দি ক্রাইম ডেস্ক: মৃত্যুর দেড় বছর পর চলতি বছরের মে মাসে ১৯৯৪ সালের এক মামলায় বিচারিক আদালতের দণ্ড থেকে খালাস পেয়েছেন সরকারি কর্মকর্তা এনায়েত করিম। হাইকোর্ট বলছেন, আপিলকারী যদি বেঁচে থাকতেন, তাহলে তিনি সম্মানজনক খালাসের অধিকারী হতেন।
১৯৯৪ সালের ৩১ আগস্ট উপ-খাদ্য পরিদর্শক মো. জাহিদুজ্জামান ও খাদ্য পরিদর্শক এনায়েত করিমের বিরুদ্ধে খুলনার দৌলতপুর থানায় মামলা হয়। ১৯৯৩-১৯৯৪ সালে উপ-খাদ্য পরিদর্শক এবং সরকারি খাদ্য গুদামে দায়িত্বে থাকাকালে জাহিদুজ্জামান সরকারি গমের হেফাজত, সঞ্চয় ও বিতরণের দায়িত্বে ছিলেন।
সেই ক্ষমতায় তিনি বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে প্রচুর পরিমাণে গম পেয়েছিলেন এবং ওজন ও যাচাইয়ের পরে তা গুদামে সংরক্ষণ করেছিলেন।
রাষ্ট্রপক্ষের মতে, সরকারি কর্মসূচির আওতায় বিভিন্ন সুবিধাভোগীদের মধ্যে গম বিতরণের পরে সরেজমিন যাচাইয়ের পর গুরুতর অসামঞ্জস্যতা প্রকাশ পায়। প্রায় ৫৫ দশমিক ৭৫১ মেট্রিক টন গমের ঘাটতি শনাক্ত করা হয়েছিল। যাতে ক্ষতি হয়েছে ৩ লাখ ৯৫ হাজার ৮৩২ দশমিক ১০ পয়সা।
এ মামলায় সাত জনের সাক্ষী নেওয়া হয়। বিচার শেষে ১৯৯৯ সালের ২৮ এপ্রিল খুলনা বিভাগীয় বিশেষ জজ রায় দেন। রায়ে মামলার প্রধান অভিযুক্ত জাহিদুজ্জামান এবং তার উর্ধ্বতন হিসেবে দ্বিতীয় অভিযুক্ত এনায়েত করিমের ৪ বছরের দণ্ড এবং এক হাজার টাকা জরিমানা করে। অনাদায়ে আরও তিন মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
পরে তারা পৃথক আপিল করে হাইকোর্ট থেকে জামিন নেন। প্রধান অভিযুক্ত জাহিদুজ্জামানের আপিল শুনানি শেষে ২০০৫ সালের ২৬ অক্টোবর বিচারপতি মো. ছিদ্দিকুর রহমান মিয়া তাকে খালাস দেন। খালাস পেয়ে তিনি চাকরিতে যোগদান করেন।
এনায়েত করিমের শুনানিতে আইনজীবী শেখ একেএম মনিরুজ্জামান কবির বলেন, প্রধান অভিযুক্ত খালাস পেয়েছেন। আর এনায়েত করিমের বিরুদ্ধে কোনো সাক্ষীও ছিল না। প্রসিকিউশন তারা অভিযোগও প্রমাণ করতে পারেননি। এ জন্য তিনি খালাস পেতে পারেন।
অপরদিকে দুদকের আইনজীবী সাইফুল মালেক চৌধুরী বলেন, বিচারিক আদালত সঠিকভাবে নথিপত্রের ভিত্তিতে আসামিকে দণ্ড দিয়েছেন। সুতরাং বিচারিক আদালতের রায়ে হস্তক্ষেপ করার মতো কিছু নেই। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী দুদকের আইনজীবীর বক্তব্য সমর্থন করেন।
এর মধ্যে ২০২৪ সালের ১৭ অক্টোবর এনায়েত করিম মারা যান।
হাইকোর্টের রায়
আপিলের শুনানি শেষে চলতি বছরের ৪ মে রায় দেন হাইকোর্ট। সম্প্রতি সে রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ করা হয়েছে।
রায়ে আদালত বলেন, বর্তমান আপিলকারী মো. এনায়েত করিমের রেকর্ডের প্রমাণ থেকে জানা যায়, তিনি কেবল ব্লক ইন্সপেক্টর/ফুড ইন্সপেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন এবং সংশ্লিষ্ট গুদামগুলোর হেফাজত, নিয়ন্ত্রণ বা পরিচালনার দায়িত্ব তাঁকে দেওয়া হয়নি। প্রসিকিউশন তার পক্ষ থেকে কোনো নির্দিষ্ট প্রকাশ্য কাজ প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। কোনো সাক্ষী সাক্ষ্য দেননি, তিনি গম অপসারণ, স্টক রেজিস্টারের কারসাজি, সরকারি সম্পত্তির অবৈধ নিষ্পত্তি বা ইচ্ছাকৃত সহায়তা বা প্ররোচনার মতো কোনো কাজে অংশ নিয়েছিলেন।
চার্জশিটে ‘যোগসাজশের’ একটি অস্পষ্ট এবং সর্বজনীন অভিযোগ ছাড়া, অভিযুক্ত অপরাধের সঙ্গে তাকে যুক্ত করার কোনো উল্লেখযোগ্য প্রমাণ নেই। প্রধান অভিযুক্তের দ্বারা বিশ্বাসের ফৌজদারি লঙ্ঘনের প্রমাণের অভাবে এবং বর্তমান আপিলকারীর বিরুদ্ধে প্ররোচনার কোনো স্বাধীন প্রমাণের অভাবে, দণ্ডবিধির ৪০৯/১০৯ ধারায় তাকে দোষী সাব্যস্ত করা যাবে না।
অতএব, নথিভুক্ত প্রমাণগুলো স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে বর্তমান আপিলকারীকে কেবল তার সরকারি অবস্থানের কারণে অভিযুক্ত করা হয়েছিল, ফৌজদারি অভিপ্রায় বা অংশগ্রহণ প্রতিষ্ঠার কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ ছাড়াই। তাই আদালত আপিল মঞ্জুর করেন।
আদালত বলেন, আপিলকারী যদি বেঁচে থাকতেন, তাহলে তিনি সম্মানজনক খালাসের অধিকারী হতেন। ফলস্বরূপ তার উত্তরাধিকারীদের তার ওপর আরোপিত জরিমানা পরিশোধের যেকোনো দায় থেকে অব্যাহতি দেওয়া হলো।
আইনজীবী শেখ এ কে এম মনিরুজ্জামান কবির বলেন, মামলার প্রধান অভিযুক্ত জাহিদুজ্জামান ২০০৫ সালে খালাস পেয়েছিলেন। এরপর তিনি চাকরিতে যোগদান করে স্বাভাবিক অবসর নেওয়ার পর মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু এনায়েত করিমের বিরুদ্ধে আরও চারটি মামলা থাকায় তিনি সেগুলোর শুনানি নিয়ে ব্যস্ত থাকায় হাইকোর্টে আপিল শুনানি করতে সময় পাননি। যদিও তিনি ওই চার মামলায় খালাস পেয়েছেন। খালাস পেয়ে তিনি হাইকোর্টে আপিল শুনানির উদ্যোগ নেন। এর মধ্যে জাহিদুজ্জামান খালাস পাওয়ায় মামলার সকল নথি খুলনা আদালতে চলে যায়।
পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ১৭ অক্টোবর মারা যান এনায়েত করিম। তখন আদালত বলেন, এক হাজার টাকা জরিমানা জমা দিয়ে দেন তাহলে খালাস পেতে পারেন। কিন্তু জরিমানা দেওয়া মানে তো দণ্ড মেনে নেওয়া। তাই জরিমানা না দিয়ে ওয়ারিশ সনদ দিয়ে এনায়েত করিমের ছেলে মামলা চালান। এরপর এনায়েত করিমের বিরুদ্ধে কোনো তথ্য-প্রমাণ না থাকায় হাইকোর্ট তাকে খালাস দেন এবং জরিমানা থেকে অব্যাহতি দেন। এখন সরকারি সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার জন্য তার ওয়ারিশরা সরকারের কাছে আবেদন করতে পারবেন।




