#দাবি না মানলে বৃহত্তর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি বন্দর রক্ষা কমিটি’র
রাজিব শর্মা: যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পাদিত বাণিজ্য চুক্তি বাতিল এবং চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা না দেওয়ার দাবিতে চট্টগ্রামে মানববন্ধন করেছে বন্দর রক্ষা কমিটি।
আজ বুধবার(০১ জুলাই) বেলা ১১টায় চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সামনে আয়োজিত কর্মসূচিতে সংগঠনের নেতারা অভিযোগ করেন, বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে গত ০৯ ফেব্রুয়ারি আমেরিকার সাথে একটি একতরফা বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করেন, যা বাংলাদেশের অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বকে চরম হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। আমেরিকা তাদের বাণিজ্য ঘাটতি পূরণের অজুহাতে এই চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের ওপর শুল্ক ও অন্যান্য অসম শর্ত চাপিয়ে দিয়েছে। চুক্তিটির বিভিন্ন শর্ত দেশের অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা, কৃষি, শিল্প এবং জাতীয় সার্বভৌমত্বের জন্য দীর্ঘমেয়াদে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বক্তারা বলেন, চুক্তির আওতায় বাংলাদেশকে দীর্ঘমেয়াদে উচ্চমূল্যে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও বিপুল পরিমাণ কৃষিপণ্য আমদানির বাধ্যবাধকতায় পড়তে হতে পারে। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়বে এবং দেশীয় কৃষি, পোল্ট্রি ও ডেইরি শিল্প প্রতিযোগিতায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে তারা দাবি করেন।
বক্তারা আরও বলেন, আগামী ১৫ বছর আন্তর্জাতিক বাজারদরের চেয়ে চড়া দামে আমেরিকা থেকে কমপক্ষে ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকার এলএনজি (তরল গ্যাস) আমদানি করতে হবে। এছাড়া ৩৫০ কোটি ডলার (৪২ হাজার কোটি টাকা) মূল্যের কৃষিপণ্য কিনতে হবে। যার মধ্যে রয়েছে প্রতি বছর ৭ লাখ টন গম এবং কয়েক গুণ বেশি দামে ২৬ লাখ টন সয়াজাত পণ্য ও তুলা। দেশীয় ডেইরি ও পোল্ট্রি শিল্পখাতের মধ্যে গরুর মাংস, দুগ্ধজাত পণ্য ও পোল্ট্রি পণ্য আমদানির বাধ্যবাধকতার কারণে দেশের বিকাশমান পোল্ট্রি ও ডেইরি শিল্প ধ্বংসের মুখে পড়বে এবং লাখো মানুষ কর্মসংস্থান হারাতে পারে। আর বাংলাদেশকে ৬ হাজার ৭১০টি মার্কিন পণ্যে শুল্ক-ছাড় দিতে হবে, বিপরীতে বাংলাদেশ সুবিধা পাবে মাত্র ১ হাজার ৬৩৮টি পণ্যে। এর ফলে বাংলাদেশ বছরে ১ হাজার ৩২৭ কোটি টাকার আমদানি শুল্ক হারাবে। এছাড়া কোনো টেন্ডার ছাড়াই আমেরিকার বোয়িং কোম্পানি থেকে ৪৫ হাজার ৪০৮ কোটি টাকা (৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার) ব্যয়ে ১৪টি বিমান কেনার চুক্তি ইতিমধ্যে গত এপ্রিলে সম্পন্ন হয়েছে। একই সাথে আমেরিকা থেকে অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম কেনা বাড়ানোর শর্তও রয়েছে।
চুক্তির এমন শর্তানুযায়ী, দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোতে ভর্তুকি দেওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এর ফলে জ্বালানি তেল, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও কৃষিতে ভর্তুকি কমায় সাধারণ মানুষকে চড়া মূল্য দিতে হবে। অথচ আমেরিকা নিজের দেশে বিপুল ভর্তুকি দিয়ে থাকে। এছাড়া, মার্কিন স্বার্থেও ক্ষতি হয় এমন কোনো দেশ (যেমন চীন, রাশিয়া) এর সাথে বাংলাদেশ কোনো চুক্তি করতে পারবে না – যা সরাসরি দেশের সার্বভৌমত্বের ওপর নগ্ন হস্তক্ষেপ বলে মনে করছেন সংগঠনটির বক্তারা।
তাদের ভাষ্য, শুল্ক-সুবিধার ক্ষেত্রে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হলে সরকারের রাজস্ব আয়েও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি সীমিত করার শর্ত কার্যকর হলে জ্বালানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও কৃষি খাতে সাধারণ মানুষের ব্যয় আরও বাড়তে পারে বলেও তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
বক্তারা আরও বলেন, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাংলাদেশের স্বাধীন অবস্থান অক্ষুণ্ন রাখতে হবে। কোনো আন্তর্জাতিক চুক্তির মাধ্যমে দেশের কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা সীমিত হওয়ার সুযোগ থাকা উচিত নয় বলেও তারা মন্তব্য করেন।
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার বিষয়ে চলমান উদ্যোগ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন সংগঠনের নেতারা। তারা বলেন, দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরের লাভজনক টার্মিনাল বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা না দিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় পরিচালনা অব্যাহত রাখা উচিত।
মানববন্ধন থেকে সরকারের প্রতি কয়েকটি দাবি জানানো হয়। এর মধ্যে রয়েছে বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পাদিত গুরুত্বপূর্ণ চুক্তিগুলো জনসম্মুখে প্রকাশ, জাতীয় সংসদে সেগুলো নিয়ে পূর্ণাঙ্গ আলোচনা এবং জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী মনে হলে প্রয়োজনীয় পুনর্বিবেচনা বা বাতিলের উদ্যোগ গ্রহণ।
কর্মসূচির শেষাংশে সংগঠনের নেতারা বলেন, উত্থাপিত দাবিগুলো বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া না হলে দেশব্যাপী বৃহত্তর গণআন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে




