজ্ঞদের এ মতামত থেকে স্পষ্ট, জনপ্রশাসন সংস্কার নিয়ে শুধু আগের প্রতিবেদনের পক্ষে-বিপক্ষে অবস্থান নিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। বরং বিদ্যমান প্রশাসনিক দুর্বলতা চিহ্নিত করে বাস্তবসম্মত, সময়োপযোগী ও কার্যকর সংস্কার পরিকল্পনা গ্রহণ করাই হবে মূল কাজ।

প্রতিশ্রুতি থেকে বাস্তবায়ন—এখনই সবচেয়ে বড় পরীক্ষা
মেধাভিত্তিক জনপ্রশাসন প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর দক্ষতা ও জনআস্থা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা, স্বচ্ছ নিয়োগব্যবস্থা, যোগ্যতার ভিত্তিতে পদোন্নতি, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা এবং নাগরিকদের কাছে প্রশাসনের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।

নতুন সংস্কার কমিশন গঠন করা হলে তার কাজ যেন কেবল প্রতিবেদন প্রণয়নে সীমাবদ্ধ না থাকে, সে বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে। সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা, দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা, অগ্রগতি প্রকাশ এবং নিয়মিত মূল্যায়নের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। পাশাপাশি আগের কমিশনের বাস্তবসম্মত সুপারিশগুলো পুনর্বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে কাজে লাগানো যেতে পারে।

সব মিলিয়ে, ‘মেরিটোক্রেসির বাংলাদেশ’ গড়ার প্রতিশ্রুতি এখন বাস্তবায়নের পরীক্ষায়। প্রশাসনে মেধা, সততা ও দক্ষতার মূল্যায়ন নিশ্চিত করা গেলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো আরও কার্যকর ও জনমুখী হতে পারে। অন্যথায়, অতীতের মতো আরেকটি কমিশন, আরেকটি প্রতিবেদন এবং বাস্তবায়নের দীর্ঘ অপেক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যেতে পারে জনপ্রশাসন সংস্কারের উদ্যোগ।

মাহবুবুর রহমান, লেখক ও মানবাধিকার কর্মী। 

মাহবুবুর রহমান: দুর্নীতিমুক্ত, দক্ষ, স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও জনবান্ধব জনপ্রশাসন প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা দীর্ঘদিনের। রাষ্ট্র পরিচালনায় যোগ্যতা, সততা ও পেশাদারত্বকে প্রাধান্য দেওয়ার লক্ষ্যে বিভিন্ন সময়ে নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামোয় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন এখনো দৃশ্যমান নয়। নিয়োগ, পদায়ন, বদলি ও পদোন্নতিতে মেধা ও দক্ষতার পরিবর্তে রাজনৈতিক বিবেচনা, দলীয় আনুগত্য এবং প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও দীর্ঘদিনের। এমন বাস্তবতায় ‘মেরিটোক্রেসির বাংলাদেশ’ গড়ার অঙ্গীকার করেছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার। তবে সেই অঙ্গীকার বাস্তবায়নে জনপ্রশাসন সংস্কারের কার্যকর উদ্যোগ কতদূর এগিয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাষ্ট্রের বিভিন্ন খাতের পাশাপাশি জনপ্রশাসন সংস্কারের বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার প্রশাসনকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, দক্ষ ও জনমুখী করার লক্ষ্যে ২০২৪ সালের ৩ অক্টোবর সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা আব্দুল মুয়ীদ চৌধুরীর নেতৃত্বে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন গঠন করে। কমিশন চার মাসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেয়। এতে প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্বিন্যাস থেকে শুরু করে নিয়োগ, পদোন্নতি, জবাবদিহিতা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার বিষয়ে দুই শতাধিক সুপারিশ করা হয়।

তবে কমিশনের প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পরও সুপারিশগুলোর উল্লেখযোগ্য অংশ বাস্তবায়নের উদ্যোগ দৃশ্যমান হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও সংস্কারের অগ্রগতি প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। পরবর্তী সময়ে বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরও নতুন করে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন গঠন কিংবা আগের সুপারিশ বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যায়নি বলে সংশ্লিষ্টদের অনেকে মনে করছেন।

মেধার মূল্যায়নই কি হবে প্রশাসনের প্রধান ভিত্তি?
বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে ‘মেরিটোক্রেসির বাংলাদেশ’ বিনির্মাণের যে অঙ্গীকার করা হয়েছে, তার মূল লক্ষ্য হলো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে যোগ্যতা, সততা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও পেশাদারত্বের ভিত্তিতে জনবল ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা। এ ব্যবস্থায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়োগ, পদায়ন, বদলি ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে দলীয় পরিচয় কিংবা রাজনৈতিক আনুগত্যের পরিবর্তে যোগ্যতাকে প্রাধান্য দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

ইশতেহারে আরও বলা হয়েছে, ব্যক্তির বিশ্বাস, অবিশ্বাস কিংবা দলীয় আনুগত্য বিবেচনায় না নিয়ে সততা, মেধা, দক্ষতা, যোগ্যতা, দেশপ্রেম ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে প্রশাসন, পুলিশসহ রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে। নিয়োগপ্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় সংস্কার, সংবিধানের আলোকে যথোপযুক্ত সিভিল সার্ভিস আইন প্রণয়ন এবং প্রশাসনের সব পর্যায়ে ই-গভর্নেন্স চালুর প্রতিশ্রুতিও রয়েছে।

কিন্তু প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধান দূর করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। জনপ্রশাসনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘদিনের দলীয়করণ, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং প্রশাসনিক অনিয়মের সংস্কৃতি পরিবর্তন না হলে কেবল নীতিগত ঘোষণা দিয়ে মেধাভিত্তিক প্রশাসন প্রতিষ্ঠা করা কঠিন হবে।

সংস্কার কমিশনের দুই শতাধিক সুপারিশ
আব্দুল মুয়ীদ চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে প্রশাসনিক কাঠামো ও কার্যপদ্ধতিতে ব্যাপক পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছিল। এর মধ্যে ছিল মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সংখ্যা কমানো, সমপ্রকৃতির মন্ত্রণালয়গুলোকে পাঁচটি গুচ্ছে বিন্যস্ত করা, নতুন দুটি বিভাগ গঠন, দেশকে চারটি প্রদেশে বিভক্ত করা এবং রাজধানীর জন্য পৃথক সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব।

এ ছাড়া জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)-এর পদবি পরিবর্তন, সিভিল সার্ভিস পুনর্গঠন, বাধ্যতামূলক অবসর ও ওএসডি প্রথা বাতিল, মন্ত্রিসভা কমিটির মাধ্যমে সচিব নিয়োগ, উপসচিব পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে কোটা পুনর্বিন্যাস এবং ন্যায়পাল নিয়োগের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও প্রতিবেদনে স্থান পায়।

প্রতিবেদনটি ১৭টি অধ্যায়ে বিন্যস্ত ছিল। বাস্তবায়নের সুবিধার্থে সুপারিশগুলোকে স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি—এই তিন ভাগে ভাগ করা হয়। স্বল্পমেয়াদি সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য ছয় মাস এবং মধ্যমেয়াদি সুপারিশের জন্য এক বছর সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল।

কমিশনের নিজস্ব জরিপেও জনপ্রশাসন সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি উঠে আসে। জরিপে ৮৪ দশমিক ৪ শতাংশ উত্তরদাতা জনপ্রশাসনে সংস্কারের পক্ষে মত দেন। অন্যদিকে, ৮০ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, বিদ্যমান জনপ্রশাসনব্যবস্থা জনবান্ধব নয়। এই ফলাফল প্রশাসনিক সংস্কারের ব্যাপক জনসমর্থনের ইঙ্গিত দিলেও সুপারিশ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন কতটা ঘটেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।

