মাহবুবুর রহমান:
রাজনীতির নির্মম বাস্তবতা হলো—ক্ষমতা কখনো শূন্যতায় টিকে থাকে না, এবং দুর্বল প্রশাসনের ওপর দাঁড়িয়ে কোনো রাজনৈতিক শক্তি দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে না। ইতিহাসের পাতা খুললেই দেখা যায়, জনপ্রিয়তা হারিয়ে নয়, বরং প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ হারিয়েই অনেক রাজনৈতিক শক্তি পতনের মুখে পড়েছে। আজ সেই একই বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। তাদের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি কোনো বিরোধী দল নয়, বরং প্রশাসনিক দুর্বলতা, সিদ্ধান্তহীনতা এবং কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় বিলম্ব।

রাষ্ট্র পরিচালনায় রাজনৈতিক বক্তব্য, জনসভা বা জনপ্রিয়তা কোনো স্থায়ী সুরক্ষা দেয় না। রাষ্ট্র পরিচালিত হয় প্রশাসনের মাধ্যমে, এবং প্রশাসন যদি দৃঢ়, কার্যকর এবং কর্তৃত্বের প্রতি অনুগত না হয়, তাহলে রাজনৈতিক ক্ষমতা কেবল একটি আনুষ্ঠানিক অবস্থানে পরিণত হয়। বাস্তব ক্ষমতা তখন ধীরে ধীরে সরে যেতে থাকে, এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব বুঝে ওঠার আগেই তারা একটি জটিল সংকটের মধ্যে পড়ে যায়।

প্রশাসন দুর্বল হলে রাজনৈতিক ক্ষমতা কাগজে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়
একটি সরকার তখনই কার্যকর, যখন তার প্রশাসন কার্যকর। প্রশাসনই রাষ্ট্রের হাত, পা এবং স্নায়ুতন্ত্র। এই কাঠামো যদি দুর্বল হয়, তাহলে সরকারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হয় না। মন্ত্রিসভা সিদ্ধান্ত নেয়, কিন্তু তা মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন করে প্রশাসন। প্রশাসন যদি দ্বিধাগ্রস্ত থাকে, যদি তারা স্পষ্ট নির্দেশনা না পায়, অথবা তারা যদি রাজনৈতিক নেতৃত্বের দৃঢ়তা নিয়ে সন্দিহান থাকে, তাহলে তারা ঝুঁকি নিতে চায় না। তারা অপেক্ষা করে, পর্যবেক্ষণ করে এবং সময়ক্ষেপণ করে।

এই সময়ক্ষেপণই রাজনৈতিক নেতৃত্বের জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ।
বাংলাদেশ-এর প্রশাসনিক কাঠামো অত্যন্ত শক্তিশালী এবং প্রভাবশালী। এই কাঠামো রাষ্ট্র পরিচালনার প্রকৃত চালিকাশক্তি। এই কাঠামো যদি সম্পূর্ণভাবে সরকারের নীতিগত নির্দেশনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়, তাহলে সরকারের কার্যকারিতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

প্রশাসনিক শিথিলতা দ্রুত রাজনৈতিক দুর্বলতায় পরিণত হয়
প্রশাসনিক দুর্বলতা কোনো তাৎক্ষণিক বিস্ফোরণ ঘটায় না। এটি ধীরে ধীরে রাজনৈতিক ভিত্তিকে ক্ষয় করে। প্রথমে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে শিথিলতা দেখা যায়। এরপর প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব হয়। গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন আটকে যায়। দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা দেখা যায়। জনগণ প্রশাসনিক সেবা পেতে হয়রানির শিকার হয়।
এই অবস্থায় জনগণ সরকারের ওপর আস্থা হারাতে শুরু করে।
রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় শক্তি হলো জনগণের আস্থা। এই আস্থা হারালে রাজনৈতিক ক্ষমতা দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়ে। এই প্রক্রিয়া যখন শুরু হয়, তখন তা থামানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে যায়।

কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় বিলম্ব একটি মারাত্মক কৌশলগত ভুল
রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর প্রশাসন সবসময় নতুন নেতৃত্বের দিকে তাকিয়ে থাকে। তারা বুঝতে চায়—নতুন নেতৃত্ব কতটা দৃঢ়, কতটা সংগঠিত এবং কতটা দীর্ঘমেয়াদি। এই সময় যদি রাজনৈতিক নেতৃত্ব দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে প্রশাসনের মধ্যে একটি বিপজ্জনক বার্তা পৌঁছে যায়—নেতৃত্ব দুর্বল, নেতৃত্ব দ্বিধাগ্রস্ত, নেতৃত্ব ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত নয়।

এই ধারণা একবার প্রতিষ্ঠিত হলে তা পরিবর্তন করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে যায়।
তারেক রহমান-এর নেতৃত্বে বিএনপি যদি দ্রুত প্রশাসনিক পুনর্গঠন না করে, তাহলে তারা একটি কৌশলগত ভুল করবে, যার মূল্য তাদের দীর্ঘমেয়াদে দিতে হবে।
রাজনীতিতে দুর্বলতার কোনো ক্ষমা নেই।

প্রশাসন নিজের মতো চলতে শুরু করলে রাজনৈতিক নেতৃত্ব অকার্যকর হয়ে পড়ে
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একটি কঠিন বাস্তবতা হলো—প্রশাসন যদি রাজনৈতিক নেতৃত্বের দৃঢ়তা নিয়ে সন্দিহান হয়, তাহলে তারা নিজের মতো চলতে শুরু করে। তারা ঝুঁকি এড়িয়ে চলে, তারা কঠিন সিদ্ধান্ত এড়িয়ে চলে এবং তারা এমন একটি অবস্থান গ্রহণ করে, যা তাদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।
এর ফলে সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হয়।
এই পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক নেতৃত্ব একটি আনুষ্ঠানিক অবস্থানে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। তারা সিদ্ধান্ত নেয়, কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হয় না। এই অবস্থাকে বলা যায় “ক্ষমতায় থেকেও অক্ষমতা”।
এটি একটি রাজনৈতিক বিপর্যয়ের সূচনা।

প্রশাসন পুনর্গঠন এখন রাজনৈতিক প্রয়োজন, বিলাসিতা নয়
প্রশাসন পুনর্গঠন কোনো প্রতিহিংসামূলক পদক্ষেপ নয়। এটি একটি রাষ্ট্রীয় প্রয়োজন। প্রতিটি কার্যকর সরকারই তাদের প্রশাসনিক কাঠামোকে পুনর্গঠন করে, যাতে তারা তাদের নীতিগত অগ্রাধিকার বাস্তবায়ন করতে পারে।
এই পুনর্গঠনের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত—
প্রশাসনে দৃঢ় নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা;
সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি বৃদ্ধি;
প্রশাসনিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা;
এবং রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব সুসংহত করা।
বাংলাদেশ সরকার-এর প্রশাসনিক কাঠামোকে কার্যকরভাবে পরিচালনা করতে হলে রাজনৈতিক নেতৃত্বকে স্পষ্ট এবং দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে।
অস্পষ্টতা এবং বিলম্ব এখানে সবচেয়ে বড় শত্রু।

সময় যত যাবে, পরিস্থিতি তত জটিল হবে
রাজনীতিতে সময় একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। প্রশাসনিক পুনর্গঠন যত বিলম্বিত হবে, প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ কাঠামো তত শক্তিশালী এবং জটিল হয়ে উঠবে। তখন পরিবর্তন আনা আরও কঠিন হয়ে যাবে।
এই বাস্তবতায় এখনই সিদ্ধান্ত নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
যদি বিএনপি এখন দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে তারা ধীরে ধীরে একটি প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে চলে যাবে। তারা তখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করার পরিবর্তে পরিস্থিতির প্রতিক্রিয়া জানাতে বাধ্য হবে।
রাজনীতিতে প্রতিক্রিয়াশীল অবস্থান সবসময় দুর্বলতার লক্ষণ।

জনগণ ফলাফল চায়, অজুহাত নয়
জনগণ রাজনৈতিক বক্তব্যে বিশ্বাস করে না, তারা বাস্তব ফলাফল দেখে। তারা দেখতে চায়—রাষ্ট্র কার্যকর কি না। তারা দেখতে চায়—আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নত হচ্ছে কি না। তারা দেখতে চায়—প্রশাসন জনগণের জন্য কাজ করছে কি না।
যদি তারা এই ফলাফল না দেখে, তাহলে তারা তাদের সমর্থন প্রত্যাহার করে নেয়।
রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো—জনগণের সমর্থন কখনো স্থায়ী নয়। এটি ধরে রাখতে হয় কার্যকারিতার মাধ্যমে।

