দি ক্রাইম ডেস্ক: চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলা যেন পরিণত হয়েছে এক আতঙ্কের জনপদে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে সেখানে থামছে না খুন, গুম, হামলা ও সশস্ত্র সংঘর্ষের ঘটনা। দিন-রাত অস্ত্রের মহড়া, প্রকাশ্যে গুলি, বাড়িতে ঢুকে হত্যা, অপহরণের পর মরদেহ উদ্ধার কিংবা চলন্ত গাড়িতে গুলি করে হত্যার মতো ঘটনা এখন অনেকটাই নিয়মিত চিত্রে পরিণত হয়েছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক বিরোধ, চাঁদাবাজি এবং পাহাড় ও নদীর বালু ব্যবসার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে সক্রিয় হয়ে উঠেছে একাধিক সন্ত্রাসী গ্রুপ। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। সন্ধ্যার পর অনেক এলাকায় মানুষের চলাচল কমে গেছে। আতঙ্কে সন্তানদের বাইরে যেতে দিচ্ছেন না অভিভাবকরা। গত ২২ মাসে উপজেলায় অন্তত ২৪টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে অধিকাংশ হত্যাকাণ্ডই রাজনৈতিক বিরোধ ও সন্ত্রাসী দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে সংঘটিত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। নিহতদের বড় একটি অংশ বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলা এক আতঙ্কের জনপদে পরিণত হয়েছে। গত ২২ মাসে এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক বিরোধ ও বালু ব্যবসার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে অন্তত ২৪টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। দিন-রাত অস্ত্রের মহড়া, প্রকাশ্যে গুলি এবং বাড়িতে ঢুকে হত্যার মতো ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে
স্থানীয়রা জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকেই রাউজানে সহিংসতা ভয়াবহ আকার ধারণ করে। দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরীর নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকাটিতে সরকার পরিবর্তনের পর নতুন করে আধিপত্য বিস্তারের লড়াই শুরু হয়। বর্তমানে ফজলে করিম গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে থাকলেও তার পতনের পর সৃষ্ট ক্ষমতার দ্বন্দ্ব রাউজানকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার রাত ১০টার দিকে চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ বোস্তামী থানার রৌফাবাদ এলাকায় দুর্বৃত্তের গুলিতে নিহত হন মো. হাছান ওরফে রাজু (৩০)। তিনি রাউজান উপজেলার কদলপুর ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের ছড়ারকুল এলাকার আবুল কালামের ছেলে। এলাকায় তিনি ‘বিন্দু মাসীর ছেলে’ নামে পরিচিত ছিলেন। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, তিনি কদলপুরের একটি সন্ত্রাসী গ্রুপের সক্রিয় সদস্য ছিলেন। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

রাউজান থানা পুলিশ সূত্র জানায়, গত ২৬ এপ্রিল কদলপুর এলাকায় নাছির উদ্দিন হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে রাজুর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তোলা হয়েছিল। ওই ঘটনার পর থেকেই তিনি আত্মগোপনে ছিলেন। পুলিশের ধারণা, ওই ঘটনার জের ধরেই রাজুকে হত্যা করা হয়েছে। এর আগে ২৫ এপ্রিল গভীর রাতে বিএনপিকর্মী কাউসার-উজ জামানকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। মামাবাড়িতে যাওয়ার পথে ৮ থেকে ১০ জনের একটি সশস্ত্র দল তাকে ঘিরে গুলি চালায়।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাউজানে প্রথম হত্যাকাণ্ড ঘটে ২৮ আগস্ট। ওই দিন পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের চৌধুরী মার্কেট এলাকায় শ্রমিক লীগের নেতা আবদুল মান্নানকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এর তিন দিন পর, ১ সেপ্টেম্বর সাবেক এমপি ফজলে করিম চৌধুরীর বাগানবাড়ি থেকে ইউসুফ মিয়ার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। একই বছরের ২৯ অক্টোবর উরকিরচর ইউনিয়নের মইশকরম এলাকার একটি ডোবা থেকে মুহাম্মদ আজম খানের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ১১ নভেম্বর নিখোঁজের তিন দিন পর চিকদাইর ইউনিয়নের বড়পুল সর্তাখাল এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয় আবু তাহেরের মরদেহ।

স্থানীয়দের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ক্ষমতার দ্বন্দ্বে রাউজানে সহিংসতা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। দীর্ঘদিন সক্রিয় থাকা সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো রাজনৈতিক পরিচয় বদলে নতুন ব্যানারে আধিপত্য বিস্তারের লড়াই চালাচ্ছে। পাহাড় কাটা ও অবৈধ বালু উত্তোলনের নিয়ন্ত্রণ নিয়েও গ্রুপগুলোর মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ চলছে, যার পেছনে রাজনৈতিক আশ্রয়ের অভিযোগ রয়েছে।

২০২৫ সালের ২৪ জানুয়ারি নোয়াপাড়া ইউনিয়নে শুঁটকি ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর আলমকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ১৯ ফেব্রুয়ারি যুবলীগকর্মী মোহাম্মদ হাসানকে ঘর থেকে তুলে নিয়ে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করে মুখোশধারীরা। ১৫ মার্চ ইফতার মাহফিল নিয়ে ফেসবুক স্ট্যাটাসকে কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষের হামলায় নিহত হন যুবদলকর্মী কমর উদ্দিন জিতু। ২১ মার্চ পূর্বপুজরা ইউনিয়নে মো. রুবেল নামে এক যুবককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ৪ এপ্রিল জমি সংক্রান্ত বিরোধে হলদিয়া ইউনিয়নে নূর আলম বকুলকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।

১৭ এপ্রিল পাহাড়তলী ইউনিয়নের মহামুনি দীঘি থেকে মো. জাফরের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ১৯ এপ্রিল যুবদলকর্মী মানিক আবদুল্লাহকে ভাত খাওয়ার সময় ঘরে ঢুকে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। ২২ এপ্রিল সদর ইউনিয়নের যুবদলের নেতা মো. ইব্রাহিমকে দোকানে ডেকে নিয়ে মাথায় গুলি করে হত্যা করা হয়। এছাড়া, কদলপুর ইউনিয়নে যুবদলকর্মী মুহাম্মদ সেলিমকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা, দিদারুল আলমের মরদেহ উদ্ধার, যুবদলের নেতা আবদুল হাকিমকে চলন্ত গাড়িতে গুলি করে হত্যা, যুবদলের নেতা আলমগীর ও রিয়াদকে খুন, জানে আলম সিকদারকে গুলি করে হত্যা এবং বিএনপিকর্মী মুজিবকে ইফতারের আগে গুলি করে হত্যাসহ একের পর এক ঘটনায় এলাকাজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকার পতনের পর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন এবং এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘাত বেড়ে যায়। দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক বিরোধ, অস্ত্রের মহড়া, চাঁদাবাজি ও বালু ব্যবসা ঘিরে রাউজানে একাধিক সন্ত্রাসী গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। সংঘাতে জড়িত দুই পক্ষের নেতাকর্মীরা বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা গোলাম আকবর খন্দকার এবং বিএনপির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর অনুসারী হিসেবে পরিচিত। ৫ আগস্টের পর তাদের অনুসারীদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী দ্বন্দ্ব আরও প্রকট হয়ে ওঠে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, এলাকায় এখন ঘরে ঘরে অস্ত্র। পুরোনো সন্ত্রাসীদের একটি অংশ রাজনৈতিক পরিচয় বদলে নতুন ব্যানারে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। ফলে সামান্য ঘটনাকেও কেন্দ্র করে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের সৃষ্টি হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রায় প্রতিটি সন্ত্রাসী গ্রুপের পেছনে কোনো না কোনো রাজনৈতিক নেতার আশ্রয়-প্রশ্রয় রয়েছে।

এদিকে, পাহাড় কাটা ও কর্ণফুলী নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন নিয়েও সংঘর্ষ বাড়ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, পাহাড় ও নদীর বালু ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়েই মূলত সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর মধ্যে রক্তক্ষয়ী দ্বন্দ্ব চলছে। বর্তমানে উপজেলার অন্তত ২৫টি পয়েন্টে বালু উত্তোলন হলেও সরকারি অনুমোদিত বালুমহাল রয়েছে মাত্র ১০টি এবং বৈধ ইজারা আছে চারটির।

স্থানীয় এক বিএনপি নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় যেসব প্রভাবশালী নেতা বালু উত্তোলন নিয়ন্ত্রণ করতেন, সরকার পরিবর্তনের পর তাদের জায়গা দখল করেছে নতুন রাজনৈতিক গ্রুপ। ফলে সংঘাত থামছে না।

রাউজান থানার পরিদর্শক (তদন্ত) নিজাম উদ্দিন দেওয়ান গণমাধ্যমকে বলেন, সাম্প্রতিক সময়ের হত্যাকাণ্ডগুলোর ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। বেশ কয়েকটি মামলার অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ নিয়মিত টহল দিচ্ছে।

আমি জেলার সাংগঠনিক দায়িত্বে নেই। এটি স্থানীয় সংসদ সদস্য গিয়াস উদ্দিন কাদের ভালো বলতে পারবেন। তবে, আইনশৃঙ্খলা বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কাজ করছে। অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে।

চট্টগ্রাম জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো. সিরাজুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, ‘রাউজান ঐতিহ্যগতভাবেই সন্ত্রাসপ্রবণ এলাকা। রাজনৈতিক বিরোধে জড়িত গ্রুপগুলোর সদস্যরাই এসব হত্যাকাণ্ডে জড়িত। রাউজানকে সন্ত্রাসমুক্ত করতে পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ চলছে। প্রতিদিন পুলিশের একাধিক টহল টিম মাঠে রয়েছে। আশা করছি দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।’

বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির চট্টগ্রাম বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক এবং ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমি জেলার সাংগঠনিক দায়িত্বে নেই। এটি স্থানীয় সংসদ সদস্য গিয়াস উদ্দিন কাদের ভালো বলতে পারবেন। তবে, আইনশৃঙ্খলা বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কাজ করছে। অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে।’

দি ক্রাইম ডেস্ক: চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলা যেন পরিণত হয়েছে এক আতঙ্কের জনপদে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে সেখানে থামছে না খুন, গুম, হামলা ও সশস্ত্র সংঘর্ষের ঘটনা। দিন-রাত অস্ত্রের মহড়া, প্রকাশ্যে গুলি, বাড়িতে ঢুকে হত্যা, অপহরণের পর মরদেহ উদ্ধার কিংবা চলন্ত গাড়িতে গুলি করে হত্যার মতো ঘটনা এখন অনেকটাই নিয়মিত চিত্রে পরিণত হয়েছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক বিরোধ, চাঁদাবাজি এবং পাহাড় ও নদীর বালু ব্যবসার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে সক্রিয় হয়ে উঠেছে একাধিক সন্ত্রাসী গ্রুপ। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। সন্ধ্যার পর অনেক এলাকায় মানুষের চলাচল কমে গেছে। আতঙ্কে সন্তানদের বাইরে যেতে দিচ্ছেন না অভিভাবকরা। গত ২২ মাসে উপজেলায় অন্তত ২৪টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে অধিকাংশ হত্যাকাণ্ডই রাজনৈতিক বিরোধ ও সন্ত্রাসী দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে সংঘটিত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। নিহতদের বড় একটি অংশ বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলা এক আতঙ্কের জনপদে পরিণত হয়েছে। গত ২২ মাসে এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক বিরোধ ও বালু ব্যবসার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে অন্তত ২৪টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। দিন-রাত অস্ত্রের মহড়া, প্রকাশ্যে গুলি এবং বাড়িতে ঢুকে হত্যার মতো ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে
স্থানীয়রা জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকেই রাউজানে সহিংসতা ভয়াবহ আকার ধারণ করে। দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরীর নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকাটিতে সরকার পরিবর্তনের পর নতুন করে আধিপত্য বিস্তারের লড়াই শুরু হয়। বর্তমানে ফজলে করিম গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে থাকলেও তার পতনের পর সৃষ্ট ক্ষমতার দ্বন্দ্ব রাউজানকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার রাত ১০টার দিকে চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ বোস্তামী থানার রৌফাবাদ এলাকায় দুর্বৃত্তের গুলিতে নিহত হন মো. হাছান ওরফে রাজু (৩০)। তিনি রাউজান উপজেলার কদলপুর ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের ছড়ারকুল এলাকার আবুল কালামের ছেলে। এলাকায় তিনি ‘বিন্দু মাসীর ছেলে’ নামে পরিচিত ছিলেন। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, তিনি কদলপুরের একটি সন্ত্রাসী গ্রুপের সক্রিয় সদস্য ছিলেন। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

রাউজান থানা পুলিশ সূত্র জানায়, গত ২৬ এপ্রিল কদলপুর এলাকায় নাছির উদ্দিন হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে রাজুর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তোলা হয়েছিল। ওই ঘটনার পর থেকেই তিনি আত্মগোপনে ছিলেন। পুলিশের ধারণা, ওই ঘটনার জের ধরেই রাজুকে হত্যা করা হয়েছে। এর আগে ২৫ এপ্রিল গভীর রাতে বিএনপিকর্মী কাউসার-উজ জামানকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। মামাবাড়িতে যাওয়ার পথে ৮ থেকে ১০ জনের একটি সশস্ত্র দল তাকে ঘিরে গুলি চালায়।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাউজানে প্রথম হত্যাকাণ্ড ঘটে ২৮ আগস্ট। ওই দিন পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের চৌধুরী মার্কেট এলাকায় শ্রমিক লীগের নেতা আবদুল মান্নানকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এর তিন দিন পর, ১ সেপ্টেম্বর সাবেক এমপি ফজলে করিম চৌধুরীর বাগানবাড়ি থেকে ইউসুফ মিয়ার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। একই বছরের ২৯ অক্টোবর উরকিরচর ইউনিয়নের মইশকরম এলাকার একটি ডোবা থেকে মুহাম্মদ আজম খানের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ১১ নভেম্বর নিখোঁজের তিন দিন পর চিকদাইর ইউনিয়নের বড়পুল সর্তাখাল এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয় আবু তাহেরের মরদেহ।

স্থানীয়দের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ক্ষমতার দ্বন্দ্বে রাউজানে সহিংসতা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। দীর্ঘদিন সক্রিয় থাকা সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো রাজনৈতিক পরিচয় বদলে নতুন ব্যানারে আধিপত্য বিস্তারের লড়াই চালাচ্ছে। পাহাড় কাটা ও অবৈধ বালু উত্তোলনের নিয়ন্ত্রণ নিয়েও গ্রুপগুলোর মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ চলছে, যার পেছনে রাজনৈতিক আশ্রয়ের অভিযোগ রয়েছে।

২০২৫ সালের ২৪ জানুয়ারি নোয়াপাড়া ইউনিয়নে শুঁটকি ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর আলমকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ১৯ ফেব্রুয়ারি যুবলীগকর্মী মোহাম্মদ হাসানকে ঘর থেকে তুলে নিয়ে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করে মুখোশধারীরা। ১৫ মার্চ ইফতার মাহফিল নিয়ে ফেসবুক স্ট্যাটাসকে কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষের হামলায় নিহত হন যুবদলকর্মী কমর উদ্দিন জিতু। ২১ মার্চ পূর্বপুজরা ইউনিয়নে মো. রুবেল নামে এক যুবককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ৪ এপ্রিল জমি সংক্রান্ত বিরোধে হলদিয়া ইউনিয়নে নূর আলম বকুলকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।

