মিজবাউল হক, চকরিয়া: কক্সবাজারের চকরিয়া ও পেকুয়া উপজেলা পরিষদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিভিন্ন এলাকায় চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও একাধিক মামলার দাগী আসামীদের জনসম্মুকে দেখা যাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন সাধারণ ভোটাররা। এসব অপরাধীরা সশস্ত্র অবস্থায় ঘুরাফেরা করছেন প্রার্থীদের সাথে। ইতোমধ্যে প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে একাধিক সংঘর্ষ ও হামলার ঘটনায় আতঙ্ক বিরাজ করছে নির্বাচনী এলাকায়। পাশাপাশি অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহারও বেড়ে গেছে বলে অভিযোগ করেছেন সাধারণ ভোটার ও প্রার্থীরা। এ অবস্থায় জনগণের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
স্থানীয় ভোটাররা জানান, আগামী ২১ মে চকরিয়া ও পেকুয়া উপজেলা পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এ দুই উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে একাধিক চেয়ারম্যান প্রার্থী ভোটের মাঠে গণসংযোগ, সভা ও সমাবেশ চালিয়ে যাচ্ছেন। স্ব-স্ব প্রার্থীরা বিজয় নিশ্চিত করতে নানা উদ্যোগ ও কৌশলও নিয়েছেন। গত কয়েকদিন ধরে শক্তি প্রদর্শন করছেন চেয়ারম্যান প্রার্থীর সমর্থকরা। এক উপজেলা চেয়ারম্যান প্রার্থী সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনী নিয়ে চলাফেরা করায় ভোটারদের মাঝে আতঙ্ক দেখা দিয়েছেন। তারা ভোটের মাঠে ভয়ভীতিও প্রদর্শন করছেন। এরইমধ্যে গত ২৯ এপ্রিল বিকাল ২টা দৈনিক মানবজমিনের চকরিয়া প্রতিনিধি মোহাম্মদ উল্লাহকে মারধর ও মোবাইল কেড়ে নিয়ে আলোচনায় এসেছেন সাবেক সংসদ সদস্য ও উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান জাফর আলম। তিনি ওই সাংবাদিককে নিজের হাতে পিঠিয়ে মারাত্মকভাবে আহত করেছেন। একইদিন রাত ১১টার দিকে চকরিয়া প্রেসক্লাবের সভাপতি জাহেদ চৌধুরীকে প্রাণনাশের হুমকি দেন চেয়ারম্যান প্রার্থী জাফর আলম। তার ক্যাডার বাহিনীর হাতে প্রতিনিয়ত হামলার শিকার হচ্ছেন প্রতিদ্বদ্বী চেয়ারম্যান প্রার্থী ও বর্তমান উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ফজলুল করিম সাঈদীর সমর্থকরা। জাফর আলম সশস্ত্র ক্যাডার নিয়ে গণসংযোগ ও সভা সমাবেশ চালিয়েছেন। তিনি প্রভাবশালী হওয়ায় অনেকে ভয়ে মুখ খুলছেন না।
আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্যদের তেমন তৎপরতাও দেখা যাচ্ছে না। এনিয়ে সাধারণ ভোটারদের মাঝে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।
এঘটনায় সাংবাদিক মোহাম্মদ উল্লাহ বাদী হয়ে উপজেলা চেয়ারম্যান প্রার্থী জাফর আলমকে প্রধান আসামী করে চকরিয়া থানায় একটি এজাহার দিয়েছেন।
চকরিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শেখ মোহাম্মদ আলী জানান, চকরিয়া উপজেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সবধরণের চেষ্ঠা চালিয়ে যাচ্ছি। ভোটের মাঠে অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে পুলিশের কয়েকটি টীম মাঠে কাজ করছেন। সাংবাদিক মোহাম্মদ উল্লাহর উপর হামলার ঘটনায় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
এছাড়াও দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকা দাগি সন্ত্রাসীরা পেকুয়া উপজেলা পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এলাকায় ফিরতে শুরু করেছে। তাদের মধ্যে কেউ পুলিশের খাতায় চিহ্নিত তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী। তাদের বিরুদ্ধে ডাকাতি, অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকান্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। কয়েক দিন আগে মগনামা ইউনিয়নে মহড়া দিয়েছে ডজন খানেক মামলার আসামী আশফাকুল হক লিটন।
একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, পেকুয়ায় যেকোন নির্বাচন আসলে চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও দাগি অপরাধীরা তৎপর হয়ে উঠেন। বিভিন্ন প্রভাবশালী প্রার্থীর পক্ষে ভোটের মাঠে প্রভাব বিস্তার করতে চাইছে দাগি অপরাধীরা। এরইমধ্যে সম্প্রতি সময়ে পুলিশের তালিকাভূক্ত দাগি অপরাধী আশফাকুল হক লিটন ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা তৎপর হয়ে উঠেছে। লিটনের বিরুদ্ধে পেকুয়া থানাসহ বিভিন্ন আদালতে প্রায় ডজনখানেক মামলা বিচারাধীন রয়েছে। লিটনের হেফাজতে অবৈধ অস্ত্রও রয়েছে বলে এলাকাবাসীরা জানিয়েছেন। এমনকি মহেশখালী ও নাইক্ষংছড়ি উপজেলার চিহ্নিত অস্ত্র ব্যবসায়ীদের সঙ্গে লিটনের রয়েছে দারুণ সখ্যতা।
জানা যায়, বিগত ২০১৬ সালে অনুষ্টিত পেকুয়ার টইটং ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের তিনদিন পূর্বে চেয়ারম্যান প্রার্থী ও উপজেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শহীদুল্লাহকে অপহরণ করে অজ্ঞাতস্থানে নিয়ে নির্বাচনের পরদিন পর্যন্ত আটকে রেখেছিল পুলিশের তালিকাভূক্ত অপরাধী আশফাকুল হক লিটনের নেতৃত্বে একদল সন্ত্রাসী। এ ঘটনায় লিটনসহ ৮/১০ জনের বিরুদ্ধে একটি অপহরণ মামলা হয়েছিল পেকুয়া থানায়। প্রতিবারই কোন না কোন নির্বাচন আসলে প্রার্থীরা অপহরণ আতঙ্কে থাকেন।
পেকুয়া উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ভাইস চেয়ারম্যান পদ প্রার্থী নাছির উদ্দিন বাদশা অভিযোগ করে বলেন, আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেকে দাগি অপরাধীদের তৎপরতা লক্ষ্য করছি। এসব অপরাধীরা কতিপয় প্রভাবশালী প্রার্থীদের পক্ষে মাঠে কাজ করছে। তাই নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্টু ও নিরপেক্ষ করতে পেকুয়ার চিহ্নিত দাগী অপরাধীদের গ্রেফতার দাবি করছি।
পেকুয়া থানার ওসি মো: ইলিয়াছ বলেন, নির্বাচনকে সামনে রেখে এলাকায় সন্ত্রাসীরা যেন আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটাতে না পারে সে জন্য পুলিশ তৎপর রয়েছে। প্রতিরাতেই বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে পলাতক আসামিদের গ্রেফতার করা হচ্ছে।’
পেকুয়া উপজেলার মগনামা ইউনিয়নের সাধারণ ভোটার আলাউদ্দিন ও ইলিয়াছ পারভেজ জানান, নির্বাচনকে সামনে রেখে বিভিন্ন প্রভাবশালী প্রার্থীর পক্ষে চিহ্নিত সন্ত্রাসীরা প্রচারণা চালাচ্ছে। ভোটের মাঠে প্রভাব বিস্তার করছে সন্ত্রাসীরা। তাই তাদের মতো সাধারণ ভোটারেরা আতঙ্কে রয়েছে।
এলাকাবাসীরা জানান, নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর থেকে বিভিন্ন দাগি আসামির আনাগোনা বেড়েছে এলাকায়। তবে নির্বাচনের আগেই নড়েচড়ে বসতে শুরু করে পেকুয়ার আন্ডারওয়ার্ল্ড। এসব দাগী সন্ত্রাসীরা সহযোগীদের মাধ্যমে নতুন করে আধিপত্য বিস্তারে উঠেপড়ে লেগেছে। দাগী সন্ত্রাসীদের মধ্যে কেউ কেউ রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত হতে চাইছে।
এব্যাপারে চকরিয়া-পেকুয়া সার্কেলের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার রকীব উর-রাজা বলেন, পেকুয়া উপজেলা পরিষদ নির্বাচন সামনে রেখে দাগি অপরাধী ও অবৈধ অস্ত্রধারীদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা হবে।




