মুহাম্মদ নিযামুদ্দীন: না জানা অপরাধ নয়, কিন্তু না জেনে অন্যকে কথায় কথায় জ্ঞান দান করটা কেবল অপরাধ নয়, অপরাধেরও অধিক। কিন্তু দুঃখজনক ও দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, আমরা অধিকাংশজন অধিকাংশ ক্ষেত্রে তেমনটাই করে থাকি। এর মাধ্যমে যে নিজেদের চিন্তা বা জ্ঞানের দারিদ্র্যতা বা দেউলিয়াত্ব দশজনের কাছে দ্রষ্টব্য হয়ে ওঠে, সে বোধটুকুও আমাদের থাকেনা।

চিংড়ি মাছকে আমরা সবাই চিনি। দেখতে দৃষ্টিনন্দন এবং খেতেও স্বাদ। কিন্তু এই মাছটির মুখ ও মলদ্বার মাথায়! অজ্ঞতার অহমিকায় অন্ধ কিছু লোকের অবস্থাও ঐ চিংড়ি মাছের মতো। এদের চটকদার কথা শুনে মানুষ মনে করে বিদ্যাসাগর বুঝি! কিন্তু প্রকৃত জ্ঞানী গুণীজনদের কাছে ঠিকই প্রমাণ হয়ে যায় – এমন মহামূর্খতা আর মিলবে কোথায়! এদের মুখ ও মাথাটাও একটা অদৃশ্য মলদ্বার। সেই মলকেই মাল মনে করে তারা পরিচয় দেয় মুর্খতার। আবার তা নিয়ে তারা করেও বড়াই। বেহুদা লোকের সাথে বাধায় লড়াই। নষ্ট করে শান্তি, যদিও এসব স্পষ্টতই ভ্রান্তি।

একজন মানুষ সব বিষয়ে জানবেন, কিংবা সর্ববিদ্যায় বিশারদ হবেন – এমনটা ঠিক নয়। কেউ যদি মনে করেন তিনি সর্ববিদ্যাভূষণ – বুঝতে হবে তার বোধে বুদ্ধিতে লেগেছে দূষণ। একজন আইনবিদ অর্থনীতির দু’একটা কথা হয়তো মুখস্থ বলতে পারলেন। কিন্তু তার একথা ভাবা ঠিক হবেনা তিনি একজন অর্থনীতিবিদ। তদ্রূপ প্যারাসিটামল বা এ জাতীয় প্রাথমিক চিকিৎসার পথ্যের নাম যে কোনো ব্যক্তি জানতেই পারেন। কিন্তু তাই বলে কেউ যদি তাকে মনে করে ডাক্তার – যান চিকিৎসা নিতে তার, মৃত্যুর ঝুঁকি থেকে কিভাবে তিনি পাবেন নিস্তার। তিনি তো আস্ত এক বোকার সর্দার! যে কোনো বিষয়ে ভাসাভাসা জ্ঞান যে কারো থাকতেই পারে। কিন্তু সেই ভাসাভাসা জ্ঞান নিয়ে তিনি যদি বিশেষজ্ঞের মতো মতামত প্রদান করতে যান, তা হবে জঘন্য অপরাধ ও জ্ঞানের অপমান। আবার কেউ যদি চান তার কাছ থেকে করতে জ্ঞান আহরণ, সেটাও হবে ভুলের ভূগোলে অবগাহন। কেননা যার জ্ঞানই ভাসাভাসা কিংবা সর্বনাশা, তার কাছ থেকে কিভাবে করা যায় জ্ঞান আহরণের আশা? যদি হয়ও আহরণ, তা হবে জ্ঞানের মরণ। এমনই করুণ পরিণতি যার, সেই জ্ঞান আহরণের আছে কি দরকার?

অতএব বোঝা গেলো যে, ভাসাভাসা জ্ঞান বা ভুল জ্ঞান লাগেনা কোনো কাজে। বরং জীবনে – বিপদ ও বিড়ম্বনা ডেকে আনে। এই বিপদ ও বিড়ম্বনা থেকে পেতে হলে উদ্ধার – প্রকৃত তথ্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান হাসিল করা দরকার। প্রশ্ন হতে পারে, প্রকৃত তথ্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান কি? সারা জাহানের যিনি সৃষ্টিকর্তা, তাঁকে জানা ও মানাই হলো প্রকৃত তথ্য প্রয়োজনীয় জ্ঞানের পরিচয় – বাকি যতো জ্ঞান বিদ্যমান, সেগুলো কোনো জ্ঞানই নয়। সেগুলো জ্ঞানের নামে একপ্রকার ভান – যদিও তা মানতে নারাজ মানুষ নামধারী কিছু নাফরমান।

জ্ঞান হলো বিধাতার শ্রেষ্ঠ নেয়ামত। এই শ্রেষ্ঠ নেয়ামতটি তিনি দান করলেন সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব মানুষকে। এবং সেই মানুষকেই তিনি প্রতিনিধি করে পাঠালেন পৃথিবীতে, যাতে পৃথিবীতে তারা মনগড়া কিছু না করে পরম প্রভুর প্রত্যাদেশ অনুযায়ী জীবনকে পরিচালনা করবে এবং জ্ঞানসমৃদ্ধ শান্তির সমাজ প্রতিষ্ঠা করবে। এই প্রত্যাদেশ প্রেরণের জন্য পরম প্রভু নির্বাচন করলেন মানুষের মধ্য থেকে কিছু মানুষকে, যাঁরা নবী-রাসূল নামে পরিচিত। এই নবী-রাসূলগণের প্রত্যেকই ছিলেন নিরপরাধ ও নিষ্পাপ। এবং শ্রেষ্ঠ।

বোঝা গেলো, মহান আল্লাহ হলেন আলিমুল হাকিম তথা সকল জ্ঞান-বিজ্ঞানের দাতা, আর মানুষ হলো তার গ্রহীতা। সকল জ্ঞানের উৎসও তিনি, আসমান জমিন সহ কূল মখলুকাতের খালিক ও মালিক যিনি। মহান আল্লাহর অসীম যে জ্ঞান, সেখান থেকে ‘অতি সামান্যই’ তিনি মানুষকে করেছেন দান। এই ‘অতি সামান্য’টা কি রকম, তার একটি তুলনাও দিয়েছেন স্বয়ং আল্লাহতালা। অর্থাৎ আল্লাহর জ্ঞান যেখানে সীমাহীন সমুদ্র, সেখানে তাঁর প্রেরিত নবী-রাসূলগণের জ্ঞান সমুদ্রের একফোঁটা জলের মতো ক্ষুদ্র! আবার অপরাপর মানুষদের তুলনায় নবী-রাসূলগণের জ্ঞান হলো সমুদ্র, আর অপরাপর মানুষদের জ্ঞান হলো তার একফোঁটা জলের মতো ক্ষুদ্র। এত ক্ষুদ্র জ্ঞানের অধিকারী হয়েও মানুষ বুঝতে চায়না কে সে? বিন্দু হয়ে সে সিন্ধুকে চ্যালেঞ্জ করে বসে!

মহান আল্লাহ তাঁর পবিত্র শেষ গ্রন্থটির শুরুটাই করেছেন ‘ইকরা’ দিয়ে, যার মানে হলো- পড়, জান। অর্থাৎ জ্ঞানের প্রতি যে অধিক গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে, তা আরম্ভের ঐ শব্দটি পাঠ করে অনুধাবন করা যায়। অন্যত্র প্রশ্নের ভঙ্গিতে মানুষকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে, যারা জানে, আরা যারা জানেনা, তারা উভয়ে কি এক? আরেক জায়গায় বলা হয়েছে, আলো ও অন্ধকার কি এক? সে জন্য মহান আল্লাহ মানুষকে নিষেধ করেছেন ধারণার ওপর, কিংবা ভাসাভাসা জ্ঞানের ওপর নির্ভর করে কিছু বলতে বা করতে। নসিহত করেছেন, না জানলে না বলতে এবং যারা জানে তাদের কাছ থেকে জেনে নিতে। যারা জানে, ইসলামি পরিভাষায় তারা আলিম নামেও পরিচিত। কিন্তু আমাদের সমাজে আলিম নামধারী কিছু জালিমও আছে, যারা লেবাস পরে ইসলামের, কিন্তু কাজ করে শয়তানের। যারা বিভিন্ন দোকান খুলে সহজ সরল সাধারণ মানুষদের কাছে শিরিক ও কুফর বিক্রি করে এবং নিজেদের পেট ও পকেট ভরে। শরীয়তকে বাদ দিয়ে এরা মারিফাত মারিফাত বলে চিল্লায়। ওয়াজ করতে গিয়ে মুরশিদি গানের নামে মুশরিকি গান গায়। এদের ওয়াজের মধ্যে থাকেনা কুরআন হাদিস থেকে কোনো বয়ান। এদের ওয়াজ মানে হলো গান আর ফান! মানুষকে পথভ্রষ্ট করা ছাড়া এদের নেই কোনো কাজ। এরা জালিম, এরা ফিতনাবাজ। তাই বাঁচাতে হলে ঈমান আখলাক – এইসব ভণ্ড পাষণ্ডদের দিতে হবে তালাক।

এবার প্রকৃত তথ্য প্রয়োজনীয় জ্ঞানের অধিকারী আলিমদের কথায় আসা যাক। ইসলামের নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) আলিমদেরকে নায়েবে নবী, তথা তাঁর উত্তরাধিকারী তথা ওয়ারিশ বলে ঘোষণা করেছেন। কিন্তু অধিকাংশ আদম সন্তান অজ্ঞতা বশত ইলমে দ্বীন হাসিলকারী মাদ্রাসা পাশ মওলানাদেরকে আলিম বলে মনে করেন। কিন্তু শুধু ইলমে জাহির তথা বাহ্যিক বিদ্যা হাসিল করলেই কেউ নবীর উত্তরাধিকারী তথ্য ওয়ারিশ হয়ে যাননা, পাশাপাশি তাকে বাতেনি বিদ্যাও হাসিল করা প্রয়োজন। সেই বাতেনি বিদ্যা আয়ত্ত করা ব্যতিরেকে কেউ নায়েবে নবী হতে পারবেননা। বাহ্যিক বিদ্যা হলো শরীয়তের হুকুম আহকাম পালন করার বিদ্যা, আর বাতেনি বিদ্যা হলো এমন এক গুপ্ত বিদ্যা, যার মাধ্যমে আত্মাকে পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করা যায়। ফলে নবীর প্রকৃত ওয়ারিশ হতে গেলে বাহ্যিক বিদ্যা ও বাতেনি বিদ্যা – দুটোকেই হাসিল করা বাঞ্ছনীয়। শুধু একটিকে করলে হাসিল – নবীর ওয়ারিশ হওয়ার শর্ত হবেনা ফুলফিল। মুজাদ্দিদে আলফেসানী (র.) শায়েখ ফরীদকে লেখা এক মাকতুবে (চিঠিতে) যাহেরী সম্পদ ও বাতেনি সম্পদের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে লিখেছেন, “জড় দেহ শরীয়তের হুকুম দ্বারা সুসজ্জিত করা যাহেরী সম্পদ এবং আল্লাহ ব্যতীত অন্যের ভালবাসা হতে অন্তরকে পবিত্র রাখাই বাতেনী সম্পদ।” (মাকতুবাতে আলফেসানী, অনুবাদক- হাফেজ মাওলানা মুহাম্মদ আবদুল জলীল, প্রকাশক- রশীদ বুক হাউস, ৬ নং প্যারীদাস রোড, ঢাকা-১১০০, পৃ-১৬৯)।

প্রখ্যাত আলিম, অলীয়ে কামিল ও আরবি-ফারসি কবি মওলানা ওলী আহমদ নিযামপুরী (র.)[১৮৮৫-১৯৬০] তাঁর ‘গুলজারে ইলম’ শীর্ষক ফারসি কাব্যগ্রন্থ ‘ফাযায়েলে ইলম’ শীর্ষক কবিতার একস্থানে লিখেছেন-
জ্ঞানার্জন পয়গম্বরদের ‘মীরাস’ সম্পদের মতো,
অংশ নেয় তারাই তাতে, ভাগ্যবান আছে যতো।
কতোইনা উত্তম উপভোগের বস্তু নবীদের এই মীরাস,
মেধাবী-অমেধাবী সবে পায় অংশ তার, হয়না নিরাশ।
(ভাবানুবাদঃ মাশুক মাশরেকী)
এই মীরাস সম্পদের একটি চমৎকার ও চিন্তাযুক্ত ব্যাখ্যা পাওয়া যায় মুজাদ্দিদে আলফেসানী (র.)-এর একটি মাকতুবে (চিঠিতে)। খান খানানের নিকট লেখা এক মাকতুবে তিনি লিখেছেন, “হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে – আলেমগণ নবীদের উত্তরাধিকারী। পয়গম্বরদের পর অবশিষ্ট ইলম দু’প্রকার – ইলেমে শরীয়ত এবং ইলমে আসরার বা গুপ্ত রহস্যসমূহের ইলম। এ দ্বিবিধ ইলমের অধিকারী ব্যক্তিই নবীদের ওয়ারিশ হওয়ার যোগ্য। যিনি এক প্রকার ইলমের অধিকারী – অন্য প্রকারের নহেন, তিনি ওয়ারিশ হওয়ার যোগ্য নন।

দৃষ্টান্ত স্বরূপ বলা যেতে পারে, যে ব্যক্তি মৃত ব্যক্তির যাবতীয় সম্পত্তির অংশ পায় তাকেই ওয়ারিশ বলা হয়। কিছুটা পেল আর কিছুটা পেল না, তাকে ওয়ারিশ বলা হয়না।”( মাকতুবাতে আলফেসানী, পৃ-৭৪)। প্রকৃত জ্ঞানী তো তাঁরাই, যাঁরা অপ্রয়োজনীয় জ্ঞান আহরণ থেকে নিজেদেরকে দূরে রেখে যাহেরী ও বাতেনী – উভয় প্রকার জ্ঞান লাভে নিজেদেরকে সমৃদ্ধ করেন এবং ইনসানে কামিল হয়ে পার্থিব ও পরকালীন কল্যাণ হাসিলে কামিয়াব হন। সফলতার প্রসঙ্গ যদি আসে, তাঁরাই সত্যিকার অর্থে সফলকাম।

মুহাম্মদ নিযামুদ্দীন: না জানা অপরাধ নয়, কিন্তু না জেনে অন্যকে কথায় কথায় জ্ঞান দান করটা কেবল অপরাধ নয়, অপরাধেরও অধিক। কিন্তু দুঃখজনক ও দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, আমরা অধিকাংশজন অধিকাংশ ক্ষেত্রে তেমনটাই করে থাকি। এর মাধ্যমে যে নিজেদের চিন্তা বা জ্ঞানের দারিদ্র্যতা বা দেউলিয়াত্ব দশজনের কাছে দ্রষ্টব্য হয়ে ওঠে, সে বোধটুকুও আমাদের থাকেনা।

চিংড়ি মাছকে আমরা সবাই চিনি। দেখতে দৃষ্টিনন্দন এবং খেতেও স্বাদ। কিন্তু এই মাছটির মুখ ও মলদ্বার মাথায়! অজ্ঞতার অহমিকায় অন্ধ কিছু লোকের অবস্থাও ঐ চিংড়ি মাছের মতো। এদের চটকদার কথা শুনে মানুষ মনে করে বিদ্যাসাগর বুঝি! কিন্তু প্রকৃত জ্ঞানী গুণীজনদের কাছে ঠিকই প্রমাণ হয়ে যায় – এমন মহামূর্খতা আর মিলবে কোথায়! এদের মুখ ও মাথাটাও একটা অদৃশ্য মলদ্বার। সেই মলকেই মাল মনে করে তারা পরিচয় দেয় মুর্খতার। আবার তা নিয়ে তারা করেও বড়াই। বেহুদা লোকের সাথে বাধায় লড়াই। নষ্ট করে শান্তি, যদিও এসব স্পষ্টতই ভ্রান্তি।

