রানা চক্রবর্তী: রায় গুণাকর ভারতচন্দ্র শুধুমাত্র বাংলা সাহিত্যের একজন শ্রেষ্ঠ কবি নন, তিনি নিজেই যেন একটা সমগ্র যুগের প্রতিনিধি। তিনি খৃষ্টীয় অষ্টাদশ শতাব্দীর বাংলার নবজাগ্রত বিদগ্ধ নাগরিক সমাজের একজন ঐতিহাসিক প্রতিনিধি। সেই সমাজে যেমন শিক্ষা, সংস্কৃতি ও আভিজাত্যের অপরূপ সমন্বয় ঘটেছিল, তেমনি তাতে সরলতা, অকপটতা ও আদর্শনিষ্ঠার যে যথেষ্ট পরিমাণে অভাব ছিল -সে বিষয়ে ঐতিহাসিকদের মনে কোন ধরণের সন্দেহ নেই। ভারতচন্দ্রের ‘অন্নদামঙ্গল’ কাব্যে সেই সমাজের ছাপটি পুরোপুরিভাবে পড়েছিল। তাই ভাষার লাবণ্যে, ছন্দের নৈপুণ্যে ও শ্লোকের চাতুর্য্যে অন্নদামঙ্গল কাব্য যেমন তুলনারহিত, তেমনি তাতে অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতাটুকুও প্রায় অনুপস্থিত রয়েছে বলে দেখতে পাওয়া যায়।

এই প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন-
“রাজসভাকবি রায়গুণাকরের অন্নদামঙ্গল গান রাজকণ্ঠের মণিমালার মতো, যেমন তাহার উজ্জ্বলতা, তেমনি তাহার কারুকার্য।”

তাঁর এই উক্তির মধ্যে যেমন ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গলের চরম প্রশংসা রয়েছে, তেমনি সেই ক্যব্যের অপূর্ণতাটুকুও উদ্‌ঘাটিত হয়েছে। মণিমালার সৌন্দর্য্য ও গঠনচাতুর্য যতই অপূর্ব হোক না কেন বা যতই বহুমূল্য হোক না কেন-বাস্তবে সেটা ফুলের মালার অপার্থিব সৌরভ থেকে বঞ্চিতই থাকে। অনুভূতির গভীরতা ও অকপটতাই যেকোন কাব্যের সৌরভ হয়, ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গলে কিন্তু সেটা নেই। তবুও ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গল নিজের অপরূপ লাবণ্যে প্রায় দু’শো বছরের বেশি সময় ধরে বাঙালীকে মুগ্ধ করে রেখেছে।

সাহিত্য গবেষকদের মতে-এই কাব্যটি রচিত হওয়ার পরে শতাধিক বর্ষ পর্যন্ত-গুণ বা জনপ্রিয়তা-কোন দিক থেকেই বাংলা ভাষায় এটির প্রতিদ্বন্দ্বী দ্বিতীয় কোন কাব্য সৃষ্টি হতে পারেনি। তবে বর্তমানে অবশ্য এই কাব্যটির সেই অপ্রতিদ্বন্দ্বী শ্রেষ্ঠত্ব আর অক্ষুণ্ণ নেই; কারণ-অতীতে মধুসূদন দত্ত, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রমেশচন্দ্র দত্ত প্রভৃতি মনীষীদের বিরূপ সমালোচনার ফলে শিক্ষিত বাঙালী সমাজে এই কাব্যটির জনপ্রিয়তাও সাময়িকভাবে খর্ব হয়েছিল। কিন্তু কাব্যটি নিয়ে পরবর্তীযুগের সমালোচকদের দৃষ্টি-ভঙ্গীর পরিবর্তন ঘটবার ফলে ভারতচন্দ্র পুনরায় তাঁর নিজের পূর্ণ মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন।

সাধারণভাবে ১৬৭৪ শকাব্দ বা ১৭৫২-৫৩ খৃষ্টাব্দকে ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গলের রচনাকাল বলা হয়ে থাকে-
“বেদ লয়ে ঋষি রসে ব্রহ্ম নিরূপিলা। সেই শকে এই গীত ভারত রচিলা॥”

ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত সর্বপ্রথম ভারতচন্দ্রের জীবনকাহিনী সংগ্রহ করে প্রকাশিত করেছিলেন। তারপর থেকে সকলেই তাঁর প্রচারিত সেই জীবনকাহিনীর সবকথা সত্যি বলে বিশ্বাস করে আসছেন। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত ভারতচন্দ্রের জীবনকাহিনীটি সরাসরিভাবে তাঁর পৌত্রের কাছ থেকে শুনেছিলেন। সুতরাং তাঁর বর্ণিত ঘটনাগুলি মোটামুটিভাবে সত্যি হওয়াই সম্ভব। তবে ঈশ্বরচন্দ্র কথিত ভারতচন্দ্রের জীবনের বিভিন্ন ঘটনার পারম্পর্য কিন্তু নিখুঁত নয়। বরং সেটার মধ্যে ইতিহাসগত দিক থেকে যথেষ্ট কালবৈষম্যের নিদর্শন পাওয়া যায়। একটি উদাহরণ দেওয়া যাক।

ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত কর্তৃক প্রকাশিত ভারতচন্দ্রের জীবনকাহিনীতে পাওয়া যায় যে, রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের সান্নিধ্যে আসবার পরে তাঁরই অনুরোধে ভারতচন্দ্র অন্নদামঙ্গল কাব্যটি রচনা করেছিলেন, এবং তারপরে একদিন কৃষ্ণচন্দ্র কবির প্রার্থনা অনুসারে তাঁকে গঙ্গাতীরের মূলাজোড় গ্রামটি ইজারা দিয়েছিলেন। এরপরে বাংলায় যখন বর্গী হাঙ্গামার ঘটনা ঘটেছিল, তখন বর্ধমানরাজ তিলকচন্দ্রের মা বর্গী আক্রমণে বিধ্বস্ত হয়ে যাওয়া বর্ধমান ছেড়ে চলে এসে মূলাজোড়ের পাশের গ্রামে নিজের বসতি স্থাপন করেছিলেন। অতঃপর বর্ধমানরাজের জননী কৃষ্ণচন্দ্রের কাছ থেকে মূলাজোড় গ্রামটি ইজারা নিয়েছিলেন, এবং কৃষ্ণচন্দ্র তখন ভারতচন্দ্রকে অন্যত্র বসবাস করবার জন্য জমি দিলেও মূলাজোড়বাসীদের অনুরোধে ভারতচন্দ্র শেষপর্যন্ত সেখানেই থেকে গিয়েছিলেন।

তাহলে এই বিবরণ থেকে পাওয়া যাচ্ছে যে, ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গল রচিত হওয়ার পরে বাংলায় বর্গী হাঙ্গামার ঘটনাটি ঘটেছিল। কিন্তু ভারতচন্দ্র নিজেই তাঁর অন্নদামঙ্গল কাব্যে জানিয়েছিলেন যে, ১৬৬৪ শকাব্দে বা ১৭৪২ খৃষ্টাব্দে বাংলায় বর্গী হাঙ্গামার ঘটনাটি ঘটেছিল, এবং সেই সময়ে আলীবর্দী খাঁ কৃষ্ণচন্দ্রকে বন্দী করেছিলেন। সেই বন্দীদশায় কৃষ্ণচন্দ্র একদিন স্বপ্নে দেবী অন্নদার আদেশ পেয়েছিলেন, যেটার ফলে তাঁর অনুরোধে ভারতচন্দ্র তাঁর অন্নদামঙ্গল কাব্যটি রচনা করেছিলেন। তাই অন্নদামঙ্গলের রচনাকাল হল ১৬৭৪ শকাব্দ বা ১৭৫২ খৃষ্টাব্দ। কিন্তু ইতিহাস বলে যে, ১৭৫০ খৃষ্টাব্দেই বঙ্গদেশে বর্গী হাঙ্গামার পরিসমাপ্তি ঘটে গিয়েছিল। সুতরাং-ঐতিহাসিক ঘটনাবলীর পারম্পর্য উল্লেখ করবার বিষয়ে ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত এখানে ভুল করেছিলেন বলে দেখা যাচ্ছে। অবশ্য এবিষয়ে তিনি ভুল সংবাদও পেয়ে থাকতে পারেন।

ভারতচন্দ্রের জন্ম-সাল সম্বন্ধে ঈশ্বরচন্দ্র লিখেছিলেন-

“এই বিশ্ববিখ্যাত ভারতচন্দ্র রায় গুণাকর মহাশয় ১৬৩৪ শকে শুভক্ষণে অবনীমণ্ডলে অবতীর্ণ হয়েন।”
কিন্তু এরপরে অন্য একজায়গায় তিনি যা লিখেছিলেন, তাতে ভারতচন্দ্রের জন্ম-সাল নিয়ে কিছু গোলযোগের সৃষ্টি হয়েছিল। ভারতচন্দ্রের লেখা দুটি সত্যপীরের পাঁচালীর মধ্যে একটিতে-‘সনে রুদ্র চৌগুণা’-বলে সালের উল্লেখ করা হয়েছিল। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত এর অর্থ করেছিলেন-১১৩৪ বঙ্গাব্দ বা ১৭২৭ খৃষ্টাব্দ। তিনি-‘কতিপয় প্রামাণ্য ব্যক্তির’-কাছ থেকে শুনেছিলেন যে, ভারতচন্দ্র মাত্র ১৫ বছর বয়সে সেই পাঁচালীটি রচনা করেছিলেন। এরপরে গুপ্তকবি লিখেছিলেন-“তৎকালে ভারতের বয়স ১৫ বৎসর উত্তীর্ণ হয় নাই, কারণ শকের সহিত সালের গণনা করাতেই নির্দিষ্ট হইল তিনি বাঙ্গালা ১১১৯ সালে জন্মগ্রহণ করেন।”

কিন্তু-বর্তমান সময়ের গবেষকদের মতে ‘সনে রুদ্র চৌগুণা’ = ১১৩৪ বঙ্গাব্দ হতে পারে না। কারণ-‘চৌ’ শব্দটি একটি স্বতন্ত্র শব্দ হিসেবে ভারতচন্দ্রের সময়কার বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত হত না, এবং অতীতের কোন বাঙালি কবিই একই অঙ্কের অর্ধেক বামা গতিতে এবং অর্ধেক দক্ষিণা গতিতে লেখেননি। তাই বর্তমান সময়ের গবেষকদের মতে- ‘সনে রুদ্র চৌগুণা’-র একমাত্র সঙ্গত অর্থ হল -১১৪৪ বঙ্গাব্দ বা ১৭৩৭ খৃষ্টাব্দ। সেক্ষেত্রে গুপ্তকবি প্রদত্ত তথ্যানুসারে ভারতচন্দ্রের জন্ম-সাল হয় ১৭২২ খৃষ্টাব্দ এবং ১৭৬০ খৃষ্টাব্দে মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল প্রায় ৩৮ বছর। কিন্তু ভারতচন্দ্র যে কমপক্ষে ৪০ বছর বয়স পর্যন্ত জীবিত ছিলেন, সেকথার প্রমাণ তাঁর ‘নাগাষ্টক’ কাব্য থেকেই পাওয়া যায়। উক্ত কাব্যটি রচনা করবার সময়ে তাঁর বয়স যে ৪০ বছর ছিল, ভারতচন্দ্র সেকথা নিজেই জানিয়েছিলেন। সুতরাং-মাত্র ১৫ বছর বয়সে ভারতচন্দ্রের ‘সত্যপীরের পাঁচালী’ রচনা করবার কথাটি, ইতিহাসগতভাবে সত্যি নয়।

ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত যদি সত্যপীরের পাঁচালীর রচনাকাল সম্বন্ধে তাঁর ধারণার উপরে নির্ভর করে ভারতচন্দ্রের জন্ম-সাল ঠিক করে থাকেন, তাহলে সেটাকে অন্ততঃ ইতিহাসের খাতিরে গ্রহণ করা চলে না। তবে তিনি স্বতন্ত্র কোন ঐতিহাসিক সূত্র থেকেও এই সালটি পেয়ে থাকতে পারেন। সুতরাং বিষয়টিকে সাবধানে ইতিহাসের কষ্টিপাথরে পরীক্ষা করবার দরকার রয়েছে।

ভারতচন্দ্রের জন্ম-সাল নির্ধারণ করতে হলে প্রথমেই ঠিক করতে হবে যে, তিনি কবে নাগাষ্টক কাব্যটি রচনা করেছিলেন। অতীতে অধ্যাপক দীনেশচন্দ্র ভট্টাচার্য অভিমত প্রকাশ করেছিলেন যে, ভারতচন্দ্রের নাগাষ্টক কাব্যটি ১৭৪৫ থেকে ১৭৫০ খৃষ্টাব্দের মধ্যে রচিত হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ের গবেষকদের মতে উক্ত কাব্যটি ১৭৪৫ খৃষ্টাব্দের পরে রচিত হয়েছিল বলে স্বীকার করা গেলেও ১৭৫০ খৃষ্টাব্দের মধ্যেই সেটার রচনা শেষ হয়ে গিয়েছিল-একথা স্বীকার করা সম্ভব নয়।

এই প্রসঙ্গে দীনেশচন্দ্র ভট্টাচার্য জানিয়েছিলেন-
“১৭৫০ খ্রীঃ পরে বর্গীর হাঙ্গামার অবসানে নাগাষ্টক রচিত হওয়ার কথা নহে।”

অন্যদিকে ইতিহাস বলছে যে, বাংলায় বর্গী হাঙ্গামা চলবার সময়ে বর্ধমানের মহারাণী রামদেব নাগের নামে মূলাজোড় গ্রামটি ইজারা নিয়েছিলেন। এরপরে রামদেব নাগের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে ভারতচন্দ্র তাঁর নাগাষ্টক কাব্যটি লিখেছিলেন, কিন্তু কত পরে লিখেছিলেন-সে সম্বন্ধে ইতিহাস থেকে কিছু জানা যায় না। নাগাষ্টক কাব্যটি রচনা করবার সময়ে বাংলায় যে বর্গী হাঙ্গামা চলছিল, একথা কোন ঐতিহাসিক সূত্র থেকেই জানতে পারা যায় না। সুতরাং-১৭৫০ খৃষ্টাব্দের পরে নাগাষ্টক কাব্যটি রচিত হয়েছিল বলে মনে করলে, ইতিহাসের দিক থেকে কোন অসঙ্গতি হয় না।

ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত কথিত ভারতচন্দ্রের জীবনকাহিনীতে পাওয়া যায় যে, রামদেব নাগের নামে মূলাজোড় গ্রামটি ইজারা দেওয়ার পরে কৃষ্ণচন্দ্র ভারতচন্দ্রকে আনারপুর অঞ্চলে বসতি স্থাপন করবার জন্য কিছু জমি দান করেছিলেন। সাম্প্রতিক অতীতে ঐতিহাসিকেরা

সেই জমিদানের দলিলটিও উদ্ধার করেছিলেন। সেটির প্রতিলিপি নিম্নরূপ-
“শ্রীশ্রীদুর্গা
শরণং
শ্রীতরঙ্গ
নকল
শ্রীযুক্ত ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর
সদুদার চরিতেষু শ্রীকৃষ্ণচন্দ্র শর্ম্মণো
নমস্কারঃ শিবং বিজ্ঞাপনঞ্চ বিশেষঃ
সপরিবারে অধিকারস্থ হইয়া আনাওরপুর চাকলায় বসতি করিয়াছ অতএব চাকলা মজকুরে বেওয়ারেশ গরজমাই উজ্জট বাস্তু ও লায়েক বাগাতি জঙ্গলভূমি ২১ একইশ বিঘা এবং বেলায়তি সমেত পতিত জঙ্গলভূমি ৫১ একাওন্ন বিঘা ও একুনে ৭২/০ বাওত্তর বিঘা বৃত্তি দিলাম বাস্তুতে সপরিবারে বসতি করিয়া বাগাতি জমিতে বাগিচা করিয়া জঙ্গলভূমি নিজ জোতে ভোগ করহ।
ইতি সন ১১৫৬ ছাপ্পান্ন ১ আগ্রহায়ণ।”

উপরোক্ত দলিলের সঙ্গে ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত প্রদত্ত ভারতচন্দ্রের জীবনকাহিনীর দুটি বিষয়ে পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়।

প্রথমতঃ, তিনি লিখেছিলেন যে, রাজা কৃষ্ণচন্দ্র ভারতচন্দ্রকে আনারপুরে জমি দিলেও ভারতচন্দ্র সেখানে যাননি, তিনি মূলাজোড়েই থেকে গিয়েছিলেন। কিন্তু উপরের সনদে স্পষ্টভাবেই লেখা হয়েছিল-
“সপরিবারে অধিকারস্থ হইয়া আনাওরপুর চাকলায় বসতি করিয়াছ।”

এর থেকে মনে হয় যে, তিনি তখনকারমত আনারপুরে চলে গেলেও পরে আবার কোন কারণে মূলাজোড়ে ফিরে এসেছিলেন। এবং ফিরে যে এসেছিলেন- সেবিষয়ে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই, কারণ-তাঁর বংশধরেরা বরাবরই মূলাজোড়েই বাস করেছিলেন।
দ্বিতীয়তঃ, উপরোক্ত দলিলটিতে ভারতচন্দ্রকে ৭২ বিঘা জমি দানের কথা বলা হলেও ঈশ্বরচন্দ্র লিখেছিলেন যে, কৃষ্ণচন্দ্র তাঁকে আনারপুর অঞ্চলের ১০৫ বিঘা জমি দান করেছিলেন।

যাই হোক, বর্তমান সময়ের গবেষকদের মতে ভারতচন্দ্র ১৭৪৯ খৃষ্টাব্দে আনারপুরে জমি পেয়েছিলেন, এবং সেই জমি পাওয়ার বেশ কিছুদিন পরেই তিনি তাঁর নাগাষ্টক কাব্যটি রচনা করেছিলেন। সুতরাং-জমি পাওয়ার মাত্র এক বছর পরে, অর্থাৎ ১৭৫০ খৃষ্টাব্দে তাঁর নাগষ্টক কাব্যটি রচিত হয়েছিল বলে ধরলে ভারতচন্দ্রের জন্ম-সাল ১৭১০ খৃষ্টাব্দ হয়।

অধ্যাপক দীনেশচন্দ্র ভট্টাচার্য জানিয়েছিলেন যে, নাগাষ্টক কাব্যের-
“তৃতীয় শ্লোকে আছে:
‘পিতা বৃদ্ধঃ পুত্রঃ শিশুরহহ নারী বিরহিণী।’
অর্থাৎ তখন তাঁহার পিতা জীবিত এবং তাঁহার তিন পুত্রের মধ্যে প্রথমটির মাত্র জন্ম হইয়াছে।”

সুতরাং-নাগাষ্টক কাব্যটি যে ভারতচন্দ্রের মৃত্যুর অন্ততঃ পাঁচ বছর আগেই রচিত হয়েছিল, সেবিষয়ে সন্দেহ কোন অবকাশ থাকে না। সেক্ষেত্রে নাগাষ্টক কাব্যটি ১৭৫৫ খৃষ্টাব্দে রচিত হয়েছিল বলে ধরলেও ভারতচন্দ্রের জন্মসাল ১৭১৫ খৃষ্টাব্দ হয়। অতএব-ভারতচন্দ্র যে, ১৭১০ থেকে ১৭১৫ খৃষ্টাব্দের মধ্যেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন, সেটা নিয়ে বর্তমান সময়ের গবেষকদের মনে কোন ধরণের সন্দেহ নেই। আর ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের দেওয়া ভারতচন্দ্রের জন্মসাল-১৬৩৪ শকাব্দ বা ১৭১২-১৩ খৃষ্টাব্দ -এরই মধ্যে পড়ে বলে এই সালকে গ্রহণ করতে এখন আর কোন বাধা নেই।

এবারে ইতিহাস বিশ্লেষণ করে দেখা যাক যে, ভারতচন্দ্র ঠিক কোন সময়ে প্রথমবারের জন্য রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের সংস্পর্শে এসেছিলেন। ঐতিহাসিকদের মতে ১৭৩৭ খৃষ্টাব্দে তিনি পূর্বোল্লিখিত সত্যপীরের পাঁচালীটি রচনা করেছিলেন, এবং তারপরে সম্ভবতঃ আরও একটি সত্যপীরের পাঁচালী লিখেছিলেন। এরপরে নানা জায়গায় ঘোরাফেরা করবার পরে তিনি রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের কাছে আশ্রয় পেয়েছিলেন। সেই ঘোরাফেরা করতে তাঁর কমপক্ষে বছর তিনেক সময় লেগেছিল বলে ধরা যেতে পারে, সেটার কম সময় ধরা চলে না। কারণ-১৭৪২ খৃষ্টাব্দের অল্প পরেই কৃষ্ণচন্দ্র ভারতচন্দ্রকে অন্নদামঙ্গল রচনা করবার আদেশ করেছিলেন বলে ইতিহাস থেকে জানা যায়। সুতরাং-১৭৪২ খৃষ্টাব্দের অন্ততঃ দু’বছর আগে থেকেই ভারতচন্দ্র কৃষ্ণচন্দ্রের আশ্রয়ে ছিলেন বলে ধরতে হয়। তাহলে ১৭৪০ খৃষ্টাব্দের মত সময়ে কৃষ্ণচন্দ্রের সঙ্গে মহাকবি ভারতচন্দ্রের প্রথম সাক্ষাৎ ঘটেছিল বলে অনুমান করা চলে।

ভারতচন্দ্রের অনুবাদ কাব্য – ‘রসমঞ্জরী’ -সম্ভবতঃ রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের আশ্রয়ে লেখা তাঁর প্রথম কোন রচনা ছিল। সেই কাব্যে ভারতচন্দ্রের-‘রায় গুণাকর’ -উপাধির কোন উল্লেখ পাওয়া যায় না, কিন্তু উপরে ১৭৪৯ খৃষ্টাব্দের যে দলিলটি দেওয়া হয়েছে-তাতে তাঁর এই উপাধির উল্লেখ দেখতে পাওয়া যায়। অতএব-১৭৪০ থেকে ১৭৪৯ খৃষ্টাব্দের মধ্যেই ভারতচন্দ্র তাঁর ‘রসমঞ্জরী’ রচনা করেছিলেন বলে সিদ্ধান্ত করা যেতে পারে।

লেখক: রানা চক্রবর্তী, বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

রানা চক্রবর্তী: রায় গুণাকর ভারতচন্দ্র শুধুমাত্র বাংলা সাহিত্যের একজন শ্রেষ্ঠ কবি নন, তিনি নিজেই যেন একটা সমগ্র যুগের প্রতিনিধি। তিনি খৃষ্টীয় অষ্টাদশ শতাব্দীর বাংলার নবজাগ্রত বিদগ্ধ নাগরিক সমাজের একজন ঐতিহাসিক প্রতিনিধি। সেই সমাজে যেমন শিক্ষা, সংস্কৃতি ও আভিজাত্যের অপরূপ সমন্বয় ঘটেছিল, তেমনি তাতে সরলতা, অকপটতা ও আদর্শনিষ্ঠার যে যথেষ্ট পরিমাণে অভাব ছিল -সে বিষয়ে ঐতিহাসিকদের মনে কোন ধরণের সন্দেহ নেই। ভারতচন্দ্রের ‘অন্নদামঙ্গল’ কাব্যে সেই সমাজের ছাপটি পুরোপুরিভাবে পড়েছিল। তাই ভাষার লাবণ্যে, ছন্দের নৈপুণ্যে ও শ্লোকের চাতুর্য্যে অন্নদামঙ্গল কাব্য যেমন তুলনারহিত, তেমনি তাতে অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতাটুকুও প্রায় অনুপস্থিত রয়েছে বলে দেখতে পাওয়া যায়।

এই প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন-
“রাজসভাকবি রায়গুণাকরের অন্নদামঙ্গল গান রাজকণ্ঠের মণিমালার মতো, যেমন তাহার উজ্জ্বলতা, তেমনি তাহার কারুকার্য।”

তাঁর এই উক্তির মধ্যে যেমন ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গলের চরম প্রশংসা রয়েছে, তেমনি সেই ক্যব্যের অপূর্ণতাটুকুও উদ্‌ঘাটিত হয়েছে। মণিমালার সৌন্দর্য্য ও গঠনচাতুর্য যতই অপূর্ব হোক না কেন বা যতই বহুমূল্য হোক না কেন-বাস্তবে সেটা ফুলের মালার অপার্থিব সৌরভ থেকে বঞ্চিতই থাকে। অনুভূতির গভীরতা ও অকপটতাই যেকোন কাব্যের সৌরভ হয়, ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গলে কিন্তু সেটা নেই। তবুও ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গল নিজের অপরূপ লাবণ্যে প্রায় দু’শো বছরের বেশি সময় ধরে বাঙালীকে মুগ্ধ করে রেখেছে।

সাহিত্য গবেষকদের মতে-এই কাব্যটি রচিত হওয়ার পরে শতাধিক বর্ষ পর্যন্ত-গুণ বা জনপ্রিয়তা-কোন দিক থেকেই বাংলা ভাষায় এটির প্রতিদ্বন্দ্বী দ্বিতীয় কোন কাব্য সৃষ্টি হতে পারেনি। তবে বর্তমানে অবশ্য এই কাব্যটির সেই অপ্রতিদ্বন্দ্বী শ্রেষ্ঠত্ব আর অক্ষুণ্ণ নেই; কারণ-অতীতে মধুসূদন দত্ত, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রমেশচন্দ্র দত্ত প্রভৃতি মনীষীদের বিরূপ সমালোচনার ফলে শিক্ষিত বাঙালী সমাজে এই কাব্যটির জনপ্রিয়তাও সাময়িকভাবে খর্ব হয়েছিল। কিন্তু কাব্যটি নিয়ে পরবর্তীযুগের সমালোচকদের দৃষ্টি-ভঙ্গীর পরিবর্তন ঘটবার ফলে ভারতচন্দ্র পুনরায় তাঁর নিজের পূর্ণ মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন।

সাধারণভাবে ১৬৭৪ শকাব্দ বা ১৭৫২-৫৩ খৃষ্টাব্দকে ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গলের রচনাকাল বলা হয়ে থাকে-
“বেদ লয়ে ঋষি রসে ব্রহ্ম নিরূপিলা। সেই শকে এই গীত ভারত রচিলা॥”

ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত সর্বপ্রথম ভারতচন্দ্রের জীবনকাহিনী সংগ্রহ করে প্রকাশিত করেছিলেন। তারপর থেকে সকলেই তাঁর প্রচারিত সেই জীবনকাহিনীর সবকথা সত্যি বলে বিশ্বাস করে আসছেন। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত ভারতচন্দ্রের জীবনকাহিনীটি সরাসরিভাবে তাঁর পৌত্রের কাছ থেকে শুনেছিলেন। সুতরাং তাঁর বর্ণিত ঘটনাগুলি মোটামুটিভাবে সত্যি হওয়াই সম্ভব। তবে ঈশ্বরচন্দ্র কথিত ভারতচন্দ্রের জীবনের বিভিন্ন ঘটনার পারম্পর্য কিন্তু নিখুঁত নয়। বরং সেটার মধ্যে ইতিহাসগত দিক থেকে যথেষ্ট কালবৈষম্যের নিদর্শন পাওয়া যায়। একটি উদাহরণ দেওয়া যাক।

ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত কর্তৃক প্রকাশিত ভারতচন্দ্রের জীবনকাহিনীতে পাওয়া যায় যে, রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের সান্নিধ্যে আসবার পরে তাঁরই অনুরোধে ভারতচন্দ্র অন্নদামঙ্গল কাব্যটি রচনা করেছিলেন, এবং তারপরে একদিন কৃষ্ণচন্দ্র কবির প্রার্থনা অনুসারে তাঁকে গঙ্গাতীরের মূলাজোড় গ্রামটি ইজারা দিয়েছিলেন। এরপরে বাংলায় যখন বর্গী হাঙ্গামার ঘটনা ঘটেছিল, তখন বর্ধমানরাজ তিলকচন্দ্রের মা বর্গী আক্রমণে বিধ্বস্ত হয়ে যাওয়া বর্ধমান ছেড়ে চলে এসে মূলাজোড়ের পাশের গ্রামে নিজের বসতি স্থাপন করেছিলেন। অতঃপর বর্ধমানরাজের জননী কৃষ্ণচন্দ্রের কাছ থেকে মূলাজোড় গ্রামটি ইজারা নিয়েছিলেন, এবং কৃষ্ণচন্দ্র তখন ভারতচন্দ্রকে অন্যত্র বসবাস করবার জন্য জমি দিলেও মূলাজোড়বাসীদের অনুরোধে ভারতচন্দ্র শেষপর্যন্ত সেখানেই থেকে গিয়েছিলেন।

তাহলে এই বিবরণ থেকে পাওয়া যাচ্ছে যে, ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গল রচিত হওয়ার পরে বাংলায় বর্গী হাঙ্গামার ঘটনাটি ঘটেছিল। কিন্তু ভারতচন্দ্র নিজেই তাঁর অন্নদামঙ্গল কাব্যে জানিয়েছিলেন যে, ১৬৬৪ শকাব্দে বা ১৭৪২ খৃষ্টাব্দে বাংলায় বর্গী হাঙ্গামার ঘটনাটি ঘটেছিল, এবং সেই সময়ে আলীবর্দী খাঁ কৃষ্ণচন্দ্রকে বন্দী করেছিলেন। সেই বন্দীদশায় কৃষ্ণচন্দ্র একদিন স্বপ্নে দেবী অন্নদার আদেশ পেয়েছিলেন, যেটার ফলে তাঁর অনুরোধে ভারতচন্দ্র তাঁর অন্নদামঙ্গল কাব্যটি রচনা করেছিলেন। তাই অন্নদামঙ্গলের রচনাকাল হল ১৬৭৪ শকাব্দ বা ১৭৫২ খৃষ্টাব্দ। কিন্তু ইতিহাস বলে যে, ১৭৫০ খৃষ্টাব্দেই বঙ্গদেশে বর্গী হাঙ্গামার পরিসমাপ্তি ঘটে গিয়েছিল। সুতরাং-ঐতিহাসিক ঘটনাবলীর পারম্পর্য উল্লেখ করবার বিষয়ে ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত এখানে ভুল করেছিলেন বলে দেখা যাচ্ছে। অবশ্য এবিষয়ে তিনি ভুল সংবাদও পেয়ে থাকতে পারেন।

ভারতচন্দ্রের জন্ম-সাল সম্বন্ধে ঈশ্বরচন্দ্র লিখেছিলেন-

“এই বিশ্ববিখ্যাত ভারতচন্দ্র রায় গুণাকর মহাশয় ১৬৩৪ শকে শুভক্ষণে অবনীমণ্ডলে অবতীর্ণ হয়েন।”
কিন্তু এরপরে অন্য একজায়গায় তিনি যা লিখেছিলেন, তাতে ভারতচন্দ্রের জন্ম-সাল নিয়ে কিছু গোলযোগের সৃষ্টি হয়েছিল। ভারতচন্দ্রের লেখা দুটি সত্যপীরের পাঁচালীর মধ্যে একটিতে-‘সনে রুদ্র চৌগুণা’-বলে সালের উল্লেখ করা হয়েছিল। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত এর অর্থ করেছিলেন-১১৩৪ বঙ্গাব্দ বা ১৭২৭ খৃষ্টাব্দ। তিনি-‘কতিপয় প্রামাণ্য ব্যক্তির’-কাছ থেকে শুনেছিলেন যে, ভারতচন্দ্র মাত্র ১৫ বছর বয়সে সেই পাঁচালীটি রচনা করেছিলেন। এরপরে গুপ্তকবি লিখেছিলেন-“তৎকালে ভারতের বয়স ১৫ বৎসর উত্তীর্ণ হয় নাই, কারণ শকের সহিত সালের গণনা করাতেই নির্দিষ্ট হইল তিনি বাঙ্গালা ১১১৯ সালে জন্মগ্রহণ করেন।”

কিন্তু-বর্তমান সময়ের গবেষকদের মতে ‘সনে রুদ্র চৌগুণা’ = ১১৩৪ বঙ্গাব্দ হতে পারে না। কারণ-‘চৌ’ শব্দটি একটি স্বতন্ত্র শব্দ হিসেবে ভারতচন্দ্রের সময়কার বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত হত না, এবং অতীতের কোন বাঙালি কবিই একই অঙ্কের অর্ধেক বামা গতিতে এবং অর্ধেক দক্ষিণা গতিতে লেখেননি। তাই বর্তমান সময়ের গবেষকদের মতে- ‘সনে রুদ্র চৌগুণা’-র একমাত্র সঙ্গত অর্থ হল -১১৪৪ বঙ্গাব্দ বা ১৭৩৭ খৃষ্টাব্দ। সেক্ষেত্রে গুপ্তকবি প্রদত্ত তথ্যানুসারে ভারতচন্দ্রের জন্ম-সাল হয় ১৭২২ খৃষ্টাব্দ এবং ১৭৬০ খৃষ্টাব্দে মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল প্রায় ৩৮ বছর। কিন্তু ভারতচন্দ্র যে কমপক্ষে ৪০ বছর বয়স পর্যন্ত জীবিত ছিলেন, সেকথার প্রমাণ তাঁর ‘নাগাষ্টক’ কাব্য থেকেই পাওয়া যায়। উক্ত কাব্যটি রচনা করবার সময়ে তাঁর বয়স যে ৪০ বছর ছিল, ভারতচন্দ্র সেকথা নিজেই জানিয়েছিলেন। সুতরাং-মাত্র ১৫ বছর বয়সে ভারতচন্দ্রের ‘সত্যপীরের পাঁচালী’ রচনা করবার কথাটি, ইতিহাসগতভাবে সত্যি নয়।

ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত যদি সত্যপীরের পাঁচালীর রচনাকাল সম্বন্ধে তাঁর ধারণার উপরে নির্ভর করে ভারতচন্দ্রের জন্ম-সাল ঠিক করে থাকেন, তাহলে সেটাকে অন্ততঃ ইতিহাসের খাতিরে গ্রহণ করা চলে না। তবে তিনি স্বতন্ত্র কোন ঐতিহাসিক সূত্র থেকেও এই সালটি পেয়ে থাকতে পারেন। সুতরাং বিষয়টিকে সাবধানে ইতিহাসের কষ্টিপাথরে পরীক্ষা করবার দরকার রয়েছে।

ভারতচন্দ্রের জন্ম-সাল নির্ধারণ করতে হলে প্রথমেই ঠিক করতে হবে যে, তিনি কবে নাগাষ্টক কাব্যটি রচনা করেছিলেন। অতীতে অধ্যাপক দীনেশচন্দ্র ভট্টাচার্য অভিমত প্রকাশ করেছিলেন যে, ভারতচন্দ্রের নাগাষ্টক কাব্যটি ১৭৪৫ থেকে ১৭৫০ খৃষ্টাব্দের মধ্যে রচিত হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ের গবেষকদের মতে উক্ত কাব্যটি ১৭৪৫ খৃষ্টাব্দের পরে রচিত হয়েছিল বলে স্বীকার করা গেলেও ১৭৫০ খৃষ্টাব্দের মধ্যেই সেটার রচনা শেষ হয়ে গিয়েছিল-একথা স্বীকার করা সম্ভব নয়।

এই প্রসঙ্গে দীনেশচন্দ্র ভট্টাচার্য জানিয়েছিলেন-
“১৭৫০ খ্রীঃ পরে বর্গীর হাঙ্গামার অবসানে নাগাষ্টক রচিত হওয়ার কথা নহে।”

অন্যদিকে ইতিহাস বলছে যে, বাংলায় বর্গী হাঙ্গামা চলবার সময়ে বর্ধমানের মহারাণী রামদেব নাগের নামে মূলাজোড় গ্রামটি ইজারা নিয়েছিলেন। এরপরে রামদেব নাগের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে ভারতচন্দ্র তাঁর নাগাষ্টক কাব্যটি লিখেছিলেন, কিন্তু কত পরে লিখেছিলেন-সে সম্বন্ধে ইতিহাস থেকে কিছু জানা যায় না। নাগাষ্টক কাব্যটি রচনা করবার সময়ে বাংলায় যে বর্গী হাঙ্গামা চলছিল, একথা কোন ঐতিহাসিক সূত্র থেকেই জানতে পারা যায় না। সুতরাং-১৭৫০ খৃষ্টাব্দের পরে নাগাষ্টক কাব্যটি রচিত হয়েছিল বলে মনে করলে, ইতিহাসের দিক থেকে কোন অসঙ্গতি হয় না।

ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত কথিত ভারতচন্দ্রের জীবনকাহিনীতে পাওয়া যায় যে, রামদেব নাগের নামে মূলাজোড় গ্রামটি ইজারা দেওয়ার পরে কৃষ্ণচন্দ্র ভারতচন্দ্রকে আনারপুর অঞ্চলে বসতি স্থাপন করবার জন্য কিছু জমি দান করেছিলেন। সাম্প্রতিক অতীতে ঐতিহাসিকেরা

সেই জমিদানের দলিলটিও উদ্ধার করেছিলেন। সেটির প্রতিলিপি নিম্নরূপ-
“শ্রীশ্রীদুর্গা
শরণং
শ্রীতরঙ্গ
নকল
শ্রীযুক্ত ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর
সদুদার চরিতেষু শ্রীকৃষ্ণচন্দ্র শর্ম্মণো
নমস্কারঃ শিবং বিজ্ঞাপনঞ্চ বিশেষঃ
সপরিবারে অধিকারস্থ হইয়া আনাওরপুর চাকলায় বসতি করিয়াছ অতএব চাকলা মজকুরে বেওয়ারেশ গরজমাই উজ্জট বাস্তু ও লায়েক বাগাতি জঙ্গলভূমি ২১ একইশ বিঘা এবং বেলায়তি সমেত পতিত জঙ্গলভূমি ৫১ একাওন্ন বিঘা ও একুনে ৭২/০ বাওত্তর বিঘা বৃত্তি দিলাম বাস্তুতে সপরিবারে বসতি করিয়া বাগাতি জমিতে বাগিচা করিয়া জঙ্গলভূমি নিজ জোতে ভোগ করহ।
ইতি সন ১১৫৬ ছাপ্পান্ন ১ আগ্রহায়ণ।”

উপরোক্ত দলিলের সঙ্গে ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত প্রদত্ত ভারতচন্দ্রের জীবনকাহিনীর দুটি বিষয়ে পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়।

প্রথমতঃ, তিনি লিখেছিলেন যে, রাজা কৃষ্ণচন্দ্র ভারতচন্দ্রকে আনারপুরে জমি দিলেও ভারতচন্দ্র সেখানে যাননি, তিনি মূলাজোড়েই থেকে গিয়েছিলেন। কিন্তু উপরের সনদে স্পষ্টভাবেই লেখা হয়েছিল-
“সপরিবারে অধিকারস্থ হইয়া আনাওরপুর চাকলায় বসতি করিয়াছ।”

