রাজিব শর্মা: গত দু’বছর ধরে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ম্লান করেছে উৎসবের আনন্দ। দুর্গাপুজো এবং শ্যামাপুজোতেও গত দু’বছর জারি ছিল কঠোর কোভিড বিধিনিষেধ। চলতি বছরে করোনা পরিস্থিতি খানিক স্বাভাবিক হওয়ায় দুর্গাপুজো শেষ হতে না হতেই শ্যামাপুজো নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন মৃৎশিল্পী ও ব্যবসায়ীরা। শ্যামাপুজোতে অশুভ শক্তির বিনাশে আলোর রোশনাই সাজিয়ে তোলা হয় ঘর-বাড়ি। রীতি অনুযায়ী জ্বালানো হয় মাটির প্রদীপ। পুজোর কদিন আগে থেকে রমরমিয়ে বিক্রি হচ্ছে মাটির প্রদীপ।
শ্যামাপুজো মানেই আলোর উৎসব। আর এই পুজোর সময় প্রতিটি বাড়িতে মাটির প্রদীপ জ্বালানোর রীতি আছে। প্রদীপের আলো এক আলাদা মাত্রা যোগ করে শক্তির দেবীর আরাধনায়। পঞ্চপ্রদীপ জ্বালানো হয় দীপাবলীর রাতে। বেশ কয়েক বছর ধরে আধুনিক লাইট থেকে বিভিন্ন ইলেক্ট্রিক প্রদীপে ছেয়ে গিয়েছে বাজার। কিন্তু তারপরেও বাজারে এখনো মাটির প্রদীপের চাহিদা ব্যাপক হারে রয়েছে। কারণ রীতি মেনে এখনো শ্যামাপুজো ও দীপাবলীতে মাটির প্রদীপ জ্বালানো হয়। আর সেই রীতি এখনও বর্তমান।
আজ রবিবার (২৩ অক্টোবর) প্রদীপ কিনতে মানুষের ভীড় লক্ষ্য করা গেল নগরীর বক্সিরহাট ও টেরীবাজারে।
প্রদীপের প্রতি মানুষের আকর্ষণ বাড়াতে তাতেও লেগেছে আধুনিকতার ছোঁয়া। পঞ্চপ্রদীপ সহ একাধিক ধরনের প্রদীপের সমাহার লক্ষ্য করা গেল বাজারে। তাতে আবার রয়েছে বিভিন্ন রঙের বাহার। যা ক্রেতাদের মন ছুঁয়ে যাচ্ছে। দামের দিকেও চিনা লাইটের থেকে অনেকটাই কম দাম এই প্রদীপের। ২ টাকা থেকে শুরু করে ৫০০ টাকা সব রকম দামের প্রদীপ রয়েছে।
গত দু বছর করোনার জন্য তেমন চাহিদা ছিল না।গত দুবছরের তুলনায় চাহিদা অনেকটাই বেড়েছে মাটির প্রদীপ কেনার। তবে এবার চাহিদা অনুযায়ী যোগান দিতে পারছেন না বলেই জানাচ্ছেন বিক্রেতারা। তবে যাই হোক মাটির প্রদীপের জায়গা খুব একটা দখল করতে পারেনি অত্যাধুনিক আলোর রোশনাই। কালীপুজোতে মাটির প্রদীপ জ্বালানোর রীতি এখনও নিজের জায়গা ধরে রেখেছে তা বলাই বাহুল্য।
ঘরে ঘরে প্রদীপ জ্বালানো দীপাবলি উদযাপনের অন্যতম অঙ্গ হলেও পুরনো দিনের কথায় পর্যবসিত হয়েছে মাটির প্রদীপ। প্রায় অতীতের গর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়া এক সামগ্রী মাটির প্রদীপ। প্রদীপকে নির্বাসিত করেছে বাজার ছেয়ে যাওয়া টুনি বালব। ফলে গত বেশ কয়েক বছর ধরেই মাটির প্রদীপ তৈরি করেন যে মৃৎশিল্পীরা তাঁদের জীবিকা ক্রমশ বিপন্ন হয়েছে। আর হু-হু করে কমেছে মাটির প্রদীপের ক্রেতার সংখ্যা।
বাপ-পিতামহের পেশা রক্ষা করতে তবু মৃৎশিল্পীদের একাংশ মাটির প্রদীপ তৈরির কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু ক্রেতাদের তেমন চাহিদা না থাকায় আর্থিক ক্ষতি লেগেই ছিল।
চট্টগ্রামের বাঁশখালী সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, উপজেলার পুকুরিয়া, সাধনপুর, কালিপুর, বৈলছড়ি, জলদি, চাম্বল, পুইছড়িসহ বিভিন্ন এলাকায় এ পেশার সঙ্গে সম্পৃক্ত কয়েকশ মৃৎশিল্পীর পরিবার এখন হাত-পা গুটিয়ে বসে আছেন। বেচাবিক্রি ও পণ্যের চাহিদা না থাকায় তাদের হাতে কোনো কাজ নাই। এসব মাটির তৈরি জিনিসগুলো বিক্রি না হওয়ায় বাঁশখালীর ঐতিহ্যবাহী কুমারপাড়াও এখন অনেকটা নীরব। উপজেলার কয়েকশ মৃৎশিল্পীর পরিবার এখন মানবেতর জীবনযাপন করছে। কেউ কেউ আবার বাপ-দাদার এই পেশা ছেড়ে অন্য পেশা বেঁচে নিতে বাধ্য হচ্ছে।
বাঁশখালী উপজেলার কালিপুরের কুমার পাড়ার অনীল রুদ্র দি ক্রাইমকে বলেন, ‘একটা সময় আমরা পাঁচ ভাইসহ পরিবারের ১৪ জন সদস্য এই মৃৎশিল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। তখন এই শিল্পের চাহিদাও ছিল ব্যাপক। কিন্তু বর্তমান বাজারে এই পণ্যগুলোর চাহিদা না থাকা এবং আয়ের চেয়ে খরচ বেশি হয়ে যাওয়ায় আমরা অন্য পেশা বেছে নিতে বাধ্য হয়েছি। শুধু আমরা নই, আমাদের পাড়ার সবাই এখন অন্য পেশায় জীবিকা নির্বাহ করে জীবনযাপন করে।
ওঁরা জানালেন, তবে মাটির প্রদীপের দিকে ফের ঝুঁকছেন ক্রেতারা। যাঁরা চিনা টুনি ভাল্ব জ্বালিয়ে এতদিন দীপাবলি উদযাপন করেছেন তাঁরাও ফের ঐতিহ্যমুখী হওয়ায় প্রদীপের চাহিদা খানিকটা বেড়েছে। সেইসঙ্গে বাজারে চাহিদা বাড়ছে মাটির পঞ্চপ্রদীপেরও।
দেবদেবীর মূর্তি ইস্তক ওঁরা মাটি দিয়ে নানান ধরনের সামগ্রী তৈরি করেন। ওঁদের কথায়, ‘এবছর মাটির প্রদীপের চাহিদা বেড়েছে। হয়তো ফের সুদিন ফিরবে এই আশাতেই আছি। কিন্তু মাটির প্রদীপ বিক্রির আশায় তো আর পরিবার চলেনা।’
মাটির প্রদীপের প্রতি আগ্রহে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে চকবাজার থেকে আসা ক্রেতা রত্না ধর দি ক্রাইমকে বলেন, অশুভ শক্তি দূর করতে শ্যামাপূজা ও দীপাবলীতে সন্ধ্যায় ও রাতে সনাতন ধর্মালম্বীদেরও প্রতিটি বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্টানে জ্বালানো হয় ঘৃত মাটির প্রদীপ। বর্তমান যে চীনা আলো জ্বালানো হচ্ছে। এটি আমাদের সংস্কৃতি নয়। আমরা আমাদের সংস্কৃতি ও হিন্দুদের ঐতিহ্য ধরে রাখতে চাই।
বোয়াঁলখালী সরোয়াতলী লোকনাথ মন্দির থেকে আগত ক্রেতা শম্ভু নাথ গোঁসাই দি ক্রাইমকে বলেন, হাজারো আধুনিক লাইট থাকলেও আমাদের সংস্কৃতি হলো মাটির ঘৃত প্রদীপ জ্বালানো। মাটি হলো পবিত্র জিনিস। মাটির ঘৃত প্রদীপ প্রজ্জ্বলন করলে জীবনের স্বার্থকথা হয়। একসময় আমাদের পিতামহরা মাটির পাত্রে রান্না করতো। আজ আমরা আধুনিকতার ছোঁয়ায় বদলালেও আমাদের ধর্মীয় সংস্কৃতি তো আর পাল্টাতে পারি না। মাটির জিনিসে কোন জীবাণু নেই। সিলভার, স্টিলে বিভিন্ন ক্ষতিকর পদার্থ আছে। মাটি হলো খাঁটি। তাই এই খাঁটি জিনিসের ব্যবহারে অশুভ শক্তি দূও করথে চাই।
দেওয়ানজী পুকুর পাড় রহমতগঞ্জ থেকে আসা মাটির প্রদীপ ক্রেতা স্বপ্না ধর দি ক্রাইমকে বলেন, আমরা দয়াময়ী কালী বাড়িতে পূজা করি। গতকাল ২৮টি মাটির প্রদীপ কিনলাম। আজ ৩টি কিনলাম। মাটিতো খাঁটি। শ্যামাপূজা ও দীপাবলির পঞ্চপ্রদীপে তো আর ইলেকট্রিক লাইট ব্যবহার করতে পারি না। লাইটতো আর্টিফিশিয়াল। সবকিছু ডিজিটাল হতে পারে। আমরা মাটির মানুষ। আমাদেরকে ঐতিহ্য রক্ষা করতে হবে। কাজেই আমরা মাটির প্রদীপ ব্যবহার করি।
সবকিছুর দাম বাড়লেও মাটির প্রদীপের দাম বাড়ে না কেন এক প্রশ্নের উত্তরে আদিত্য ষ্টোরের বাবুল নাথ দি ক্রাইমকে বলেন, সবকিছুর দাম বাড়লেও আমরা দাম বাড়িয়ে নিতে পারি না। গত পাঁচ বছর আগের যে দাম এখনো সে দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। পরিবহন খরছ, কর্মচারী বেতন, বিদ্যুৎ বিলসহ যাবতীয় খরছের সাথে সমন্বয় করে বিক্রি করলে একটি মাটির প্রদীপের দাম হতে হবে ৫ টাকা অথচ আমরা সেই ২ টাকায় বিক্রি করতেছি। ক্রেতারা বাড়তি দিতে চায় না। ইলেকটনিক্স বাতিতে ক্রেতারা চড়া দামে কিনতে পারে অথচ মাটির প্রদীপ বলে অবহেলা।
বক্সিরহাটের মাটির জিসিসের পুরোনো ব্যবসায়ী মোহনা ষ্টোরের স্বত্বাধিকারী অরুণ কান্তি নাথ দি ক্রাইমকে বলেন, মাটির জিনিসের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। বিগত ৫ বছর ধরে এমন আগ্রহ দেখিনি। আমরা অনেকবছর ধরে মাটির পণ্য নিয়ে কাজ করছি। আমরা চাইনিজ লাইট বিক্রি করি না। হাজারো আধুনিক লাইট বের হলেও মাটির প্রদীপের জনপ্রিয়তা হারাবে না।
গতবছরের চেয়ে এই বছরের ক্রেতার উপস্থিতি বেশি কিনা এক প্রশ্নের জবাবে তিনি দি ক্রাইমকে বলেন, গত বছরের চেয়ে এই বছরের চাপ দ্বিগুণ বেড়েছে। আগে মাটির প্রদীপের একাধিক দোকান থাকলেও বতর্মান ১০ থেকে ১২টি দোকানে বিক্রি হয়। আগে মাটির জিনিসের ব্যবহার বেশি ছিল, বর্তমান আধুনিকতার ছোঁয়ায় কিছুটা ভাঁটা পড়ছে। তাছাড়া এসব বানানোর লোকও কমে আসছে।
সবকিছুর দাম বাড়লেও মাটির প্রদীপের দাম স্থিতির কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি দি ক্রাইমকে বলেন, মাঝখানে আধুনিকতার ছোঁয়ায় মাটির প্রদীপের ব্যবহার একটু কমলেও এখন বাড়ছে। আগে যেখানে ১০০ বানাতো এখন তা হাজারের উপওে বানাতে হয়। কাজেই মৃৎশিল্পীরা তাদের পুরোনো ব্যবসার মার্কেট ধরে রাখতে দাম বাড়াচ্ছে না বলে জানান এ ব্যবসায়ী।
বাঁশখালী থেকে আসা মাটির প্রদীপ ব্যবসায়ী সুবল রুদ্র দি ক্রাইমকে বলেন, শহরের মানুষ একটু শৌখিন হন, এখানে নতুন ধরনের রংদার মাটির প্রদীপের চাহিদা রয়েছে। তাই এখানে বারবার ছুটে আসি এই ধরনের প্রদীপ বেঁচতে।
মোমবাতির বাজার চড়া, কমছে ক্রেতার চাপ:
অন্যধিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসহ বিভিন্ন পন্যের পাশাপাশি বাড়ছে মোমবাতির দাম। মোমবাতির দাম বাড়লেও কমেছে ক্রেতার চাপ।
বক্সিরহাট মোমবাতি ব্যবসায়ী আলী ষ্টোরের আব্বাস আলী দি ক্রাইমকে বলেন, মোমের দাম টনে ৪০ হাজার টাকা বাড়ছে। যার কারনে বাড়তি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। মোমের দাম বাড়ার কারনে ক্রেতার উপস্থিতি আগের চেয়ে অনেক কমেছে।
চকবাজার থেকে আসা মোমবাতি ক্রেতা রুবেল দাশ দি ক্রাইমকে বলেন, মোমবাতি বেশি কিনতে পারিনি। যে মোমবাতি ডজন ৫০ টাকা বিক্রি করতো তা এখন ৮০ টাকা। এত দামে মোমবাতি কেনা সম্ভব না।




