রানা চক্রবর্তী: দৌলত-উজীর বাহরাম খান লায়লা-মজনুর অমর উপাখ্যান অবলম্বনে বাংলা ভাষায় ‘লায়লী-মজনু’ কাব্য রচনা করেছিলেন। এর আগে অল্প বয়সে তিনি কারবালার কাহিনী নিয়ে বাংলা ভাষায় আরেকটি কাব্য লিখেছিলেন।‘লায়লী-মজনু’ কাব্যে দৌলত উজীর লিখেছিলেন যে, তাঁর পূর্বপুরুষ হামিদ খান, বাংলার সুলতান হোসেন শাহের (১৪৯৩-১৫১৯ খৃষ্টাব্দ) প্রধান উজীর ছিলেন।

হোসেন শাহ হামিদ খানের গুণ ও অলৌকিক শক্তির পরিচয় পেয়ে তাঁকে ‘দুই সিক’ দান করেছিলেন এবং চাটিগ্রাম বা ফতেহাবাদের অধিকারীর পদে নিযুক্ত করেছিলেন। এরপরে হামিদ খানের বংশধরেরা চট্টগ্রামেই বাস করতে শুরু করেছিলেন। বাহরাম খানের আমলে চট্টগ্রামের অধিপতি ছিলেন-‘নৃপতি নেজাম শাহা সুর (শূর)’। তিনি প্রথমে কবির পিতাকে এবং তাঁর মৃত্যুর পর স্বয়ং কবিকে-‘দৌলত উজীর’ -খেতাব দিয়েছিলেন; অর্থাৎ-কবিকে তিনি তাঁর রাজ্যের অর্থবিভাগের কোন একটি উচ্চপদে নিযুক্ত করেছিলেন।

এখানে উল্লেখ্য যে, সেকালের ‘উজীর’ আখ্যাধারী রাজকর্মচারীরা রাজ্যের রাজধানীতে যেমন নিযুক্ত হতেন, তেমনি বাইরেও নিযুক্ত হতেন। বাংলার স্বাধীন সুলতানদের বহু শিলালিপিতে দেখা যায় যে, সেযুগে উজীর আখ্যাধারী অনেক রাজকর্মচারীর কর্মক্ষেত্র রাজধানী থেকে বহুদূরে কোন জায়গায় অবস্থিত ছিল।

দৌলত-উজীর বাহরাম খান যে মুঘল সম্রাট ঔরঙ্গজেবের রাজত্বকালেই (১৬৫৮-১৭০৭ খৃষ্টাব্দ) ‘লায়লী-মজনু’ কাব্যটি রচনা করেছিলেন, সেবিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। কারণ লায়লী-মজনুর উপক্রমে-‘আওরঙ্গ শাহা দিল্লীশ্বর’–এর প্রশস্তি পাওয়া যায় এবং এই প্রশস্তিকে প্রক্ষিপ্ত বলে মনে করবার কোন কারণ অন্ততঃ গবেষকরা খুঁজে পাননি। বাহরাম খান যে ঔরঙ্গজেবের সমসাময়িক ছিলেন, সেটার অন্য ঐতিহাসিক প্রমাণও পাওয়া যায়। চট্টগ্রাম-নিবাসী কবি মোহাম্মদ খানের লেখা ‘মক্তুল-হোসেন’ কাব্যে (রচনাকাল ১৬৪৬ খৃষ্টাব্দ) একজন পীর সদর জাঁহার উল্লেখ পাওয়া যায়, যাঁকে বারো ভূইয়ার অন্যতম ঈশা খাঁ সংবর্ধিত করেছিলেন।

ঈশা খাঁ- খৃষ্টীয় ষোড়শ শতাব্দীর শেষপাদে বাংলাৰ একাংশের স্বাধীন শাসক হয়েছিলেন এবং ১৫৯৯ খৃষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে তাঁর মৃত্যু হয়েছিল। (History of Bengal, D. U., Vol. II, p- 238) অন্যদিকে চট্টগ্রামবাসী বাহরাম খানও তাঁর লায়লী-মজনু কাব্যে লিখেছিলেন যে, তাঁর পীর আসাউদ্দীনের প্রপিতামহের নাম ছিল-সদর জাহাঁ (ছদর জাহান বা সদর জাহান)। উক্ত সদর জাহাঁ খৃষ্টীয় ষোড়শ শতাব্দীর শেষপাদে জীবিত থাকলে তাঁর প্রপৌত্রের শিষ্য বাহরাম খান খুব স্বাভাবিকভাবেই ১৬৫৮ থেকে ১৭০৭ খৃষ্টাব্দের মধ্যে জীবিত থাকবার কথা।

লায়লী-মজনুতে কবি তাঁর বংশপরিচয় ও আত্মপরিচয় দেওয়ার সময়ে বলেছিলেন যে, তাঁর আমলে-“ধবল অরুণ গজেশ্বর” —চট্টগ্রামের সার্বভৌম নৃপতি ছিলেন; অর্থাৎ-আরাকানের কোন রাজা তখন চট্টগ্রামের শাসক ছিলেন। (এই প্রসঙ্গে আরো বিস্তারিত আলোচনার জন্য সুখময় মুখোপাধ্যায় প্রণীত ‘বাংলার ইতিহাসের দু’শো বছর’ গ্রন্থের ২য় সংস্করণের ৫৪৫ নং পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্যঃ।) অতীতে অধ্যাপক আলী আহমদ অভিমত প্রকাশ করেছিলেন যে, আরাকানবাজের অনুকরণে চট্টগ্রামের স্বাধীন রাজা নিজাম শাহ— ‘ধবল অরুণ গজেশ্বর’ -উপাধি নিয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর এই ধারণা কোন ঐতিহাসিক তথ্যপ্রমাণ দ্বারা সমর্থিত নয় বলে বর্তমান সময়ের গবেষকরা এটিকে স্বীকার করেন না। ‘ধবল অরুণ গজেশ্বর’ বা এই জাতীয় বিরুদ অন্য কোন দেশের অন্য কোন শাসকের কোনদিন ছিল বলে ইতিহাস থেকে অন্ততঃ প্রমাণ পাওয়া যায় না। কবির পৃষ্ঠপোষক-‘নেজাম শাহা সুর’-যে কোন আরাকানরাজই ছিলেন, সেকথা দু’টি বিষয় থেকে বুঝতে পারা যায়। প্রথমতঃ ‘নেজাম শাহা সুর’ ও আরাকানরাজের নাম কবি তাঁর কাব্যে একইসঙ্গে লিখেছিলেন—
“চাটিগ্রাম অধিপতি হইলেন্ত মহামতি
নৃপতি নেজাম শাহা সুর॥
একশত ছত্রধারী সভানের অধিকারী
ধবল অরুণ গজেশ্বর॥
রজনী সময় হৈলে মাণিক্য প্রদীপ জ্বলে
অপরূপ পুরীর অন্তর॥”

দ্বিতীয়তঃ, কবি তাঁর কাব্যের একজায়গায় ‘নেজাম শাহা’–কে ‘মহারাজ’ বলে উল্লেখ করেছিলেন, যা সেযুগের মুসলমান কবিরা কোন মুসলমান শাসককে সচরাচর বলতেন না। ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, ১৪৩০ খৃষ্টাব্দের পর থেকে আরাকানের রাজারা নিজেদের নামের সঙ্গে একটি করে মুসলমানী নামও নিতেন; সুতরাং- ‘নেজাম শাহা’ও সেরকমই একটি নাম ছিল।
গবেষকদের মতে, উক্ত ‘নেজাম শাহা’ যে সময়ে কবিকে ‘দৌলত উজীর’ খেতাব দিয়েছিলেন এবং যে সময়ে কবি তাঁর ‘লায়লী-মজনু’ কাব্যটি রচনা করেছিলেন-এই দুই সময়ের মধ্যে বহু ব্যবধান রয়েছে। অতীতে এই প্রসঙ্গে অধ্যাপক আলী আহমদ লিখেছিলেন—
“(খেতাব পাওয়ার সময়ে) বাহরামের বয়স এত অল্প ছিল যে, দৌলত-উজীরের পদ-প্রাপ্তি তাঁহার পক্ষে আশা করা সম্ভবপর ছিল না। কিন্তু নিজাম শাহ তাঁহার প্রতি অনুগ্রহ প্রদর্শন করিলেন।
‘পিতাহীন শিশু জানি দয়াধর্ম মনে মানি
বাপের খেতাব দিলা মোরে॥’
তিনি যখন লায়লী-মজনু কাব্য লিখেন তখন তাঁহার বয়স সম্বন্ধে কবি নিজেই বলিয়াছেন—
‘এবে মোর বৃদ্ধ কাল হৈল উপস্থিত।
বুদ্ধি সুদ্ধি পরাক্রম সকল খণ্ডিত॥’ …”

প্রথম বয়সে, ‘দৌলত-উজীর’ খেতাব পাওয়ার কিছুকাল পরে কবি যখন কারবালার কাহিনী অবলম্বনে একটি কাব্য লিখেছিলেন (সেই কাব্যটিকে পরবর্তীকালে গ্রন্থটির সম্পাদক আলী আহমদ ‘ইমামবিজয়’ নাম অভিহিত করেছিলেন), তখনও পর্যন্ত তিনি পীরের শিষ্য হননি; তাই তাঁর পীর আসাউদ্দীনের নাম সেই কাব্যের মধ্যে কোথাও পাওয়া যায় না। অন্যদিকে তাঁর লায়লী-মজনু কাব্যের প্রায় প্রতিটি ভনিতাতেই পীর আসাউদ্দীনের নাম পাওয়া যায়। এথেকেও কবির দৌলত-উজীর খেতাব প্রাপ্তি ও লায়লী-মজনু কাব্যটি রচনা করবার মধ্যে বিস্তৃত কালব্যবধান ইতিহাসগতভাবে প্রমাণিত হয়। আর সেই কালব্যবধান থাকবার জন্যই তাঁর পৃষ্ঠপোষকঃ শাসক নেজাম শাহার আসল নাম সম্বন্ধে সঠিকভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়।

বর্তমানে একথা ইতিহাসগতভাবে স্বীকৃত যে- দৌলত-উজীর ঔরঙ্গজেবের রাজত্বকালের কোন একসময়ে লায়লী-মজনু কাব্যটি রচনা করেছিলেন; কিন্তু ঠিক কোন সময়ে রচনা করেছিলেন, সেকথা বলা সম্ভব নয়। আবার উক্ত কাব্যটি রচনা করবার ঠিক কত দিন আগে তিনি দৌলত-উজীর খেতাবটি পেয়েছিলেন, সেকথাও ইতিহাস থেকে জানা যায় না। সুতরাং- তিনি ঠিক কোন আরাকানরাজের পৃষ্ঠপোষণ লাভ করেছিলেন, সেকথা বলাও সম্ভব নয়। অতীতের আরাকানের রাজাদের মধ্যে অনেকেই যেমন তাঁদের মুদ্রায় নিজেদের মুসলমানী নাম উল্লেখ করেছিলেন, তেমনি অনেকেই আবার তেমন কোন নামের উল্লেখ করেননি বলেও দেখা যায়। যেমন-আরাকানরাজ শ্রীসুধর্মার মুসলমানী নাম-‘দ্বিতীয় সেলিম শাহ’ -তাঁর মুদ্রায় উল্লেখিত না হলেও ম্যানরিকের বিবরণীতে তাঁর এই নামটি উল্লেখিত হয়েছিল বলে দেখতে পাওয়া যায়। (এই প্রসঙ্গে বিস্তারিত আলোচনার জন্য লায়লী-মজনুর কাব্যের ২য় সংস্করণের ১৫ নং পৃষ্ঠায় ডঃ আহমদ শরীফ লিখিত ভূমিকা দ্রষ্টব্যঃ।) তাই অতীতের কোন আরাকান রাজের ‘নেজাম শাহা’, অর্থাৎ- নিজাম শাহ নাম ছিল, সেকথা ইতিহাস থেকে এখনও আবিষ্কার করা সম্ভব হয়নি। তবে বর্তমান সময়ের গবেষকদের মতে, দৌলত উজীরের লায়লী-মজনু রচনার সময়ে যদি উক্ত ‘নেজাম শাহা’ জীবিত থেকে থাকেন, তাহলে তিনি তৎকালীন আরাকানরাজ শ্রীচন্দ্রসুধর্মা হওয়াই সম্ভব। তবে ‘নেজাম শাহা’ যে বাস্তবে সেই সময়ে জীবিত ছিলেন, একথার কোন প্রমাণ ইতিহাসে পাওয়া যায় না।

কাব্যের মধ্যে ‘চৌতিশা’–য় দৌলত উজীর ‘ক্ষ’ দিয়ে শ্লোক রচনা করবার সময়ে- “ক্ষিতিত নেজাম শাহা বীর” -বলেছিলেন, কিন্তু এর থেকেও কিছু প্রমাণিত হয় না; কারণ-সেযুগে মৃত বীরদের বীরত্বের প্রশংসাও কবিরা ঐ একইভাবে করে থাকতেন। এছাড়া কবির ‘ইমামবিজয়’ (গ্রন্থটির সম্পাদক আলী আহমদ প্রদত্ত নাম) কাব্যটিও উক্ত নিজাম শাহের রাজত্বকালেই রচিত হয়েছিল; কারণ-সেই গ্রন্থের একজায়গায় কবি বলেছিলেন—
“নৃপতি নিঝাম শাহ রাজ্যঅধিপতি।
যশবন্ত বলবন্ত শক্তিবন্ত অতি॥”

অতীতে ডঃ আহমদ শরীফ, ডঃ আবদুল করিম এবং অধ্যাপক আলী আহমদ একথা স্বীকার করতে চাননি যে, লায়লী-মজনু কাব্যটি ঔরঙ্গজেবের রাজত্বকালে রচিত হয়েছিল। তাঁদের মতে ঐ কাব্যটি এর অনেক আগেকার রচনা ছিল। কিন্তু নিম্নোক্ত বিষয়গুলি বিবেচনা করে পরবর্তী সময়ের গবেষকরা এই প্রসঙ্গে তাঁদের সঙ্গে সহমত পোষণ করতে পারেননি-
(১) এখনও পর্যন্ত লায়লী-মজনুর পাঁচটি প্রাচীন পুঁথিতে-‘আওরঙ্গ শাহা’ বা ঔরঙ্গজেবের -প্রশস্তি পাওয়া গিয়েছে; এছাড়া আরও চারটি প্রাচীন পুঁথিতে সেই একই প্রশস্তি ছিল বলে ডঃ আহমদ শরীফ অনুমান করেছিলেন। (বিস্তারিত তথ্যের জন্য লায়লী-মজনুর ২য় সংস্করণের ভূমিকা অংশের ৮-৯ নং পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্যঃ।) সুতরাং-কাব্যটির এতগুলি প্রাচীন পুঁথিতে একটি প্রক্ষিপ্ত প্রশস্তি হঠাৎই স্থান পেয়ে গিয়েছিল বলে কিছুতেই স্বীকার করা যায় না।

(২) বাহরাম খানকে ঔরঙ্গজেবের সমসাময়িক বলে ধরে নিলে তাঁর গুরুর প্রপিতামহ সদর জাহাঁকে যে সময়ে পাওয়া যায়, ঠিক সেই সময়েই মহম্মদ খানের মাতামহের পিতা সদর জাহাঁকেও পাওয়া যায়। তাঁরা দু’জনেই চট্টগ্রামবাসী ও দু’জনেই পীর ছিলেন। এছাড়া ‘সদর জাহাঁ’ উপাধিটিও সেযুগে মোটেই সুলভ ছিল না। অতীতে এই প্রসঙ্গে ডঃ আবদুল করিম লিখেছিলেন যে- “বিভিন্ন লোকের এই উপাধি থাকা সম্ভব।” কিন্তু-সেযুগের শিলালিপি, সাহিত্য ও অন্যান্য ঐতিহাসিক সূত্রগুলির কোথাও এই একই উপাধির অন্য কোন অধিকারীর সন্ধান পাওয়া যায় না। উক্ত সদর জাঁহা সেযুগের কোন রাজকর্মচারী বা ভূস্বামী ছিলেন না, তিনি পীর ছিলেন; তাই একজন পীরের পক্ষে সেকালে এই জাতীয় উপাধি লাভ করাটা রীতিমত বিরল ঘটনা বলেই মনে হয়। এবং তাই তখনকার একাধিক পীরের ক্ষেত্রে এই বিরল ঘটনা ঘটবে বলে ভাবা যায় না। এই ব্যাপারে বর্তমান সময়ের গবেষকরা সদর জাহাঁর ক্ষেত্রে একটি সুন্দর ‘synchronism’ পেয়েছেন এবং ঐতিহাসিকদের কাছে এই জাতীয় প্রমাণ অত্যন্ত মূল্যবান। সুতরাং- দুই সদর জাহাঁকে এক না ধরে অন্য কোন উপায় নেই।

এই প্রসঙ্গে আরও উল্লেখ্য যে, অতীতের কোন কোন গবেষক এই মত ব্যক্ত করেছিলেন যে, যেহেতু দুই সদর জাহাঁর মধ্যে একজনের পুত্রের নাম- শাহা আহমদ (মোহাম্মদ খানের মাতামহ) এবং অপরজনের পুত্রের নাম-শাহা জনুদ (আসাউদ্দীনের পিতামহ) ছিল, সেহেতু তাঁরা পৃথক ব্যক্তি ছিলেন। কিন্তু বর্তমান সময়ের গবেষকরা তাঁদের এই মতটি স্বীকার করেননি; কারণ-অন্য পাঁচ জনের মত সদর জাহাঁরও একাধিক পুত্র কেন হতে পারে না, এর কোন কারণ তাঁরা দেখাননি।

(৩) পূর্বোক্ত গবেষকরা দৌলত-উজীরকে খৃষ্টীয় ষোড়শ শতাব্দীর মানুষ বলে মনে করেছিলেন। কিন্তু ইতিহাস বলে যে, ষোড়শ শতাব্দীতে চাটিগ্রাম বা চট্টগ্রাম শহরের প্রাণকেন্দ্র (দিল্লী, পাটনা প্রভৃতি পুরোনো শহরের মত চাটিগ্রাম শহরের অবস্থানও তখন বার বার বদল হয়েছিল) বর্তমান চট্টগ্রাম শহর থেকে আট মাইল দূরে ফতেহাবাদে অবস্থিত ছিল। এসম্বন্ধে অনেক ঐতিহাসিক প্রমাণও পাওয়া যায়। যেমন-এপ্রসঙ্গে দৌলত উজীর নিজেই লিখেছিলেন—
“নগর ফতেয়াবাদ দেখিয়া পূরএ সাধ
চাটিগ্রাম সুনাম প্রকাশ।”

কিন্তু, ১৬৬৬ খৃষ্টাব্দে মোঘলরা যখন মগদের হাত থেকে চাটিগ্রাম(চট্টগ্রাম) জয় করে নিয়েছিলেন, তখন চাটিগ্রাম শহরের প্রাণকেন্দ্র এখনকার চট্টগ্রাম শহরের কেন্দ্রস্থলেই অবস্থিত ছিল। মোঘলদের চট্টগ্রাম বিজয়ের সময়ে মগদের দুর্গ সাম্প্রতিক অতীতের চট্টগ্রাম শহরের সিভিল হাসপাতালের জমি ও টেম্পেস্ট হিলের মাঝখানে অবস্থিত ছিল। চট্টগ্রাম বিজয়ের অব্যবহিত পরে বিজেতা মোঘল বাহিনীর অন্যতম নায়ক বুজুর্গ খান চট্টগ্রামের কেন্দ্রস্থলে একটি জামে মসজিদ নির্মাণ করিয়ে দিয়েছিলেন, এবং সেই মসজিদের সংলগ্ন এলাকাটিই বর্তমানে চট্টগ্রামের সবথেকে কর্মব্যস্ত এলাকা হিসেবে চিহ্নিত। এছাড়া দৌলত-উজীরের আমলেও চাটিগ্রাম শহরের প্রাণকেন্দ্র চট্টগ্রাম শহরেই অবস্থিত ছিল এবং তখন সেই অঞ্চলের বিশিষ্ট নাম যে ‘জাফরাবাদ’ ছিল-একথার ঐতিহাসিক প্রমাণ ‘ইমামবিজয়’ কাব্যে দৌলত-উজীরের এই উক্তিটি থেকে পাওয়া যায়-
“সহর জাফরাবাদ নামে চাটিগ্রাম।
তাহাতে বৈসএ পীর বদর আলাম॥”

একই প্রসঙ্গে একথাও জানিয়ে রাখা যাক যে, দৌলত উজীরের পীর আসাউদ্দীনের বাড়ি ফতেহাবাদে অবস্থিত ছিল। সেই কারণেই দৌলত উজীর তাঁর পীরের বাসভূমিকে শুধুমাত্র-‘নগর ফতেয়াবাদ নাম’ -বললেও-‘চাটিগ্রাম-কিন্তু বলেননি। এথেকেও বোঝা যায় যে, দৌলত উজীরের আমলে চাটিগ্রাম শহরটি ফতেহাবাদ থেকে সরে গিয়েছিল।

পীর বদর আলমের দরগাহ এখনকার চট্টগ্রাম শহরের মধ্যেই বরাবর ছিল ও বর্তমানেও সেখানেই রয়েছে। এমনকি মোঘলদের চাটিগ্রাম বিজয়ের সময়েও পীর বদরের দরগাহটি যে খাস চট্টগ্রাম শহরের অন্তর্ভুক্ত ছিল, সেকথা শিহাবুদ্দীন তালিশের বিবরণ পড়লেই জানতে পারা যায়। ‘ইমামবিজয়’ কাব্যে দৌলত উজীর স্পষ্টভাবেই বলেছিলেন যে, তাঁর সময়েও ‘চাটিগ্রাম’ শহরের মধ্যেই পীর বদর আলমের দরগাহটি অবস্থিত ছিল। কিন্তু খৃষ্টীয় ষোড়শ শতাব্দীতে ঐ দরগাহটি সেই একই ভূমিতে অবস্থিত থাকলেও সেই ভূমিকে চাটিগ্রাম থেকে কিছু দূরে অবস্থিত পার্বত্যভূমি বলে গণ্য করা হত। দৌলত উজীর তাঁর কাব্যে খৃষ্টীয় ষোড়শ শতাব্দীর চাটিগ্রাম সম্বন্ধে ও তাঁর পূর্বপুরুষ হামিদ খানের প্রসঙ্গে লিখেছিলেন-
“চৌদিকে পর্বত গড় অধিক উঞ্চলতর
তাত শাহা বদর আলাম॥”

এখানে দৌলত উজীরের সূক্ষ্ম ইতিহাসজ্ঞান রীতিমত মুগ্ধ করে। বর্তমান সময়ের গবেষকদের মতে এরপরে আর কোন সন্দেহ থাকে না যে, দৌলত উজীর আসলে খৃষ্টীয় সপ্তদশ শতাব্দীর মানুষ ছিলেন।

(৪) খৃষ্টীয় সপ্তদশ শতাব্দীর প্রথমে সৈয়দ সুলতান লিখেছিলেন যে, তাঁর আগে-‘দেশী ভাসে’ -রসুলের কথা নিয়ে অন্য কেউ কাব্য রচনা করেননি। তাই রসুলের কথা নিয়ে কিছু লেখা হওয়ার আগে ইমামদের কথা নিয়ে কাব্য রচিত হয়েছিল বলে ভাবা যায় না। সুতরাং-এদিক থেকেও দৌলত উজীরের ‘ইমামবিজয়’ কাব্যকে খৃষ্টীয় ষোড়শ শতাব্দীর রচনা বলে ভাবা কঠিন। এছাড়া মোহাম্মদ খানও যেভাবে ‘মক্তুল হোসেন’–এর রচনার ইতিহাস বর্ণনা করেছিলেন, সেটার থেকেও মনে হয় যে, তাঁর আগে ইমামদের কাহিনী নিয়ে বাংলা ভাষায় কেউ কিছু লেখেননি।

অতীতে অধ্যাপক আলী আহমদ অভিমত প্রকাশ করেছিলেন (ইমামবিজয় কাব্যের ভূমিকা দ্রষ্টব্যঃ) যে, দৌলত-উজীরের পৃষ্ঠপোষক ‘নেজাম শাহা সুর’ শের খান সুরের, অর্থাৎ- শের শাহের ভাই নিজাম খান সুরের সঙ্গে এবং পর্তুগীজ বিবরণীতে উল্লিখিত শের শাহের সেনাপতি নোগাজিলের সঙ্গে অভিন্ন। কিন্তু-গবেষকদের মতে, এই দুই নিজামের মধ্যে শুধুমাত্র নামসাদৃশ্য ছাড়া অন্য কোন মিল দেখতে পাওয়া যায় না; শের শাহের ভাই নিজাম কোনদিন বাংলায় এসেছিলেন বলে কোথাও উল্লেখ পাওয়া যায় না এবং নিজাম–এর সঙ্গে নোগাজিল–এর যেহেতু কোন ধ্বনিগত সাদৃশ্য নেই, কাজেই এই মত গ্রহণযোগ্য নয়।

ডঃ আহমদ শরীফ অভিমত প্রকাশ করেছিলেন যে, দৌলত-উজীর ১৫৪৩ থেকে ১৫৫৩ খৃষ্টাব্দের মধ্যে লায়লী-মজনু রচনা করেছিলেন। এই প্রসঙ্গে তিনি চারটি বিষয়ের উপর জোর দিয়ে (লায়লী-মজনুর ২য় সংস্করণের ভূমিকা দ্রষ্টব্যঃ) বলেছিলেন যে-

(১) দৌলত উজীর যেহেতু ঔরঙ্গজেবের দেওয়া চট্টগ্রামের নতুন নাম ইসলামাবাদ–এর উল্লেখ করেননি, অতএব তিনি ঔরঙ্গজেবের চট্টগ্রাম বিজয়ের পরে লায়লী-মজনু লেখেননি।

(২) ‘বহারিস্তান গায়বী’ গ্রন্থে জাহাঙ্গীরের আমলে চট্টগ্রামের নিকটবর্তী কোন এক নিজামপুর পরগণার অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া যায়; দৌলত-উজীরের পৃষ্ঠপোষক নিজাম শাহের নামেই সেই পরগণার নামকরণ করা হয়েছিল বলে ডঃ শরীফ মতপ্রকাশ করেছিলেন।

(৩) দৌলত-উজীর লিখেছিলেন যে, হামিদ খানের পরে চট্টগ্রামে—
“অনুক্রমে বংশ কথ গঞিলেন্ত এই মত
গৌড়ের অধীন হইল দূর।
চাটিগ্রাম অধিপতি হইলেন্ত মহামতি
নৃপতি নেজাম শাহা সুর॥”

ডঃ শরীফের মতে-“অনুক্রমে এই মত … অর্থে অল্পকালের মধ্যে গৌড় সিংহাসন ঘন ঘন হাত বদল হওয়া বোঝায়”; এবং চট্টগ্রাম থেকে— “গৌড়ের অধীনতা দূর হবার ঠিক পরেই নিজাম শাহ নৃপতি হয়েছিলেন।”

(৪) অষ্টাদশ শতাব্দীর কবি মুহম্মদ মুকিম ও ঊনবিংশ শতাব্দীর কবি চুহর তাঁর কয়েকজন সমসাময়িক ও পূর্ববর্তী কবির নাম করলেও, সেই নামগুলির মধ্যে— “নেই দৌলত উজিরের নাম। এতে মনে হয়, দৌলত উজির তাঁদের অনেক পূর্ববর্তী কবি।”
ডঃ শরীফের উপরোক্ত বক্তব্যগুলি সম্বন্ধে বর্তমান সময়ের গবেষকদের বক্তব্য নিম্নরূপ—

(১) ঔরঙ্গজেবের দেওয়া চট্টগ্রামের নতুন নাম ‘ইসলামাবাদ’ মোটেই চলে নি, তাছাড়া কোন জায়গার নতুন নাম রাখবার সঙ্গে সঙ্গেই সেটা চালু হয়ে যায় না; উদাহরণস্বরূপ বলা চলে যে, কলকাতার বহু রাস্তার নতুন নাম বেশ কয়েক বছর চালু হওয়ার পরেও সাধারণ মানুষ এখনও সেগুলিকে ব্যবহার করেন না। তাছাড়া দৌলত-উজীর তাঁর লায়লী-মজনুতে হামিদ খানের আমলের চাটিগ্রামের কথা লিখেছিলেন, তাই সেটাকে ইসলামাবাদ বলবার কোন কারণ অন্ততঃ ইতিহাস থেকে পাওয়া যায় না।

(২) নিজামপুর পরগণার নামকরণ যে নিজামের নামে হয়েছিল সেই নিজাম আসলে কে এবং কোন্ সময়ের ব্যক্তি ছিলেন- সেকথা যখন জানা নেই তখন তাঁকে এই প্রসঙ্গের সঙ্গে যুক্ত না করাই সমীচীন।

(৩) “অনুক্রমে বংশ কথ গঞিলেন্ত এই মত”- একথার অর্থ ‘অল্পকালের মধ্যে’ হয় না, বরং একথাটির সহজ অর্থ হল- অনেক পুরুষ পার হয়ে যাবার পরে; সুতরাং-এটা স্পষ্টতঃই বহু দিনের ব্যাপার। “গৌড়ের অধীন … নেজাম শাহা সুর” -উক্তিটি দ্বারা কবি চট্টগ্রামে গৌড়ের অধীনতা দূর হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ‘নেজাম শাহা’ শাসক হয়েছিলেন বলতে চেয়েছিলেন বলে মনে হয় না; বরং গৌড়ের অধীনতা দূর হওয়ার পরে কোন একসময়ে নেজাম শাহা সেখানকার শাসক হয়েছিলেন- একথা বলাই কবির অভিপ্রেত ছিল বলে মনে হয়।

(৪) মুহম্মদ মুকিম ও চুহরের কবি-প্রশস্তিতে খৃষ্টীয় সপ্তদশ শতাব্দীর প্রত্যেকটি মুসলমান কবির নাম যখন পাওয়া যায় না, তখন সেখানে দৌলত উজীরের নাম না থাকাটা থেকে কিছু প্রমাণিত হয় না। এছাড়া এমনিতেও কারও কোন বিষয়ের উল্লেখ না করা থেকে ইতিহাসগতভাবে কিছু প্রমাণিত হয়ে যায় না।

বাঙলা একাডেমী পত্রিকার ১৩৭০ বঙ্গাব্দের শ্রাবণ-আশ্বিন সংখ্যার ১-১৬ নং পৃষ্ঠায় প্রকাশিত একটি প্রবন্ধে ডঃ আবদুল করিম মতপ্রকাশ করেছিলেন যে-নেজাম শাহা সুর আসলে কোন আরাকানরাজ ছিলেন না, বরং তিনি আরাকানরাজের অধীনস্থ একজন শাসনকর্তা ছিলেন। যেহেতু ১৬০৭ খৃষ্টাব্দের পরে আরাকানের রাজারা চট্টগ্রামে মগ শাসনকর্তা নিযুক্ত করতেন এবং যেহেতু ১৫৮৬ খৃষ্টাব্দ থেকে ১৬০৭ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত চট্টগ্রামের কোন শাসনকর্তার নাম ইতিহাসে পাওয়া যায় না, অতএব- নেজাম শাহা সুর -১৫৮৬ থেকে ১৬০৭ খৃষ্টাব্দের মধ্যে কোন এক সময়ে চট্টগ্রামের শাসনকর্তা ছিলেন।

বর্তমান সময়ের গবেষকদের মতে, ডঃ করিমের এই অভিমতের পিছনে ‘Begging the question’ নামের একটা fallacy দেখতে পাওয়া যায়। অর্থাৎ-তিনি প্রথমে নেজাম শাহাকে আরাকানরাজের অধীনস্থ শাসনকর্তা হিসাবে ধরে নিয়ে তারপরে তাঁর সময় অন্বেষণ করেছিলেন। কিন্তু— সেই ধরে নেওয়ার অনুকূলে তিনি কোন ঐতিহাসিক প্রমাণ দেননি।

যাই হোক, এখনও পর্যন্ত যা কিছু আলোচনা করা হয়েছে, সেটার ভিত্তিতে নিম্নলিখিত সিদ্ধান্তগুলি নেওয়া যেতে পারে—
(১) কবি বাহরাম খান- নিজাম শাহ -এই মুসলমানী নামধারী কোন একজন আরাকানরাজের সমসাময়িক ছিলেন ও তাঁর কাছে তিনি অতি অল্প বয়সে দৌলত-উজীর খেতাবটি পেয়েছিলেন।

(২) ঐ খেতাব পাওয়ার কিছুকাল পরে উক্ত নিজাম শাহের রাজত্বকালেই তিনি তাঁর ‘ইমামবিজয়’ কাব্যটি রচনা করেছিলেন।

(৩) এর অনেকদিন পরে শায়েস্তা খানের অধীনস্থ মোঘল বাহিনীর চট্টগ্রাম বিজয়ের (১৬৬৬ খৃষ্টাব্দে) পরে তিনি তাঁর ‘লায়লী-মজনু’ কাব্যটি রচনা করেছিলেন; এবং তখন মোঘল সম্রাট ঔরঙ্গজেবই যেহেতু বাহরাম খানের বাসভূমি চট্টগ্রামের সার্বভৌম অধীশ্বর ছিলেন, সেহেতু কবি তাঁর কাব্যে তাঁরই প্রশস্তি রচনা করেছিলেন।লেখক: রানা চক্রবর্তী, বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

রানা চক্রবর্তী: দৌলত-উজীর বাহরাম খান লায়লা-মজনুর অমর উপাখ্যান অবলম্বনে বাংলা ভাষায় ‘লায়লী-মজনু’ কাব্য রচনা করেছিলেন। এর আগে অল্প বয়সে তিনি কারবালার কাহিনী নিয়ে বাংলা ভাষায় আরেকটি কাব্য লিখেছিলেন।‘লায়লী-মজনু’ কাব্যে দৌলত উজীর লিখেছিলেন যে, তাঁর পূর্বপুরুষ হামিদ খান, বাংলার সুলতান হোসেন শাহের (১৪৯৩-১৫১৯ খৃষ্টাব্দ) প্রধান উজীর ছিলেন।

হোসেন শাহ হামিদ খানের গুণ ও অলৌকিক শক্তির পরিচয় পেয়ে তাঁকে ‘দুই সিক’ দান করেছিলেন এবং চাটিগ্রাম বা ফতেহাবাদের অধিকারীর পদে নিযুক্ত করেছিলেন। এরপরে হামিদ খানের বংশধরেরা চট্টগ্রামেই বাস করতে শুরু করেছিলেন। বাহরাম খানের আমলে চট্টগ্রামের অধিপতি ছিলেন-‘নৃপতি নেজাম শাহা সুর (শূর)’। তিনি প্রথমে কবির পিতাকে এবং তাঁর মৃত্যুর পর স্বয়ং কবিকে-‘দৌলত উজীর’ -খেতাব দিয়েছিলেন; অর্থাৎ-কবিকে তিনি তাঁর রাজ্যের অর্থবিভাগের কোন একটি উচ্চপদে নিযুক্ত করেছিলেন।

এখানে উল্লেখ্য যে, সেকালের ‘উজীর’ আখ্যাধারী রাজকর্মচারীরা রাজ্যের রাজধানীতে যেমন নিযুক্ত হতেন, তেমনি বাইরেও নিযুক্ত হতেন। বাংলার স্বাধীন সুলতানদের বহু শিলালিপিতে দেখা যায় যে, সেযুগে উজীর আখ্যাধারী অনেক রাজকর্মচারীর কর্মক্ষেত্র রাজধানী থেকে বহুদূরে কোন জায়গায় অবস্থিত ছিল।

দৌলত-উজীর বাহরাম খান যে মুঘল সম্রাট ঔরঙ্গজেবের রাজত্বকালেই (১৬৫৮-১৭০৭ খৃষ্টাব্দ) ‘লায়লী-মজনু’ কাব্যটি রচনা করেছিলেন, সেবিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। কারণ লায়লী-মজনুর উপক্রমে-‘আওরঙ্গ শাহা দিল্লীশ্বর’–এর প্রশস্তি পাওয়া যায় এবং এই প্রশস্তিকে প্রক্ষিপ্ত বলে মনে করবার কোন কারণ অন্ততঃ গবেষকরা খুঁজে পাননি। বাহরাম খান যে ঔরঙ্গজেবের সমসাময়িক ছিলেন, সেটার অন্য ঐতিহাসিক প্রমাণও পাওয়া যায়। চট্টগ্রাম-নিবাসী কবি মোহাম্মদ খানের লেখা ‘মক্তুল-হোসেন’ কাব্যে (রচনাকাল ১৬৪৬ খৃষ্টাব্দ) একজন পীর সদর জাঁহার উল্লেখ পাওয়া যায়, যাঁকে বারো ভূইয়ার অন্যতম ঈশা খাঁ সংবর্ধিত করেছিলেন।

ঈশা খাঁ- খৃষ্টীয় ষোড়শ শতাব্দীর শেষপাদে বাংলাৰ একাংশের স্বাধীন শাসক হয়েছিলেন এবং ১৫৯৯ খৃষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে তাঁর মৃত্যু হয়েছিল। (History of Bengal, D. U., Vol. II, p- 238) অন্যদিকে চট্টগ্রামবাসী বাহরাম খানও তাঁর লায়লী-মজনু কাব্যে লিখেছিলেন যে, তাঁর পীর আসাউদ্দীনের প্রপিতামহের নাম ছিল-সদর জাহাঁ (ছদর জাহান বা সদর জাহান)। উক্ত সদর জাহাঁ খৃষ্টীয় ষোড়শ শতাব্দীর শেষপাদে জীবিত থাকলে তাঁর প্রপৌত্রের শিষ্য বাহরাম খান খুব স্বাভাবিকভাবেই ১৬৫৮ থেকে ১৭০৭ খৃষ্টাব্দের মধ্যে জীবিত থাকবার কথা।

লায়লী-মজনুতে কবি তাঁর বংশপরিচয় ও আত্মপরিচয় দেওয়ার সময়ে বলেছিলেন যে, তাঁর আমলে-“ধবল অরুণ গজেশ্বর” —চট্টগ্রামের সার্বভৌম নৃপতি ছিলেন; অর্থাৎ-আরাকানের কোন রাজা তখন চট্টগ্রামের শাসক ছিলেন। (এই প্রসঙ্গে আরো বিস্তারিত আলোচনার জন্য সুখময় মুখোপাধ্যায় প্রণীত ‘বাংলার ইতিহাসের দু’শো বছর’ গ্রন্থের ২য় সংস্করণের ৫৪৫ নং পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্যঃ।) অতীতে অধ্যাপক আলী আহমদ অভিমত প্রকাশ করেছিলেন যে, আরাকানবাজের অনুকরণে চট্টগ্রামের স্বাধীন রাজা নিজাম শাহ— ‘ধবল অরুণ গজেশ্বর’ -উপাধি নিয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর এই ধারণা কোন ঐতিহাসিক তথ্যপ্রমাণ দ্বারা সমর্থিত নয় বলে বর্তমান সময়ের গবেষকরা এটিকে স্বীকার করেন না। ‘ধবল অরুণ গজেশ্বর’ বা এই জাতীয় বিরুদ অন্য কোন দেশের অন্য কোন শাসকের কোনদিন ছিল বলে ইতিহাস থেকে অন্ততঃ প্রমাণ পাওয়া যায় না। কবির পৃষ্ঠপোষক-‘নেজাম শাহা সুর’-যে কোন আরাকানরাজই ছিলেন, সেকথা দু’টি বিষয় থেকে বুঝতে পারা যায়। প্রথমতঃ ‘নেজাম শাহা সুর’ ও আরাকানরাজের নাম কবি তাঁর কাব্যে একইসঙ্গে লিখেছিলেন—
“চাটিগ্রাম অধিপতি হইলেন্ত মহামতি
নৃপতি নেজাম শাহা সুর॥
একশত ছত্রধারী সভানের অধিকারী
ধবল অরুণ গজেশ্বর॥
রজনী সময় হৈলে মাণিক্য প্রদীপ জ্বলে
অপরূপ পুরীর অন্তর॥”

দ্বিতীয়তঃ, কবি তাঁর কাব্যের একজায়গায় ‘নেজাম শাহা’–কে ‘মহারাজ’ বলে উল্লেখ করেছিলেন, যা সেযুগের মুসলমান কবিরা কোন মুসলমান শাসককে সচরাচর বলতেন না। ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, ১৪৩০ খৃষ্টাব্দের পর থেকে আরাকানের রাজারা নিজেদের নামের সঙ্গে একটি করে মুসলমানী নামও নিতেন; সুতরাং- ‘নেজাম শাহা’ও সেরকমই একটি নাম ছিল।
গবেষকদের মতে, উক্ত ‘নেজাম শাহা’ যে সময়ে কবিকে ‘দৌলত উজীর’ খেতাব দিয়েছিলেন এবং যে সময়ে কবি তাঁর ‘লায়লী-মজনু’ কাব্যটি রচনা করেছিলেন-এই দুই সময়ের মধ্যে বহু ব্যবধান রয়েছে। অতীতে এই প্রসঙ্গে অধ্যাপক আলী আহমদ লিখেছিলেন—
“(খেতাব পাওয়ার সময়ে) বাহরামের বয়স এত অল্প ছিল যে, দৌলত-উজীরের পদ-প্রাপ্তি তাঁহার পক্ষে আশা করা সম্ভবপর ছিল না। কিন্তু নিজাম শাহ তাঁহার প্রতি অনুগ্রহ প্রদর্শন করিলেন।
‘পিতাহীন শিশু জানি দয়াধর্ম মনে মানি
বাপের খেতাব দিলা মোরে॥’
তিনি যখন লায়লী-মজনু কাব্য লিখেন তখন তাঁহার বয়স সম্বন্ধে কবি নিজেই বলিয়াছেন—
‘এবে মোর বৃদ্ধ কাল হৈল উপস্থিত।
বুদ্ধি সুদ্ধি পরাক্রম সকল খণ্ডিত॥’ …”

প্রথম বয়সে, ‘দৌলত-উজীর’ খেতাব পাওয়ার কিছুকাল পরে কবি যখন কারবালার কাহিনী অবলম্বনে একটি কাব্য লিখেছিলেন (সেই কাব্যটিকে পরবর্তীকালে গ্রন্থটির সম্পাদক আলী আহমদ ‘ইমামবিজয়’ নাম অভিহিত করেছিলেন), তখনও পর্যন্ত তিনি পীরের শিষ্য হননি; তাই তাঁর পীর আসাউদ্দীনের নাম সেই কাব্যের মধ্যে কোথাও পাওয়া যায় না। অন্যদিকে তাঁর লায়লী-মজনু কাব্যের প্রায় প্রতিটি ভনিতাতেই পীর আসাউদ্দীনের নাম পাওয়া যায়। এথেকেও কবির দৌলত-উজীর খেতাব প্রাপ্তি ও লায়লী-মজনু কাব্যটি রচনা করবার মধ্যে বিস্তৃত কালব্যবধান ইতিহাসগতভাবে প্রমাণিত হয়। আর সেই কালব্যবধান থাকবার জন্যই তাঁর পৃষ্ঠপোষকঃ শাসক নেজাম শাহার আসল নাম সম্বন্ধে সঠিকভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়।

বর্তমানে একথা ইতিহাসগতভাবে স্বীকৃত যে- দৌলত-উজীর ঔরঙ্গজেবের রাজত্বকালের কোন একসময়ে লায়লী-মজনু কাব্যটি রচনা করেছিলেন; কিন্তু ঠিক কোন সময়ে রচনা করেছিলেন, সেকথা বলা সম্ভব নয়। আবার উক্ত কাব্যটি রচনা করবার ঠিক কত দিন আগে তিনি দৌলত-উজীর খেতাবটি পেয়েছিলেন, সেকথাও ইতিহাস থেকে জানা যায় না। সুতরাং- তিনি ঠিক কোন আরাকানরাজের পৃষ্ঠপোষণ লাভ করেছিলেন, সেকথা বলাও সম্ভব নয়। অতীতের আরাকানের রাজাদের মধ্যে অনেকেই যেমন তাঁদের মুদ্রায় নিজেদের মুসলমানী নাম উল্লেখ করেছিলেন, তেমনি অনেকেই আবার তেমন কোন নামের উল্লেখ করেননি বলেও দেখা যায়। যেমন-আরাকানরাজ শ্রীসুধর্মার মুসলমানী নাম-‘দ্বিতীয় সেলিম শাহ’ -তাঁর মুদ্রায় উল্লেখিত না হলেও ম্যানরিকের বিবরণীতে তাঁর এই নামটি উল্লেখিত হয়েছিল বলে দেখতে পাওয়া যায়। (এই প্রসঙ্গে বিস্তারিত আলোচনার জন্য লায়লী-মজনুর কাব্যের ২য় সংস্করণের ১৫ নং পৃষ্ঠায় ডঃ আহমদ শরীফ লিখিত ভূমিকা দ্রষ্টব্যঃ।) তাই অতীতের কোন আরাকান রাজের ‘নেজাম শাহা’, অর্থাৎ- নিজাম শাহ নাম ছিল, সেকথা ইতিহাস থেকে এখনও আবিষ্কার করা সম্ভব হয়নি। তবে বর্তমান সময়ের গবেষকদের মতে, দৌলত উজীরের লায়লী-মজনু রচনার সময়ে যদি উক্ত ‘নেজাম শাহা’ জীবিত থেকে থাকেন, তাহলে তিনি তৎকালীন আরাকানরাজ শ্রীচন্দ্রসুধর্মা হওয়াই সম্ভব। তবে ‘নেজাম শাহা’ যে বাস্তবে সেই সময়ে জীবিত ছিলেন, একথার কোন প্রমাণ ইতিহাসে পাওয়া যায় না।

কাব্যের মধ্যে ‘চৌতিশা’–য় দৌলত উজীর ‘ক্ষ’ দিয়ে শ্লোক রচনা করবার সময়ে- “ক্ষিতিত নেজাম শাহা বীর” -বলেছিলেন, কিন্তু এর থেকেও কিছু প্রমাণিত হয় না; কারণ-সেযুগে মৃত বীরদের বীরত্বের প্রশংসাও কবিরা ঐ একইভাবে করে থাকতেন। এছাড়া কবির ‘ইমামবিজয়’ (গ্রন্থটির সম্পাদক আলী আহমদ প্রদত্ত নাম) কাব্যটিও উক্ত নিজাম শাহের রাজত্বকালেই রচিত হয়েছিল; কারণ-সেই গ্রন্থের একজায়গায় কবি বলেছিলেন—
“নৃপতি নিঝাম শাহ রাজ্যঅধিপতি।
যশবন্ত বলবন্ত শক্তিবন্ত অতি॥”

অতীতে ডঃ আহমদ শরীফ, ডঃ আবদুল করিম এবং অধ্যাপক আলী আহমদ একথা স্বীকার করতে চাননি যে, লায়লী-মজনু কাব্যটি ঔরঙ্গজেবের রাজত্বকালে রচিত হয়েছিল। তাঁদের মতে ঐ কাব্যটি এর অনেক আগেকার রচনা ছিল। কিন্তু নিম্নোক্ত বিষয়গুলি বিবেচনা করে পরবর্তী সময়ের গবেষকরা এই প্রসঙ্গে তাঁদের সঙ্গে সহমত পোষণ করতে পারেননি-
(১) এখনও পর্যন্ত লায়লী-মজনুর পাঁচটি প্রাচীন পুঁথিতে-‘আওরঙ্গ শাহা’ বা ঔরঙ্গজেবের -প্রশস্তি পাওয়া গিয়েছে; এছাড়া আরও চারটি প্রাচীন পুঁথিতে সেই একই প্রশস্তি ছিল বলে ডঃ আহমদ শরীফ অনুমান করেছিলেন। (বিস্তারিত তথ্যের জন্য লায়লী-মজনুর ২য় সংস্করণের ভূমিকা অংশের ৮-৯ নং পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্যঃ।) সুতরাং-কাব্যটির এতগুলি প্রাচীন পুঁথিতে একটি প্রক্ষিপ্ত প্রশস্তি হঠাৎই স্থান পেয়ে গিয়েছিল বলে কিছুতেই স্বীকার করা যায় না।

(২) বাহরাম খানকে ঔরঙ্গজেবের সমসাময়িক বলে ধরে নিলে তাঁর গুরুর প্রপিতামহ সদর জাহাঁকে যে সময়ে পাওয়া যায়, ঠিক সেই সময়েই মহম্মদ খানের মাতামহের পিতা সদর জাহাঁকেও পাওয়া যায়। তাঁরা দু’জনেই চট্টগ্রামবাসী ও দু’জনেই পীর ছিলেন। এছাড়া ‘সদর জাহাঁ’ উপাধিটিও সেযুগে মোটেই সুলভ ছিল না। অতীতে এই প্রসঙ্গে ডঃ আবদুল করিম লিখেছিলেন যে- “বিভিন্ন লোকের এই উপাধি থাকা সম্ভব।” কিন্তু-সেযুগের শিলালিপি, সাহিত্য ও অন্যান্য ঐতিহাসিক সূত্রগুলির কোথাও এই একই উপাধির অন্য কোন অধিকারীর সন্ধান পাওয়া যায় না। উক্ত সদর জাঁহা সেযুগের কোন রাজকর্মচারী বা ভূস্বামী ছিলেন না, তিনি পীর ছিলেন; তাই একজন পীরের পক্ষে সেকালে এই জাতীয় উপাধি লাভ করাটা রীতিমত বিরল ঘটনা বলেই মনে হয়। এবং তাই তখনকার একাধিক পীরের ক্ষেত্রে এই বিরল ঘটনা ঘটবে বলে ভাবা যায় না। এই ব্যাপারে বর্তমান সময়ের গবেষকরা সদর জাহাঁর ক্ষেত্রে একটি সুন্দর ‘synchronism’ পেয়েছেন এবং ঐতিহাসিকদের কাছে এই জাতীয় প্রমাণ অত্যন্ত মূল্যবান। সুতরাং- দুই সদর জাহাঁকে এক না ধরে অন্য কোন উপায় নেই।

এই প্রসঙ্গে আরও উল্লেখ্য যে, অতীতের কোন কোন গবেষক এই মত ব্যক্ত করেছিলেন যে, যেহেতু দুই সদর জাহাঁর মধ্যে একজনের পুত্রের নাম- শাহা আহমদ (মোহাম্মদ খানের মাতামহ) এবং অপরজনের পুত্রের নাম-শাহা জনুদ (আসাউদ্দীনের পিতামহ) ছিল, সেহেতু তাঁরা পৃথক ব্যক্তি ছিলেন। কিন্তু বর্তমান সময়ের গবেষকরা তাঁদের এই মতটি স্বীকার করেননি; কারণ-অন্য পাঁচ জনের মত সদর জাহাঁরও একাধিক পুত্র কেন হতে পারে না, এর কোন কারণ তাঁরা দেখাননি।

(৩) পূর্বোক্ত গবেষকরা দৌলত-উজীরকে খৃষ্টীয় ষোড়শ শতাব্দীর মানুষ বলে মনে করেছিলেন। কিন্তু ইতিহাস বলে যে, ষোড়শ শতাব্দীতে চাটিগ্রাম বা চট্টগ্রাম শহরের প্রাণকেন্দ্র (দিল্লী, পাটনা প্রভৃতি পুরোনো শহরের মত চাটিগ্রাম শহরের অবস্থানও তখন বার বার বদল হয়েছিল) বর্তমান চট্টগ্রাম শহর থেকে আট মাইল দূরে ফতেহাবাদে অবস্থিত ছিল। এসম্বন্ধে অনেক ঐতিহাসিক প্রমাণও পাওয়া যায়। যেমন-এপ্রসঙ্গে দৌলত উজীর নিজেই লিখেছিলেন—
“নগর ফতেয়াবাদ দেখিয়া পূরএ সাধ
চাটিগ্রাম সুনাম প্রকাশ।”

কিন্তু, ১৬৬৬ খৃষ্টাব্দে মোঘলরা যখন মগদের হাত থেকে চাটিগ্রাম(চট্টগ্রাম) জয় করে নিয়েছিলেন, তখন চাটিগ্রাম শহরের প্রাণকেন্দ্র এখনকার চট্টগ্রাম শহরের কেন্দ্রস্থলেই অবস্থিত ছিল। মোঘলদের চট্টগ্রাম বিজয়ের সময়ে মগদের দুর্গ সাম্প্রতিক অতীতের চট্টগ্রাম শহরের সিভিল হাসপাতালের জমি ও টেম্পেস্ট হিলের মাঝখানে অবস্থিত ছিল। চট্টগ্রাম বিজয়ের অব্যবহিত পরে বিজেতা মোঘল বাহিনীর অন্যতম নায়ক বুজুর্গ খান চট্টগ্রামের কেন্দ্রস্থলে একটি জামে মসজিদ নির্মাণ করিয়ে দিয়েছিলেন, এবং সেই মসজিদের সংলগ্ন এলাকাটিই বর্তমানে চট্টগ্রামের সবথেকে কর্মব্যস্ত এলাকা হিসেবে চিহ্নিত। এছাড়া দৌলত-উজীরের আমলেও চাটিগ্রাম শহরের প্রাণকেন্দ্র চট্টগ্রাম শহরেই অবস্থিত ছিল এবং তখন সেই অঞ্চলের বিশিষ্ট নাম যে ‘জাফরাবাদ’ ছিল-একথার ঐতিহাসিক প্রমাণ ‘ইমামবিজয়’ কাব্যে দৌলত-উজীরের এই উক্তিটি থেকে পাওয়া যায়-
“সহর জাফরাবাদ নামে চাটিগ্রাম।
তাহাতে বৈসএ পীর বদর আলাম॥”

একই প্রসঙ্গে একথাও জানিয়ে রাখা যাক যে, দৌলত উজীরের পীর আসাউদ্দীনের বাড়ি ফতেহাবাদে অবস্থিত ছিল। সেই কারণেই দৌলত উজীর তাঁর পীরের বাসভূমিকে শুধুমাত্র-‘নগর ফতেয়াবাদ নাম’ -বললেও-‘চাটিগ্রাম-কিন্তু বলেননি। এথেকেও বোঝা যায় যে, দৌলত উজীরের আমলে চাটিগ্রাম শহরটি ফতেহাবাদ থেকে সরে গিয়েছিল।

পীর বদর আলমের দরগাহ এখনকার চট্টগ্রাম শহরের মধ্যেই বরাবর ছিল ও বর্তমানেও সেখানেই রয়েছে। এমনকি মোঘলদের চাটিগ্রাম বিজয়ের সময়েও পীর বদরের দরগাহটি যে খাস চট্টগ্রাম শহরের অন্তর্ভুক্ত ছিল, সেকথা শিহাবুদ্দীন তালিশের বিবরণ পড়লেই জানতে পারা যায়। ‘ইমামবিজয়’ কাব্যে দৌলত উজীর স্পষ্টভাবেই বলেছিলেন যে, তাঁর সময়েও ‘চাটিগ্রাম’ শহরের মধ্যেই পীর বদর আলমের দরগাহটি অবস্থিত ছিল। কিন্তু খৃষ্টীয় ষোড়শ শতাব্দীতে ঐ দরগাহটি সেই একই ভূমিতে অবস্থিত থাকলেও সেই ভূমিকে চাটিগ্রাম থেকে কিছু দূরে অবস্থিত পার্বত্যভূমি বলে গণ্য করা হত। দৌলত উজীর তাঁর কাব্যে খৃষ্টীয় ষোড়শ শতাব্দীর চাটিগ্রাম সম্বন্ধে ও তাঁর পূর্বপুরুষ হামিদ খানের প্রসঙ্গে লিখেছিলেন-
“চৌদিকে পর্বত গড় অধিক উঞ্চলতর
তাত শাহা বদর আলাম॥”

এখানে দৌলত উজীরের সূক্ষ্ম ইতিহাসজ্ঞান রীতিমত মুগ্ধ করে। বর্তমান সময়ের গবেষকদের মতে এরপরে আর কোন সন্দেহ থাকে না যে, দৌলত উজীর আসলে খৃষ্টীয় সপ্তদশ শতাব্দীর মানুষ ছিলেন।

(৪) খৃষ্টীয় সপ্তদশ শতাব্দীর প্রথমে সৈয়দ সুলতান লিখেছিলেন যে, তাঁর আগে-‘দেশী ভাসে’ -রসুলের কথা নিয়ে অন্য কেউ কাব্য রচনা করেননি। তাই রসুলের কথা নিয়ে কিছু লেখা হওয়ার আগে ইমামদের কথা নিয়ে কাব্য রচিত হয়েছিল বলে ভাবা যায় না। সুতরাং-এদিক থেকেও দৌলত উজীরের ‘ইমামবিজয়’ কাব্যকে খৃষ্টীয় ষোড়শ শতাব্দীর রচনা বলে ভাবা কঠিন। এছাড়া মোহাম্মদ খানও যেভাবে ‘মক্তুল হোসেন’–এর রচনার ইতিহাস বর্ণনা করেছিলেন, সেটার থেকেও মনে হয় যে, তাঁর আগে ইমামদের কাহিনী নিয়ে বাংলা ভাষায় কেউ কিছু লেখেননি।

অতীতে অধ্যাপক আলী আহমদ অভিমত প্রকাশ করেছিলেন (ইমামবিজয় কাব্যের ভূমিকা দ্রষ্টব্যঃ) যে, দৌলত-উজীরের পৃষ্ঠপোষক ‘নেজাম শাহা সুর’ শের খান সুরের, অর্থাৎ- শের শাহের ভাই নিজাম খান সুরের সঙ্গে এবং পর্তুগীজ বিবরণীতে উল্লিখিত শের শাহের সেনাপতি নোগাজিলের সঙ্গে অভিন্ন। কিন্তু-গবেষকদের মতে, এই দুই নিজামের মধ্যে শুধুমাত্র নামসাদৃশ্য ছাড়া অন্য কোন মিল দেখতে পাওয়া যায় না; শের শাহের ভাই নিজাম কোনদিন বাংলায় এসেছিলেন বলে কোথাও উল্লেখ পাওয়া যায় না এবং নিজাম–এর সঙ্গে নোগাজিল–এর যেহেতু কোন ধ্বনিগত সাদৃশ্য নেই, কাজেই এই মত গ্রহণযোগ্য নয়।

