মাহবুবুর রহমান: আজ ১ অক্টোবর, আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস ২০২৬। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে। প্রবীণ জনগোষ্ঠীর অধিকার, মর্যাদা, স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং তাঁদের প্রতি পারিবারিক ও সামাজিক দায়িত্বের বিষয়গুলো নতুন করে আলোচনায় এসেছে। একটি দেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অগ্রগতিতে প্রবীণদের অবদান অনস্বীকার্য। অথচ জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে তাঁদের অনেকেই নানা ধরনের অবহেলা, আর্থিক অনিশ্চয়তা, অসুস্থতা, একাকিত্ব ও সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার মুখোমুখি হচ্ছেন। আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস কেবল একটি আনুষ্ঠানিক দিবস নয়; এটি প্রবীণদের প্রতি আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য স্মরণ করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। প্রবীণদের অভিজ্ঞতা, জ্ঞান, শ্রম, ত্যাগ ও অবদানকে যথাযথ মূল্যায়ন করে তাঁদের জন্য সম্মানজনক, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করাই এ দিবসের মূল তাৎপর্য। বিশ্বব্যাপী মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। এর ফলে স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক নিরাপত্তা, পেনশন, আবাসন, কর্মসংস্থান, পরিচর্যা এবং পারিবারিক দায়িত্বের মতো বিষয়গুলো ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বাংলাদেশেও জনমিতিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকার দরিদ্র, অসহায়, একাকী ও শারীরিকভাবে অক্ষম প্রবীণদের জন্য কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক চ্যালেঞ্জ। আজকের এই বিশেষ দিনে প্রবীণদের জীবনমান, তাঁদের অধিকার, বিদ্যমান সমস্যা, সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ এবং প্রবীণবান্ধব সমাজ গঠনের সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা প্রয়োজন। দীর্ঘায়ুর যুগে প্রবীণদের জন্য নতুন ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান

২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক প্রতিপাদ্য:
জাতিসংঘের ঘোষিত ২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবসের প্রতিপাদ্যের বাংলা ভাবার্থ হলো, ‘দীর্ঘায়ুর যুগ: দীর্ঘতর জীবনের জন্য ব্যবস্থাগুলোকে নতুন করে ভাবা।’ এবারের প্রতিপাদ্যে মানুষের দীর্ঘায়ু হওয়ার বিষয়টিকে শুধু চিকিৎসাবিজ্ঞানের সাফল্য হিসেবে নয়, বরং স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক সুরক্ষা, কর্মসংস্থান, আবাসন ও পারিবারিক পরিচর্যার ব্যবস্থাকে নতুন করে সাজানোর প্রয়োজনীয়তা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের ২০২৬ সালের বার্তায় বলা হয়েছে, বিশ্বে ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা ২০৫০ সালের মধ্যে ১২০ কোটি থেকে বেড়ে ২১০ কোটিতে পৌঁছাতে পারে। তখন বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ হবে এই বয়সী মানুষ। এ পরিবর্তন মোকাবিলায় কর্মসংস্থান, পেনশন, আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা ও আজীবন শিক্ষার সুযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এই বৈশ্বিক বাস্তবতা বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, মানুষের আয়ু বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রবীণদের স্বাস্থ্যসেবা ও আর্থিক নিরাপত্তার চাহিদাও বাড়ছে। দীর্ঘ জীবন তখনই অর্থবহ হবে, যখন একজন প্রবীণ ব্যক্তি সুস্থতা, স্বনির্ভরতা, সামাজিক অংশগ্রহণ এবং নিজের সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার নিয়ে বেঁচে থাকার সুযোগ পাবেন।

বাংলাদেশে দিবসটি পালনে সরকারি উদ্যোগ
বাংলাদেশে ১৯৯১ সাল থেকে আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস পালিত হয়ে আসছে। ২০২৬ সালে দিবসটির ৩৬তম আয়োজন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। দিবসটি উপলক্ষে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন সমাজসেবা অধিদপ্তর বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে শোভাযাত্রা, আলোচনা সভা, জাতীয় সংবাদপত্রে বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ এবং প্রবীণদের মর্যাদা সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টি। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সমাজসেবা কার্যালয়গুলোকে যথাযোগ্য মর্যাদায় দিবসটি পালনের নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী পৃথক বাণী দিয়েছেন। রাষ্ট্রপতি প্রবীণদের কল্যাণে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, সামাজিক ও দাতব্য সংগঠন, বিত্তবান ব্যক্তি এবং পরিবারগুলোকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রী প্রবীণদের অভিজ্ঞতা, ত্যাগ ও প্রজ্ঞাকে দেশের সামাজিক ভিত্তির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এসব উদ্যোগের মূল তাৎপর্য হলো, প্রবীণদের কল্যাণ কেবল সরকারের একক দায়িত্ব নয়। পরিবার, সমাজ, স্থানীয় প্রশাসন, গণমাধ্যম, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও নাগরিক সমাজের সম্মিলিত অংশগ্রহণ ছাড়া প্রবীণবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলা কঠিন।

প্রবীণ জনগোষ্ঠী: সমাজের অভিজ্ঞতার ভান্ডার
একজন প্রবীণ ব্যক্তি শুধু বয়সের বিচারে প্রবীণ নন; তিনি একটি পরিবারের ইতিহাস, একটি সমাজের অভিজ্ঞতা এবং একটি দেশের উন্নয়নযাত্রার সাক্ষী। তাঁদের দীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে নতুন প্রজন্ম অনেক কিছু শিখতে পারে। কৃষি, ব্যবসা, শিক্ষা, সংস্কৃতি, মুক্তিযুদ্ধ, সামাজিক সংগঠন, পরিবার পরিচালনা এবং স্থানীয় উন্নয়নে প্রবীণদের অবদান রয়েছে। গ্রামবাংলার কৃষক, শ্রমজীবী মানুষ, শিক্ষক, সমাজকর্মী, ব্যবসায়ী, সরকারি কর্মকর্তা ও বিভিন্ন পেশার মানুষ দীর্ঘ কর্মজীবনের মধ্য দিয়ে দেশের অর্থনীতি ও সমাজ গঠনে ভূমিকা রেখেছেন। তাঁদের অনেকেই অবসর গ্রহণের পরও পরিবার ও সমাজের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। কেউ নাতি-নাতনিদের লালন-পালন করছেন, কেউ পারিবারিক ব্যবসায় পরামর্শ দিচ্ছেন, আবার কেউ স্থানীয় বিরোধ নিষ্পত্তি ও সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষায় ভূমিকা রাখছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেকের কর্মক্ষমতা কমে আসে। কারও নিয়মিত চিকিৎসার প্রয়োজন হয়, কেউ হারিয়ে ফেলেন উপার্জনের সক্ষমতা, আবার কেউ জীবনসঙ্গী বা পরিবারের অন্য সদস্যদের হারিয়ে একাকিত্বে ভোগেন। ফলে তাঁদের অভিজ্ঞতার যথাযথ মূল্যায়নের পাশাপাশি প্রয়োজন হয় আর্থিক ও সামাজিক সহায়তা। প্রবীণদের সমাজের বোঝা হিসেবে বিবেচনা করার পরিবর্তে তাঁদের সক্রিয় অংশীদার হিসেবে দেখতে হবে। তাঁদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে স্থানীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা, সামাজিক উদ্যোগ এবং নতুন প্রজন্মের শিক্ষায় কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন।

প্রবীণদের প্রধান সমস্যা: দারিদ্র্য, অসুস্থতা ও একাকিত্ব
বাংলাদেশের প্রবীণ জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ নানা ধরনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যার মুখোমুখি। বিশেষ করে দরিদ্র পরিবার, প্রত্যন্ত অঞ্চলের বাসিন্দা, স্বামী বা স্ত্রীকে হারানো ব্যক্তি এবং শারীরিক প্রতিবন্ধকতায় আক্রান্ত প্রবীণদের জীবন অনেক বেশি কঠিন।

আর্থিক অনিশ্চয়তা ও দারিদ্র্য
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক প্রবীণ ব্যক্তি নিয়মিত আয় করার সক্ষমতা হারান। যাঁরা সারা জীবন কৃষিকাজ, দিনমজুরি, ক্ষুদ্র ব্যবসা কিংবা অনানুষ্ঠানিক পেশায় নিয়োজিত ছিলেন, তাঁদের অনেকেরই অবসরকালীন সঞ্চয় বা পেনশনের ব্যবস্থা নেই। ফলে দৈনন্দিন খাবার, পোশাক, বাসস্থান ও চিকিৎসার খরচ মেটাতে তাঁদের পরিবারের অন্য সদস্যদের ওপর নির্ভর করতে হয়। দরিদ্র পরিবারের প্রবীণদের জন্য এই নির্ভরশীলতা আরও জটিল হয়ে ওঠে। অনেক সময় পরিবারের উপার্জনক্ষম সদস্যদের সীমিত আয়ের কারণে প্রবীণদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না। তাই প্রবীণদের জন্য নিয়মিত আর্থিক সহায়তা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং আয়বর্ধক কার্যক্রমের সুযোগ বাড়ানো জরুরি।

স্বাস্থ্যসেবা ও চিকিৎসার সংকট
বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদ্‌রোগ, দৃষ্টিশক্তির সমস্যা, হাড়ের দুর্বলতা, শ্রবণশক্তি হ্রাস ও স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়ার মতো নানা স্বাস্থ্যগত সমস্যা দেখা দিতে পারে। অনেক প্রবীণকে দীর্ঘদিন ওষুধ সেবন করতে হয়। কারও প্রয়োজন হয় নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও বিশেষায়িত চিকিৎসার। কিন্তু গ্রামীণ এলাকার অনেক প্রবীণের পক্ষে দূরের হাসপাতালে যাতায়াত করা কঠিন। চিকিৎসার ব্যয়, যাতায়াতের অসুবিধা এবং যথাযথ পরিচর্যার অভাবে তাঁরা প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। প্রবীণদের জন্য সহজলভ্য চিকিৎসা, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, সাশ্রয়ী ওষুধ এবং বাড়িভিত্তিক পরিচর্যার ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন।

পারিবারিক অবহেলা ও মানসিক নিঃসঙ্গতা
পরিবারের সদস্যদের কর্মব্যস্ততা, সন্তানদের দূরে বসবাস, পারিবারিক বিরোধ কিংবা জীবনসঙ্গীকে হারানোর কারণে অনেক প্রবীণ একাকিত্বে ভোগেন। তাঁদের সঙ্গে কথা বলার, সময় কাটানোর কিংবা মনের কথা প্রকাশ করার মানুষ না থাকলে মানসিক কষ্ট আরও বাড়তে পারে। কিছু ক্ষেত্রে প্রবীণদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। সম্পত্তি, চিকিৎসা, বাসস্থান কিংবা পারিবারিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে তাঁদের ইচ্ছাকে উপেক্ষা করার ঘটনাও ঘটতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে প্রবীণদের প্রতি সম্মান, সহমর্মিতা এবং পারিবারিক দায়িত্ববোধ জোরদার করা প্রয়োজন।

নিরাপত্তাহীনতা ও নির্যাতন
প্রবীণদের প্রতি অবহেলা, আর্থিক শোষণ, সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করা, অপমানজনক আচরণ এবং শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন গুরুতর সামাজিক সমস্যা। অনেক প্রবীণ সামাজিক সম্মান হারানোর ভয়ে কিংবা পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় নির্যাতনের কথা প্রকাশ করেন না। এ ধরনের পরিস্থিতি প্রতিরোধে পারিবারিক সচেতনতা, সামাজিক নজরদারি, আইনি সহায়তা এবং অভিযোগ জানানোর সহজ ব্যবস্থা প্রয়োজন। বিশেষ করে একা বসবাসকারী ও শারীরিকভাবে অসহায় প্রবীণদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্থানীয় পর্যায়ে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

প্রবীণদের সামাজিক নিরাপত্তা: সরকারি সহায়তার গুরুত্ব
প্রবীণ জনগোষ্ঠীর আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশে বয়স্ক ভাতা একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি। এর মাধ্যমে নির্ধারিত যোগ্যতা অনুযায়ী অসচ্ছল প্রবীণদের আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়। এই কর্মসূচি দরিদ্র প্রবীণদের নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতে সহায়তা করে। তবে প্রবীণদের চাহিদা কেবল আর্থিক সহায়তায় সীমাবদ্ধ নয়। তাঁদের জন্য চিকিৎসা, পুষ্টি, নিরাপদ আবাসন, যাতায়াত এবং সামাজিক অংশগ্রহণের সুযোগও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলোকে প্রবীণদের প্রকৃত প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে গড়ে তোলা প্রয়োজন। বয়স্ক ভাতার আওতায় প্রকৃত অসচ্ছল ও অসহায় প্রবীণদের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা, আবেদনপ্রক্রিয়া সহজ করা, নিয়মিত ভাতা প্রদান এবং স্বচ্ছতা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি যেসব প্রবীণ শারীরিক অসুস্থতা বা প্রতিবন্ধকতার কারণে নিজেরা ভাতা সংগ্রহ করতে পারেন না, তাঁদের জন্য সহজ ও নিরাপদ অর্থপ্রাপ্তির ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। সরকারি সহায়তার পাশাপাশি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, সমাজসেবা অধিদপ্তর, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও দাতব্য প্রতিষ্ঠানগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করলে প্রবীণদের সামাজিক সুরক্ষা আরও সম্প্রসারিত হতে পারে।

প্রবীণদের অধিকার ও আইনি সুরক্ষা
প্রবীণদের অধিকার রক্ষায় বাংলাদেশে পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩ একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনগত ভিত্তি। এ আইনে সন্তানদের ওপর পিতা-মাতার ভরণ-পোষণের দায়িত্ব আরোপ করা হয়েছে। আইনের উদ্দেশ্য হলো পিতা-মাতার যথাযথ ভরণ-পোষণ ও তাঁদের প্রতি সন্তানের দায়িত্ব নিশ্চিত করা। তবে আইন প্রণয়নের পাশাপাশি এর বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়ানোও জরুরি। অনেক প্রবীণ তাঁদের আইনগত অধিকার সম্পর্কে অবগত নন। আবার পারিবারিক সম্পর্কের কারণে অনেকে আইনি সহায়তা নিতে আগ্রহী হন না। তাই স্থানীয় পর্যায়ে আইনি পরামর্শ, সচেতনতামূলক সভা এবং প্রয়োজনে সহায়তা পাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। প্রবীণদের সম্পত্তির অধিকার, ব্যক্তিগত মর্যাদা, নিরাপদ বসবাস এবং চিকিৎসা গ্রহণের সুযোগ রক্ষায় সংশ্লিষ্ট আইন ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার কার্যকর প্রয়োগ গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে প্রবীণদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত পছন্দের প্রতি সম্মান দেখাতে হবে।

প্রবীণবান্ধব স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজন
দীর্ঘায়ুর যুগে স্বাস্থ্যব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হলো প্রবীণদের জন্য বয়সোপযোগী চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা। শুধু রোগের চিকিৎসা নয়, রোগ প্রতিরোধ, পুনর্বাসন, মানসিক স্বাস্থ্য এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যার ব্যবস্থাও গড়ে তুলতে হবে। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে প্রবীণদের জন্য বিশেষ পরামর্শ ও স্বাস্থ্য পরীক্ষার সুযোগ বাড়ানো যেতে পারে। উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে বয়স্ক রোগীদের চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় জনবল ও সেবা উন্নত করার বিষয়টিও বিবেচনা করা জরুরি। বিশেষ করে স্মৃতিভ্রংশ, চলাফেরায় অক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতায় আক্রান্ত প্রবীণদের জন্য প্রশিক্ষিত পরিচর্যাকারীর প্রয়োজন রয়েছে। তাঁদের পরিবারের সদস্যদেরও প্রাথমিক পরিচর্যা, পুষ্টি, ওষুধ ব্যবস্থাপনা ও জরুরি স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দিতে হবে। প্রবীণদের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলা, সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করা এবং তাঁদের পছন্দের কাজ করার স্বাধীনতা দেওয়া মানসিক সুস্থতায় সহায়ক হতে পারে।

প্রবীণবান্ধব সমাজ গঠনে পরিবার ও সমাজের দায়িত্ব
প্রবীণদের নিরাপদ ও সম্মানজনক জীবন নিশ্চিত করার প্রথম দায়িত্ব পরিবারের। বাবা-মা ও পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্যদের প্রতি ভালোবাসা, সম্মান ও দায়িত্ববোধ শুধু নৈতিক কর্তব্য নয়, এটি সামাজিক মূল্যবোধেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পরিবারের সদস্যদের উচিত প্রবীণদের সঙ্গে নিয়মিত সময় কাটানো, তাঁদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া এবং চিকিৎসা ও দৈনন্দিন প্রয়োজনের প্রতি যত্নশীল হওয়া। বিশেষ করে যাঁরা একা থাকেন, তাঁদের নিয়মিত খোঁজখবর নেওয়া প্রয়োজন। সামাজিক সংগঠন, স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। প্রবীণদের জন্য নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, বিনা মূল্যে চিকিৎসা পরামর্শ, পুষ্টিকর খাবার বিতরণ, বিনোদনমূলক আয়োজন এবং সামাজিক মিলনকেন্দ্র গড়ে তোলা যেতে পারে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও প্রবীণদের প্রতি শ্রদ্ধা ও দায়িত্ববোধ তৈরির কার্যক্রম চালু করা যেতে পারে। নতুন প্রজন্মের সঙ্গে প্রবীণদের অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ তৈরি হলে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও আন্তঃপ্রজন্মের সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় হবে।

নারীর বার্ধক্য ও বিশেষ যত্নের প্রয়োজন
প্রবীণ নারীদের সমস্যাগুলোও বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে। অনেক নারী সারা জীবন পরিবার ও সন্তানদের জন্য শ্রম দিলেও বৃদ্ধ বয়সে আর্থিকভাবে স্বনির্ভর থাকতে পারেন না। বিশেষ করে বিধবা, নিঃসন্তান, স্বল্প আয়ের এবং গ্রামীণ এলাকার প্রবীণ নারীরা নানা ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবনযাপন করেন। অনেক প্রবীণ নারী নিজের নামে সম্পত্তি, সঞ্চয় কিংবা নিয়মিত আয়ের সুযোগ না থাকায় অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। তাঁদের জন্য আর্থিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ বাসস্থান এবং আইনগত সহায়তার সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। প্রবীণ নারীদের সামাজিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং তাঁদের প্রতি বৈষম্য ও নির্যাতন প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। বিশেষ করে একা বসবাসকারী প্রবীণ নারীদের জন্য স্থানীয় পর্যায়ে সহায়তা ও নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।

দীর্ঘায়ুর যুগে কর্মসংস্থান ও প্রযুক্তির ব্যবহার
আধুনিক বিশ্বে দীর্ঘায়ু মানুষের জন্য নতুন সম্ভাবনাও সৃষ্টি করছে। অবসর গ্রহণের পরও অনেক প্রবীণ তাঁদের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা কাজে লাগিয়ে সমাজে অবদান রাখতে পারেন। তাঁদের উপযোগী স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজ, পরামর্শক হিসেবে অংশগ্রহণ, ক্ষুদ্র উদ্যোগ এবং দক্ষতা বিনিময়ের সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে। প্রযুক্তির ব্যবহারও প্রবীণদের জীবন সহজ করতে পারে। মোবাইল ফোনের মাধ্যমে চিকিৎসকের পরামর্শ, ডিজিটাল আর্থিক সেবা এবং জরুরি যোগাযোগের ব্যবস্থা তাঁদের দৈনন্দিন জীবনে সহায়ক হতে পারে। তবে প্রযুক্তি ব্যবহারে অদক্ষ প্রবীণদের জন্য প্রশিক্ষণ ও সরাসরি সহায়তার ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। এ ছাড়া সরকারি ও বেসরকারি সেবাকেন্দ্র, গণপরিবহন, হাসপাতাল এবং জনসাধারণের ব্যবহারের স্থাপনাগুলো প্রবীণবান্ধব করে গড়ে তোলা দরকার। বিশেষ করে হুইলচেয়ার ব্যবহারের সুযোগ, বসার ব্যবস্থা, সহজে প্রবেশযোগ্য সেবা এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশনাব্যবস্থা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।

প্রবীণদের কল্যাণে করণীয়
প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে কয়েকটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। বয়স্ক ভাতার আওতা ও কার্যকারিতা বাড়িয়ে প্রকৃত অসচ্ছল প্রবীণদের কাছে সহায়তা পৌঁছে দেওয়া। সরকারি হাসপাতাল ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে প্রবীণদের জন্য সহজলভ্য চিকিৎসা এবং প্রয়োজনীয় ওষুধের ব্যবস্থা করা। প্রবীণ নির্যাতন ও পারিবারিক অবহেলা প্রতিরোধে সচেতনতা, আইনি সহায়তা এবং অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা। একাকী, অসহায় ও শারীরিকভাবে অক্ষম প্রবীণদের জন্য স্থানীয় পর্যায়ে পরিচর্যা ও সহায়তা কার্যক্রম চালু করা। প্রবীণদের জন্য নিরাপদ, সহজে প্রবেশযোগ্য ও স্বাস্থ্যসম্মত আবাসন এবং গণপরিবহন নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া। প্রবীণদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করা। প্রবীণদের অধিকার ও তাঁদের প্রতি পারিবারিক দায়িত্ব সম্পর্কে গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক সংগঠনের মাধ্যমে সচেতনতা বাড়ানো। প্রবীণদের প্রয়োজন নিরূপণ করে দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত জাতীয় পরিকল্পনা গ্রহণ করা।

প্রবীণদের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে হবে
একটি উন্নত সমাজের পরিচয় শুধু তার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বা অবকাঠামোগত উন্নয়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সমাজের সবচেয়ে অভিজ্ঞ ও বয়োজ্যেষ্ঠ নাগরিকেরা কতটা নিরাপদ, সম্মানজনক ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন করতে পারছেন, সেটিও উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ সূচক।

প্রবীণদের অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান নতুন প্রজন্মের জন্য মূল্যবান সম্পদ। তাঁদের সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ দিলে একদিকে যেমন তাঁদের একাকিত্ব কমবে, অন্যদিকে সমাজও তাঁদের অভিজ্ঞতা থেকে উপকৃত হবে। এ জন্য প্রবীণদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা এবং তাঁদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

বিশেষ করে স্থানীয় উন্নয়ন, পারিবারিক বিরোধ নিষ্পত্তি, সামাজিক সম্প্রীতি ও পরিবেশ সংরক্ষণের মতো কাজে আগ্রহী প্রবীণদের অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করা যেতে পারে। এতে তাঁদের আত্মমর্যাদা বৃদ্ধি পাবে এবং প্রজন্মের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদার হবে।

মানবিক বাংলাদেশ গড়তে প্রবীণদের মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে
আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস ২০২৬ আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা তুলে ধরেছে—দীর্ঘ জীবন তখনই সার্থক, যখন সেই জীবনে নিরাপত্তা, সুস্থতা, স্বাধীনতা ও মর্যাদা থাকে। প্রবীণদের জন্য কেবল আনুষ্ঠানিক শুভেচ্ছা কিংবা এক দিনের আয়োজন যথেষ্ট নয়। তাঁদের কল্যাণে সারা বছর ধরে কার্যকর কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে হবে।  বাংলাদেশের প্রতিটি পরিবারে প্রবীণদের প্রতি দায়িত্ববোধ জাগ্রত করা, তাঁদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা এবং সামাজিক নিরাপত্তার আওতা সম্প্রসারণ করা সময়ের দাবি। পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে প্রবীণদের জন্য একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে তুলতে হবে। আজকের তরুণরাই আগামী দিনের প্রবীণ। তাই প্রবীণদের প্রতি সম্মান ও সহমর্মিতা প্রদর্শন মানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও একটি নিরাপদ সমাজ গড়ে তোলা। আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবসের এই বিশেষ দিনে আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত—কোনো প্রবীণ যেন অবহেলা, দারিদ্র্য, অসুস্থতা কিংবা একাকিত্বের কারণে মর্যাদাহীন জীবনযাপন করতে বাধ্য না হন। তাঁদের অভিজ্ঞতা ও অবদানকে যথাযথ স্বীকৃতি দিয়ে একটি মানবিক, সহানুভূতিশীল ও প্রবীণবান্ধব বাংলাদেশ গড়ে তোলাই হোক আজকের দিনের মূল প্রত্যয়।

 

মাহবুবুর রহমান: আজ ১ অক্টোবর, আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস ২০২৬। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে। প্রবীণ জনগোষ্ঠীর অধিকার, মর্যাদা, স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং তাঁদের প্রতি পারিবারিক ও সামাজিক দায়িত্বের বিষয়গুলো নতুন করে আলোচনায় এসেছে। একটি দেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অগ্রগতিতে প্রবীণদের অবদান অনস্বীকার্য। অথচ জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে তাঁদের অনেকেই নানা ধরনের অবহেলা, আর্থিক অনিশ্চয়তা, অসুস্থতা, একাকিত্ব ও সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার মুখোমুখি হচ্ছেন। আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস কেবল একটি আনুষ্ঠানিক দিবস নয়; এটি প্রবীণদের প্রতি আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য স্মরণ করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। প্রবীণদের অভিজ্ঞতা, জ্ঞান, শ্রম, ত্যাগ ও অবদানকে যথাযথ মূল্যায়ন করে তাঁদের জন্য সম্মানজনক, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করাই এ দিবসের মূল তাৎপর্য। বিশ্বব্যাপী মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। এর ফলে স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক নিরাপত্তা, পেনশন, আবাসন, কর্মসংস্থান, পরিচর্যা এবং পারিবারিক দায়িত্বের মতো বিষয়গুলো ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বাংলাদেশেও জনমিতিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকার দরিদ্র, অসহায়, একাকী ও শারীরিকভাবে অক্ষম প্রবীণদের জন্য কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক চ্যালেঞ্জ। আজকের এই বিশেষ দিনে প্রবীণদের জীবনমান, তাঁদের অধিকার, বিদ্যমান সমস্যা, সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ এবং প্রবীণবান্ধব সমাজ গঠনের সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা প্রয়োজন। দীর্ঘায়ুর যুগে প্রবীণদের জন্য নতুন ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান

২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক প্রতিপাদ্য:
জাতিসংঘের ঘোষিত ২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবসের প্রতিপাদ্যের বাংলা ভাবার্থ হলো, ‘দীর্ঘায়ুর যুগ: দীর্ঘতর জীবনের জন্য ব্যবস্থাগুলোকে নতুন করে ভাবা।’ এবারের প্রতিপাদ্যে মানুষের দীর্ঘায়ু হওয়ার বিষয়টিকে শুধু চিকিৎসাবিজ্ঞানের সাফল্য হিসেবে নয়, বরং স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক সুরক্ষা, কর্মসংস্থান, আবাসন ও পারিবারিক পরিচর্যার ব্যবস্থাকে নতুন করে সাজানোর প্রয়োজনীয়তা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের ২০২৬ সালের বার্তায় বলা হয়েছে, বিশ্বে ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা ২০৫০ সালের মধ্যে ১২০ কোটি থেকে বেড়ে ২১০ কোটিতে পৌঁছাতে পারে। তখন বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ হবে এই বয়সী মানুষ। এ পরিবর্তন মোকাবিলায় কর্মসংস্থান, পেনশন, আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা ও আজীবন শিক্ষার সুযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এই বৈশ্বিক বাস্তবতা বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, মানুষের আয়ু বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রবীণদের স্বাস্থ্যসেবা ও আর্থিক নিরাপত্তার চাহিদাও বাড়ছে। দীর্ঘ জীবন তখনই অর্থবহ হবে, যখন একজন প্রবীণ ব্যক্তি সুস্থতা, স্বনির্ভরতা, সামাজিক অংশগ্রহণ এবং নিজের সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার নিয়ে বেঁচে থাকার সুযোগ পাবেন।

বাংলাদেশে দিবসটি পালনে সরকারি উদ্যোগ
বাংলাদেশে ১৯৯১ সাল থেকে আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস পালিত হয়ে আসছে। ২০২৬ সালে দিবসটির ৩৬তম আয়োজন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। দিবসটি উপলক্ষে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন সমাজসেবা অধিদপ্তর বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে শোভাযাত্রা, আলোচনা সভা, জাতীয় সংবাদপত্রে বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ এবং প্রবীণদের মর্যাদা সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টি। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সমাজসেবা কার্যালয়গুলোকে যথাযোগ্য মর্যাদায় দিবসটি পালনের নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী পৃথক বাণী দিয়েছেন। রাষ্ট্রপতি প্রবীণদের কল্যাণে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, সামাজিক ও দাতব্য সংগঠন, বিত্তবান ব্যক্তি এবং পরিবারগুলোকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রী প্রবীণদের অভিজ্ঞতা, ত্যাগ ও প্রজ্ঞাকে দেশের সামাজিক ভিত্তির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এসব উদ্যোগের মূল তাৎপর্য হলো, প্রবীণদের কল্যাণ কেবল সরকারের একক দায়িত্ব নয়। পরিবার, সমাজ, স্থানীয় প্রশাসন, গণমাধ্যম, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও নাগরিক সমাজের সম্মিলিত অংশগ্রহণ ছাড়া প্রবীণবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলা কঠিন।

প্রবীণ জনগোষ্ঠী: সমাজের অভিজ্ঞতার ভান্ডার
একজন প্রবীণ ব্যক্তি শুধু বয়সের বিচারে প্রবীণ নন; তিনি একটি পরিবারের ইতিহাস, একটি সমাজের অভিজ্ঞতা এবং একটি দেশের উন্নয়নযাত্রার সাক্ষী। তাঁদের দীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে নতুন প্রজন্ম অনেক কিছু শিখতে পারে। কৃষি, ব্যবসা, শিক্ষা, সংস্কৃতি, মুক্তিযুদ্ধ, সামাজিক সংগঠন, পরিবার পরিচালনা এবং স্থানীয় উন্নয়নে প্রবীণদের অবদান রয়েছে। গ্রামবাংলার কৃষক, শ্রমজীবী মানুষ, শিক্ষক, সমাজকর্মী, ব্যবসায়ী, সরকারি কর্মকর্তা ও বিভিন্ন পেশার মানুষ দীর্ঘ কর্মজীবনের মধ্য দিয়ে দেশের অর্থনীতি ও সমাজ গঠনে ভূমিকা রেখেছেন। তাঁদের অনেকেই অবসর গ্রহণের পরও পরিবার ও সমাজের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। কেউ নাতি-নাতনিদের লালন-পালন করছেন, কেউ পারিবারিক ব্যবসায় পরামর্শ দিচ্ছেন, আবার কেউ স্থানীয় বিরোধ নিষ্পত্তি ও সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষায় ভূমিকা রাখছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেকের কর্মক্ষমতা কমে আসে। কারও নিয়মিত চিকিৎসার প্রয়োজন হয়, কেউ হারিয়ে ফেলেন উপার্জনের সক্ষমতা, আবার কেউ জীবনসঙ্গী বা পরিবারের অন্য সদস্যদের হারিয়ে একাকিত্বে ভোগেন। ফলে তাঁদের অভিজ্ঞতার যথাযথ মূল্যায়নের পাশাপাশি প্রয়োজন হয় আর্থিক ও সামাজিক সহায়তা। প্রবীণদের সমাজের বোঝা হিসেবে বিবেচনা করার পরিবর্তে তাঁদের সক্রিয় অংশীদার হিসেবে দেখতে হবে। তাঁদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে স্থানীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা, সামাজিক উদ্যোগ এবং নতুন প্রজন্মের শিক্ষায় কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন।

প্রবীণদের প্রধান সমস্যা: দারিদ্র্য, অসুস্থতা ও একাকিত্ব
বাংলাদেশের প্রবীণ জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ নানা ধরনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যার মুখোমুখি। বিশেষ করে দরিদ্র পরিবার, প্রত্যন্ত অঞ্চলের বাসিন্দা, স্বামী বা স্ত্রীকে হারানো ব্যক্তি এবং শারীরিক প্রতিবন্ধকতায় আক্রান্ত প্রবীণদের জীবন অনেক বেশি কঠিন।

আর্থিক অনিশ্চয়তা ও দারিদ্র্য
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক প্রবীণ ব্যক্তি নিয়মিত আয় করার সক্ষমতা হারান। যাঁরা সারা জীবন কৃষিকাজ, দিনমজুরি, ক্ষুদ্র ব্যবসা কিংবা অনানুষ্ঠানিক পেশায় নিয়োজিত ছিলেন, তাঁদের অনেকেরই অবসরকালীন সঞ্চয় বা পেনশনের ব্যবস্থা নেই। ফলে দৈনন্দিন খাবার, পোশাক, বাসস্থান ও চিকিৎসার খরচ মেটাতে তাঁদের পরিবারের অন্য সদস্যদের ওপর নির্ভর করতে হয়। দরিদ্র পরিবারের প্রবীণদের জন্য এই নির্ভরশীলতা আরও জটিল হয়ে ওঠে। অনেক সময় পরিবারের উপার্জনক্ষম সদস্যদের সীমিত আয়ের কারণে প্রবীণদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না। তাই প্রবীণদের জন্য নিয়মিত আর্থিক সহায়তা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং আয়বর্ধক কার্যক্রমের সুযোগ বাড়ানো জরুরি।

স্বাস্থ্যসেবা ও চিকিৎসার সংকট
বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদ্‌রোগ, দৃষ্টিশক্তির সমস্যা, হাড়ের দুর্বলতা, শ্রবণশক্তি হ্রাস ও স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়ার মতো নানা স্বাস্থ্যগত সমস্যা দেখা দিতে পারে। অনেক প্রবীণকে দীর্ঘদিন ওষুধ সেবন করতে হয়। কারও প্রয়োজন হয় নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও বিশেষায়িত চিকিৎসার। কিন্তু গ্রামীণ এলাকার অনেক প্রবীণের পক্ষে দূরের হাসপাতালে যাতায়াত করা কঠিন। চিকিৎসার ব্যয়, যাতায়াতের অসুবিধা এবং যথাযথ পরিচর্যার অভাবে তাঁরা প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। প্রবীণদের জন্য সহজলভ্য চিকিৎসা, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, সাশ্রয়ী ওষুধ এবং বাড়িভিত্তিক পরিচর্যার ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন।

পারিবারিক অবহেলা ও মানসিক নিঃসঙ্গতা
পরিবারের সদস্যদের কর্মব্যস্ততা, সন্তানদের দূরে বসবাস, পারিবারিক বিরোধ কিংবা জীবনসঙ্গীকে হারানোর কারণে অনেক প্রবীণ একাকিত্বে ভোগেন। তাঁদের সঙ্গে কথা বলার, সময় কাটানোর কিংবা মনের কথা প্রকাশ করার মানুষ না থাকলে মানসিক কষ্ট আরও বাড়তে পারে। কিছু ক্ষেত্রে প্রবীণদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। সম্পত্তি, চিকিৎসা, বাসস্থান কিংবা পারিবারিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে তাঁদের ইচ্ছাকে উপেক্ষা করার ঘটনাও ঘটতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে প্রবীণদের প্রতি সম্মান, সহমর্মিতা এবং পারিবারিক দায়িত্ববোধ জোরদার করা প্রয়োজন।

নিরাপত্তাহীনতা ও নির্যাতন
প্রবীণদের প্রতি অবহেলা, আর্থিক শোষণ, সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করা, অপমানজনক আচরণ এবং শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন গুরুতর সামাজিক সমস্যা। অনেক প্রবীণ সামাজিক সম্মান হারানোর ভয়ে কিংবা পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় নির্যাতনের কথা প্রকাশ করেন না। এ ধরনের পরিস্থিতি প্রতিরোধে পারিবারিক সচেতনতা, সামাজিক নজরদারি, আইনি সহায়তা এবং অভিযোগ জানানোর সহজ ব্যবস্থা প্রয়োজন। বিশেষ করে একা বসবাসকারী ও শারীরিকভাবে অসহায় প্রবীণদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্থানীয় পর্যায়ে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

প্রবীণদের সামাজিক নিরাপত্তা: সরকারি সহায়তার গুরুত্ব
প্রবীণ জনগোষ্ঠীর আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশে বয়স্ক ভাতা একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি। এর মাধ্যমে নির্ধারিত যোগ্যতা অনুযায়ী অসচ্ছল প্রবীণদের আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়। এই কর্মসূচি দরিদ্র প্রবীণদের নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতে সহায়তা করে। তবে প্রবীণদের চাহিদা কেবল আর্থিক সহায়তায় সীমাবদ্ধ নয়। তাঁদের জন্য চিকিৎসা, পুষ্টি, নিরাপদ আবাসন, যাতায়াত এবং সামাজিক অংশগ্রহণের সুযোগও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলোকে প্রবীণদের প্রকৃত প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে গড়ে তোলা প্রয়োজন। বয়স্ক ভাতার আওতায় প্রকৃত অসচ্ছল ও অসহায় প্রবীণদের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা, আবেদনপ্রক্রিয়া সহজ করা, নিয়মিত ভাতা প্রদান এবং স্বচ্ছতা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি যেসব প্রবীণ শারীরিক অসুস্থতা বা প্রতিবন্ধকতার কারণে নিজেরা ভাতা সংগ্রহ করতে পারেন না, তাঁদের জন্য সহজ ও নিরাপদ অর্থপ্রাপ্তির ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। সরকারি সহায়তার পাশাপাশি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, সমাজসেবা অধিদপ্তর, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও দাতব্য প্রতিষ্ঠানগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করলে প্রবীণদের সামাজিক সুরক্ষা আরও সম্প্রসারিত হতে পারে।

প্রবীণদের অধিকার ও আইনি সুরক্ষা
প্রবীণদের অধিকার রক্ষায় বাংলাদেশে পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩ একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনগত ভিত্তি। এ আইনে সন্তানদের ওপর পিতা-মাতার ভরণ-পোষণের দায়িত্ব আরোপ করা হয়েছে। আইনের উদ্দেশ্য হলো পিতা-মাতার যথাযথ ভরণ-পোষণ ও তাঁদের প্রতি সন্তানের দায়িত্ব নিশ্চিত করা। তবে আইন প্রণয়নের পাশাপাশি এর বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়ানোও জরুরি। অনেক প্রবীণ তাঁদের আইনগত অধিকার সম্পর্কে অবগত নন। আবার পারিবারিক সম্পর্কের কারণে অনেকে আইনি সহায়তা নিতে আগ্রহী হন না। তাই স্থানীয় পর্যায়ে আইনি পরামর্শ, সচেতনতামূলক সভা এবং প্রয়োজনে সহায়তা পাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। প্রবীণদের সম্পত্তির অধিকার, ব্যক্তিগত মর্যাদা, নিরাপদ বসবাস এবং চিকিৎসা গ্রহণের সুযোগ রক্ষায় সংশ্লিষ্ট আইন ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার কার্যকর প্রয়োগ গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে প্রবীণদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত পছন্দের প্রতি সম্মান দেখাতে হবে।

প্রবীণবান্ধব স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজন
দীর্ঘায়ুর যুগে স্বাস্থ্যব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হলো প্রবীণদের জন্য বয়সোপযোগী চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা। শুধু রোগের চিকিৎসা নয়, রোগ প্রতিরোধ, পুনর্বাসন, মানসিক স্বাস্থ্য এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যার ব্যবস্থাও গড়ে তুলতে হবে। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে প্রবীণদের জন্য বিশেষ পরামর্শ ও স্বাস্থ্য পরীক্ষার সুযোগ বাড়ানো যেতে পারে। উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে বয়স্ক রোগীদের চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় জনবল ও সেবা উন্নত করার বিষয়টিও বিবেচনা করা জরুরি। বিশেষ করে স্মৃতিভ্রংশ, চলাফেরায় অক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতায় আক্রান্ত প্রবীণদের জন্য প্রশিক্ষিত পরিচর্যাকারীর প্রয়োজন রয়েছে। তাঁদের পরিবারের সদস্যদেরও প্রাথমিক পরিচর্যা, পুষ্টি, ওষুধ ব্যবস্থাপনা ও জরুরি স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দিতে হবে। প্রবীণদের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলা, সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করা এবং তাঁদের পছন্দের কাজ করার স্বাধীনতা দেওয়া মানসিক সুস্থতায় সহায়ক হতে পারে।

প্রবীণবান্ধব সমাজ গঠনে পরিবার ও সমাজের দায়িত্ব
প্রবীণদের নিরাপদ ও সম্মানজনক জীবন নিশ্চিত করার প্রথম দায়িত্ব পরিবারের। বাবা-মা ও পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্যদের প্রতি ভালোবাসা, সম্মান ও দায়িত্ববোধ শুধু নৈতিক কর্তব্য নয়, এটি সামাজিক মূল্যবোধেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পরিবারের সদস্যদের উচিত প্রবীণদের সঙ্গে নিয়মিত সময় কাটানো, তাঁদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া এবং চিকিৎসা ও দৈনন্দিন প্রয়োজনের প্রতি যত্নশীল হওয়া। বিশেষ করে যাঁরা একা থাকেন, তাঁদের নিয়মিত খোঁজখবর নেওয়া প্রয়োজন। সামাজিক সংগঠন, স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। প্রবীণদের জন্য নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, বিনা মূল্যে চিকিৎসা পরামর্শ, পুষ্টিকর খাবার বিতরণ, বিনোদনমূলক আয়োজন এবং সামাজিক মিলনকেন্দ্র গড়ে তোলা যেতে পারে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও প্রবীণদের প্রতি শ্রদ্ধা ও দায়িত্ববোধ তৈরির কার্যক্রম চালু করা যেতে পারে। নতুন প্রজন্মের সঙ্গে প্রবীণদের অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ তৈরি হলে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও আন্তঃপ্রজন্মের সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় হবে।

নারীর বার্ধক্য ও বিশেষ যত্নের প্রয়োজন
প্রবীণ নারীদের সমস্যাগুলোও বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে। অনেক নারী সারা জীবন পরিবার ও সন্তানদের জন্য শ্রম দিলেও বৃদ্ধ বয়সে আর্থিকভাবে স্বনির্ভর থাকতে পারেন না। বিশেষ করে বিধবা, নিঃসন্তান, স্বল্প আয়ের এবং গ্রামীণ এলাকার প্রবীণ নারীরা নানা ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবনযাপন করেন। অনেক প্রবীণ নারী নিজের নামে সম্পত্তি, সঞ্চয় কিংবা নিয়মিত আয়ের সুযোগ না থাকায় অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। তাঁদের জন্য আর্থিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ বাসস্থান এবং আইনগত সহায়তার সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। প্রবীণ নারীদের সামাজিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং তাঁদের প্রতি বৈষম্য ও নির্যাতন প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। বিশেষ করে একা বসবাসকারী প্রবীণ নারীদের জন্য স্থানীয় পর্যায়ে সহায়তা ও নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।

দীর্ঘায়ুর যুগে কর্মসংস্থান ও প্রযুক্তির ব্যবহার
আধুনিক বিশ্বে দীর্ঘায়ু মানুষের জন্য নতুন সম্ভাবনাও সৃষ্টি করছে। অবসর গ্রহণের পরও অনেক প্রবীণ তাঁদের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা কাজে লাগিয়ে সমাজে অবদান রাখতে পারেন। তাঁদের উপযোগী স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজ, পরামর্শক হিসেবে অংশগ্রহণ, ক্ষুদ্র উদ্যোগ এবং দক্ষতা বিনিময়ের সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে। প্রযুক্তির ব্যবহারও প্রবীণদের জীবন সহজ করতে পারে। মোবাইল ফোনের মাধ্যমে চিকিৎসকের পরামর্শ, ডিজিটাল আর্থিক সেবা এবং জরুরি যোগাযোগের ব্যবস্থা তাঁদের দৈনন্দিন জীবনে সহায়ক হতে পারে। তবে প্রযুক্তি ব্যবহারে অদক্ষ প্রবীণদের জন্য প্রশিক্ষণ ও সরাসরি সহায়তার ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। এ ছাড়া সরকারি ও বেসরকারি সেবাকেন্দ্র, গণপরিবহন, হাসপাতাল এবং জনসাধারণের ব্যবহারের স্থাপনাগুলো প্রবীণবান্ধব করে গড়ে তোলা দরকার। বিশেষ করে হুইলচেয়ার ব্যবহারের সুযোগ, বসার ব্যবস্থা, সহজে প্রবেশযোগ্য সেবা এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশনাব্যবস্থা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।

প্রবীণদের কল্যাণে করণীয়
প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে কয়েকটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। বয়স্ক ভাতার আওতা ও কার্যকারিতা বাড়িয়ে প্রকৃত অসচ্ছল প্রবীণদের কাছে সহায়তা পৌঁছে দেওয়া। সরকারি হাসপাতাল ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে প্রবীণদের জন্য সহজলভ্য চিকিৎসা এবং প্রয়োজনীয় ওষুধের ব্যবস্থা করা। প্রবীণ নির্যাতন ও পারিবারিক অবহেলা প্রতিরোধে সচেতনতা, আইনি সহায়তা এবং অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা। একাকী, অসহায় ও শারীরিকভাবে অক্ষম প্রবীণদের জন্য স্থানীয় পর্যায়ে পরিচর্যা ও সহায়তা কার্যক্রম চালু করা। প্রবীণদের জন্য নিরাপদ, সহজে প্রবেশযোগ্য ও স্বাস্থ্যসম্মত আবাসন এবং গণপরিবহন নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া। প্রবীণদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করা। প্রবীণদের অধিকার ও তাঁদের প্রতি পারিবারিক দায়িত্ব সম্পর্কে গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক সংগঠনের মাধ্যমে সচেতনতা বাড়ানো। প্রবীণদের প্রয়োজন নিরূপণ করে দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত জাতীয় পরিকল্পনা গ্রহণ করা।

প্রবীণদের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে হবে
একটি উন্নত সমাজের পরিচয় শুধু তার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বা অবকাঠামোগত উন্নয়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সমাজের সবচেয়ে অভিজ্ঞ ও বয়োজ্যেষ্ঠ নাগরিকেরা কতটা নিরাপদ, সম্মানজনক ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন করতে পারছেন, সেটিও উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ সূচক।

প্রবীণদের অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান নতুন প্রজন্মের জন্য মূল্যবান সম্পদ। তাঁদের সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ দিলে একদিকে যেমন তাঁদের একাকিত্ব কমবে, অন্যদিকে সমাজও তাঁদের অভিজ্ঞতা থেকে উপকৃত হবে। এ জন্য প্রবীণদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা এবং তাঁদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

বিশেষ করে স্থানীয় উন্নয়ন, পারিবারিক বিরোধ নিষ্পত্তি, সামাজিক সম্প্রীতি ও পরিবেশ সংরক্ষণের মতো কাজে আগ্রহী প্রবীণদের অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করা যেতে পারে। এতে তাঁদের আত্মমর্যাদা বৃদ্ধি পাবে এবং প্রজন্মের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদার হবে।

মানবিক বাংলাদেশ গড়তে প্রবীণদের মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে
আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস ২০২৬ আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা তুলে ধরেছে—দীর্ঘ জীবন তখনই সার্থক, যখন সেই জীবনে নিরাপত্তা, সুস্থতা, স্বাধীনতা ও মর্যাদা থাকে। প্রবীণদের জন্য কেবল আনুষ্ঠানিক শুভেচ্ছা কিংবা এক দিনের আয়োজন যথেষ্ট নয়। তাঁদের কল্যাণে সারা বছর ধরে কার্যকর কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে হবে।  বাংলাদেশের প্রতিটি পরিবারে প্রবীণদের প্রতি দায়িত্ববোধ জাগ্রত করা, তাঁদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা এবং সামাজিক নিরাপত্তার আওতা সম্প্রসারণ করা সময়ের দাবি। পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে প্রবীণদের জন্য একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে তুলতে হবে। আজকের তরুণরাই আগামী দিনের প্রবীণ। তাই প্রবীণদের প্রতি সম্মান ও সহমর্মিতা প্রদর্শন মানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও একটি নিরাপদ সমাজ গড়ে তোলা। আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবসের এই বিশেষ দিনে আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত—কোনো প্রবীণ যেন অবহেলা, দারিদ্র্য, অসুস্থতা কিংবা একাকিত্বের কারণে মর্যাদাহীন জীবনযাপন করতে বাধ্য না হন। তাঁদের অভিজ্ঞতা ও অবদানকে যথাযথ স্বীকৃতি দিয়ে একটি মানবিক, সহানুভূতিশীল ও প্রবীণবান্ধব বাংলাদেশ গড়ে তোলাই হোক আজকের দিনের মূল প্রত্যয়।