বিজন কুমার বিশ্বাস, কক্সবাজার: কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার খুটাখালী এলাকায় অবস্থিত মেধাকচ্ছপিয়া জাতীয় উদ্যান-এর সংরক্ষিত বনভূমি দখল করে অবৈধ বসতি স্থাপনের পেছনে বনবিট কর্মকর্তা মুমিনুর রহমান-এর বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ ও যোগসাজশের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, “চা-পানির খরচ” নামে অর্থ গ্রহণের বিনিময়ে বনভূমিতে বসতি নির্মাণের সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে। বনভূমিতে বসতি স্থাপনকারী এক রোহিঙ্গা নাগরিক মো. হারেস-এর স্ত্রীও এ ধরনের অভিযোগ করেছেন। এ সংক্রান্ত একটি ভিডিও ফুটেজ প্রতিবেদকের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, জাতীয় উদ্যানের বিস্তীর্ণ এলাকায় পাহাড় কেটে সমতল করা হচ্ছে এবং গাছপালা উজাড় করে গড়ে তোলা হচ্ছে নতুন বসতি। কোথাও ঝুপড়ি ঘর, আবার কোথাও আধাপাকা ও পাকা স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, গত কয়েক মাসে এ দখল কার্যক্রম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে, যা পরিকল্পিত বন দখলের ইঙ্গিত দেয়।
একাধিক স্থানীয় সূত্র জানায়, একটি সংঘবদ্ধ চক্র দালালদের মাধ্যমে আগ্রহীদের কাছ থেকে নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা নিয়ে বনভূমির জায়গা নির্ধারণ করে দেয়। এরপর সেখানে নির্বিঘ্নে বসতি স্থাপন সম্ভব হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন বাসিন্দার দাবি, বনবিট কর্মকর্তার অনুমতি ছাড়া এখানে কোনো কিছুই সম্ভব নয়। “চা-পানির খরচ” দিলেই কোনো বাধা আসে না বলেও অভিযোগ করেন তারা।
অভিযোগ রয়েছে, প্রতিটি বসতির জন্য আলাদা করে অর্থ আদায় করা হচ্ছে এবং রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর একটি অংশকে লক্ষ্য করে এই বসতি স্থাপনে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে বনবিট এলাকার অন্তত ১০ থেকে ১২টি পাকা ও আধাপাকা বসতঘর নির্মাণাধীন রয়েছে বলে জানা গেছে।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, বন বিভাগের টহল কার্যক্রমেও রয়েছে শিথিলতা। অনেক সময় দখলকারীদের আগেই সতর্ক করে দেওয়া হয়, ফলে তারা নির্বিঘ্নে নির্মাণকাজ চালিয়ে যেতে পারে। এতে সংরক্ষিত বনভূমি রক্ষায় প্রশাসনের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযুক্ত বনবিট কর্মকর্তা মুমিনুর রহমান অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “বসতবাড়ি নির্মাণের সুযোগ দিয়ে কোনো ধরনের আর্থিক লেনদেন করা হয়নি। একটি চক্র আমার নাম ব্যবহার করে এসব অপকর্ম চালাচ্ছে।” তিনি অবৈধ দখলকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানান।
অন্যদিকে, অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার পরপরই বনভূমি দখলকারী আবু তাহের প্রতিবেদকের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিষয়টি আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে “ম্যানেজ” করার চেষ্টা করেন।
তিনি দাবি করেন, খুটাখালী ১ নম্বর ওয়ার্ডের কোনাপাড়া এলাকার আহমদ ছফা ও রোহিঙ্গা নাগরিক মো. হারেস-সহ তিনটি বসতঘর নির্মাণে প্রায় ১৫ হাজার টাকা উৎকোচ দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে বিভাগীয় বনবিট কর্মকর্তা মারুফ হোসেন-এর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ না করায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
পরিবেশবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, সংরক্ষিত জাতীয় উদ্যানে এ ধরনের অবৈধ দখল কার্যক্রম অব্যাহত থাকলে তা জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। বন উজাড়ের ফলে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস হওয়ার পাশাপাশি মানব-বন্যপ্রাণী সংঘাতও বৃদ্ধি পাবে।
এদিকে স্থানীয় সচেতন মহল অবিলম্বে অবৈধ বসতি উচ্ছেদ, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছে। তাদের আশঙ্কা, দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে মেধাকচ্ছপিয়া জাতীয় উদ্যান ধীরে ধীরে দখলদারদের নিয়ন্ত্রণে চলে যেতে পারে।




