খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি: পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেকের বাঘাইহাট বাজরে আঞ্চলিক দুটি সংগঠনের বন্দুক গোলাগুলির ঘটনায় শান্তি পরিবহনের বাসের হেলপার মো: নাঈম(২৮) নিহত হওযার খবর পাওযা গেছে। বাঘাইছড়ি উপজেলার বাঘাইহাটে বিক্ষোভরত জনতার উপর সেনা মদদপুষ্ট ঠ্যাঙাড়ে(নব্যমুখোশ-সংস্কারবাদী) সন্ত্রাসীদের গুলিতে শান্তি পরিবহন বাসের এক হেলপার নিহতে ঘটনায় ইউপিডিএফ’র অভিযোগ। এ ঘটনায় আরো অন্তত: ১২জন আহত হযেছেন। মঙ্গলবার(১৮ জুন ) এ ঘটনা ঘটে। সন্ত্রাসীদের গুলি হামলায় আহতদের মধ্যে ১২জনের নাম জানা গেছে।
তারা হলেন-রিপনা চাকমা(৩৭),অরুন চাকমা(৩০), বিনয় চাকমা(৪০), সুরন চাকমা(৩০),দেব রঞ্জন চাকমা(৪৫),মনিচা চাকমা(১৩), তিনি ৭ম শ্রেণীর ছাত্রী, সাধন চাকমা(৪৫), মিতা চাকমা(৩০), গুবিনয় চাকমা(৩৫) তিনি পায়ে গুলিবিদ্ধ হন; চিক্কো মনি চাকমা(৩০), সোনা মনি চাকমা(২৫), দুলেই চাকমা তিনি হাটুতে গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন।
নিহত নাঈম এ-র বাড়ি লক্ষ্মীছড়ির জুর্গাছড়ি এলাকায়। তার পিতার নাম মো: নজরুল ইসলাম নিখোঁজ দীর্ঘদিন ধরে। ৪বোন ১ভাইয়ের মধ্যে নাঈম সবার ছোট। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ছেলেকে হারিয়ে মা নাসিমা বেগম জ্ঞান হারিয়ে এখন পাগলপ্রায়। ৭/৮মাস অতিবাহিত হলো নাঈম বিয়ে করেছে। স্ত্রী অন্ত:স্বত্তা বলে সুত্রে জানা গেছে।
মঙ্গলবার দুপুরে এ গোলাগুলির ঘটনায প্রায় ৬শতাধিক রাউন্ড গুলি বিনিময়ের ঘটনার ঘটেছে। এই ঘটনায় পুরো বাঘাইহাট এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
স্থানীয়রা জানায়, বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাচনকে ঘিরে উপজেলার বাঘাইহাট এলাকায় দুই পক্ষের মাঝে উত্তেজনা বিরাজ করছিল। মঙ্গলবার দুপুর ২টার দিকে বন্দুক যুদ্ধের ঘটনা ঘটলে বাঘাইহাট বাজরের শান্তি পরিবহণের মাসের হেলপার মো: নাঈম গুলি বিদ্ধ হয়। পরে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে দীঘিনালা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে ডাক্তার তাকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। এই ঘটনায় আরো দুজই জন গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। আহতদের মধ্যে দুলেই চাকমা ও চিক্কো চাকমা নামে দু’জনের নাম পাওয়া গেছে। তবে স্থানীয় অপর একটি সূত্র জানায় বন্দুকযুদ্ধের ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে।
প্রত্যক্ষ দর্শীসূত্রে জানা যায়, গত ৭ই জুন থেকে সেনাবাহিনীর নিরাপত্তায় মুখোশ-সংস্কারদের একটি সশস্ত্র দল বাঘাইহাট বাজারে অবস্থান করে জনগণের ওপর নিপীড়ন, হুমকি-ধমকিসহ নানা সন্ত্রাসী কর্মকান্ড পরিচালনা করে আসছিল। তাদের নানা অত্যাচারের ভয়ে স্থানীয় লোকজন বাঘাইহাট বাজারে যেতে পারছিল না। এর মধ্যে সন্ত্রাসীরা উজো বাজার ও মাচলঙ বাজারে ব্যবসায়ীদেরকে পাইকারি মালামাল নেওয়া বন্ধ করে দিলে জনগণের মধ্যে ক্ষোভ দানা বাঁধতে থাকে।
মঙ্গলবার সকালে বাঘাইহাট বাজার থেকে ব্যবসায়ীরা মালামাল কিনে উজো বাজার ও মাচলং বাজারে নিতে চাইলে ঠ্যাঙাড়ে সন্ত্রাসীরা তাতে বাধা দেয় এবং ক্রয়কৃত মামলাল কেড়ে রাখে। এতে ব্যবসায়ী ও এলাকার পাহাড়ি-বাঙালি সাধারণ জনগণ বিক্ষুদ্ধ হয়। এ খবরটি জানাজানি হলে বিভিন্ন এলাকা থেকে শত শত জনতা বাঘাইহাট বাজারে এসে জড়ো হয় এবং সন্ত্রাসীদের অপকর্মের প্রতিবাদে পর্যটন সড়কে ও বাঘাইহাট বাজারে বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে থাকে এবং পর্যটন সড়কটি অবরোধ করে। এ সময় সন্ত্রাসীদের সাথে বিক্ষোভরত জনতার মুখোমুখি অবস্থার সৃষ্টি হলে প্রথমে সন্ত্রাসীরা কয়েকজন নারীর ওপর লাঠিপেটা করে। এরপর বিক্ষুব্ধ জনতা আরো উত্তেজিত হযে বাঘাইহাট বাজারে অবস্থান নিয়ে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ জোরদার করে।
জনতার বিক্ষোভের মুখে সন্ত্রাসীরা বাঘাইহাট বাজার থেকে পালিযে বাঘাইহাট জোনের পাশের স্কুলে গিয়ে অবস্থান নেয়। এরপরও জনতার বিক্ষোভ চলতে থাকে। পরে বেলা ২টার সময় সন্ত্রাসীরা বিক্ষুব্ধ জনতাকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি চালায। এতে শান্তি পরিবহন বাসের হেলপার মো: নাঈমসহ অনেকে আহত হয়। এরপর গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত মো: নাঈমকে উদ্ধার করে দীঘিনালা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বিকেল ৩:৪৮টা তার মৃত্যু হয়। নিহত মো: নাঈম-এর বাড়ি ফটিকছড়ির নাজিরহাট বলে জানা গেছে।
এলাকাবাসী জানায়, মঙ্গলবার সকাল ১১টায় ইউপিডিএফ মূল দলের নেতৃত্বে প্রায় ৫শতাধিক গ্রামবাসী বাঘাইহাট বাজারে বিক্ষোভ মিছিল শুরু করে। এক পর্যায়ে তারা ফাঁকা গুলিছুড়ে ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে উপিডিএফ গণতান্ত্রিক দলের অবস্থানের দিকে আগাতে থাকে পরে ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক নিজেদের আত্মরক্ষায় বাঘাইহাট স্কুলের তৃতীয় তলায় অবস্থান নিলে গ্রামবাসীরা স্কুলের গেইট ভেঙ্গে ভিতরে প্রবেশ করার চেষ্টা চালায়। পরে আঞ্চলিক দুটি দলের সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের মাঝে গুলি বিমিয়ের ঘটনা ঘটলে গ্রামবাসীরা দৌঁড়ে পালিয়ে যায়। এই ঘটনায় এই হতাহতের ঘটনা ঘটে। এদিকে গুলাগুলির ঘটনায় সাজেকে অনেক পর্যটক আটকে পড়েছে।
রাঙ্গামাটির পুলিশ সুপার মীর আবু তৌহিদ জানান, দুপুরের দিকে গোলাগুলির ঘটনায় ১জন গুলিবিদ্ধ হয়। পরে সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় তাকে দীঘিনালা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঠানো হলে তিনি মৃত্যু বরণ করেন। এঘটনার পর পুরো বাঘাইহাট বাজারে নিরাপত্তা বাহিনীর তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে। বর্তমানে পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে।
বাঘাইছড়ির ওসি ঘটনাস্থলে রয়েছে বলেও তিনি জানান। এদিকে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট(ইউপিডিএফ) রাঙ্গামাটি ইউনিটের সংগঠক সচল চাকমা মঙ্গলবার সংবাদ মাধ্যমে দেয়া এক বিবৃতিতে রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার বাঘাইহাটে সন্ত্রাসীদের গুলিতে শান্তি পরিবহণের এক হেলপার নিহত ও বেশ কয়েকজন আহত হওয়ার ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ এবং অবিলম্বে হত্যকারীদের গ্রেফতার ও শাস্তিরও দাবি জানিয়েছেন। উক্ত ঘটনায় ইউপিডিএফ নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে এবং সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি বুধবার কালো ব্যাজ ধারণ, শোক সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিলের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে।
এছাড়া কয়েকজন বাঙালিও আহত হযেছেন বলে জানা গেছে। তবে তাদের নাম জানা যায়নি। উক্ত হামলার পর সন্ত্রাসীরা বাঘাইহাট জোনে গিয়ে আশ্রয় নেয বলে জানা গেলেও শেষ পর্যন্ত তাদের অবস্থান সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যায়নি।
ইউপিডিএফের নিন্দা ও প্রতিবাদ: ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট(ইউপিডিএফ) রাঙামাটি ইউনিটের সংগঠক সচল চাকমা এক বিবৃতিতে বাঘাইহাটে ঠ্যাঙাড়ে সন্ত্রাসীদের গুলিতে শান্তি পরিবহণের এক হেলপার নিহত ও বেশ কয়েকজন আহত হওযার ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ এবং অবিলম্বে হত্যকারীদের গ্রেফতার ও শাস্তিরও দাবি জানিযেছেন। বিবৃতিতে তিনি ঠ্যাঙাড়ে বাহিনী ভেঙে দেয়ারও দাবি জানান।
তিনি গত ৭ই জুন থেকে ঠ্যাঙাড়ে রা বাঘাইহাট বাজারের একটি স্কুল ঘরে সশস্ত্রভাবে অবস্থান করলেও তাদের বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ না নেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
বিবৃতিতে তিনি অভিযোগ করে বলেন, ঠ্যাঙাড়ে সন্ত্রাসের কারণে বর্তমানে পুরো পার্বত্য চট্টগ্রাম অশান্ত হযে উঠেছে মন্তব্য করে তিনি আরও বলেন, ‘একটি বিশেষ গোষ্ঠী ঠ্যাঙাড়েদেরকে নির্বাচনে ভোট কেন্দ্র দখলের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে এবং সাধারণ নিরীহ জনগণের স্বার্থের বিরুদ্ধে লেলিযে দিচ্ছে।’
তিনি প্রশ্ন করে বলেন, ‘কীভাবে কিছু লোক বাঘাইহাট বাজারের মতো প্রকাশ্য স্থানে দিনের পর দিন সশস্ত্রভাবে অবস্থান করতে পারে এবং সাধারণ জনগণের দৈনন্দিন জীবন জীবিকার কাজে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে?’ তিনি গণপ্রতিরোধের জোযারে ঠ্যাঙাড়ে বাহিনী ও তাদের আশ্রয়দাতারা ভেসে যাবে বলে মন্তব্য করেন। ইউপিডিএফ নেতা সচল চাকমা সাজেকবাসীর দাবি ও আন্দোলনের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করেন এবং অবিলম্বে ঠ্যাঙাড়েদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান।
কর্মসূচি ঘোষণা: এদিকে বাঘাইহাটে ঠ্যাঙাড়ে বাহিনীর গুলিতে নিহত মো; নাঈম-এর হত্যাকারীদের গ্রেফতার-শাস্তি ও ঠ্যাঙাড়ে বাহিনী ভেঙে দেয়ার দাবিতে সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি প্রতিবাদ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। মঙ্গলবার বিকেলের দিকে সাজেকের উজো বাজারে অনুষ্ঠিত জনতার একটি সমাবেশ থেকে কমিটির সদস্য সচিব ও সাজেক ইউনিয়ন কার্বারী এসোসিয়েশনের সভাপতি নতুন জয় চাকমা সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি নামে একটি সংগঠন গঠনের ও বুধবার কালো ব্যাজ ধারণ, শোক সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিলের ঘোষণা দেন।
তিনি বলেন, আজ ঠ্যাঙাড়েদের নির্বিচার গুলিতে শান্তি পরিবহণের হেলপার মো: নাঈম নিহত ও বেশ কয়েকজন পাহাড়ি ও বাঙালি আহত হযেছেন। তিনি অবিলম্বে খুনীদের গ্রেফতার-শাস্তির দাবি জানিয়ে বলেন, গত ৭ই জুন থেকে ঠ্যাঙাড়েরা বাঘাইহাটে সশস্ত্রভাবে অবস্থান ও জনগণের ওপর জুলুম করলেও তাদের বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ নেয়া হয়নি।অপরদিকে এ ঘটনায় পিসিজেএসএস সংস্কার এবং ইউপিডিএফ গনতান্ত্রিক এর পক্ষ থেকে কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি।




