রানা চক্রবর্তী : বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘চন্দ্রশেখর’ উপন্যাসের লরেন্স ফস্টর ‘শৈবলিনী’কে দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন। চন্দ্রশেখরের ওই কাহিনী কল্পিত হলেও, অতীতে কিন্তু ফস্টরের মত শত শত ইংরেজ বাস্তব-ক্ষেত্রেও বঙ্গনারীদের প্রতি তাঁদের লোলুপ দৃষ্টি হেনেছিলেন। নীলদর্পণের ‘পদী ময়রাণী’কে নিয়ে পাড়ার ছেলেরা যে ছড়া বেঁধেছিল, সেটার মূলেও তাঁর সাথে নীলকুঠীর সাহেবদের অবৈধ প্রণয় ছিল। বলা বাহুল্য যে, অতীতের ওই ধরণের সাহেবরা রবীন্দ্রনাথ কথিত ‘ছোট ইংরেজ’ ছিলেন। তবে তখন অনেক ‘বড় ইংরেজ’ও বাংলায় এসেছিলেন। আর তাঁদের মধ্যে অনেকেই উদ্দেশ্য-নির্বিশেষ দৃষ্টিতে বঙ্গনারীর কথা আলোচনাও করেছিলেন। সেই পর্দানসীন যুগে ভদ্রঘরের বঙ্গনারীর দর্শন পাওয়া কিন্তু সাহেবদের পক্ষে বিশেষ সহজসাধ্য ব্যাপার ছিল না। আর মনে চৌদ্দ আনা ইচ্ছা থাকলেও তখন কোন অভিজাত বাঙালীর বাড়িতে পার্টি উপলক্ষে আগত সাহেবদের সঙ্গে পুরনারীদের পরিচয় করিয়ে দেওয়ার সাহসও কারো ছিল না। ওদিকে ১৭৭৪ সালের আগে কলকাতায় সাহেবদের কোন সোসাইটি গড়ে ওঠেনি। তখন ব্যারাকে যেসব তরুণ ইংরেজ সৈন্যরা বাস করতেন, তাঁরা অনেক সময়েই দুধের তৃষ্ণা ঘোলে মিটিয়েছিলেন। ওই সময়ে দেশীয় নারী বলতে যাঁদের সঙ্গে তাঁদের পরিচয় সাধন সহজসাধ্য ছিল, তাঁরা কিন্তু মূলতঃ আয়া, মেথরানী প্রভৃতি নিম্নবর্ণভুক্ত মহিলারা ছিলেন। তাঁদের প্রণয়াসক্ত হয়ে অনেক সাহেবই তখন যেমন নিজের জীবন সার্থক হয়েছে বলে মনে করেছিলেন, তেমনি প্রতিদ্বন্দ্বীকে প্রেমের পথ থেকে সরাবার জন্য ‘ডুয়েল’ লড়েছিলেন, এবং তেমনি আবার সব কিছুতে ব্যর্থ হয়ে প্রণয়িনীর গৃহে আগুন লাগিয়ে দিয়ে হিংস্র আনন্দও উপভোগ করেছিলেন। সেই সময়ের অনেক ইংরেজ সাহেবের মুখ দিয়ে ওই মহিলাদের নিয়ে – “ওরা হল নিম্নবর্ণভুক্ত মহিলা, সমাজে অপাংক্তেয়। ওদের মনের গতিও নিম্নমুখী। অতএব হে ইংরেজ নন্দন, ওই পিচ্ছিল পথে পা দিও না” – ইত্যাদি গোছের অনেক নিষেধবাক্য উচ্চারিত হলেও, তাতে কিন্তু কেউ বিশেষ কেউ কর্ণপাত করেন নি। তখনকার এক মেথরানীর কথা উল্লেখ করতে গিয়ে ‘অ্যাংলো ইণ্ডিয়ান ডোমেষ্টিক স্কেচ’ গ্রন্থের লেখক উচ্ছ্বাসে ডগমগ হয়ে লিখেছিলেন, “Mehturanee – adorned possibly by all those indescribable Asiatic charms which the glowing tint of the Sindoor centering the forehead, the sable pencilling of Soorma and Missie on eyelid and teeth and the Sanguinary hue of the Pan upon lips and gums are of course so highly calculated to create.” অষ্টাদশ শতকে ‘জর্জ পারবেরী’ কলকাতায় নবাগত ইংরেজদের দাসদাসী নিয়োগের ব্যাপারে একটু সচেতন হতে বলেছিলেন। কারণ, “as soon as they find out your besetting sin they will pamper it and ultimately make you a perfect slave to it until they affect your ruin.” এখন প্রায় সকলেই জানেন যে, সেই মেথরানী-আয়ারা আর যাই হোন না কেন, বাঙালী ছিলেন না। তখন কর্মব্যপদেশে তাঁরা কলকাতাবাসী হয়েছিলেন। ছোট ইংরেজদের নজর ছোট ছিল, তাই তাঁদের কথা কম আলোচনা করাই ভালো। তবে সেকালের ভদ্রঘরের বঙ্গনারীদের দূর থেকে দেখেছিলেন, এবং নিজেদের ডায়েরীতে সেকথা শ্রদ্ধানম্রচিত্তে উল্লেখ করেছিলেন, এমন ইংরেজও কিন্তু দু’-একজন ছিলেন। অনেক ইংরেজই সেকালের কলকাতার খুঁটিনাটি বর্ণনা করলেও তাঁদের লেখায় তখনকার বঙ্গ-রমণীর বর্ণনা কিন্তু খুব বেশী একটা পাওয়া যায় না। নবাবী শাসনের পতনের পরে যখন দেশব্যাপী অরাজকতা দেখা দিয়েছিল, তখন বিজয়ী ইংরেজ সৈন্যদের লালসা শোভনতার সীমা অতিক্রম করে অতি হীনভাবেই আত্মপ্রকাশ করেছিল। পরবর্তীকালে ইংরেজ কুঠিয়ালদের পাপাচরণের অসংখ্য দৃষ্টান্ত দেখে ইংরেজদের নৈতিক মানদণ্ড সম্পর্কে তৎকালীন বঙ্গসমাজও সন্দিহান হয়ে উঠেছিল। ফলে পর্দাপ্রথা উত্তরোত্তর কঠোর হতে শুরু করেছিল। তখনকার সাহেবদের ডায়েরী বা জর্নালে বঙ্গনারীদের কথা বিশেষ উল্লিখিত হয়নি; সেটার কারণ হল যে, ওই সময়ে বঙ্গনারীর দর্শনলাভ খুব একটা সহজসাধ্য ব্যাপার ছিল না, এবং বাংলার কোথাও সেই বিষয়ে বেশী আগ্রহ দেখালে, তখন নীলদর্পণের ‘উড’ সাহেবের ভাষায় ‘বীটন টু জেলি’ হওয়ার বিলক্ষণ আশঙ্কা ছিল।

১৭৭৪ সালে ‘এশিয়াটিকাস’ কলকাতায় এসেছিলেন। নিজের লেখায় তিনি বঙ্গরমণীর প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়েছিলেন। তিনি সেই সময়ের বঙ্গরমণী ও তদানীন্তন কলকাতা প্রবাসী ইউরোপীয় ললনাদের পাশাপাশি তুলনা করে লিখেছিলেন, “বঙ্গনারীর প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের গড়ন এমন সুন্দর, তাঁদের নয়নযুগল এমন ব্যঞ্জনাময় যে গাত্রবর্ণের কথা একবারও মনে জাগে না, you must acknowledge them not inferior to the most celebrated beauties of Europe. পক্ষান্তরে কলকাতার শ্বেতাঙ্গিনীদের কথা ভাবুন। তাঁদের মুখের গোলাপী আভা বিদায় নেওয়ায় মুখ ফ্যাকাসে ও রোগাটে। দেখলে মনে হয় ‘ল্যাজারাস’ যেন কবর থেকে সত্যি উঠে এসেছে। অমন কঙ্কালসার বিবর্ণশ্রী শ্বেতাঙ্গিনীর চেয়ে the dazzling brightness of a copper-coloured face infinitely preferable.” তাঁর অল্পদিন কয়েকদিন পরেই ‘মিসেস ফে’ কলকাতায় এসেছিলেন। উক্ত ভদ্রমহিলার নিজের চরিত্রটি কিন্তু আদৌ নির্মল ছিল না। তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের কেচ্ছা অবলম্বন করে তখনকার দিনে দুটি আস্ত বই লেখা হয়েছিল। তাই সেই সময়ে কলকাতায় এসে, ধবলী অপেক্ষা শ্যামলীদের প্রতি ইংরেজ যুবকদের অত পক্ষপাতিত্ব দেখে তিনি যদি ঈর্ষান্বিত হয়ে থাকেন, তাহলে তাঁকে দোষ দেওয়া যায় না। তাঁর মত ছিল যে, ওই সময়ের হিন্দু রমণীরা নাকি বড় বেশী প্রসাধন করতেন; আর সেই সাজ-পোশাক প্রসাধনাদি বাদ দিলে তাঁদের সত্যিই সুন্দরী বলা চলে কিনা – সেবিষয়ে তিনি সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন। বাংলার নারীদের নিয়ে তিনি লিখেছিলেন, “Their whole time is taken up in decorating their persons – the hair, eyelids, eyebrows, teeth, hands and nails – all undergo a certain process to render them more completely fascinating … the motive being to secure the affections of a husband or to counteract the plans of a rival.”
মজার ব্যাপার হল যে, তিনি বাংলার নারীদের নিয়ে এত কথা লিখলেও, ওই সময়ে মাত্র দু’জন নারীর দেখা পেয়েছিলেন, সেটাও আবার দূর থেকে। তিনি নিজেই লিখেছিলেন, “হিন্দু নারীদের কখনও প্রকাশ্যে দেখা যায় না। যখন গাড়ি চেপে তাঁরা পথে কোন কারণে বের হয়, তখন সেই গাড়ির চারিদিকে ঘেরাটোপ দেওয়া থাকে।” তবে ‘ফ্যানি পার্কস’ তখনকার এক হিন্দুর অন্দরমহলে প্রবেশের আমন্ত্রণ পেয়েছিলেন। চীৎপুরের কোন এক ধনীবাবুর বাড়িতে দুর্গাপুজা উপলক্ষে আয়োজিত নাচ দেখবার জন্য পার্কস দম্পতি আমন্ত্রিত হয়েছিলেন। সেই নাচ শেষ হওয়ার পরে মিসেস পার্কসকে সাদরে অন্দরমহলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। একটা ‘অন্ধকার সিঁড়ি বেয়ে’ তাঁকে সেখানে যেতে হয়েছিল। নীচের প্রশস্ত হলঘরে তখন আমন্ত্রিতরা পান ভোজনে ব্যস্ত ছিলেন। উপরে একপাশে বাঁশের কাবারী কেটে চিক বানানো হয়েছিল। সেই চিকের ফাঁক দিয়ে নীচের নাচঘরের দৃশ্যাদি দেখা যেত। মিসেস পার্কস আগেই শুনেছিলেন যে, বঙ্গনারীরা পরিবারের পুরুষ ছাড়া অন্য কোন পুরুষকেই তাঁদের অন্দরমহলে প্রবেশ করতে দেন না। কিন্তু ওই বাড়ির অন্দরমহলে প্রবেশ করে তিনি যখন বাড়ির মেয়েদের সঙ্গে আলাপ করেছিলেন, তখন রীতিমত বিস্মিত হয়েছিলেন। কারণ, পর-পুরুষদের সামনে যাঁরা কখনো হাজির হতেন না, অন্দরমহলে যাঁরা পর-পুরুষদের কোন দিন প্রবেশ করতে দিতেন না, তাঁরা কিন্তু পর-পুরুষদের সকলকেই চিনতেন! সেদিন চিকের ফাঁক দিয়ে নীচের হলঘরে আমন্ত্রিত ব্যক্তিরা বসে আছেন বলে দেখা যাচ্ছিল, এবং অন্তঃপুরবাসিনী মহিলারা “… appeared to know all the gentlemen in sight and told me their names. They were very inquisitive and requested me to point out my husband, inquired how many children I had and asked me a thousand questions.” বর্তমানে বঙ্গনারীদের শাড়ি পরবার বিশেষ ধরনটি বিশ্বব্যাপী খ্যাতি অর্জন করেছে। সেকালিনীদের শাড়ি পরবার কৌশল দেখে মিসেস পার্কস মুগ্ধ হয়েছিলেন। একটি মাত্র বস্ত্রকে সুন্দরভাবে শরীরের চারিদিকে পাক খাইয়ে পরতে দেখে তিনি রীতিমত অবাক হয়ে গিয়েছিলেন – “although in one piece a complete dress and is a remarkably graceful one.” তবে পার্কসের সময়ে হিন্দু রমণীদের পোশাক ও পরিধানে মুসলিম ছাপ বেশ একটু প্রবল ছিল। তাঁদের হাতে শাঁখা ও রূপার গহনা, চোখে সুর্মা এবং কপালে ভ্রূ-যুগলের মধ্যস্থলে একটি কালো টীপ থাকত। পার্কসের বর্ণনা অনুসারে, তদানীন্তন বঙ্গরমণীর পোশাক ছিল নীল পাড় মসলিন, সেটার তলায় সায়া-জাতীয় কোন কিছু থাকত না। সেই সময়ের মেয়েদের গায়ে কোন জামার কথাও তিনি উল্লেখ করেননি। জঙ্গীপুরের ঘাটে তিনি এক বঙ্গরমণীকে স্নান করতে দেখেছিলেন। ভাগীরথীর জলে দাঁড়িয়ে সেই মহিলাটি নিজের স্নানপর্ব সমাধা করেছিলেন। এক-কোমর জলে দাঁড়িয়ে অঙ্গ মার্জনা করতে করতে তিনি ধীরে ধীরে পরনের শাড়িটিও কেচে ফেলেছিলেন; কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল যে, সমগ্র শাড়িটি কাচা হয়ে গেলেও, তাঁর দেহ কিন্তু একবারে জন্যও অনাবৃত হয়নি। সব সময়েই শাড়ির কোন-না-কোন অংশ দিয়ে তিনি নিজের লজ্জা নিবারণ করেছিলেন। মিসেস পার্কস লিখেছিলেন, “They wash their hair and bodies retaining all the time some part of their drapery which assumes the most classical appearance.” একইভাবে ‘হাচিসন’ কলকাতার এসপ্লানেড ঘাটে বঙ্গরমণীর স্নানের দৃশ্য দেখেছিলেন। তবে সেক্ষেত্রে তিনি অবাক হয়েছিলেন অন্য কারণে। স্নানের শেষে জলপূর্ণ কলসী নিয়ে তাঁদের অবলীলাক্রমে হেঁটে যাওয়া দেখে সাহেব তাজ্জব হয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর ধারণা হয়েছিল যে, নিয়মিতভাবে ওই কলসী বহনই বঙ্গরমণীদের শরীরের অমন আঁটসাট গড়নের মূল কারণ।
এই প্রবন্ধে এখনও পর্যন্ত যাঁদের কথা উল্লেখ করা হল, তাঁরা কেউ খৃষ্টান মিশনারী ছিলেন না। মিশনারীদের মধ্যে কেরী, ওয়ার্ড প্রভৃতি অনেকেই প্রাসঙ্গিকভাবে তাঁদের লেখায় বঙ্গরমণীদের কথা উল্লেখ করেছিলেন। তাঁদের কেউ কেউ সেই সময়ের বঙ্গরমণীদের কুসংস্কার, কেউ বাল্য-বিবাহ, তো কেউ আবার সতীদাহ প্রথার জন্য বেদনা বোধ করেছিলেন। ওয়ার্ড সাহেব তো একদা এক শ্মশানঘাটে একজন বঙ্গরমণীকে নিজের অসুস্থ সন্তানকে জীবন্ত অবস্থাতেই ভাসিয়ে দিতে দেখেছিলেন। সেই ঘটনার একদিকে ছিল কুসংস্কার, আর অন্য দিকে ছিল মাতৃহৃদয় – যদিও শেষপর্যন্ত কুসংস্কারই তাতে জয়ী হয়েছিল। ওয়ার্ড সাহেব সেই দৃশ্য দেখে বেদনার্তচিত্তে প্রশ্ন করেছিলেন, “মাতৃহৃদয় কবে শতদলের মত সব বাধাবিপত্তি ভেদ করে আপন গৌরবে ফুটে উঠবে?”
‘স্কেচেস অব ইণ্ডিয়ার’ গ্রন্থকারও কিছুদিনের জন্য কলকাতায় ছিলেন। পরে তিনি সারা ভারত ঘুরে বেড়িয়েছিলেন। বাংলা তথা সামগ্রিকভাবে ভারতীয় মহিলাদের কমনীয় সৌন্দর্য তাঁকে বার বার মুগ্ধ করেছিল। তিনি লিখেছিলেন, “হিন্দুস্থানী মহিলাদের (আমি হিন্দু ও মুসলমান উভয়ের কথাই বলছি) শরীর লাবণ্যমণ্ডিত; ছন্দ ও সৌন্দর্য বলতে যে আদর্শটি চোখের সামনে ভেসে ওঠে তাই দিয়ে তৈরী তাঁদের অঙ্গ। তাঁদের মুখশ্রী যত সুন্দর ততোধিক মিষ্টি এবং ব্যঞ্জনাময়। তাঁদের লম্বা টানা চোখের সেই ঠাণ্ডা আগুন এমনিতেই যেন কথা বলে। এ দেশের মেয়েরা তাঁদের চুলের গরবে গরবিনী। তাঁদের চুল বেশ লম্বা ও চকচকে, মাথার পিছনে সামান্য একটু পাক দিয়ে বেঁধে রাখে।”এই পর্যটক তাঁর গ্রন্থের ফুটনোটে ভারতে আগত অন্যান্য ইউরোপীয়দের কূপমণ্ডুকতার নিন্দা করে মন্তব্য করেছিলেন, “হাজার হাজার আগন্তুকদের এক বৃহৎ অংশ ভারতে অবস্থানকালে তাঁদের চাকরদের স্ত্রী বা তাঁদের উপপত্নী ছাড়া সত্যিকারের উচ্চশ্রেণীর মহিলাদের না দেখেই ভারত ছেড়ে চলে যায়।”
‘জন-লে-কোর্ডিয়ের’ তাঁর লেখায় ভারতীয় ও ইউরোপীয় মহিলাদের মধ্যে তুলনামূলক আলোচনা করেছিলেন। ভদ্রলোক ফরাসী হলেও, বেশ কিছুদিন ইংরেজ বাহিনীতে কাজ করেছিলেন। ১৭৮৫ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে তিনি কলকাতায় ছিলেন। তিনি তাঁর ডায়েরীতে লিখেছিলেন, “দশ-বারো বছর বয়সেই হিন্দু মেয়েদের বিয়ে হয়ে যায়। আমরা সন্তানসম্ভবা নারীদের এদেশে প্রায়ই দেখি। সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার ঠিক পর থেকেই তাঁরা তাঁর জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করে। যখনই সম্ভব স্তন্যপান করায়, যখন তা সম্ভব হয় না তখন সন্তানের স্বাস্থ্য ও মেজাজ যাতে ভাল থাকে তার ব্যবস্থা করে। সন্তানকে ক্রমাগত স্তন্যদানের ফলে পয়োধর দুর্বল হয়, কিন্তু হাসিমুখে তাঁরা সে ত্রুটি মেনে নেয়। স্বামীকে সুখী করা ছাড়া জীবনে তাঁদের অন্য কোন উচ্চাকাঙ্ক্ষা নেই, এভাবেই তাঁরা দেশের পুরুষ মানুষেরা যাতে অদৃষ্টের দুঃখ কষ্টের মুখোমুখি দাঁড়াতে পারে, তার সাহস যোগায়। … গাত্রবর্ণ ও নিরাবরণতার প্রতি কটাক্ষ করে যাঁদের তোমরা বর্বর বল, তাঁদের নারী-জাতির এই হল চরিত্র। এবার আমাদের সুদর্শনা ভদ্রস্বভাবা ইউরোপীয় ললনার কথা ভাবা যাক। ইউরোপীয় মহিলারা কেবল ধন-সম্পদের দিকে তাকিয়ে বিবাহ করেন, সমাজ নির্দিষ্ট কর্তব্য পর্যন্ত তাঁরা পালন করেন না। বিয়ের পর যদি কোন মহিলার সন্তান হয় তবে তাঁর ভার মাহিনাভোগী নার্সের উপরে দেওয়া হয়। যতদিন পর্যন্ত সন্তান তাঁর রূপসী মায়ের কাজে বাধার সৃষ্টি করবে, ততদিন সে নার্সের কাছেই মানুষ হবে।” সন্তান পালনের প্রতি ইউরোপীয় মহিলাদের অনাগ্রহ, বিলাস-ব্যসনের প্রতি অত্যধিক মোহ ইত্যাদি দোষের উল্লেখ করে পরবর্তীকালেও বহু ইউরোপীয় পর্যটক বাঁকা মন্তব্য করেছিলেন। ভারতীয় নারীর শ্রেষ্ঠ বিকাশ তাঁর মাতৃত্বে, সেখানেই ভারতীয় নারীত্বের সার্থকতা, একথা কোর্ডিয়ের তাঁর গ্রন্থের অন্যত্রও বলেছিলেন।
আঠারো শতকের একেবারে শেষদিকে ‘মিসেস শেরউড’ কলকাতায় এসেছিলেন। তিনি কলকাতা থেকে মুর্শিদাবাদ, এবং আরও বহু জায়গায় গিয়েছিলেন। এই ভদ্রমহিলা অত্যন্ত সন্দেহবাতিকগ্রস্ত ছিলেন। ‘ভারতবর্ষ’ নামটি শুনেই তাঁর আতঙ্ক হত। তিনি কারো কাছে উড়ো কথা শুনেছিলেন যে, ভারতের নেটিভ আয়ারা নাকি সাহেব-শিশুদের আফিম খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখে! কথাটা শোনামাত্র তাঁর সন্দেহ হতে শুরু করেছিল। আর যেদিনই তাঁর শিশু একটু বেশি ঘুমোত, সেদিনই তাঁর সেই সন্দেহ ঘনীভূত হত। আবার তাঁর শিশুটি কম ঘুমোলেও ওই আয়ার রেহাই ছিল না। তিনি শুনেছিলেন যে, এদেশে অনেকেই নাকি নানা মতলবে তুকতাক করেন। একদিন তাঁর বাড়ির এক হিন্দু আয়া নিজস্ব ধর্মীয় সংস্কারবশে শেরউড-কন্যার কপালে একটি সিঁদুরের টিপ পরিয়ে দেওয়ায়, ভয়ে আশঙ্কায় মেম সাহেবের মুখ শুকিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এহেন মিসেস শেরউডই আবার তাঁর শিশুর আয়ার ঘুমপাড়ানি গানের প্রশংসা করে লিখেছিলেন, “তাঁর কথা ও সুর এখনো আমার স্পষ্ট মনে আছে। পরবর্তীকালে বহুদিন পর্যন্ত আমি সেই গান মূল হিন্দুস্থানীতে গেয়েছি। যখনই কোন শিশু আমার কোলে শুয়েছে, তাঁকে ঘুম পাড়াবার জন্য সেই গানই আমি গেয়েছি।” গানটির ইংরেজি অনুবাদও তিনি তাঁর স্মৃতিগ্রন্থে প্রকাশ করেছিলেন –
“Sleep make baby
Sleep make
Sleep little baby
Sleep, Oh! Oh!
Golden is thy bed
Of silk are thy curtains
From Cabul the Mughal woman comes
To make my master sleep.”
‘ভেরেলেস্ট’ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি শাসনের একেবারে প্রথম দিকে অল্প কিছুদিনের জন্য বাংলার গভর্ণর হয়েছিলেন। মতভেদ ও দলীয় চক্রান্তের ফলে তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। তিনি বঙ্গদেশে তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা পরে পুস্তকাকারে প্রকাশ করেছিলেন। তিনি বঙ্গদেশীয় মহিলা সম্পর্কে নিজের যে সব অভিমত প্রকাশ করেছিলেন, সেগুলোর কোন কোন অংশ যদিও সমর্থনযোগ্য নয়, এবং সংস্কারমুক্ত একজন পশ্চিমী সাহেবের মুখে শোভনীয়ও নয়, কিন্তু তবুও একজনের ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গী হিসাবে এখানে সেটার উল্লেখ করা উচিত। ভেরেলেস্ট লিখেছিলেন, “মেয়েদের আব্রু নষ্ট করলে মুসলমানদের সম্ভ্রমে যতখানি আঘাত লাগে, হিন্দুদের তার চেয়ে কম কিছু লাগে না। ভারতে এই আব্রু নষ্ট করাই জঘন্যতম অপমান। মিঃ স্কাসটন বলেছেন – ‘বাংলার সুবেদার সরফরাজ খান তাঁর সর্বাধিক ধনী প্রজা জগৎশেঠকে যে রকম লজ্জাকরভাবে অবমাননা করেছিলেন, তত অপমান সরফরাজ খান কোনদিন ভোগ করেননি। সুবেদার সরফরাজ শুনলেন, তাঁর প্রজা জগৎশেঠের পুত্র এক অসামান্যা সুন্দরীকে বিয়ে করেছে। সুবেদার চাপ দিলেন, একবার দেখাতেই হবে সেই রূপসীকে। ছেলের বাপ (মেয়ের শ্বশুর) সুবেদারকে অনেক অনুনয় করলেন, কিন্তু ব্যর্থ হলেন। শেষপর্যন্ত সরফরাজ সেই মেয়েকে দেখলেন, এবং ফেরত পাঠিয়ে দিলেন। বোধ হয় তাঁর কোন ক্ষতি তিনি করেননি। কিন্তু এই রক্ষণশীল পর্দানসিন দেশে, এই ঘটনায় তিনি মনে যে আঘাত পেলেন তা দুরপনেয়।’ … মিঃ ডো বলেছেন – ‘ভারতে মহিলাদের এমন পবিত্ররূপে গণ্য করা হয় যে, সাধারণ সৈন্যরা যুদ্ধকালে চরম ধ্বংস কার্যের সময়েও তাঁদের অঙ্গে হাত দেয় না। হারেম হল তাঁদের আশ্রয়স্থল। যুদ্ধ-বিজয়ী বর্বরের দল তাঁদের স্বামীকে হত্যা করে সেই রক্তমাখা হাতে হারেমে প্রবেশ করে। কিন্তু তাঁরাও হারেমবাসিনী পুরনারীদের গোপন কক্ষ দেখে ভয়ে পিছিয়ে আসে।’ বর্বর দস্যুরা পর্যন্ত যেখানে মহিলাদের সম্ভ্রম হানি করতে সাহস করেনি, আমাদের বিচারালয় কি সেই কাজ করবে? একটি সরকারের পরিবর্তে নতুন সরকার আমরা কায়েম করতে পারিনি। আমরা কি দুর্বল নারী, শিশু ও ভৃত্যদের (যাঁদের পরিবারের কর্তাই এতদিন নিজ শৌর্যের দ্বারা রক্ষা করতেন) রক্ষার দায়িত্ব অস্বীকার করব? আমরা কি স্বভাবের ব্যতিক্রম ঘটিয়ে পবিত্র পারিবারিক বন্ধন ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করে দেব?” ভেরেলেস্ট যখন বাংলার গভর্ণর হয়েছিলেন, তখন নবাবী শাসনের শেষ হলেও কোম্পানি শাসনও কিন্তু দানা বেঁধে উঠতে পারেনি। দ্বৈত-শাসনের নামে বাংলার সর্বত্র তখন অরাজকতা চলছিল। একদিকে দুর্ভিক্ষ, অন্যদিকে দস্যুবৃত্তি ও লুণ্ঠন তখন নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে গিয়েছিল। বঙ্কিমচন্দ্রের ‘আনন্দমঠ’ সেই পটভূমিকাতেই রচিত হয়েছিল। ভেরেলেস্ট তৎকালীন শাসন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আনয়নের দায়িত্বের কথাই লণ্ডনস্থ কোম্পানির পরিচালক-মণ্ডলীকে স্মরণ করিয়ে দিতে গিয়ে ওই কথাগুলি লিখেছিলেন। কিন্তু এরপরেই ভেরেলেস্ট যে নিজস্ব অভিমত প্রকাশ করেছিলেন, সেটা তাঁর অজ্ঞতারই পরিচয় দেয়। তিনি নিজে পশ্চিমী প্রগতিশীল আবহাওয়ায় লালিতপালিত হওয়া সত্ত্বেও বহু-বিবাহকে সমর্থন করেছিলেন, এবং সেটার স্বপক্ষে হাস্যকর যুক্তিও দেখিয়েছিলেন। তাঁর মতে, “প্রেসিডেণ্ট মন্টেস্কু বলেছেন – ‘গ্রীষ্মপ্রধান দেশে মেয়েরা মাত্র আট, নয়, বড় জোর দশের মধ্যেই বিবাহযোগ্য হয়ে পড়ে। বিশ বছরেই তাঁরা বুড়িয়ে যায়। স্বভাবতঃই, এদেশে, আইনের কোন বাধা না থাকলে, একজন পুরুষ তাঁর স্ত্রীকে ত্যাগ করে অন্য স্ত্রীলোককে বিয়ে করে। কাজেই বহু-বিবাহ প্রচলিত হওয়াই উচিত।’ আমাদের (ইউরোপীয়দের) আইন নাতিশীতোষ্ণ দেশের আইন। সেখানে মেয়েদের সৌন্দর্য দীর্ঘস্থায়ী। বেশি বয়সে যখন তাঁদের যৌবন পরিপুষ্ট হয়, তখন দৈহিক রূপ ও মনের জোর দুই মিলিয়ে তাঁরা পুরুষের সমকক্ষ হয়ে পড়ে। ফলে আমাদের দেশে মাত্র এক বিবাহ প্রচলিত। অন্যের দ্বারা কৃত সন্তানরা ‘জারজ’ রূপে বিবেচিত হয়। বাপ-মায়ের সঙ্গে সন্তানদের সম্পর্কও শেষ হয়, এবং সম্পত্তির উত্তরাধিকারিত্বও জারজ সন্তানরা পায় না।”
মিসেস ফে তাঁর গ্রন্থে সেকালের কোন এক বড়লোকের মেয়ের বিবাহের বর্ণনা দিয়েছিলেন। তিনি অবশ্য নিজের চোখে সেই বিবাহ দেখেননি, অন্যের মুখ থেকে শুনে সেকথা লিপিবদ্ধ করেছিলেন। তাঁর বর্ণিত সেই বিবাহের শোভাযাত্রায়, বর-কনে একটি বহুবিচিত্র কারুকার্য-খচিত পাল্কিতে চেপে বের হয়েছিলেন, ও পাত্র-পাত্রী পক্ষের লোকজনও তাতে যোগ দিয়েছিলেন। তাঁদের কেউ ঘোড়ায় চেপেছিলেন, তো কেউ হাতির পিঠে ছিলেন, তো কেউ আবার নিজস্ব পাল্কিতে ছিলেন। নাচওয়ালীরা নাচতে নাচতে, এবং বাদ্যকরের দল বাজনা বাজাতে বাজাতে সেই শোভাযাত্রার পুরোভাগে চলেছিল। সন্ধ্যায় মেয়ের বাপের বাড়িতে বাজি পোড়ানো হয়েছিল, তাছাড়া সেখানে খানাপিনারও নাকি কোন বিরাম ছিল না। তবে সেসব কথাই তিনি সম্ভবতঃ কোন ইউরোপীয় ব্যক্তির মুখ থেকে শুনেছিলেন; এবং তিনিই তাঁকে জানিয়েছিলেন যে, সেখানে – “no European was present.” সেখানে কোন ইউরোপীয় উপস্থিত ছিলেন না। তখন যে অনুষ্ঠানে কোন ইউরোপীয় হাজির ছিলেন না, অথচ সেখানে অত অর্থ খরচ করা হয়েছিল – এটা সম্ভবতঃ মিসেস ফে’র পক্ষে বিশ্বাস করা কঠিন হয়েছিল। অবশ্য সেই সময়ের অন্যান্য সামাজিক খবরগুলি কিন্তু তিনি কোন ইউরোপীয়ানদের মুখ থেকে শোনেন নি। সেগুলো তিনি ভারতীয়দের মুখে থেকেই শুনেছিলেন, এবং বিশ্বাস করতেও দ্বিধা করেন নি। যেমন – “বড়লোক তাঁর একমাত্র কন্যার জন্য স্বজাতির মধ্যে থেকেই গরিব পাত্র সংগ্রহ করে ঘর-জামাই করতে চেষ্টা করেন। এটা প্রয়োজন। কারণ, মেয়ের বৃদ্ধ বাপ যখন মারা যাবেন, তখন তাঁর তরুণ স্বামী তাঁর নিজের বাপ-মায়ের তাগিদে, এবং নিজের প্রয়োজনে পরিবারের মহিলাদের সাহায্যে স্বজাতীয় কোন গরিব পরিবারের সুন্দরী কন্যার খোঁজ করতে থাকবেন। তারপরে সেই সুন্দরীকে দ্বিতীয় স্ত্রীরূপে গ্রহণ করবেন। তাতে অবশ্য পরিবারে প্রথম স্ত্রীর প্রাধান্য অক্ষুণ্ণ থাকবে, প্রথম স্ত্রীই বাড়ির কর্ত্রী হবেন। স্বামীর পক্ষেও যেকোন একজনের প্রতি বেশী আসক্ত হওয়া সম্ভব নয়, কারণ প্রচলিত আইন অনুসারে স্বামী পালাক্রমে প্রত্যেক স্ত্রীর সঙ্গেই বাস করতে বাধ্য।” তখনকার ভারতীয় সমাজের সেই সব খবর মিসেস ফে বেশ নিষ্ঠার সঙ্গেই সংগ্রহ করেছিলেন, যদিও কোন ভারতীয় পরিবারের মহিলাদের সঙ্গে কখনোই তাঁর প্রত্যক্ষ কোন পরিচয় ঘটেনি।
বর্তমান সময়ে কোন হিন্দু গরিবের কন্যাদায় যেমন আহার-নিদ্রাহরণকারী ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়, সেকালেও সেটাই ছিল। এই প্রসঙ্গে মিশনারী ‘ওয়ার্ড’ লিখেছিলেন, “দু’বেলা দু’মুঠো অন্নের ভাবনা হিন্দুর প্রধান ভাবনা নয়। কয়েকটি অন্ধ কুসংস্কার, হাস্যকর দেশাচারের জন্য ব্যয় নির্বাহ কি করে হবে সেই ভাবনাতেই তাঁরা কাতর। অথচ, হাজার হাজার টাকা ব্যয় করবার পরেও নব-দম্পতির হাতে এমন টাকা থাকে না যা দিয়ে সুখে দিনাতিপাত করা যায়। শুধু লোক-দেখানো আড়ম্বর, হৈ-চৈ, ধূমপান (গ্রামবাসীদের আপ্যায়নের জন্য সুগন্ধি তামাক ও হুঁকা-গড়গড়া ইত্যাদির ব্যবহার), ব্রাহ্মণ ও আত্মীয় ভোজনেই সব অর্থ ব্যয় হয়ে যায়।” ওয়ার্ড সাহেব যতই ওই সময়ের বিয়ের খরচ নিয়ে নিজের মাথাব্যথা করুন না কেন, সেই সময়ের ইউরোপীয়রা কিন্তু সেসব নিয়ে মোটেও তেমন আগ্রহী ছিলেন না। তখন তাঁদের কাছে লাখ টাকার প্রশ্ন ছিল যে, বাঙালী মেয়েদের সৌন্দর্যের গোপন রহস্যটা কি? আর তাঁদের রূপের উৎসই বা কোথায়? ওয়ার্ড সাহেব নিজেও সেই বিষয়ে খোঁজ করেছিলেন। তিনিই লিখেছিলেন, “মেয়েদের গায়ের ত্বককে মসৃণ করবার জন্য ইউরোপীয় মায়েরা কন্যাদের অতি অল্প বয়স থেকেই নানারকম ওষুধ খাওয়াতে শুরু করেন। কিন্তু বাঙালী মেয়েরা সারা শরীরে সর্ষের তেল মাখেন। এই তেলই তাঁদের গরম, ঠাণ্ডা ও মশার উপদ্রব থেকে রক্ষা করে। তারপরে পাঁচ বছর বয়স থেকেই তাঁদের রৌদ্রস্নান চলে। ফলে তাঁদের গায়ের রং আবার কালো হতে শুরু করে। কিন্তু তা সত্ত্বেও জন্মকালে মেয়ের গায়ের রং যাই হোক না কেন (অবশ্যই তুলনামূলক বিচারে সেই রং খুব ফর্সা বলতে হবে), সে সব মেয়ের গাত্রবর্ণের রক্তাভা দেখে তুমি অবাক হবে না।”
(তথ্যসূত্র:
১- An Anglo-Indian Domestic Sketch: A Letter from an Artist in India to His Mother in England, Colesworthey Grant.
২- THE EAST INDIA COMPANY & THE BRITISH EMPIRE IN THE FAR EAST, Marguerite E. WILBUR.
৩- Fanny Parks: Intrepid Memsahib: Fanny parks (1794-1875) an Independent Traveller in 19th Century India, Barbara Eaton.
৪- Memoirs Of The Life Of William Ward: Late Baptist Missionary In India, William Ward.
৫- A View of the Rise, Progress, and Present State of the English Government in Bengal, Harry Verelst.
৬- Up the Country: Letters from India, Emily Eden.)

রানা চক্রবর্তী : বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘চন্দ্রশেখর’ উপন্যাসের লরেন্স ফস্টর ‘শৈবলিনী’কে দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন। চন্দ্রশেখরের ওই কাহিনী কল্পিত হলেও, অতীতে কিন্তু ফস্টরের মত শত শত ইংরেজ বাস্তব-ক্ষেত্রেও বঙ্গনারীদের প্রতি তাঁদের লোলুপ দৃষ্টি হেনেছিলেন। নীলদর্পণের ‘পদী ময়রাণী’কে নিয়ে পাড়ার ছেলেরা যে ছড়া বেঁধেছিল, সেটার মূলেও তাঁর সাথে নীলকুঠীর সাহেবদের অবৈধ প্রণয় ছিল। বলা বাহুল্য যে, অতীতের ওই ধরণের সাহেবরা রবীন্দ্রনাথ কথিত ‘ছোট ইংরেজ’ ছিলেন। তবে তখন অনেক ‘বড় ইংরেজ’ও বাংলায় এসেছিলেন। আর তাঁদের মধ্যে অনেকেই উদ্দেশ্য-নির্বিশেষ দৃষ্টিতে বঙ্গনারীর কথা আলোচনাও করেছিলেন। সেই পর্দানসীন যুগে ভদ্রঘরের বঙ্গনারীর দর্শন পাওয়া কিন্তু সাহেবদের পক্ষে বিশেষ সহজসাধ্য ব্যাপার ছিল না। আর মনে চৌদ্দ আনা ইচ্ছা থাকলেও তখন কোন অভিজাত বাঙালীর বাড়িতে পার্টি উপলক্ষে আগত সাহেবদের সঙ্গে পুরনারীদের পরিচয় করিয়ে দেওয়ার সাহসও কারো ছিল না। ওদিকে ১৭৭৪ সালের আগে কলকাতায় সাহেবদের কোন সোসাইটি গড়ে ওঠেনি। তখন ব্যারাকে যেসব তরুণ ইংরেজ সৈন্যরা বাস করতেন, তাঁরা অনেক সময়েই দুধের তৃষ্ণা ঘোলে মিটিয়েছিলেন। ওই সময়ে দেশীয় নারী বলতে যাঁদের সঙ্গে তাঁদের পরিচয় সাধন সহজসাধ্য ছিল, তাঁরা কিন্তু মূলতঃ আয়া, মেথরানী প্রভৃতি নিম্নবর্ণভুক্ত মহিলারা ছিলেন। তাঁদের প্রণয়াসক্ত হয়ে অনেক সাহেবই তখন যেমন নিজের জীবন সার্থক হয়েছে বলে মনে করেছিলেন, তেমনি প্রতিদ্বন্দ্বীকে প্রেমের পথ থেকে সরাবার জন্য ‘ডুয়েল’ লড়েছিলেন, এবং তেমনি আবার সব কিছুতে ব্যর্থ হয়ে প্রণয়িনীর গৃহে আগুন লাগিয়ে দিয়ে হিংস্র আনন্দও উপভোগ করেছিলেন। সেই সময়ের অনেক ইংরেজ সাহেবের মুখ দিয়ে ওই মহিলাদের নিয়ে – “ওরা হল নিম্নবর্ণভুক্ত মহিলা, সমাজে অপাংক্তেয়। ওদের মনের গতিও নিম্নমুখী। অতএব হে ইংরেজ নন্দন, ওই পিচ্ছিল পথে পা দিও না” – ইত্যাদি গোছের অনেক নিষেধবাক্য উচ্চারিত হলেও, তাতে কিন্তু কেউ বিশেষ কেউ কর্ণপাত করেন নি। তখনকার এক মেথরানীর কথা উল্লেখ করতে গিয়ে ‘অ্যাংলো ইণ্ডিয়ান ডোমেষ্টিক স্কেচ’ গ্রন্থের লেখক উচ্ছ্বাসে ডগমগ হয়ে লিখেছিলেন, “Mehturanee – adorned possibly by all those indescribable Asiatic charms which the glowing tint of the Sindoor centering the forehead, the sable pencilling of Soorma and Missie on eyelid and teeth and the Sanguinary hue of the Pan upon lips and gums are of course so highly calculated to create.” অষ্টাদশ শতকে ‘জর্জ পারবেরী’ কলকাতায় নবাগত ইংরেজদের দাসদাসী নিয়োগের ব্যাপারে একটু সচেতন হতে বলেছিলেন। কারণ, “as soon as they find out your besetting sin they will pamper it and ultimately make you a perfect slave to it until they affect your ruin.” এখন প্রায় সকলেই জানেন যে, সেই মেথরানী-আয়ারা আর যাই হোন না কেন, বাঙালী ছিলেন না। তখন কর্মব্যপদেশে তাঁরা কলকাতাবাসী হয়েছিলেন। ছোট ইংরেজদের নজর ছোট ছিল, তাই তাঁদের কথা কম আলোচনা করাই ভালো। তবে সেকালের ভদ্রঘরের বঙ্গনারীদের দূর থেকে দেখেছিলেন, এবং নিজেদের ডায়েরীতে সেকথা শ্রদ্ধানম্রচিত্তে উল্লেখ করেছিলেন, এমন ইংরেজও কিন্তু দু’-একজন ছিলেন। অনেক ইংরেজই সেকালের কলকাতার খুঁটিনাটি বর্ণনা করলেও তাঁদের লেখায় তখনকার বঙ্গ-রমণীর বর্ণনা কিন্তু খুব বেশী একটা পাওয়া যায় না। নবাবী শাসনের পতনের পরে যখন দেশব্যাপী অরাজকতা দেখা দিয়েছিল, তখন বিজয়ী ইংরেজ সৈন্যদের লালসা শোভনতার সীমা অতিক্রম করে অতি হীনভাবেই আত্মপ্রকাশ করেছিল। পরবর্তীকালে ইংরেজ কুঠিয়ালদের পাপাচরণের অসংখ্য দৃষ্টান্ত দেখে ইংরেজদের নৈতিক মানদণ্ড সম্পর্কে তৎকালীন বঙ্গসমাজও সন্দিহান হয়ে উঠেছিল। ফলে পর্দাপ্রথা উত্তরোত্তর কঠোর হতে শুরু করেছিল। তখনকার সাহেবদের ডায়েরী বা জর্নালে বঙ্গনারীদের কথা বিশেষ উল্লিখিত হয়নি; সেটার কারণ হল যে, ওই সময়ে বঙ্গনারীর দর্শনলাভ খুব একটা সহজসাধ্য ব্যাপার ছিল না, এবং বাংলার কোথাও সেই বিষয়ে বেশী আগ্রহ দেখালে, তখন নীলদর্পণের ‘উড’ সাহেবের ভাষায় ‘বীটন টু জেলি’ হওয়ার বিলক্ষণ আশঙ্কা ছিল।

১৭৭৪ সালে ‘এশিয়াটিকাস’ কলকাতায় এসেছিলেন। নিজের লেখায় তিনি বঙ্গরমণীর প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়েছিলেন। তিনি সেই সময়ের বঙ্গরমণী ও তদানীন্তন কলকাতা প্রবাসী ইউরোপীয় ললনাদের পাশাপাশি তুলনা করে লিখেছিলেন, “বঙ্গনারীর প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের গড়ন এমন সুন্দর, তাঁদের নয়নযুগল এমন ব্যঞ্জনাময় যে গাত্রবর্ণের কথা একবারও মনে জাগে না, you must acknowledge them not inferior to the most celebrated beauties of Europe. পক্ষান্তরে কলকাতার শ্বেতাঙ্গিনীদের কথা ভাবুন। তাঁদের মুখের গোলাপী আভা বিদায় নেওয়ায় মুখ ফ্যাকাসে ও রোগাটে। দেখলে মনে হয় ‘ল্যাজারাস’ যেন কবর থেকে সত্যি উঠে এসেছে। অমন কঙ্কালসার বিবর্ণশ্রী শ্বেতাঙ্গিনীর চেয়ে the dazzling brightness of a copper-coloured face infinitely preferable.” তাঁর অল্পদিন কয়েকদিন পরেই ‘মিসেস ফে’ কলকাতায় এসেছিলেন। উক্ত ভদ্রমহিলার নিজের চরিত্রটি কিন্তু আদৌ নির্মল ছিল না। তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের কেচ্ছা অবলম্বন করে তখনকার দিনে দুটি আস্ত বই লেখা হয়েছিল। তাই সেই সময়ে কলকাতায় এসে, ধবলী অপেক্ষা শ্যামলীদের প্রতি ইংরেজ যুবকদের অত পক্ষপাতিত্ব দেখে তিনি যদি ঈর্ষান্বিত হয়ে থাকেন, তাহলে তাঁকে দোষ দেওয়া যায় না। তাঁর মত ছিল যে, ওই সময়ের হিন্দু রমণীরা নাকি বড় বেশী প্রসাধন করতেন; আর সেই সাজ-পোশাক প্রসাধনাদি বাদ দিলে তাঁদের সত্যিই সুন্দরী বলা চলে কিনা – সেবিষয়ে তিনি সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন। বাংলার নারীদের নিয়ে তিনি লিখেছিলেন, “Their whole time is taken up in decorating their persons – the hair, eyelids, eyebrows, teeth, hands and nails – all undergo a certain process to render them more completely fascinating … the motive being to secure the affections of a husband or to counteract the plans of a rival.”
মজার ব্যাপার হল যে, তিনি বাংলার নারীদের নিয়ে এত কথা লিখলেও, ওই সময়ে মাত্র দু’জন নারীর দেখা পেয়েছিলেন, সেটাও আবার দূর থেকে। তিনি নিজেই লিখেছিলেন, “হিন্দু নারীদের কখনও প্রকাশ্যে দেখা যায় না। যখন গাড়ি চেপে তাঁরা পথে কোন কারণে বের হয়, তখন সেই গাড়ির চারিদিকে ঘেরাটোপ দেওয়া থাকে।” তবে ‘ফ্যানি পার্কস’ তখনকার এক হিন্দুর অন্দরমহলে প্রবেশের আমন্ত্রণ পেয়েছিলেন। চীৎপুরের কোন এক ধনীবাবুর বাড়িতে দুর্গাপুজা উপলক্ষে আয়োজিত নাচ দেখবার জন্য পার্কস দম্পতি আমন্ত্রিত হয়েছিলেন। সেই নাচ শেষ হওয়ার পরে মিসেস পার্কসকে সাদরে অন্দরমহলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। একটা ‘অন্ধকার সিঁড়ি বেয়ে’ তাঁকে সেখানে যেতে হয়েছিল। নীচের প্রশস্ত হলঘরে তখন আমন্ত্রিতরা পান ভোজনে ব্যস্ত ছিলেন। উপরে একপাশে বাঁশের কাবারী কেটে চিক বানানো হয়েছিল। সেই চিকের ফাঁক দিয়ে নীচের নাচঘরের দৃশ্যাদি দেখা যেত। মিসেস পার্কস আগেই শুনেছিলেন যে, বঙ্গনারীরা পরিবারের পুরুষ ছাড়া অন্য কোন পুরুষকেই তাঁদের অন্দরমহলে প্রবেশ করতে দেন না। কিন্তু ওই বাড়ির অন্দরমহলে প্রবেশ করে তিনি যখন বাড়ির মেয়েদের সঙ্গে আলাপ করেছিলেন, তখন রীতিমত বিস্মিত হয়েছিলেন। কারণ, পর-পুরুষদের সামনে যাঁরা কখনো হাজির হতেন না, অন্দরমহলে যাঁরা পর-পুরুষদের কোন দিন প্রবেশ করতে দিতেন না, তাঁরা কিন্তু পর-পুরুষদের সকলকেই চিনতেন! সেদিন চিকের ফাঁক দিয়ে নীচের হলঘরে আমন্ত্রিত ব্যক্তিরা বসে আছেন বলে দেখা যাচ্ছিল, এবং অন্তঃপুরবাসিনী মহিলারা “… appeared to know all the gentlemen in sight and told me their names. They were very inquisitive and requested me to point out my husband, inquired how many children I had and asked me a thousand questions.” বর্তমানে বঙ্গনারীদের শাড়ি পরবার বিশেষ ধরনটি বিশ্বব্যাপী খ্যাতি অর্জন করেছে। সেকালিনীদের শাড়ি পরবার কৌশল দেখে মিসেস পার্কস মুগ্ধ হয়েছিলেন। একটি মাত্র বস্ত্রকে সুন্দরভাবে শরীরের চারিদিকে পাক খাইয়ে পরতে দেখে তিনি রীতিমত অবাক হয়ে গিয়েছিলেন – “although in one piece a complete dress and is a remarkably graceful one.” তবে পার্কসের সময়ে হিন্দু রমণীদের পোশাক ও পরিধানে মুসলিম ছাপ বেশ একটু প্রবল ছিল। তাঁদের হাতে শাঁখা ও রূপার গহনা, চোখে সুর্মা এবং কপালে ভ্রূ-যুগলের মধ্যস্থলে একটি কালো টীপ থাকত। পার্কসের বর্ণনা অনুসারে, তদানীন্তন বঙ্গরমণীর পোশাক ছিল নীল পাড় মসলিন, সেটার তলায় সায়া-জাতীয় কোন কিছু থাকত না। সেই সময়ের মেয়েদের গায়ে কোন জামার কথাও তিনি উল্লেখ করেননি। জঙ্গীপুরের ঘাটে তিনি এক বঙ্গরমণীকে স্নান করতে দেখেছিলেন। ভাগীরথীর জলে দাঁড়িয়ে সেই মহিলাটি নিজের স্নানপর্ব সমাধা করেছিলেন। এক-কোমর জলে দাঁড়িয়ে অঙ্গ মার্জনা করতে করতে তিনি ধীরে ধীরে পরনের শাড়িটিও কেচে ফেলেছিলেন; কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল যে, সমগ্র শাড়িটি কাচা হয়ে গেলেও, তাঁর দেহ কিন্তু একবারে জন্যও অনাবৃত হয়নি। সব সময়েই শাড়ির কোন-না-কোন অংশ দিয়ে তিনি নিজের লজ্জা নিবারণ করেছিলেন। মিসেস পার্কস লিখেছিলেন, “They wash their hair and bodies retaining all the time some part of their drapery which assumes the most classical appearance.” একইভাবে ‘হাচিসন’ কলকাতার এসপ্লানেড ঘাটে বঙ্গরমণীর স্নানের দৃশ্য দেখেছিলেন। তবে সেক্ষেত্রে তিনি অবাক হয়েছিলেন অন্য কারণে। স্নানের শেষে জলপূর্ণ কলসী নিয়ে তাঁদের অবলীলাক্রমে হেঁটে যাওয়া দেখে সাহেব তাজ্জব হয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর ধারণা হয়েছিল যে, নিয়মিতভাবে ওই কলসী বহনই বঙ্গরমণীদের শরীরের অমন আঁটসাট গড়নের মূল কারণ।
এই প্রবন্ধে এখনও পর্যন্ত যাঁদের কথা উল্লেখ করা হল, তাঁরা কেউ খৃষ্টান মিশনারী ছিলেন না। মিশনারীদের মধ্যে কেরী, ওয়ার্ড প্রভৃতি অনেকেই প্রাসঙ্গিকভাবে তাঁদের লেখায় বঙ্গরমণীদের কথা উল্লেখ করেছিলেন। তাঁদের কেউ কেউ সেই সময়ের বঙ্গরমণীদের কুসংস্কার, কেউ বাল্য-বিবাহ, তো কেউ আবার সতীদাহ প্রথার জন্য বেদনা বোধ করেছিলেন। ওয়ার্ড সাহেব তো একদা এক শ্মশানঘাটে একজন বঙ্গরমণীকে নিজের অসুস্থ সন্তানকে জীবন্ত অবস্থাতেই ভাসিয়ে দিতে দেখেছিলেন। সেই ঘটনার একদিকে ছিল কুসংস্কার, আর অন্য দিকে ছিল মাতৃহৃদয় – যদিও শেষপর্যন্ত কুসংস্কারই তাতে জয়ী হয়েছিল। ওয়ার্ড সাহেব সেই দৃশ্য দেখে বেদনার্তচিত্তে প্রশ্ন করেছিলেন, “মাতৃহৃদয় কবে শতদলের মত সব বাধাবিপত্তি ভেদ করে আপন গৌরবে ফুটে উঠবে?”
‘স্কেচেস অব ইণ্ডিয়ার’ গ্রন্থকারও কিছুদিনের জন্য কলকাতায় ছিলেন। পরে তিনি সারা ভারত ঘুরে বেড়িয়েছিলেন। বাংলা তথা সামগ্রিকভাবে ভারতীয় মহিলাদের কমনীয় সৌন্দর্য তাঁকে বার বার মুগ্ধ করেছিল। তিনি লিখেছিলেন, “হিন্দুস্থানী মহিলাদের (আমি হিন্দু ও মুসলমান উভয়ের কথাই বলছি) শরীর লাবণ্যমণ্ডিত; ছন্দ ও সৌন্দর্য বলতে যে আদর্শটি চোখের সামনে ভেসে ওঠে তাই দিয়ে তৈরী তাঁদের অঙ্গ। তাঁদের মুখশ্রী যত সুন্দর ততোধিক মিষ্টি এবং ব্যঞ্জনাময়। তাঁদের লম্বা টানা চোখের সেই ঠাণ্ডা আগুন এমনিতেই যেন কথা বলে। এ দেশের মেয়েরা তাঁদের চুলের গরবে গরবিনী। তাঁদের চুল বেশ লম্বা ও চকচকে, মাথার পিছনে সামান্য একটু পাক দিয়ে বেঁধে রাখে।”এই পর্যটক তাঁর গ্রন্থের ফুটনোটে ভারতে আগত অন্যান্য ইউরোপীয়দের কূপমণ্ডুকতার নিন্দা করে মন্তব্য করেছিলেন, “হাজার হাজার আগন্তুকদের এক বৃহৎ অংশ ভারতে অবস্থানকালে তাঁদের চাকরদের স্ত্রী বা তাঁদের উপপত্নী ছাড়া সত্যিকারের উচ্চশ্রেণীর মহিলাদের না দেখেই ভারত ছেড়ে চলে যায়।”
‘জন-লে-কোর্ডিয়ের’ তাঁর লেখায় ভারতীয় ও ইউরোপীয় মহিলাদের মধ্যে তুলনামূলক আলোচনা করেছিলেন। ভদ্রলোক ফরাসী হলেও, বেশ কিছুদিন ইংরেজ বাহিনীতে কাজ করেছিলেন। ১৭৮৫ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে তিনি কলকাতায় ছিলেন। তিনি তাঁর ডায়েরীতে লিখেছিলেন, “দশ-বারো বছর বয়সেই হিন্দু মেয়েদের বিয়ে হয়ে যায়। আমরা সন্তানসম্ভবা নারীদের এদেশে প্রায়ই দেখি। সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার ঠিক পর থেকেই তাঁরা তাঁর জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করে। যখনই সম্ভব স্তন্যপান করায়, যখন তা সম্ভব হয় না তখন সন্তানের স্বাস্থ্য ও মেজাজ যাতে ভাল থাকে তার ব্যবস্থা করে। সন্তানকে ক্রমাগত স্তন্যদানের ফলে পয়োধর দুর্বল হয়, কিন্তু হাসিমুখে তাঁরা সে ত্রুটি মেনে নেয়। স্বামীকে সুখী করা ছাড়া জীবনে তাঁদের অন্য কোন উচ্চাকাঙ্ক্ষা নেই, এভাবেই তাঁরা দেশের পুরুষ মানুষেরা যাতে অদৃষ্টের দুঃখ কষ্টের মুখোমুখি দাঁড়াতে পারে, তার সাহস যোগায়। … গাত্রবর্ণ ও নিরাবরণতার প্রতি কটাক্ষ করে যাঁদের তোমরা বর্বর বল, তাঁদের নারী-জাতির এই হল চরিত্র। এবার আমাদের সুদর্শনা ভদ্রস্বভাবা ইউরোপীয় ললনার কথা ভাবা যাক। ইউরোপীয় মহিলারা কেবল ধন-সম্পদের দিকে তাকিয়ে বিবাহ করেন, সমাজ নির্দিষ্ট কর্তব্য পর্যন্ত তাঁরা পালন করেন না। বিয়ের পর যদি কোন মহিলার সন্তান হয় তবে তাঁর ভার মাহিনাভোগী নার্সের উপরে দেওয়া হয়। যতদিন পর্যন্ত সন্তান তাঁর রূপসী মায়ের কাজে বাধার সৃষ্টি করবে, ততদিন সে নার্সের কাছেই মানুষ হবে।” সন্তান পালনের প্রতি ইউরোপীয় মহিলাদের অনাগ্রহ, বিলাস-ব্যসনের প্রতি অত্যধিক মোহ ইত্যাদি দোষের উল্লেখ করে পরবর্তীকালেও বহু ইউরোপীয় পর্যটক বাঁকা মন্তব্য করেছিলেন। ভারতীয় নারীর শ্রেষ্ঠ বিকাশ তাঁর মাতৃত্বে, সেখানেই ভারতীয় নারীত্বের সার্থকতা, একথা কোর্ডিয়ের তাঁর গ্রন্থের অন্যত্রও বলেছিলেন।
আঠারো শতকের একেবারে শেষদিকে ‘মিসেস শেরউড’ কলকাতায় এসেছিলেন। তিনি কলকাতা থেকে মুর্শিদাবাদ, এবং আরও বহু জায়গায় গিয়েছিলেন। এই ভদ্রমহিলা অত্যন্ত সন্দেহবাতিকগ্রস্ত ছিলেন। ‘ভারতবর্ষ’ নামটি শুনেই তাঁর আতঙ্ক হত। তিনি কারো কাছে উড়ো কথা শুনেছিলেন যে, ভারতের নেটিভ আয়ারা নাকি সাহেব-শিশুদের আফিম খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখে! কথাটা শোনামাত্র তাঁর সন্দেহ হতে শুরু করেছিল। আর যেদিনই তাঁর শিশু একটু বেশি ঘুমোত, সেদিনই তাঁর সেই সন্দেহ ঘনীভূত হত। আবার তাঁর শিশুটি কম ঘুমোলেও ওই আয়ার রেহাই ছিল না। তিনি শুনেছিলেন যে, এদেশে অনেকেই নাকি নানা মতলবে তুকতাক করেন। একদিন তাঁর বাড়ির এক হিন্দু আয়া নিজস্ব ধর্মীয় সংস্কারবশে শেরউড-কন্যার কপালে একটি সিঁদুরের টিপ পরিয়ে দেওয়ায়, ভয়ে আশঙ্কায় মেম সাহেবের মুখ শুকিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এহেন মিসেস শেরউডই আবার তাঁর শিশুর আয়ার ঘুমপাড়ানি গানের প্রশংসা করে লিখেছিলেন, “তাঁর কথা ও সুর এখনো আমার স্পষ্ট মনে আছে। পরবর্তীকালে বহুদিন পর্যন্ত আমি সেই গান মূল হিন্দুস্থানীতে গেয়েছি। যখনই কোন শিশু আমার কোলে শুয়েছে, তাঁকে ঘুম পাড়াবার জন্য সেই গানই আমি গেয়েছি।” গানটির ইংরেজি অনুবাদও তিনি তাঁর স্মৃতিগ্রন্থে প্রকাশ করেছিলেন –
“Sleep make baby
Sleep make
Sleep little baby
Sleep, Oh! Oh!
Golden is thy bed
Of silk are thy curtains
From Cabul the Mughal woman comes
To make my master sleep.”
‘ভেরেলেস্ট’ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি শাসনের একেবারে প্রথম দিকে অল্প কিছুদিনের জন্য বাংলার গভর্ণর হয়েছিলেন। মতভেদ ও দলীয় চক্রান্তের ফলে তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। তিনি বঙ্গদেশে তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা পরে পুস্তকাকারে প্রকাশ করেছিলেন। তিনি বঙ্গদেশীয় মহিলা সম্পর্কে নিজের যে সব অভিমত প্রকাশ করেছিলেন, সেগুলোর কোন কোন অংশ যদিও সমর্থনযোগ্য নয়, এবং সংস্কারমুক্ত একজন পশ্চিমী সাহেবের মুখে শোভনীয়ও নয়, কিন্তু তবুও একজনের ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গী হিসাবে এখানে সেটার উল্লেখ করা উচিত। ভেরেলেস্ট লিখেছিলেন, “মেয়েদের আব্রু নষ্ট করলে মুসলমানদের সম্ভ্রমে যতখানি আঘাত লাগে, হিন্দুদের তার চেয়ে কম কিছু লাগে না। ভারতে এই আব্রু নষ্ট করাই জঘন্যতম অপমান। মিঃ স্কাসটন বলেছেন – ‘বাংলার সুবেদার সরফরাজ খান তাঁর সর্বাধিক ধনী প্রজা জগৎশেঠকে যে রকম লজ্জাকরভাবে অবমাননা করেছিলেন, তত অপমান সরফরাজ খান কোনদিন ভোগ করেননি। সুবেদার সরফরাজ শুনলেন, তাঁর প্রজা জগৎশেঠের পুত্র এক অসামান্যা সুন্দরীকে বিয়ে করেছে। সুবেদার চাপ দিলেন, একবার দেখাতেই হবে সেই রূপসীকে। ছেলের বাপ (মেয়ের শ্বশুর) সুবেদারকে অনেক অনুনয় করলেন, কিন্তু ব্যর্থ হলেন। শেষপর্যন্ত সরফরাজ সেই মেয়েকে দেখলেন, এবং ফেরত পাঠিয়ে দিলেন। বোধ হয় তাঁর কোন ক্ষতি তিনি করেননি। কিন্তু এই রক্ষণশীল পর্দানসিন দেশে, এই ঘটনায় তিনি মনে যে আঘাত পেলেন তা দুরপনেয়।’ … মিঃ ডো বলেছেন – ‘ভারতে মহিলাদের এমন পবিত্ররূপে গণ্য করা হয় যে, সাধারণ সৈন্যরা যুদ্ধকালে চরম ধ্বংস কার্যের সময়েও তাঁদের অঙ্গে হাত দেয় না। হারেম হল তাঁদের আশ্রয়স্থল। যুদ্ধ-বিজয়ী বর্বরের দল তাঁদের স্বামীকে হত্যা করে সেই রক্তমাখা হাতে হারেমে প্রবেশ করে। কিন্তু তাঁরাও হারেমবাসিনী পুরনারীদের গোপন কক্ষ দেখে ভয়ে পিছিয়ে আসে।’ বর্বর দস্যুরা পর্যন্ত যেখানে মহিলাদের সম্ভ্রম হানি করতে সাহস করেনি, আমাদের বিচারালয় কি সেই কাজ করবে? একটি সরকারের পরিবর্তে নতুন সরকার আমরা কায়েম করতে পারিনি। আমরা কি দুর্বল নারী, শিশু ও ভৃত্যদের (যাঁদের পরিবারের কর্তাই এতদিন নিজ শৌর্যের দ্বারা রক্ষা করতেন) রক্ষার দায়িত্ব অস্বীকার করব? আমরা কি স্বভাবের ব্যতিক্রম ঘটিয়ে পবিত্র পারিবারিক বন্ধন ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করে দেব?” ভেরেলেস্ট যখন বাংলার গভর্ণর হয়েছিলেন, তখন নবাবী শাসনের শেষ হলেও কোম্পানি শাসনও কিন্তু দানা বেঁধে উঠতে পারেনি। দ্বৈত-শাসনের নামে বাংলার সর্বত্র তখন অরাজকতা চলছিল। একদিকে দুর্ভিক্ষ, অন্যদিকে দস্যুবৃত্তি ও লুণ্ঠন তখন নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে গিয়েছিল। বঙ্কিমচন্দ্রের ‘আনন্দমঠ’ সেই পটভূমিকাতেই রচিত হয়েছিল। ভেরেলেস্ট তৎকালীন শাসন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আনয়নের দায়িত্বের কথাই লণ্ডনস্থ কোম্পানির পরিচালক-মণ্ডলীকে স্মরণ করিয়ে দিতে গিয়ে ওই কথাগুলি লিখেছিলেন। কিন্তু এরপরেই ভেরেলেস্ট যে নিজস্ব অভিমত প্রকাশ করেছিলেন, সেটা তাঁর অজ্ঞতারই পরিচয় দেয়। তিনি নিজে পশ্চিমী প্রগতিশীল আবহাওয়ায় লালিতপালিত হওয়া সত্ত্বেও বহু-বিবাহকে সমর্থন করেছিলেন, এবং সেটার স্বপক্ষে হাস্যকর যুক্তিও দেখিয়েছিলেন। তাঁর মতে, “প্রেসিডেণ্ট মন্টেস্কু বলেছেন – ‘গ্রীষ্মপ্রধান দেশে মেয়েরা মাত্র আট, নয়, বড় জোর দশের মধ্যেই বিবাহযোগ্য হয়ে পড়ে। বিশ বছরেই তাঁরা বুড়িয়ে যায়। স্বভাবতঃই, এদেশে, আইনের কোন বাধা না থাকলে, একজন পুরুষ তাঁর স্ত্রীকে ত্যাগ করে অন্য স্ত্রীলোককে বিয়ে করে। কাজেই বহু-বিবাহ প্রচলিত হওয়াই উচিত।’ আমাদের (ইউরোপীয়দের) আইন নাতিশীতোষ্ণ দেশের আইন। সেখানে মেয়েদের সৌন্দর্য দীর্ঘস্থায়ী। বেশি বয়সে যখন তাঁদের যৌবন পরিপুষ্ট হয়, তখন দৈহিক রূপ ও মনের জোর দুই মিলিয়ে তাঁরা পুরুষের সমকক্ষ হয়ে পড়ে। ফলে আমাদের দেশে মাত্র এক বিবাহ প্রচলিত। অন্যের দ্বারা কৃত সন্তানরা ‘জারজ’ রূপে বিবেচিত হয়। বাপ-মায়ের সঙ্গে সন্তানদের সম্পর্কও শেষ হয়, এবং সম্পত্তির উত্তরাধিকারিত্বও জারজ সন্তানরা পায় না।”
মিসেস ফে তাঁর গ্রন্থে সেকালের কোন এক বড়লোকের মেয়ের বিবাহের বর্ণনা দিয়েছিলেন। তিনি অবশ্য নিজের চোখে সেই বিবাহ দেখেননি, অন্যের মুখ থেকে শুনে সেকথা লিপিবদ্ধ করেছিলেন। তাঁর বর্ণিত সেই বিবাহের শোভাযাত্রায়, বর-কনে একটি বহুবিচিত্র কারুকার্য-খচিত পাল্কিতে চেপে বের হয়েছিলেন, ও পাত্র-পাত্রী পক্ষের লোকজনও তাতে যোগ দিয়েছিলেন। তাঁদের কেউ ঘোড়ায় চেপেছিলেন, তো কেউ হাতির পিঠে ছিলেন, তো কেউ আবার নিজস্ব পাল্কিতে ছিলেন। নাচওয়ালীরা নাচতে নাচতে, এবং বাদ্যকরের দল বাজনা বাজাতে বাজাতে সেই শোভাযাত্রার পুরোভাগে চলেছিল। সন্ধ্যায় মেয়ের বাপের বাড়িতে বাজি পোড়ানো হয়েছিল, তাছাড়া সেখানে খানাপিনারও নাকি কোন বিরাম ছিল না। তবে সেসব কথাই তিনি সম্ভবতঃ কোন ইউরোপীয় ব্যক্তির মুখ থেকে শুনেছিলেন; এবং তিনিই তাঁকে জানিয়েছিলেন যে, সেখানে – “no European was present.” সেখানে কোন ইউরোপীয় উপস্থিত ছিলেন না। তখন যে অনুষ্ঠানে কোন ইউরোপীয় হাজির ছিলেন না, অথচ সেখানে অত অর্থ খরচ করা হয়েছিল – এটা সম্ভবতঃ মিসেস ফে’র পক্ষে বিশ্বাস করা কঠিন হয়েছিল। অবশ্য সেই সময়ের অন্যান্য সামাজিক খবরগুলি কিন্তু তিনি কোন ইউরোপীয়ানদের মুখ থেকে শোনেন নি। সেগুলো তিনি ভারতীয়দের মুখে থেকেই শুনেছিলেন, এবং বিশ্বাস করতেও দ্বিধা করেন নি। যেমন – “বড়লোক তাঁর একমাত্র কন্যার জন্য স্বজাতির মধ্যে থেকেই গরিব পাত্র সংগ্রহ করে ঘর-জামাই করতে চেষ্টা করেন। এটা প্রয়োজন। কারণ, মেয়ের বৃদ্ধ বাপ যখন মারা যাবেন, তখন তাঁর তরুণ স্বামী তাঁর নিজের বাপ-মায়ের তাগিদে, এবং নিজের প্রয়োজনে পরিবারের মহিলাদের সাহায্যে স্বজাতীয় কোন গরিব পরিবারের সুন্দরী কন্যার খোঁজ করতে থাকবেন। তারপরে সেই সুন্দরীকে দ্বিতীয় স্ত্রীরূপে গ্রহণ করবেন। তাতে অবশ্য পরিবারে প্রথম স্ত্রীর প্রাধান্য অক্ষুণ্ণ থাকবে, প্রথম স্ত্রীই বাড়ির কর্ত্রী হবেন। স্বামীর পক্ষেও যেকোন একজনের প্রতি বেশী আসক্ত হওয়া সম্ভব নয়, কারণ প্রচলিত আইন অনুসারে স্বামী পালাক্রমে প্রত্যেক স্ত্রীর সঙ্গেই বাস করতে বাধ্য।” তখনকার ভারতীয় সমাজের সেই সব খবর মিসেস ফে বেশ নিষ্ঠার সঙ্গেই সংগ্রহ করেছিলেন, যদিও কোন ভারতীয় পরিবারের মহিলাদের সঙ্গে কখনোই তাঁর প্রত্যক্ষ কোন পরিচয় ঘটেনি।
বর্তমান সময়ে কোন হিন্দু গরিবের কন্যাদায় যেমন আহার-নিদ্রাহরণকারী ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়, সেকালেও সেটাই ছিল। এই প্রসঙ্গে মিশনারী ‘ওয়ার্ড’ লিখেছিলেন, “দু’বেলা দু’মুঠো অন্নের ভাবনা হিন্দুর প্রধান ভাবনা নয়। কয়েকটি অন্ধ কুসংস্কার, হাস্যকর দেশাচারের জন্য ব্যয় নির্বাহ কি করে হবে সেই ভাবনাতেই তাঁরা কাতর। অথচ, হাজার হাজার টাকা ব্যয় করবার পরেও নব-দম্পতির হাতে এমন টাকা থাকে না যা দিয়ে সুখে দিনাতিপাত করা যায়। শুধু লোক-দেখানো আড়ম্বর, হৈ-চৈ, ধূমপান (গ্রামবাসীদের আপ্যায়নের জন্য সুগন্ধি তামাক ও হুঁকা-গড়গড়া ইত্যাদির ব্যবহার), ব্রাহ্মণ ও আত্মীয় ভোজনেই সব অর্থ ব্যয় হয়ে যায়।” ওয়ার্ড সাহেব যতই ওই সময়ের বিয়ের খরচ নিয়ে নিজের মাথাব্যথা করুন না কেন, সেই সময়ের ইউরোপীয়রা কিন্তু সেসব নিয়ে মোটেও তেমন আগ্রহী ছিলেন না। তখন তাঁদের কাছে লাখ টাকার প্রশ্ন ছিল যে, বাঙালী মেয়েদের সৌন্দর্যের গোপন রহস্যটা কি? আর তাঁদের রূপের উৎসই বা কোথায়? ওয়ার্ড সাহেব নিজেও সেই বিষয়ে খোঁজ করেছিলেন। তিনিই লিখেছিলেন, “মেয়েদের গায়ের ত্বককে মসৃণ করবার জন্য ইউরোপীয় মায়েরা কন্যাদের অতি অল্প বয়স থেকেই নানারকম ওষুধ খাওয়াতে শুরু করেন। কিন্তু বাঙালী মেয়েরা সারা শরীরে সর্ষের তেল মাখেন। এই তেলই তাঁদের গরম, ঠাণ্ডা ও মশার উপদ্রব থেকে রক্ষা করে। তারপরে পাঁচ বছর বয়স থেকেই তাঁদের রৌদ্রস্নান চলে। ফলে তাঁদের গায়ের রং আবার কালো হতে শুরু করে। কিন্তু তা সত্ত্বেও জন্মকালে মেয়ের গায়ের রং যাই হোক না কেন (অবশ্যই তুলনামূলক বিচারে সেই রং খুব ফর্সা বলতে হবে), সে সব মেয়ের গাত্রবর্ণের রক্তাভা দেখে তুমি অবাক হবে না।”
(তথ্যসূত্র:
১- An Anglo-Indian Domestic Sketch: A Letter from an Artist in India to His Mother in England, Colesworthey Grant.
২- THE EAST INDIA COMPANY & THE BRITISH EMPIRE IN THE FAR EAST, Marguerite E. WILBUR.
৩- Fanny Parks: Intrepid Memsahib: Fanny parks (1794-1875) an Independent Traveller in 19th Century India, Barbara Eaton.
৪- Memoirs Of The Life Of William Ward: Late Baptist Missionary In India, William Ward.
৫- A View of the Rise, Progress, and Present State of the English Government in Bengal, Harry Verelst.
৬- Up the Country: Letters from India, Emily Eden.)