একজন মানুষ সব বিষয়ে জানবেন, কিংবা সর্ববিদ্যায় বিশারদ হবেন – এমনটা ঠিক নয়। কেউ যদি মনে করেন তিনি সর্ববিদ্যাভূষণ – বুঝতে হবে তার বোধে বুদ্ধিতে লেগেছে দূষণ। একজন আইনবিদ অর্থনীতির দু’একটা কথা হয়তো মুখস্থ বলতে পারলেন। কিন্তু তার একথা ভাবা ঠিক হবেনা তিনি একজন অর্থনীতিবিদ। তদ্রূপ প্যারাসিটামল বা এ জাতীয় প্রাথমিক চিকিৎসার পথ্যের নাম যে কোনো ব্যক্তি জানতেই পারেন। কিন্তু তাই বলে কেউ যদি তাকে মনে করে ডাক্তার – যান চিকিৎসা নিতে তার, মৃত্যুর ঝুঁকি থেকে কিভাবে তিনি পাবেন নিস্তার। তিনি তো আস্ত এক বোকার সর্দার! যে কোনো বিষয়ে ভাসাভাসা জ্ঞান যে কারো থাকতেই পারে। কিন্তু সেই ভাসাভাসা জ্ঞান নিয়ে তিনি যদি বিশেষজ্ঞের মতো মতামত প্রদান করতে যান, তা হবে জঘন্য অপরাধ ও জ্ঞানের অপমান। আবার কেউ যদি চান তার কাছ থেকে করতে জ্ঞান আহরণ, সেটাও হবে ভুলের ভূগোলে অবগাহন। কেননা যার জ্ঞানই ভাসাভাসা কিংবা সর্বনাশা, তার কাছ থেকে কিভাবে করা যায় জ্ঞান আহরণের আশা? যদি হয়ও আহরণ, তা হবে জ্ঞানের মরণ। এমনই করুণ পরিণতি যার, সেই জ্ঞান আহরণের আছে কি দরকার?

অতএব বোঝা গেলো যে, ভাসাভাসা জ্ঞান বা ভুল জ্ঞান লাগেনা কোনো কাজে। বরং জীবনে – বিপদ ও বিড়ম্বনা ডেকে আনে। এই বিপদ ও বিড়ম্বনা থেকে পেতে হলে উদ্ধার – প্রকৃত তথ্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান হাসিল করা দরকার। প্রশ্ন হতে পারে, প্রকৃত তথ্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান কি? সারা জাহানের যিনি সৃষ্টিকর্তা, তাঁকে জানা ও মানাই হলো প্রকৃত তথ্য প্রয়োজনীয় জ্ঞানের পরিচয় – বাকি যতো জ্ঞান বিদ্যমান, সেগুলো কোনো জ্ঞানই নয়। সেগুলো জ্ঞানের নামে একপ্রকার ভান – যদিও তা মানতে নারাজ মানুষ নামধারী কিছু নাফরমান।

জ্ঞান হলো বিধাতার শ্রেষ্ঠ নেয়ামত। এই শ্রেষ্ঠ নেয়ামতটি তিনি দান করলেন সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব মানুষকে। এবং সেই মানুষকেই তিনি প্রতিনিধি করে পাঠালেন পৃথিবীতে, যাতে পৃথিবীতে তারা মনগড়া কিছু না করে পরম প্রভুর প্রত্যাদেশ অনুযায়ী জীবনকে পরিচালনা করবে এবং জ্ঞানসমৃদ্ধ শান্তির সমাজ প্রতিষ্ঠা করবে। এই প্রত্যাদেশ প্রেরণের জন্য পরম প্রভু নির্বাচন করলেন মানুষের মধ্য থেকে কিছু মানুষকে, যাঁরা নবী-রাসূল নামে পরিচিত। এই নবী-রাসূলগণের প্রত্যেকই ছিলেন নিরপরাধ ও নিষ্পাপ। এবং শ্রেষ্ঠ।

বোঝা গেলো, মহান আল্লাহ হলেন আলিমুল হাকিম তথা সকল জ্ঞান-বিজ্ঞানের দাতা, আর মানুষ হলো তার গ্রহীতা। সকল জ্ঞানের উৎসও তিনি, আসমান জমিন সহ কূল মখলুকাতের খালিক ও মালিক যিনি। মহান আল্লাহর অসীম যে জ্ঞান, সেখান থেকে ‘অতি সামান্যই’ তিনি মানুষকে করেছেন দান। এই ‘অতি সামান্য’টা কি রকম, তার একটি তুলনাও দিয়েছেন স্বয়ং আল্লাহতালা। অর্থাৎ আল্লাহর জ্ঞান যেখানে সীমাহীন সমুদ্র, সেখানে তাঁর প্রেরিত নবী-রাসূলগণের জ্ঞান সমুদ্রের একফোঁটা জলের মতো ক্ষুদ্র! আবার অপরাপর মানুষদের তুলনায় নবী-রাসূলগণের জ্ঞান হলো সমুদ্র, আর অপরাপর মানুষদের জ্ঞান হলো তার একফোঁটা জলের মতো ক্ষুদ্র। এত ক্ষুদ্র জ্ঞানের অধিকারী হয়েও মানুষ বুঝতে চায়না কে সে? বিন্দু হয়ে সে সিন্ধুকে চ্যালেঞ্জ করে বসে!

মহান আল্লাহ তাঁর পবিত্র শেষ গ্রন্থটির শুরুটাই করেছেন ‘ইকরা’ দিয়ে, যার মানে হলো- পড়, জান। অর্থাৎ জ্ঞানের প্রতি যে অধিক গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে, তা আরম্ভের ঐ শব্দটি পাঠ করে অনুধাবন করা যায়। অন্যত্র প্রশ্নের ভঙ্গিতে মানুষকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে, যারা জানে, আরা যারা জানেনা, তারা উভয়ে কি এক? আরেক জায়গায় বলা হয়েছে, আলো ও অন্ধকার কি এক? সে জন্য মহান আল্লাহ মানুষকে নিষেধ করেছেন ধারণার ওপর, কিংবা ভাসাভাসা জ্ঞানের ওপর নির্ভর করে কিছু বলতে বা করতে। নসিহত করেছেন, না জানলে না বলতে এবং যারা জানে তাদের কাছ থেকে জেনে নিতে। যারা জানে, ইসলামি পরিভাষায় তারা আলিম নামেও পরিচিত। কিন্তু আমাদের সমাজে আলিম নামধারী কিছু জালিমও আছে, যারা লেবাস পরে ইসলামের, কিন্তু কাজ করে শয়তানের। যারা বিভিন্ন দোকান খুলে সহজ সরল সাধারণ মানুষদের কাছে শিরিক ও কুফর বিক্রি করে এবং নিজেদের পেট ও পকেট ভরে। শরীয়তকে বাদ দিয়ে এরা মারিফাত মারিফাত বলে চিল্লায়। ওয়াজ করতে গিয়ে মুরশিদি গানের নামে মুশরিকি গান গায়। এদের ওয়াজের মধ্যে থাকেনা কুরআন হাদিস থেকে কোনো বয়ান। এদের ওয়াজ মানে হলো গান আর ফান! মানুষকে পথভ্রষ্ট করা ছাড়া এদের নেই কোনো কাজ। এরা জালিম, এরা ফিতনাবাজ। তাই বাঁচাতে হলে ঈমান আখলাক – এইসব ভণ্ড পাষণ্ডদের দিতে হবে তালাক।

এবার প্রকৃত তথ্য প্রয়োজনীয় জ্ঞানের অধিকারী আলিমদের কথায় আসা যাক। ইসলামের নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) আলিমদেরকে নায়েবে নবী, তথা তাঁর উত্তরাধিকারী তথা ওয়ারিশ বলে ঘোষণা করেছেন। কিন্তু অধিকাংশ আদম সন্তান অজ্ঞতা বশত ইলমে দ্বীন হাসিলকারী মাদ্রাসা পাশ মওলানাদেরকে আলিম বলে মনে করেন। কিন্তু শুধু ইলমে জাহির তথা বাহ্যিক বিদ্যা হাসিল করলেই কেউ নবীর উত্তরাধিকারী তথ্য ওয়ারিশ হয়ে যাননা, পাশাপাশি তাকে বাতেনি বিদ্যাও হাসিল করা প্রয়োজন। সেই বাতেনি বিদ্যা আয়ত্ত করা ব্যতিরেকে কেউ নায়েবে নবী হতে পারবেননা। বাহ্যিক বিদ্যা হলো শরীয়তের হুকুম আহকাম পালন করার বিদ্যা, আর বাতেনি বিদ্যা হলো এমন এক গুপ্ত বিদ্যা, যার মাধ্যমে আত্মাকে পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করা যায়। ফলে নবীর প্রকৃত ওয়ারিশ হতে গেলে বাহ্যিক বিদ্যা ও বাতেনি বিদ্যা – দুটোকেই হাসিল করা বাঞ্ছনীয়। শুধু একটিকে করলে হাসিল – নবীর ওয়ারিশ হওয়ার শর্ত হবেনা ফুলফিল। মুজাদ্দিদে আলফেসানী (র.) শায়েখ ফরীদকে লেখা এক মাকতুবে (চিঠিতে) যাহেরী সম্পদ ও বাতেনি সম্পদের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে লিখেছেন, “জড় দেহ শরীয়তের হুকুম দ্বারা সুসজ্জিত করা যাহেরী সম্পদ এবং আল্লাহ ব্যতীত অন্যের ভালবাসা হতে অন্তরকে পবিত্র রাখাই বাতেনী সম্পদ।” (মাকতুবাতে আলফেসানী, অনুবাদক- হাফেজ মাওলানা মুহাম্মদ আবদুল জলীল, প্রকাশক- রশীদ বুক হাউস, ৬ নং প্যারীদাস রোড, ঢাকা-১১০০, পৃ-১৬৯)।

প্রখ্যাত আলিম, অলীয়ে কামিল ও আরবি-ফারসি কবি মওলানা ওলী আহমদ নিযামপুরী (র.)[১৮৮৫-১৯৬০] তাঁর ‘গুলজারে ইলম’ শীর্ষক ফারসি কাব্যগ্রন্থ ‘ফাযায়েলে ইলম’ শীর্ষক কবিতার একস্থানে লিখেছেন-
জ্ঞানার্জন পয়গম্বরদের ‘মীরাস’ সম্পদের মতো,
অংশ নেয় তারাই তাতে, ভাগ্যবান আছে যতো।
কতোইনা উত্তম উপভোগের বস্তু নবীদের এই মীরাস,
মেধাবী-অমেধাবী সবে পায় অংশ তার, হয়না নিরাশ।
(ভাবানুবাদঃ মাশুক মাশরেকী)
এই মীরাস সম্পদের একটি চমৎকার ও চিন্তাযুক্ত ব্যাখ্যা পাওয়া যায় মুজাদ্দিদে আলফেসানী (র.)-এর একটি মাকতুবে (চিঠিতে)। খান খানানের নিকট লেখা এক মাকতুবে তিনি লিখেছেন, “হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে – আলেমগণ নবীদের উত্তরাধিকারী। পয়গম্বরদের পর অবশিষ্ট ইলম দু’প্রকার – ইলেমে শরীয়ত এবং ইলমে আসরার বা গুপ্ত রহস্যসমূহের ইলম। এ দ্বিবিধ ইলমের অধিকারী ব্যক্তিই নবীদের ওয়ারিশ হওয়ার যোগ্য। যিনি এক প্রকার ইলমের অধিকারী – অন্য প্রকারের নহেন, তিনি ওয়ারিশ হওয়ার যোগ্য নন।

দৃষ্টান্ত স্বরূপ বলা যেতে পারে, যে ব্যক্তি মৃত ব্যক্তির যাবতীয় সম্পত্তির অংশ পায় তাকেই ওয়ারিশ বলা হয়। কিছুটা পেল আর কিছুটা পেল না, তাকে ওয়ারিশ বলা হয়না।”( মাকতুবাতে আলফেসানী, পৃ-৭৪)। প্রকৃত জ্ঞানী তো তাঁরাই, যাঁরা অপ্রয়োজনীয় জ্ঞান আহরণ থেকে নিজেদেরকে দূরে রেখে যাহেরী ও বাতেনী – উভয় প্রকার জ্ঞান লাভে নিজেদেরকে সমৃদ্ধ করেন এবং ইনসানে কামিল হয়ে পার্থিব ও পরকালীন কল্যাণ হাসিলে কামিয়াব হন। সফলতার প্রসঙ্গ যদি আসে, তাঁরাই সত্যিকার অর্থে সফলকাম।