*পানির চাহিদা ও সরবরাহের ঘাটতি পূরণে বাড়ছে উৎপাদন সক্ষমতা
নিজস্ব প্রতিবেদক: চলতি বছর দৈনিক আড়াই কোটি লিটার পানি সরবরাহে যুক্ত করার টার্গেট নিয়েছে চট্টগ্রাম ওয়াসা। এ লক্ষ্যে নগরীতে পানির চাহিদা ও সরবরাহের ঘাটতি পূরণে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে চট্টগ্রাম ওয়াসা। স্বল্পমেয়াদে গভীর নলকূপ স্থাপন এবং দীর্ঘমেয়াদে পানি শোধনাগার সম্প্রসারণ ও নতুন শোধনাগার নির্মাণের পরিকল্পনা করছে সংস্থাটি। ওয়াসার লক্ষ্য, চলতি বছর দৈনিক আড়াই কোটি লিটার পানি সরবরাহে যুক্ত করা এবং ২০৩০ সালের মধ্যে উৎপাদন সক্ষমতা আরও ৫০ কোটি লিটার বাড়ানো।
জানা গেছে, চট্টগ্রাম ওয়াসার নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হিসেবে প্রকৌশলী সেলিম মো. জানে আলম যোগদান করার পর চট্টগ্রাম ওয়াসার কাজে গতি এসেছে।ওয়াসার রাজস্ব আদায়, গ্রাহকদের হালনাগাদ তথ্য সংগ্রহ, অবৈধ সংযোগ এবং লাইসেন্সবিহীন গভীর নলকূপের তথ্য সংগ্রহ, কাজের গতি আনতে কর্মচারী -কর্মকর্তাকে পদোন্নতি, পানি সরবরাহ বৃদ্ধিসহ একাধিক কার্যক্রমে সরকারী এ সংস্থাটির গতি ফিরেছে।
ওয়াসা সূত্রে জানা গেছে, পানির চাহিদা ও সরবরাহের ঘাটতি পূরণে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সংস্থাটি। গভীর নলকূপ স্থাপনের একটি প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৪৯ কোটি টাকা। এর আওতায় ২০টি গভীর নলকূপ স্থাপন, ৩৫টি পরীক্ষামূলক নলকূপ খনন এবং প্রায় ৪ দশমিক ৭ কিলোমিটার সরবরাহ লাইন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।এ ছাড়া বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় ৩ হাজার ৯২১ কোটি টাকার পানি সরবরাহ উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে গভীর নলকূপ স্থাপন, পাইপলাইন উন্নয়ন ও ডিজিটাল পানির মিটার স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
ওয়াসার হিসাবে, চট্টগ্রাম নগরীতে দৈনিক পানির চাহিদা প্রায় ৬০ থেকে ৬৫ কোটি লিটার। বিপরীতে উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৫০ কোটি লিটার। ফলে চাহিদার তুলনায় দৈনিক ঘাটতি রয়েছে।নতুন প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের পাশাপাশি পাইপলাইনের অপচয় ও সিস্টেম লস কমানো গেলে নগরবাসীর পানির সংকট অনেকটাই কমবে বলে আশা করছে সংস্থাটি।
চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী সেলিম মো. জানে আলমের বলেন, শুষ্ক মৌসুমে কর্ণফুলী ও হালদা নদীর পানিতে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় পানি উৎপাদন ব্যাহত হয়। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় গভীর নলকূপ স্থাপনের পাশাপাশি বিদ্যমান শোধনাগারগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।এ জন্য অর্থায়ন ও সম্ভাব্যতা যাচাই নিয়ে দাতা সংস্থাগুলোর সঙ্গে আলোচনা চলছে।
ওয়াসার প্রধান প্রকৌশলী মাকসুদ আলম জানিয়েছেন, মোহরা এলাকায় দৈনিক ২০ কোটি লিটার সক্ষমতার নতুন শোধনাগার নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এ প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই ও অর্থায়নের বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এদিকে বকেয়া রাজস্ব আদায়ে বিশেষ কার্যক্রম জোরদারের পর চট্টগ্রাম ওয়াসার মাসিক রাজস্ব আদায় ২৮ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। গত কয়েক বছর ধরে যেখানে মাসিক রাজস্ব আদায় ১৮ থেকে ২০ কোটি টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, সেখানে সেপ্টেম্বর মাসে আদায় হয়েছে ২৮ কোটি ২৫ লাখ ৮৫ হাজার টাকা।
চট্টগ্রাম ওয়াসার সেপ্টেম্বর ২০২৬ মাসের রাজস্ব আদায়ের হিসাব অনুযায়ী, মোট আদায়ের মধ্যে পানির বিল থেকে এসেছে ২৬ কোটি ১৯ লাখ ২৫ হাজার টাকা। এর মধ্যে চলতি বিল বাবদ ১৪ কোটি ১৯ লাখ ১১ হাজার টাকা এবং বকেয়া বিল থেকে আদায় হয়েছে ১২ কোটি ১৪ হাজার টাকা।এ ছাড়া সারচার্জ থেকে ৮০ লাখ ৫৭ হাজার টাকা, গভীর নলকূপ ফি বাবদ ৬৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং নতুন সংযোগ খাত থেকে ৩৫ লাখ ৯৩ হাজার টাকা আদায় হয়েছে। এর আগে আগস্ট মাসে চট্টগ্রাম ওয়াসার রাজস্ব আদায় হয়েছিল ২৬ কোটি ৮০ লাখ টাকা।
ওয়াসা সূত্র জানায়, ২৫ হাজার টাকার বেশি বকেয়া রয়েছে এমন গ্রাহকদের সংযোগ সরেজমিন পরিদর্শন করে বকেয়া আদায়ের উদ্যোগ নেয় সংস্থাটি। একই সঙ্গে গ্রাহকদের হালনাগাদ তথ্য সংগ্রহ, অবৈধ সংযোগ এবং লাইসেন্সবিহীন গভীর নলকূপের তথ্যও সংগ্রহ করা হয়। সংস্থাটির মোট বকেয়া রাজস্বের পরিমাণ প্রায় ২৫৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কাছে পাওনা ৭১ কোটি ৫২ লাখ টাকা। আর সাধারণ গ্রাহকদের কাছে পাওনা রয়েছে ১৮৭ কোটি ৪৩ লাখ টাকা।এ ছাড়া মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হচ্ছে। লাইসেন্সবিহীন গভীর নলকূপ স্থাপনকারীদের বিরুদ্ধেও নেওয়া হচ্ছে আইনগত ব্যবস্থা।
চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী সেলিম মো. জানে আলম বলেন, রাজস্ব আদায়ে বর্তমানে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। গঠিত দলগুলো এলাকাভিত্তিক কাজ করে বকেয়া থাকা গ্রাহকদের বিল পরিশোধে উৎসাহিত করছে। এর আগে ৫০ হাজার টাকার বেশি বকেয়া আদায়ে কাজ করা হয়েছে। এখন ২৫ হাজার টাকার বেশি বকেয়াধারীদের নিয়ে কাজ চলছে।
তিনি বলেন, সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলে রাজস্ব আদায়ে রেকর্ড হয়েছে। এই ধারা অব্যাহত থাকবে। এ কাজে আগ্রহ ও উৎসাহ প্রদানের জন্য সর্বোচ্চ বকেয়া আদায়কারী তিনজন মিটার পরিদর্শককে ক্রেস্ট এবং প্রতিটি টিমের সদস্যদের সনদ দেওয়া হয়েছে।
ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরও বলেন, চট্টগ্রাম ওয়াসা সরকারের রাজস্ব আদায়ে বদ্ধপরিকর। সম্মানিত গ্রাহকদের অনুরোধ করবো, আইন মেনে সংযোগ ও নলকূপের লাইসেন্স গ্রহণ করুন এবং বকেয়া টাকা পরিশোধ করুন।
জানা গেছে, চট্টগ্রাম ওয়াসার নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হিসেবে প্রকৌশলী সেলিম মো. জানে আলম যোগদান করার পর চট্টগ্রাম ওয়াসার কাজে গতি এসেছে। তাকে এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়ে ২১ মে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করে। ১লা জুন ২০২৬ সালে ওয়াসার এমডি হিসেবে যোগদান করেন। চট্টগ্রাম ওয়াসার চলতি বছরের ফেব্রুয়ারী মাসের রেভিনিউ ছিলো ১৮ কোটি টাকা, মার্চ মাসে ১৯ কোটি, এপ্রিলে ২০ কোটি, মে মাসে ১৯ কোটি টাকা কিন্তু জুন মাসে রাজস্ব আদায় হয়েছে সর্বমোট ২৬ কোটি ৭০ লাখ ৪৪ হাজার টাকা। যা এযাবৎ বিগত কয়েক বছরের মধ্যে ওয়াসার সর্ব্বোচ রাজস্ব আদায়।এছাড়া সেলিম এমডি হিসেবে যোগদান করার পরই ওয়াসার ইতিহাসে ২৪২ জন কর্মচারী -কর্মকর্তাকে পদোন্নতি প্রদান করেন যারা এতোদিন বৈষম্যের শিকার ছিলো।
এ বিষয়ে ওয়াসার এমডি প্রকৌশলী সেলিম মোহাম্মদ জানে আলম আরো বলেন,এটি শুধু একটি আর্থিক সাফল্য নয়, বরং গ্রাহকদের আস্থা, কর্মকর্তা -কর্মচারীদের নিষ্ঠা এবং সুশাসন ভিত্তিক ব্যবস্থাপনার প্রতিফলন। আমরা স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও আধুনিক সেবার মাধ্যমে রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি করতে সক্ষম হয়েছি। এই অর্জন আমাদের ভবিষ্যতে আরও উন্নত ও টেকসই পানি সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে অনুপ্রাণিত করবে। আমরা আশা করি, সবার সহযোগিতায় চট্টগ্রাম ওয়াসা আগামী দিনেও সেবার মান ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় নতুন নতুন মাইলফলক স্পর্শ করবে।
তিনি বলেন,সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চট্টগ্রাম ওয়াসার পাওনা ২৪১ কোটি টাকা।আগামী এক বছরে তা অর্ধেকে নামিয়ে আনা হবে বলে জানান তিনি।




