পর্ব- ১

জিয়া হাবীব আহ্‌সান,এডভোকেট:

তৃণমূল পর্যায়ে মানবাধিকার সচেতনতা বৃদ্ধি, অধিকার ও আইনী সুরক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষে ব্লাস্ট, বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশন-বিএইচআরএফ আইন ও শালিশ কেন্দ্র প্রভৃতি মানবাধিকার সংগঠন এডভোকেসির অংশ হিসেবে জনস্বার্থে মামলাও পরিচালনা করে থাকে। নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন,২০১৩ প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অবদান অনস্বীকার্য।নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন,২০১৩ প্রণয়নের পর প্রশাসনের অতি উৎসাহী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ করা সম্ভব কিছুটা হলেও সম্ভব হচ্ছে।

এই আইনের তদন্তের ক্ষেত্রে কিছুটা দুর্বলতা ও সংকট থাকলেও আইনটির সুফল অনেকে পেতে যাচ্ছে।সারা বিশ্বে নির্যাতন এবং অন্যান্য নিষ্ঠুর, অমানবিক বা লাঞ্ছনাকর দণ্ড বা শাস্তির বিরুদ্ধে চলমান সংগ্রামকে আরো ফলপ্রসু করতে ১৯৮৪ সালের ১০ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ নির্যাতন এবং অন্যান্য নিষ্ঠুর, অমানবিক বা লাঞ্ছনাকর দণ্ড বা শাস্তির বিরুদ্ধে কনভেনশন’ (CAT) গ্রহণ করে।১৯৯৮ সালের ৫ অক্টোবর বাংলাদেশ নির্যাতন বিরোধী কনভেনশনের পক্ষভুক্ত হয়।নির্যাতন ও অন্যান্য নিঠুর আচরণ প্রতিরোধ এবং শাস্তি প্রদান বিষয়ে সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা’ এবং নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারের আন্তর্জাতিক সনদ’- এর থেকে অনেক বিস্তারিত বিধি-বিধান নির্যাতন বিরোধী কনভেনশনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

তাছাড়া নির্যাতন বিরোধী কনভেনশনের ৪নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কনভেনশনের প্রত্যেক পক্ষরাষ্ট্র নির্যাতনমূলক সকল কার্যক্রমকে তাদের ফৌজদারী আইনে অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট অপরাধের গুরুত্ব অনুযায়ী পর্যাপ্ত শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।নিষ্ঠুর এবং লাঞ্ছনাকর আচরণ বা শাস্তি থেকে মুক্ত থাকার বিষয়ে সাংবিধানিক নিশ্চয়তা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের নাগরিকগণ প্রায়শই এই ধরনের নির্যাতনের শিকার হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

বিশেষ করে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কোন ব্যক্তিকে গ্রেফতার বা আটক করার পর হেফাজতকালীন সময়ে গ্রেফতারকৃত ব্যক্তির কাছ থেকে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী আদায়ের ক্ষেত্রে এই ধরনের নির্যাতনের অভিযোগ উঠে।নির্যাতন থেকে মুক্ত থাকা প্রত্যেক ব্যক্তির মৌলিক অধিকার।যেকোন ধরনের নির্যাতন বা বেআইনী শাস্তি মানুষের জীবন ও ব্যক্তি স্বাধীনতাকে ক্ষুন্ন করে যা মৌলিক মানবাধিকারের লঙ্ঘন।

সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণার ৩নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, প্রত্যেক মানুষের জীবন, ব্যক্তি স্বাধীনতা এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তার অধিকার রয়েছে’ এবং ৫নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কোন মানুষকে যন্ত্রণা বা নিষ্ঠুর, অমানবিক বা লাঞ্ছনাকর দণ্ড দেয়া যাবে না বা অনুরূপ আচরণ করা যাবে না’।একইভাবে নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারের আন্তর্জাতিক সনদের ৭নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কাউকে নির্যাতন বা নিষ্ঠুর, অমানবিক ও লাঞ্ছনাকর দণ্ড বা অনুরূপ কোন আচরণ করা যাবে না’।এই অধিকারগুলোকে বাংলাদেশের সংবিধানেও মৌলিক অধিকার হিসেবে নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়েছে।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সনদের সাথে একাত্ম হয়ে বাংলাদেশের সংবিধানের ৩১,৩২ এবং ৩৫(৫) অনুচ্ছেদগুলোতে জীবন ও ব্যক্তি স্বাধীনতার অধিকার এবং নির্যাতন বা নিষ্ঠুর, অমানবিক ও লাঞ্ছনাকর দণ্ড বা অনুরূপ কোন শাস্তি থেকে নাগরিকদের মুক্ত থাকার অধিকারের নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়েছে।বাংলাদেশের আইন ও সংবিধান বলছে, হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যু’ বেআইনি কাজ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের মত চরম অপরাধ। তারপরও হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনার বিচার হয় না, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভিক্টিম পরিবার হুমকি এবং চাপের মুখে অভিযোগও করে না।

আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর মামলা নেওয়ার উদাহরণ বিরল। কিন্তু অভিযোগ না করেও ভিক্টিম পরিবারের যেসব অভিজ্ঞতা তা জানলেই বোঝা যায়, কেন কারও পক্ষে অভিযোগ করার সাহস দেখানো সম্ভব নয়।আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী নিজেরাই তদন্ত করে, ফল যা হওয়ার তা-ই হয়, যে আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী মামলাই নিতে চায় না, তার হাতে তদন্তের ভার দিলে এর চেয়ে ভিন্ন কিছু হওয়ার কারণ নেই।আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে তদন্তের জন্য কোনো স্বাধীন কমিশন গঠন করা প্রয়োজন এবং অত্যন্ত জরুরী।

নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন, ২০১৩ এর ২(৬) ধারায় নির্যাতন এই আইনে নির্যাতন বলতে বোঝানো হয়েছে; (৬) —নির্যাতন’ অর্থ কষ্ট হয় এমন ধরনের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন; এতদ্ব্যতীত (ক) কোনো ব্যক্তি বা অপর কোনো ব্যক্তির নিকট হইতে তথ্য অথবা স্বীকারোক্তি আদায়ে; (খ) সন্দেহভাজন অথবা অপরাধী কোনো ব্যক্তিকে শাস্তি প্রদানে; (গ) কোনো ব্যক্তি অথবা তাহার মাধ্যমে অপর কোন ব্যক্তিকে ভয়ভীতি দেখানো; (ঘ) বৈষম্যের ভিত্তিতে কারো প্ররোচনা বা উস্কানি, কারো সম্মতিক্রমে অথবা নিজ ক্ষমতাবলে কোনো সরকারি কর্মকর্তা অথবা সরকারি ক্ষমতাবলে-এইরূপ কর্মসাধনও নির্যাতন হিসাবে গণ্য হবে।উক্ত সংজ্ঞা থেকে হেফাজতে নির্যাতনের বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্ট।নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন, ২০১৩ এর ২(৭) ধারায় অনুযায়ী —হেফাজতে মৃত্যু’ অর্থ সরকারি কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর হেফাজতে কোনো ব্যক্তির মৃত্যু; ইহা ছাড়াও হেফাজতে মৃত্যু বলিতে অবৈধ আটকাদেশ, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কর্তৃক গ্রেপ্তারকালে কোনো ব্যক্তির মৃত্যুকেও নির্দেশ করবে; কোনো মামলায় সাক্ষী হউক বা না হউক জিজ্ঞাসাবাদকালে মৃত্যুও হেফাজতে মৃত্যুর অন্তর্ভুক্ত হবে।

নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন, ২০১৩ এর ১৩ (১) এ বলা হয়েছে যে, কোনো সরকারী কর্মকর্তা বা কর্মচারী অপর কোনো ব্যক্তিকে নির্যাতন করিলে তাহা ঐ সরকারী কর্মকর্তা বা কর্মচারীর কৃত একটি অপরাধ হিসাবে গণ্য হবে।এছাড়াও এই আইনের ১৩ (২) ধারা অনুযায়ী কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী যদি কোনো ব্যক্তিকে নির্যাতনের মতো কোনো অপরাধ সংঘটনে উদ্যোগী হন অথবা সংঘটনে সহায়তা ও প্ররোচিত করেন; অথবা সংঘটনে ষড়যন্ত্র করেন তাহা হলে এই আইনের অধীনে তিনি অপরাধ করিয়াছেন বলিয়া গণ্য হবে।আবার ধারা ১৩ (৩) উল্লেখ আছে যে, এই আইনে কৃত অপরাধের দায়ভার অপরাধীকে ব্যক্তিগতভাবে বহন করতে হবে।নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন, ২০১৩ এর ৪ ধারায় বলা হয়েছে যে, ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮ এ যাহা কিছুই থাকুক না কেন, তাহা সত্ত্বেও এই আইনের এখতিয়ারাধীন কোন আদালতের সামনে কোন ব্যক্তি যদি অভিযোগ করে যে, তাহাকে নির্যাতন করা হয়েছে, তাহা হলে উক্ত আদালত তাৎক্ষণিকভাবে ঐ ব্যক্তির বিবৃতি লিপিবদ্ধ করবেন; একজন রেজিস্টার্ড চিকিৎসক দ্বারা অবিলম্বে তাহার দেহ পরীক্ষার আদেশ দিবেন; অভিযোগকারী মহিলা হলে রেজিস্টার্ড মহিলা চিকিৎসক দ্বারা পরীক্ষা করিবার ব্যবস্থা করবেন।চিকিৎসক অভিযোগকারী ব্যক্তির দেহের জখম ও নির্যাতনের চিহ্ন এবং নির্যাতনের সম্ভাব্য সময় উল্লেখপূর্বক ২৪ ঘণ্টার মধ্যে উহার একটি রিপোর্ট তৈরী করবেন।

সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক প্রস্তুতকৃত রিপোর্টেও একটি কপি অভিযোগকারী অথবা তাহার মনোনীত ব্যক্তিকে এবং আদালতে পেশ করবেন।এছাড়াও চিকিৎসক যদি এমন পরামর্শ দেন যে পরীক্ষাকৃত ব্যক্তির চিকিৎসা প্রয়োজন তাহালে আদালত ঐ ব্যক্তিকে হাসপাতালে ভর্তি করার নির্দেশ প্রদান করবেন।নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন, ২০১৩ এর ৫ ধারায় বলা হয়েছে আদালত ধারা ৪ এর উপধারা ১(ক) অনুযায়ী ক্ষতিগ্রস্ত অথবা সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির বিবৃতি লিপিবদ্ধ করার পর আদালত অনতিবিলম্বে বিবৃতির একটি কপি সংশ্লিষ্ট পুলিশ সুপারের কাছে বা ক্ষেত্রমত, তদূর্ধ্ব কোন পুলিশ কর্মকর্তার কাছে প্রেরণ করবেন এবং একটি মামলা দায়েরের নির্দেশ প্রদান করবেন।পুলিশ সুপার উক্ত আদেশ প্রাপ্তির পর পরই ঘটনা তদন্ত করিয়া চার্জ বা চার্জবিহীন রিপোর্ট পেশ করবেন।তবে শর্ত থাকে যে, সংশ্লিষ্ট সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি যদি মনে করেন যে পুলিশ দ্বারা সুষ্ঠুভাবে তদন্ত সম্ভব নয় সেক্ষেত্রে উক্ত ব্যক্তি যদি আদালতে আবেদন করবেন এবং আদালতে যদি তাহার আবেদনে এই মর্মে সন্তুষ্ট হন যে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির আবেদন যথার্থ সেক্ষেত্রে আদালত বিচার বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ প্রদান করতে পারবেন।

রিপোর্ট দাখিলের সময় তদন্ত কর্মকর্তা, ক্ষেত্রমত, বিচার বিভাগীয় তদন্ত কর্মকর্তা অভিযোগ প্রদানকারী ব্যক্তিকে তারিখ সহ রিপোর্ট দাখিল সম্পর্কে আদালতকে অবহিত করবেন।সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি ৩০ দিনের মধ্যে নিজে ব্যক্তিগতভাবে অথবা এডভোকেট মারফত উক্ত রিপোর্টের বিরুদ্ধে আদালতে আপত্তি জানাতে পারবে।আদালত সংঘটিত অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তির বা ব্যক্তিদের পদমর্যাদার নিম্নে নহে এমন পদমর্যাদার কোন পুলিশ অফিসারকে মামলার তদন্ত অনুষ্ঠানের নির্দেশ প্রদান করবেন।

লেখক: এডভোকটে, কলামিষ্ঠ ও মানবাধিকার সুশাসন-কর্মী।

পর্ব- ১

জিয়া হাবীব আহ্‌সান,এডভোকেট:

তৃণমূল পর্যায়ে মানবাধিকার সচেতনতা বৃদ্ধি, অধিকার ও আইনী সুরক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষে ব্লাস্ট, বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশন-বিএইচআরএফ আইন ও শালিশ কেন্দ্র প্রভৃতি মানবাধিকার সংগঠন এডভোকেসির অংশ হিসেবে জনস্বার্থে মামলাও পরিচালনা করে থাকে। নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন,২০১৩ প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অবদান অনস্বীকার্য।নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন,২০১৩ প্রণয়নের পর প্রশাসনের অতি উৎসাহী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ করা সম্ভব কিছুটা হলেও সম্ভব হচ্ছে।

এই আইনের তদন্তের ক্ষেত্রে কিছুটা দুর্বলতা ও সংকট থাকলেও আইনটির সুফল অনেকে পেতে যাচ্ছে।সারা বিশ্বে নির্যাতন এবং অন্যান্য নিষ্ঠুর, অমানবিক বা লাঞ্ছনাকর দণ্ড বা শাস্তির বিরুদ্ধে চলমান সংগ্রামকে আরো ফলপ্রসু করতে ১৯৮৪ সালের ১০ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ নির্যাতন এবং অন্যান্য নিষ্ঠুর, অমানবিক বা লাঞ্ছনাকর দণ্ড বা শাস্তির বিরুদ্ধে কনভেনশন’ (CAT) গ্রহণ করে।১৯৯৮ সালের ৫ অক্টোবর বাংলাদেশ নির্যাতন বিরোধী কনভেনশনের পক্ষভুক্ত হয়।নির্যাতন ও অন্যান্য নিঠুর আচরণ প্রতিরোধ এবং শাস্তি প্রদান বিষয়ে সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা’ এবং নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারের আন্তর্জাতিক সনদ’- এর থেকে অনেক বিস্তারিত বিধি-বিধান নির্যাতন বিরোধী কনভেনশনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

তাছাড়া নির্যাতন বিরোধী কনভেনশনের ৪নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কনভেনশনের প্রত্যেক পক্ষরাষ্ট্র নির্যাতনমূলক সকল কার্যক্রমকে তাদের ফৌজদারী আইনে অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট অপরাধের গুরুত্ব অনুযায়ী পর্যাপ্ত শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।নিষ্ঠুর এবং লাঞ্ছনাকর আচরণ বা শাস্তি থেকে মুক্ত থাকার বিষয়ে সাংবিধানিক নিশ্চয়তা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের নাগরিকগণ প্রায়শই এই ধরনের নির্যাতনের শিকার হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

বিশেষ করে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কোন ব্যক্তিকে গ্রেফতার বা আটক করার পর হেফাজতকালীন সময়ে গ্রেফতারকৃত ব্যক্তির কাছ থেকে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী আদায়ের ক্ষেত্রে এই ধরনের নির্যাতনের অভিযোগ উঠে।নির্যাতন থেকে মুক্ত থাকা প্রত্যেক ব্যক্তির মৌলিক অধিকার।যেকোন ধরনের নির্যাতন বা বেআইনী শাস্তি মানুষের জীবন ও ব্যক্তি স্বাধীনতাকে ক্ষুন্ন করে যা মৌলিক মানবাধিকারের লঙ্ঘন।

সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণার ৩নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, প্রত্যেক মানুষের জীবন, ব্যক্তি স্বাধীনতা এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তার অধিকার রয়েছে’ এবং ৫নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কোন মানুষকে যন্ত্রণা বা নিষ্ঠুর, অমানবিক বা লাঞ্ছনাকর দণ্ড দেয়া যাবে না বা অনুরূপ আচরণ করা যাবে না’।একইভাবে নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারের আন্তর্জাতিক সনদের ৭নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কাউকে নির্যাতন বা নিষ্ঠুর, অমানবিক ও লাঞ্ছনাকর দণ্ড বা অনুরূপ কোন আচরণ করা যাবে না’।এই অধিকারগুলোকে বাংলাদেশের সংবিধানেও মৌলিক অধিকার হিসেবে নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়েছে।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সনদের সাথে একাত্ম হয়ে বাংলাদেশের সংবিধানের ৩১,৩২ এবং ৩৫(৫) অনুচ্ছেদগুলোতে জীবন ও ব্যক্তি স্বাধীনতার অধিকার এবং নির্যাতন বা নিষ্ঠুর, অমানবিক ও লাঞ্ছনাকর দণ্ড বা অনুরূপ কোন শাস্তি থেকে নাগরিকদের মুক্ত থাকার অধিকারের নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়েছে।বাংলাদেশের আইন ও সংবিধান বলছে, হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যু’ বেআইনি কাজ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের মত চরম অপরাধ। তারপরও হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনার বিচার হয় না, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভিক্টিম পরিবার হুমকি এবং চাপের মুখে অভিযোগও করে না।

আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর মামলা নেওয়ার উদাহরণ বিরল। কিন্তু অভিযোগ না করেও ভিক্টিম পরিবারের যেসব অভিজ্ঞতা তা জানলেই বোঝা যায়, কেন কারও পক্ষে অভিযোগ করার সাহস দেখানো সম্ভব নয়।আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী নিজেরাই তদন্ত করে, ফল যা হওয়ার তা-ই হয়, যে আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী মামলাই নিতে চায় না, তার হাতে তদন্তের ভার দিলে এর চেয়ে ভিন্ন কিছু হওয়ার কারণ নেই।আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে তদন্তের জন্য কোনো স্বাধীন কমিশন গঠন করা প্রয়োজন এবং অত্যন্ত জরুরী।

নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন, ২০১৩ এর ২(৬) ধারায় নির্যাতন এই আইনে নির্যাতন বলতে বোঝানো হয়েছে; (৬) —নির্যাতন’ অর্থ কষ্ট হয় এমন ধরনের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন; এতদ্ব্যতীত (ক) কোনো ব্যক্তি বা অপর কোনো ব্যক্তির নিকট হইতে তথ্য অথবা স্বীকারোক্তি আদায়ে; (খ) সন্দেহভাজন অথবা অপরাধী কোনো ব্যক্তিকে শাস্তি প্রদানে; (গ) কোনো ব্যক্তি অথবা তাহার মাধ্যমে অপর কোন ব্যক্তিকে ভয়ভীতি দেখানো; (ঘ) বৈষম্যের ভিত্তিতে কারো প্ররোচনা বা উস্কানি, কারো সম্মতিক্রমে অথবা নিজ ক্ষমতাবলে কোনো সরকারি কর্মকর্তা অথবা সরকারি ক্ষমতাবলে-এইরূপ কর্মসাধনও নির্যাতন হিসাবে গণ্য হবে।উক্ত সংজ্ঞা থেকে হেফাজতে নির্যাতনের বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্ট।নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন, ২০১৩ এর ২(৭) ধারায় অনুযায়ী —হেফাজতে মৃত্যু’ অর্থ সরকারি কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর হেফাজতে কোনো ব্যক্তির মৃত্যু; ইহা ছাড়াও হেফাজতে মৃত্যু বলিতে অবৈধ আটকাদেশ, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কর্তৃক গ্রেপ্তারকালে কোনো ব্যক্তির মৃত্যুকেও নির্দেশ করবে; কোনো মামলায় সাক্ষী হউক বা না হউক জিজ্ঞাসাবাদকালে মৃত্যুও হেফাজতে মৃত্যুর অন্তর্ভুক্ত হবে।

নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন, ২০১৩ এর ১৩ (১) এ বলা হয়েছে যে, কোনো সরকারী কর্মকর্তা বা কর্মচারী অপর কোনো ব্যক্তিকে নির্যাতন করিলে তাহা ঐ সরকারী কর্মকর্তা বা কর্মচারীর কৃত একটি অপরাধ হিসাবে গণ্য হবে।এছাড়াও এই আইনের ১৩ (২) ধারা অনুযায়ী কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী যদি কোনো ব্যক্তিকে নির্যাতনের মতো কোনো অপরাধ সংঘটনে উদ্যোগী হন অথবা সংঘটনে সহায়তা ও প্ররোচিত করেন; অথবা সংঘটনে ষড়যন্ত্র করেন তাহা হলে এই আইনের অধীনে তিনি অপরাধ করিয়াছেন বলিয়া গণ্য হবে।আবার ধারা ১৩ (৩) উল্লেখ আছে যে, এই আইনে কৃত অপরাধের দায়ভার অপরাধীকে ব্যক্তিগতভাবে বহন করতে হবে।নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন, ২০১৩ এর ৪ ধারায় বলা হয়েছে যে, ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮ এ যাহা কিছুই থাকুক না কেন, তাহা সত্ত্বেও এই আইনের এখতিয়ারাধীন কোন আদালতের সামনে কোন ব্যক্তি যদি অভিযোগ করে যে, তাহাকে নির্যাতন করা হয়েছে, তাহা হলে উক্ত আদালত তাৎক্ষণিকভাবে ঐ ব্যক্তির বিবৃতি লিপিবদ্ধ করবেন; একজন রেজিস্টার্ড চিকিৎসক দ্বারা অবিলম্বে তাহার দেহ পরীক্ষার আদেশ দিবেন; অভিযোগকারী মহিলা হলে রেজিস্টার্ড মহিলা চিকিৎসক দ্বারা পরীক্ষা করিবার ব্যবস্থা করবেন।চিকিৎসক অভিযোগকারী ব্যক্তির দেহের জখম ও নির্যাতনের চিহ্ন এবং নির্যাতনের সম্ভাব্য সময় উল্লেখপূর্বক ২৪ ঘণ্টার মধ্যে উহার একটি রিপোর্ট তৈরী করবেন।

সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক প্রস্তুতকৃত রিপোর্টেও একটি কপি অভিযোগকারী অথবা তাহার মনোনীত ব্যক্তিকে এবং আদালতে পেশ করবেন।এছাড়াও চিকিৎসক যদি এমন পরামর্শ দেন যে পরীক্ষাকৃত ব্যক্তির চিকিৎসা প্রয়োজন তাহালে আদালত ঐ ব্যক্তিকে হাসপাতালে ভর্তি করার নির্দেশ প্রদান করবেন।নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন, ২০১৩ এর ৫ ধারায় বলা হয়েছে আদালত ধারা ৪ এর উপধারা ১(ক) অনুযায়ী ক্ষতিগ্রস্ত অথবা সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির বিবৃতি লিপিবদ্ধ করার পর আদালত অনতিবিলম্বে বিবৃতির একটি কপি সংশ্লিষ্ট পুলিশ সুপারের কাছে বা ক্ষেত্রমত, তদূর্ধ্ব কোন পুলিশ কর্মকর্তার কাছে প্রেরণ করবেন এবং একটি মামলা দায়েরের নির্দেশ প্রদান করবেন।পুলিশ সুপার উক্ত আদেশ প্রাপ্তির পর পরই ঘটনা তদন্ত করিয়া চার্জ বা চার্জবিহীন রিপোর্ট পেশ করবেন।তবে শর্ত থাকে যে, সংশ্লিষ্ট সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি যদি মনে করেন যে পুলিশ দ্বারা সুষ্ঠুভাবে তদন্ত সম্ভব নয় সেক্ষেত্রে উক্ত ব্যক্তি যদি আদালতে আবেদন করবেন এবং আদালতে যদি তাহার আবেদনে এই মর্মে সন্তুষ্ট হন যে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির আবেদন যথার্থ সেক্ষেত্রে আদালত বিচার বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ প্রদান করতে পারবেন।

রিপোর্ট দাখিলের সময় তদন্ত কর্মকর্তা, ক্ষেত্রমত, বিচার বিভাগীয় তদন্ত কর্মকর্তা অভিযোগ প্রদানকারী ব্যক্তিকে তারিখ সহ রিপোর্ট দাখিল সম্পর্কে আদালতকে অবহিত করবেন।সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি ৩০ দিনের মধ্যে নিজে ব্যক্তিগতভাবে অথবা এডভোকেট মারফত উক্ত রিপোর্টের বিরুদ্ধে আদালতে আপত্তি জানাতে পারবে।আদালত সংঘটিত অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তির বা ব্যক্তিদের পদমর্যাদার নিম্নে নহে এমন পদমর্যাদার কোন পুলিশ অফিসারকে মামলার তদন্ত অনুষ্ঠানের নির্দেশ প্রদান করবেন।

লেখক: এডভোকটে, কলামিষ্ঠ ও মানবাধিকার সুশাসন-কর্মী।