যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের জয় এবং কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর দেশটির শেয়ারবাজারে বড় ধরনের ইতিবাচক সাড়া দেখা গেছে। নির্বাচনের পর বুধবার ডাও জোন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাভারেজ দেড় হাজার পয়েন্টের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ ও নাসডাক কম্পোজিট সূচকেও উল্লেখযোগ্য উত্থান লক্ষ্য করা গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, বাজারের এই ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া মূলত রাজনৈতিক ভারসাম্য এবং প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার ওপর কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনার সঙ্গে সম্পর্কিত।
প্রাথমিকভাবে ভোটের পর বাজারে শেয়ার বিক্রির চাপ তৈরি হলেও পরবর্তীতে বিনিয়োগকারীরা নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতির সম্ভাব্য প্রভাব মূল্যায়ন করে বিনিয়োগ বাড়িয়েছেন। এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক গত তিন মাসের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী দৈনিক প্রবৃদ্ধি রেকর্ড করেছে, আর ডাও জোন্সের উত্থান ছিল প্রায় ৩ শতাংশ। বিনিয়োগকারীদের ধারণা, বিভক্ত সরকার বড় ধরনের নীতিগত পরিবর্তনের গতি কমিয়ে দিতে পারে, যা প্রশাসনের শুল্ক আরোপ, ঘাটতি বাজেট এবং ইরান সংঘাতের মতো বিষয়ে অনিশ্চয়তা কমাতে সাহায্য করবে। ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে কংগ্রেস থাকায় ট্রাম্পের পক্ষে বড় ধরনের কর, ব্যয় ও নীতিগত পরিবর্তন সহজে অনুমোদন করানো কঠিন হতে পারে।
তবে এই নির্বাচনের প্রভাব সব খাতে সমান নয়। ডেমোক্র্যাটরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, প্রযুক্তি কোম্পানি এবং ডিজিটাল সম্পদের ওপর কঠোর নজরদারির দাবি তুলতে পারে বলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। এর ফলে এআই অবকাঠামো, ডেটা সেন্টার নির্মাণ, জ্বালানি ব্যবহার এবং এআই অবকাঠামোর সম্প্রসারণে নতুন বিধিনিষেধের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে বাজারের এই প্রতিক্রিয়া ছিল মিশ্র। মাইক্রোসফট, অ্যামাজন, অ্যালফাবেট ও মেটার মতো বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম বেড়েছে। বিনিয়োগকারীদের একাংশের ধারণা, ডেটা সেন্টার সম্প্রসারণের গতি কমলে প্রতিষ্ঠিত ক্লাউড কম্পিউটিং ব্যবসাগুলো সুবিধা পেতে পারে। অন্যদিকে, হাট ৮, আইআরইএন, কোর সায়েন্টিফিক ও অ্যাপ্লাইড ডিজিটালের মতো ডেটা সেন্টার পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারে চাপ দেখা গেছে। সেমিকন্ডাক্টর সূচক কমেছে ৩ দশমিক ১ শতাংশ, যা ছয় মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে। টেসলার শেয়ারের দামও কমেছে। প্রতিরক্ষা খাতের কোম্পানিগুলোর মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, কারণ ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ১ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা বাজেট কংগ্রেসে বাধার মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিনিয়োগকারীরা।
নির্বাচনের পর সবচেয়ে বড় পরিবর্তন দেখা গেছে তেলের বাজারে। বুধবার অপরিশোধিত তেলের দাম ৮ শতাংশের বেশি কমে প্রতি ব্যারেল প্রায় ৯৫ ডলারে নেমে এসেছে। মার্কিন অপরিশোধিত তেলের দামেও বড় পতন ঘটে। বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, ডেমোক্র্যাটদের জয় ইরান সংঘাত বন্ধে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়াতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতির চাপও তৈরি হয়েছিল। তেলের দাম কমলে সাধারণ ভোক্তা ও ব্যবসায়ীরা জ্বালানি খরচে স্বস্তি পেতে পারেন। পাশাপাশি পরিবহন ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির চাপ কমার সম্ভাবনাও রয়েছে। তবে তেলের বাজারের এই ইতিবাচক পরিবর্তন অনেকটাই মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত প্রশমনের প্রত্যাশার ওপর নির্ভর করছে। অঞ্চলটিতে উত্তেজনা বাড়লে তেলের দাম আবারও বেড়ে যেতে পারে। ফলে নির্বাচনের পর বাজারে তৈরি হওয়া স্বস্তি কতটা স্থায়ী হবে, তা নির্ভর করছে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর।