১৭ এপ্রিল পাহাড়তলী ইউনিয়নের মহামুনি দীঘি থেকে মো. জাফরের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ১৯ এপ্রিল যুবদলকর্মী মানিক আবদুল্লাহকে ভাত খাওয়ার সময় ঘরে ঢুকে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। ২২ এপ্রিল সদর ইউনিয়নের যুবদলের নেতা মো. ইব্রাহিমকে দোকানে ডেকে নিয়ে মাথায় গুলি করে হত্যা করা হয়। এছাড়া, কদলপুর ইউনিয়নে যুবদলকর্মী মুহাম্মদ সেলিমকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা, দিদারুল আলমের মরদেহ উদ্ধার, যুবদলের নেতা আবদুল হাকিমকে চলন্ত গাড়িতে গুলি করে হত্যা, যুবদলের নেতা আলমগীর ও রিয়াদকে খুন, জানে আলম সিকদারকে গুলি করে হত্যা এবং বিএনপিকর্মী মুজিবকে ইফতারের আগে গুলি করে হত্যাসহ একের পর এক ঘটনায় এলাকাজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকার পতনের পর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন এবং এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘাত বেড়ে যায়। দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক বিরোধ, অস্ত্রের মহড়া, চাঁদাবাজি ও বালু ব্যবসা ঘিরে রাউজানে একাধিক সন্ত্রাসী গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। সংঘাতে জড়িত দুই পক্ষের নেতাকর্মীরা বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা গোলাম আকবর খন্দকার এবং বিএনপির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর অনুসারী হিসেবে পরিচিত। ৫ আগস্টের পর তাদের অনুসারীদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী দ্বন্দ্ব আরও প্রকট হয়ে ওঠে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, এলাকায় এখন ঘরে ঘরে অস্ত্র। পুরোনো সন্ত্রাসীদের একটি অংশ রাজনৈতিক পরিচয় বদলে নতুন ব্যানারে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। ফলে সামান্য ঘটনাকেও কেন্দ্র করে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের সৃষ্টি হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রায় প্রতিটি সন্ত্রাসী গ্রুপের পেছনে কোনো না কোনো রাজনৈতিক নেতার আশ্রয়-প্রশ্রয় রয়েছে।

এদিকে, পাহাড় কাটা ও কর্ণফুলী নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন নিয়েও সংঘর্ষ বাড়ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, পাহাড় ও নদীর বালু ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়েই মূলত সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর মধ্যে রক্তক্ষয়ী দ্বন্দ্ব চলছে। বর্তমানে উপজেলার অন্তত ২৫টি পয়েন্টে বালু উত্তোলন হলেও সরকারি অনুমোদিত বালুমহাল রয়েছে মাত্র ১০টি এবং বৈধ ইজারা আছে চারটির।

স্থানীয় এক বিএনপি নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় যেসব প্রভাবশালী নেতা বালু উত্তোলন নিয়ন্ত্রণ করতেন, সরকার পরিবর্তনের পর তাদের জায়গা দখল করেছে নতুন রাজনৈতিক গ্রুপ। ফলে সংঘাত থামছে না।

রাউজান থানার পরিদর্শক (তদন্ত) নিজাম উদ্দিন দেওয়ান গণমাধ্যমকে বলেন, সাম্প্রতিক সময়ের হত্যাকাণ্ডগুলোর ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। বেশ কয়েকটি মামলার অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ নিয়মিত টহল দিচ্ছে।

আমি জেলার সাংগঠনিক দায়িত্বে নেই। এটি স্থানীয় সংসদ সদস্য গিয়াস উদ্দিন কাদের ভালো বলতে পারবেন। তবে, আইনশৃঙ্খলা বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কাজ করছে। অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে।

চট্টগ্রাম জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো. সিরাজুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, ‘রাউজান ঐতিহ্যগতভাবেই সন্ত্রাসপ্রবণ এলাকা। রাজনৈতিক বিরোধে জড়িত গ্রুপগুলোর সদস্যরাই এসব হত্যাকাণ্ডে জড়িত। রাউজানকে সন্ত্রাসমুক্ত করতে পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ চলছে। প্রতিদিন পুলিশের একাধিক টহল টিম মাঠে রয়েছে। আশা করছি দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।’

বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির চট্টগ্রাম বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক এবং ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমি জেলার সাংগঠনিক দায়িত্বে নেই। এটি স্থানীয় সংসদ সদস্য গিয়াস উদ্দিন কাদের ভালো বলতে পারবেন। তবে, আইনশৃঙ্খলা বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কাজ করছে। অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে।’