দলীয়করণ, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও দুর্নীতি বড় বাধা
জনপ্রশাসনের কর্মকর্তাদের মতে, প্রশাসনের সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো নিয়োগ, পদায়ন ও পদোন্নতিতে মেধা ও দক্ষতার যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে না পারা। বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক আনুগত্য, প্রভাবশালী মহলের সুপারিশ এবং ব্যক্তিগত সম্পর্ক প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করেছে—এমন অভিযোগও রয়েছে।

এর ফলে যোগ্য ও দক্ষ কর্মকর্তাদের অনেকে প্রত্যাশিত মূল্যায়ন থেকে বঞ্চিত হন। অন্যদিকে, রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে সুবিধা পাওয়ার অভিযোগ প্রশাসনের পেশাদারত্ব ও নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। কেন্দ্রীভূত প্রশাসনিক কাঠামো এবং জবাবদিহিতার ঘাটতিও এ সমস্যাকে দীর্ঘস্থায়ী করেছে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিমত।

সংস্কার বিশেষজ্ঞদের মতে, জনপ্রশাসনকে কার্যকর করতে হলে শুধু সাংগঠনিক কাঠামো পরিবর্তন করলেই হবে না; বরং নিয়োগ ও পদোন্নতির স্বচ্ছ মানদণ্ড, নিরপেক্ষ মূল্যায়নব্যবস্থা, পেশাগত স্বাধীনতা, দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও আমলাতন্ত্রের দায়িত্ব ও ক্ষমতার সীমারেখাও স্পষ্ট করা প্রয়োজন।

৫০ বছরে ২৬টি উদ্যোগ, তবু কেন গতানুগতিক প্রশাসন?
গত পাঁচ দশকে বাংলাদেশে জনপ্রশাসন সংস্কারের লক্ষ্যে ২৬টি কমিশন বা কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। এতগুলো উদ্যোগের পরও প্রশাসনিক কাঠামো ও কার্যপদ্ধতিতে প্রত্যাশিত পরিবর্তন না আসা সংস্কারপ্রক্রিয়ার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, কমিশন গঠন এবং প্রতিবেদন প্রণয়ন সংস্কারের প্রথম ধাপ মাত্র। সুপারিশের বাস্তবসম্মত মূল্যায়ন, রাজনৈতিক ঐকমত্য, প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন, প্রশাসনিক প্রস্তুতি, নির্দিষ্ট সময়সীমা এবং বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের কার্যকর ব্যবস্থা না থাকলে সংস্কারের সুফল পাওয়া কঠিন।

এ ক্ষেত্রে আগের কমিশনের সুপারিশগুলোকে অগ্রাধিকারভিত্তিতে পর্যালোচনা করে কোন প্রস্তাব দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য, কোনটির জন্য আইন সংশোধন প্রয়োজন এবং কোনটির ক্ষেত্রে বৃহত্তর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ঐকমত্য দরকার—তা নির্ধারণ করা জরুরি। একই সঙ্গে বাস্তবায়নযোগ্য সুপারিশগুলোকে অনির্দিষ্টকালের জন্য ফেলে না রেখে নির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনার আওতায় আনার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।

নতুন কমিশন গঠনের আশ্বাস সরকারের
জনপ্রশাসন সংস্কারের বিষয়ে বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে নতুন কমিশন গঠনের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টা মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ জানিয়েছেন, জনপ্রশাসন সংস্কারের জন্য খুব শিগগির একটি নতুন কমিশন গঠন করা হবে। প্রশাসনকে দলীয়করণের প্রভাব থেকে বের করে আনার বিষয়েও সরকার কাজ করছে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।

গত ১৭ আগস্ট সরকারের ১৮০ দিন উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। উপদেষ্টা জানান, বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন গঠনের যে প্রতিশ্রুতি রয়েছে, সরকার সেই অবস্থান থেকে সরে আসেনি। এ লক্ষ্যে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে বিভিন্ন কার্যক্রম শুরু হয়েছে এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জমা দেওয়া প্রতিবেদনও পর্যালোচনা করা হয়েছে।

কমিশন গঠনে বিলম্বের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি প্রশাসনের ভেতরে বিদ্যমান সমস্যাগুলো দূর করার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সংস্কার কমিশনকে কার্যকরভাবে কাজ করতে হলে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক পর্যায়ে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও অনিয়ম দূর করার বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি।

তবে কমিশন গঠনের ঘোষণা বাস্তব রূপ পাবে কবে, কমিশনের কার্যপরিধি কী হবে এবং আগের প্রতিবেদনের কোন কোন সুপারিশ নতুন করে বিবেচনা করা হবে—এসব বিষয়ে স্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

আগের প্রতিবেদন নিয়ে প্রশ্ন, নতুন কমিশনের পক্ষে বিশেষজ্ঞ
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক সচিব এ কে এম আব্দুল আউয়াল মজুমদার অন্তর্বর্তী সরকারের জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন নিয়ে সমালোচনা করেছেন। তাঁর মতে, প্রতিবেদনটি নিম্নমানের এবং বাস্তবায়নযোগ্য সুপারিশের ঘাটতি রয়েছে। বর্তমান সরকার নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী নতুন একটি জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন গঠন করলে তা ইতিবাচক উদ্যোগ হবে বলে তিনি মনে করেন।

তিনি বলেন, নতুন কমিশনের উচিত হবে বিস্তৃত পর্যালোচনার মাধ্যমে বাস্তবসম্মত সুপারিশ তৈরি করা। সেখান থেকে এমন প্রস্তাব চিহ্নিত করতে হবে, যেগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশ, জনগণ এবং জনপ্রশাসনের কর্মকর্তারা উপকৃত হবেন। একই সঙ্গে মেধাভিত্তিক, যোগ্য, দক্ষ, জনবান্ধব ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি হবে।

বিশেষজ্ঞদের এ মতামত থেকে স্পষ্ট, জনপ্রশাসন সংস্কার নিয়ে শুধু আগের প্রতিবেদনের পক্ষে-বিপক্ষে অবস্থান নিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। বরং বিদ্যমান প্রশাসনিক দুর্বলতা চিহ্নিত করে বাস্তবসম্মত, সময়োপযোগী ও কার্যকর সংস্কার পরিকল্পনা গ্রহণ করাই হবে মূল কাজ।

প্রতিশ্রুতি থেকে বাস্তবায়ন—এখনই সবচেয়ে বড় পরীক্ষা
মেধাভিত্তিক জনপ্রশাসন প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর দক্ষতা ও জনআস্থা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা, স্বচ্ছ নিয়োগব্যবস্থা, যোগ্যতার ভিত্তিতে পদোন্নতি, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা এবং নাগরিকদের কাছে প্রশাসনের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।

নতুন সংস্কার কমিশন গঠন করা হলে তার কাজ যেন কেবল প্রতিবেদন প্রণয়নে সীমাবদ্ধ না থাকে, সে বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে। সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা, দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা, অগ্রগতি প্রকাশ এবং নিয়মিত মূল্যায়নের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। পাশাপাশি আগের কমিশনের বাস্তবসম্মত সুপারিশগুলো পুনর্বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে কাজে লাগানো যেতে পারে।

সব মিলিয়ে, ‘মেরিটোক্রেসির বাংলাদেশ’ গড়ার প্রতিশ্রুতি এখন বাস্তবায়নের পরীক্ষায়। প্রশাসনে মেধা, সততা ও দক্ষতার মূল্যায়ন নিশ্চিত করা গেলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো আরও কার্যকর ও জনমুখী হতে পারে। অন্যথায়, অতীতের মতো আরেকটি কমিশন, আরেকটি প্রতিবেদন এবং বাস্তবায়নের দীর্ঘ অপেক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যেতে পারে জনপ্রশাসন সংস্কারের উদ্যোগ।

মাহবুবুর রহমান, লেখক ও মানবাধিকার কর্মী।