ডঃ আহমদ শরীফ অভিমত প্রকাশ করেছিলেন যে, দৌলত-উজীর ১৫৪৩ থেকে ১৫৫৩ খৃষ্টাব্দের মধ্যে লায়লী-মজনু রচনা করেছিলেন। এই প্রসঙ্গে তিনি চারটি বিষয়ের উপর জোর দিয়ে (লায়লী-মজনুর ২য় সংস্করণের ভূমিকা দ্রষ্টব্যঃ) বলেছিলেন যে-

(১) দৌলত উজীর যেহেতু ঔরঙ্গজেবের দেওয়া চট্টগ্রামের নতুন নাম ইসলামাবাদ–এর উল্লেখ করেননি, অতএব তিনি ঔরঙ্গজেবের চট্টগ্রাম বিজয়ের পরে লায়লী-মজনু লেখেননি।

(২) ‘বহারিস্তান গায়বী’ গ্রন্থে জাহাঙ্গীরের আমলে চট্টগ্রামের নিকটবর্তী কোন এক নিজামপুর পরগণার অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া যায়; দৌলত-উজীরের পৃষ্ঠপোষক নিজাম শাহের নামেই সেই পরগণার নামকরণ করা হয়েছিল বলে ডঃ শরীফ মতপ্রকাশ করেছিলেন।

(৩) দৌলত-উজীর লিখেছিলেন যে, হামিদ খানের পরে চট্টগ্রামে—
“অনুক্রমে বংশ কথ গঞিলেন্ত এই মত
গৌড়ের অধীন হইল দূর।
চাটিগ্রাম অধিপতি হইলেন্ত মহামতি
নৃপতি নেজাম শাহা সুর॥”

ডঃ শরীফের মতে-“অনুক্রমে এই মত … অর্থে অল্পকালের মধ্যে গৌড় সিংহাসন ঘন ঘন হাত বদল হওয়া বোঝায়”; এবং চট্টগ্রাম থেকে— “গৌড়ের অধীনতা দূর হবার ঠিক পরেই নিজাম শাহ নৃপতি হয়েছিলেন।”

(৪) অষ্টাদশ শতাব্দীর কবি মুহম্মদ মুকিম ও ঊনবিংশ শতাব্দীর কবি চুহর তাঁর কয়েকজন সমসাময়িক ও পূর্ববর্তী কবির নাম করলেও, সেই নামগুলির মধ্যে— “নেই দৌলত উজিরের নাম। এতে মনে হয়, দৌলত উজির তাঁদের অনেক পূর্ববর্তী কবি।”
ডঃ শরীফের উপরোক্ত বক্তব্যগুলি সম্বন্ধে বর্তমান সময়ের গবেষকদের বক্তব্য নিম্নরূপ—

(১) ঔরঙ্গজেবের দেওয়া চট্টগ্রামের নতুন নাম ‘ইসলামাবাদ’ মোটেই চলে নি, তাছাড়া কোন জায়গার নতুন নাম রাখবার সঙ্গে সঙ্গেই সেটা চালু হয়ে যায় না; উদাহরণস্বরূপ বলা চলে যে, কলকাতার বহু রাস্তার নতুন নাম বেশ কয়েক বছর চালু হওয়ার পরেও সাধারণ মানুষ এখনও সেগুলিকে ব্যবহার করেন না। তাছাড়া দৌলত-উজীর তাঁর লায়লী-মজনুতে হামিদ খানের আমলের চাটিগ্রামের কথা লিখেছিলেন, তাই সেটাকে ইসলামাবাদ বলবার কোন কারণ অন্ততঃ ইতিহাস থেকে পাওয়া যায় না।

(২) নিজামপুর পরগণার নামকরণ যে নিজামের নামে হয়েছিল সেই নিজাম আসলে কে এবং কোন্ সময়ের ব্যক্তি ছিলেন- সেকথা যখন জানা নেই তখন তাঁকে এই প্রসঙ্গের সঙ্গে যুক্ত না করাই সমীচীন।

(৩) “অনুক্রমে বংশ কথ গঞিলেন্ত এই মত”- একথার অর্থ ‘অল্পকালের মধ্যে’ হয় না, বরং একথাটির সহজ অর্থ হল- অনেক পুরুষ পার হয়ে যাবার পরে; সুতরাং-এটা স্পষ্টতঃই বহু দিনের ব্যাপার। “গৌড়ের অধীন … নেজাম শাহা সুর” -উক্তিটি দ্বারা কবি চট্টগ্রামে গৌড়ের অধীনতা দূর হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ‘নেজাম শাহা’ শাসক হয়েছিলেন বলতে চেয়েছিলেন বলে মনে হয় না; বরং গৌড়ের অধীনতা দূর হওয়ার পরে কোন একসময়ে নেজাম শাহা সেখানকার শাসক হয়েছিলেন- একথা বলাই কবির অভিপ্রেত ছিল বলে মনে হয়।

(৪) মুহম্মদ মুকিম ও চুহরের কবি-প্রশস্তিতে খৃষ্টীয় সপ্তদশ শতাব্দীর প্রত্যেকটি মুসলমান কবির নাম যখন পাওয়া যায় না, তখন সেখানে দৌলত উজীরের নাম না থাকাটা থেকে কিছু প্রমাণিত হয় না। এছাড়া এমনিতেও কারও কোন বিষয়ের উল্লেখ না করা থেকে ইতিহাসগতভাবে কিছু প্রমাণিত হয়ে যায় না।

বাঙলা একাডেমী পত্রিকার ১৩৭০ বঙ্গাব্দের শ্রাবণ-আশ্বিন সংখ্যার ১-১৬ নং পৃষ্ঠায় প্রকাশিত একটি প্রবন্ধে ডঃ আবদুল করিম মতপ্রকাশ করেছিলেন যে-নেজাম শাহা সুর আসলে কোন আরাকানরাজ ছিলেন না, বরং তিনি আরাকানরাজের অধীনস্থ একজন শাসনকর্তা ছিলেন। যেহেতু ১৬০৭ খৃষ্টাব্দের পরে আরাকানের রাজারা চট্টগ্রামে মগ শাসনকর্তা নিযুক্ত করতেন এবং যেহেতু ১৫৮৬ খৃষ্টাব্দ থেকে ১৬০৭ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত চট্টগ্রামের কোন শাসনকর্তার নাম ইতিহাসে পাওয়া যায় না, অতএব- নেজাম শাহা সুর -১৫৮৬ থেকে ১৬০৭ খৃষ্টাব্দের মধ্যে কোন এক সময়ে চট্টগ্রামের শাসনকর্তা ছিলেন।

বর্তমান সময়ের গবেষকদের মতে, ডঃ করিমের এই অভিমতের পিছনে ‘Begging the question’ নামের একটা fallacy দেখতে পাওয়া যায়। অর্থাৎ-তিনি প্রথমে নেজাম শাহাকে আরাকানরাজের অধীনস্থ শাসনকর্তা হিসাবে ধরে নিয়ে তারপরে তাঁর সময় অন্বেষণ করেছিলেন। কিন্তু— সেই ধরে নেওয়ার অনুকূলে তিনি কোন ঐতিহাসিক প্রমাণ দেননি।

যাই হোক, এখনও পর্যন্ত যা কিছু আলোচনা করা হয়েছে, সেটার ভিত্তিতে নিম্নলিখিত সিদ্ধান্তগুলি নেওয়া যেতে পারে—
(১) কবি বাহরাম খান- নিজাম শাহ -এই মুসলমানী নামধারী কোন একজন আরাকানরাজের সমসাময়িক ছিলেন ও তাঁর কাছে তিনি অতি অল্প বয়সে দৌলত-উজীর খেতাবটি পেয়েছিলেন।

(২) ঐ খেতাব পাওয়ার কিছুকাল পরে উক্ত নিজাম শাহের রাজত্বকালেই তিনি তাঁর ‘ইমামবিজয়’ কাব্যটি রচনা করেছিলেন।

(৩) এর অনেকদিন পরে শায়েস্তা খানের অধীনস্থ মোঘল বাহিনীর চট্টগ্রাম বিজয়ের (১৬৬৬ খৃষ্টাব্দে) পরে তিনি তাঁর ‘লায়লী-মজনু’ কাব্যটি রচনা করেছিলেন; এবং তখন মোঘল সম্রাট ঔরঙ্গজেবই যেহেতু বাহরাম খানের বাসভূমি চট্টগ্রামের সার্বভৌম অধীশ্বর ছিলেন, সেহেতু কবি তাঁর কাব্যে তাঁরই প্রশস্তি রচনা করেছিলেন।লেখক: রানা চক্রবর্তী, বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট