জোরপূর্বক বাউল- ফকির- সন্ন্যাসীদের চুল কাটার ব্যাপারে হাইকোর্টের রুল
দি ক্রাইম ডেস্ক: বাউল ফকিরদের উপরে ক্রমবর্ধমান নির্যাতন শুধু তাদের একতারা ভাঙা, আখড়ায় আক্রমণ আর গান বন্ধের ফতোয়াতে সীমাবদ্ধ নেই। জোরপূর্বক শত শত বাউল, ফকির ও সন্ন্যাসীদের চুল ও জটা কাটা হয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় শুধু তাদের ধর্ম বিশ্বাসের অবমাননাই করা হয়নি, মানুষ হিসেবে তাদের নিজের দেহের উপর তাদের এজেন্সিকেও অস্বীকার করা হয়েছে এবং তাদের মানব সত্ত্বার বিমানবিকীকরণ করা হয়েছে। তাদের দেহকে পরিণত করা হয়েছে ওহাবি ও খারেজি আকীদায় বিশ্বাসীদের আকীদার অধীনস্হ বস্তুতে!
এ ব্যাপারে ব্যবস্থা গ্রহণে সরকারের ব্যর্থতার মূল্য পরিশোধ করেছেন এদেশের বাউল ও ফকিরেরা। বাউল ফকিরেরাও বাংলাদেশ রাষ্ট্রের নাগরিক, তাদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক চরিত্রও প্রশ্নবিদ্ধ হয়।অন্যদিকে ব্যবস্থা গ্রহণে রাষ্ট্রের ব্যার্থতার ফলশ্রুতিতে বাউলদের উপরে এই ধরনের সন্ত্রাস ও নিপীড়ন বন্ধ হয়নি, বরং বেড়েই চলেছে। বাউল ফকিরের চুল ও জটা কেটে ভাইরাল হওয়া পেইজগুলো এখনো তাদের এই ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক নিপীড়ন অব্যাহত রেখেছে।
ফলে এই ঘটনায় সংক্ষুব্ধ হয়ে নারী পক্ষের প্রতিষ্ঠাতা শিরীন পারভীন হক, অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, অধ্যাপক আমেনা মুহসিন, সুরেশ্বর দরবার শরিফের পীর সাহেব হাসান শাহ সুরেশ্বরী দিপু নূরী, অধ্যাপক গীতিআরা নাসরিন, লেখক ও গবেষক আলতাফ পারভেজ, কণ্ঠশিল্পী ফারজানা ওয়াহিদ সায়ান এবং অন্যান্য সচেতন নাগরিকদের পক্ষে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে বাংলাদেশ সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীন ৫৯৬/২০২৬ নম্বর রিট পিটিশন দায়ের করেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিষ্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে “সামাজিক শৃঙ্খলা ও ধর্মীয় সংস্কারের” নামে একদল দুষ্কৃতকারী কর্তৃক ফকির, সুফি সাধক ও বাউলদের প্রতি নিষ্ঠুর, অমানবিক ও মর্যাদাহানিকর আচরণের প্রেক্ষিতে এই রিট পিটিশনটি দায়ের করা হয়।
আবেদনকারীদের দাবী, এ ধরনের আচরণ—এবং এর বিরুদ্ধে কর্তৃপক্ষের নিষ্ক্রিয়তা—সংবিধানের ২৭, ৩১, ৩৫(৫), ৩৬, ৩৯(১) এবং ৪১ অনুচ্ছেদের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন; যা যথাক্রমে আইনের দৃষ্টিতে সমতা, আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার, নিষ্ঠুর, অমানবিক বা মর্যাদাহানিকর আচরণ থেকে মুক্তি, চলাফেরার স্বাধীনতা, চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং যেকোনো ধর্মাবলম্বনের, পালনের ও প্রচারের অধিকার নিশ্চিত করে।
গত ২১ জুন ২০২৬ তারিখে রিট আবেদনকারীদের পক্ষে শুনানী করেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিষ্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া। অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানীতে উপস্থিত ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল (ডিএজি) মিস জামিলা মমতাজ, ডিএজি জনাব মো. জাহিদুল ইসলাম (জনি), এবং অ্যাসিস্ট্যান্ট অ্যাটর্নি জেনারেল জনাব মো. জাকির হোসেন, জনাব মো. হুমায়ুন কবির সিদ্দিকী, জনাব মো. তানভীর প্রধান ও মিস শারমিন হামিদ।
