মিজবাউল হক, চকরিয়া : কক্সবাজারের চকরিয়া পৌরশহরের চিরিঙ্গা সোসাইটি এলাকায় মহাসড়কের দু’পাশের ফুটপাত দখল করে দখলবাজ চক্র ভাসমান দোকান এবং অবৈধ পরিবহন কাউন্টার বসিয়ে রমরমা বাণিজ্য চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ভাসমান দোকান ও সড়কের উপর যততত্র পরিবহন কাউন্টার গুলোর কারণে সাধারণ পথচারীদের চলাচল চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
অভিযোগ উঠেছে, ফুটপাতে হকার ও বিভিন্ন দোকানপাট বসার কারণে পথচারী জনগণকে বাধ্য হয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মূল সড়ক দিয়ে হাঁটতে হচ্ছে। এভাবে মহাসড়ক ও সংযোগ সড়কের ওপর অবৈধ দোকান, সিএনজি অটোরিকশা ও টমটম গাড়ির কারণে চিরিঙ্গা সোসাইটি এলাকা সংকুচিত হয়ে দিনের বেলায় দীর্ঘ সময় তীব্র যানজট লেগেই থাকছে। জরুরি কাজে চলাচলকারী পথচারী, স্কুল কলেজ মাদরাসা পড়ুয়া শিক্ষার্থী এবং সরকারি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা-যাওয়া করা মুর্মুষ রোগীকে চরম দুর্ভোগ ও দুর্দশা পোহাতে হচ্ছে। পাশাপাশি মহাসড়ক ও সংযোগ সড়ক সংকুচিত হয়ে পড়ার কারণে প্রতিনিয়ত ছোট-বড় দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে পৌরবাসী।
অপরদিকে সড়কের দু’পাশের ড্রেনের ওপর অবৈধভাবে দোকানপাট বসিয়ে বাণিজ্য করা এবং সেখানে বর্জ্য ফেলায় শহরের পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। থানা পুলিশ ও পৌর প্রশাসনের উদাসীনতার সুযোগে দখলবাজ চক্রের সদস্যরা ইদানীং বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। এমন প্রেক্ষাপটে ভেঙে পড়েছে চকরিয়া পৌরশহরের ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা। এতে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়ে প্রতিনিয়ত নগরীর সৌন্দর্যও হারাতে বসেছে। সবমিলিয়ে এখন যানজটে অচল হয়ে পড়েছে চকরিয়া পৌরশহর।
সরেজমিনে দেখা যায়, চকরিয়া পৌরশহরের চিরিঙ্গা পুরাতন বাসস্ট্যান্ড (জনতা মার্কেট রোড), সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় রোড (জনতা শপিং কমপ্লেক্স মোড়), পুরাতন এস আলম কাউন্টার, চকরিয়া নিউ মার্কেট রোড, সোসাইটি কাঁচাবাজার রোড, চকরিয়া সরকারি হাসপাতাল সড়ক ও থানার রাস্তা মাথা থেকে পৌর বাস টার্মিনাল পর্যন্ত এক কিলোমিটার মহাসড়কের দু’পাশের ফুটপাত দখল করে কমপক্ষে তিন শতাধিক অবৈধ ভাসমান দোকান বসিয়ে বিভিন্ন ধরনের মালামালের পসরা সাজিয়ে ব্যবসা করছেন দোকানীরা।
জানা গেছে, চকরিয়া পৌরশহরের ব্যস্ততম বাণিজ্যিক এলাকা এবং গুরুত্বপূর্ণ সড়ক হিসেবে বিবেচিত। এই সড়কগুলোতে প্রতিদিন শতশত বিভিন্ন প্রকার যানবাহন ও হাজারো পথচারী চলাচল করে। ফুটপাতগুলো দখল হয়ে যাওয়ায় পথচারীরা সড়কের ওপর দিয়ে চলাচল করতে বাধ্য হচ্ছে। ফলে প্রতিদিন সকাল থেকে রাত অবধি যানজটে নাকাল হচ্ছে পৌরবাসী।
অপরদিকে, সোসাইটি কাঁচাবাজার সড়কে ভাসমান দোকান বাণিজ্য এবং বিভিন্ন পন্যবাহি ট্রাক থেকে দিনের বেলায় মালামাল উঠানামা করার কারণে চকরিয়া সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, চকরিয়া আবাসিক মহিলা কলেজ ও চকরিয়া কোরক বিদ্যাপীঠ স্কুলের হাজারো শিক্ষার্থীর চলাচলে চরম বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছে। অন্যদিকে ওয়াপদা সড়কের উপর অবৈধ ভাসমান দোকান বসিয়ে তরিতরকারি বেচাকেনার কারণে কোথায় আগুন লাগলে সেখানে গিয়ে বিদ্যুৎ সংযোগ লাইন বন্ধ করতে যেতে পারে না পিডিবি বিভাগের লোকজন ও গাড়ি।
নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলন (নিসচা) কক্সবাজার জেলা কমিটির সভাপতি চকরিয়া পৌরশহরের বাসিন্দা সাংবাদিক জসিম উদ্দিন কিশোর বলেন, অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছে, চকরিয়ায় আইন আদালত নেই, প্রশাসন নেই, না হলে কীভাবে চকরিয়া পৌর বাসটার্মিনাল থেকে জনতা মার্কেট পর্যন্ত সড়কের দু’পাশের ফুটপাত দখল করে ভাসমান দোকান বসিয়ে এবং ফুটপাত সংলগ্ন সড়কের ওপর কাপড়, জুতা-স্যান্ডেল, বিভিন্ন ধরনের ফলের দোকান, মনোহারি সামগ্রী, টি-স্টল, পুরি-শিঙাড়া, মাছ-তরকারিসহ বিভিন্ন ধরনের মালামাল নিয়ে দিব্যি ব্যবসা করছে।
তিনি বলেন, পৌরশহরের এতগুলো ব্যস্ততম সড়কের ফুটপাত ও সড়কের অংশ বিশেষ দখল হয়ে পড়ার কারণে যানবাহন ও পথচারী চলাচলে মারাত্মক বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছে। স্বাভাবিক চলাচলে পথচারী জনগণকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
চকরিয়া উপজেলা পরিবেশ সাংবাদিক ফোরামের সভাপতি সাংবাদিক মাহমুদুর রহমান মাহমুদ বলেন, চকরিয়া পৌরশহরের ফুটপাত জবর দখলের সঙ্গে ফল ব্যবসায়ী সমিতির কিছু লোভী প্রকৃতির নেতা জড়িত। এক সময় তারা পৌরসভা থেকে অঘোষিত ভাবে ফুটপাত ইজারা নিয়ে ভাসমান দোকান বসিয়ে বাণিজ্য করতো।
তবে এখন পৌরসভা থেকে ফুটপাত ইজারা দেওয়া বন্ধ আছে। তারপরও আগের কায়দায় ফল সমিতির নেতারা ভাসমান দোকান বসিয়ে অবৈধ বাণিজ্য অব্যাহত রেখেছে। একইভাবে ফুটপাত বেচাকেনার সঙ্গে অনেক মার্কেট মালিক এবং মার্কেটের সামনের অংশের দোকানীরাও জড়িত।
তিনি বলেন, পৌরশহরের যানজট নিরসনে উপজেলা প্রশাসন ও পৌর কর্তৃপক্ষ মাঝে মধ্যে অভিযান চালিয়ে অবৈধ ভাসমান দোকান উচ্ছেদ করে থাকে। আবার উচ্ছেদ অভিযানের পর সংশ্লিষ্টদের উদাসীনতা ও নজরদারির অভাবে কিছু সময় পর তা আবার দখল হয়ে যায়।
ফুটপাতের একাধিক দোকানী পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেন, দোকান বসিয়ে ব্যবসা করতে গিয়ে আমাদেরকে প্রতিদিন চাঁদা দিতে হয়। দোকান ভিত্তিক চাঁদার টাকা ফল সমিতির নেতাদের নিয়োজিত লোকজন উত্তোলন করে। তাদের সঙ্গে সরকার দল সমর্থিত কিছু নেতা আগেও জড়িত ছিল, এখনও জড়িত আছে। মূলতঃ চকরিয়া পৌরশহরের ফুটপাতের ব্যবসা নিয়ে একটি সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে।
চকরিয়া পৌরসভার বাজার শাখার অফিসার মো. জানে আলম বলেন, পৌরসভা থেকে এখন চকরিয়া পৌরশহরের ফুটপাত ইজারা দেওয়া বন্ধ রয়েছে। তবে কিছু লোক সমিতির নাম ভাঙ্গিয়ে ফুটপাতের ওপর ভাসমান দোকান বসিয়ে অবৈধভাবে বাণিজ্য করছেন। অবশ্য পৌরসভা থেকে ইতোমধ্যে অনেকবার অভিযান চালিয়ে বসানো এসব অবৈধ ভাসমান দোকান উচ্ছেদ করা হয়েছে।
চকরিয়া পৌরসভার প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহীন দেলোয়ার বলেন, চকরিয়া পৌরশহরের ফুটপাত জবরদখল উচ্ছেদ ও যানজট নিরসনে গত মাসে উপজেলা পরিষদের আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শিগগিরই অবৈধভাবে ফুটপাত দখলকারীদের বিরুদ্ধে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। উপজেলা প্রশাসনের মোবাইল কোর্ট প্রয়োজনে জড়িতদের একসঙ্গে জেল-জরিমানা করবে।