এর থেকে মনে হয় যে, তিনি তখনকারমত আনারপুরে চলে গেলেও পরে আবার কোন কারণে মূলাজোড়ে ফিরে এসেছিলেন। এবং ফিরে যে এসেছিলেন- সেবিষয়ে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই, কারণ-তাঁর বংশধরেরা বরাবরই মূলাজোড়েই বাস করেছিলেন।
দ্বিতীয়তঃ, উপরোক্ত দলিলটিতে ভারতচন্দ্রকে ৭২ বিঘা জমি দানের কথা বলা হলেও ঈশ্বরচন্দ্র লিখেছিলেন যে, কৃষ্ণচন্দ্র তাঁকে আনারপুর অঞ্চলের ১০৫ বিঘা জমি দান করেছিলেন।

যাই হোক, বর্তমান সময়ের গবেষকদের মতে ভারতচন্দ্র ১৭৪৯ খৃষ্টাব্দে আনারপুরে জমি পেয়েছিলেন, এবং সেই জমি পাওয়ার বেশ কিছুদিন পরেই তিনি তাঁর নাগাষ্টক কাব্যটি রচনা করেছিলেন। সুতরাং-জমি পাওয়ার মাত্র এক বছর পরে, অর্থাৎ ১৭৫০ খৃষ্টাব্দে তাঁর নাগষ্টক কাব্যটি রচিত হয়েছিল বলে ধরলে ভারতচন্দ্রের জন্ম-সাল ১৭১০ খৃষ্টাব্দ হয়।

অধ্যাপক দীনেশচন্দ্র ভট্টাচার্য জানিয়েছিলেন যে, নাগাষ্টক কাব্যের-
“তৃতীয় শ্লোকে আছে:
‘পিতা বৃদ্ধঃ পুত্রঃ শিশুরহহ নারী বিরহিণী।’
অর্থাৎ তখন তাঁহার পিতা জীবিত এবং তাঁহার তিন পুত্রের মধ্যে প্রথমটির মাত্র জন্ম হইয়াছে।”

সুতরাং-নাগাষ্টক কাব্যটি যে ভারতচন্দ্রের মৃত্যুর অন্ততঃ পাঁচ বছর আগেই রচিত হয়েছিল, সেবিষয়ে সন্দেহ কোন অবকাশ থাকে না। সেক্ষেত্রে নাগাষ্টক কাব্যটি ১৭৫৫ খৃষ্টাব্দে রচিত হয়েছিল বলে ধরলেও ভারতচন্দ্রের জন্মসাল ১৭১৫ খৃষ্টাব্দ হয়। অতএব-ভারতচন্দ্র যে, ১৭১০ থেকে ১৭১৫ খৃষ্টাব্দের মধ্যেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন, সেটা নিয়ে বর্তমান সময়ের গবেষকদের মনে কোন ধরণের সন্দেহ নেই। আর ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের দেওয়া ভারতচন্দ্রের জন্মসাল-১৬৩৪ শকাব্দ বা ১৭১২-১৩ খৃষ্টাব্দ -এরই মধ্যে পড়ে বলে এই সালকে গ্রহণ করতে এখন আর কোন বাধা নেই।

এবারে ইতিহাস বিশ্লেষণ করে দেখা যাক যে, ভারতচন্দ্র ঠিক কোন সময়ে প্রথমবারের জন্য রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের সংস্পর্শে এসেছিলেন। ঐতিহাসিকদের মতে ১৭৩৭ খৃষ্টাব্দে তিনি পূর্বোল্লিখিত সত্যপীরের পাঁচালীটি রচনা করেছিলেন, এবং তারপরে সম্ভবতঃ আরও একটি সত্যপীরের পাঁচালী লিখেছিলেন। এরপরে নানা জায়গায় ঘোরাফেরা করবার পরে তিনি রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের কাছে আশ্রয় পেয়েছিলেন। সেই ঘোরাফেরা করতে তাঁর কমপক্ষে বছর তিনেক সময় লেগেছিল বলে ধরা যেতে পারে, সেটার কম সময় ধরা চলে না। কারণ-১৭৪২ খৃষ্টাব্দের অল্প পরেই কৃষ্ণচন্দ্র ভারতচন্দ্রকে অন্নদামঙ্গল রচনা করবার আদেশ করেছিলেন বলে ইতিহাস থেকে জানা যায়। সুতরাং-১৭৪২ খৃষ্টাব্দের অন্ততঃ দু’বছর আগে থেকেই ভারতচন্দ্র কৃষ্ণচন্দ্রের আশ্রয়ে ছিলেন বলে ধরতে হয়। তাহলে ১৭৪০ খৃষ্টাব্দের মত সময়ে কৃষ্ণচন্দ্রের সঙ্গে মহাকবি ভারতচন্দ্রের প্রথম সাক্ষাৎ ঘটেছিল বলে অনুমান করা চলে।

ভারতচন্দ্রের অনুবাদ কাব্য – ‘রসমঞ্জরী’ -সম্ভবতঃ রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের আশ্রয়ে লেখা তাঁর প্রথম কোন রচনা ছিল। সেই কাব্যে ভারতচন্দ্রের-‘রায় গুণাকর’ -উপাধির কোন উল্লেখ পাওয়া যায় না, কিন্তু উপরে ১৭৪৯ খৃষ্টাব্দের যে দলিলটি দেওয়া হয়েছে-তাতে তাঁর এই উপাধির উল্লেখ দেখতে পাওয়া যায়। অতএব-১৭৪০ থেকে ১৭৪৯ খৃষ্টাব্দের মধ্যেই ভারতচন্দ্র তাঁর ‘রসমঞ্জরী’ রচনা করেছিলেন বলে সিদ্ধান্ত করা যেতে পারে।

লেখক: রানা চক্রবর্তী, বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট