বিশেষ প্রতিবেদক: নানা ধরণের দুর্নীতি ও অনিয়মের কারণে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) তে আন্দোলনে নেমেছে সিবিএ নেতৃবৃন্দ। সম্প্রতি সিডিএ’র নগর পরিকল্পনাবিদ অথরাইজড অফিসার-২ এর অপসারণের দাবীতে বিভিন্ন সভা সমাবেশে উত্তাল সিডিএ। একে অপরের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেছে কর্তৃপক্ষ বরাবরে।
সংগঠনের নেতৃবৃন্দরা জানিয়েছে, কর্তৃপক্ষ কোন আইনগত ব্যবস্থা না নিলে প্রয়োজনে তারা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রনালয়ে লিখিত অভিযোগসহ আইনের আশ্রয় গ্রহন করবে। নগর পরিকল্পনা বিভাগের অধিনেই ইমারত নির্মাণ কমিটি। এ দুটি কমিটির পদাধিকার বলে চেয়ারম্যান উপ-প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ(ডিসিটিপি)। তিনিই এ দুটি শাখার ন্যায়পাল। সমস্ত দুণীতি ও অনিয়ম এই শাখায়। বর্তমান ভারপ্রাপ্ত উপ-প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ আবু ঈশা আনচারির যোগ্যতা নিয়ে সিডিএর দুইজন প্রকৌশলী আদালতে মামলা ও করেছিল। কিন্তু মামলাটি পরে উভয়ের সমঝোতার মাধ্যমে নিস্পন্ন হয়। সাবেক ভারপ্রাপ্ত সচিব সাইফুল ইসলাম দায়িত্ব পালনকালীন সময়ে রহস্যজনকভাবে বেশ কয়েকজনকে বিধিবহির্ভূতভাবে ভারপ্রাপ্ত পদোন্নতির অফিস আদেশ জারি করেছিল, এটিও তার মধ্যে একটি। পূবে ইমারত নিমাণ কমিটির পদাধিকার বলে চেয়ারম্যান ছিলেন প্রধান প্রকৌশলী। ২০০৮ সালের ইমারত নিমাণ বিধি অনুযায়ী স্থাপত্য পরিকল্পনা শাখার উপ-প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদের কাছে পদটি হস্তান্তরিত হয়। তখন সিটিপি পদটি সৃষ্টি হলেও এই পদে কেউ আসীন ছিলেন না। প্রায় ৮/৯ বছর যাবৎ এই পদটি খালী ছিল। বর্তমানে সৃষ্ট এ পদ নিয়ে প্রকৌশল শাখা ও স্থাপত্য পরিকল্পনা শাখার মধ্যে চলছে মনস্তাত্বিক দন্ধ।
নগরবাসীকে ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্র(এলইউসি) অনুমোদন সময় ক্ষেপন হয় বছরের পর বছর। মন্ত্রনালয়ের নির্দেশনা আছে এলইউসি ও নকশা অনুমোদন ৪৫ দিনের মধ্যে সম্পন্ন করার। কার কথা কে শুনে। সরকারী রাজস্ব ও আদায় হয় বেশী এ শাখা থেকে। সাবেক চেয়ারম্যান আবদুস ছালাম এলইউসি ফি বিধিমালা লঙ্গন করে অর্থ মন্ত্রনালয় থেকে অনুমোদন না নিয়ে নিজের গায়ের জোরে ৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করে। অথচ বিধিমালাতে ফি নিধারণ করা আছে ১ হাজার টাকা। বোড মিটিং এ অনুমোদন নিলেও অর্থ মন্ত্রনালয়ের অনুমোদন না থাকলে জনগন থেকে সরাসরি বধিত ফি আদায় করা যায় না। কিন্তু সিডিএ কর্তৃপক্ষ আইনের প্রতিবৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বর্ধিত ফি আদায় করছে। এ ছাড়াও দুইজন জিআইএসকে(গ্লোবাল ইনফরমেশান সিস্টেম) কোন যোগ্যতা না থাকা সত্বেও এটিপি পদে পদোন্নতি দিয়েছে। যা ডিপিসিতে উল্লেখ রয়েছে। এ দুইজনের নাম জয়নাল ও জিন্নাত। তারা টাকা ছাড়া ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্র নথিতে দস্তখত করেনা। টাকা না দেওয়ায় শ্যামল চৌধূরীর দাখিলকৃত ভূমি ব্যবহার ছাড় পত্র নথি নং ৫৭৪/২০২০-২১ গায়েব করে ফেলে। যা সংশ্লিষ্ট ডিসিটিপিকে মৌখিকভাবে জানানো হয়েছে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারী মাসের শেষের দিকে প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ(সিটিপি) এর চাকুরীর মেয়াদ শেষ হবে।তাই এই পদে কে পদায়ন হবে তা নিয়ে ইতোমধ্যে দৌড়ঝাপ শুরু হয়েছে। এই দৌড় প্রতিযোগিতায় তিনজন নির্বাহী প্রকৌশলী ও একজন নগর পরিকল্পনাবিদ তদবির চালাচ্ছে। প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ নিয়োগে সরকারী যে বিধিবিধান আছে সেই বিধি বিধানই মেনে চলছে না সিডিএ কর্তৃপক্ষ।
সিডিএ এর একজন দায়িত্বশীল অফিসারের কাছে জানতে চাইলে তিনি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সরকারী বিধি অনুযায়ী প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদেরও যোগ্যতা হবে; সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে (ক) যে কোন স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নগর পরিকল্পনা (প্রকৌশল) স্নাতক ডিগ্রীধারীসহ সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে সরকারী/আধা-সরকারী/স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানে ১ম শ্রেণীর কর্মকর্তা পদে কমপক্ষে ১৫(পনের) বৎসরের অভিজ্ঞাতা থাকাতে হবে। (খ) পদোন্নতির ক্ষেত্রে উপ-প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ হিসেবে কমপক্ষে ১০(দশ) বছরের অভিজ্ঞা থাকতে হবে।
সেক্ষেত্রে বর্তমানে সিডিএ তে কর্মরত প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদের সে রকম কোন যোগ্যতা নেই। তারপরও তিনি প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ হিসেবে কিভাবে পদোন্নতি পেল সেটা বোধগম্য নয়।
আর উপ-প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ হিসেবে সরকারীবিধিতে যে যোগ্যতা থাকার কথা তা হলো; সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে (ক) যে কোন স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নগর পরিকল্পনায় (প্রকৌশল) স্নাতক ডিগ্রী ধারীসহ সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে সরকারী/আধা-সরকারী/স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানে ১ম শ্রেণীর কর্মকর্তা পদে কমপক্ষে ১০ (দশ) বৎসরের অভিজ্ঞাতা থাকতে হবে। (খ) পদোন্নতির ক্ষেত্রে নগর পরিকল্পনা নগর পরিকল্পনা ডিগ্রীধারী অথরাইজড অফিসার অথবা উল্লিখিত উভয় পদে কমপক্ষে ৭ (সাত) বৎসরের অভিজ্ঞতা থাকিতে হবে।সেক্ষেত্রে বর্তমানে সিডিএতে কর্মরত কারো প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ হওয়ার যোগ্যতা নেই।
সিডিএ তে প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ ও উপ-প্রধান পরিকল্পনাবিদ এই দুই পদে কি মধু আছে বুঝা মুশকিল। এই পদে বসার জন্য সিডিএ’র জনৈক কর্মকর্তা ইতোমধ্যে সরকাররের এক কেন্দ্রীয় নেতাকে দেড়কোটি টাকা উৎকোচ দিয়েছে বলে লোক মুখে চউর হয়েছে। সেই সাথে মন্ত্রণালয়ের এক শক্তিশালী আমলাকেও প্রায় কোটি টাকার মত উৎকোচ প্রদান করেছেন বলে সিডিএর কর্মকর্তা ও কর্মচারিদের মুখে মুখে। যা কিছু রটে তা কিছুনা কিছু বটেই। অথচ এই পদে যে যোগ্যতার প্রযোজন তা কারো কাছেই নেই।
যে কর্মকর্তা উক্ত পদে যেতে এত টাকা উৎকোচ দিয়ে ফেলেছেন তাঁর বিরুদ্ধে বর্তমানে দুর্নীতি দমন কমিশনে মামলা চলামান আছে । এখনো তিনি পদ বাণিজ্যে এগিয়ে আছেন বলে জানা যায়। সিডিএ তে এই সকল দুর্নীতিবাজ অফিসারদের দুর্নীতির বিষয়ে ধারাবাহিকভাবে সংবাদ প্রকাশিত হলেও তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ দৃশ্যমান কোন শাস্তির ব্যবস্থা হয়নি বলে তারা বহাল তরিয়তে আছে। এতে সিডিএ এর প্রশাসনিক ব্যবস্থা অত্যন্ত নাজুক।
নগরের কোন মানুষ বাড়ী করার আগে বাজেট করে সিডিএ তে দুর্নীতিবাজ অফিসারদের কত দিতে হবে। তা না হলে নানা ধরণের হয়রানি হয়ে পরিশেষে নিজের জায়গায় ঘর বাঁধতে গিয়ে আবার নাকি জেলে যেতে হয়।এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে চট্টগ্রাম মহানগর উন্নয়নে সরকার যে পরিকল্পনা করেছে তা বাস্তবায়ন করা আদৌ সম্ভবপর নয়।