এখনই পদক্ষেপ না নিলে বিএনপি বেকায়দায় পড়বে
এটি একটি সতর্কবার্তা, কোনো রাজনৈতিক স্লোগান নয়। প্রশাসনিক দুর্বলতা যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে বিএনপি ধীরে ধীরে একটি কঠিন রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে যাবে। তারা বুঝে ওঠার আগেই তাদের কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যাবে।
এই পরিস্থিতি এড়াতে হলে এখনই দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে হবে।
প্রশাসনকে পুনর্গঠন করতে হবে। প্রশাসনে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। প্রশাসনে স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে—রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত, এবং সেই কর্তৃত্ব অটুট থাকবে।

সিদ্ধান্তহীনতা সবচেয়ে বড় বিপদ
রাজনীতিতে ভুল সিদ্ধান্তের মূল্য আছে, কিন্তু সিদ্ধান্তহীনতার মূল্য আরও বেশি। ভুল সিদ্ধান্ত সংশোধন করা যায়, কিন্তু সিদ্ধান্তহীনতা ধীরে ধীরে পুরো কাঠামোকে দুর্বল করে দেয়।

বিএনপি যদি তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে চায়, তাহলে তাদের এখনই প্রশাসন ঢেলে সাজাতে হবে। বিলম্ব করার কোনো সুযোগ নেই।

প্রশাসনের ওপর দৃঢ় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে। এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—দৃঢ় নেতৃত্বের প্রমাণ দিতে হবে।
অন্যথায় পরিস্থিতি তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
রাজনীতির ইতিহাস অপেক্ষা করে না। যারা সময়মতো সিদ্ধান্ত নেয় না, ইতিহাস তাদের জন্য অপেক্ষা করে না।

মাহবুবুর রহমান, সাংবাদিক ও কলামিষ্ট।

 

মাহবুবুর রহমান:
রাজনীতির নির্মম বাস্তবতা হলো—ক্ষমতা কখনো শূন্যতায় টিকে থাকে না, এবং দুর্বল প্রশাসনের ওপর দাঁড়িয়ে কোনো রাজনৈতিক শক্তি দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে না। ইতিহাসের পাতা খুললেই দেখা যায়, জনপ্রিয়তা হারিয়ে নয়, বরং প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ হারিয়েই অনেক রাজনৈতিক শক্তি পতনের মুখে পড়েছে। আজ সেই একই বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। তাদের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি কোনো বিরোধী দল নয়, বরং প্রশাসনিক দুর্বলতা, সিদ্ধান্তহীনতা এবং কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় বিলম্ব।

রাষ্ট্র পরিচালনায় রাজনৈতিক বক্তব্য, জনসভা বা জনপ্রিয়তা কোনো স্থায়ী সুরক্ষা দেয় না। রাষ্ট্র পরিচালিত হয় প্রশাসনের মাধ্যমে, এবং প্রশাসন যদি দৃঢ়, কার্যকর এবং কর্তৃত্বের প্রতি অনুগত না হয়, তাহলে রাজনৈতিক ক্ষমতা কেবল একটি আনুষ্ঠানিক অবস্থানে পরিণত হয়। বাস্তব ক্ষমতা তখন ধীরে ধীরে সরে যেতে থাকে, এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব বুঝে ওঠার আগেই তারা একটি জটিল সংকটের মধ্যে পড়ে যায়।

প্রশাসন দুর্বল হলে রাজনৈতিক ক্ষমতা কাগজে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়
একটি সরকার তখনই কার্যকর, যখন তার প্রশাসন কার্যকর। প্রশাসনই রাষ্ট্রের হাত, পা এবং স্নায়ুতন্ত্র। এই কাঠামো যদি দুর্বল হয়, তাহলে সরকারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হয় না। মন্ত্রিসভা সিদ্ধান্ত নেয়, কিন্তু তা মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন করে প্রশাসন। প্রশাসন যদি দ্বিধাগ্রস্ত থাকে, যদি তারা স্পষ্ট নির্দেশনা না পায়, অথবা তারা যদি রাজনৈতিক নেতৃত্বের দৃঢ়তা নিয়ে সন্দিহান থাকে, তাহলে তারা ঝুঁকি নিতে চায় না। তারা অপেক্ষা করে, পর্যবেক্ষণ করে এবং সময়ক্ষেপণ করে।

