এম রুহুল আমিন: ডাঃ জাফরউল্লাহ চৌধুরীর অফুরন্ত শক্তি, উৎসাহ, প্যাশন কাজ করে এই ছুটে চলার পিছনে। সাপ্তাহিক বিচিত্রা ছিল দেশের মধ্যবিত্তের আল্টিমেট প্রকাশনা – বিচিত্রার এনডোর্সমেন্ট ছিল সর্বোচ্চ প্রচারণা। সত্তর দশকের বিচিত্রায় বঙ্গন্ধু, রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, মাওলানা ভাসানী প্রমুখ ছাড়া হাতে গোনা আর যে কজন বিচিত্রার প্রচ্ছদে স্থান পেয়েছিলেন – ডাঃ জাফরউল্লাহ চৌধুরী তাঁদের একজন।
বিচিত্রা এক প্রচ্ছদ করে সোনালী ধানক্ষেতের ব্যাকগ্রাউন্ডে দাঁড়িয়ে আছেন ঝাঁকড়া চুলের তরুণ ডাঃ জাফরউল্লাহ চৌধুরী।ডাঃ জাফরউল্লাহ চৌধুরী বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক পদক – স্বাধীনতা পদক পান আজ থেকে ৪১ বছর আগে – ১৯৭৭ সালে।স্বাধীনতা যুদ্ধের পর মুক্তিযোদ্ধা সংসদ গঠনের লক্ষে প্রথম যে বৈঠক হয় – তা অনুষ্ঠিত হয় ডাঃ জাফরউল্লাহ চৌধুরীর সভাপতিত্বে। পরে অনেক বছর তিনি মুক্তিযোদ্ধা সংসদের প্রধান ছিলেন।
চট্টগ্রামে জন্ম হলেও – ডাঃ জাফরউল্লাহ চৌধুরী বড় হয়েছেন পড়াশোনা করেছেন ঢাকাতে | বকশীবাজার স্কুল, ঢাকা কলেজ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ। ১৯৬৪ সালে তিনি বিলেত চলে যান উচ্চশিক্ষার জন্য এবং জেনারেল ও ভাস্কুলার সার্জারিতে এফ আর সি এস নেন – এর মধ্যে চলে আসে ১৯৭১। ফিরে আসেন দেশে – সাধারণ সৈনিক হিসেবে অস্ত্র হাতে প্রত্যক্ষ যুদ্ধে যোগ দেন | পরে একটা ফিল্ড হাসপাতালের প্রয়োজন দেখা দিলে – গড়ে তোলেন প্রথম ফিল্ড হাসপাতাল – ‘বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতাল’ ! ডাঃ জাফরউল্লাহ চৌধুরী আর আর একজন বিলেত ফেরত একসিডেন্ট ইনারজেন্সি চিকিৎসক ডাঃ মবিন মিলে |
একাত্তরের পর দেশে ফিরে উনি ইচ্ছে করলে ঢাকার প্রধানতম সার্জারি প্র্যাক্টিশনার হয়ে যেতে পারতেন , কিন্তু তা না করে তিনি ফিরে যান গ্রামে- আরেক যুদ্ধ ক্ষেত্রে | গড়ে তোলেন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র | ওনার পাইলট প্রজেক্ট গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র প্রাইমারী কেয়ার কনসেপ্ট মাঠে প্রমান করে এবং এর ভিত্তিতে WHO আর UNO আলমা আটা কনফারেন্সের মাধ্যমে গ্লোবাল ইউনিভার্সাল প্রাইমারী কেয়ার প্রকল্পের ঘোষণা দেয় |
গ্লোবাল প্যারামেডিক যে কনসেপ্ট – তার প্রথম উদ্ভাবক গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র এর ডাঃ জাফরউল্লাহ চৌধুরী! ট্রেইন্ড প্যারামেডিক দিয়ে মিনি ল্যাপারোটমির মাধ্যমে লাইগেশন সার্জারির উদ্ভাবক ডাঃ জাফরউল্লাহ চৌধুরী| এ সংক্রান্ত তাঁর পেপার টা বিশ্ব বিখ্যাত মেডিকেল জার্নাল ল্যানসেট মূল আর্টিকেল হিসেবে ছাপা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের মূল পেডিয়াটিক্স টেক্সট বইয়ের একটা চ্যাপ্টার ডাঃ জাফরউল্লাহ চৌধুরী লিখতেন অনেক বছর ধরে। দেশে বিদেশে ডাঃ জাফরউল্লাহ চৌধুরীর লিখা বই আর পেপার প্রচুর। প্রাইমারি কেয়ার নিয়ে লিখা ওঁনার সম্পাদিত ও প্রকাশিত একটি বই “যেখানে ডাক্তার নেই” একসময় বাংলাদেশের ঘরে ঘরে পাওয়া যেত।
১৯৭৯ সাল থেকেই তিনি জাতীয় শিক্ষা কমিটির ও নারী কমিটির মেন্বার হিসেবে আমাদের শিক্ষা নীতি আর নারী নীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন |
তবে গণস্বাস্থের পর তার ম্যাগনাম ওপাস হচ্ছে ১৯৮২ সালের জাতীয় ঔষুধ নীতি! সমগ্র বিশ্ব আজ অবাক হয়ে গবেষণা করে বাংলাদেশের মতো দেশ কিভাবে এ ধরণের একটা রেডিকেল নীতি কিভাবে বাস্তবায়ন করলো! স্বাধীনতার পর এই ঔষুধ নীতি স্বাস্থ খাতে আমাদের সর্বোচ্চ প্রাপ্তি।
এই সময়ের বাংলাদেশ ওনাকে জেল জরিমানা দিয়ে সম্মান করলেও দেশের বাইরে বিশ্ব মানচিত্রে ডাঃ জাফরউল্লাহ চৌধুরী ব্যাপক ভাবে সমাদৃত। নোবেল এর পর যে সর্বোচ্চ যে আন্তর্জাতিক পুরস্কার – ‘রেমন-ম্যাগস্যাসই এওয়ার্ড’ – ডাঃ জাফরউল্লাহ চৌধুরী তা বিজয়ী!
এই তো সেদিন ও ওনাকে দেখলাম মিছিলের সামনে! দুসপ্তাহ আগে নাগরিক সভায় বক্তা হিসেবে! ওনার শরীর ভালো না অনেকদিন ধরে! আমাদের দেশের কমেডিয়ান বা কবর জিয়ারতের রাষ্ট্রপতিরা – জাস্ট সরকার পয়সা দেবে বলে – অসুস্থ না হলেও চেকআপের জন্য জার্মান, সিঙ্গাপুর ইত্যাদি সফরে যান ৪০ -৫০ জন সফর সঙ্গী নিয়ে! মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও জীবনের শেষ মাসগুলো সিঙ্গাপুরের আইসিইউ তে কাটাবেন!
জাফরুল্লাহ সাহেব মাঝখানে কোভিডের সময় বেশ অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন! বিদেশে যাবার কথা হচ্ছিলো অথবা সিএমএইচ! কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতিবিদ না আমলা বা রাষ্ট্রপতিদের যা নেই – স্পাইন এবং সেলফ রেস্পেক্ট – তা ডাঃ জাফরউল্লাহ চৌধুরীর আছে! ” কভিডের সব পেশেন্ট আমার হাসপাতালে আসছে আর এখানে মারা যাচ্ছে – কোন বিবেচনায় আমি নিজে অন্য হাসপাতালে যাবো?” এই বিবেচনা বোধটা সেই সময় দেশের স্বাস্থ্য বিভাগের হর্তা কর্তা কারোই ছিল না – সবাই সিএমএইচ এ গিয়ে সকাল বিকেল আইভারমেকটিন খাচ্ছিলেন!
ডাঃ জাফরউল্লাহ চৌধুরী আজ মারা গিয়েছেন! নিজের হাসপাতালেই – গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালে! সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে না! আপনাকে রাষ্ট্র কিভাবে মূল্যায়ন করবে আমি জানি না! আমার চোখে আপনি বীরশ্রেঠ!
আপনার আত্মার শান্তি কামনা করছি।
লেখকঃ এম রুহুল আমিন,মানবাধিকার কর্মী ও স্হায়ী কমিটির সদস্য পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদ – পিসিএনপি।



