এম,সফিউল আজম চৌধুরী :-বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে যে তোষামোদ ও চাটুকারিতার সংস্কৃতি জেঁকে বসেছিল, তা কেবল একটি পেশার অবক্ষয় নয়, বরং একটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্য ছিল চরম অবমাননাকর। গণমাধ্যমকে বলা হয় রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ, যার প্রধান দায়িত্ব ক্ষমতার দর্পণ হওয়া এবং জনস্বার্থকে রক্ষা করা।এই দর্পণ ধুলোবালি আর মিথ্যার প্রলেপে ঢাকা পড়েছে। পেশাদার সাংবাদিকতার জায়গা দখল করে নিয়েছিল ‘তেলবাজি’, যেখানে সংবাদের বস্তুনিষ্ঠতার চেয়ে শাসকের মন তুষ্টিই হয়ে উঠেছিল সাফল্যের প্রধান মাপকাঠি। এই চাটুকারিতার প্রতিযোগিতায় একদল ব্যক্তি নিজেদের সাংবাদিক পরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত করলেও, তারা আসলে অনেকেই ছিলেন ক্ষমতার একনিষ্ঠ সেবক।

ফলে প্রকৃত ও মেধাবী সাংবাদিকরা নিজ আঙিনায় কোণঠাসা হয়ে পড়েছিলেন এবং সাংবাদিকতা হারিয়েছিল তার নৈতিক ভিত্তি। এই তেলবাজির রূপ ছিল বহুমুখী ও অত্যন্ত নির্লজ্জ। সংবাদ সম্মেলনগুলোতে জনগুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন করার পরিবর্তে একদল তথাকথিত জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক কীভাবে গুণকীর্তন গাওয়ার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হতেন। সেখানে রাষ্ট্রের সংকট, দুর্নীতি বা মানবাধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলা ছিল এক প্রকার অলিখিত নিষিদ্ধ কাজ। প্রশ্নকর্তাদের তালিকা আগে থেকেই নির্ধারিত থাকত এবং সেখানে কোনো কঠিন বা যৌক্তিক প্রশ্নের জায়গা ছিল না। এর বিপরীতে যারা সত্য তুলে ধরার সাহস দেখাতেন, এই তেলবাজ গোষ্ঠীটিই তাদের ওপর প্রথম আঘাত হানত। তারা সহকর্মীদের বিরুদ্ধে গোয়েন্দা সংস্থায় মিথ্যা তথ্য সরবরাহ করা থেকে শুরু করে তাদের ‘দেশদ্রোহী’ বা ‘উন্নয়নবিরোধী’ তকমা দিয়ে ক্যারিয়ার ধ্বংস করতেও দ্বিধা করত না। এই সুবিধাবাদী চক্রটি সাংবাদিকতাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে রাজউক ও চউকের মূল্যবান প্লট, ব্যাংক ঋণের বিশেষ সুবিধা, এমনকি বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্সও বাগিয়ে নিয়েছিল। তাদের এই ব্যক্তিগত লিপ্সার বলি হতে হয়েছে গোটা পেশাদার সাংবাদিক সমাজকে।

​পেশাদার সাংবাদিকরা যখন কোণঠাসা হন, তখন তার প্রভাব কেবল নির্দিষ্ট ব্যক্তির ওপর পড়ে না, বরং তা পুরো জাতির তথ্যের অধিকারকে খর্ব করে। অনেক শীর্ষস্থানীয় সংবাদ প্রতিষ্ঠানের মালিকরা তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষায় সম্পাদকদের ওপর সরাসরি চাপ প্রয়োগ করতেন যেন সরকারের কোনো সমালোচনা না ছাপা হয়। এর ফলে সংবাদকক্ষগুলোতে এক ধরনের ‘অদৃশ্য সেন্সরশিপ’ বা সেলফ-সেন্সরশিপ তৈরি হয়েছিল। যোগ্য ও নীতিবান সাংবাদিকরা যখন সত্য লিখতে পারতেন না, তখন তারা মানসিকভাবে ভেঙে পড়তেন এবং অনেকে বাধ্য হয়ে পেশা পরিবর্তন করেছেন। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মতো কালো আইন যেমন ভয়ের পরিবেশ তৈরি করেছিল, তেমনি এই তেলবাজ সাংবাদিকরা ছিলেন সেই ভয়ের পাহারাদার। তারা সাংবাদিক সমাজকে দ্বিধাবিভক্ত করে ফেলেছিলেন এবং ইউনিয়ন ও প্রেস ক্লাবগুলোকে দলীয় কার্যালয়ে পরিণত করেছিলেন। তারা এমন এক বিষাক্ত পরিবেশ তৈরি করেছিলেন যেখানে সত্য বলাটাই হয়ে উঠেছিল সবচেয়ে বড় অপরাধ।

​আন্তর্জাতিক সাংবাদিকতার মানদণ্ড অনুযায়ী, একজন সাংবাদিকের কাজ হলো ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা ব্যক্তিদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা। কিন্তু বিগত আমলে এর উল্টো চিত্র দেখা গেছে। তেলবাজ সাংবাদিকরা অনুসন্ধান করে বের করতেন সরকারের বিরোধীরা কোথায় কী করছেন, অথচ সরকারের ভেতরে থাকা বিশাল দুর্নীতির সিন্ডিকেট তাদের চোখ এড়িয়ে যেত। এই গোষ্ঠীটি কেবল অভ্যন্তরীণ তোষামোদেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও দেশের প্রকৃত চিত্র আড়াল করে অপপ্রচার চালিয়েছে। তারা সংবাদপত্রের সম্পাদকীয় নীতিকে পদদলিত করে নির্লজ্জভাবে দলীয় প্রোপাগান্ডা ছড়িয়েছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের কাছে সংবাদপত্রের বিশ্বাসযোগ্যতা শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। মানুষের আস্থাহীনতার এই ক্ষত সারাতে দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হবে।

​বর্তমানে ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশ একটি নতুন গণতান্ত্রিক যাত্রার সূচনা করেছে। এই সন্ধিক্ষণে পেশাদার সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে বর্তমান নির্বাচিত সরকারের প্রতি জোরালো দাবি—এই বহুরূপী ও সুবিধাবাদী সাংবাদিকদের ব্যাপারে সর্বোচ্চ সজাগ থাকতে হবে। চাটুকারদের কোনো সুনির্দিষ্ট আদর্শ নেই; তারা কেবল ক্ষমতার উপাসক। বিগত আমলে যারা ফ্যাসিবাদের দোসর হিসেবে কাজ করেছে, তারাই এখন ভোল পাল্টে বর্তমান সরকারের আস্থাভাজন হওয়ার চেষ্টায় লিপ্ত। তারা এখন নিজেদের ‘নির্যাতিত’ হিসেবে জাহির করছে এবং সরকারি দপ্তরগুলোতে ভিড় জমাচ্ছে। সরকার যদি এই গিরগিটিদের মিষ্টি কথায় বিভ্রান্ত হয়, তবে তা হবে গণমাধ্যমের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা। ক্ষমতার কাছাকাছি থেকে যারা চাটুকারিতা করে, তারা শাসকের কানে সবসময় মিথ্যার মন্ত্র দেয় এবং জনবিচ্ছিন্নতা তৈরি করে। ফলে সরকার একসময় বাস্তব পরিস্থিতি অনুধাবনে ব্যর্থ হয় এবং শেষ পর্যন্ত স্বৈরতন্ত্রের দিকে ধাবিত হয়।

​পেশাদার সাংবাদিকতার মর্যাদা ফিরিয়ে আনতে হলে বর্তমান সরকারকে কিছু সাহসী পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রথমেই এই তেলবাজ সিন্ডিকেটকে ভেঙে দিতে হবে। সরকারি সুযোগ-সুবিধা, প্রেস অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড কিংবা রাষ্ট্রীয় সফরের সফরসঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক আনুগত্যের পরিবর্তে কঠোরভাবে পেশাদারত্ব ও নৈতিকতাকে মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। বিগত সময়ে যারা সাংবাদিকতার সাইনবোর্ড ব্যবহার করে অবৈধ সম্পদ গড়েছে বা ক্ষমতার অপব্যবহার করে সহকর্মীদের হয়রানি করেছে, তাদের যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে জবাবদিহিতার আওতায় আনা জরুরি। একই সাথে গণমাধ্যম মালিকদের ওপর রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে যেন তারা সাংবাদিকদের ওপর কোনো অনৈতিক এজেন্ডা চাপিয়ে দিতে না পারে। একটি মুক্ত গণমাধ্যম কমিশন গঠন করা সময়ের দাবি, যা সাংবাদিকদের ন্যূনতম বেতন-ভাতা এবং পেশাগত মর্যাদা নিশ্চিত করবে।

