মোঃ মশিউর রহমান ইসাদ, রংপুর: রংপুর নগরীর ১২ নং ওয়ার্ডের ঐতিহ্যবাহী রাধাকৃষ্ণপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের সাম্প্রতি নিয়োগ বানিজ্যের নামে রমরমা ব্যবসার অভিযোগ উঠেছে।
বিদ্যালয়ের একাধিক সমস্যা নিয়ে ও নিয়োগ প্রকাশিত করেন বর্তমান ম্যানেজিং কমিটি। সম্প্রতি নৈশ্য প্রহরী, আয়া ও সহকারী প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ প্রকাশিত হলে দরদামে মেতে উঠেছে বলে অভিযোগ করেন চাকরি প্রত্যাশী ও এলাকার সচেতন জনগণ।
বর্তমান ম্যানেজিং কমিটি ও ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক পূর্বে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এজাজুল হককে একই দুর্নীতি ও নিয়োগ বাণিজ্যের দায়ে সাসপেন্ড করা হয়। একই জায়গায় ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেয় আনারুল ইসলাম বাবুকে কিন্তু এখানেও ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নিয়োগ বানিজ্য ও অর্থ ক্যালেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়ায় তাকেও সাসপেন্ড করা হয়, সেই একই জায়গায় বর্তমান জাহাঙ্গীর আলমকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেয় ম্যানেজিং কমিটি।
কিন্তু একই নিয়মে বিদ্যালয় পরিচালনা করছেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ও ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি। পূর্বের একই কারণে সাসপেন্ড করলেও এবার তার বিপরীত রূপ ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির। সাসপেন্ডের বদলে যেনো নিজের পৈতৃক সম্পত্তি ভাব নিয়ে অর্থ আদায়ের এক অভিনব কৌশল অবলম্বন করছেন সভাপতি ও ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক।
নীতিমালা ২০২১ মোতাবেক রাধাকৃষ্ণপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে ৩টি শূন্য পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয় ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৩ এ, (১) সহকারী প্রধান শিক্ষক (২)নৈশ্য প্রহরী (৩) আয়া পদে।
বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী নিয়োগ পরীক্ষা গত ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৩ তারিখে সদর উপজেলা অফিসে হবার কথা থাকলেও তা সম্পূর্ণ না হওয়ায় পরীক্ষা বাতিল করা হয় বলে জানা যায়।
পরে ২৮ নভেম্বর ২০২৩ এ একই শূন্য পদে পুনঃ নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেন বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, আবারো শুরু হয় সেই পূর্বের নিয়োগ বানিজ্যের কলাকৌশল। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিটি প্রকাশের পরে পরেই দরদামে মেতে উঠে মানিজিং কমিটির সভাপতি ও ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক এমন মন্তব্য করে অভিযোগ করেন পূর্বের নিয়োগ প্রত্যাশীরা।
এদিকে বিদ্যালয়ের নিয়োগ প্রকাশের পর ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি শামসুদ্দিন আজাদ তার নিজের বোন রোকেয়া বেগম (৩২) কে আয়া পদে নিয়োগ দানে জোর তৎপরতা চালায়। যা পূর্বের নিয়োগ প্রত্যাশী মোকারিমা বেগম, তার কাছে ৭ লক্ষ টাকার জায়গায় ৪ লক্ষ টাকা ফাইনাল হয় ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ও সভাপতির সঙ্গে, কিন্তু পরে সভাপতির নিজ বোনকে জালিয়াতি করে বয়স কমিয়ে আয়া পদে আবেদন করান সভাপতি।
এদিকে ৭ জানুয়ারী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটার লিস্ট অনুযায়ী রোকেয়া বেগমের বয়স পাওয়া যায় (৪০)বছর।
অভিযোগে আরো জানা যায়, নৈশ্য প্রহরী পদে যে প্রার্থী বেশী টাকা দিতে সক্ষম হবে তাকে নিয়োগ দেয়া হবে বলে জানান প্রধান শিক্ষক ও সভাপতি। একই পদে একাধিক ব্যক্তির কাছ থেকে অর্থ গ্রহন করছেন বলে জানান নিয়োগ প্রত্যাশী ও এলাকাবাসী।
এবং আয়া পদে সামসুজ্জামান এর সহধর্মিনী মোকারিমাকে নিয়োগ দেয়ার কথা থাকলেও ঘটনা চক্রে গোপন ভাবে নিয়োগ পরীক্ষা সময় নির্ধারণ করে কন্ট্রাক্টকৃত প্রার্থীদের অগোচরে বেশি অর্থপ্রদান প্রার্থীদের নিয়োগ পরীক্ষা নেয়ার আশংকা করছে পূর্বের নিয়োগ প্রত্যাশীরা।
আরো জানা গেছে, নিয়োগ প্রত্যাশী মোকাররিমা বেগম মরহুম সোলেমান মাস্টার বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা সদস্যের ছেলে শ্যামসুজ্জামনের সহধর্মিনী।
এলাকাবাসী জানান, প্রতিষ্ঠাতা সদস্যের পরিবারকেও গত ২৫ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার এভাবে রাস্তায় রাস্তায় মানব্বন্ধন করে এভাবে বিচার চাইতে হবে এটা সত্যি অনেক দুঃখজনক বিষয়।
এলাকাবাসী ও পূর্বের নিয়োগ প্রত্যাশীরা আরো জানান, বিগত দিনে প্রায় ৩০০ শত ছাত্র- ছাত্রীর সংখ্যা থাকলেও বর্তমান রাধাকৃষ্ণপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র- ছাত্রীর সংখ্যা ১০০ জনে নেমে এসেছে।এমতোবস্থায় বিদ্যালয়ের সকল উন্নয়নের ধারা ফিরিয়ে আনার জন্য, এবং নিয়োগ বাণিজ্য বন্ধের দাবিতে ২৫ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার মানব্বন্ধন করেন তারা এবং মোকাররিমার স্বামী শামসুজ্জামান জেলা শিক্ষা অফিস বরাবরে লিখিত অভিযোগও দাখিল করেছেন।
এই অভিযোগ প্রসঙ্গে রাধাকৃষ্ণপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক জাহাঙ্গীর আলম কাজলের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা এখনো কাউকে নিয়োগ দিইনি। পরপর দু’বার নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেও এখনো একটি পদে কোনো আবেদন পড়েনি। এখন যারা অভিযোগ তুলছে তারা আমার কাছে অন্যায় আবদার করেছে। আমি তাদেরকে কোনো ভাবে আশ্বাস দিতে পারিনি বলেই তারা নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ তুলেছে। অথচ নিয়োগ প্রক্রিয়া এখনো শুরু হয়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিদ্যালয়টির ব্যবস্থাপনা কমিটির এক সদস্য জানান, বিদ্যালয়ে তিনটি পদে নিয়োগ দিতে পরপর দু’বার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে। আবেদনের নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও সহকারী প্রধান শিক্ষক পদে কোনো আবেদন জমা হয়নি। তবে আয়া এবং নৈশ্যপ্রহরী পদে অনেকে আবেদন করেছেন। চাকরি প্রত্যাশীদের অনেকেই তদবির করতে চেষ্টা করছে, এটা স্বাভাবিক ঘটনা। তবে নিয়োগ বাণিজ্যের যে অভিযোগ তোলা হয়েছে, তা মোটেও সত্য নয়।
এদিকে বিদ্যালয় ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি শামসুদ্দিন আজাদকে তার মুঠো ফোনে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সমস্ত বিষয়টি মিথ্যা, বিদ্যালয়ের নিয়োগ দেয়ার বিষয়ে তার কোনো হাত নেই এবং এই নিয়োগে কারো কাছে কোনো অর্থ দাবি করেননি তিনি।
আয়া পদে ৭ লক্ষ টাকা চাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে বলেন, সভাপতি এ বিষয় জানার কথা নয়। সেটা ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক জানেন উনি টাকা চেয়েছে কি না, তবে যদি চেয়ে থাকেন তাহলে সেটা খতিয়ে দেখতে হবে।
রোকেয়া বেগমের আবেদনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আবেদন করেছে সেটা যে কেউ করতে পারে। তবে সেটা জালিয়াতি করে বয়স কমানো হয়েছে কি না সেটা দেখার দায়িত্ব শিক্ষা অফিসারের, তারা যাচাই করেই নিয়োগ পরীক্ষা নিবেন, এই বলে তিনি ফোনটি রেখে দেন।
রাধাকৃষ্ণপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের সকল প্রকার নিয়োগ বানিজ্য, দূর্নীতি ও নানান অনিয়মগুলোর বিরুদ্ধে তদন্তের দাবী করেন চাকুরী প্রত্যাশী ও এলাকার জনসাধারণ ।




