নিজস্ব প্রতিবেদক, সাতকানিয়া : ‘সত্যি আল্লাহর কসম তার মা (শাশুড়ি) আমাকে বিষ খাইয়ে দিয়েছেন। আমার স্বামী জিজ্ঞাসা করলে আমি বলব, আমাকে বিষ খাওয়াই দেয়নি। কিন্তু খাওয়াই দিছে, আল্লাহর কসম খাওয়াই দিছে, সত্যি’- মৃত্যুর আগে শাশুড়ির বিরুদ্ধে এভাবেই জোরপূর্বক বিষ পান করানোর অভিযোগ তুলে দুনিয়া থেকে বিদায় নিলেন আমেনা বেগম (২৪) নামে এক গৃহবধূ।
শনিবার (১৭ জানুয়ারী) মধ্য রাতে গৃহবধূ আমেনা চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। মৃত্যুর কিছুক্ষণ আগে হাসপাতালের বেডে শোয়া অবস্থায় মোবাইলে ধারণকৃত বিষপান করানোর অভিযোগের এমন একটা ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম (ফেসবুক) এ ভাইরাল হয়। এর পর ফেসবুকে শুরু হয় নানা ধরনের নেতিবাচক মন্তব্য। এ ঘটনায় গৃহবধূর স্বামী মো.ইউছুফকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করেছেন থানা পুলিশ।
নিহত আমেনা চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার পদুয়া ইউনিয়নের মীর পাড়া এলাকার শফিক আহমদের মেয়ে। স্বামী মো.ইউছুফ সাতকানিয়া উপজেলার সদর ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের বাহাদির পাড়া এলাকার হাজী আবু বক্করের ছেলে। ২০২২ সালের ৫ আগষ্ট তাদের বিয়ে হয়। তাদের সংসারে আড়াই বছর বয়সী এক কন্যা সন্তান রয়েছে।
https://www.facebook.com/share/v/1D6tU1GQcJ/
এলাকাবাসীর সাথে কথা বলে জানা যায়, গত শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) রাত ৮টার দিকে শশুর বাড়িতে গৃহবধূ আমেনার বিষপানের ঘটনা ঘটে। পরে তাকে (আমেনা) লোহাগাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করেন। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গতকাল শনিবার (১৭ জানুয়ারি) মধ্য রাতে আমেনার মৃত্যু হয়।
নিহত আমেনার বড় ভাই মো. ফোরকান বলেন, শুক্রবার (১৬জানুয়ারি) আসরের সময় আমার বোন (আমেনা) আমাকে ফোন করে বলে, তাকে শ্বশুরবাড়ি থেকে নিয়ে যেতে। না হয় শ্বশুরবাড়ির লোকজন তাকে মেরে ফেলবে। আমি বলেছি, ধৈর্য ধর। পরে তার স্বামী একই দিন শুক্রবার রাতে আমাকে ফোন দিয়ে বলছে, আমেনা বিষ পান করেছে। তখন তাৎক্ষণিক আমার মাথায় আসল, কেন বোন আমাকে তার শশুর বাড়ি থেকে নিয়ে যেতে বলেছে। আমি যদি তাকে নিয়ে আসতাম তাহলে আমার বোন বেঁচে থাকতো।
ফোরকান অভিযোগ করে বলেন, মূলত আমার বোনের স্বামী ইউসুফ, তার শাশুড়ি ও শ্বশুর মিলে জোর পূর্বক বিষ পান করিয়ে আমার বোনকে মেরে ফেলেছে। আমি এ খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করছি।
ফোরকান বলেন, বিয়ের পর থেকে আমার বোনকে স্বামীসহ তার শ্বশুর বাড়ির লোকজন আমাদের কাছ থেকে যৌতুকের অংশ হিসেবে টাকা এনে দেওয়ার জন্য বিভিন্নভাবে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করত। এতে আমেনা অসম্মতি জানালে তাকে নির্যাতনের পাশাপাশি দেওয়া হত হত্যার হুমকিও। অথচ ইউসুফকে থাকার জন্য বাড়িটাও আমরা করে দিছি। বিয়ের সময় দাওয়াত না খাওয়ার কথা বলে আমাদের কাছ থেকে ২ লাখ ৩০ হাজার টাকা নিয়েছে স্বামী ইউছুফ। এছাড়া বিয়ের সাত দিন পর বাড়িতে পানির মোটর বসানোর জন্য দেওয়া হয় ৩০ হাজার টাকা।
অভিযুক্ত আমেনার স্বামী মো. ইউসুফ বলেন, যে ভিডিও প্রকাশ হয়েছে সেটা মিথ্যা। আমেনার ভাগ্নে জোর করে করিয়েছে। আমাদের মধ্যে পারিবারিক বিরোধ ছিল। বেশ কয়েকবার বিচার সালিশও হয়েছে। শুক্রবার সন্ধ্যার দিকে আমি বাড়ির বাইরে ছিলাম। চা-নাস্তা খেয়ে বাড়ির পাশ্ববর্তী এলাকায় একটা মাহফিলে যাওয়ার জন্য ঘরে জামা-কাপড়ের জন্য
গিয়ে দেখি আমার রুমে লাইট নেভানো। আলো দিয়ে দেখি আমেনা খাটের ওপর ছটফট করছে। পরে সিএনজি চালিত অটোরিকশা যোগে লোহাগাড়ার পদুয়া হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সময় তাকে কি হয়েছে এবং কেমন লাগছে জিজ্ঞাসা করলেও সে আমাকে কিছু বলেনি। হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে জানতে পারি, সে বিষ খেয়েছে। অবস্থা খারাপ হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। শনিবার রাত ১২টার দিকে তার মৃত্যু হয়।
স্বামী ইউছুফ অভিযোগ করে বলেন, সে (আমেনা) খুব বদমেজাজি ছিল। আমি বা আমার পরিবার কেউ তার মৃত্যুতে জড়িত না। তারা আমার ও আমার মা-বাবার ওপর এসব মিথ্যা চাপিয়ে দিচ্ছে। আমেনা অসুস্থ থাকায় তাকে ওষুধ এনে দিয়ে বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর পর সে বিষ পান করে বলে শুনেছি। আমি কৃষি কাজ করি। মূলত আমার মা-বাবা পরিবার থেকে আমাকে আলাদা হওয়ার জন্য চাপ দিত। আমি খেটে খাওয়া মানুষ। আমি আলাদা হতে রাজি না হওয়ায় আমেনা আমার ওপর প্রায় সময় মেজাজ দেখাতো।
সাতকানিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মঞ্জুরুল হক বিষপানে গৃহবধূ মারা যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, এ ঘটনায় স্বামী ইউছুফকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে। অভিযোগ পেলে বিস্তারিত তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।