​সুস্থ সাংবাদিকতা ফিরিয়ে আনতে হলে সাংবাদিকদের নিজেদের মধ্যেও গভীর আত্মশুদ্ধি প্রয়োজন। সাংবাদিকতার লড়াইটি এখন বহুমুখী—একদিকে হারানো আস্থা পুনরুদ্ধার, অন্যদিকে ক্ষমতার মোহে আচ্ছন্ন হওয়ার প্রলোভন ত্যাগ করা। ইউনিয়ন বা প্রেস ক্লাবগুলোকে রাজনৈতিক দলীয় প্রভাবমুক্ত করতে হবে। সাংবাদিকদের প্রধান শত্রু হচ্ছে অন্ধ দলীয় আনুগত্য, যা তাদের কলমকে ভোঁতা করে দেয়। এখন সময় এসেছে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় নতুন করে প্রাণ সঞ্চার করার। গত দেড় দশকে যে সীমাহীন লুণ্ঠন, অর্থ পাচার ও প্রাতিষ্ঠানিক ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে, তা নিরপেক্ষভাবে জাতির সামনে উন্মোচন করা পেশাদার সাংবাদিকদের প্রধান নৈতিক দায়িত্ব। যারা ক্ষমতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে কথা বলার সাহস রাখে, সরকার যেন তাদের মূল্যায়ন করে। কারণ তোষামোদের চেয়ে সমালোচকই শাসকের প্রকৃত বন্ধু; সমালোচকই ভুল ধরিয়ে দিয়ে রাষ্ট্রকে বিপথে যাওয়া থেকে রক্ষা করে।

আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন, তেলবাজি কোনো নির্দিষ্ট সময়ের সমস্যা নয়, এটি একটি মানসিকতা। এই মানসিকতা ক্ষমতার চারপাশে পরজীবীর মতো টিকে থাকে। তাই বর্তমান সরকারের দায়িত্বশীলদের প্রতি আমাদের আহ্বান, আপনারা যখন আয়নার সামনে দাঁড়াবেন, তখন যেন কেবল নিজেদের প্রশংসা শুনতে না পান। যারা সত্য তিক্ত হলেও আপনার সামনে তুলে ধরবে, তাদের কণ্ঠস্বরকে স্বাগত জানান। সাংবাদিকতার ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যারা রাজার তোষামোদ করেছে, তারা ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে, আর যারা সত্যের পক্ষে লড়েছে, তারাই মানুষের হৃদয়ে বেঁচে আছে। পেশাদার সাংবাদিকদের জন্য একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করলেই কেবল গণতন্ত্র তার প্রকৃত মর্যাদা ফিরে পাবে।

​উপসংহারে বলা যায়, বাংলাদেশের সাংবাদিকতা এখন এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। তেলবাজির যে কলঙ্কিত ইতিহাস আমরা পেছনে ফেলে এসেছি, তার পুনরাবৃত্তি রোধ করতে না পারলে গণমাধ্যম কখনোই জনগণের আস্থা ফিরে পাবে না। বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের কাছে বিনীত অনুরোধ—চাটুকারদের মোসাহেবিতে ভুলবেন না। যারা আপনার চোখে ধাঁধা লাগিয়ে সত্য আড়াল করতে চায়, তাদের কঠোরভাবে বর্জন করুন। তোষামোদির এই বৃত্ত ভাঙতে পারলে এবং পেশাদার সাংবাদিকদের প্রকৃত মর্যাদা নিশ্চিত করতে পারলে বাংলাদেশ একটি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত হবে। চাটুকারিতামুক্ত, সাহসী ও দায়বদ্ধ সাংবাদিকতাই হোক নতুন বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি।

লেখক-সাংবাদিক,রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও মানবাধিকার কর্মী, চট্টগ্রাম।

এম,সফিউল আজম চৌধুরী :-বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে যে তোষামোদ ও চাটুকারিতার সংস্কৃতি জেঁকে বসেছিল, তা কেবল একটি পেশার অবক্ষয় নয়, বরং একটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্য ছিল চরম অবমাননাকর। গণমাধ্যমকে বলা হয় রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ, যার প্রধান দায়িত্ব ক্ষমতার দর্পণ হওয়া এবং জনস্বার্থকে রক্ষা করা।এই দর্পণ ধুলোবালি আর মিথ্যার প্রলেপে ঢাকা পড়েছে। পেশাদার সাংবাদিকতার জায়গা দখল করে নিয়েছিল ‘তেলবাজি’, যেখানে সংবাদের বস্তুনিষ্ঠতার চেয়ে শাসকের মন তুষ্টিই হয়ে উঠেছিল সাফল্যের প্রধান মাপকাঠি। এই চাটুকারিতার প্রতিযোগিতায় একদল ব্যক্তি নিজেদের সাংবাদিক পরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত করলেও, তারা আসলে অনেকেই ছিলেন ক্ষমতার একনিষ্ঠ সেবক।

ফলে প্রকৃত ও মেধাবী সাংবাদিকরা নিজ আঙিনায় কোণঠাসা হয়ে পড়েছিলেন এবং সাংবাদিকতা হারিয়েছিল তার নৈতিক ভিত্তি। এই তেলবাজির রূপ ছিল বহুমুখী ও অত্যন্ত নির্লজ্জ। সংবাদ সম্মেলনগুলোতে জনগুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন করার পরিবর্তে একদল তথাকথিত জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক কীভাবে গুণকীর্তন গাওয়ার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হতেন। সেখানে রাষ্ট্রের সংকট, দুর্নীতি বা মানবাধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলা ছিল এক প্রকার অলিখিত নিষিদ্ধ কাজ। প্রশ্নকর্তাদের তালিকা আগে থেকেই নির্ধারিত থাকত এবং সেখানে কোনো কঠিন বা যৌক্তিক প্রশ্নের জায়গা ছিল না। এর বিপরীতে যারা সত্য তুলে ধরার সাহস দেখাতেন, এই তেলবাজ গোষ্ঠীটিই তাদের ওপর প্রথম আঘাত হানত। তারা সহকর্মীদের বিরুদ্ধে গোয়েন্দা সংস্থায় মিথ্যা তথ্য সরবরাহ করা থেকে শুরু করে তাদের ‘দেশদ্রোহী’ বা ‘উন্নয়নবিরোধী’ তকমা দিয়ে ক্যারিয়ার ধ্বংস করতেও দ্বিধা করত না। এই সুবিধাবাদী চক্রটি সাংবাদিকতাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে রাজউক ও চউকের মূল্যবান প্লট, ব্যাংক ঋণের বিশেষ সুবিধা, এমনকি বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্সও বাগিয়ে নিয়েছিল। তাদের এই ব্যক্তিগত লিপ্সার বলি হতে হয়েছে গোটা পেশাদার সাংবাদিক সমাজকে।

​পেশাদার সাংবাদিকরা যখন কোণঠাসা হন, তখন তার প্রভাব কেবল নির্দিষ্ট ব্যক্তির ওপর পড়ে না, বরং তা পুরো জাতির তথ্যের অধিকারকে খর্ব করে। অনেক শীর্ষস্থানীয় সংবাদ প্রতিষ্ঠানের মালিকরা তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষায় সম্পাদকদের ওপর সরাসরি চাপ প্রয়োগ করতেন যেন সরকারের কোনো সমালোচনা না ছাপা হয়। এর ফলে সংবাদকক্ষগুলোতে এক ধরনের ‘অদৃশ্য সেন্সরশিপ’ বা সেলফ-সেন্সরশিপ তৈরি হয়েছিল। যোগ্য ও নীতিবান সাংবাদিকরা যখন সত্য লিখতে পারতেন না, তখন তারা মানসিকভাবে ভেঙে পড়তেন এবং অনেকে বাধ্য হয়ে পেশা পরিবর্তন করেছেন। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মতো কালো আইন যেমন ভয়ের পরিবেশ তৈরি করেছিল, তেমনি এই তেলবাজ সাংবাদিকরা ছিলেন সেই ভয়ের পাহারাদার। তারা সাংবাদিক সমাজকে দ্বিধাবিভক্ত করে ফেলেছিলেন এবং ইউনিয়ন ও প্রেস ক্লাবগুলোকে দলীয় কার্যালয়ে পরিণত করেছিলেন। তারা এমন এক বিষাক্ত পরিবেশ তৈরি করেছিলেন যেখানে সত্য বলাটাই হয়ে উঠেছিল সবচেয়ে বড় অপরাধ।

​আন্তর্জাতিক সাংবাদিকতার মানদণ্ড অনুযায়ী, একজন সাংবাদিকের কাজ হলো ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা ব্যক্তিদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা। কিন্তু বিগত আমলে এর উল্টো চিত্র দেখা গেছে। তেলবাজ সাংবাদিকরা অনুসন্ধান করে বের করতেন সরকারের বিরোধীরা কোথায় কী করছেন, অথচ সরকারের ভেতরে থাকা বিশাল দুর্নীতির সিন্ডিকেট তাদের চোখ এড়িয়ে যেত। এই গোষ্ঠীটি কেবল অভ্যন্তরীণ তোষামোদেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও দেশের প্রকৃত চিত্র আড়াল করে অপপ্রচার চালিয়েছে। তারা সংবাদপত্রের সম্পাদকীয় নীতিকে পদদলিত করে নির্লজ্জভাবে দলীয় প্রোপাগান্ডা ছড়িয়েছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের কাছে সংবাদপত্রের বিশ্বাসযোগ্যতা শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। মানুষের আস্থাহীনতার এই ক্ষত সারাতে দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হবে।

​বর্তমানে ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশ একটি নতুন গণতান্ত্রিক যাত্রার সূচনা করেছে। এই সন্ধিক্ষণে পেশাদার সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে বর্তমান নির্বাচিত সরকারের প্রতি জোরালো দাবি—এই বহুরূপী ও সুবিধাবাদী সাংবাদিকদের ব্যাপারে সর্বোচ্চ সজাগ থাকতে হবে। চাটুকারদের কোনো সুনির্দিষ্ট আদর্শ নেই; তারা কেবল ক্ষমতার উপাসক। বিগত আমলে যারা ফ্যাসিবাদের দোসর হিসেবে কাজ করেছে, তারাই এখন ভোল পাল্টে বর্তমান সরকারের আস্থাভাজন হওয়ার চেষ্টায় লিপ্ত। তারা এখন নিজেদের ‘নির্যাতিত’ হিসেবে জাহির করছে এবং সরকারি দপ্তরগুলোতে ভিড় জমাচ্ছে। সরকার যদি এই গিরগিটিদের মিষ্টি কথায় বিভ্রান্ত হয়, তবে তা হবে গণমাধ্যমের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা। ক্ষমতার কাছাকাছি থেকে যারা চাটুকারিতা করে, তারা শাসকের কানে সবসময় মিথ্যার মন্ত্র দেয় এবং জনবিচ্ছিন্নতা তৈরি করে। ফলে সরকার একসময় বাস্তব পরিস্থিতি অনুধাবনে ব্যর্থ হয় এবং শেষ পর্যন্ত স্বৈরতন্ত্রের দিকে ধাবিত হয়।

​পেশাদার সাংবাদিকতার মর্যাদা ফিরিয়ে আনতে হলে বর্তমান সরকারকে কিছু সাহসী পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রথমেই এই তেলবাজ সিন্ডিকেটকে ভেঙে দিতে হবে। সরকারি সুযোগ-সুবিধা, প্রেস অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড কিংবা রাষ্ট্রীয় সফরের সফরসঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক আনুগত্যের পরিবর্তে কঠোরভাবে পেশাদারত্ব ও নৈতিকতাকে মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। বিগত সময়ে যারা সাংবাদিকতার সাইনবোর্ড ব্যবহার করে অবৈধ সম্পদ গড়েছে বা ক্ষমতার অপব্যবহার করে সহকর্মীদের হয়রানি করেছে, তাদের যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে জবাবদিহিতার আওতায় আনা জরুরি। একই সাথে গণমাধ্যম মালিকদের ওপর রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে যেন তারা সাংবাদিকদের ওপর কোনো অনৈতিক এজেন্ডা চাপিয়ে দিতে না পারে। একটি মুক্ত গণমাধ্যম কমিশন গঠন করা সময়ের দাবি, যা সাংবাদিকদের ন্যূনতম বেতন-ভাতা এবং পেশাগত মর্যাদা নিশ্চিত করবে।

​সুস্থ সাংবাদিকতা ফিরিয়ে আনতে হলে সাংবাদিকদের নিজেদের মধ্যেও গভীর আত্মশুদ্ধি প্রয়োজন। সাংবাদিকতার লড়াইটি এখন বহুমুখী—একদিকে হারানো আস্থা পুনরুদ্ধার, অন্যদিকে ক্ষমতার মোহে আচ্ছন্ন হওয়ার প্রলোভন ত্যাগ করা। ইউনিয়ন বা প্রেস ক্লাবগুলোকে রাজনৈতিক দলীয় প্রভাবমুক্ত করতে হবে। সাংবাদিকদের প্রধান শত্রু হচ্ছে অন্ধ দলীয় আনুগত্য, যা তাদের কলমকে ভোঁতা করে দেয়। এখন সময় এসেছে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় নতুন করে প্রাণ সঞ্চার করার। গত দেড় দশকে যে সীমাহীন লুণ্ঠন, অর্থ পাচার ও প্রাতিষ্ঠানিক ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে, তা নিরপেক্ষভাবে জাতির সামনে উন্মোচন করা পেশাদার সাংবাদিকদের প্রধান নৈতিক দায়িত্ব। যারা ক্ষমতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে কথা বলার সাহস রাখে, সরকার যেন তাদের মূল্যায়ন করে। কারণ তোষামোদের চেয়ে সমালোচকই শাসকের প্রকৃত বন্ধু; সমালোচকই ভুল ধরিয়ে দিয়ে রাষ্ট্রকে বিপথে যাওয়া থেকে রক্ষা করে।

আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন, তেলবাজি কোনো নির্দিষ্ট সময়ের সমস্যা নয়, এটি একটি মানসিকতা। এই মানসিকতা ক্ষমতার চারপাশে পরজীবীর মতো টিকে থাকে। তাই বর্তমান সরকারের দায়িত্বশীলদের প্রতি আমাদের আহ্বান, আপনারা যখন আয়নার সামনে দাঁড়াবেন, তখন যেন কেবল নিজেদের প্রশংসা শুনতে না পান। যারা সত্য তিক্ত হলেও আপনার সামনে তুলে ধরবে, তাদের কণ্ঠস্বরকে স্বাগত জানান। সাংবাদিকতার ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যারা রাজার তোষামোদ করেছে, তারা ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে, আর যারা সত্যের পক্ষে লড়েছে, তারাই মানুষের হৃদয়ে বেঁচে আছে। পেশাদার সাংবাদিকদের জন্য একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করলেই কেবল গণতন্ত্র তার প্রকৃত মর্যাদা ফিরে পাবে।

​উপসংহারে বলা যায়, বাংলাদেশের সাংবাদিকতা এখন এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। তেলবাজির যে কলঙ্কিত ইতিহাস আমরা পেছনে ফেলে এসেছি, তার পুনরাবৃত্তি রোধ করতে না পারলে গণমাধ্যম কখনোই জনগণের আস্থা ফিরে পাবে না। বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের কাছে বিনীত অনুরোধ—চাটুকারদের মোসাহেবিতে ভুলবেন না। যারা আপনার চোখে ধাঁধা লাগিয়ে সত্য আড়াল করতে চায়, তাদের কঠোরভাবে বর্জন করুন। তোষামোদির এই বৃত্ত ভাঙতে পারলে এবং পেশাদার সাংবাদিকদের প্রকৃত মর্যাদা নিশ্চিত করতে পারলে বাংলাদেশ একটি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত হবে। চাটুকারিতামুক্ত, সাহসী ও দায়বদ্ধ সাংবাদিকতাই হোক নতুন বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি।

লেখক-সাংবাদিক,রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও মানবাধিকার কর্মী, চট্টগ্রাম।