*প্রশাসনের নির্লিপ্ততায় মাদকের বিস্তার ও কিশোর গ্যাং সৃষ্টির অভিযোগ
*অভিযান করে মাদকে জড়িতদের গ্রেপ্তার ও সচেতনতায় করা হচ্ছে র্যালী ও সভা-সমাবেশ-ওসি
সুকান্ত বিকাশ ধর, সাতকানিয়া: চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় ইয়াবা ব্যবসার প্রসারে কিশোর গ্যাং এর আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিরোধে কিশোর গ্যাং সদস্যের উপর্যুপরি ছুরিকাঘাতে তাহমিদুল হাসাম হামীম (১৯) নামে এক তরুণকে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। মঙ্গলবার (০৮ সেপ্টেম্বর) রাতে উপজেলার কেরানীহাট সিটি সেন্টারের মারামারির একপর্যায়ে ছুরিকাঘাতের ঘটনা ঘটে।
এ ঘটনায় অভিযুক্ত মো. রোহান উদ্দিনকে (১৯) ঘটনার রাতেই উপজেলার ঢেমশা ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের দোহাজারী-কক্সবাজার রেল লাইন সংলগ্ন মাস্টার বাড়ি এলাকা থেকে জনতা আটক করে গণপিটুনি দিয়ে পুলিশে সোপর্দ করেন। নিহত হামীম উপজেলার ছদাহা ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের হাসমত আলী সিকদার দোকানের পার্শ্ববর্তী আলী হাদি বাড়ির মৃত ফরিদুল আলমের ছেলে,গ্রেপ্তারকৃত রোহান একই ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সৈয়দাবাদ কাজিরখীল এলাকার ওসমান গণির ছেলে।
অপরদিকে, ছদাহার হাসমত আলীর দোকান এলাকাটি মাদকের হট স্পটে পরিণত হয়েছে অনেক আগেই। মাদক বিকি-কিনি বন্ধ ও জড়িতদের গ্রেপ্তারে প্রশাসনের নির্লিপ্ততায় মাদকের বিস্তার ও কিশোর গ্যাং এর সৃষ্টি হয়েছে। তা ক্রমেই বেড়ে চলছে। ফলে ওই এলাকার লোকজন অনেকটা নিরাপত্তাহীনতায় কালযাপন করছেন বলে এলাকাবাসী জানিয়েছেন।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও এলাকাবাসী সূত্রে জানা যায়, সোমবার (০৭ সেপ্টেম্বর) সকালে গ্রেপ্তার রোহান আমিরাবাদ এলাকায় যাচ্ছিলেন। ওই সময় তার প্রতিবেশী শাহানুরসহ আরও কয়েকজন তার সঙ্গে একটি গাড়িতে উঠেন। পথিমধ্যে ইয়াবা ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ ও প্রসারকে কেন্দ্র করে নিহত হামীমের সঙ্গে শাহানুর ও অন্যান্যদের মারামারি হয়। সেখানে হামীম মারধরের শিকার হন। ওই সময় রোহান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেন। কিন্তু এতে হামীমের ধারণা, রোহানের ইন্দনে তাকে মারধর করা হয়েছে। তাই তাকে পরবর্তীতে দেখে নেওয়ার হুমকি দেয় হামীম।
আরও জানা যায়, পরবর্তীতে হামীমের নেতৃত্বে ১০ থেকে ১২ জনের একটি গ্রুপ দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হাসমত আলীর দোকান এলাকায় মহড়া দেয়। সেখান থেকে তারা (হামিম এর গ্রুপ) গ্রেপ্তার রোহানকে শক্তি প্রদর্শনে কাজিরখীলে গিয়েও মহড়া দেয়। সর্বশেষ মঙ্গলবার রাতে বিষয়টি মীমাংসার জন্য তারা সবাই কেরানীহাট সিটি সেন্টারে জড়ো হন। সেখানে তর্কাতর্কির একপর্যায়ে প্রথমে হামীম লোহার রড দিয়ে রোহানের হাতে আঘাত করে। এর পরপরই রোহান রাগান্বিত হয়ে তার সাথে থাকা ধারালো ছুরি দিয়ে হামীমের পেটে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত করে ঘটনাস্থল থেকে দ্রুত সটকে পড়েন। এসময় হামিমের পেটের নাড়িভুঁড়ি বের হয়ে যায়।
এ সময় সেখানে উপস্থিত কিশোর গ্যাং এর একাংশ আহত হামীমকে উদ্ধার করে কেরানীহাটের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করান এবং অপর অংশটি গ্রেপ্তার রোহানকে ধাওয়া করে আটকে গণপিটুনি দিয়ে পুলিশে সোপর্দ করে। এদিকে, হামীমের অবস্থা সংকটাপন্ন হওয়ায় কর্তব্যরত চিকিৎসক প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে প্রেরণ করলে পথিমধ্যে তার মৃত্যু হয়।
গণপিটুনির পর রোহান উদ্দিন স্থানীয়দের নিকট ছুরিকাঘাতের স্বীকারোক্তিতে দিয়ে একটি ভিডিও বার্তায় বলেন, হামীমের সঙ্গে আমাদের এলাকার ছেলেদের সঙ্গে ঝামেলা থাকলেও আমার সঙ্গে কোন ঝামেলা নেই। আমি আমিরাবাদ যাওয়ার সময় আমাদের পাড়ার কয়েকজন ছেলে আমার সঙ্গে গাড়িতে উঠে। পথিমধ্যে তারা হামীমের সঙ্গে মারামারি দেয়। ওই সময় মধ্যস্থতা করে তাদেরকে শান্ত করি। এরপর হামীমকে একটি কিরিচ নিয়ে হাঁটতে দেখা যায়। সর্বশেষ কেরানীহাট সিটি সেন্টারে হামীম আমাকে হাতে লোহার রড দিয়ে আঘাত করলে আমি রাগান্বিত হয়ে তাকে ছুরিকাঘাত করেছি।
ঢেমশা ইউনিয়নের ব্যবসায়ী শাহেদুল ইসলাম বলেন, প্রথমে স্থানীয়রা অভিযুক্ত রোহানকে আটক করে গণপিটুনি দেয়। এরপর সাতকানিয়া সার্কেল অফিসার মো. আরিফুল ইসলাম সিদ্দিকীকে খবর দেওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই এসআই জহির আমিন, মাহাবুবুল করিম ও সাইদুল ঘটনাস্থলে আসেন এবং রোহানকে তাদের নিকট হস্তান্তর করা হয়।
নিহতের মামা মো. মহিউদ্দিন বলেন, হামীম ও তার বন্ধুদের মধ্যে একটা বিরোধ সৃষ্টি হয়েছিল। আমার ভাগিনা বিরোধটি মীমাংসার জন্য কেরানীহাট সিটি সেন্টারে গিয়েছিল। সেখানেই মারামারির ঘটনা ঘটেছে।
তিনি বলেন, হামিম বিগত বছর এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেনি। বাবা না থাকার সুযোগে সে বাজে আড্ডায় যোগ দেয়। তাকে বাজে সঙ্গ থেকে বাঁচাতে প্রবাসে পাঠানোর জন্য পাসপোর্টও তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দুনিয়া থেকে চলে গেলো। তার বিবাহিত দুই বোন রয়েছে। আমরা এ ঘটনায় দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।
হাসমত আলী দোকান এলাকায় খোঁজ নিয়ে ও এলাকার লোকজনের সাথে কথা বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি বর্ণনা করেছেন মাদকের ভয়াবহতা সম্পর্কে।
এব্যাপারে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ষাটোর্ধ ও চল্লিশ বছর বয়সী বৃদ্ধারা জানান, এক সময় আমাদের এলাকায় মাদকের উপদ্রব তেমন ছিল না। বছর-দুয়েক আগে থেকে মাদক বেড়ে গেছে। এলাকাটি এখন মাদকের হট স্পষ্টে পরিণত হয়েছে। এ ব্যবসাকে পুঁজি করে সৃষ্টি হয়েছে কিশোর গ্যাং। আবার মাদক টিকিয়ে রাখতে কিশোর এর সদস্যরা প্রায় সময় লিপ্ত হচ্ছে মারামারিতে। মূলত মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিতে ও আধিপত্যের বিস্তারের দ্বন্দ্বে এ হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হয়েছে। এতে প্রশাসন নির্লিপ্ত না থেকে দ্রুত এবং কার্যকরী উদ্যোগ নিলে আজকে আমাদের এ অবস্থা দেখতে হতো না।
তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, প্রশাসন জানে এ এলাকায় কারা মাদক ব্যবসা ও মাদক সেবনের সাথে জড়িত। প্রশাসন আন্তরিক হলে কোন দিন মাদকে জড়িতরা এলাকাটা ধ্বংস করতে সাহস পেত না। যার ফলে অভিভাবকরা উঠতি বয়সী সন্তানদের নিয়ে খুবই উদ্বীগ্ন হয়ে পড়ছে। এজন্য অনেকেই এলাকা ছেড়ে অন্যত্র বসবাসের চিন্তা শুরু করে দিয়েছে। ইতোমধ্যে অনেকেই চলেও গেছে।
ছদাহা ৪ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো.আইয়ুব অসহায়ের সুরে বলেন, আমাদের সামর্থ্যে মাদক বন্ধ করা সম্ভব নয়। প্রশাসনকে আরও আন্তরিক হতে হবে। প্রশাসন আমাদের সাহস দিলে জনগণকে সাথে নিয়ে আমরা মাদক প্রতিরোধে এগিয়ে যাব। তাই মাদকের বিরুদ্ধে দ্রুত সময়ের মধ্যে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
সাতকানিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ঘটনার মূল অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সে ঘটনার সরাসরি জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে। নিহতের লাশ ময়নাতদন্তের জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। নিহতের স্বজনরা মামলা দিলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এক প্রশ্নে ওসি বলেন, শুধু হাসমত আলী সিকদারের দোকান নয় ; আমরা প্রতিদিন মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করে মাদক কারবারি গ্রেপ্তার পরবর্তী আদালতের নিকট সোপর্দ করছি। মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান পরিচলানার পাশাপাশি মাদক বন্ধে এলাকাবাসীকে সচেতন করতে থানা পুলিশের পক্ষ থেকে ইউনিয়নে ইউনিয়নে র্যালী ও সভা-সমাবেশ করা হচ্ছে।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সাতকানিয়া সার্কেল) মো. আরিফুল ইসলাম সিদ্দিকী বলেন, প্রাথমিকভাবে আমরা জানতে পেরেছি, পূর্ব বিরোধের জেরে এ ঘটনা ঘটেছে। তবে বিরোধের মূল কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে এ ঘটনায় আরও কেউ জড়িত আছে কিনা এবং কারো ইন্ধন ছিল কি না সেটিও খতিয়ে দেখতে তদন্ত চলছে। এ ছাড়াও গ্রেপ্তার রোহানকে জিজ্ঞাসাবাদ করে ঘটনার মূল কারণ ও বিস্তারিত তথ্য জানার চেষ্টা চলমান রয়েছে।