রিট আবেদনকারী ও রাষ্ট্র পক্ষের শুনানী শেষে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগের মাননীয় বিচারপতি জনাব রাজিক-আল-জালিল এবং মাননীয় বিচারপতি জনাব দেবাশীষ রায় চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত দ্বৈত বেঞ্চ আগামী ৬০ দিনের মধ্যে পুলিশের মহাপরিদর্শক, ডিএমপি কমিশনার এবং সিআইডি প্রধানকে—বাউল, ফকির ও সন্ন্যাসী এবং মাজার ও খানকাগুলোর ওপর হামলার অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত ও রিপোর্ট আদালতে দাখিল প্রদানের এক আদেশ(রুল নিসি) প্রদান করেছেন।
একইসাথে ৩ মন্ত্রণালয় সহ পুলিশ প্রধান, ডিএমপি কমিশনার, সিআইডি প্রধান সহ…….. ‘কে আগামী চার (৪) সপ্তাহের মধ্যে
স্বরাষ্ট্র, ধর্ম বিষয়ক এবং সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়; পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি); ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার; এবং অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক—বাউল, ফকির ও সন্ন্যাসীদের সাংবিধানিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং তাঁদের বেআইনি নির্যাতন ও মর্যাদাহানিকর আচরণ থেকে রক্ষা করতে কেন তাঁদের নিষ্ক্রিয়তাকে আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ও আইনগতভাবে অকার্যকর ঘোষণা করা হবে না এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে এবং বাউল, ফকির ও সন্ন্যাসীদের ধর্মীয় আচার ও বিশ্বাসের কারণে তাঁদের চুল ও জটা কাটা এবং অন্যান্য হয়রানি ও অপমান করার ভবিষ্যৎ সব চেষ্টা বন্ধ করতে কেন বিবাদীদের উপযুক্ত পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হবে না মর্মে কারণ দর্শানোর আদেশ প্রদান করেছেন।
এছাড়াও এই রিট পিটিশনে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) চেয়ারম্যানকে এই মামলায় ৭ নম্বর বিবাদী করা হয়েছে। অন্যদিকে, ৮ থেকে ১১ নম্বর বিবাদী—যথাক্রমে ফেসবুক পেজ “mahbubcreations4” ও ইউটিউব চ্যানেল “Street Humanity of Bangladesh”-এর অ্যাডমিন মো. মাহবুব সরকার; ইউটিউব চ্যানেল “Humanity Fast BD”-এর অ্যাডমিন ও জয়েন্ট অ্যাডমিন মুফতি সোহরাব হোসেন আশরাফী ও মোহাম্মদ আফসার আহমেদ; এবং ইউটিউব চ্যানেল “KMReaz”-এর অ্যাডমিন কে এম রিয়াজ—সংবিধানে নিশ্চিত করা মৌলিক অধিকারসমূহ ইচ্ছাকৃতভাবে লঙ্ঘনের অভিযোগের বিষয়ে কেন তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে না, সে বিষয়ে কারণ দর্শাতে বলা হয়েছে।
এহেন পরিস্থিতিতে মহামান্য আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছেন রিটকারী নাগরিকগণ। অন্যদিকে বাউল ফকির নির্যাতনকারী মাহাবুব সরকার, সোহরাব হোসেন আশরাফি, মোহাম্মদ আফসার আহমেদ এবং কে এম রিয়াজকে গ্রেফতার করে উপযুক্ত শাস্তি প্রদানের জোর দাবী জানিয়েছেন রিটকারীগণ।