এই সময়ক্ষেপণই রাজনৈতিক নেতৃত্বের জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ।
বাংলাদেশ-এর প্রশাসনিক কাঠামো অত্যন্ত শক্তিশালী এবং প্রভাবশালী। এই কাঠামো রাষ্ট্র পরিচালনার প্রকৃত চালিকাশক্তি। এই কাঠামো যদি সম্পূর্ণভাবে সরকারের নীতিগত নির্দেশনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়, তাহলে সরকারের কার্যকারিতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

প্রশাসনিক শিথিলতা দ্রুত রাজনৈতিক দুর্বলতায় পরিণত হয়
প্রশাসনিক দুর্বলতা কোনো তাৎক্ষণিক বিস্ফোরণ ঘটায় না। এটি ধীরে ধীরে রাজনৈতিক ভিত্তিকে ক্ষয় করে। প্রথমে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে শিথিলতা দেখা যায়। এরপর প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব হয়। গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন আটকে যায়। দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা দেখা যায়। জনগণ প্রশাসনিক সেবা পেতে হয়রানির শিকার হয়।
এই অবস্থায় জনগণ সরকারের ওপর আস্থা হারাতে শুরু করে।
রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় শক্তি হলো জনগণের আস্থা। এই আস্থা হারালে রাজনৈতিক ক্ষমতা দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়ে। এই প্রক্রিয়া যখন শুরু হয়, তখন তা থামানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে যায়।

কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় বিলম্ব একটি মারাত্মক কৌশলগত ভুল
রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর প্রশাসন সবসময় নতুন নেতৃত্বের দিকে তাকিয়ে থাকে। তারা বুঝতে চায়—নতুন নেতৃত্ব কতটা দৃঢ়, কতটা সংগঠিত এবং কতটা দীর্ঘমেয়াদি। এই সময় যদি রাজনৈতিক নেতৃত্ব দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে প্রশাসনের মধ্যে একটি বিপজ্জনক বার্তা পৌঁছে যায়—নেতৃত্ব দুর্বল, নেতৃত্ব দ্বিধাগ্রস্ত, নেতৃত্ব ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত নয়।

এই ধারণা একবার প্রতিষ্ঠিত হলে তা পরিবর্তন করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে যায়।
তারেক রহমান-এর নেতৃত্বে বিএনপি যদি দ্রুত প্রশাসনিক পুনর্গঠন না করে, তাহলে তারা একটি কৌশলগত ভুল করবে, যার মূল্য তাদের দীর্ঘমেয়াদে দিতে হবে।
রাজনীতিতে দুর্বলতার কোনো ক্ষমা নেই।

প্রশাসন নিজের মতো চলতে শুরু করলে রাজনৈতিক নেতৃত্ব অকার্যকর হয়ে পড়ে
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একটি কঠিন বাস্তবতা হলো—প্রশাসন যদি রাজনৈতিক নেতৃত্বের দৃঢ়তা নিয়ে সন্দিহান হয়, তাহলে তারা নিজের মতো চলতে শুরু করে। তারা ঝুঁকি এড়িয়ে চলে, তারা কঠিন সিদ্ধান্ত এড়িয়ে চলে এবং তারা এমন একটি অবস্থান গ্রহণ করে, যা তাদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।
এর ফলে সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হয়।
এই পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক নেতৃত্ব একটি আনুষ্ঠানিক অবস্থানে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। তারা সিদ্ধান্ত নেয়, কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হয় না। এই অবস্থাকে বলা যায় “ক্ষমতায় থেকেও অক্ষমতা”।
এটি একটি রাজনৈতিক বিপর্যয়ের সূচনা।

প্রশাসন পুনর্গঠন এখন রাজনৈতিক প্রয়োজন, বিলাসিতা নয়
প্রশাসন পুনর্গঠন কোনো প্রতিহিংসামূলক পদক্ষেপ নয়। এটি একটি রাষ্ট্রীয় প্রয়োজন। প্রতিটি কার্যকর সরকারই তাদের প্রশাসনিক কাঠামোকে পুনর্গঠন করে, যাতে তারা তাদের নীতিগত অগ্রাধিকার বাস্তবায়ন করতে পারে।
এই পুনর্গঠনের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত—
প্রশাসনে দৃঢ় নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা;
সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি বৃদ্ধি;
প্রশাসনিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা;
এবং রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব সুসংহত করা।
বাংলাদেশ সরকার-এর প্রশাসনিক কাঠামোকে কার্যকরভাবে পরিচালনা করতে হলে রাজনৈতিক নেতৃত্বকে স্পষ্ট এবং দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে।
অস্পষ্টতা এবং বিলম্ব এখানে সবচেয়ে বড় শত্রু।

সময় যত যাবে, পরিস্থিতি তত জটিল হবে
রাজনীতিতে সময় একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। প্রশাসনিক পুনর্গঠন যত বিলম্বিত হবে, প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ কাঠামো তত শক্তিশালী এবং জটিল হয়ে উঠবে। তখন পরিবর্তন আনা আরও কঠিন হয়ে যাবে।
এই বাস্তবতায় এখনই সিদ্ধান্ত নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
যদি বিএনপি এখন দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে তারা ধীরে ধীরে একটি প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে চলে যাবে। তারা তখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করার পরিবর্তে পরিস্থিতির প্রতিক্রিয়া জানাতে বাধ্য হবে।
রাজনীতিতে প্রতিক্রিয়াশীল অবস্থান সবসময় দুর্বলতার লক্ষণ।

জনগণ ফলাফল চায়, অজুহাত নয়
জনগণ রাজনৈতিক বক্তব্যে বিশ্বাস করে না, তারা বাস্তব ফলাফল দেখে। তারা দেখতে চায়—রাষ্ট্র কার্যকর কি না। তারা দেখতে চায়—আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নত হচ্ছে কি না। তারা দেখতে চায়—প্রশাসন জনগণের জন্য কাজ করছে কি না।
যদি তারা এই ফলাফল না দেখে, তাহলে তারা তাদের সমর্থন প্রত্যাহার করে নেয়।
রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো—জনগণের সমর্থন কখনো স্থায়ী নয়। এটি ধরে রাখতে হয় কার্যকারিতার মাধ্যমে।

এখনই পদক্ষেপ না নিলে বিএনপি বেকায়দায় পড়বে
এটি একটি সতর্কবার্তা, কোনো রাজনৈতিক স্লোগান নয়। প্রশাসনিক দুর্বলতা যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে বিএনপি ধীরে ধীরে একটি কঠিন রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে যাবে। তারা বুঝে ওঠার আগেই তাদের কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যাবে।
এই পরিস্থিতি এড়াতে হলে এখনই দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে হবে।
প্রশাসনকে পুনর্গঠন করতে হবে। প্রশাসনে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। প্রশাসনে স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে—রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত, এবং সেই কর্তৃত্ব অটুট থাকবে।

সিদ্ধান্তহীনতা সবচেয়ে বড় বিপদ
রাজনীতিতে ভুল সিদ্ধান্তের মূল্য আছে, কিন্তু সিদ্ধান্তহীনতার মূল্য আরও বেশি। ভুল সিদ্ধান্ত সংশোধন করা যায়, কিন্তু সিদ্ধান্তহীনতা ধীরে ধীরে পুরো কাঠামোকে দুর্বল করে দেয়।

বিএনপি যদি তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে চায়, তাহলে তাদের এখনই প্রশাসন ঢেলে সাজাতে হবে। বিলম্ব করার কোনো সুযোগ নেই।

প্রশাসনের ওপর দৃঢ় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে। এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—দৃঢ় নেতৃত্বের প্রমাণ দিতে হবে।
অন্যথায় পরিস্থিতি তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
রাজনীতির ইতিহাস অপেক্ষা করে না। যারা সময়মতো সিদ্ধান্ত নেয় না, ইতিহাস তাদের জন্য অপেক্ষা করে না।

মাহবুবুর রহমান, সাংবাদিক ও কলামিষ্ট।